পানিতে আর্সেনিক : হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

 পানিতে আর্সেনিক : হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

আব্দুল হাই রঞ্জু: পানি ব্যতিত মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। এ জন্যই পানির অপর নাম জীবন। সেই জীবন রক্ষাকারী পানি যদি হয় দূষিত, তাহলে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। প্রতি বছরই পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়। অথচ পানির দেশ বাংলাদেশ। যে দেশে এখন বিশুদ্ধ পানির বড়ই সংকট। ফালগুন চৈত্র মাস এলেই শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার। নগরমহানগর সহ খোদ রাজধানীতে খাবার পানির জন্য বিক্ষোভ পর্যন্ত করতে হয়। এরপরও সুপেয় পানির সংকট দূর হয় না।
 
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে খরা, অনাবৃষ্টি কিম্বা অতিবৃষ্টি এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্য সঙ্গী। খাল, বিল, নদী-নালা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অধিক জনসংখ্যার বাংলাদেশে মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহারও বেড়েই চলছে। প্রতিনিয়তই ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলসহ ১৬টি জেলায় কম বেশি ভূ-গর্ভস্থ পানি কমতে কমতে অনেক নিচে নেমে গেছে। মূলত দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে এখন উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় সেচভিত্তিক চাষাবাদই একমাত্র অবলম্বন। ডিজেল চালিত, বিদ্যুৎ চালিত, মটর কিম্বা স্যালো ইঞ্জিনের সহায়তায় ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে ধান, সবজি চাষাবাদের কারণে পানির স্তর প্রতিবছরই ২/৩ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে ভূ-গর্ভস্থ পানির আঁধার কমে আসবে। ফলে সেচভিত্তিক চাষাবাদও হুমকির মুখে পড়বে। সংগত কারণেই ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। যেমন: বৃষ্টির পানি কিম্বা বন্যার সময় নদ-নদীর বাড়তি পানি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন নদ-নদী-নালা, খাল, বিলের পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদের জন্য সেচ দেয়া সম্ভব হয়। এমনকি খাল-বিল, নদী, নালা খনন করে বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করতে নদ-নদীর পানি পরিশোধন করারও ব্যবস্থা নিতে হবে অর্থাৎ পানি অফুরন্ত, অমুলক এ ধারনা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে এবং পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে হবে। স্মরণে রাখতে হবে, পানি অফুরন্ত নয়, এরও সীমাবদ্ধতা আছে অর্থাৎ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
 
মূলত ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ার কারণে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের পাবনার ঈশ্বরদীসহ অনেক জায়গায় ভূ-গর্ভস্থ পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যাচ্ছে। পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের কারণে ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর গ্রামে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় এক দৈনিকে ‘ঈশ্বরদীতে আর্সেনিক ভয়াবহতা’ শীর্ষক প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ঈশ্বরদী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য নিউ এরা ফাউন্ডেশন ঈশ্বরদীর পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর, নলগড়ি, চররূপপুর, নদীপাড়া, বিবিসি বাজারপাড়া, খানপাড়া, সরদারপাড়া সহ বিভিন্ন গ্রামে আর্সেনিকের ব্যাপকতা দেখা পেয়েছে। ফলে এসব এলাকায় রোগির সংখ্যাও বাড়ছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ পর্যন্ত করছেন।

যদিও আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করার কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়লেও মৃত্যুবরণ করার কথা নয়। কিন্তু সচেতনতার অভাবে দীর্ঘদিন আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করায় দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তের কারণে অনেকের অকাল মৃত্যু ঘটেছে। যদিও সরকারিভাবে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ আয়োজন আছে সত্য, কিন্তু এখনও দেশের উল্লেখযোগ্য মানুষ আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করছেন। গত ১১ জুন জাতীয় এক দৈনিকে নীরব ঘাতক আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মেহেরপুরের শত শত নারী-পুরুষ, শিশু আক্রান্ত হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতিনিয়তই ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃৃদ্ধি পাওয়ায় আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আর্সেনিক দূষণের কারণটি ভূ-তাত্ত্বিক। এ ব্যাপারে দুটি মতের কথা উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা। একটি হচ্ছে অতিমাত্রায় ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ভূ-অভ্যন্তরে অক্সিজেন প্রবেশের ফলে পানিবাহী শিলাস্তরে আর্সেনিক জড়ো হয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানিতে যুক্ত হচ্ছে। অন্য মতটি হচ্ছে, গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের ভূ-প্রাকৃতিক বিশিষ্ট আর্সেনিক দূষণের জন্য অনেকাংশই দায়ী।

এক সময় বিশুদ্ধ পানির উৎস হিসেবে গভীর নলকুপের ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়েছিল। এরপর গোটা দেশেই লাখ লাখ নলকূপ স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব অবস্থার কারণে এখন সে উদ্যোগেও ভাটা পড়েছে। এখন গভীর নলকুপ কেন, সাধারণ একটি টিউবওয়েল স্থাপন করতে হলে বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রায় ২/৩ শত ফুট পর্যন্ত গভীরে পাইপ স্থাপন করতে হয়। তা না হলে পানির দেখা মেলা খুবই ভার। শুধু বরেন্দ্র অঞ্চলেই নয়, এর আশে পাশের জেলাগুলোতে এখন সেচ পাম্প চালানোর জন্য মাটি ১০/১২ ফুট পর্যন্ত গভীর করে সেখানে শ্যালো ইঞ্জিন কিম্বা বিদ্যুৎ চালিত পাম্প বসিয়ে চাষাবাদে সেচ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর জেলার পানির স্তর হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অঞ্চলের পানির স্তর থেকে সাগরের পানির স্তর প্রায় এক দেড়শ ফুট নিচে হওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানি দ্রুত প্রবাহিত হওয়ার কারণেই ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দূর ভবিষ্যতে সাগরের লোনা পানি এসব অঞ্চলে ঢুকে পড়বে। এমন ঘটনা ঘটলে উত্তরাঞ্চলে সুপেয় মিঠা পানির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। এ কারণেই ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য পানি নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। যেন সরকারি অনুমোদন ব্যতিত নতুন গভীর, অগভীর নলকুপ কেউ স্থাপন করতে না পারে। এজন্য সবচেয়ে যেটা বেশি প্রয়োজন, তাহলো সেচভিত্তিক উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান উৎপাদনে স্বল্প পানিতে চাষাবাদযোগ্য ধানের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। অর্থাৎ সেচ-ভিত্তিক চাষাবাদে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। তানা হলে এমন একদিন আসবে, যখন সেচ কেন খেয়ে বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক সুপেয় পানির সংকট দেখা দিতে পারে।

আগেই বলেছি মাত্রাতিরিক্তভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের সুযোগে অক্সিজেন ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করায় আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, যে কোন মূল্যেই হোক ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। আর্সেনিকের এ সমস্যা এখন শুধু উত্তরাঞ্চলেই নয়, এ সমস্যা দিনে দিনে গোটা দেশকে আক্রান্ত করছে। আর আর্সেনিকের কারণে অনেকটা অজ্ঞতার কারণেই সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করায় মানুষ যেমন নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তেমনি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে। এও সত্য, আর্সেনিকের প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়। মূলত সচেতনতার অভাবেই দারিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের প্রবণতা বেশি। আর যাদের সঠিকভাবে চিকিৎসা নেয়ার সক্ষমতাও কম। ফলে দারিদ্র জনগোষ্ঠী আর্সেনিকের বিরূপ প্রভাবে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। এ কারণে সরকারিভাবে ব্যয় বরাদ্দের ব্যবস্থা করে আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকার সকল নলকুপে আর্সেনিক নিরোধক ফিল্টার সরবরাহের ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে নিতে হবে। এমনকি পানিতে কি পরিমাণ আর্সেনিক আছে, তা পরীক্ষা করার কীটও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।

মোদ্দাকথা, আর্সেনিকযুক্ত পানি পান থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হলে পরিকল্পিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কাজ শুরু করতে দেরি হলে আর্সেনিকের বিরূপ প্রভাব মহামারিতে রূপ নিতে পারে। মূলত জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি টিউবওয়েলে আর্সেনিক নিরোধক ফিল্টার সরকারি ভাবে সরবরাহের পাশাপাশি পানিতে কি পরিমাণ আর্সেনিকের মাত্রা বিদ্যমান তা পরীক্ষার জন্য কীটের সহজলভ্যতাকে নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে নিকট ভবিষ্যতে উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশেই আর্সেনিকের ভয়াবহতা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবেই দেখা দিবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।
লেখক : প্রাবন্ধিক
ahairanju@gmail.com
০১৯২২-৬৯৮৮২৮