মার্চে মহাসমাবেশের পরিকল্পনা

খালেদা জিয়ার মুক্তি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেই থাকছে বিএনপি

খালেদা জিয়ার মুক্তি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেই থাকছে বিএনপি

রাজকুমার নন্দী : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর, স্মারকলিপি প্রদানের মতো নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে আসছে দলটি। বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা জানান, কারামুক্তির আগপর্যন্ত নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সে অনুযায়ী আবারো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। দলটির উদ্যোগে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ দেশব্যাপী লিফলেট বিতরণ করা হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির অভিযোগ, মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে রয়েছেন। নেতারা বলছেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। তাদের আশা, আইনি প্রক্রিয়াতেই তিনি শিগগিরই কারামুক্ত হবেন এবং আইনি লড়াইয়েই তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। এরপর দলীয় চেয়ারপারসনকে নিয়েই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে বিএনপি। তারা বলছেন, রাজপথের আন্দোলন ছাড়া নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করা সম্ভব নয়। সেই কারণে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত দলের শক্তি অক্ষুন্ন রাখতে হবে। সরকার যতই কঠোর হোক তারা শেষপর্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। কোনো উসকানি কিংবা ফাঁদে পা দেবে না। জানা গেছে, চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে চায় দলটি।

খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ দেশব্যাপী দলের বক্তব্য সম্বলিত লিফলেট বিতরণ করবে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি জানান, দলের কেন্দ্রীয় নেতারা স্ব স্ব জেলায় এই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। জানা গেছে, লিফলেট ছাপানো এবং তৃণমূলে তা পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শিগগির দেশব্যাপী ফের মানববন্ধন এবং মার্চের মাঝামাঝি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আগামী ৩ মার্চ ওয়ার্কার্স পার্টি এবং ৭ মার্চ আওয়ামী লীগ সমাবেশ করবে। আমাদেরও মার্চের মাঝামাঝিতে সেখানে সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় সাজা হওয়ার পর থেকে খালেদা জিয়া ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে বন্দি আছেন। দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে ইতোমধ্যে মানববন্ধন, অবস্থান, অনশন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, স্মারকলিপি প্রদান, কালো পতাকা প্রদর্শন ও প্রতিবাদ মিছিলসহ কয়েকদফা কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এসবের মধ্যে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন্দ্রীয়ভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। বিএনপির পাশাপাশি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও পৃৃথকভাবে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হচ্ছে। ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতারাও বিএনপির এই কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়ে অংশগ্রহণ করছেন। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও স্বাক্ষর দিচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজন। গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে ব্যাপক সাড়া পড়েছে বলে দাবি করেছে দলটি। এ পর্যন্ত বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি এক কোটির বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে। চেয়ারপারসনের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। দলটির নীতি-নির্ধারকরা চাইছেন, দুই কোটি স্বাক্ষর সংগ্রহ হলে রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি এবং সরকারকে স্মারকলিপি আকারে তা দেয়া হবে। একইসাথে বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাক্ষরের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের নজরেও আনবে বিএনপি। বিদেশি দূতাবাস-হাই কমিশনেও দেয়া হতে পারে গণস্বাক্ষরের তালিকা।

জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। কর্মসূচিতে সারাদেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। এটা অব্যাহত থাকবে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দলের দফতরের তথ্য মতে- সারাদেশে গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। দল-মত নির্বিশেষে মানুষ দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য স্বাক্ষর করছেন। তাদের এই স্বাক্ষর গণতন্ত্রের নেত্রীর মুক্তির দাবিকে আরো বেগবান করবে। খালেদা জিয়ার মুক্তিই এখন বিএনপির প্রধান লক্ষ্য বলে জানান তিনি। দলটির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু জানান, সারাদেশে আমাদের দলের চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি চলছে। তৃণমূলের নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে আমরা এরইমধ্যে সারাদেশে এক কোটির বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে পেরেছি। তাদেরকে স্বাক্ষর বই কেন্দ্রে পাঠাতে বলা হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই তা দুই কোটি ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি শেষে সেগুলো দলের হাইকমান্ড স্মারকলিপি আকারে সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে দিবেন।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দলটির উদ্যোগে অনলাইনেও স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান চলছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয় দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ দেখছি আমরা। তারা ই-মেইলের মাধ্যমে গণস্বাক্ষরের ফরম নিয়ে পূরণ করে আবার পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ অনলাইনে স্বাক্ষরও করছেন। শুধু ঢাকা বিভাগে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ হয়েছে বলে জানান তিনি। ঢাকাসহ সারাদেশে চলছে বিএনপির গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, তাদের এই কর্মসূচি গণমানুষের নজর কেড়েছে। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাক্ষর করছেন। জানতে চাইলে রংপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মোজাফফর হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আমরা মহানগরে ৫০ হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহের টার্গেট নিয়ে কাজ করছি।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাড়া পাচ্ছি। ইতোমধ্যে ৩০ হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে। আশা করছি, অচিরেই টার্গেট পূরণ হবে। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে চলমান গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচিতে দলের নেতা-কর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম। তিনি দৈনিক করতোয়াকে বলেন, এ পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে। দেশনেত্রীর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলমান থাকবে। নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল হক বলেন, গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে মানুষের অবিশ্বাস্য সাড়া দেখেছি। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে দোকানদারসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নিচ্ছেন। দিনাজপুরের কাহারোল থানা বিএনপির নেতা মেহেদী হাসান সুমন বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচিতে সর্বস্তরের মানুষ স্বাক্ষর করছেন। তার থানায় এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। তারা এক লক্ষ স্বাক্ষর সংগ্রহ করবেন বলে জানান তিনি।