অধিকার, সুশাসন ও প্রত্যাশা

 অধিকার, সুশাসন ও প্রত্যাশা

রায়হান আহমেদ তপাদার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশাল জয় নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো দেশ শাসনের সুযোগ পেয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার এক মহান ব্রত নিয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে জনরায় লাভ করে। দীর্ঘ ১০ বছরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্ব ইতিমধ্যে দেশের অর্থনৈতিক ভিত গড়ে দিয়েছে। ফলে আগামী পাঁচ বছর তার নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য ছিল খুবই জরুরি। দেশবাসী আশা করে নাগরিক হিসাবে তারা যোগ্য সম্মান পাবে, একই সাথে নাগরিকের মৌলিক অধিকার বিশেষ করে ভোক্তা অধিকার সুশিক্ষা, সুচিকিৎসা, নিরাপদ খাদ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, বস্ত্র, নিরাপদ আবাসন, নিরাপদ সড়ক যাতায়াত, আইসিটি, ব্যাংকিং ও আর্থিক অধিকারগুলি সুরক্ষিত হবে। নাগরিকের মুক্তচিন্তা ও মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর অধিকারগুলি রাষ্ট্র নিশ্চিত করবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবার পরপরই ঘোষণা দিয়েছেন সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থবারের মতো ও টানা তৃতীয়বার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা। বর্তমান ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বেশি কিছু বিষয়ে প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে যা তাঁরা নির্বাচিত হলে প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়ন করবেন। প্রশাসনের সর্বস্তরে ই-গভর্নেন্স সেবা, সরকারি জনসেবার তথ্য জানতে প্রশাসনকে বাধ্যতামূলকভাবে তথ্য প্রদানে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ কার্যকর করেেত হবে।
এবং আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত দেশপ্রেমিক গণমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং জনসেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদসহ পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনগুলিকে শক্তিশালীকরণ, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা উন্নত ও প্রসারিত করা, নগর ও শহরে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং নগর ব্যবস্থাপনায় অধিকতর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
বর্তমানে পরিচালিত সামাজিক সুরক্ষার আওতা ও পরিধি বাড়ানো, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কৃষি উপকরণের উপর ভর্তুকি বাড়ানো, কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্যের দ্রুত সাপস্নাই চেইন গড়ে তোলা, ছোট ও মাঝারি আকারের দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামার প্রতিষ্ঠা এবং মৎস্য চাষের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনমত ভর্তুকি, প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি করা, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনয়ন, আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা, তৃণমূলে সুসাশন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রশাসনের সকল পর্যায়ে ত্রিপক্ষীয় গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত, ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধ, ওষুধ, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, আইসিটিসহ সরকারি- বেসরকারি সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষকে গ্রাহক হয়রানি রোধ ও সেবার মান নিশ্চিতে ভোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকারি নজরদারি নিশ্চিত করা অন্যতম।
দেশের জনগণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে শেখ হাসিনার হাত ধরেই দেশের শাসনতান্ত্রিক, সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ অনেকগুলি যুগান্তকারী পরিবর্তন সম্ভব হবে। সে কারণে জনপ্রত্যাশা হলো, সাধারণ জনগণের নিত্যদিনকার সমস্যা নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য মূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, মজুদদারি, ফড়িয়া ও কালোবাজারী নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাজারে অসাধু সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেট রোধে প্রতিযোগিতামূলক আইনের যথাযথ প্রয়োগ, পণ্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি বাস্তব প্রতিফলনে প্রাইস কমিশন গঠন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তাছাড়া পণ্যমূল্যের সিন্ডিকেট, বাণিজ্যে অনৈতিকতা রোধ ও সকল সেবা-সার্ভিসে অব্যবস্থা নিরসনে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ০৯ পরিবর্তন-পরিমার্জন করা। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আপদকালীন বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে টিসিবিকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা; শহর-নগরে বসবাসকারি নাগরিকদের জীবনমান রক্ষায় বিদ্যমান বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে জনস্বার্থে তা কার্যকর করা, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিয়ে নগরে বসবাসরত নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য ফ্ল্যাট বরাদ্দের ব্যবস্থা করা, সীমিত আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সহজশর্তে গৃহনির্মাণ ঋণ এসব কর্মসূচির প্রতি বিশেষ নজর দেবে। এমনকি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনেক জায়গায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মিরা এগুলো দখলে নিয়ে নেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের সত্যিকারের অংশগ্রহণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে অনেক জায়গায় ভর্তি বাণিজ্য যেমন প্রকট হচ্ছে তেমনি অভিভাবকদের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতবিনিময়ের সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে; যার সর্বশেষ বলি হলেন ঢাকায় ভিকারুননেসা নূন স্কুলের অরিত্রি অধিকারীর মর্মান্তিক ট্রাজেডি। তাই এখনই সময় নতুন সরকারের নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার আগে এ বিষয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক জবাবদিহিতাকে নাগরিক তদারকি ও পরিবর্তনের আওতায় আনতে হবে। নাগরিক অধিকার ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ভোক্তা অধিকার ও নাগরিক সংগঠনগুলিকে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সরকারি নাগরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কমিটি ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সকল প্রকার নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দান এবং এ সমসত্ম নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাড়িবাড়া, হোল্ডিং ট্যাক্স, গণপরিবহন, নগর ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে নাগরিক ভোগান্তি নিরসনে গ্রাহক, সেবাদানকারী সংস্থা ও ভোক্তা প্রতিনিধি, প্রশাসনের সমন্বয়ে ত্রিপাক্ষিক গণশুনানির মাধ্যমে নাগরিক পরীক্ষন, অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সুশাসন জোরদার করতে হবে। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল, ফরমালিন ও বিভিন্ন কেমিকেল মিশ্রণরোধে নিরাপদ খাদ্য আইন ’১৩ বাস্তবায়ন করা, সিন্ডিকেট ভিত্তিক বর্তমান গণপরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, রেলপথকে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করে রেলপথের সেবা সাধারণ জনগণের আওতায় নিয়ে আসা, সরকারি নাগরিক সেবা প্রদানকারী সংস্থা সমূহের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষে ভোক্তাদের সত্যিকারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভোক্তা প্রতিনিধি নির্বাচনে ক্যাব প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
তাছাড়া বাজার তদারকিকে স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অত্যাবশ্যকীয় কাজের আওতায় আনার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি, সরকারিভাবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলিকেও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, আর্থিক ও ঋণ কেলেংকারি রোধ, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে গ্রাহকদের অধিকার সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
এমনকি তাদের ভোগান্তি নিরসনে ব্যাংক, আর্থিক খাতে সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, গ্রাহকদের অধিকার সুরক্ষা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গ্রাহকদের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, সরকারি-বেসকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, নিয়ন্ত্রণহীন টেলিকম ও আইটি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ওষুধ ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন ভেজাল, মূল্য আদায়ের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি হাসপাতালগুলিতে সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত ও গ্রাহক ভোগান্তি নিরসন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা, কৃষি খাতে সত্যিকারের  কৃষক পর্যায়ে ভর্তুকি পৌঁছানো নিশ্চিত ও প্রণোদনা বাড়ানো ও নিশ্চিত করা, কৃষকের পণ্যের বিক্রয়মূল্য ও খোলাবাজারে খুচরা বিক্রয় মূল্যের একটি সীমা নির্ধারণ, খুচরা বাজারে মূল্য বৃদ্ধিকারীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় দিক র্নিদেশনা প্রদান করবে। দেশে সত্যিকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আর একটি জটিল সমস্যা হলো, প্রচলিত শাসন ব্যবস্থায় সমাজের সকল শ্রেণি ও পেশার প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ থাকে না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মালিক সকল জনগণ বলা হলেও শাসন ব্যবস্থায় সমাজের সকল পর্যায়ের শ্রেণি-পেশার নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। শুধুমাত্র জনপ্রতিনিধি নির্বাচন বা ভোট দেয়া ছাড়া আর কোন ভূমিকা নেই। উল্লেখ্য সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়টি রাজনীতিতে অনুপস্থিতির কারণে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, অবজ্ঞা ও সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনায়। যেখানে অনেকগুলি খাতে শুধু সরকারি কর্মকর্তারাই নীতি নির্ধারণ করে থাকেন, আবার অনেক জায়গায় সরকারি কর্মকর্তা ও ঐ সেক্টরের ব্যবসায়ীরা মিলে যৌথভাবে নীতি নির্ধারণ করে থাকেন। অথচ এখানে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বা যাদের জন্য এই সেবা সার্ভিস তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব থাকে না। ভোক্তা ও নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্ট কমিটি ও সেবাদানকারী সংস্থায় এখনও সত্যিকারের ভোক্তা প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি। তাই উন্নয়নের সুফলভোগ সাধারণ মানুষের সন্তুষ্টি বিধানের মানদন্ডে বিবেচিত হয়। এ জন্য বর্তমানে অনেক দেশে হ্যাপিনেস ইনডেক্স বা সন্তুষ্টি সূচকের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নের অগ্রগতি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার ছাড়া মানুষের সন্তুষ্টি বিধান করা সম্ভব হয় না। তাই উন্নয়নভিত্তিক জনসমর্থন দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রদান করে না। নির্বাচনী অঙ্গীকার সফলভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে উল্লিখিত বিষয়গুলো সরকারের যথাযথ বিবেচনা এবং এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার। তাহলেই সার্বিকভাবে দেশ ২০৪১ সাল নাগাদ একটি সুষম উন্নত দেশ হওয়ার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা সে লক্ষ্যেই লড়াই করে চলছেন।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট  
[email protected]