গুজবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান

 গুজবের  বিরুদ্ধে রুখে  দাঁড়ান

রবিউল ইসলাম (রবীন): আগুনের লেলিহান শিখার মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সমাজে নানা গুজব। তারমধ্যে ’পদ্মাসেতুতে কল্লার’ গুজব ব্যাপক ভাবে দেখা দিয়েছে। ‘ছেলেধরা’ আতঙ্কে ভুগছে সমাজের মায়েরা-বাবারা, নানা শ্রেণীর মানুষ। আবার ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হচ্ছে নিরপরাধ মানুষ। গত ছয় মাসে ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এই ইস্যুতে। সন্তানের ভর্তির জন্য রাজধানীর বাড্ডার একটি স্কুলে খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন এক নারী তাসলিমা বেগম। কিন্তু ’ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনির নির্মমতার শিকার হয়ে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে। ঠিক এরপর দিনই নওগাঁর মান্দায় পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ছেলেধরার গুজব রটিয়ে ছয়জনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এই জাতীয় আরো অনেক ‘গণপিটুনির’ বিবরণ দেওয়া যায়। সব দেখে শুনে মনে হচ্ছে ’গণপিটুনি’ ’দলবেঁেধ কাউকে মেরে ফেলা’ এখন কারো কারো কাছে উৎসবে পরিণত হয়েছে।

গুজব ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা বাড়ছেই। পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে-এমন গুজবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এমন অবস্থায় ৯ জেলায় গণপিটুনির শিকার হয়েছেন অন্তত ২১ জন। সন্দেহ আর অবিশ্বাসের পিটুনির শিকার হয়ে যাঁরা নিহত বা আহত হচ্ছেন,তাঁদের মধ্যে অনেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন। এ ছাড়া কোন কোন স্থানে পরিকল্পিতভাবে গুজব রটানো হচ্ছে। তাই বিষয়টিকে হালকা করে দেখার আর অবকাশ নেই। আইন ও সালিস কেন্দ্রের হিসাব মতে গত ছয় মাসে যে ৩৬ জন গণপিটুনিতে মারা গেছেন, তার মধ্যে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ১৭ জন। এ ছাড়া ঢাকায় নয়জন, খুলনায় পাঁচ, সিলেটে দুজন ও রাজশাহীতে একজন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন।

কিন্তু মানুষ আতঙ্কে আছেন এ কথা শতভাগ সত্য। আমি নিজে আমার এলাকার কিছু  স্কুলে গিয়ে দেখেছি অধিকাংশ অভিভাবক ‘ছেলেধরা’ আতঙ্কে ভুগছে। স্কুলগুলিতে আগের চেয়ে এখন অভিভাবক উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কুলের শিক্ষকরা এ নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। টিভি বা পত্রিকায় এসব নিয়ে নানারূপ খবর বের হওয়ায় শিশুরাও আতঙ্কে ভুগছে। মায়েরা আর তাঁেদর সন্তানদের একাকি স্কুলে যেতে দিচ্ছেন না।গণপিটুনি ও এর মাধ্যমে হত্যাকান্ড বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে জনগণ ছিনতাইকারী, চোর বা ডাকাত ধরে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলার অনেক ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় এর পেছনে যে মনস্বত্ত্ব কাজ করে তা হল থানা-পুলিশে গিয়ে কাজ হবে না; আইন নিজের হাতে তুলে নিতে হবে। কিন্তু কোন সভ্য জগতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। মানুষ সবই জানে, বোঝে, তারপরও রেনু’র মতো নিরপরাধ অনেকে মারা যায়। কেউ তার হিসেব রাখে না। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে ’ছেলেধরা’ জাতীয় গুজব নেই। আর কাউকে  প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলার সাথে উন্নত দেশের মানুষ পরিচিত নয়।

গুজব ভয়াবহ এক বিষয়। মূলত যাঁরা এখনো কুসংস্কার বিশ্বাস করে, তাঁরা এই কাজগুলো করে। আমার এলাকার একদল মহিলা প্রচন্ডভাবে বিশ্বাস করে যে, পদ্মা সেতুতে মানুষের রক্ত লাগবে, তাই ছেলেধরারা বাচ্চাদের চুরি করছে। আমি ওদের বললাম, যমুনা সেতু করার সময় কি মানুষের রক্ত লেগেছিল? তখন উনারা চুপ করে যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা গুজব আমরা দেখেছি, শুনেছি। ’পাক বাহিনী আসছে’ এই গুজব দিনের মধ্যে অসংখ্যবার শুনে হয়রানি হয়েছে মানুষ। এখনো এই ডিজিটাল যুগে চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে নানা গুজব তৈরি হয়। রাজনীতিতে অনেক সময় অনেক গুজব ছড়ানো হয়। নির্বাচনের সময় গুজবের ডাল পালা তৈরি হয়। গুজব ছড়িয়ে অনেক নিরপরাধ মানুষকে এখনো ’একঘরে’ করা হয়। তাই আমাদের গুজবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে টিভি, রেডিও সহ পেপারে গুজবের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন ব্যবহার করা যেতে পারে। গুজবের মতো ভয়াবহ বিষয়কে উচ্ছেদ করতে যা যা করার, তাই করতে হবে।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক-কলামিষ্ট
[email protected]
০১৭২৫-০৪৫১০৫