দেশের গন্ডি পেরিয়ে রফতানি হচ্ছে বিদেশে

পাবনায় ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড়ে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

 পাবনায় ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড়ে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

পাবনা প্রতিনিধি : পাবনা সদর উপজেলার বাংলাবাজার গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মমিন। মাত্র কয়েক বছর আগে ঢাকার গাজীপুরে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। অথচ সেই মমিনের কারখানা থেকেই এখন পোশাক রফতানি হচ্ছে ভারতসহ পাশর্^বর্তী কয়েকটি দেশে। মাত্র দশ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু করা তার কারখানার বর্তমান আর্থিক মূল্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।পাবনার সদর উপজেলার আশপাশে বিভিন্ন গ্রামে মমিনের মত এমন অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা গড়ে তুলেছেন কয়েক শতাধিক তৈরি পোশাকের কারখানা। গত দশ বছরে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষের। প্রতি বছর এসব কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি পিস তৈরি পোশাক যার অধিকাংশই টি-শার্ট। যার বাজার মূল্য প্রায় ১২শ’ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিক্রি হচ্ছে বিদেশেও। সম্ভাবনা জাগানিয়া এই ক্ষুদ্র শিল্পে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হল, এসব পণ্যের প্রধান কাঁচামাল ঢাকা ও চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ফেলে দেয়া, উচ্ছিষ্ট কাপড়। স্থানীয়ভাবে যা ঝুট কাপড় হিসেবে পরিচিত। ছাই উড়িয়ে অমূল্য রতন আনার মত উচ্ছিষ্ট থেকেই পাবনার  হোসিয়ারী শ্রমিক ব্যবসায়ীরা তৈরি করেছেন হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল বাজার। সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯৫ সালের দিকে পাবনায় ঝুট ব্যবসার প্রচলন ঘটে। সে সময় সীমিত আকারে হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ঝুট শিল্পের তৈরি পোশাকের ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানা থেকে নমুনা কাটিংয়ের কাপড়, পরিত্যক্ত কাপড় কম দামে সংগ্রহ করে তা দিয়ে গেঞ্জি তৈরির ব্যবসা শুরু করেন তারা।     

প্রাথমিক পর্যায়ে এসব গেঞ্জি জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে ফেরি করে বিক্রি করা হত। ধীরে ধীরে পাবনার গন্ডি পেরিয়ে ঝুট পণ্যের পার্শ্ববর্তী জেলা ও দেশের বাইরেও বাজার তৈরি হয়। পাবনা হোসিয়ারী ম্যানুফাকচারার্স গ্রুপের সভাপতি বারিক হোসেন জনি বলেন, প্রথমদিকে আমরা ঝুট কাপড়ের তৈরি টি-শার্টগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে শুরু করি। ধীরে ধীরে ব্যবসায়ের পরিধি বাড়ে। ভারত, মালয়েশিয়া, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে এখন আমাদের পণ্য রফতানি হচ্ছে। স্বল্প মূল্য ও গুণগত মান ভাল হওয়ায়, চাহিদা বাড়ছে। প্রতি বছর বাজারও বড় হচ্ছে। বারিক হোসেন আরো জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট বড় এক হাজারের বেশি ঝুট কাপড়ের পোশাক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার পণ্য রফতানি বার্ষিক পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। ব্যবসায়ী রাশেদুজ্জামান রাসেল জানান, গত দুইযুগ ধরে তিনি স্থানীয় বাজারে পোশাক বিক্রি করে আসছেন। সম্প্রতি তিনি মালয়েশিয়ায় পোশাক রফতানির অর্ডার পেয়েছেন। বাড়ি ভাড়া করে, আরো বেশি শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে কারখানাও বড় করেছেন। কেবল ব্যবসায়ীই নয়, এসব কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় নারী ও বেকার যুবকদের। তারা দৈনিক পাঁচশ থেকে ছয়শ’ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন এসব কারখানায়।

জেলা শহরের নয়নামতি এলাকার একটি পোশাক কারখানায় সেলাই অপারেটর পদে কাজ করেন হালিমা খাতুন। তিনি জানান, দুই বছর আগেও তিনি গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। সেখানে মাসে দশ থেকে বার হাজার টাকা আয় করলেও জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল অনেক বেশি। এখন নিজ বাড়িতে থেকেই তিনি প্রায় সমপরিমাণ আয় করছেন। ফলে মাস শেষে ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয়ও হচ্ছে। তবে সম্ভাবনার এ শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন নানা সংকটের কথাও। ঢাকা ও গাজীপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সিন্ডিকেট করে ঝুট কাপড়ের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের স্বেচ্ছাচারী আচরণে কাঁচামাল পেতে দেরী ও বেশি দামে কিনতে হয়। এছাড়া পুঁজি সংকটের কারণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এসব সংকট নিরসনে সরকারি সহযোগিতা চান তারা। এ বিষয়ে পাবনা চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি আলী মর্তুজা বিশ^াস বলেন, ঝুট ব্যবসায়ীদের কাঁচামাল ক্রয়ে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে আমরা বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দকে জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুত এ সংকট কেটে যাবে। পাবনার বিদায়ী জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় সরকার এসএমই লোনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে আবেদন করলে অবশ্যই ক্ষুদ্র তৈরি পোশাক শিল্পে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হবে।