দুর্নীতি বিরোধী অভিযান ইতিবাচক

 দুর্নীতি বিরোধী অভিযান ইতিবাচক

রায়হান আহমেদ তপাদার : আমাদের সমাজে দুর্নীতি যেন নীতি হয়ে গেছে। একসময় সরকারি কার্যালয়ে কর্মকর্তারা লুকিয়ে দুর্নীতি করতেন। কিছু লজ্জা-শরমের ব্যাপার ছিল। কিন্তু এখন আর এসবের বালাই নেই। সবাই যেন দল বেঁধে দুর্নীতি করেন। বৈধ বা অবৈধ যে কাজেই মানুষ যাক না কেন, খরচ দিতেই হবে। এমনকি পরিবার ও সমাজও দুর্নীতিবাজ মানুষকে খারাপ চোখে দেখে না। দুর্নীতিবাজ আত্মীয়ের দানখয়রাত বা আতিথেয়তা নিতেও সিংহভাগ মানুষের বাধোবাধো ঠেকে না। অন্যদিকে যে সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতি করেন না, তাঁরা সমাজে অপাঙ্?ক্তেয়। কারণ, তাঁরা আত্মীয়-পরিজনদের জন্য অত খরচ করতে পারেন না, যা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পারেন। চীনে যে ধাঁচের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, মার্কিন প্রবাসী চীনা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মিন ঝিন পির মতে, তা হলো ক্রোনি ক্যাপিটালিজম। বাংলা করলে এর অর্থ দাঁড়ায় স্বজনতোষী পুঁজিবাদ। এই ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, এখানে রাষ্ট্রের কর্মচারি-দালাল-রাজনৈতিক নেতারা সব মিলেমিশে দুর্নীতি করেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই দুর্নীতি হয়ে থাকে। সবাই যার কমবেশি ভাগ পেয়ে থাকেন। ব্যাপারটা হলো, আগে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঘুষ খাওয়ার যুগে অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ছাড়াও সরকারি কার্যালয়ে কাজ করানো যেত। কিন্তু এখন সেটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন এই সিন্ডিকেটের দ্বারস্থ না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে কাজ করানো সম্ভব নয়। আগে যার কিছু সম্ভাবনা ছিল, এখন তাও নেই। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সূচিত অভিযান সফল হলে জনগণের আস্থা অর্জনে সরকার অতীতের চাইতে অনেক বেশি সফল হতে পারে।
সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সূচিত অভিযান নিজের দল, অঙ্গ সংগঠন এবং প্রশাসনসহ সর্বত্র এগিয়ে নিতে সক্ষম হলে দেশের উন্নয়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত হওয়ার পাটাতন তৈরি হওয়া অনেকটাই বাস্তব বলে মনে হবে। সে কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই অভিযান যত বেশি সফল হবে তত বেশি মানুষ আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের রূপান্তর লক্ষ করতে পারবে। সেটি ঘটলে বাংলাদেশ যে লক্ষ্যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন মুক্তিযোদ্ধারা দেখেছিলেন, জাতির জনক দেখিয়েছেন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সেটি বাস্তবে রূপ নেয়া সম্ভব হতে পারে। মানুষ সেই বাংলাদেশ দেখতে চায়। এতদিন উন্নয়নের ধারায় বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলতে শুরু করেছে এখন সুশাসনের জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে সূচিত অভিযান সেই উন্নয়নকে শুধু ত্বরান্বিতই করবে না মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সমৃদ্ধি ইত্যাদিও ঘটাতে সক্ষম হবে। সেটিই মানুষের প্রত্যাশা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের এই অভিযান যত বেশি সফল হবে তত বেশি মানুষ আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের রূপান্তর লক্ষ করতে পারবে। মানুষ সেই বাংলাদেশ দেখতে চায়।

গত নির্বাচনের প্রাক্কালে ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা উল্লেখ আছে। এই মেয়াদে ক্ষমতায় এসে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন। সেটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ আরো বেশকিছু জায়গাতে বিস্তৃত হয়েছে। এ ছাড়াও ভোক্তা অধিকার আইনের বাস্তবায়ন ঘটাতে গত ছয় মাস নানা ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছিল। এসব অভিযানে বড় বড় দখলদার, ভূমিদস্যু, নকল কারবারিসহ অবৈধ কর্মকাে র সঙ্গে জড়িত অনেকেই তাদের দখলদারিত্ব, নকল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ভেজাল ইত্যাদি উৎপাদনে অংশীদারিত্ব হারাতে বাধ্য করেছে। এসব অভিযানের কথা আগে অনেকেই ভাবতে পারেনি। কারণ এসবের সঙ্গে জড়িত ছিল প্রভাবশালী, ক্ষমতাধর, আইন ও প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত নানা ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী যাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যে আস্থার সংকট থাকত। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানসমূহ সরকার ভীষণভাবে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এতে ছাড় দেয়া হয়নি প্রভাবশালী বা নিজ দলের ব্যক্তি-গোষ্ঠীকেও। ফলে সরকারের এই অভিযানগুলো ভীষণভাবে জনসমর্থিত হয়ে উঠেছে। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, সরকার যে কোনো অবৈধ ও দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করার মতো শক্তি ও সাহস রাখে। ফলে সরকারের মধ্যেও এক ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অবৈধ কর্মকাে র বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলে সরকার সেটি এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে। জনগণের মধ্যেও সে ধরনের একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের বাস্তবতা অনুধাবন করেই সম্ভবত দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা তার দল এবং অঙ্গ সংগঠনের অভ্যন্তরে যারা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার কাজে অনেকদিন থেকে জড়িত হয়ে আছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তাতে প্রধানমন্ত্রী সাধুুুবাদ পাওয়ার অধিকারী।

সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযানের নামে বড় ধরনের কোনো ধরপাকড় ইত্যাদি পরিচালিত হতে দেখা যায়নি। সে কারণেই দলের ভেতরে অনেকেই দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থবিত্ত কামাই করার কাজে লিপ্ত হয়। আবার অনেকে দলের কাউকে না কাউকে ম্যানেজ করে দলে প্রবেশ করে এই ধরনের অপকর্মে যুক্ত হয়। দলের একশ্রেণির নেতাকর্মির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এরা নানা ধরনের অবৈধ কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে পড়ে। এদের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী দানবরূপে অনেকেই অভিহিত করে থাকে। তাদের ক্ষমতার কাছে এমনকি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে। আবার এসব মানুষের কাছ থেকে নানা ধরনের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দলের ও প্রশাসনের অনেকেই ভোগ করতে থাকেন। ক্রমেই বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এসব দানবরূপী মানবে ভরে উঠতে শুরু করেছে। এদের ভয়ে অনেকেই দূরে থাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব ব্যক্তি মূলত সরকারের নানা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপকভাবে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটিয়ে থাকে। বর্তমান সরকারের নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকা  দেশব্যাপী চলছে। দেশের মানুষ আশা করে এই অভিযানটি যেন একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। প্রকৃত অপরাধীদের যেন ধরা হয় এবং আইনের আওতায় আনা হয়। তাহলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন, আদর্শবাদী নেতাকর্মিদের দ্বারা পরিচালিত হতে পারবে। সেটি ঘটলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি আরো অনেক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ভিত্তি তৈরি হবে।

কেননা সরকার যেসব অভিযান পরিচালনা করছে সেটি কোনো বিরোধীদলীয় নেতা বা কর্মি দেখে নয় বরং নিজের দলের ছত্রছায়ায় থেকে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা সম্পদ ইত্যাদি লুটপাট করেছে তাদের আইনের হাতে তুলে দিচ্ছে। এসব ধৃত অপরাধী কয়েক বছর আগে তাদের দলেই ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে খুব বেশি জনসমর্থন দাঁড় করানো যাবে বলে মনে হয় না। বরং যে বিষয়টি রাজনীতি সচেতন মানুষের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো সরকার এ পর্যন্ত দেশ পরিচালনায় সর্বক্ষেত্রেই কমবেশি সাফল্য অর্জন করেছে। বাকি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাফল্য অর্জনের উদ্যোগ নেয়া। অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি অবশ্য দীর্ঘদিন থেকে তার দলের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি সম্পর্কে সাবধান করে দিচ্ছিলেন। রাজনীতিতে ত্যাগ ও আদর্শের গুরুত্ব জানিয়ে তিনি দলীয় বিভিন্ন সভা, সমাবেশের কথা বলেছেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুসহ যারা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছেন তারাও অনেক ত্যাগ স্বীকার করে রাজনীতি করেছেন, বঙ্গবন্ধু নিজে কীভাবে পরিবারের সুখশান্তি বিসর্জন দিয়ে রাজনীতি করেছেন সেসব উদাহরণ টেনে বক্তৃতা করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ধন, সম্পদ ও আরাম-আয়েশের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করছেন। তার দলের নেতাকর্মীদেরও তিনি বঙ্গবন্ধুসহ আদর্শবান ত্যাগী নেতাদের জীবন ও রাজনীতি থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজ করার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

গণমাধ্যমে তার এসব বক্তব্য প্রায়ই উঠে আসত। অনেকেই তার বক্তব্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করে লেখালেখি করেছেন, একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী দলীয় প্রধানের আদর্শের ঠিক বিপরীতে ব্যক্তিগত ক্ষমতা, অর্থবিত্ত অর্জন ইত্যাদিতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে বলে যেসব অভিযোগ রয়েছে তাতে শেখ হাসিনার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষত পরপর তিনবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার কারণে তৃণমূল থেকে উপরের স্তর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন ধরনের অঙ্গ সংগঠনের অভ্যন্তরে অনেকের উত্থান ঘটেছে যারা এই সময়ে রাজনীতির নামে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যাপকভাবে পরিচিতি কুড়িয়েছে। এর ফলে একদিকে দলীয় প্রধান এবং সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশকে আর্থ-সামাজিক, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে উন্নয়ন ঘটিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন, ঠিক তার বিপরীতে দলের বিভিন্ন স্তরে নেতাকর্মীদের অনেকেই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করে চলছে। কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে-মানুষের জন্য তা অত সমস্যা নয়, যদি সেই সরকার মানুষকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে বা তার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। সেটা করতে গেলে অবশ্যই দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে হবে এবং মানুষকেও মনোভাব বদলাতে হবে। তবে সরকারকেই মূল ভূমিকা নিতে হবে। তাহলে জনসাধারণের সমর্থন পেতে অসুবিধা হবে না।
লেখক ঃ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
ৎধরযধহ৫৬৭@ুধযড়ড়.পড়স