বগুড়ায় শহীদ খোকন পার্ক যাঁর নামে

 বগুড়ায় শহীদ খোকন পার্ক যাঁর নামে

   এড. মোঃ মনতেজার রহমান মন্টু :খোকন ছিলেন মা’র বড্ড আদরের সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ শেষে যে মুক্তিযোদ্ধাই খোকনের বাড়িতে যেতেন তাঁকেই জড়িয়ে ধরে মা বলতেন, তোমরা ফিরে এসেছো-আমার খোকন কই? মুক্তিযোদ্ধারা বলতেন অন্য জেলার দায়িত্বে ছিল অস্ত্র জমা দিতে দেরি হচ্ছে। মা সারা দিন সারা রাত জায়নামাজে বসে কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। খোকন আর ফিরে আসেনি। ১৯৭১-এ ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থেকেই সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে ছাত্র-জনতা। এমনিভাবে বগুড়ায় স্বেচ্ছাসেবক ব্রিগেড গঠন করা হয়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুদুর রহমান হেলাল, দৈনিক করতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক, টি এম মুসা পেস্তা এবং অন্যান্যদের নেতৃত্বে এই ব্রিগেড পরিচালিত হতো। এড. রফিকুল ইসলাম লাল, খোকন, টিটু, তারিক, ছুন্ন, চাঁন্দুসহ বহু ছাত্র যুবকেরা বাঁশের লাঠি, কাঠের রাইফেল, বন্দুক বানিয়ে ট্রেনিং করাতো বগুড়া জিলা স্কুলের আম বাগানের নীচে।

রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি সেনারা ২৫শে মার্চ বগুড়া ঢুকবে মর্মে ওয়্যারলেস মেসেজ এলে বগুড়া সদর থানার বাঙালি পুলিশ হাবিলদার মোসলেম উদ্দিন এই তথ্য ফাঁস করে দেন ব্রিগেড নেতাদের। আরও খবর আসে ঢাকা রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তরে পাকিস্তানীরা আক্রমণ চালিয়েছে। ফলে বগুড়া পুলিশ বাহিনীর উৎসাহে এবং তৎকালীন ডিসি খান এ আলম খান সাহেবের সিদ্ধান্তে বগুড়ায় পুলিশ লাইনের অস্ত্র ভান্ডার খুলে দিতে। খোকনের পুরোনাম গোলাম মোঃ পাইকাড়, পিতা মোজাম পাইকাড়, পিতা মাতার ৩য় সন্তান খোকন। লেখাপড়া করতেন বগুড়া জিলা স্কুল এবং পরবর্তীতে আজিজুল হক কলেজে ২য় বর্ষে এই মেধাবী যুবক দেশপ্রেম উদ্ধুদ্ধ খোকনকে সব সময় দেখা যেতো স্বাধীনতার আন্দোলনে পুরোভাগে। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাতেই দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বগুড়ার দিকে অগ্রসর হওয়া পাকিস্তানী সেনা বাহিনীকে প্রতিহত করতে। খোকন ও তাঁর সহ যোদ্ধাদের সাহসী প্রতিরোধের কারণে বেশ কিছুদিন পাকিস্তানী বাহিনী বগুড়া শহরে ঢুকতেই পারেনি।

পাকিস্তানী হানাদারদের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সূর্যকে ছিনিয়ে আনবার দৃপ্ত প্রত্যয়ে খোকন সামরিক ট্রেনিং গ্রহণ করতে ভারতে যান। ট্রেনিং শেষে তাঁর নেতৃত্বে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধার দল জয়পুরহাট হয়ে দেশে প্রবেশের নির্দেশ এলে খোকন বাধ্য হয়ে বগুড়ায় আক্কেলপুর পৌছে। খোকন জয়পুরহাট এলাকা ঠিকমত চিনত না, তবে সে জানতো জয়পুরহাটে রাজাকার আব্দুল আলীম, জামাত নেতা আব্বাস আলীর বাড়ি এবং ভয়ংকর জায়গা। এদিকে ভারতে মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং করতে গিয়েছিলেন আক্কেলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান। তিনি খোকনের হাতে একখানা চিঠি লিখে দিয়ে বলেছিলেন আক্কেলপুর তার অনুগত কর্মিকে চিঠিটি দিলে তোমাদের থাকার এবং খাবার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানতেন না তার অনুগত কর্মি ততদিনে রাজাকারের খাতায় নাম লিখেছে।

 যখনই খোকন ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে চিঠিখানি কর্মির হাতে দিয়েছি, তখনই অনুগত কর্মি খুশি হয়ে তাদেরকে গোপনে বসতে দিয়ে ৪টি মুরগি জবাই করে রাতের খাবার ব্যবস্থা করে অতি গোপনে রাজাকার আব্দুল আলীমকে খবর দিয়ে পাকিস্তানী সেনা বাহিনী নিয়ে এসে গোটা বাড়ী ঘেরাও করে বিশ্বাসঘাতকতা করে খোকনের দলকে ধরিয়ে দেয়। সারারাত বড্ড অমানবিক নির্যাতন এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ১৬ জনকে মেরে ফেলে। পরের দিন খোকনকে দিয়ে ১৬ জনের গর্ত কবর খুঁড়ে তার মধ্যে শুয়ে রেখে দেয় আবার খোকনকে প্রথমে শরীরে লোহার পেরেক ঢুকে দিয়ে রাস্তায় ধারে গাছের সাথে বেঁধে রেখে জনসাধারণকে বলতে থাকে যারা পাকিস্তানের বিরোধিতা করবে তাদের কপালে এই রকম হবে। পরে খোকনের দ্বারা তার নিজের খোঁড়া কবর খুড়িয়ে মাথায় গুলি করে খোকনকে উক্ত কবরে ফেলে দেয়। শহীদ খোকন ১৯৫৪ সালের ১৫ ই জুন জন্মগ্রহণ করে এবং ১৯৭১ এর ১৪ই জুনে শহীদ হন। আজ যেখানে শহীদ খোকন পার্ক স্থাপিত সেদিন এই জায়গায় এই রকম ছিল না। বিশাল পুকুর ছিল। পরে পুকুর ভরাট করে ওই সময়কার পৌর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন মন্ডল এই পার্ক নির্মাণ করে নাম রেখেছেন শহীদ খোকন পার্ক। এমনকি পৌর কর্তৃপক্ষ এই শহীদের নামে শহরে বগুড়া একটি রাস্তার নাম করণ করেছেন। এই বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার জন্ম ও মৃত্যুর মাসে তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
লেখক ঃ  সাবেক স্পেশাল পিপি
বগুড়া  জজকোর্ট
০১৭১১-৪২৫৯৮১