ফের মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারে সংকট

 ফের মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারে সংকট

আব্দুল হাই রঞ্জু : দেশের সমৃদ্ধির জন্য প্রবাসী আয় একটি সম্ভাবনাময় খাত। পোশাক খাতের পরের স্থানটি ধরে রেখেছে প্রবাসী আয়। প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রবাস থেকে দেশে প্রবেশ করে। বর্তমানে প্রবাসে কর্মরত রয়েছে ১ কোটি ১৮ লাখ ১১ হাজার ৯৭০ জন বাংলাদেশি। প্রতিবছরই দেশে নতুন করে প্রায় ২০ লাখ  কর্মক্ষম শ্রমশক্তি যুক্ত হচ্ছে। যে হারে শ্রমশক্তি যুক্ত হচ্ছে, সে হারে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বেকারের হার প্রতিনিয়তই বাড়ছে। সরকারি কিম্বা বেসরকারি যে খাতেই হোক এ দেশের বেকাররা কাজ করে বাঁচতে চায়। কিন্তু সে আকাংক্ষা দেশীয়ভাবে পূরণ না হওয়ায় পরিবার ও দেশের মায়া ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি দিতে মরিয়া হয়ে উঠছে যুব সমাজ। বিদেশে বাংলাদেশি প্রতি চারজনের তিনজন কাজ করছেন মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও মালয়েশিয়ায়। মালয়েশিয়ায় প্রচুর পরিমাণ বাংলাদেশি কর্মি কাজ করছেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সালে দু’দেশের সরকারি পর্যায়ে অর্থাৎ জিটুজি পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিতে শুরু করে মালয়েশিয়া। মূলত ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে জিটুজি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় লোক নেয়া শুরু হলেও শুধু প্লান্টেশন প্রজেক্টে কাজ করতে আগ্রহ কম থাকায় জনশক্তি রফতানির হার ছিল কম। পরে মালয়েশিয়া জনশক্তির জন্য বাংলাদেশকে তাদের ‘সোর্স কান্ট্রির’ তালিকাভুক্ত করে। ফলে সেবা, উৎপাদন, নির্মাণসহ অন্যান্য খাতেও বাংলাদেশী কর্মি নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি রফতানির সাথে যুক্ত কিন্তু সুযোগ সন্ধানী এজেন্সি মালয়েশিয়ার উচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে বাড়তি অর্থ আদায় করে কর্মি পাঠানো শুরু করে। মালয়েশিয়ার স্টার অনলাইনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশের ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেট মালয়েশিয়া সরকারের উপর মহলের যোগসাজশে বাংলাদেশে এজেন্ট অনুমোদন দিয়ে একচেটিয়া কারবার শুরু করে। উক্ত প্রতিবেদনে মালয়েশিয়া মন্ত্রী এম কালুসেগারানকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, একটি সিন্ডিকেট মানব পাচারের মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রতারিত করেছে। আগের প্রশাসন জনশক্তি প্রক্রিয়াটিকে একটি ব্যবসায়ী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে কয়েকজন ব্যক্তিকে সুবিধা দিয়েছে। এ কারণে শ্রমিকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যস্বত্বভোগীরা ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে (সূত্র: দৈনিক আজকালের খবর তাং ২৪ জুন ২০১৮)। এসব অনিয়মের জন্য ড. মাহাথির মোহাম্মদের নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে কর্মি নেয়া স্থগিত করেছে। এসব অনিয়ম, দুর্নীতি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কর্মি নেয়া বন্ধ থাকবে মর্মে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, মন্ত্রী এম কালুসেগারান জানান যে, সিন্ডিকেট তাদের দেশের প্রচলিত “জিটুজি প্লাস” পাদ্ধতিতে কর্মি পাঠাত, তা বন্ধ করে মালয়েশিয়া সরকার ‘জিটুজি’ প্রক্রিয়ায় ফিরে যাবে। এতে আবেদন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

মাহাথির মোহাম্মদ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ১৫ বছর পর ফের ক্ষমতায় এসে দুর্নীতিমুক্ত মালয়েশিয়ার সমৃদ্ধিতে যে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তারই জেরে বাংলাদেশ থেকে কর্মি নেয়া স্থগিত করেছে। যদিও মালয়েশিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি এখনও অবহিত করেননি। এ প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের কাউন্সিলর মোঃ সায়েদুল ইসলাম বলেন, আমাদের এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়নি। আমরা মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের সংগে যোগাযোগ রাখছি এবং তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানার পর আমরা দ্বি-পক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ নেব মর্মেও মন্তব্য করেন তিনি। বাস্তবে মালয়েশিয়ার নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, তারা চাইবেন বিগত সরকার কি করেছেন বা তাঁরা এখন কি করবেন তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার বিষয়টি স্বাভাবিকও বটে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্ব মাহাথিব মোহাম্মদের সময় উচ্চতায় ছিল। আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকারের তরফে কুটনৈতিক তৎপরতা সফলভাবে পরিচালিত হলে মালয়েশিয়ায় স্থাগিতাদেশ প্রত্যাহার হবে। গত ২০১২-১৩ অর্থ বছরে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘জিটুজি’ পদ্ধতিতে কর্মি প্রেরণের জন্য যে চুক্তি করেছিল, তা ২০১৬ সালে এসে পরিমার্জন করে পুনরায় ‘জিটুজি প্লাস’ প্রক্রিয়ায় কমি পাঠানোর ক্ষেত্রে ১০টি বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির বিতর্কিত কর্মকান্ডই মালয়েশিয়ার কর্মি প্রেরণের ক্ষেত্রে নতুন করে সংকটের সৃষ্টি করেছে।

মুলত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ‘জিটুজি প্লাস’ প্রক্রিয়ায় ভাগ্য ফেরাতে কাজ নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানো বাংলাদেশি কমিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা কলাগাছের মতই ফুলে ফেঁপে ধনী হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের হোতাদের যেখানে ২ হাজার রিংগিত খরচ বাবদ নেয়ার কথা, সেখানে তারা নিয়েছে ২০/২৫ হাজার রিংগিত পর্যন্ত। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ অর্থ অন্যায্যভাবে আদায় করা হয়েছে। জনৈক ব্যবসায়ী বিয়ে করে মালয়েশিয়ায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অবস্থান করছেন। যার ছত্রছায়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মি প্রেরণের অনুমতি পাওয়া ১০ কোম্পানির স্বার্থরক্ষার জন্য ‘সিমটেম পেরখিদমাতান পেকেরজা অ্যাসিং (এসপিপিএ) নামে একটি অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থাও গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ থেকে কর্মি নেয়ার সময় চাকরিদাতাদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ হিসেবে মাথাপিছু ৩০৫ রিংগিত করে নেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে শুধু এসপিপিএ নয়, এর পাশাপাশি জেআর জয়েন্ট,  বেসনিনেট ও সিনের ফ্লাক্স নামে ৩টি কোম্পানীর মালিক বাংলাদেশি কর্মি প্রেরণের কাজে নিয়োজিত ছিল। সূত্র মতে, এসব কোম্পানিকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন, মালয়েশিয়ার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী জাহিদ হামিদি ও সাবেক শ্রমমন্ত্রী আজমিন খালিদ (সুত্র: দৈনিক মানবকন্ঠ ২৪/০৬/১৮ ইং)।

প্রকৃত অর্থে মালয়েশিয়ার স্বপ্ন দ্রষ্টা, উন্নয়নের স্থপতি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় না আসলে হয়তো মালয়েশিয়ায় কর্মি পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি মদদপুষ্ট আদম ব্যবসায়ীদের রাহুগ্রাস বন্ধ হতো না। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক সরকারের সময় বাংলাদেশ সরকারের তরফে সকল এজেন্সিকে লোক প্রেরণের ক্ষেত্রে সুযোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলেও কোন প্রকার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো ১০ কোম্পানির সুযোগ সুবিধাকে বেশি করে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ফলে ৪০ হাজার টাকার স্থলে ৩/৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে। বর্তমান মাহাথির মোহাম্মদের সরকার মালয়েশিয়ার উন্নয়নে কাজ করবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশিদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এখনও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মিদের প্রচুর কদর রয়েছে। কারণ আমাদের দেশের কর্মিরা কর্মঠ এবং আন্তরিক। যাদের প্রেরিত অর্থে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। যারা কাজের আশায় অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়েছেন। অনেককেই সাগরে ডুবে মরতে হয়েছে। ভাগ্যক্রমে কেউ কেউ কিনারের দেখা পেলেও বনে জঙ্গলে মাসের পর মাস পালিয়ে থেকে কাজ খুঁজতে হয়েছে। অনেককেই নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কাউকে কাউকে দালাল চক্র আটকে রেখে মুক্তিপণ পর্যন্ত আদায় করেছে। টাকা দিতে না পারার অপরাধে হাত পা পর্যন্ত কেটে নেয়া হয়েছে। সে এক অমানবিক বিভৎসতা, যা কল্পনা করাও যায় না। অভিশপ্ত এ জীবন কাহিনী অনেকের ভাগ্যে জুটেছে। আমরা আশা করি, মানব সম্পদকে কাজে লাগাতে মালয়েশিয়ার বর্তমান সরকার আন্তরিক হবেন। শত অনিয়ম, নির্যাতন বন্ধে কার্যকরি ব্যবস্থা নিবেন। অবশ্য ইতিমধ্যেই আমাদের দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন মানবপাচারে জড়িতদের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে। আমরা আশাবাদি, দুর্নীতি দমন কমিশনের এ উদ্যোগ যেন কোনভাবেই ভেস্তে না যায়। ভয় হয়, কারণ আমাদের দেশের দুর্নীতিবাজদের শিকড় অনেক গভীরে। তারা পরম ক্ষমতাশালী। যারা পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়েন। সবসময় থেকে যান ধরা ছোঁয়ার অনেক বাইরে। আবার কোন কোন সময় নিরপরাধী কিম্বা চুনোপুটিরা ধরা পড়ে যায়। কার্যত কাজের কাজ কিছুই হয় না। আর বড় কোন নতুন ঘটনার নিচে চাপা পড়ায় তদন্ত কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। এসব ঘটনা হর হামেশাই ঘটছে। যা নতুন কিছুই নয়। অধিক জনসংখ্যাই আমাদের মানবসম্পদ। এই মানব সম্পদকে দেশে বিদেশে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। এ জন্য সরকার মালয়েশিয়ার সরকারের সাথে কুটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে কর্মি প্রেরণে মালয়েশিয়ার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন- এটাই কর্মমুখী মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮