জামায়াত ছাড়তে এখনই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না বিএনপি

 জামায়াত ছাড়তে এখনই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে নানামুখী চাপ থাকলেও  ২০ দলীয় জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শরিকের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না বিএনপি। ভোটের রাজনীতির কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত দীর্ঘদিনের এই জোট সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক ধরে রাখার পক্ষে তারা। বিএনপির হাইকমান্ড গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জাতীয় ঐক্য গঠনের পাশাপাশি নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের ভোট ব্যাংকের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে। দলটির নেতারা মনে করছেন, নিবন্ধনহীনতার কারণে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ না থাকায় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনে জামায়াতকে নিয়ে তেমন সমস্যা হবে না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াত যদি স্বেচ্ছায় জোট ছেড়ে চলে যেতে চায়, তাহলে দলটিকে আটকাবে না তারা। তবে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের দাবি, সিলেটসহ সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের রহস্যময় ভূমিকার কারণে জোটের শরিক এই দলটির প্রতি বিএনপির আকর্ষণ অনেক কমেছে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে আদালত থেকে স্বীকৃত জামায়াতকে নিয়ে শুরু থেকেই বেকায়দায় বিএনপি। জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে দলের ভেতরে-বাইরে এবং দেশি-বিদেশি চাপের মুখে পড়ে বিএনপি। এমনকি ২০১২ সালে জামায়াতের সাথে জোটভুক্ত হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ দেশি-বিদেশি অনেক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে। তাছাড়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনে জামায়াত অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সম্পর্কোন্নয়নে সম্প্রতি বিএনপির প্রতিনিধি দলের ভারত সফরেও জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের ব্যাপারে জোরালো তাগিদ দেয়া হয়। এসব ঘটনায় জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির ওপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে।

এমন প্রেক্ষাপটে ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়া এবং ওই নির্বাচনের আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতও বিবৃতি দেওয়ার ঘটনায় বিএনপির হাইকমান্ড দলটির ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিএনপির জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নীতি-নির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের বৈঠকেও। সেখানে দলটির তৃণমূলের বেশিরভাগ নেতা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জামায়াতকে বাদ দিয়ে সরকারের বাইরে থাকা বিকল্পধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্যসহ ডান-বাম সব মত ও পথের দলকে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। তবে বিএনপির হাইকমান্ড জাতীয় ঐক্যের পাশাপাশি জামায়াতের ভোট ব্যাংকের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে। জামায়াতকে ছেড়ে ড. কামাল হোসেন আর যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে ঐক্য গড়লে ভোটের লড়াইয়ে লাভ না লোকসান হবে-সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় বিএনপি।

বিএনপির কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, জামায়াতের কারণেই প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক দল ও শক্তি বিএনপিকে সমর্থন দিতে অনীহা জানিয়ে আসছে। নানামুখী চেষ্টা সত্ত্বেও জামায়াতের কারণে প্রতিবেশী ভারতের সমর্থনও আদায় করা যাচ্ছে না। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকার কারণে স্বাধীনতাবিরোধী ওই দলটির অপকর্মের দায় বিভিন্ন সময়ে তাদের ওপরেও চাপানোর চেষ্টা হয়েছে। তাই জামায়াতকে এখনই বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ইতিবাচক ইমেজসম্পন্ন দলগুলোকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া দরকার। তাদের মতে, এই দলগুলোর সেভাবে ভোট না থাকলেও তাদের নেতাদের এক ধরণের ইতিবাচক ভাবমূর্তি আছে- যেটাকে কাজে লাগিয়ে সফল হওয়া যাবে।

তবে দলটির উদারপন্থীরা মনে করেন, সামনে নির্বাচন। তাই জামায়াতকে এখন জোট থেকে সরিয়ে দিলে লাভ হবে সরকারের। কারণ, সারাদেশে এই দলটির নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে। এসব ভোট তখন আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যেতে পারে। তাছাড়া বিএনপি জোট থেকে ইসলামী দলগুলোকে আলাদা করতে সরকারও নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। জামায়াতকে জোট থেকে আলাদা করতে পারলে সরকার এই দলটিকেই আবার বিএনপির বিপক্ষেই দাঁড় করাতে পারে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে জামায়াত যদি নিজেই জোট ছেড়ে চলে যেতে চায়, তাহলে দলটিকে আটকানো ঠিক হবে না।

এই দুই অংশের সমীকরণ নিয়ে হিসাব-নিকাশ করা বিএনপির হাইকমান্ড আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে তৃণমূলের মতামত নিয়ে গত ১১ ও ১৩ আগস্ট রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। তবে ভোটের রাজনীতির কারণে নানামুখী চাপ সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের জোট সঙ্গী জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা। দলটি মনে করছে, নিবন্ধন না থাকায় জাতীয় ঐক্য গঠনে জামায়াত কোনো সমস্যা না। অবশ্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াত স্বেচ্ছায় জোট ছেড়ে চলে যেতে চাইলে তাদেরকে আটকাবে না বিএনপি।

জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে তৃণমূলের চাপের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, বিএনপির জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে অনেকেই এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। পরবর্তীতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জাতীয় ঐক্য গড়তে জামায়াতকে নিয়ে সরকারের বাইরের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, এখন পর্যন্ত এমন কোনো কথা শুনছি না। মনে হয়- জামায়াত নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই এখন মূল বিষয়।

দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি ও জোটের কোনো সমস্যা নেই। এটা মিডিয়ার সৃষ্টি। এতো বড় দলে নেতা-কর্মীদের নানা মত থাকতেই পারে। এখানে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না।

বিএনপির রাজনীতির পরামর্শক ও সমালোচক গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সঙ্গে রয়েছে। তারা বিরোধী দল-জোটের পার্ট। আর বিএনপি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানালেও নতুন কোনো দল তো এখনো সেখানে আসেনি। অবশ্য এটা ঠিক-জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় আগ্রহী দলগুলো জামায়াতের ব্যাপারে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। তবে যুক্তফ্রন্ট বা গণফোরাম এমন কথাও বলেনি যে, জামায়াতকে ছাড়েন- আমরা ঐক্যে যোগ দিলাম।

বিএনপিপন্থী এই বুদ্ধিজীবী আরো বলেন, প্রত্যেকটি দল ঐক্য প্রক্রিয়ার কথা বলছে। কিন্তু ঐক্যের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে বিএনপি কিসের ভরসায় আজকে জামায়াত ছাড়ার মতো একটি মেজর ডিসিশন নেবে? তবে এটা ঠিক-সিলেটসহ সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ ভূমিকার কারণে দলটির প্রতি বিএনপির আকর্ষণ কমেছে।