জাতীয় সংগীত গাইতে হবে শুদ্ধভাবে

 জাতীয় সংগীত গাইতে হবে শুদ্ধভাবে

আ. ব. ম রবিউল ইসলাম (রবীন) :আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি...’- আমাদের জাতীয় সংগীত। এক মহাকাব্য। আমাদের এক অস্তিত্বের নাম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ২৫ লাইনের এই গানের ১০ লাইনকে জাতীয় সংগীত হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের অর্জন আমাদের জাতীয় সংগীত। বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দেওয়া এক সময়কার জাতীয় সংগীত ’পাক সারজমিন সাদবাদ...’- এর পরিবর্তে আমরা আজকের জাতীয় সংগীত পেয়েছি। ভাষার জন্য বাঙালি জাতি যে সংগ্রাম, আন্দোলন করেছে, এই জাতীয় সংগীতও পেতে আমাদের লড়াই, সংগ্রাম করতে হয়েছে। এক সময়ের নিষিদ্ধ এই  জাতীয় সংগীত আমাদের অহংকারের অনুসঙ্গ।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিদিন জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিনের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ বছর পর যে প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুদ্ধভাবে, শ্রদ্ধাভরে জাতীয় সংগীত কি গাওয়া হয়? কিভাবে একটি রবীন্দ্র সংগীত জাতীয় সংগীত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত পেল সেই ইতিহাস আমরা কয়জনই বা জানি। আমাদের পাঠ্যবইয়ে সেই বিষয়টি স্থান পেতে পারতো না? আর জাতীয় সংগীত নিয়ে খুব বেশি কাজও আমরা করিনি। মফস্বল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে অনেক স্থানে সঠিক পদ্ধতিতে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়না। শিশুদের শুদ্ধভাবে জাতীয় সংগীত গাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের যে ভূমিকা রাখার দরকার অনেক ক্ষেত্রে তা করা হয়না। চলতি মাসে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শুদ্ধভাবে জাতীয় সংগীত গাওয়ার প্রতিযোগিতা হয়ে গেল। বিষয়টি খুবই ইতিবাচক ঘটনা ছিল। বহুদিন পর শুধু জাতীয় সংগীত নিয়ে এরকম একটা আয়োজন করাতে সরকার ধন্যবাদ পেতেই পারে।
 
জাতীয় সংগীত কোনভাবেই ভুল গাওয়া যাবে না। একদম সঠিক উচ্চারণে এবং সুরে শুদ্ধ করে গাইতে হবে এবং গাওয়ার সময় এর প্রতি যথাযথ সম্মানও দেখাতে হবে। যখন জাতীয় সংগীত গাওয়া অথবা বাজানো হয় ও জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করা হয়, তখন উপস্থিত সবাইকে জাতীয় পতাকার দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে। যখন পতাকা প্রদর্শন না করা হয়, তখন সবাইকে বাদক দলের দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে অনেক জায়গায় অনেককে বুকে হাত রেখে জাতীয় সংগীত গাইতে দেখা যায়। এটি আসলে সঠিক নয়। জাতীয় সংগীত গাইতে হবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। সাধারণ নাগরিকদের বাইরে ডিফেন্স বা প্রতিরক্ষাবাহিনীর জন্য জাতীয় সংগীত গাওয়ার নিয়ম পৃথকভাবে বলা হয়েছে।

জাতীয় সংগীতের পুরোটা সব অনুষ্ঠানে গাওয়ার নিয়ম নেই। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, যেমন একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের শুরুতে এবং শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ সংগীত বাজাতে হবে। তবে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের প্যারেড অনুষ্ঠানে দুই লাইন শুরুতে বাজানোর নিয়ম রয়েছে। সব বিদ্যালয়ের দিনের কার্যক্রম জাতীয় সংগীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু করতে হবে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংসদ ভবনে প্রবেশ করার শুরুতে ও শেষে পূর্ণ জাতীয় সংগীত বাজাতে হবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ যখন জাতির উদ্দেশে সম্প্রচার করা হয় করা হয়, তখন সম্প্রচারের শুরু ও শেষে দুই লাইন বাজাতে হবে। রাষ্ট্রপতি যখন কোন প্যারেডে সালাম গ্রহণ করেন, তখনো দুই লাইন বাজাতে হয়। তা ছাড়া রাষ্ট্রপতি যদি কোনো অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হন বা কোনো অনুষ্ঠান উদ্ধোধন করেন অথবা প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসাবে স্বাধীনতা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন, তাহলে এসব ক্ষেত্রে তাঁদের আগমন ও প্রস্থানের সময় দুই লাইন জাতীয় সংগীত বাজানোর নিয়ম রয়েছে। বিদেশি কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান তাঁর রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সফরে বাংলাদেশে এলে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করার আগে জাতীয় সংগীতের প্রথম দুই লাইন বাজাতে হবে। এ ছাড়া কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপরিবারের সদস্য, রাষ্ট্রদূত হাইকমিশনার বা সমমর্যাদার কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি যখন রাষ্ট্রপতির সালাম গ্রহণ করেন, তখন দুই লাইন বাজাতে হবে।

 রেডিও এবং টেলিভিশনের প্রতিদিনের কার্যক্রমের শেষেও দুই লাইন বাজানোর কথা রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এর সুর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংগ্রহ করেছিলেন লালন সংগীত শিল্পী গগন হরকরার রচিত একটি গানের সুর হতে। গানটি ছিল ’আমি কোথায় পাব তারে, মনের মানুষেরে...।’ আমার সোনার বাংলা গানটি ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এ গানের রচয়িতা ও সুরকার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই গানটি রচিত হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি তারিখে মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে এ গানটির প্রথম দশ লাইন সদ্যগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ঠ্রের জাতীয় সংগীত হিসাবে নির্বাচিত হয়। ১৩১২ বঙ্গাব্দে (১০৯৫ সালে) বঙ্গদর্শন পত্রিকায় আশ্বিন সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। গানটি রবীন্দ্রনাথের ’গীতবিতান’ গ্রন্থের স্বরবিতান অংশযুক্ত। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তারিখে পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সংগীত হিসাবে ঘোষণা করা হয় ১৯৭২ সালে ৪ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর বাংলাদেশের সংবিধানে এই গানকে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দেওয়া হয়। চলচিত্রকার জহির রায়হান ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর বিখ্যাত ’জীবন থেকে নেওয়া’ কাহিনীচিত্রে এই গানের চলচ্চিত্রায়ন করেন। গানটির ইংরেজি অনুবাদ করেন সৈয়দ আলী আহসান। গানটিতে বাংলার প্রকৃতির কথা প্রধানভাবে স্থান পেয়েছে।
লেখক ঃ প্রভাষক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১৮-৯৩৪৮৪৭