তোড়জোড় সত্ত্বেও হচ্ছে না ছাত্রদলের নতুন কমিটি!

 তোড়জোড় সত্ত্বেও হচ্ছে না ছাত্রদলের নতুন কমিটি!

রাজকুমার নন্দী : গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভবিষ্যৎ আন্দোলন সফলে তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে দ্রুতগতিতে বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ইউনিট কমিটিগুলো গঠনের তৎপরতায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে পুনরায় তোড়জোড় শুরু হয়। কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সাবেক ছাত্রনেতারা এই তোড়জোড় শুরু করেন। তবে কমিটি গঠনের পর পদবঞ্চিতদের সম্ভাব্য বিদ্রোহের আশঙ্কাসহ বাস্তবভিত্তিক কিছু অসুবিধার কারণে শিগগিরই ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনে তেমন আগ্রহী নয় বিএনপির হাইকমান্ড। ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না বলে মনে করছে দলটি।

জানা গেছে, ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ কিংবা কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িতদের কাছেও সুনির্দিষ্ট কোনো ম্যাসেজ নেই। তবে বিএনপির একটি সূত্রের দাবি, ঈদুল আজহার পরে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার আগে সব ইউনিট কমিটি গঠনের পাশাপাশি বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন এবং আংশিক কমিটিগুলোও পূর্ণাঙ্গ করা হবে। এই হিসাবে ইউনিট কমিটি গঠন সম্পন্ন হওয়ার পর ঘোষিত হতে পারে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি। ১১৭টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ইতোমধ্যে ১০১টি ইউনিটের কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। তবে ছাত্রদলের নতুন কমিটি সিনিয়র নাকি জুনিয়র নাকি সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয়ে গঠিত হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে বাস্তব কিছু অসুবিধাও রয়েছে। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রদলের কমিটি গঠনের ক্ষমতা হলো পার্টির চেয়ারপারসনের। কিন্তু মিথ্যা মামলায় তিনি এখন কারাগারে। এমন প্রেক্ষিতে গঠনতন্ত্র মোতাবেক এখন ক্ষমতা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এখন লন্ডনে।

তিনি আরো বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে ছাত্রদলের কার্যক্রম চলছে-এটা আমরা জানি। তবে এতে সাংগঠনিক তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে বলে আমরা মনে করছি না। অবশ্য এটা ঠিক, কমিটি গঠন করতে পারলে সাংগঠনিক শক্তিটা আরো বাড়বে।

রাজীব আহসানকে সভাপতি, মামুনুর রশিদ মামুনকে সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর ছাত্রদলের ১৫৩ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩৬ সদস্যের বিশাল আকৃতির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। খসড়া গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর মেয়াদী ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর শেষ হয়েছে। এর পূর্বাপর থেকে সংগঠনের নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা ও তৎপরতা শুরু হয়। নেতৃত্বপ্রত্যাশী নেতারাও বৈঠক করে দ্রুত নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের দাবিতে বিএনপি মহাসচিবসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের কাছে দাবি জানান। নতুন কমিটির দাবিতে ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সহ-তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক মামুন খান ২০১৬ সালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় অনশন শুরু করলে বিএনপি মহাসচিবের আশ্বাসে তা ভঙ্গ করেন। এতোকিছুর পরও বিএনপির হাইকমান্ড আগ্রহ না দেখানোয় ছাত্রদলের কমিটি হয়নি। এরপর গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার আগে ছাত্রদলের কমিটি গঠনের আলোচনা পুনরায় শুরু হয়। কিন্তু বেগম জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর পরিস্থিতি একদমই পাল্টে যায়। খালেদা জিয়ার মুক্তিই বিএনপির প্রধান ভাবনা হয়ে দাঁড়ায়। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়ার মুক্তি বিলম্বিত হওয়ায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও তার মুক্তির দাবিতে ঈদুল আজহার পরে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।

এমন প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ আন্দোলন সফলে তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দলের চালিকাশক্তি যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের ইউনিট কমিটিগুলো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপির হাইকমান্ড। দ্রুতগতিতে ইউনিট কমিটিগুলো গঠনের তৎপরতায় আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে পুনরায় তোড়জোড় শুরু হয়। তবে অতীতের ধারাবাহিকতায় নতুন কমিটির পর পদবঞ্চিতদের সম্ভাব্য বিদ্রোহের আশঙ্কায় আন্দোলনের আগে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনে তেমন আগ্রহী নয় বিএনপি। জানা যায়, ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি ঘোষণার পর পদবঞ্চিতরা একজোট হয়ে লাগাতার বিক্ষোভ শুরু করেন। তিন মাসের বিক্ষোভে তখন জ্বালিয়ে দেয়া হয় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এর আগে জুয়েল-হাবিব নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করেন পদবঞ্চিত নেতারা। ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া বিএনপির হাইকমান্ডের শঙ্কা, কমিটি গঠনের পর অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারও যদি বিদ্রোহ দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে দলের আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই আন্দোলনে যাওয়ার আগে সাংগঠনিক নতুন কোনো ঝামেলায় যেতে চায় না বিএনপি।

বিএনপির গত কাউন্সিলে রাজীব, মামুন ও আকরামকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হয়। এরপরও ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে সভাপতি পদপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন আকরাম ও মামুন। রাজীব আহসান নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। সভাপতি পদপ্রত্যাশী অন্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন- বর্তমান সহ-সভাপতি আলমগীর হাসান সোহান, নাজমুল হাসান, ইখতিয়ার রহমান কবির, আবু আতিক আল হাসান মিন্টু, মামুন বিল্লাহ, জহিরুল ইসলাম বিপ্লব, সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার।

সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন-বর্তমান কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক কাজী মোকতার হোসেন, মিয়া মোহাম্মদ রাসেল, মিজানুর রহমান সোহাগ, নূরুল হুদা বাবু, আব্দুর রহিম হাওলাদার সেতু, আবুল হাসান, মফিজুর রহমান আশিক, শামছুল আলম রানা, মেহবুব মাসুম শান্ত, বায়েজিদ আরেফিন, ওমর ফারুক মুন্না, মির্জা ইয়াসিন, গোলাম মোস্তফা। এছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন- মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া, আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী, আমীর আমজাদ মুন্না, সৈয়দ মাহমুদ, মেহেদী হাসান, আরাফাত বিল্লাহ খান, নাহিদুল ইসলাম সুহাদ, তরিকুল ইসলাম, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আল মেহেদী তালুকদার, আবুল বাসার সিদ্দিকী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঞ্জিত কুমার দেব জনিসহ কয়েকজন।

জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে-এ ব্যাপারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ হাইকমান্ড অবগত। তাদের নির্দেশেই সারাদেশের ইউনিট কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। আমরা এখন আমাদের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম চালিয়ে যাচ্ছি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যখন উপযুক্ত মনে করবেন, তখনই ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করবেন।