বসন্ত এসেছে আজি এসেছে ফাগুন

  বসন্ত এসেছে আজি এসেছে ফাগুন

মাহফুজ সাদি: শীতালু বাতাসের তেজ কমছে, বাড়ছে দক্ষিণা হাওয়ার উষ্ণতা। পুরনো পাতারা ঝড়ে পড়ছে, গজাচ্ছে নতুন পাতা। আসছে ফাগুন, ঋতুরাজ বসন্ত; তাই হাসছে প্রকৃতি, রঙ লেগেছে প্রাণে প্রাণে। শিমুল বন আর কৃষ্ণচূড়ারা সেজেছে সূর্যের সাথে তাল মিলিয়ে রক্তিম রঙে। কোকিলরা গান ধরেছে ভ্রমরের গুনগুনানির তালে তালে। চারদিকে শোনা যায় ঝড়া পাতার নিক্কন ধ্বনি। বসন্ত বারৈ খুঁজে পায় নিজের নামের স্বার্থকতা। এসে হানা দেয় ঘরে-মনে, অশান্ত মনকে জানান দেয়, বেঁচে আছো এখনও প্রেমে আর গানে। আজ শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিন। আজ পহেলা ফাল্গুন। ঋতুচক্র এখন যেন আর পঞ্জিকার অনুশাসন মানছে না ঠিকই, কিন্তু বসন্ত তার আগমনী জানান দেয় কোকিলের ডাকে।

সকালের দিকে তীব্র কুয়াশা আর একটু বেলা যেতে ঝকঝকে রোদ। বসন্তের এই আবহে চাদরমোড়া শীতকে বিদায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে গত কয়েকদিনে। ফাল্গুনের দ্বিতীয় দিনে ভালবাসা দিবস সেই উৎসবকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। পরপর দু’দিনের তারুণ্যে মেলা যেন নতুন প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। বাঙালির জীবনে বসন্তের উপস্থিতি সেই অনাদিকাল থেকেই। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে স্বমহিমায়। আর শহুরে বসন্তেও যেন সেই আত্মীয়তা থাকে। কানে কানে বলে যায়, আজ ভুলিয়ো আপন পর ভুলিয়ো। ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’। বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই প্রাণচঞ্চলতা। কঁচিপাতায় আলোর নাচন। বাঙালি জীবনে বসন্ত আর আন্দোলন যেন মিলেমিশে একাকার। বসন্তের আগমন বার্তা ১৯৫২ সালের সেই ফাল্গুন মনে করিয়ে দেয় যেদিন পিচঢালা রাজপথে লাল ফুল হয়ে শহীদ হয়েছিলেন ভাষা সংগ্রামীরা।

বসন্তেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পথে নেমেছিল। বসন্ত মনে করিয়ে দিয়ে যায় এ প্রজন্ম ২০১৩ সালে জেগে উঠেছিল ফাগুনে গণজাগরণে। তাই কেবল প্রকৃতি আর মনে নয়,বাঙালির জাতীয় ইতিহাসেও বসন্ত আসে বারবার। গত দুই বসন্ত ছিলো এদেশের মানুষের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। বসন্ত মানেই যেখানে নতুন প্রাণের কলরব, সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটায় ম্লান করে দিয়েছিল। এবার অন্যরকম বসন্ত উদযাপনের অপেক্ষায় আছে বাঙালি মন। ছুটির দিনে বর্ণিল পোশাক আর ফুলের বর্ণচ্ছটা গায়ে মাখিয়ে তরুণ-তরুণীরা বইমেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, চারুকলার বকুলতলা মাতিয়ে রাখবে। আজ এই বসন্তবরণকে নিয়ে রাজধানী নানা রঙে সেজেছে। দিনটির শুরু চারুকলার বকুলতলায় প্রথম প্রভাতে বরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। দিনভর চলবে নানা উৎসব। দিনটি উপলক্ষে এবার রমনা পার্কের মাধবী চত্বরে মাধবী উৎসবের আয়োজন করেছে প্রকৃতি বিষয়ক সংগঠন তরুপল্লব। সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হবে এ উৎসব। উৎসবে উদ্ভিদবিজ্ঞানী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা, কথাশিল্পী বিপ্রদাশ বড়ুয়া,পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক এবং নিসর্গী মোকারম হোসেনসহ তরুপল্লবের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যরা উপস্থিত থেকে প্রকৃতিপ্রেমীদের মাধবীসহ বসন্তের ফুল ও গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। সবাইকে বসন্তের শুভেচ্ছা। এ দিন বিশেষ করে তরুণীরা বাসন্তি রঙের শাড়ি আর মাথায় হলুদ ফুল দিয়ে নিজেরদের নুতন করে সাজিয়ে তোলে।

অন্যদিকে ছেলেরা সাজে হলুদ রঙের পাঞ্জাবিতে। গ্রাম-বাংলায় বিশেষ আয়োজনে চলে পিঠা উৎসব। আর শহরে এটি পায় বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা। চীনেও বসন্ত বরণ হয়ে থাকে। এই বসন্ত বরণ উৎসব হলো তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। তারা চন্দ্রপুঞ্জিকা অনুযায়ী এ উৎসব করে থাকে। তারা সিন চুন খোয়াইলা বলে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকে। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় আপনাকে বসন্তের শুভেচ্ছা। বসন্ত ঋতু লুকিয়ে আছে ফাল্গুন ও চৈত্র মাসের ভিতর। তবে অনুভবের জায়গা থেকে বলতে গেলে শুধু ফাল্গুন মাসের কথাই বলতে হবে। বাংলা বছর গণনায় ফাল্গুন ১১তম মাস হলেও কালের আবর্তনে এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এটি শুধু একটি মাসের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই ফাল্গুন মাসকে নিয়ে আমাদের লোক গানের পাশাপাশি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রয়েছে নানা রচনা। যেমন বাউল সুরে গাওয়া হয় নারী হয় লজ্জাতে লাল, ফাল্গুনে লাল শিমুল বন, এ কোন রঙে রঙিন হলো বাউল মন..মন রে....এ কোন রঙে রঙিন হলো বাউল মন। নারী লজ্জাতে লাল হয় না পুরুষ লজ্জাতে লাল হয় তা বিতর্কের বিষয়। তবে ফাগুনের মাসে শিমুলের বন যে লাল হয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন...ফাল্গুনে বিকশিত/ কাঞ্চন ফুল,/ ডালে ডালে পুঞ্জিত/ আম্রমুকুল। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন- ‘ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ  বসন্ত।’