বই উৎসবে মেতেছে শিশু-কিশোররা

 বই উৎসবে মেতেছে শিশু-কিশোররা

আব্দুল হাই রঞ্জু : মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। সেই শিক্ষা অর্জনের সুযোগ সবার ভাগ্যে সমভাবে জোটে না। যদিও সরকার শিক্ষা প্রসারে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে পাঠ্য বই সরবরাহ, শিক্ষা ভাতা প্রদান, স্কুল ফিডিংয়ের মতো কর্মসূচি চালু রেখেছে, তবুও শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের হার দিনে দিনে আরো প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে হারে বিদ্যাপিঠ গড়ে উঠছে না। ফলে প্রাথমিক স্তর থেকে আসন সংখ্যার অনুপাতে প্রতিটি আসনের বিপরীতে প্রায় ৭ থেকে ১২ জন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। আর প্রথম শ্রেণিতে লটারীতেই শিক্ষার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ হয়। সূত্র মতে, রাজধানীর ৪১টি সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে ২৪টিতেই প্রথম শ্রেণি নেই। মাত্র ১৭টি প্রাথমিকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ রয়েছে। আর প্রাথমিক শ্রেণিতে ১ হাজার ৯৬০টি আসনে ভর্তির জন্য আবেদন পড়েছিল ২২ হাজার ১৭৯ জন ক্ষুদে শিক্ষার্থীর। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে একটি আসনের বিপরীতে ৬ বছর বয়সী ১২ জন ক্ষুদে শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এই হিসাবে প্রতি আসনে বাদ পড়েছে ১১ জন করে। বাদ পড়া এসব ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মনে প্রথমেই হোচট খাওয়া। কোমলমতি ক্ষুদে শিশুরাই আমাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। লটারীতে সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীর চেয়ে তুলনামুলক ভাল শিক্ষার্থীও বাদ পড়ে।

 পক্ষান্তরে লটারীর সুযোগে কম মেধাবীদের কেউ কেউ ভর্তির সুযোগও পাচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোমলমতি ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের কেন লটারীর মাধ্যমে ভর্তি হতে হবে? কেন প্রতি ১২ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১ জন ভর্তির সুযোগ পাবে? এর সোজাসাপটা উত্তর ভর্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের তুলনায় কাংখিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়নি। অর্থাৎ প্রতিবছর যে হারে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, সে হারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হচ্ছে না, আসন সংখ্যাও বাড়ছে না। অথচ মানুষের স্বপ্ন ছিল, দেশ স্বাধীন হবে, শিক্ষা হবে সার্বজনিন। সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে কোন বৈষম্য থাকবে না। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর আগে। আর তিন বছর পর জাতি স্বাধীনতা অর্জনের সূবর্ণ জয়ন্তি উদযাপন করবে। হয়তো কত বক্তাই স্বাধীনতার স্বাদ ঘরে পৌঁছে দেয়ার দাবি করবে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর মানুষের মৌলিক অধিকার শিক্ষাক্ষেত্রে যে বৈষম্য বেড়েছে, দৈন্যতা বেড়েছে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে, তা হয়তো সেভাবে উচ্চারিত হবে না। আর যদি প্রগতিশীল কোন রাজনীতিক কিম্বা বুদ্ধিজীবী সে অভিযোগ উত্থাপন করে, তা সেভাবে প্রচারও পাবে না। আর আমার মত অখ্যাত লেখকরা যদি সত্য কথাটি তুলে ধরে, তা খ্যাতনামা লেখকদের মতো অতো গুরুত্বও পাবে না, অপ্রিয় হলেও এটাই বাস্তবতা। আমি মনে করি, শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বৈষম্য, আর বাণিজ্যিকীকরণ রোধে ক্ষমতাসীনদেরকে স্বাধীনতার চেতনা সবার জন্য শিক্ষার সফল বাস্তবায়নে সকল স্তরেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকারিকরণ করা উচিৎ। তাহলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ অনেকাংশেই নিশ্চিত হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে গ্রাম থেকে শুরু করে নগর-মহানগরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একই নজরে দেখতে হবে। এটাও সত্য, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হলেই শিক্ষাদানের গুণগত মান সমান হবে, তা বলাও ঠিক হবে না। তবে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে বৈষম্য এখন বিদ্যমান, তা পর্যায়ক্রমে হয়ত বন্ধ করা অনেকাংশেই সম্ভব হবে।

যেমন গোটা দেশেই প্রতিনিয়তই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করে অনেকেই চুঁটিয়ে ব্যবসা করছেন। আর গলাকাটা যাচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষের। একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে একজন শিক্ষার্থীর ভর্তিতে কি পরিমাণ অর্থ জোগাতে হয়, কার অজানা আছে সে কাহিনী? শিক্ষা ক্ষেত্রে এ ধরনের বাণিজ্য রোধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে আর যাই হোক, এটা নিশ্চিত-স্বাধীনতার চেতনার বাস্তবায়ন হবে না। শুধুমাত্র শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার কারণেই গুটিকতক মানুষ এখন বহুজাতিক কোম্পানির মতোই দেশের গোটা অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। যারা এখন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করে বিত্তবৈভবে সমৃদ্ধ হয়ে সে অর্থ নানা ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। আর শ্রেণি স্বার্থ রক্ষায় এসব ব্যবসায়ীদেরকে মদদ দিচ্ছে। এভাবেই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। শুধু মেডিক্যাল কলেজই নয়, শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরেই একই ধারা এখন বিরাজমান। যা প্রাথমিক স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। যেমন: বেসরকারি প্রাথমিক স্তরে ক্যাডেট, শিশু নিকেতন কিম্বা নানা নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু আছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনার খরচও তুলনামূলক বেশি। এরপরও প্রতিটি বাবা মা-ই সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল জীবনের চিন্তা করে বাড়তি খরচে লেখাপড়া করান। অথচ সরকার শিক্ষার প্রসারে প্রতিবছরই বিনামুল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ করে  আসছে। গত বছরের শেষ মাস ছিল ডিসেম্বর। ছিল ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে  নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের বাড়তি কাজের চাপ থাকাই স্বাভাবিক ছিল। এরই মাঝেও নির্বাচনের একদিন পর শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হলো নতুন বই। ১ জানয়ারি ’১৯ রোজ মঙ্গলবার। সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বই উৎসবের উদ্বোধন করেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বই উৎসবে মেতে ওঠে শিশু শিক্ষার্থীরা। নতুন বছর শুরুর প্রথম দিনেই কোমলমতি শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠকে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এ ছাড়াও শিক্ষাবিদ, কথা সাহিতিক, ক্রিকেটার সহ অনেকেই আমন্ত্রিত ছিলেন।

 জাঁকজমকপূর্ণ এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ৪ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর হাতে ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২ কপি বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেয়া হয়। সূত্রমতে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল। এই ১০ বছরে ২৯৬ কোটি ৭ লাখ ৮৯ হাজার ১৭২টি বই বিনামূল্যে বিতরণ করেছে সরকার। বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সাধুবাদ পাওয়ারই যোগ্য। এরপরও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আশানুরূপভাবে কমছে না। অনেক শিশু শিক্ষার্থীই ৫ম শ্রেণির দরজা অতিক্রম করলেও মাধ্যমিক স্তরে যেতে পারে না। আবার কেউ কেউ মাধ্যমিক স্তরে পড়াশুনা শুরু করলেও অষ্টম শ্রেণির পর আর টিকে থাকতে পারে না। আর মাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই উচ্চ মাধ্যমিকে যেতে পারে না। মুলত এর মুলেই দরিদ্রতা একটি অন্যতম কারণ। সংসারের বোঝা টানতেই শিশু কিশোররা শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। দেখা যায় গোটা দেশেই হোটেল রেস্তোরা, বাস, টেম্বু, লেগুনার হেলপার হিসেবে শিশুরা কাজ করছে। এমনকি কলে-কারখানায় শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে দেখা যায়। দেশের আইন অনুযায়ী শিশু শ্রম নিষিদ্ধ থাকলেও প্রয়োজন সকল আইনকে উপেক্ষা করে কাজে যেতে বাধ্য করে। আর মালিক পক্ষ তুলনামুলক স্বল্প ব্যয়ে শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করে। এ নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির হাজার কথা প্রতিদিনই উচ্চারিত হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। উল্টো শিশু শ্রমের হার কমার বদলে শুধুই বাড়ছে।

তবুও শিক্ষার হার বাড়াতে সরকার বিনামুল্যে পাঠ্যবই বিতরণসহ নানা ভাবে উদ্যোগ নিচ্ছে। এর সুফল যে শিশুরা পাচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। এখন গরিব পরিবারগুলোর মধ্যেও পড়াশুনা করার গুরুত্ব বেড়েছে। প্রতিটি বাবা মায়েই সন্তানদের স্কুলে যেতে উৎসাহিত করে ঠিকই, কিন্তু এক পর্যায়ে গিয়ে আর পড়াশুনা করাতে পারে না। যদিও সরকার দাবী করে, দেশের বিভিন্ন খাতে নানা উন্নয়ন হয়েছে। মানুষের সক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু এও সত্য, পাশাপাশী শ্রেণি বৈষম্যও বেড়েছে। যে পরিমাণ মানুষের সক্ষমতা বেড়েছে, তুলনামুলক তার চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। আর অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ার অর্থই হচ্ছে গরীব মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যদি গরিব মানুষের সংখ্যা কমানো না যায়, তাহলে আপেক্ষিক অর্থে হয়ত দেশের সমৃদ্ধির দাবী করা যাবে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষের জীবন মানের উন্নতি বাড়বে না। আর মানুষের জীবন মানের উন্নতি না বাড়লে অর্থনৈতিক বৈষম্যকেও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে দেশকে সমৃদ্ধ করতে হলে মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কমিয়ে আনতে হবে। তা না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন করা কঠিন হবে। শিক্ষার প্রসার ঘটাতে যেমন বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের উৎসব করা হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কমিয়ে এনে প্রতিটি পরিবারের আয় রোজগার বৃদ্ধির দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮