ঈদযাত্রায় ভোগান্তি রোধে ব্যবস্থা জরুরি

 ঈদযাত্রায় ভোগান্তি রোধে ব্যবস্থা জরুরি

রায়হান আহমেদ তপাদার : ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে অনেক কষ্ট সহ্য করে মানুষ গ্রামের বাড়িতে ছুটে যায়। আর এই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য কারো মধ্যেই যেন চেষ্টা ও আন্তরিকতার অভাব দেখা যায় না। নাড়ির টানে মানুষ ছুটে চলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বাড়ি ফেরার সে যে কী আগ্রহ ও ব্যাকুলতা বলে বোঝানো কঠিন। মানুষ ছুটে চলে তার আপন ঠিকানায়, আপন সত্তায় মাটির টানে, নিজ ঠিকানায়। আর এই আনন্দের যাত্রায় কিছু সঠিক পরিকল্পনার প্রয়োগ আপনার যাত্রাকে করতে পারে আরো উপভোগ্য। হোক ট্রেন, বাস বা লঞ্চ; গাদাগাদি করে চড়তে যাবেন না। অতিরিক্ত ভার বহন করতে যাওয়াটা বেশ ঝুঁকির। কিন্তু সড়ক-মহাসড়কের যে অবস্থা তাতে কষ্টের সীমা আরো হাজার গুণ বেড়ে যায়। ঈদের সাত দিন আগে থেকেই যানজট শুরু হয়ে যায়। এতে জনগণের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। এ জন্য মহাসড়কের দিকে সর্বদাই নজর রাখতে হবে। সড়ক ভালো রাখার জন্য প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় নির্দিষ্ট কমিটি গঠন করতে হবে। তাহলে সব সড়কের অবস্থাই ভালো থাকবে। এতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতে কোনো ধরনের বাধা থাকবে না। রাস্তা ভালো হলে যানজট হবে না। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মানুষ বাড়িতে যাবেই, এটা যেমন সত্য; সড়কপথ এত অল্প সময়ে নির্বিঘœ করা যাবে না, তা-ও মেনে নিতে হবে। ঈদের সময় যেহেতু চাপ বাড়ে, মহাসড়কের মেরামতের কাজ এত দ্রুত সম্ভব নয়। এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় যান ও শৃঙ্খলা বজায় রাখলে যাত্রা নির্বিঘœ করা সহজ হবে। এ বিষয়ে প্রশাসনের বড় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। সারা দেশেই সড়ক-মহাসড়কের ভাঙাচোরা জায়গাগুলো সংস্কার করতে হবে।

বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের সংস্কার কাজ দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। জুনের ৮ তারিখের মধ্যে ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়ক মেরামতের কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। ঈদে মহাসড়কে যানজট ও ভোগান্তি রোধে পুলিশ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ঈদের আগে এবং পরে অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব সড়কে উন্নয়নকাজ স্থগিত রাখতে হবে। যান চলাচল নির্বিঘœ করতে সড়ক দখলমুক্ত করতে হবে। সড়কের পাশ ঘেঁষে তৈরি সব স্থাপনা সরাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করি। অস্থায়ীভাবেও দোকানপাট বসানো যাবে না। যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ব্যাপারে তৎপর হবে বলে আশা করি। লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়ি যেন রাস্তায় চলতে না পারে সে জন্য বিআরটিএকে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুরনো যানবাহন চালাতে হলে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে তবেই নামাতে হবে। শিল্পাঞ্চলে বিশেষ পোশাক কারখানায় ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া যায় কি না ভেবে দেখা দরকার। ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘœ করতে মহাসড়কে পুলিশের পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে শৃঙ্খলা রাখতে হবে। ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে যান চলাচলে ব্যত্যয় ঘটুক তা কাম্য নয়। ঈদের সময় অতিরিক্ত ব্যবসা করার জন্য লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি, এমনকি নছিমনও হাইওয়েতে চলাফেরা করে। গাড়ির কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে যানজট লেগেই থাকে। ঈদের আগে ও পরের তিন দিন হাইওয়েতে ট্রাক ও লরি বন্ধ রাখতে হবে। ট্রেনের বগি ও বাসের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে।

অনলাইনে টিকিট কেনার সুযোগ ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে নিয়ে আসতে হবে। সব রকম অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইওয়ে পুলিশকে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। ঈদ যাত্রা নিশ্চিত করতে কালোবাজারে যেন টিকিট চলে না যায়। র‌্যাবের যে তৎপরতা চলছে, এটা যেন অব্যাহত থাকে। আর এ ব্যাপারে সরকার ও প্রশাসনের সরাসরি তদারকি দরকার। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাহারায় রাখতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ ড্রাইভারকে বাদ দিতে হবে। যত্রতত্র বাজার ও পার্কিং বন্ধ করতে হবে। মানুষের বিবেক সবচেয়ে বড় আদালত, এটা মনে রাখতে হবে ও মানতে হবে। ঈদ যাত্রা নির্বিঘœ করতে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালগুলোয় ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের নিয়োগ দিতে হবে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য। দিনের বেলায় কার্গো গাড়ি, ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান এসবের চলাচল সীমিত করতে হবে। ঘরমুখো মানুষ যেন কোনোভাবে হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। হাইওয়ে পুলিশ ঈদ যাত্রা নির্বিঘœ করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। ট্রেন ও বিভিন্ন গাড়ির টিকিট যেন কেউ ব্ল্যাকে বিক্রি করতে না পারে তার জন্য সতর্কবার্তা জারি করতে হবে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। রাস্তা সংস্কার করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। ঈদের যাত্রায় বাস, ট্রেন ও নৌপথে বগি ও গাড়ি বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। এবার যেহেতু ঈদে ছুটি কম, তাই ছুুটি বৃদ্ধি করেও যানজট নিরসন করা সম্ভব। জল ও স্থলপথে সার্ভে করে ত্রুটি চিহ্নিত করা জরুরি।

ঈদের আগেই সব পথ চলাচল উপযোগী করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সব রাস্তার খানাখন্দ, ফেরিঘাট মেরামতের কাজ সম্পন্ন করতে হবে; মালিকদের সঙ্গে জরুরি সভা করে স্টিমার, লঞ্চ, বাস প্রভৃতির মেরামত কাজ শেষ করার তাগিদ দিতে হবে; লঞ্চ ও বাস পরিদর্শন করে দেখতে হবে সেগুলো নিরাপদ চলাচলের উপযোগী কি না। রেল কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে কোচ মেরামতের কাজ হাতে নিয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে সেবার হাত বাড়িয়ে দিলে ঈদ যাত্রা আনন্দমুখর হবে সন্দেহ নেই। স্বল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিটে যাত্রী বহন করা যেতে পারে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ বিশেষ স্পটে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। দুই-তিন স্তরে নজরদারির ব্যবস্থা রাখতে হবে। যানজট নিরসনের জন্য আগে-ভাগে প্রস্তুতি নিতে হবে। রাস্তার দুই পাশে বিঘœকারক কোনো স্থাপনা যেন না থাকে। সড়ক-মহাসড়কগুলোতে হাইওয়ে পুলিশকে সক্রিয় থাকতে হবে। এতে সড়কপথের বিড়ম্বনা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। টিকিটপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে ঘরে পৌঁছানো পর্যন্ত পদে পদে বিড়ম্বনা সইতে হয় ঘরমুখো মানুষকে। তবুও প্রিয়জনের সান্নিধ্যে যেতে পারার আনন্দে পথের বিড়ম্বনার স্মৃতি ও ক্লান্তি মুছে যায়। এ ক্ষেত্রে কালোবাজারি ও অযথা হয়রানি বন্ধে প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পথের ক্লান্তি ভুলে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেবে নাড়ির টানে ঘরে ফেরা মানুষ। প্রত্যেক মানুষ এবার তাদের স্বজনদের নিয়ে আনন্দে ঈদ উদ্?যাপন করুক, এ প্রত্যাশা করছি। গত বছর ট্রেনের টিকিটের জন্য জমায়েত লোকদের পত্রিকায় ছাপানো ছবি দেখে মনে হচ্ছিল কোনো জনসভায় আগত ব্যক্তিদের ছবি। ঈদ যাত্রা পুরোপুরি নির্বিঘœ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষ চাইলে অনেকটাই নিরাপদ করতে পারে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে।

সারা বছরের মোট ছুটি থেকে কেটে ঈদের সময় তিন-চার দিনের ছুটি বাড়ানোই শ্রেয়। মহাসড়কে পাশের অস্থায়ী দোকান ঈদের আগে উচ্ছেদ করা দরকার। দিনে ট্রাক চলাচল বন্ধ করতে হবে, সব অটো বা সিএনজি বন্ধ রাখতে হবে। দূরপাল্লার গাড়ি যেখানে-সেখানে থামানো যাবে না। গতিসীমা নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে, ওভারটেক নয়। ট্রেন, লঞ্চ বাড়ানো হলে ভোগান্তি কমবে, আনন্দময় হবে ঈদ যাত্রা। ঈদের সময় কর্মজীবী মানুষ প্রাণের টানে বাড়ি যায়। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার পথে তারা নানা ভোগান্তির মধ্যে পড়ে। তাদের স্বস্তির জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া দরকার। টিকিটের কালোবাজারি বন্ধ করতে হবে, পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা উচিত হবে না। পথে ডাকাতি-ছিনতাই রোধের ব্যবস্থা করতে হবে। সড়কে-মহাসড়কে দিন-রাত টহলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সরকারি গণযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের ঈদে নিরাপদে বাড়ি ফেরার একমাত্র অবলম্বন হলো বাংলাদেশ রেলওয়ে। আর সর্বপ্রথম এই ঈদে যাত্রা সফল করতে বাংলাদেশ রেলওয়েকে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। সঠিক সময়ে টিকিট বিক্রি শুরু করা, ট্রেনসংখ্যা ও বগিসংখ্যা আরো বৃদ্ধি করাসহ নানামুখী পদক্ষেপ দরকার। আর দুর্ঘটনা এড়াতে ট্রেন ও বাসের ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। বাংলাদেশে সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ হলো রেল। আর সড়কপথগুলোতে ট্রাফিক জ্যামের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে থাকতে হয়। তাই সড়কপথগুলো ঈদের ছুটির আগে মেরামত করার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি কোনো চালক ট্রাফিক আইন মেনে না চলে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইনের যা শাস্তির কথা বলা আছে, সেটির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি রেলপথে বাড়তি ট্রেন সংযুক্ত করতে হবে। যাতে ঈদে ঘরমুখো মানুষ নিরাপদে বাড়িতে যেতে পারে। পাশাপাশি সব যাত্রীকে মনে রাখতে হবে, হকারদের কাছ থেকে কোনো জিনিস কেনাকাটা ও খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ঈদ যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘœ করাটাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষ করে ঈদ যাত্রায় সড়ক-মহাসড়কে যানজট চরম আকার ধারণ করে। এ নিয়ে মানুষের দুর্ভোগের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার এখন থেকেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই ঈদ যাত্রায় নির্বিঘœ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই যেকোনো অনিয়ম রুখতে তাদের আরো কঠোর হতে হবে। বাস-ট্রেন-লঞ্চ থেকে শুরু করে সব ধরনের যানচালকদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধ করা আবশ্যক। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো এবং এ বিষয়ে যাত্রীদের সচেতন হতে হবে। এ ছাড়া গণমাধ্যম গুলোতেও প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে। নিরাপদ হোক সবার পথযাত্রা।
লেখক ঃ কলামিস্ট
[email protected]