গণতন্ত্রের পথে উন্নয়ন-এগিয়ে যাক বাংলাদেশ

 গণতন্ত্রের পথে উন্নয়ন-এগিয়ে যাক বাংলাদেশ

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ : উন্নয়ন নাকি গণতন্ত্র? কোন পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। গত কয়েকবছর থেকে এই প্রশ্নটি অধিকাংশ আলোচক ও সমালোচকদের মনে ও মুখে বার বার উকিঁ ঝুকি দিচ্ছে। কিন্তু এর একটি সহজ ও সত্য উত্তর আমরা কেউ সহজ করে দিতে পারছি না। এক কথায় কেউ বলতে পারছেনা যে আমরা শুধু উন্নয়ন চাই, আর গণতন্ত্র গোল্লায় যাক। আবার এ কথাটিও বলা যাচ্ছে না আগে গণতন্ত্র পরে উন্নয়ন। কারণ এটি বললে সরকার হয়তবা তাকে উন্নয়ন বিরোধী  বা স্বাধীনতা বিরোধী  শক্তি হিসেবে  আখ্যা দিয়ে দিতে পারে। সুতরাং কথা বলার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মনে একটু হলেও ভয়ভীতি তো আছেই, তার ওপর আবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন- ২০১৮ প্রণয়নের পর মানুষের ভয়টাকে আরো অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। সুতরাং উন্নয়ন বা গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা নিঃসন্দেহে একটি দুঃসাহসিক কাজ। আবার দেশে যদি উন্নয়ন না হয়, মানুষ যদি দারিদ্র্যর দুষ্টচক্রের মধ্যে সার্বক্ষণিকভাবে ঘুরপাক খেতে থাকে তাহলে গণতন্ত্র দিয়ে আমি কী করব? কোথাও না কোথাও একটা প্যাঁচ লাগিয়ে সবাই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ব্যাখা দিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ সাহস করে বলতেও পারছেনা যে  আমি উন্নয়ন ও গণতন্ত্র দু’টাই চাই। তবে উন্নয়নের নামে গণতন্ত্রকে যেন সেদিকেও আমাদেরকে সোচ্চার হতে হবে। সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজ বলতে যাদেরকে  আমরা বুঝি, দেশের গণতন্ত্রায়নে বা সুশাসনের জন্য জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারাও ঠিক কতটুকু ভূমিকা পালন করতে পারছেন সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেকের মনে। গণতন্ত্র, সুশাসন, সম্পদের সুষম বণ্টন ও বৈষম্য দূরীকরণে কাজগুলো ঠিকঠাক মতো হচ্ছে কিনা সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। উন্নয়নের নামে যদি লুটেরাদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়, মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিবাদী  শ্রেণির হাতে রাষ্ট্রের বেশিভাগ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে  থাকে  তবে সেটি সমাজ উন্নয়ন বা রাষ্ট্রের উন্নয়নে তেমন কোন ভূমিকা রাখবে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খানের একটি সাক্ষাতকার পড়লাম। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে সবাই উন্নয়নের গল্প শোনালেও ড. আকবর আলী খান বার বার দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তখন তাকে একজন প্রশ্ন করেছিলেন,  পৃথিবীর এত কিছু থাকতে আপনারা কেন দুর্নীতি নিয়ে  পড়ে আছেন। দুর্নীতি কি উন্নতিকে রোধ করতে পারে? না। দুর্নীতিতে কখনোই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনা। সুতরাং আপনি যদি শুধু উন্নয়নের কথা ভাবেন তাহলে দুর্নীতি  বিষয়টি  নিয়ে এতো সিরিয়াসলি না ভাবলেও চলবে। তখন ড. আকবর আলী খান বলেছেন, দুর্নীতি থাকলেও উন্নয়ন সম্ভব এই বিষয়টি আমিও স্বীকার করি কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল কারা ভোগ করছেন সেই বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। দেশে  লুটেরা শ্রেণি তৈরি করে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলুক তা আমরা কখনোই চাই না।  কারণ এটি এখন সর্বজনস্বীকৃত যে  আমরা নি¤œ আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি এবং আসছে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেই আমরা সেটি প্রমাণ করে দিব,  আমাদের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে, গত কয়েকবছর থেকে  জিডিপির হার ৭ শতাংশের ওপরে  ধরে রাখতে আমরা সক্ষম হয়েছি, আমাদের  মাথাপিছু আয় বাড়ছে, দারিদ্র্যে ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। মাতৃমৃত্যুর হার কমছে, সামাজিক সূচকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সামাজিক সূচকে আমরা প্রতিবেশি দেশগুলোর থেকেও অনেক এগিয়ে আছি।  এছাড়াও দ্য গ্লোবাল ইকোনোমিস্ট ফোরাম (জিইএফ) এর তথ্যমতে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের ওপরে। মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের সুফল হিসেবে বাংলাদেশী পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। জিইএফ অনুমান করছেন যে বাংলাদেশে ২০১৯ সালে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই ২২ হাজার কোটির টাকার বিনিয়োগ আসতে পারে।

 এছাড়াও যুক্তরাজ্য ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)। তারা ওয়ার্ল্ড  ইকোনমিক  লিগ টেবিল ২০১৯ বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেন যে বাংলাদেশ ২০৩২ সালের মধ্যে বিশ্বের বৃহৎ ২৫টি অর্থনীতির দেশের মধ্যে প্রবেশ করবে এবং তখন বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৪ তম। তখন বাংলাদেশ সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, ভিয়েতনাম,দক্ষিণ আফ্রিকা ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো পিছনে ফেলে যাবে। এছাড়াও বাংলাদেশে এখন অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। অবশ্য সবগুলো খবরই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য খুবই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। এতকিছু সত্ত্বেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্যমতে এখনো বাংলাদেশ প্রায় ৪ কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে যার মধ্যে ১২ শতাংশের বেশি হতদরিদ্র। এছাড়াও তিনবেলা পেট ভরে খাবার খেতে পারলেও  কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার বা ২২০০ কিলো ক্যালরি চাহিদাটুকু পূরণ করতে পারেন না  এদের সংখ্যাটাও আরো অনেক বেশি। এছাড়াও কিছু প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ রয়েছে যারা এখনো তিনবেলা পেটভরে খাবার খেতে  পান না। তাহলে দেশের একাংশ মানুষ যদি তিনবেলা পেটপুরে খাবার খেতে না পারেন, এখনো  প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ যদি তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিটুকু না পায়, উন্নয়ন যদি হয় শুধু মাত্র অবকাঠামোর  উন্নয়ন, উন্নয়ন যদি হয় শুধু বিশেষ একটি শ্রেণি, গোষ্ঠীর  উন্নয়ন। তবে দেশের মানুষের জন্য সুফল বয়ে

আনবে না। তাই সাধারণ মানুষের পেট ভরাতে হলেও সম্পদের সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে, উন্নয়নের সুফল যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পর্যন্ত পৌছে যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। জাত, পাত বৈষম্য নিরসন করে একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীল ও সামাজিক সৌহার্দ্যপুর্ণ সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, সেই সাথে শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হবে, বাঙালি সংস্কৃতির মানোন্নয়ন করতে হবে, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীগুলোকে শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নের মূল ধারায় ফিরিয়ে এনে বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য মৌলিক  ও কাঠামোগত  সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে, সেই সাথে কারিগরি দক্ষ মানুষ গড়ে তুলে বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই বিষয়টি এখন আমাদের সবার কাছে সুস্পষ্ট আমাদের দেশে যে হারে মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিক সে  হারে  বৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুঁজিবাদীদের প্রতিপত্তি ও প্রভাবে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি প্রবেশ করছে। দুর্নীতি এবং উন্নয়ন এখন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এই ব্যবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে যেরকমের শঙ্কা, ভয়ভীতি কাজ করেছিল কিন্তু  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এরকম কোন শঙ্কা বা ভয়ভীতি কাজ করেনি। কারণ এই নির্বাচনটি ছিল একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। যদিও আমরা জানি যে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের সাথে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কোন সম্পর্ক নেই। তাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলেই যে সেটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন হবে এরকমটি ভাবার কোন কারণ নেই। কারণ এই দু’টি আলাদা বিষয়। প্রথম থেকেই সবাই ভেবেছিল যে এবারের নির্বাচনটি হবে অংশগ্রহণমূলক কিন্তু সেটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হবে কিনা সেটি নিয়ে সবার মনেই সন্দেহ ছিল। নির্বাচনের ৬ মাস আগেই সাধারণ মানুষ বলে ধারণা করেছিল যে এই নির্বাচনের ফলাফল কি হবে বা এই নির্বাচনে কী ঘটতে যাচ্ছে। যাহোক শেষ পর্র্যন্ত মানুষ যা ভেবেছিল ঠিক তাই ঘটেছে। এবারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের মহাবিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রীসহ ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। তবে সংখ্যাটা যে আরো বাড়তে বা আরো কিছু পরিবর্তন আসতে পারে সেটিও এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে।

 আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছেন যে এবারের মন্ত্রিসভায় নতুন একটি চমক রয়েছে। অবশ্য সেই চমক আমরা শেষপর্যন্ত দেখেছি।  পুরাতন বাঘা বাঘা মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে নতুন মুখের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। অনেকেই এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এখন দেখার বিষয় নতুন মন্ত্রী সভা, নতুন বছরে কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়ে নব উদ্যমে কাজ করতে পারেন। দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স, বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও নৈরাজ্যের মোকাবেলা করা, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, গার্মেন্টস খাতে শ্রমিক অসন্তোষ, শিশু নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ, গণপরিবহন খাতে অনিয়ম ও নৈরাজ্য, সড়কের মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো, পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, গুম ও খুনের মতো যে বড় বড় ঘটনাগুলো বিগত কয়েকবছর ঘটেছে এই বিষয়গুলো বর্তমান সরকার বা নবগঠিত মন্ত্রিপরিষদ কিভাবে মোকাবেলা করবেন সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে সবার ওপরে  আমাদের প্রত্যাশা থাকবে গণতন্ত্রের পথ ধরেই বাংলাদেশ যেন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৫০-৫৩৪০২৮