জলবায়ু পরিবর্তন ও ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি

  জলবায়ু পরিবর্তন ও ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি

অলোক আচার্য্য : জলবায়ু পরিবর্তন ধারণার সাথে আজ আমরা প্রায় সবাই পরিচিত। প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলাম থেকেই জলবায়ু ও এর পরিবর্তনের ধারণা অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ফলে একটি শিশুও জানে জলবায়ু কি, এর পরিবর্তন কি এবং কেন হচ্ছে এবং এর ফলে যে আমরা ভয়ংকর বিপদে পড়তে যাচ্ছি সেটাও জানে। যদি এই পরিবর্তন চলতেই থাকে তাহলে আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি বিপদে আমরা পড়তে যাচ্ছি বলেই আমার মনে হয়। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল ও আফগানিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যার হিসেবে অধিকাংশ মানুষই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হবে। ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে কৃষি, স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ জিডিপি’র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হারাতে হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ২০৫০ সাল নাগাদ এক ডিগ্রী থেকে আড়াই ডিগ্রী পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকা ১০টি জেলার মধ্যে সাতটিই চট্টগ্রাম বিভাগের। কমে যেতে পারে এসব এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান। ফলে দারিদ্র থেকে বেরিয়ে আসার যে প্রচেষ্টা তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু তা আরও জোরদার করা উচিত। কারণ বিষয়টি আমাদের অস্তিত্বের সাথে জড়িত।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে ঘন ঘন কালবৈশাখি, টর্ণেডো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আঘাত করেছে। সেসব এলাকার অনেক মানুষ আজ গৃহহীন। পরিবেশবিদরা বলছেন আবহাওয়ার চরিত্র দীর্ঘ অনেক বছর যাবৎ বদলাচ্ছে। ষড়ঋতুর এই দেশে এখন ছয়টি ঋতু আলাদা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। রীতিমত নাম গুণে বের করতে হয় কিন্তু দেখা মেলে না। কারণ যখন যে আবহাওয়া থাকার কথা তখন তা থাকছে না। শীতের সময়ে খুব অল্প সময় শীত অনুভূত হয়। যখন গরম আসার কথা তখন শীত থাকে। অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি তো আমাদের লেগেই আছে। প্রকৃতি তার চরিত্র পাল্টাচ্ছে। আমরাও প্রকৃতির খেয়ালের সাথে নিজেদের প্রস্তুত করে নিচ্ছি। কিন্তু ক্ষতি পোষাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশ্বের ৪০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হলো চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। আমরা মূলত এরকম বড় বড় শিল্পোন্নত দেশের কার্বন উৎপাদনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার। তার সাথে রয়েছে নিজেদের ভারসাম্যহীনতা। সব মিলিয়ে অবস্থা যে ভজঘট সেটা বোঝা যায়। আমরা পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু তাই বলে বসে থাকার কোন উপায় নেই। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমাদের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। যদি এটা মনে করি যে এই ভূমিকা সরকার একা করবে তাহলে এটা ভুল চিন্তা। আমরা নিজেদের উদ্যেগেও কাজ শুরু করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ২০১৫ সালে সম্পাদিত বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এতে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলো আশাবাদী ছিল যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলোকে আমরা পাশে পাবো। যদিও এই জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের দেশের দায় তুলনামূলকভাবে কম কিন্তু ফল ভোগ করছি আমরাই বেশি। বিশ্বের ১৮০টি দেশের সমর্থনে করা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির বাংলাদেশের মত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। যে অর্থ ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করতে পারে। তবে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তির প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের কারণে এই জলবায়ু চুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে পত্র-পত্রিকায় এসেছে। কিন্তু আমরা এই চুক্তির বাস্তবায়ন চাই।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশগুলোর একটি। প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রাণহানি ঘটার পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত হচ্ছে অগণিত মানুষ। সেসব মানুষ শহরমুখী হওয়ার কারণে চাপ বাড়ছে শহরের উপর। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, কালবৈশাখি, জলোচ্ছ্বাস, টর্ণেডোসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছে। পরিবেশের পরিবর্তিত প্রভাব নিয়ে চলছে নানা ধরনের সাবধানবাণী। আমাদের জলবায়ুর ক্রমাগত পরিবর্তনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা চলছে। যখন শীত আসার কথা তখন না এসে শীত আসছে দেরিতে। আবার যখন বৃষ্টি হওয়ার দরকার তখন না হয়ে অসময়ে প্রচুর বৃষ্টি হলো। অনেকদিন থেকেই শোনা যাচ্ছে পৃথিবীর আবহাওয়া বিরূপ হতে শুরু করেছে। বদলে যাচ্ছে জলবায়ু। জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণগুলো ক্রমেই প্রকৃতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিবেশ বিপর্যয়জনিত কারণে সবচেয়ে দুর্ভোগে যে দেশ পড়বে তার মধ্যে প্রথম সারিতেই বাংলাদেশের নাম রয়েছে। আমাদের দেশ নিয়ে চিন্তা তো আমাদেরই হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে প্রবণতা তার জন্য সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার মত হুমকি বহন করছে। ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে। তাছাড়া এর জন্য আমাদের মত নিচু দেশগুলির একটা বিরাট অংশ সাগরের পানিতে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে বিজ্ঞানীদের হুঁশিয়ারী রয়েছে। লবণাক্ততার বিরূপ প্রভাব পড়বে ফসল উৎপাদনে। যা খাদ্য ব্যবস্থার জন্যও ভয়াবহ ফলাফল বহন করতে পারে।

পরিবেশের বিরূপ অবস্থার সাথে লড়াই করার মত পর্যাপ্ত সামর্থ আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি। বিগত বছরগুলোতে আইলা বা সিডর বা নার্গিসের মত প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির দিকে তাকালে সহজেই আমরা তা অনুমান করতে পারি। আজও সেসময়কার ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের সে দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সংগ্রামের রেশ থামতে না থামতেই আবারো নতুন কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের উৎপত্তি হচ্ছে। নিত্যনতুন নাম আর ভয়ংকর চেহারা নিয়ে আমাদের সাজানো গোছানো সংসারকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে যাচ্ছে। যখনই সংকট সামনে এসেছে তখনই আমরা এ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি। তারপর ধীরে ধীরে সেই বিষয়টা আমরা ভুলতে থাকি। শুধু সেইসব মানুষের মনে দাগ থেকে যায় যারা এর শিকার হয়েছে। বহু বছর তারা এর ক্ষতচিহ্ন বহন করে। তারপর যখন সবকিছু কাটিয়ে উঠে দাঁড়ায় তখন হঠাৎ আবারো কোন নতুন দুর্যোগের কবলে পড়ে। গত বছর একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণায় প্রকাশ করেছিল, বাংলাদেশে প্রতিবছর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ৮২৪১ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। সিডর, খাইমুর, নার্গিস, আইলার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। সেসব ক্ষয়ক্ষতি কাটাতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে। এর ভেতরেই নতুন নতুন দুর্যোগ হানা দিচ্ছে। গত বছর বজ্রপাতেই মারা গিয়েছিল ১৪২ জন। যার সংখ্যা দুই দিনেই ছিল ৮২ জন। এরকমটা অতীতে দেখা যায়নি। তাই বজ্রপাতও নতুন দুর্যোগ রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এ বছরে চৈত্রের শুরু থেকেই বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিভিন্ন সময় প্রচুর মানুষ মারা গেছে। ১৯৭০ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ লাখ লোক মারা গিয়েছিল। আর পার্শ্ব ক্ষয়ক্ষতি তো ছিল আরও ভয়ংকর। ১৯৯১ সালের ঝড়ে প্রায় দেড় লাখ লোক নিহত হয়েছিল। তাছাড়া ১৯৮৮, ১৯৯৮ সালের বন্যাতেও যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে বড় আতংকের নাম ভূমিকম্প। যা মোকাবেলা করার শক্তি আমাদের একেবারেই অপর্যাপ্ত। জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। আমাদের দেশের একক কারণ না হলেও আমাদের সেই ফল ভোগ করতে হচ্ছে। এই পরিবর্তনের গতি রোধ করতে তাই সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে নিজেদের রক্ষায় এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় রোধে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার হবে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ তাই উপকূলীয় অঞ্চলে পরিকল্পিত বনায়ন করা জরুরি। এছাড়া সারা দেশেই বৃক্ষ রোপণের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবেশের জন্য ক্ষতি করে এরকম সব কাজ থামাতে হবে। প্রশ্ন যখন নিজেদের টিকিয়ে রাখা তখন দ্রুত সব পরিবেশ রক্ষার সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
লেখক ঃ সাংবাদিক- প্রাবন্ধিক
[email protected]  
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬