রাত ১১:৩৬, শুক্রবার, ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
/ মতামত

হাসনাত মোবারক:১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। আত্মপ্রকাশলগ্নে আজকের এ দেশটির জনগণের অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়েছে। অত্যাচারীর নির্মম পেষণে দগ্ধিত হচ্ছিল শান্তিকামী বাঙালিরা। পাকবাহিনী এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ওপর। পাকবাহিনীর অত্যাচারের ধরনটি ছিল বর্ণনাতীত। নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে, মানুষকে প্রকাশ্যে হত্যা। ১৯৭১ সাল, গ্রামের পর গ্রাম, মাঠের পর মাঠ অগ্নিবলয়ের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে  ষোল ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত যুদ্ধ চলছিল। বলা হয় টানা নয় মাসব্যাপী লড়াই সংগ্রাম শেষে বাংলাদেশের সবুজজমিনে লাল বর্ণ খচিত পতাকাটি মুক্তভাবে উড়তে থাকে। শুধু এ নয় মাসই একটি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যে বিষয়টি অগ্রাহ্য করা হয়, তা হল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। মূলত ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর ভিতকে কম্পিত করে তোলে। ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। পাকিস্তানি শাসক চক্রের বিরুদ্ধে বাঙালিদের সোচ্চার হওয়ার মূলমন্ত্র ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। প্রায় দু’শ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে ১৯৪৭ সালে এ উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র গঠন হয়। বর্ণ চতুর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে, বিস্তর ফারাক থাকা সত্বেও অখন্ড পাকিস্তান গঠন করা হয়েছিল।

 রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, একটি জাতি গঠন করতে হলে তাকে নি¤œ লিখিত  উপাদান সমূহের উপস্থিত থাকতে হবে। ভৌগলিক সান্নিধ্য, বংশগত ঐক্য, ভাষাগত ঐক্য, ধর্মগত ঐক্য, রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক সমস্বার্থ। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাক্কলে জাতীয়তাবাদের উপাদানগুলোর মধ্যে একমাত্র ধর্মগত ঐক্য ব্যতিত সব উপাদানই অনুপস্থিত ছিল। তার পরও ১৯৪৭ সালে মুসলমানদের জন্য পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠন করা হয়। দুর্ভাগ্যবসত যাত্রালগ্ন  থেকে হিতে-বিপরীত ঘটনা ঘটতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের উপর নেমে আসে পশ্চিমা শাসকগেষ্ঠীর শাসন শোষণ ও কর্তৃত্বের অধ্যায়। বঞ্চিত হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানিরা। প্রথমে আঘাত হানে- বাংলা ভাষা, বাঙালির আর্থ-সামাজিক ও বাঙালির সংস্কৃতির উপর। বাঙালি জাতিকে অবদমিত করার জন্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল।  পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর বিমাতাসুলভ কর্তৃত্বসুলভ আচরণ শুরু থেকে করে আসছিল। নানান বৈষ্যম্য থাকা সত্ত্বেও এই বিভক্ত মেনে নিয়েছিল স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর বাঙালিরা। একটি নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে ক্রমে।


মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তৈরি হয় বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সোপান। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ভাষা সৈনিকেরা মূলত জনগণের মধ্যে মনোগত ও ভাবগত একাত্মবোধের সান্নিধ্যের জন্য নিজেদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।
বার্ট্রান্ড রাসেলের মতানুসারে জাতীয়তাবাদ হলো একটি সাদৃশ্য ও ঐক্যের অনুভূতি যা পরস্পরকে ভালবাসতে শিক্ষা দেয়। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন সকলের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির এক অনন্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এ আন্দোলন জাতীয়তাবাদী চেতনার বীজ বপন করেছিল।  সৃষ্টি করেছিল নতুন পথরেখা । ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ব সৃষ্টিতে সাহায্য করেছিল। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ শক্তিকে হীনবল করে জাতীয়তাবাদের শক্তিকে প্রগতিশীল করেছিল। ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে একধাপ এগিয়ে দিয়েছিল। জনগণের মধ্যে এক নতুন জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এ চেতনা ক্রমে ক্রমে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাক্সক্ষাকে জাগ্রত করে। তাই ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের গণচেতনার প্রথম সংগঠিত আন্দোলনের নব প্রয়াস। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের স্বাধীকার আদায়ের প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।   


১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্রে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হলেও পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর অত্যাচার ও বৈষম্যর মাত্রা বাড়িয়ে দেয় পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী। ১৯৫৮ সালে সামরিক জান্তা আইয়ুব খান এসে  গণতন্ত্রের নামে প্রহসন শুরু করে। রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক ও শিক্ষা সংস্কৃতিতে বাঙালিরা অবদমিত  হতে থাকে। নানান প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে বাঙালিরা সংগ্রাম  ও ঐক্য গড়ে তুলতে থাকে। পূর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষে ১৯৬৬ সালে  শেখ মুজিবুর রহমান  ছয় দফা  দাবি উত্থাপন করেন। এটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। পূর্ববাংলার জনগণের মনে ব্যাপকভাবে সাড়া জাগানো ঘটনা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর ভিতকে নড়বড়ে করে তোলে এ আন্দোলনের মাধ্যমে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল জয়। আওয়ামী লীগের এ জয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেয় আর নয় । কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের নেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া  নিয়ে শুরু হয় নানারকম টালবাহানা।

 সামরিক জান্তা  ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী নীলনকশার জাল বিস্তার করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাঙালিদের অমর মহাকাব্য পাঠ করেন।  যেটাকে বলা হয় সাতই মার্চের ভাষণ। ওই মহাকাব্যের মন্ত্রমায়ার সুরের লহরীতে বিশাল বাংলা জেগে ওঠেছিল। পঁচিশ মার্চের মধ্য রাতের সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনারা নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নির্বাচারে গুলি চালায়। হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে পাক সেনারা। রক্তনদীর ভেতর দিয়ে অতিক্রম হয় বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনগুলো। পাকবাহিনী শুরু গণহত্যা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ সংগঠিত হয়। গড়ে তোলা হয় মুক্তিবাহিনী। পাকসেনাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তির ঐক্যের ফসল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র। নয় মাসব্যাপী চলতে থাকা লড়াই সংগ্রামের ইতি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে। এদিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। সেদিন থেকে মুক্ত  বিহঙ্গের মতো পতপত করে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৭৫০৯৩৬৯১৯

এই বিভাগের আরো খবর

নৌকা বাইচ : আবহমান বাংলার ঐতিহ্য

আরিফুল ইসলাম:আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ‘নৌকা বাইচ’। হাজারো দুঃখ-কষ্টের মাঝে নির্মল আনন্দের শৈল্পিক বিনোদন  হলো নৌকা বাইচ। যুগ-যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্য আজও দোলায়িত  করে মানুষকে। অবারিত আনন্দে মেতে ওঠে মন-প্রাণ। বাংলার ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির লোকয়ত রূপ নৌকা বাইচ। আকাশ সংস্কৃতির এই যুগেও মানুষ ভুলে যায়নি জনপ্রিয় এই খেলাকে। তবে আগের মতো আয়োজন না থাকলেও সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তা আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এদেশে একসময় যোগাযোগ ছিল নদীকেন্দ্রীক আর বাহন ছিল নৌকা। মুলত: নৌ শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় বন্দর ও শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠে। এ থেকেই তৈরী হয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ নৌ কারিগর।


মুসলিম নবাব-বাদশাদের আমলে নৌকা বাইচ দারুন জনপ্রিয় ছিল। অনেকে মনে করেন, নবাববাদশাদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকা বাইচের গোড়াপত্তন হয়। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলের রাজ্য জয় ও রাজ্য রক্ষার অন্যতম কৌশল ছিল নৌ শক্তি। বাংলার বার ভূঁইয়ারা নৌবলেই মোগলদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। মগ ও হার্মাদ জলদস্যুদের দমনে নৌশক্তি কর্যকরি ভূমিকা রাখে। রণবহর বা নৌবহরে দীর্ঘাকৃতির ছিপ জাতীয় নৌকা থাকত। বর্তমানে বাইচের নৌকার আকৃতিও সে রকমই।


বাংলাদেশে নৌকা বাইচ প্রাচীন হলেও খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়ার ইউফ্রেটিস নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করত সেখানকার লোকেরা। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীল নদে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর থেকে নৌকা বাইচের প্রসারতা ছড়িয়ে পড়ে। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা এখনও ব্যাপক জনপ্রিয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিকে গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট হিসেবে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অর্ন্তভূক্ত হয়।


আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই ছুটে চলে নৌকা বাইচ দেখতে। নদীপাড়ের মানুষের মনে আনন্দ-উচ্ছ্বাস বয়ে যায়। দু-পাড়ে মেলা বসে। নদী পাড়ের গ্রামগুলিতে জামাই-ঝি’সহ নতুন-পুরাতন আত্বীয়-স্বজনের আগমন ঘটে। মেলা চলে ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত। মেলায় চলে লাঠিখেলা, নাগরদোলাসহ বিভিন্ন আনন্দ আয়োজন। দূর-দূরান্ত থেকে উৎসবের আমেজে জনসমাগম ঘটে নদী পাড়ে।

নদীবক্ষে মাঝি-মাল্লাদের সুর-সঙ্গীত আর ছন্দময় দাঁড় মুগ্ধ করে সবাইকে। নদীজল আন্দোলিত হয়। নদী হয়ে ওঠে জলক্রীড়ার অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রধানত : ভাদ্র আশ্বিন মাসে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। বিকেল বেলা শুরু হয় নৌকা বাইচের মুল আসর। আর সন্ধ্যায় চলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারনী বাইচ।
বাইচ শব্দটি ফরাসি । বিবর্তন হয়ে বাজি  বাইজ  বাইচ হয়েছে। যার অর্থ খেলা। এখানে দাঁড় টানার কসরত ও নৌকা চালনার কৌশল দ্বারা বিজয় লাভের লক্ষ্যে আমোদপ্রমোদমূলক প্রতিযোগিতা বোঝায়। এক দল মাঝি নিয়ে একেকটি দল গঠিত হয়। একাধিক দলের মধ্যে নৌকা চালনা প্রতিযোগিতা হলো নৌকা বাইচ। বাংলাদেশে বাইচের নৌকা বিভিন্ন ধরনের দেখা যায়। তবে এর গঠন বেশ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ । নৌকা হতে হয় সরু ও লম্বাটে। কারণ সরু ও লম্বাটে নৌকা নদীর পানি কেটে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে এবং প্রতিযোগিতার জন্য যথেষ্ট উপযোগী।

 নৌকাকে দর্শকের সামনে আর্কষনীয় করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের নকশা ও উজ্জল রঙের কারুকার্য করা হয়। নৌকার সামনের ও পেছনের গলুইটাকে চুমকির কারুকার্য দিয়ে সাজানো হয়। এই নৌকাগুলোকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন : পঙ্খীরাজ, ময়ুরপঙ্খী, সোনারতরী, অগ্রদূত প্রভৃতি। নৌকা বাইচের কিছু আনুষ্ঠানিকতাও রয়েছে। নৌকায় ওঠার আগে মাঝিরা পাক-পবিত্র হয়ে একই রঙের গেঞ্জি ও মাথায় একই রঙের রুমাল বেঁধে নেয়। দুপাশে সার বেঁধে বসে ‘হৈ-হৈয়া-হৈইয়ো’ জয় ধ্বনিতে বৈঠা টানে। মধ্যখানে থাকেন নিদের্শক বা গায়েন। প্রতি নৌকায় ৩০ থেকে ১০০ জন মাঝি  থাকে। গায়েনের নির্দেশে মাঝিরা গান ধরে গানের তালের ঝোঁকে-ঝোঁকে বৈঠা টানে। বৈঠার টানে পানিতে অভিঘাতের সৃষ্টি হয়।

 নৌকা এগিয়ে যায় দ্রুতগতিতে। আবেগ-উত্তেজনার নৌকা বাইচ আরো হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন এবং মনোমুগ্ধকর। আবহমান কাল থেকে চলে আসা প্রাণোচ্ছল আনন্দের অনুষঙ্গ নৌকা বাইচ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এর কারণ নদী দখল, নদীতে কল-কারখানার বর্জ্য ফেলা এবং যেখানে সেখানে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন। ফলে ধ্বংস হতে চলেছে নদী। নষ্ট হচ্ছে নদীর পানি। হারিয়ে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গতি। এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে নদী, সেই সাথে নৌকা বাইচ। প্রশাসন ও ক্রীড়ামোদীরা এগিয়ে এলে নৌকা বাইচের গবির্ত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে আশার কথা হলোবেশ কয়েক বছর থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থনে নৌকা বাইচের আয়োজন চলছে। এই আয়োজন অব্যহত থাকলে নদীপথের ঐতিহ্য নৌকা বাইচ টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
লেখক : সংগঠক-সংস্কৃতিকর্মি
arifulislam_82@yahoo.com
০১৭২৮৫০০৬৩৬

এই বিভাগের আরো খবর

আরামের সংসারে সমৃদ্ধ আগামী

আতাউর রহমান মিটন:ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। মাসটি অন্যান্য আরও গুরুত্বপূর্ণ দিবসে ভরপুর। কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে আলোচনা করব ভেবে হিমশিম খাচ্ছি। গত ৯ ডিসেম্বর ছিল বাংলার নারী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত, নারীমুক্তির বাতিঘর বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটি বাংলাদেশে ‘রোকেয়া দিবস’ হিসেবে বর্ণাঢ্যভাবে পালিত হয়। সরকার কর্তৃক দেয়া হয় ‘রোকেয়া পদক’। আমার পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ দু’জন মানুষ মাসুদা ফারুক রতœা এবং মাজেদা শওকত আলী এবারের ‘বেগম রোকেয়া পদক’ অর্জন করেছেন। রতœা আপা এবং মাজেদা আপাসহ এবারের রোকেয়া পদক অর্জনকারী ৫ জন মহীয়সী নারীকেই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে বিশ্বের কাছে মডেল। বিশ্বের আর কোন দেশে সরকার প্রধান, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের নেত্রী, স্পীকার, দেশের অন্যতম শীর্ষ বিরোধীদল নেতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নারী – এমন নজীর নেই। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পদে নারী এখন শুধু মনোনীত হচ্ছেন না, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হচ্ছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নারী প্রার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে বলে শোনা যাচ্ছে। এসবই বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন পূরণ, নারীর মুক্তি ও সাহসিকতার সাথে এগিয়ে চলার সূচক। তথাপি অনেকেই হয়তো বলবেন যে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিকভাবে সমাজে নারীদের সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও মানুষ হিসেবে সমঅধিকারের দাবি আজও অর্জিত হয়নি। এই অভিমতের সাথে আমার কোন দ্বিমত নেই।  সমতার অর্জনের পথ দীর্ঘ। আরও সংগ্রাম প্রয়োজন।  

‘নারীর ক্ষমতায়ন’ অর্থ পুরুষকে ‘কম ক্ষমতাসম্পন্ন’ করা নয়। বিষয়টি পুরুষতান্ত্রিকতার বিদ্যমান একচেটিয়া কর্তৃত্ববাদ অবসানের সাথে সম্পর্কিত। সমঅধিকার, সমান অংশীদারিত্ব ও সমান সুযোগের বদলে ‘একচেটিয়াতন্ত্র’ আমাদের কারোরই পছন্দ নয়। আমরা কারও হাতেই ‘একচেটিয়া কর্তৃত্ব’ তুলে দেয়ার পক্ষে নই। কারণ তাতে করে নিজের অজান্তেই এক ‘স্বৈরাচারী’ মনোভাবের দাসত্বের কাছে আমরা পরাজয় বরণ করি। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা সর্বত্র ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ চাই। এটা পাবার জন্য অসামান্য সাহস, প্রবল আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সমাজের সকলকে কাজ করে যেতে হবে। নিজেদের মধ্যে বিভক্তি বাড়ানো তথা নারীকে পুরুষের বিরুদ্ধে বা পুরুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ গণ্য করবার চেষ্টা নয়, বরং নারীকে পুরুষের পাশাপাশি, সমান মর্যাদায় দেখতে পারতে হবে। আমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেয় এমন সমাজ চাই।
 
সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা – এই ত্রৈমাত্রিক চেতনার নিরিখেই সমাজে নারীর অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও আমাদের মহান সংবিধান, কোথাও নারীর প্রতি বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। বরং একটি মুক্ত, স্বাধীন, সাম্যবাদী সমাজ গঠনের চেতনা বাংলাদেশের নারী-পুরুষ সকলকে সম্মিলিত করেছে ‘মুক্তির পতাকায়’! এমডিজিতে বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে ভাল করলেও নারীর ক্ষমতায়ন তথা মাতৃ মৃত্যুহার কমিয়ে আনা ও নারী-পুরুষ বৈষম্য হ্রাসে কাঙ্খিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। আমরা এখন এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করছি। এসডিজি অর্জন করতে হলে সর্বস্তরে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ ও ‘নারী-পুরুষের বৈষম্য হ্রাস’কে অন্যতম অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকাকে ‘নারীবান্ধব’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সকলকে উদার মানসিকতায় এগিয়ে আসতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদকে এ লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে, একটি সুখী ও আনন্দময় সমাজ গড়ে তুলতে চাইলে সমাজে নারী ও পুরুষ সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নির্ভরশীলতার সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে। ডান হাতের সাথে বাম হাতের যে সম্পর্ক সেই রকম একটা প্রীতিময় সম্পর্ক নিশ্চিত করা চাই। সংসারের কর্তৃত্ব কার হাতে সেটা বড় নয়, বরং সংসারটা কতখানি আরামের, সেই সংসারের সদস্যরা কতটা পারস্পরিক বন্ধনে জড়িয়ে আছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।  এমন অনেক সংসার আছে যেখানে নারীর হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত কিন্তু সেখানে মমতা ও প্রীতির বদলে স্বৈরতন্ত্র বিরাজমান।

স্বৈরাচারী কর্তৃত্বের এমন সংসার কেবল বিষময় নয়, পুরোটাই বাসের অযোগ্য! ভালবাসার সংসারে আর্থিক অভাব থাকলেও তা বাসযোগ্য হয়। কিন্তু ভালবাসাহীন কর্তৃত্ববাদী সংসারে অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও সেখানে দম বদ্ধ হয়ে আসে। পরিবারের প্রিয় মানুষগুলো তখন নিজেকে বাঁচাতে পালাতে চায়, শেষ পর্যন্ত অনেকেই পালিয়ে যায়, আজ নয়তো কাল। আবার অনেকেই নীরবে চোখের পানিতে বুক ভাসায়, তারপর নীরবেই হারিয়ে যায়। এখানে নারী বা পুরুষ আমার কাছে প্রধান বিবেচ্য নয়। কর্তৃত্ববাদ, একচেটিয়াতন্ত্র, স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবই মুখ্য বিষয়। একটি শান্তিকামী সমাজে সামন্তযুগীয় একচেটিয়া কর্তৃত্বের বর্বরতার অবসান করাটাই আসল কথা।

দোষে-গুণে মানুষ। সংসারে আমাদেরকে মানিয়ে চলতে হয়। পরস্পরকে বুঝতে চেষ্টা করতে হয় পরম মমতায়। কিন্তু ভালবাসাকে যারা পোষাকী ভাবেন তাদের কাছে ঈষৎ ময়লা, একটু ছেঁড়া কিংবা একটু পুরনো পোষাক আর পরিধেয় থাকে না। অথচ সংসার সুখময় করতে হলে পরস্পরের মধ্যে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সাহায্য চাই, যা আছে তাই নিয়ে সুখী হওয়া চাই। আরও বেশি করে চাই বন্ধুত্ব। যদিও প্রেম ও বন্ধুত্বের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বন্ধুত্ব বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম বলিলে দুই জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, যার জগৎ নাই। দুই জনেই দুই জনের জগৎ।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।

আমি সেই ‘ক্ষমতায়ন’ চাই না যা আমাকে আরাম থেকে বঞ্চিত করে। আমি এমন বাসস্থান চাই যেখানে সুখের দেবতা আসতে পারে পরম নির্ভরতায়। এখানে রাজা হওয়া বা ফকির হওয়াটা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সুখী হওয়া, আরাম পাওয়া। আমরা এমন একটা সমাজ চাই যেখানে আরামে বাস করা যায়। ‘একচেটিয়াতন্ত্র’ দিয়ে পরিচালিত সমাজ সেটা কার দ্বারা শাসিত হচ্ছে, নারী নাকি পুরুষ তাতে কি এসে যায়! আমেরিকার বর্তমান রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প নারী নাকি পুরুষ সেটা বিবেচনার চাইতে আমাদের কাছে বরং বেশি বিবেচ্য যে তিনি এবং তাঁর সরকার ‘যুদ্ধবাজ’। ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ‘জেরুজালেম’কে স্বীকৃতি দিয়ে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ বাঁধানোর ষড়যন্ত্র সম্পন্ন করেছেন। এই স্বৈরাচারী আধিপত্য বিশ্বের কোন শান্তিকামী’র কাম্য নয়। আমাদেরও নয়। আমরা সংসার থেকে শুরু করে সরকার, সর্বত্র উদারতা ও সংহতি চেতনার অনন্য উচ্চতায় পরিশীলিত নেতৃত্ব চাই।

অনেক কথা আছে, সঙ্গত কারণেই আমাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে হয়। সব সত্য সরাসরি বলা বা প্রকাশ করা যায় না। তাতে বিপদ বাড়ে, সংঘাত বৃদ্ধি পায়। উসকানী পায় অন্ধকারের অপশক্তি। স্বৈরতন্ত্রকে আমরা সকলেই ঘৃণা করি কিন্তু তার সাথেই আমাদের বসবাস! এই বৈপরীত্য, এই অচলায়তনের শেষ কোথায় আমি জানি না। তবে মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্রবিরোধী মনোভাব বলিষ্ঠ হচ্ছে সেটা আমাদের জন্য একটা ভাল সংবাদ। স্বৈরাচার নিপাত যাক, সমতা প্রতিষ্ঠা পাক – এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের দেশ শান্তি, সমতা ও গণতন্ত্র সুসংহত করার পথে এগিয়ে যাক এই কামনা করছি।

গত ১০ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হলো ‘বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। এই দিবসকে সামনে রেখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘দারিদ্র্য বিমোচন ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিতকরণে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশন। জাতীয় সংসদের সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ (এপিপিজি’স) এবং বেসরকারী সংগঠন আমার অধিকার ফাউন্ডেশন ও অক্সফ্যাম এর উদ্যোগে দিনব্যাপী এই কনভেনশনে একটি দারিদ্র্যম্ক্তু বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। দারিদ্র্য অবসান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আকাঙ্খা। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা, ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্যের দর্শন বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায় যে ‘স্বাধীনতা’ বলতে তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং ‘মুক্তি’ বলতে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির কথা বলেছিলেন। শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোন মূল্য থাকে না, যদি দারিদ্র্য থেকে মুক্তি অর্জিত না হয়।

আমরা সবাই জানি, ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু’র জন্মের শত বছর পূর্ণ হবে। আর ২০২১ সালে পূর্ণ হবে মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর। দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে না পারলে কোন মুখে আমরা মহানায়কের জন্ম শতবার্ষিকী পালন করব? কিভাবে আমরা উদযাপন করব মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী? মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের দেশে দারিদ্রের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। সরকারী হিসেবে এটা এখন প্রায় ২৩ শতাংশ। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে দারিদ্র্য কমেছে এটা সত্য। কিন্তু এটাও তো সত্যি যে বাংলাদেশের প্রতি ৫ জনে একজন এখনও দরিদ্র?

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আগামী ২০২১ সালের বাংলাদেশ কেমন হবে তা অনেকাংশে নির্ভর করছে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ কিভাবে, কোন অগ্রাধিকার নিয়ে কাজ করছে তার উপর। বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কাজের সামষ্টিক অর্জন প্রতিফলিত হবে আগামী ২০২১ সালে। সরকার ঘোষিত ‘রূপকল্প ২০২১ অর্জন’ তথা একটি দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের জন্য ‘উর্দ্ধমুখী’ তথা ‘বটম আপ’ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দু হবে ইউনিয়ন পরিষদ। দারিদ্র্যমুক্তির জন্য ইউনিয়ন পর্যায় থেকে নারীকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘সমতাভিত্তিক’ সমাজ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হলে সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ, উচ্চ মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন ‘উন্নত বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। দারিদ্রের কাছে পরাজয় নয় বরং নিজেদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে যেন দারিদ্র্য মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেই প্রেরণা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে টাকার অভাব রয়েছে বলিলে সবটুকু বলা হয় না। আমাদের রয়েছে ভরসার অভাব।’ ২০২১ সাল সন্নিকটে। কাজ শুরু করতে হবে এখনই। সমতাভিত্তিক, দারিদ্র্যমুক্ত ও সকলের জন্য সমান সুযোগের বাংলাদেশ গঠন করা হয়তো কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। মনে ভরসা রেখে এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখবেন, মুক্তিকামী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘শেষ না করা পর্যন্ত যে কোন কাজই অসম্ভব মনে হয়’। অনেক দাম দিয়ে কেনা বিজয়ের নেপথ্যে সকল শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা, সকল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং নানাভাবে আত্মদানকারী সকল সংগ্রামী সাথীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
-০১৭১১৫২৬৯৭৯

এই বিভাগের আরো খবর

বৃক্ষ নিধন নয়, রোপণ করুন

মোঃ মামুন-উর-রশিদ:আমাদের জীবনে ও আমাদের পরম বিশ্বস্ত বন্ধু গাছপালা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গাছ থেকে প্রাপ্ত কাঠ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য। যা আমাদের জীবনে নিত্যনৈমিত্তিক হয়েছে। তা ছাড়া আমাদের রান্না-বান্নার জ্বালানি হিসেবে প্রচুর কাঠ ব্যবহার হয়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে অধিক পরিমাণে কাঠের ব্যবহার বনভূমি উজাড় করছে দ্রুত গতিতে। ফলে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কার্বন-ডাই- অক্সাইড এর পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। প্রভাব ফেলছে জলবায়ু পরিবর্তনে। সুতরাং এটাই মোক্ষম সময় কাঠের বিকল্প কিছু খোঁজা, যাতে মানুষ অধিকহারে কাঠের ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে।  


পাশাপাশি যেহেতু গাছপালা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় মূখ্য-ভুমিকা রাখে, তাহলে সর্বনি¤œ ২৫% গাছ যাতে বর্তমান থাকে সেক্ষেত্রে আমাদের বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবতে হবে। যদিও বনভূমির উপর যাদের জীবন নির্ভর করে তাদের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। তবে সামগ্রিক চিন্তায় সারা বিশ্বের মানুষ, বন্যপ্রাণী, সামুদ্রিক মৎস্য রক্ষা ও মরুময়তা কমাতে আরও অধিকহারে বৃক্ষ লাগানো প্রয়োজন।  
কারণ বাংলাদেশে কৃষি জমি-সম্প্রসারণ ও বাসা-বাড়ি নির্মাণ এবং নির্মাণ সামগ্রির প্রয়োজনে অধিক হারে গাছ-পালা নিধন হলেও সে হারে বৃক্ষ রোপণ হচ্ছে না। যদিও গাছ রোপণ সম্পর্কে শ্লোগান পরিবর্তন হয়েছে তাই আগের শ্লোগান ছিল-
“বেশী করে গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান” তা বর্তমানে হয়েছে, “আপনি একটি গাছ কাঁটলে কমপক্ষে চারটি গাছ লাগাতে হবে।”


একটি ছোট দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি হওয়ায় দেশের জনগণের অধিক পরিমাণে আসবাবপত্র, সংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদা বেড়ে গিয়েছে কয়েকগুণ যদিও সে হারে বাংলাদেশে গাছের সংখ্যা বাড়েনি। এছাড়া এ বিপদ থেকে দেশের মানুষ, প্রাণী ও জলবায়ুকে রক্ষা করতে তেমন কোন গবেষণাও হয়নি এ পর্যন্ত। যাতে গাছের বিকল্প হিসাবে আমরা কৃষিজাত পণ্য যেমন- ধান ও গমের নাড়া, বিভিন্ন গাছ পাট ও ধৈন্চার খড়ি, নলখাগড়া ইত্যাদি জাতীয় ফেলনা অংশ গাছের বিকল্প অংশ ব্যবহার করে আসবাবপত্রসহ অন্যান্য ব্যবহারিক জিনিসপত্র তৈরি করতে পারা যায়। যা হতে পরিবেশ বান্ধব। রক্ষা পাবে আমাদের সীমিত পরিমাণ বনভূমি।


অন্যদিকে আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠী কৃষককূলরা লাভবান হবে বেশি বেশি। উৎসাহিত হতে কৃষকরা কৃষি কাজ করতে। কৃষকদের গাছপালার ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প সন্ধানে উৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি বিকল্প হিসেবে অন্যান্য কৃষি উৎপাদনের মধ্যে পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদি ব্যবহার করতে হবে। অথচ তা না করতে পারলে এ বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদার জন্য ৯৪% ভাগ গাছ পালা থেকে প্রাপ্ত কাঠ ব্যবহার করা লাগতো।


আসবাবপত্রগুলো কাঠ দিয়ে না তৈরি করে বিকল্প হিসাবে শন, বেতের দ্বারা তৈরি হতে পারে। যেগুলো হতো হালকা, বহনযোগ্য এবং সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব, রুচিশীল এবং সহজে নষ্ট না হওয়া বা ভেঙ্গে না যাওয়া বা কীটপতঙ্গ সহজে নষ্ট করতে না পারা ইত্যাদি। যদিও ইতিমধ্যে দেশের জন্য প্লাষ্টিকের স্ট্রলি বা লোহার তৈরি জিনিসপত্রকে কাঠের তৈরি জিনিসপত্রের বিকল্প হিসাবে নিতে শুরু করেছে। যদিও প্লাষ্টিকের তৈরি স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বান্ধব নয়।


তাছাড়া কাঠ ব্যবহার করে বাড়ির ভিতরে অবকাঠামো তৈরি করতে নিরুৎসাহিত করতে হবে। পাট বা বাঁশের তৈরি দ্রব্যাদি বাড়ির ভিতরে ব্যবহারে জনসাধারণকে বুঝাতে চেষ্টা করতে হবে। কারণ এর ব্যবহার অপেক্ষাকৃত কম  ব্যয় বহুল, পরিবেশ বান্ধব তো বটেই। বাড়ির ভিতরের পরিবেশ পাবে নতুন এটা আবহ জলবায়ুর পরিবর্তন, তাপমাত্রায় তারতম্য, অধিক হারে গাছপালা নিধন, বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আজ প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ হ্রাস করছে।


আগের দিনে আমাদের চারপাশে অধিক গাছপালা, ঝোপঝাড় ছিল। ফলে তখনকার দিনে সীমিত জনসংখ্যায় জ্বালানি তেমন সমস্যা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে অধিক জনসংখ্যার জন্য বর্ধিত পরিমাণ জ্বালানি সংস্থান হচ্ছে না। ফলে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বেশি বেশি গাছপালা কাটতে হচ্ছে। অপরপক্ষে ইটভাটা, কলকারখানা, তামাক পোড়ানোসহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে কাঠের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে গাছপালার পরিমাণ কমে যাওয়ায় মানুষকে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করার জন্য তৎপর হতে হচ্ছে। খুঁজতে হচ্ছে বিকল্প জ্বালানি উৎস।
বর্তমানে জ্বালানির বিকল্প হিসাবে মহিলারা গোবর দিয়ে লাকড়ি বা মুইঠা তৈরি করেন। এতে গ্রামের মানুষের কিছুটা জ্বালানি চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে। তাছাড়া গোবর থেকে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করে জ্বালানির চাহিদা পূরণ করছে। যা রান্নার কাজে জ্বালানি ও বিদ্যুতের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এ  জন্য বাণিজ্যিক হারে গবাদিপশু পালন শুরু হয়েছে। অধিক হারে বৃক্ষ নিধনকে রক্ষা করতে হলে বিকল্প জ্বালানি অনুসন্ধান জরুরি। অন্যথায় আরও মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় হতে পারে।


সুতরাং উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে বৃক্ষ রোপণ এর কোন বিকল্প নেই। রাস্তার দু’পাশে উঁচু পাহাড়, নদী তীরবর্তী এলাকায় সাগরের উপকূলে অধিক পরিমাণে বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। ফলে বনজ সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং পাশাপাশি বন্য প্রাণী রক্ষা করা সম্ভব। তাছাড়া অধিক হারে বৃক্ষ রোপণের ফলে নদী ভাঙন রোধ করা সম্ভব। যা রক্ষা করত নদীতীর সংলগ্ন অবহেলিত ও গরিব জনপদ। অতএব জনগণকে আরও বেশি পরিমাণ বৃক্ষ রোপণে উৎসাহিত করতে হবে। হারানো বৃক্ষ রাজীর পরিমাণ কমিয়ে শূন্যতা পূরণ করতে হবে। তাই জ্বালানি আসবাবপত্র এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে কাঠের ব্যবহার কমাতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ বা সৌর শক্তিকে বেশী করে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়ে গাছপালার উপর চাপ কমাতে হবে।


তাছাড়া চোরাই পথে কাঠ পাচার ও বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ, আইন পাশ ও তার প্রয়োগ যথাযথ করতে হবে। সর্বোপরি, আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় অধিক হারে বৃক্ষ রোপণ করা এবং বনজ সম্পদ উন্নয়নে কাজ করতে হবে। তাতে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা পাবে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আসবে। আসুন সবাই মিলে এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য রূপে আবার গড়ে তুলি। সমস্বরে বলে উঠি, লও সে নগর, দাও সে অরণ্য।

লেখক: সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
০১৭১১-০১০১২১
mamun_bd1976@yahoo.com

এই বিভাগের আরো খবর

মহানবি (সা.) এর আগমনের তাৎপর্য এবং তার গুণাবলী

মাওলানা মো: রায়হানূর রহমান :পবিত্র কুরআনে মহানবি (সা) এর আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ‘আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের জন্য রাসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদেরকে আল্লাহর বাণিসমূহ তিলাওয়াত করে শোনান, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত (প্রজ্ঞা)।’ (সূরা আলে-ইমরান ঃ ১৬৪)। কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক আসবে তিনি সকলের নবি। ‘এই রাসূল প্রেরিত হয়েছেন অন্য আরো সেসব লোকদের জন্য যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি।

’ (সূরা আল জুমআ ঃ ৩)। ‘বলুন, হে লোক সকল ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’ (সূরা আ’রাফ ঃ ১৫৮)। সকল মতবাদ-মতাদর্শের উপর দীন ইসলামের বিজয় আনয়ন করা ঃ ‘তিনি সেই সত্তা যিনি তার রাসূলকে প্রেরণ করেছেন সত্য দীন সহকারে যেন তিনি সেটাকে সমস্ত দীনের উপর বিজয়ী করেন।’ (সূরা ফাতহ ঃ ২৮+ সূরা সফ ঃ ৯)। ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের প্রতি রাসূল প্রেরণ করেছি এই নির্দেশনা দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করবে এবং তাগূতকে বর্জন করবে।’ (সূরা আন-নাহল ঃ ৩৬) ।

 
মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করা ঃ ‘হে নবি আমি আপনাকে সাক্ষী দাতা, সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তার দিকে আহবায়করূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আহযাব ঃ ৪৫-৪৬)। ‘আপনি উপদেশ প্রদান করুন, আপনি তো কেবল উপদেশ দানকারী,তাদের উপর জবরদস্তকারী নন।’ (সূরা আল গাশিয়াহ ঃ ২১-২২)। ‘সেই নবির গুণ এই যে, তিনি তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেন, আর পবিত্র বস্তুগুলিকে তাদের জন্য হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তুগুলিকে তাদের জন্য হারাম করেন। আর তাদের থেকে কঠিন আদেশসমূহ (যা পূর্ববর্তী শরিয়তে ছিল) অপসারিত করেন।’ (সূরা আ’রাফ ঃ ১৫৭) ।


মহানবি (সা) এর প্রতি বিশ্বাসের তাৎপর্য ঃ তিনি সর্বশেষ নবি ও রাসূল ঃ ‘মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষ লোকের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবি । আল্লাহ সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।’ (সূরা আহযাব ঃ ৪০) । মহানবি (সা) ছিলেন মানুষ, ফেরেশতা বা জ্বিন নন ঃ ‘বলুন, আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, নিশ্চয়ই তোমাদের ইলাহই একমাত্র ইলাহ।’ (সূরা আল-কাহফ ঃ ১১০)। ‘তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই এসেছেন আল্লাহর রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের প্রতি মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি ¯েœহশীল ও দয়াময় ।’ (সূরা আত তাওবা ঃ ১২৮)।

]
কারো ভাল-মন্দ করার ক্ষমতা কেবল আল্লাহরই আছে, নবি-রাসূল বা অন্য কারো নেই ঃ ‘আপনি বলে দিন আমি নিজে আমার নিজের জন্য কোন উপকারের ক্ষমতাও রাখি না এবং কোন অপকার করার ক্ষমতাও রাখি না, তবে যা আল্লাহ ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত। আর আমি যদি গায়েব জানতাম তবে তো বহুল পরিমাণে কল্যাণ সঞ্চয় করতে পারতাম এবং কোন ক্ষতিই আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না, আমি তো কেবল ভীতি প্রদর্শনকারী এবং সুসংবাদ প্রদানকারী সেসব লোকদের জন্য যারা ঈমান রাখে।’ (সূরা আ’রাফ ঃ ১৮৮)। নবি (সা) গায়েব জানতেন না ঃ ‘আমি বলিনা যে আমার কাছে আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, আর আমি গায়েবও জানি না। আমি এটাও বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা।’(সূরা হূূদ ঃ ৩১)। তবে তিনি গায়েবের (যেমন: জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি) বিষয়ে যা কিছু বলেছেন, সেটা গায়েবের খবর মাত্র, যা আল্লাহ পাক ওহির মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দিয়েছেন। ‘এগুলো হচ্ছে গায়েবের খবর যা আমি আপনার কাছে প্রত্যাদেশ করেছি।’ (সূরা আলে-ইমরান ঃ ৪৪) । ‘আপনি জানতেন না কিতাব কী আর ঈমান কী ?


 বরং আমি এটাকে আলোকবর্তিকা বানিয়েছি, যার মধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করি।’ (সূরা আশ শূরা ঃ ৫২)। ‘বলুন আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার কাছে আমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশ হয়।’ (সূরা আ’রাফ ঃ ২০৩) । ‘আর তিনি তো নিজের থেকে কিছু বলেন না, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় কেবল সেটাই বলেন।’ (সূরা আন-নাজম ঃ ৩-৪)। হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা) বলেছেন : আমি তো একজন মানুষ। দ্বীন সম্পর্কে যখন তোমাদের আমি কোন আদেশ দেই, তখন তোমরা তা পালন করবে, আর যখন কোন পার্থিব কথা আমি আমার মতানুসারে বলি, তখন তো আমি একজন মানুষ। (মুসলিম ঃ ৫৯১৫)। অপর বর্ণনায়, রাসূল (সা) বললেন : ‘তোমাদের দুনিয়াবী বিষয়ে নিজেরাই ভালো জানো।’ (মুসলিম ঃ ৫৯১৬)। আয়েশা রাঃ সহ অন্তত দশজন সাহাবী থেকে বর্ণিত। কিয়ামতের দিন কিছু লোককে রাসূল (সা) এর হাউজে কাওসারের কাছে যেতে বাঁধা দেয়া হবে। রাসূল (সা) তাদের চিনতে পেরে বলবেন, এরা তো আমারই উম্মত। তখন তাকে বলা হবে : আপনি জানেন না, আপনার পরে তারা কী আমল করেছিল ? তিনি বলবেন: দূর হয়ে যাও, দূর হয়ে যাও, যারা আমার পরে দীনকে বিকৃত করেছ।’ (মুসলিম ঃ ৫৭৬৮)। সুতরাং রাসূল (সা) গায়েব জানেন বা তিনি হাজির-নাজির (উপস্থিত এবং সবই দেখেন) এরূপ ধারণা করা ঠিক নয়।


রাসূল (সা) এর চারিত্রিক গুণাবলী ঃ ‘আর অবশ্যই আপনি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।’ (সূরা ক্বলম ঃ ৫)। ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব ঃ ২১)। আনাস ইবনে মালিক রাঃ বলেন : রাসূল (সা) ছিলেন সকল মানুষের মধ্যে সুন্দরতম, সর্বাধিক দানশীল এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বীর (সাহসী)। (মুসলিম ঃ ৫৮০১)। আমি দশ বছর রাসূল (সা) এর খিদমত করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে কখনো উহ্ শব্দটুকুও বলেননি এবং কোন সময় আমাকে এটা করনি কেন, এটা করলে কেন এভাবে বলেননি।’ (মুসলিম ঃ ৫৮০৫)। ‘রাসূল (সা) মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। (মুসলিম ঃ ৫৮১০)। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) বলেন: রাসূল (সা) এর কাছে কেউ কিছু চাইলে তিনি কখনো ‘না’ বলতেন না। (মুসলিম ঃ ৫৮১১)। আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূল (সা) পর্দানসীন কুমারীর চেয়েও বেশী লজ্জাশীল ছিলেন। আর তিনি কোন কিছু অপছন্দ করলে আমরা তার চেহারা দেখে অনুভব করতাম। (মুসলিম ঃ ৫৮২৫)। আয়েশা (রা) বলেন: যখন রাসূল (সা) কে দু’টো বিষয়ের কোন একটি গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেয়া হতো তখন তিনি অধিকতর সহজটি গ্রহণ করতেন, যদি না তা পাপের কাজ হতো। আর যদি তা পাপের কাজ হতো তবে তিনি তা থেকে সকলের চেয়ে অধিক দূরে থাকতেন। তিনি নিজের জন্য কোনদিন প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি, তবে মহীয়ান ও গরীয়ান আল্লাহর (বিধান লংঘন করে) মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হলে (তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন)। (মুসলিম ঃ ৫৮৩৮)। রাসূল (সা) নিজ হাতে কোনদিন কাউকে মারেননি, কোন স্ত্রীলোককেও না, কোন খাদিমকেও না, আল্লাহর পথে জিহাদ ব্যতীত। আর যে তাকে নির্যাতন করেছে, নিপীড়ন করেছে, তিনি তার থেকেও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। (মুসলিম ঃ ৫৮৪২)। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কখনো অশালীন কথা বলতেন না। (বুখারি ঃ ৫৮০০)।

 

গুণবাচক নামসমূহ ঃ জুবাইর ইবনে মুত্বঈম রাঃ সূত্রে। রাসূল (সা) বলেন, আমি মুহাম্মাদ (প্রশংসিত), আমি আহমাদ (অধিক প্রশংসাকারী), আমি আল-মাহী (বিলুপ্তকারী) আমার মাধ্যমে কুফরকে বিলুপ্ত করা হবে। আমি আল-হাশির (একত্রকারী) আমার পিছনে লোকদেরকে একত্র (সমবেত) করা হবে। আমি আল-আকিব (সর্বশেষ) আমি ঐ ব্যক্তি যার পরে আর কোন নবী নেই। আল্লাহ আমার নাম রেখেছেন রাঊফ (¯েœহময়) ও রাহীম (দয়াবান) । (মুসলিম ঃ ৫৮৯৫)।
রাসূল (সা)-এর ইবাদত বন্দেগী ঃ ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সঙ্গিসাথীরা কাফেরদের প্রতি অতিশয় কঠোর এবং পরস্পরের প্রতি অতিশয় দয়াশীল। তুমি যখন তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে দেখবে যে, তারা কখনো রুকু করছে এবং কখনো সিজদা করছে। তারা আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ এবং সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের চেহারায় নিদর্শনাবলী দীপ্তিমান রয়েছে তাদের সিজদার চিহ্নসমূহ।’ (সূরা ফাতহ ঃ ২৯)।  আয়েশা (রাঃ)  বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন সালাত আদায় করতেন তখন এমনভাবে কিয়াম করতেন যে, তার পদযুগল ফুলে ফেটে যেত। এ দেখে আমি তাকে বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এরূপ করছেন অথচ আপনার পূর্বাপর সমূদয় বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন, হে আয়েশা! আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না ? (বুখারি ঃ ১১১৮, মুসলিম ঃ ৬৮৬৫)।


আমাদের করনীয় ঃ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর রাসূল তোমাদেরকে যা আদেশ করেন তোমরা তা পালন কর এবং তিনি যা নিষেধ করেন তোমরা তা বর্জন কর।’ (সূরা হাশর ঃ৭)। ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহর ভালবাসা পেতে চাও তাহলে আমার (রাসুলের) অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন, আর তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন, আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু ।’ (সূরা আলে-ইমরান ঃ ৩১)। ‘অতএব, যারা এই নবির প্রতি ঈমান আনয়ন করে এবং তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করে এবং সেই নূরের (কুরআনের) অনুসরণ করে যা তার প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে, এরূপ লোকেরাই পূর্ণ সফলকাম হবে।’ (সূরা আ’রাফ ঃ ১৫৭)। ‘রাসূল (সা) বলেছেন : আমি তোমাদের যা থেকে নিষেধ করেছি তোমরা তা থেকে বিরত থাক এবং যা তোমাদের আদেশ করেছি, তা তোমাদের সাধ্য অনুসারে পালন কর। (মুসলিম ঃ ৫৯০২)। আবু কাতাদা আনসারী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ঐ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং ওই দিন আমার উপর কোরআন নাযিল হয়েছে (মুসলিম ঃ ২৬২১)। রাসূল (সা) এর আগমন উপলক্ষে কিছু করতে চাইলে সোমবারে রোজা রাখা যেতে পারে। আর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল সত্যিকারের মুমিন হওয়া যাবে ।
লেখক ঃ সহকারী শিক্ষক, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন  
পাবলিক স্কুল ও কলেজ , বগুড়া।
rrahman.rr75@gmail.com
০১৭৩৯-৮৫০৬৫৬

এই বিভাগের আরো খবর

দুর্বল ভিত্তির ওপর সুউচ্চ ইমারত হয় না

মোহাম্মদ নজাবত আলী:আমাদের সংবিধানে শিক্ষা ব্যবস্থা হবে অভিন্ন, এমন কথা উল্লেখ রয়েছে অর্থাৎ সর্বজনীন গণমুখী শিক্ষার কথা বলা আছে। যেখানে একই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে, কোনো বিভাজন থাকবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি কিন্ডার গার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম সহ আরও নানা ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। যে সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, অথচ সংবিধানের অনেক দিক নির্দেশনা দৃশ্যমান নয়, উপেক্ষিত।

প্রকৃতপক্ষে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভাজন তৈরি করা হয়েছে অথচ সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি যা দেশের মূল শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে জড়িত। মাধ্যমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এ সমস্ত সিংহভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় থেকে পাশ করছে। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে না। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে শিক্ষাবিদ গবেষকরা বর্তমান শিক্ষার গুণগত মানকে দায়ী করেছেন। শিক্ষার গুণগত মান ভালো না হওয়ার অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে নোট বই, প্রাইভেট, প্রশ্ন ফাঁস কোচিং বাণিজ্যকে দায়ী করেন।

 শিক্ষা গবেষণায় উঠে আসা কারণগুলো যে, অকারণ তা নয় বরং বহুলাংশে সঠিক। কারণ বর্তমান সরকার যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছেন তাতে নোট গাইড, কোচিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে এ জন্য যে, তাতে শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীর বোধগম্যতা, সৃজনশীলতা, মেধা বিকাশে বাধা, কেননা মুখস্থ বিদ্যা পরিহার করে শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ ঘটানোর জন্য সৃজনশীল পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। সনাতন পদ্ধতি পরিহার করে যখন নতুন এক ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলো তখন দেশবাসী শিক্ষিত বিশিষ্টজনরা সাধুবাদ জানায়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে এ পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

শত ভাগ পাশ, নোট গাইড, প্রশ্ন ফাঁস, কোচিং বাণিজ্য, ভর্তি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয় ইত্যাদি কারণে এ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। সম্প্রতি বিশিষ্ট জন, শিক্ষাবিদরা বর্তমান ৩০ নম্বর এর বহু নির্বাচনী প্রশ্ন বাতিলের ও পরামর্শ দেন। কারণ অনেক সময় পরীক্ষার হলে বাইরে থেকে এ ৩০ নম্বরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর সাপ্লাই দেয়া হয় পরীক্ষার্থীর কাছে। একটি শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি নানা ধরনের নেতিবাচক দিক থাকে তাহলে সে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কিভাবে ভালো কিছু আশা করা যায় ?

আমাদের শিক্ষার্থীরা মূল বই শ্রেণিমুখী না হয়ে নোট গাইড, প্রাইভেট, কোচিং নির্ভর। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে সৃজনশীলতা অর্জন, মেধার বিকাশ, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা। বর্তমান শিক্ষার্থীরা সেটা অর্জন করবে মূল বই ও শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকদের আলোচনায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, মূখস্থ বিদ্যা নকলের চেয়েও ভয়াবহ। সে ভয়াবহ পথে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর হাঁটছে, কোচিং সেন্টারগুলোতে নোট মূখস্থের মাধ্যমে। উপরšু— নোট গাইড তো রয়েছে।

এভাবে একটি জাতি প্রকৃতপক্ষে কখনো মেধাসম্পন্ন হিসাবে গড়ে উঠতে পারে না। একই সাথে সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যহত হচ্ছে। আমরা অনেক আগে থেকে শুনে আসছি সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিশেষ মনোযোগের জন্য প্রাইভেট কোচিং নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে অর্থাৎ সরকারি বেতন-ভাতাদি পান এমন এমপিওভুক্ত শিক্ষক প্রাইভেট বা কোচিং করাতে পারবে না নিজ বিদ্যালয়ে বা অন্যত্র।

 কিন্তু কবে এ আইন হবে কবে বাস্তবায়ন হবে তা আমরা জানি না। তবে বাস্তবায়ন হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়া দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে এবং একই সাথে শিক্ষার্থীরা বই ও শ্রেণিমুখী হবে বলে অভিজ্ঞ মহল এবং বিশিষ্টজনরা মনে করেন। কারণ শিক্ষাকে এক শ্রেণির অতি মুনাফালোভী শিক্ষক, কর্মকর্তা, নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত সারা বছর প্রাইভেট, কোচিংয়ের লোভনীয় ফাঁদে ফেলেছে শিক্ষার্থীদের, যার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থা বাণিজ্যকরণ হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা অনিয়ম, দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত। বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, নকল, খাতা অবমূল্যায়ন, শ্রেণি কক্ষের পড়ালেখা, গাইড, শিট, টিউশনী, কোচিং সেন্টারে। প্রশ্ন প্রণয়নে ভুল, ইত্যাদি অপকর্মের সাথে জড়িত ছাত্রলীগের এক শ্রেণির নেতা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরেও চলছে এ অনিয়ম, দুর্নীতি। সরকার এখনও কোচিং সেন্টার, নোট গাইড বন্ধ করতে ও প্রশ্ন ফাঁস হোতাদের চিহ্নিত বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারাটা কি এক ধরনের ব্যর্থতা নয় ?


দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও নন-এমপিওভুক্ত বেশ কয়েকজন শিক্ষক আমাকে মোবাইলে অনুরোধ জানিয়েছেন তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে লিখতে। নন-এমপিও শিক্ষকরা তাদের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে লেখার অনুরোধ জানিয়েছেন। উপরোন্ত আমার লেখা অনিয়মিত হওয়ার কারণও জানতে চেয়েছেন। আমি তাদের এই বলে আশ্বস্ত করেছি সবার অনুরোধ যেমন- রক্ষা করা কঠিন তেমনি পত্রিকা কর্তৃপক্ষের ওপর লেখা ছাপানো নির্ভর করে।

যা হোক, আমি ব্যক্তিগতভাবে পেশায় একজন বেসরকারি শিক্ষক। প্রায় সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হয়। তবুও এর ফাঁকে অনেক কষ্ট করেও গভীর রাতঅবধি লেখার খসড়া তৈরি করি। আমি যেহেতু বেসরকারি শিক্ষক তাই স্বাভাবিকভাবে শিক্ষকদের প্রতি আমার সহানুভূতি রয়েছে। আমিও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কোনো কিছুর ভিত যদি দুর্বল হয় তাহলে তা টেকসই হয় না।

 হঠাৎ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। বেসরকারি শিক্ষকদের যে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে তা শক্ত মজবুত নয়। দুর্বল ভিত্তির ওপর সুউচ্চ ইমারত হয় না। আমরা যারা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত আর্থিক দিক থেকে আমাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি পরিপূর্ণভাবে। এখনো বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত ও আর্থিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত বেসরকারি শিক্ষকরা। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রী মহোদয় একজন সজ্জন ব্যক্তি এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি এখনো শিক্ষা ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম, শিক্ষকদের দুর্ভোগ, শিক্ষার মান বাড়ানোর বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেননি। সময়ের পরিক্রমায় যুগের পরিবর্তনে নানা সময়ে বিভিন্নভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ও সংস্কার বাধিত হয়। একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নানা ধরনের অনিয়ম রয়েছে। প্রশ্নফাঁস, কোচিং বাণিজ্য, পিইসি, জেএসসি, জেডিসি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা, অতিরিক্ত সিলেবাসের বোঝা শিক্ষার্থীদের সইবার সক্ষমতা কতটুকু রয়েছে ?


শিক্ষাক্ষেত্রে নানা অনিয়ম, শিক্ষকদের শুধু আর্থিক সংকটই নয় সামাজিকভাবেও শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় প্রতিনিয়ত। স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য, রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার খবর আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখি। উন্নত ও সভ্য রাষ্ট্রগুলোতে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অতি গুরুত্ব দেয়া হয়। একদিকে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়ম, বিশৃঙ্খলায় যোগ্যতা ও মেধা সম্পন্ন শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে না অন্যদিকে শিক্ষকদের আর্থিক দৈন্যতা এ দুটো বিষয় দুর্বল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই দুর্বল ভিত্তির ওপর কোনো টেকসই ইমারত তৈরি করা যায় না। আমাদের সরকারের বিভিন্ন কর্তা ব্যক্তিরা প্রায় একটি কথা গর্বের সাথে উচ্চারণ করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলতে চান।


 শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে, কথাটা ঠিক। কিন্তু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ২০-২৫ বছর শিক্ষকতা পেশায় জড়িত এমন দক্ষ, অভিজ্ঞ, শিক্ষকের বেতন ১৬ হাজার স্কেলে কেন ? এ স্কেলে বেতন পায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণি পাশ একজন পিয়ন বা দপ্তরী। আর সরকারি হাসপাতালের একজন নার্সের বেতন ১৬ হাজারের চাইতেও অনেক বেশি। একজন শিক্ষক যদি একজন পিয়নের স্কেলে, একজন নার্সের স্কেলের চেয়ে কম বেতন পান তাহলে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১৬ হাজার স্কেলের অন্তর্ভূক্ত যে সমস্ত শিক্ষক আছেন তাদের অপরাধ কি ? আমার বিবেচনায় তাদের অপরাধ দু’টি। তারা বি.এড প্রশিক্ষণের আগেই টাইম স্কেল নিয়েছেন অথবা বেসরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। সরকারি অনুমোদিত বেসরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড সনদের যদি কোনো মূল্যায়ন না হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে অনুমোদন দেয়া হলো কেন ?

 আর প্রশিক্ষণের আগেই টাইমস্কেল নিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল যে, তাকে ১৬ হাজার স্কেলে পড়ে থাকতে হবে। সরকার বা শিক্ষামন্ত্রীর এ দ্বৈতনীতি ও বিভিন্ন অনিয়ম শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। এখনো বেসরকারি শিক্ষকরা শতভাগ বোনাস পান না। বরাদ্দ নেই বৈশাখী ভাতা ও প্রবৃদ্ধি। অন্যদিকে ননএমপিও শিক্ষকদের অবস্থা তো আরও খারাপ। তারা যুগের পর যুগ বিনা বেতনে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন অথচ পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। একটি সভ্য সমাজের এ চিত্র হতে পারে না।

তাদের এমন অবস্থা যে, জীবন মরণ সমস্যা। তারা দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৮ বছর চাকুরী করার পর অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, না পারছে চাকুরী ছাড়তে না পারছে অন্য কিছু করতে। এ দীর্ঘ সময়ে শিক্ষার্থীদের সাথে এ সমস্ত শিক্ষকদের একটি স্নেহের সম্পর্ক যোগসূত্র হলেও তারা বেতন ভাতাদি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তাদের অসহায় অন্তর বার বার কেঁদে ওঠে। সরকার তাদের বার বার প্রতিশ্র“তি দিয়েও কোনো ফল হচ্ছে না। তাদের কান্না থামানো যায় না। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে তাদেরও জীবন, সংসার রয়েছে। অন্তত পক্ষে একবারে না হলেও পর্যায়ক্রমে তাদের বেতন ভাতাদির ব্যবস্থা করা সরকারের মানবিক দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।

সভ্য দেশগুলোতে শিক্ষাখাতে বড় ধরনের পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়, একটি সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠি তৈরিতে। কেননা সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠি ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের দেশেও শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু এর সিংহভাগ অর্থের অপচয় হয় শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে। আমরা প্রতিনিয়ত বড় বড় কথা বলি। আইন করে নোট, গাইড, এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করছি।

আমাদের রাষ্ট্রের কথা ও কাজের মধ্যে এক্ষেত্রে কোনো মিল নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কখনো বলতে শুনিনা দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন কাঠামো পুনঃবিন্যাস, বৈষম্য দূরিকরণ ও নন-এমপিও শিক্ষকদের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা। প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি সব শিক্ষকদের এক পর্যায়ে এনে এ পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে শিক্ষার ভিত আরও দুর্বল হবে এবং এ দুর্বল ভিত্তির ওপর সুউচ্চ ইমারত তৈরি সম্ভব নয়।
লেখকঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

এই বিভাগের আরো খবর

ঢাকা উত্তরে উদারতা ও সংহতির চেতনায় উজ্জীবিত উত্তরাধিকার আসুক

আতাউর রহমান মিটন:বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। চারিদিকে লাল-সবুজের বিপুল সমারোহ। আনন্দ-আহলাদে উদ্বেলিত বাঙালি। এরই মাঝে সকলকে অবাক করে দিয়ে গত ৩০ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার, চিরবিদায় নিলেন ‘সবুজ ঢাকা’ গঠনের অন্যতম স্বপ্নচারী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এর প্রথম মেয়র আনিসুল হক। তাঁর মৃত্যুতে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গণমাধ্যম, সর্বত্রই আনিসুল হক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সবাই নিজেদের মত করে স্মৃতিচারণ করছেন, বন্দনা করছেন এক কীর্তিমান মানুষের। প্রতীয়মান হচ্ছে জীবিত আনিসুল হক এর চেয়ে প্রয়াত আনিসুল হক বরং বেশি শক্তিশালী।

সকলকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আমরা যতই এই সত্য ভুলে থাকার চেষ্টা করি না কেন, ‘মরে যেতে হবেই’। সকলকেই বিদায় নিয়ে চলে যেতে হবে শূন্য হাতে। কেউ এই সত্য পাশ কাটিয়ে যেতে পারবে না। খুবই সফল ব্যবসায়ী হয়ে, অনেক ধন-সম্পদের মালিক হয়েও মৃত্যুকে ফেরানো যাবে না। লন্ডনের নাম করা হাসপাতালও কাউকে বাঁচাতে পারে না, যখন মৃত্যুর ডাক এসে যায়! জাগতিক নিয়মেই সবাইকে চলে যেতে হয়! সবাই চলে যায়! আমরাও একদিন চলে যাব সকল মায়া ছিন্ন করে।

আনিসুল হক খুব অসময়ে, অতর্কিতেই চলে গেলেন। এই স্বপ্নচারীর বক্তৃতা, তাঁর অনুষ্ঠান উপস্থাপনা যাঁরা দেখেছেন বা শুনেছেন তাঁরা জানবেন কি দরদী এক মানুষ ছিলেন আনিসুল হক। তিনি নিজে স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ বাতলে দিতেন, প্রয়োজনে দায়িত্ব তুলে নিতেন নিজের কাঁধে। অন্তঃহীন সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা মহানগর নিয়ে তিনি শুধু স্বপ্ন দেখেন নি, শেষ পর্যন্ত নিজের কাঁধে সেই স্বপ্ন পূরণের অসাধ্য সাধনের দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন। সাহসের সাথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন দখলবাজদের বিরুদ্ধে। রাজধানীর যানজট, জলজট, বর্জ্যজট, বিলবোর্ডজট এমনিতর হাজারো সমস্যার কথা সকলেই জানেন। ঢাকায় প্রতি বর্গ কিঃমিঃÑএ প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ বাস করে।

ঢাকা সত্যিই বাসের অযোগ্য একটি শহর কিনা তা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক হয়তো নেই কিন্তু এই শহরকে ঢেলে সাজানো, এই শহরকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করার মত নেতৃত্ব দেবার সাহস ক’জনার আছে? তিনি যেভাবে তেজগাঁ, মোহাম্মদপুর, গাবতলী থেকে যানজট দূর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেই সাহস আর কেউ কি দেখাতে পারবেন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা উত্তরে অরাজনৈতিক কিন্তু জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব আনিসুল হক এর উপর আস্থা রেখেছিলেন। দলের বাঘা বাঘা নেতাদের দিকে না তাকিয়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন একজন মানুষকে যাঁর দু’চোখ ভরা ছিল স্বপ্নে। মেয়র হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাত্র প্রায় দেড় বছর। আওয়ামী লীগের ব্যানারে ভোটে জিতলেও তিনি দলীয় লেজুড়বৃত্তি করেন নি। বরং মেয়র হিসেবে তিনি এমনভাবে কাজ করেছিলেন, যার ফলে মৃত্যুর পরও সর্বস্তরের নগরবাসী তাঁকে হৃদয় দিয়ে আগলে রেখেছে। নিঃসন্দেহে মানুষের মনে তিনি স্থায়ী একটি জায়গা করে নিয়েছেন।

২০১৫ সালের ৬ মে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি উত্তরে অবস্থিত নগরবাসীর আকাঙ্খা পূরণে ছুটে বেড়িয়েছেন। তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন অনেকেই। একটু খেয়াল করলে সকলেই দেখবেন যে, ঢাকা উত্তর সিটি এলাকা একটু একটু করে বদলাতে শুরু করেছিল। প্রভাবশালী দেশগুলোর দূতাবাসের দখল থেকে গুলশানের ফুটপাত মুক্ত করা, ‘ঢাকার চাকা’ নামে বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা থেকে শুরু করে নানাভাবেই তিনি ঢাকা উত্তরকে ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সকলকে সম্পৃক্ত করে কাজ করে যাচ্ছিলেন।

তিনি শুধু আপোষহীনই ছিলেন না, তিনি কাজ করেছেন ক্লান্তিহীন। নিজের প্রতি কোন খেয়াল না রাখার মত বোকামী করে তিনি আজ কোটি হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে গেছেন। সে জন্য আমরা শ্রদ্ধেয় আনিস ভাইয়ের উপর অভিমান রাখছি। কিন্তু আমাদের এই অভিমানে কিছুই যায় আসে না! তাঁর অকাল মৃত্যুতে সবচেয়ে ব্যথিত যে জন, যিনি হারিয়েছেন আমাদের যে কারোর থেকে বেশি, জীবনে এগিয়ে চলার নেপথ্যে যে মানুষটি থেকেছেন ছায়ার মত, যিনি ছিলেন প্রকৃত পরিকল্পনাবিদ, আনিসুল হক এর সেই প্রিয়তম স্ত্রী রুবানা হক নিজের ফেসবুক ওয়ালে যে পোষ্টটি দিয়েছেন সেখানে বর্ণিত হয়েছে,
“যদি জল আসে আঁখি পাতে
একদিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে
তবু মনে রেখো।
একদিন যদি বাঁধা পড়ে কাজে শারদপ্রাতে
তবু মনে রেখো।
যদি পড়িয়া মনে,
ছল ছল জল নাহি দেখা দেয় নয়নকোণে
তবু মনে রেখো”
অবশ্যই ঢাকা উত্তরের মানুষ তাঁদের প্রিয় মেয়র আনিসুল হককে মনে রাখবে। মানুষ তাঁকে মনে রাখবে তাঁরই কারণে। কবি যেমন করে বলেছেন,
“তোমারে যা দিয়েছিনু, সে তোমারি দান –
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়!
হে বন্ধু বিদায়।”

মানুষ বাঁচে ভালবাসায়। জীবিত আনিসুল হক এর চেয়ে প্রয়াত আনিসুল হক এখন অনেক প্রাণবন্ত। সবাই তাঁর গুণকীর্তনে ব্যস্ত। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর কর্মগুণে। সেই ১৯৮০ সাল থেকে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা উত্তরের মেয়র হিসেবে কোটি কোটি মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন এই মানুষটি। মোহনীয় ব্যক্তিত্ব ও মায়াবী হাসিতে ভরা মুখখানি সকলের মানসপটে গেঁথে আছে। ক’জনই বা পারে সেটা! সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, সিটি কর্পোরেশনের ঝাড়–দার, পোশাক শিল্পের কর্মী, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতি কর্মি, সাংবাদিক, দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা তরুণ, মমতাময়ী মা, রাজনৈতিক নেতা, দেশের প্রধানমন্ত্রী সকলেই আজ শোকাহত এই মানুষটির অকাল মৃত্যুতে। ঢাকা উত্তর এখন যেন অভিভাবকহীন। কে পুরণ করবে তাঁর অভাব? কে হবেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এর পরবর্তি মেয়র? শোকের পাশাপাশি এই প্রশ্নটিও এখন নগরীর অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

আইন অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বর থেকে ৯০ দিন, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মেয়র পদে উপ নির্বাচন শেষ করতে হবে।  দেশের অন্যতম শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ এই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। গতবারের মত এবারও দলের শীর্ষ নীতি নির্ধারক ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা দলের ভেতরের কাউকে মনোনয়ন না দিয়ে রাজনীতিতে চমক সৃষ্টি করতে পারেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তিনি একজন নারী প্রার্থীকে গুরুত্ব দিতে পারেন এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।

২০১৫ সালের নির্বাচনে কোন প্রার্থীকেই দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে না হলেও এবার তা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারের শেষ সময়ে অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জনপ্রিয়তা প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেশবাসীর কাছে গণ্য হবে। তাই এখানে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে দলীয় ভাবমূর্তি, সামগ্রিক রাজনৈতিক বিবেচনা এবং আগামী নির্বাচনের কৌশল ইত্যাদি ক্ষমতাসীন দলকে বিবেচনায় নিতে হবে। আনিসুল হক এর মত কোন জনপ্রিয় ব্যক্তি আবারও ঢাকা উত্তরের অভিভাবকত্ব পাবেন কিনা সেটা রাজনৈতিক দলগুলোর উপর নির্ভর করছে। প্রয়াত আনিসুল হক মেয়র হিসেবে যে দৃষ্টান্ত, কর্মদক্ষতার যে উচ্চতা সৃষ্টি করে গেছেন তা সত্যিই পরবর্তি মেয়রের জন্য একটি মাইলফলক, একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

আনিসুল হক মেয়র হিসেবে মাত্র দেড় বছর সময়ে একটি সুন্দর ও সুবজ ঢাকা গড়ে তোলার স্বপ্নই কেবল দেখাননি, বরং স্বল্প সময়ে কয়েকটি স্বপ্নের বাস্তবায়নের ভিত গেড়ে নগরবাসীর মনে আস্থা ও ভালবাসার এক অনন্য উচ্চতা তৈরি করেছেন। ‘গ্রিন সিটি-ক্লিন সিটি’ এখন সকলের চাওয়া। কে সেই চাওয়া পূরণ করবেন সেটাই প্রশ্ন। পরিবর্তনের তথা বদলে যাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, ঢাকার চাকা যেভাবে ঘুরতে শুরু করেছে, একজন ব্যক্তির চলে যাওয়াতে তা যেন থেমে না যায় নগরবাসী সেটা কামনা করেন। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, কিন্তু দলের চেয়ে বড় দেশ তথা দেশের মানুষ। আমরা এমন নেতা চাই যিনি মানুষের হয়ে কাজ করবেন, মানুষের কাছে জবাবদিহি করবেন। ব্যক্তিগত লোভ লালসার উর্ধে থেকে কাজ করতে সক্ষম এমন ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্ব নগরবাসী আবারও দেখতে চান।

মানুষ আসলেই তাঁর স্বপ্নের সমান বড়। মানুষ খাটো হয় তখনই যখন তাঁর স্বপ্ন ছোট থাকে। আনিসুল হক তরুণদের খুব ভালবাসতেন, তরুণদেরকে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করতেন। তিনি তরুণদেরকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার আহ্বান জানাতেন। তিনি উপদেশ দিয়ে বলতেন, ‘গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করে আনিসুল হক যদি মেয়র হতে পারেন তাহলে তোমরা কেন বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখবে না। নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করো। বিশ্ব সেরা হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করার ব্রত গ্রহণ করো, দেখবে তুমি অনেক উঁচুতে পৌঁছে গেছো।’

তরুণদের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তৃতায় তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘তোমাদের সামনে এখন অনেক সুযোগ। তোমাদের মত আমাদের কাছে ইন্টারনেট ছিল না। আমরা বিশ্বকে জানার এত সুযোগ পাইনি। জীবনকে আমরা তখন দেখতে পেতাম না। তোমরা এখন ভবিষ্যত দেখতে পারো। মানুষ পারে না এমন কিছু নেই। তোমরা যদি বড় করে স্বপ্ন দেখতে পারো, তোমরা একদিন ঠিকই বড় হবে। আমিও বেকার ছিলাম কিন্তু আমি কখনই আত্মবিশ্বাস হারায় নি। আমাকে যদি তোমরা সফল ভাবো, তাহলে আমি বলতে পারি তোমরাও সফল হতে পারবে। শুধু আত্মব্শ্বিাসটা হারিও না। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ছিল আমার মায়ের দোয়া। আমার মা সব সময় আমাকে ফুঁ দিতেন, দোয়া করে দিতেন।’  

মেয়র নির্বাচন করার আগেও আনিসুল হক মায়ের কবরে দোয়া নিতে গিয়েছিলেন। সেই তিনি এবার শায়িত হলেন, মায়ের কবরের পাশে। বনানীতে ছোটছেলের কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন আনিসুল হক। বৃদ্ধ বাবার বুকে শোকের পাথর বিদ্ধ করে চলে গেলেন প্রিয় এই মানুষটি। দেশের মানুষ তাঁর জন্য দোয়া করছেন। দৈনিক করতোয়া পরিবারের পক্ষ থেকে আমরাও তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। আনিসুল হক-এর উত্তরাধিকার হিসেবে আমরাও এমন কাউকে চাই, যিনি বিভেদ তৈরি নয়, বরং সম্মিলিত শক্তি ও মেধায় সুন্দর আগামী গড়ে তুলবেন। উদারতা ও সংহতির চেতনায় উজ্জীবিত এক নতুন শহর গড়ে তুলবেন সেটাই আমাদের কামনা।  
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
-০১৭১১৫২৬৯৭৯

এই বিভাগের আরো খবর

দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি

আব্দুল হাই রঞ্জু:সেবা খাতগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ অন্যতম। আর এ খাতের সমৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে শিল্প, কলকারখানা কৃষির সমৃদ্ধি। এখন গোটা বিশ্বের সাথে তালমিলে তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন করতে হলে বিদ্যুতের ব্যবহার ছাড়া অন্য কিছুই কল্পনা করা যায় না। অথচ সেই বিদ্যুৎ খাতটির আশানুরূপ সমৃদ্ধি যেমন আসেনি, আবার এ খাতটি দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার কারণে জনগণের বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের ন্যায় চেপে বসেছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সে হারে বাড়েনি। উল্টো দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে রেন্টাল, কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে অগ্রাধিকার দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়েছে, আর সে খরচ উসুল করতে দফায় দফায় বিদ্যুতের মুল্য বাড়ানো হয়েছে।

 পক্ষান্তরে স্বল্প মেয়াদের রেন্টাল পদ্ধতি দীর্ঘ মেয়াদে জনগণের বোঝা হয়েছে। শুরুতে বলা হয়েছিল, বিদ্যুৎ চাহিদা পুরণে ভাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ৩/৪ বছর পর বন্ধ করে দেয়া হবে। কিন্তু নির্দিষ্ট এই সময়ের মধ্যে তো তা সম্ভব হয়নি, উল্টো বারবার নবায়ন করে মেয়াদ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ফলে এ খাতটিকে লোকসানের পরিমাণ প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা পুষিয়ে নিতে নানা অজুহাতে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় নিয়ামক তেলের দাম গোটা বিশ্বেই অনেক কমেছে। তেলের মুল্য কমার কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ যেখানে কমার কথা সেখানে উৎপাদন খরচ বাড়ার অজুহাতে বারংবার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। যা কোনভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।


বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে গণশুনানির আয়োজন করেছিল। গণশুনানীতে সকলেই বিদ্যুতের মুল্য বৃদ্ধি না করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমাদেরও ধারনা ছিল, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে গণশুনানির মত একটি গণতান্ত্রিক পথ অবলম্বন করায় হয়ত শেষ পর্যন্ত গণ মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হবে। বাস্তবে কিন্তু গণশুনানীর সকল মতামতকে উপেক্ষা করে হঠাৎই বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হলো। অর্থাৎ গণশুনানী প্রহসনে পরিণত হলো। যে কারণে বাংলাদেশ কনজ্যুমার্স এ্যাসোসিয়েশন বা ক্যাব সরকারের এ সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থ পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনস্বার্থ রক্ষায় আইনের আশ্রয় গ্রহণ সচরাচর চোখে না পড়লেও শেষ পর্যন্ত যদি ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় সংস্থাটি আইনের শরণাপন্ন হয়, তাহলে উদ্যোগটিকে ইতিবাচক বললেও শেষ দেখার জন্য হয়ত অপেক্ষো করতে হবে। যেহেতু আইনি প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ মেয়াদী, সেহেতু তাৎক্ষনিক কোন সুফল মিলবে এমনটা আশা করাও সমীচিন হবে না। হয়ত এ পথে হাঁটলে আর এক দফায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কমে আসতে পারে। তবে, জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে সংস্থাটির এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতেই হবে।


আন্দোলন সংগ্রাম করে যখন শাসক গোষ্ঠীর চৈতন্য ফেরাতে ব্যর্থ দেশের ডজন ডজন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন, তখন মানুষের শেষ আশ্রয় স্থল আদালতের শরণাপন্ন না হয়ে উপায় বা কি? কিন্তু সে আদালতে যাওয়ার পরও জনস্বার্থ কতটুকু রক্ষা করা যাবে, তা নিয়েও সম্ভাবনার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। অথচ প্রতিবেশি দেশ ভারতে সেবা খাতগুলোর মূল্য বৃদ্ধি সহসাই করা হয় না। আর যৎসামান্য বৃদ্ধি করা হলে গোটা দেশে আন্দোলনের ঝড় ওঠে। ফলে সে দেশে জনস্বার্থ পরিপন্থি কোন সিদ্ধান্ত নিলে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ আমাদের দেশে বিদ্যুতের মত অতি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতে মূল্য বৃদ্ধির যে মহাউৎসব(?) চলে, যা সাধারণ মানুষকে নির্বিঘেœই গিলে খেতে হচ্ছে।

 

যদিও আকষ্মিক বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নানাভাবে কথা বলছে, কিন্তু সরকার নির্বিকার। উল্টো ক্ষমতাসীনদের জ্বালানি উপদেষ্টা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি মামুলি ব্যাপার। আর বলাটাই স্বাভাবিক। কারণ তারা উচুঁ তলায় থেকে সাধারণ মানুষের সক্ষমতাকে নিজেদের সক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করায়, ইউনিট প্রতি ৩৫ পয়সা বৃদ্ধিকে খুব একটা কষ্টের মনে করেন না। অথচ মহাজোট সরকার ক্ষমতায় দুই মেয়াদে ন্যুনতম ৮ দফায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ ইউনিট প্রতি ১০.৭০ টাকা করা হয়েছে। এটা যে কি পরিমাণ মানুষের কষ্টের কারণ হবে, তা ক্ষমতাসীনদের হয়ত বোঝার মধ্যেই পড়বে না।

 অথচ সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের খরচ প্রতিটি খাতেই যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে হারে আর রুজি রোজগার হচ্ছে না। উল্টো দিনে দিনে জীবন যাত্রার ব্যয় সমানেই বেড়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের উর্দ্ধমূল্য, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, শিক্ষা, চিকিৎসার মূল্য বৃদ্ধির আগ্রাসনে জনজীবন অতিষ্ট। অথচ নিয়ম হচ্ছে, সরকার জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে সেবা খাতগুলোয় ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি করবে। কিন্তু ভর্তুকির পরিমাণ বাড়লেও তার সুফল সাধারণ মানুষের ভাগ্যে না জুটলেও গুটিকতক বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার পাল্লাকেই ভারি করছে। তা নাহলে হাতে গোনা ক’জন রেন্টাল, কুইক রেন্টালের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর হাতে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে জিম্মি হতে হয় কি করে? এর জবাব মেলাও ভার।

 

তবে এ দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিকে একেবারেই অযৌক্তিক মনে করে বামদলগুলোকে হরতালের মত কর্মসূচি দিতে হয়েছে। সামনের বছর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে জনসমর্থনে ভাটা পড়তে পারে, এমন আশংকাকেও ক্ষমতাসীনরা আমলে নেয়নি। কারণ তারা নিশ্চিত, জনসমর্থনে ভাটা পড়লেও ক্ষমতায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে কোন টানাপোড়নে পড়তে হবে না। তা নাহলে গণশুনানীতে সকল পক্ষের মতামতকে উপেক্ষা করে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে কি ভাবে? একটি পুঁজিবাদি রাষ্ট্র কাঠামোয় গুটিকতক মানুষের


হাতে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশটির অর্থনীতি মুলত পুঁজিবাদি। ফলে এ দেশে পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষার অগ্রাধিকার সাধারণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থের অনেক উর্দ্ধে। যদিও বর্তমান মহাজোট সরকারের দাবি, দলটি এ দেশের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইয়ে অগ্রণী ভুমিকা পালন করে আসছে। আমরাও দেখেছি, স্বাধীনতা পূর্ব বাঙালি জাতির ভাগ্য উন্নয়নে দলটি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। পাকিস্তানী ২২ পরিবারের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে রাজপথ প্রকম্পিত করেছে। এ দেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল, দেশ স্বাধীন হলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও সে চেতনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেনি।

 বরং নব্য শোষক গোষ্ঠীর উত্থান হয়েছে। যাদের হাতে প্রতিনিয়তই এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য বিড়ম্বনা বেড়েছে। শোষণ বঞ্চনাও বেড়েছে। একমাত্র শোষিত শ্রেণীর রাষ্ট্র কাঠামো ব্যতিত এ দেশের জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কিন্তু সে সম্ভাবনাও তো অনেক তিমিরে। ভাগ্যের লিখন, এটাই নিয়তি (!) ভেবেই সাধারণ মানুষের দুঃস্বপ্নের রাত কাটে। কখন সে রাত প্রভাত হবে, তা এ দেশের সাধারণ মানুষের জানার অনেক বাইরেই রয়ে গেছে। অথচ ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে দেশটি পরিণত হয়েছে। যে যেখানে যেভাবে পাচ্ছে, সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছে। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে, হয়ত একদিন এ দেশের মানুষের বাসোপযোগী শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। কারণ সকল অন্যায়, অবিচার, অনৈতিকতার গর্ভেই প্রতিবাদের বীজ রোপিত হয়।


 যা একদিন মহিরুহে পরিণত হবে, ভেঙ্গে খান খান হবে অত্যাচারির সমস্ত শক্তির। আর বিজ্ঞানেও যার স্বীকৃতি মেলে। নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতে, প্রতিটি ব¯ু‘র ক্রিয়ার সমপরিমাণ বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোন অত্যাচারি শোষক ও শাসক গোষ্ঠীর মসনদ চিরস্থায়ী হয় না। এজন্য দেশের নিপীড়িত শোষিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসই পারে শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর একগুয়েমি লুটেরা আচরণের আগ্রাসনকে নিশ্চিহ্ন করতে। তা নাহলে প্রয়োজনে শুধু গুটিকতক মানুষের স্বার্থ রক্ষায় বারংবার বিদ্যুৎসহ পরিসেবাখাতগুলোর মূল্য বৃদ্ধি চলতেই থাকবে। যদিও সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল, ২০১৮ সাল থেকেই বিদ্যুতের মূল্য কমানো হবে। এ সময়ের মধ্যে পরিকল্পনায় থাকা বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে চলে আসবে, বন্ধ করে দেয়া হবে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। এতে গড় উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে। বাস্তবে কিন্তু সে প্রতিশ্রুতির সফল বাস্তবায়ন না করে উল্টো বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে জনকষ্ট বাড়ানো হচ্ছে। একদিকে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকীর পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের দামও বাড়ছে। মাঝপথ থেকে লাভবান হচ্ছেন বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা।


মোদ্দাকথা, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে কম খরচের দিকে হাঁটছেন না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি খরচ মেটাতেই জনগণের ওপর সে দায় চাপিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে আবারো অযৌক্তিকভাবে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হতে পারে অর্থাৎ ঘুরে ফিরেই বিদ্যুতের লোকসান সামাল দিতে জনগণের গলাকাটা হবে। আমরা মনে করি, পুরাতন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে আধুনিকায়ন ও কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। আর উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হলে বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে হবে না। বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে যতদ্রুত সম্ভব উৎপাদনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আর এ পথকে মসৃণ করতে না পারলে জনস্বার্থ বার বারই ক্ষুন্ন হবে। যা কারো কাছেই কাম্য নয়।
  লেখক: প্রাবন্ধিক

ahairanju@gmail.com
-০১৯২২৬৯৮৮২৮

এই বিভাগের আরো খবর

বিজয় মানে লাল সবুজের পতাকা

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ :জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কোর সদর দফতরের মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা গত ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে  ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বা বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিলেন। ইউনেস্কো প্রতিবছর উচ্চ পর্যায়ের একটি আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করে। এই কমিটির কাজ হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত মানবসম্পদকে ভিজ্যুয়াল এবং অডিও আকারে স্বীকৃতি দিয়ে সেগুলোর রক্ষার ব্যবস্থা করা। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতির মাধ্যমে এটি আরও জোরালো হল যে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও তাদের স্বাধীনতার ঘোষণাটি তথা ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের মাত্র ১৮ মিনিটের ভাষণটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ভাষণের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার গৌরব অর্জন করল।

আমি মনে করি এই ঘোষণাটি আরও অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। কারণ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সেই সময় একটি ভাষণ একটি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিতে পারে এটি কারও কল্পনাতে আসেনি। অথচ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক সেই ভাষণটি গোটা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন সুখ এনে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। একটি নামের মধ্যে গোটা জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে। খুব কম সংখ্যক ভাষণই রয়েছে যেগুলোর সাথে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তুলনা করা যায়। যেমন মার্টিন লুথার কিং এর আই হ্যাভ  এ ড্রিম, লিংকন এর গেটসবার্গ এদ্রেস, নেহেরুর ৪৭ এর লালকেল্লা।

বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণটি মোট ১২টি বিদেশী ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সেই বিখ্যাত ভাষণের পর  ১৯৩৩ সালে জন্মলাভ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন নিউজউইক ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল তাদের লিড নিউজে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ বা রাজনীতির কবি নামে আখ্যায়িত করেছিলেন। যদিও ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিউজউইক নানা সমস্যা ও  আর্থিক সংকটের কারণে ছাপানো বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এটি নিউকউইক গ্লোবাল ডিজিটাল ভার্সনে প্রকাশ হয়। তারপরেও ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিলের নিউজউইকের বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা লিড নিউজটির কথা বাঙালি জাতি স্মরণ করবে।  


আমাদের  দুর্ভাগ্য যে স্বাধীনতার খুব অল্প সময় পরেই আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারিয়েছি। আমরা একজন মহান নেতা হারিয়েছি। আমরা, আমাদের মনোবলকে হারিয়ে ফেলেছি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে কোন সমরাস্ত্র, প্রশিক্ষিত কোন সেনাবাহিনী বা  গোলাবারুদ কিছুই ছিল না। তারপরেও তিনি একটি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিলেন। কারণ তিনি বাঙালি জাতিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলন, স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন  এবং  একটি স্বাধীন সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার মনোবল ছিল প্রখর। যার কারণে তিনি ভয়কে জয় করেছিলেন, স্বাধীনতাকে জয় করেছেন। আমরা মনে করি স্বাধীনতা মানেই বঙ্গবন্ধু, বিজয় মানেই বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু।

বৃটিশরা দীর্ঘ ২০০ বছর গোটা ভারতবর্ষকে শাসন ও শোষণ করেছে। ইংরেজ শাসনের এই ২০০ বছরের ইতিহাসে বাঙালিরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও শোষিত হয়েছে। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম এদেশ থেকে বৃটিশরা চলে গেলেই মনে হয় আমাদের মুক্তি মিলবে। আমরা স্বাধীনতা ও শান্তি পাব। সেই লক্ষ্যেই আমাদের প্রথম লড়াইটা ছিল বৃটিশদের বিরুদ্ধে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্যুট, বুট, কোট টাই পরা ইংরেজদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও পাঞ্জাবিদের জুলুম, নির্যাতন, শাসন ও শোষণের শিকার হয় এই বাংলার মানুষ। প্রথমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের নিয়ে একাধিক সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের কথা ছিল।

এমনকি ১৯৪৩ সালেও জিন্নাহ সাহেবও একাধিক রাষ্ট্রের কথাই বলেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল যে ‘স্টেটস’ শব্দটির জায়গায় ‘স্টেট’ শব্দটি ব্যবহার করা হল। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কৌশলে এই স্টেটস শব্দের এসটিকে এড়িয়ে যান এবং ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গান্ধীজীর সাথে  পত্রালাপে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি মাত্র রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেন। যেটি তার জীবনে চরম অনৈতিক একটি অপকৌশল ছিল। তারপর ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠন করা হলেও প্রথমেই বাঙালিরা তেমন একটি জোরালো প্রতিবাদ করেনি।


 কিন্তু  পরবর্তীতে যখন তারা দেখল যে আমরা বৃটিশদের শাসন ও শোষণের  হাত থেকে রক্ষা পেলেও পাকিস্তানিদের হাতে আবারও নতুন করে নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত, জুলুম, অত্যাচারে প্রতিনিয়তই শাসিত ও শোষিত হয়ে যাচ্ছি। পাকিস্তানিরা শুধু আমাদের শাসন ও শোষণ করেই ক্ষ্যান্ত না,  তারা আমাদের বুকের উপর পা দিয়ে আমাদের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিতে চাচ্ছে। আমাদের অধিকারগুলোকে প্রতিনিয়তই ভুলণ্ঠিত করছে। আমাদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক সব দিক থেকেই আমাদেরকে অবহেলিত ও বঞ্চিত করে রাখছে। আমাদেরকে তারা রাষ্ট্রের অংশ মনে করছে না। উপনিবেশিক ও সা¤্রাজ্যবাদী কায়দায় তারা আমাদেরকে অত্যাচারের খড়গ হস্তে দমিয়ে রাখতে চাচ্ছে। আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলো থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করছে।

গায়ের রক্ত পানি করে উৎপাদন করছি আমরা আর উন্নয়ন হচ্ছে পাকিস্তানিদের। ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে গোটা বাঙালি জাতি একত্রিত হয়েছে। স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমরা প্রমাণ করে দিয়েছি যে বাঙালি বীরের জাতি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমরা প্রমাণ করে দিয়েছি যে বাঙালি জাতি খুব ভাল করেই জানে যে কিভাবে অধিকার আদায় করে নিতে হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং সবশেষে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণের পর স্বাধীনতা সংগ্রাম। বাঙালি জাতিকে কোথাও কোনভাবেই তারা দমিয়ে রাখতে পারেনি। বাঙালিদের শৌর্য বীর্যের কাছে পরাজিত হয়েছে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী।  


কোন দুঃশাসন-ই পৃথিবীতে বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনা। তাই পাকিস্তানিরাও এদেশে টিকতে পারেনি। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী সেই সময় আমাদেরকে বিভিন্নভাবে শাসন, শোষণ ও নির্যাতন করেছিল। তারা কোন দিনই পূর্ব বাংলাকে তাদের রাষ্ট্রের অংশ মনে করেনি। তারা মনে করেছিল পূর্ব বাংলা পাকিস্তানিদের একটি উপনিবেশ। সুতরাং তারা শাসন করেছে, শোষণ করেছে, নির্যাতন করেছে এবং আমাদের উৎপাদিত সম্পদ লুট করেছে। সেই সময় পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর ৫৬ শতাংশ পূর্ব বাংলায় বসবাস করলেও রাজধানীসহ কেন্দ্রীয় সরকারের সকল বিভাগ, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এবং সরকারি অন্যান্য আর্থিক সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থার কার্যালয় পশ্চিমে পাকিস্তানে করা হয়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে উৎপাদন করি আমরা আর এর সব সুফল ভোগ করতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা।

১৫৫৬-১৯৬০ সালের দিকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মাথাপিছু আয় ছিল পূর্ব বাংলার চেয়ে ৩২.৫% বেশি সেটি ১৯৬৯-৭০ সালে এসে দাঁড়ায় ৬১ শতাংশে। ১৯৪৮-৪৯ থেকে ১৯৬৮-৬৯ সালের এই বিশ বছরে পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ পাচার হয় ১১.৮ বিলিয়ন টাকা। হিসেবে দেখা যায় এই টাকাগুলো যদি আমাদের পূর্ব বাংলার উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা হত তাহলে সেই সময় বাংলাদেশে ৩৯ শতাংশ উন্নয়ন করা সম্ভব হত। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল দীর্ঘ এই ২৩ বছরে পাকিস্তানি সরকার বিদেশীদের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক সাহায্য পেয়েছে যার মধ্যে ৭৩.৬ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে আর মাত্র ২৬.৪ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে পূর্ব বাংলায়।

কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পূর্ব বাংলাকে অবহেলা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলসেচ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকার পরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে রেখেছিল। তাদের ঘৃণ্য লালসাকে চরিতার্থ করার জন্য এভাবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তারা আমাদের সম্পদ লুট করে তারা নিজেরা সম্পদের পাহাড় গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের এই দানবীয় বিভৎস্য ও জঘন্য চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বাঙালি সেনারা গর্জে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ৩০ লাখ শহিদ এবং ২ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালিরা তাদের স্বাধীনতার লাল সূর্যটা ছিনিয়ে এনেছে।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর হেনরি কিসিঞ্জার নির্লজ্জের মত তাচ্ছিল্য করে বলেছিল ‘ইট ইজ এ বাস্কেট কেস’ অর্থাৎ বাংলাদেশ হবে একটি বটমলেস বাস্কেট বা তলাবিহীন ঝুড়ি। তিনি মনে করেছিলেন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ যদি স্বাধীনতার স্বাদ পায় তারপরেও এই দেশটিকে বিদেশী সাহায্যের  দিকে সারাজীবন চাতক পাখির মত চেয়ে চেয়ে থাকতে হবে। বিদেশী সাহায্য বা দান ছাড়া দেশটি টিকে থাকতে পারবে না। আর এখানে যত অর্থই দেয়া হোক না কেন সেটি দিয়ে কোন কাজই হবে না। কারণ বাংলাদেশ হচ্ছে একটি তলাবিহীন ঝুড়ি। হেনরি কিসিঞ্জারের সেই উক্তিগুলো আজ মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

স্বাধীনতার ৪৬ বছরে পরে বাংলাদেশ এখন অনেক দূর এগিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। গার্মেন্টেস শিল্পে আমরা গোটা বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় হয়ে আছি। ফল উৎপাদন ও মৎস্য চাষে আমরা অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছি। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি। আমাদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, দরিদ্রতা কমেছে। সামাজিক সূচকের অনেক ক্ষেত্রেই আমরা পাশ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তান অতিক্রম করেছে। সুতরাং আমরা অনেকগুলো কাজেই সফল ও স্বার্থকভাবে সম্পুন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। এখন শুধু সুশাসন ও গণতান্ত্রিক ধারার বিকাশের মাধ্যমে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা।
লেখক: সংগঠক  ও প্রাবন্ধিক
rased.4bangladesh@gmail.com
০১৭৫০-৫৩৪০২৮

এই বিভাগের আরো খবর

বিজ্ঞানের আলোকে সুন্নাতে রাসূল (সা)

মাও: মো: রায়হানূর রহমান:মহানবি হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর আদর্শ অনুসরণের মধ্যে মুমিন ব্যক্তির জন্য ইহকাল ও পরকালে রয়েছে শান্তি ও কল্যাণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহর ভালবাসা দাবি কর তবে আমার রাসূলের অনুসরণ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে ভালবাসবেন, তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন, আর তিনি তো অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সূরা আলে ইমরান: ৩১)।‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব: ২১)। নিচে বিজ্ঞানের আলোকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কতিপয় সুন্নাত আমল ও তার উপকারিতার কথা তুলে ধরা হলো –

১) ডান হাতে খানা খাওয়া: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন তোমাদের কেউ পানাহার করতে চায় সে যেন তার ডান হাতে পানাহার করে, কেননা শয়তান বাম হাতে পানাহার করে (মুসলিম)। মানুষের খাদ্য গ্রহণের সময় হাতের আঙ্গুল থেকে প্লাজমা নামক একধরনের হজমী রস নির্গত হয়। ডান হাতের আঙ্গুল থেকে নির্গত হয় পজেটিভ প্লাজমা যা খাদ্যদ্রব্য হজমে সহায়তা করে। আর বাম হাত থেকে নির্গত হয় নেগেটিভ প্লাজমা, যা খাদ্যদ্রব্য হজমে বিঘœ সৃষ্টি করে।

২) বসে পানাহার করা: আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কোন ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। কাতাদাহ বলেন, আমরা বললাম, আর খাওয়া ? তিনি বললেন : সেটা তো আরো খারাপ, আরো নিকৃষ্ট। (মুসলিম)। মানুষ বসে পানি পান করলে সেটা আস্তে আস্তে খাদ্যনালির নিচের দিকে যায় (যেমন শিশুরা চুষে চুষে দুধ পান করে তেমনি চুষে চুষে /চুমুক দিয়ে পানি পান করা উত্তম)। কারণ খাদ্যনালীটা খুব দুর্বল, এর ভিতরে পাতলা পর্দা আছে। দাঁড়িয়ে পানি পান করলে খুব দ্রুত যায়, যা খাদ্যনালির পাতলা পর্দা বরদাশত করতে পারে না। ফলে খাদ্যনালির পাতলা পর্দা ফেটে গিয়ে আলসার, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ ব্যাধি সৃষ্টি হয়।

৩) পান পাত্রে নিঃশ্বাস ফেলা নিষেধ: রাসূলুল্লাহ (সা) পান পাত্রে নিঃশ্বাস ফেলতে এবং তাতে ফুঁক দিতে নিষেধ করেছেন। (বুখারি, মুসলিম, মুস্তাদরাকে হাকিম)। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) পান করার সময় তিনবার শ্বাস গ্রহণ করতেন এবং বলতেন এতে উত্তমরূপে তৃপ্তি লাভ হয়, পিপাসার ক্লেশ দুর হয় এবং অতি সহজে গলধঃকরণ হয়। আনাস (রাঃ) নিজেও দুই বা তিন নিঃশ্বাসে পান করতেন। (বুখারি,মুসলিম)। প্রাণির নিঃশ্বাস ও ফুঁকের মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড বের হয়ে পানির সাথে মিশ্রিত হলে কার্বলিক এসিড তৈরি হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর । ৪) আঙ্গুল ও বর্তন চেটে-মুছে খাওয়া : রাসূলুল্লাহ (সা) (আহার শেষে) আঙ্গুল ও বর্তন চেটে খেতে আদেশ করে বলেছেন, তোমরা জান না (খাদ্যের) কোন অংশে বরকত আছে। (মুসলিম)। খাদ্যের শেষ অংশে থাকে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স। হাত দিয়ে খাবার খেলে হাতের আঙ্গুল থেকে নির্গত হয় প্লাজমা নামক হজমী রস, যা খাদ্যকে দ্রুত হজম করে ।

৫) পেট ভর্তি করে খানা খাওয়া নিষেধ: রাসূলুল্লাহ (সা) পাকস্থলির এক-তৃতীয়াংশ খাবার দিয়ে এবং এক-তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে পূর্ণ করতে এবং বাকি অংশ খালি রাখতে বলেছেন। (ইবনে মাজাহ)। আয়েশা (রাঃ) বলেন, মুহাম্মাদ (সা) এর পরিবার-পরিজন মদীনায় আসার পর হতে পরপর তিনদিন গমের আটার খাবার পেট ভরে খান নাই। আর এই অবস্থায়ই তিনি ইন্তেকাল করেন। (বুখারি)। অতিভোজনের ফলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস ইত্যাদি হবার আশংকা বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত খাদ্য পাকস্থলির সঙ্কোচন ও প্রসারণে বাঁধা দেয়। ফলে কোন পাচক রস নির্গত হতে পারে না, খাদ্যও হজম হয় না। শ্বেতসার জাতিয় খাদ্য বেশি পরিমাণে আহার করলে ডিসপেপসিয়া ও বহুমূত্র রোগ দেখা দেয় । ৬) পাত্রে মাছি পড়লে ডুবিয়ে দেওয়া: মহানবি (সা) বলেছেন, তোমাদের কারো পাত্রে মাছি পতিত হলে সে যেন উক্ত মাছিটিকে ডুবিয়ে দেয়, তারপর সেটিকে দুরে নিক্ষেপ করে। কেননা এর একটি ডানায় আরোগ্য এবং অপর ডানায় রোগ (জীবাণু) থাকে। (বুখারি)। একথা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, মাছির এক ডানায় রোগ এবং অন্য ডানায় তার প্রতিষেধক রয়েছে।

৭) দাঁড়ি রাখা: রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: তোমরা গোঁফ ছোট করবে এবং দাঁড়ি বড় করবে, এভাবে তোমরা আহলে কিতাবদের বিরোধীতা করবে।(আহমাদ)। দাঁড়ি রাখার বিষয়ে গবেষকরা বলেছেন, দাঁড়ি কামাতে গিয়ে মুখের চামড়ায় যে হালকা ঘষা লাগে, তা ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
৮) ডান কাতে শয়ন করা: বারা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) শয়নকালে তার হাত ডান গালের নীচে রাখতেন। (আদাবুল মুফরাদ)। আয়েশা রাঃ বলেন, রাসুল (সা) ফজরের সুন্নাত সালাত পড়ার পর ডান কাতে কিছুক্ষণ শয়ন করে আরাম করতেন। (বুখারি)। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডান কাতে শোয়াই অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। এতে হৃদপিন্ডের ওপর চাপ পড়ে কম, পেটের ভিতর ভারী যকৃত ঝুলে থাকে না। ফলে পাকস্থলিতে চাপ পড়ে না। পাকস্থলির নড়াচড়া স্বাভাবিক থাকে এবং এর ভেতরের খাদ্যদ্রব্য হজমের উপযোগী হয়ে সহজেই খাদ্যনালীর পরবর্তী অংশে চলে যেতে পারে।

৯) রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো: রাসূলুল্লাহ (সা) ইশার সালাতের আগে ঘুমানোকে অপছন্দ করতেন এবং ইশার পর আলোচনা করাকে অপছন্দ করতেন । (বুখারি) এখানে একটি বিজ্ঞান আছে, তা হচ্ছে, রাত যখন গভীর হয় তখন মানুষের ঘুমানোর হরমোনগুলো নিঃসরণ হয়, যা দেহকে ঘুমের দিকে টানে । জ্ঞান বিজ্ঞানের গভীর কোন বিষয় মানুষ এ সময় অনুধাবন করতে পারে না।

১০) গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনবার বলা:  রাসূলুল্লাহ (সা) যখন কোন (বিশেষ) কথা বলতেন, তখন তা তিনবার বলতেন । (বুখারি ) । বর্তমান বিজ্ঞান বলছে, মস্তিষ্কের তিনটা টার্ম আছে, লং টার্ম, মিডল টার্ম এবং শর্ট টার্ম । একটা কথা ব্রেনে গেলে প্রথমে সেটা শর্ট টার্মে যায়। কয়েক মিনিট পরে এ কথাটা হারিয়ে যায় । যদি পুনরায় কথাটা বলা হয় তবে সেটা মিডল টার্মে যায় । সেটা সহজে হারাবে না । যদি আরেকবার বলা হয় তবে সেটা শ্রোতার মস্তিষ্কের লং টার্মে চলে যায় । সেটা দীর্ঘসময় স্মরণ থাকে, আর ভুলে না।  

১১) টুপি পরিধান করা: রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তার সাহাবীগণ কখনো টুপিসহ পাগড়ী আবার শুধু পাগড়ী কিংবা শুধু টুপিও পরিধান করতেন, কেউ কেউ মাঝে মধ্যে মাথায় রূমাল ব্যবহার করতেন। (বুখারি, মুসলিম)। বর্তমানে আমরা দেখতে পাই যে, ডাক্তাররাও বিশেষতঃ অপারেশনের সময় টুপি পরিধান করেন নইলে মাথার চুলের গোড়া দিয়ে জীবাণু প্রবেশ করে ইনফেকশন হতে পারে।  ১২) পেশাব-পায়খানার বেগ চেপে না রাখা: আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, খানা সামনে আসলে কোন সালাত নেই, পেশাব-পায়খানার বেগ থাকা অবস্থায়ও কোন সালাত নেই । (মুসলিম: ১১২৮, বুখারি: ৬৬৫)। আজকের বিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘ সময় মলমূত্র চেপে রাখলে মূত্রাশয়ে পাথরের ন্যায় মারাত্মক রোগের সৃষ্টি হয় ।  

১৩) জ্বর হলে পানি দ্বারা শীতল করা: ইবনে উমার (রাঃ) সূত্রে । রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : জ্বরের প্রচন্ডতা জাহান্নামের উত্তাপ থেকে। তাই তোমরা পানি দিয়ে তাকে ঠান্ডা কর । (মুসলিম: ৫৫৬৪) । বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় জ্বরের চিকিৎসায় অন্যান্য ঔষধের পাশাপাশি পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয় । ১৪) খাতনা করা: আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, পাঁচটি কাজ ফিতরাতের অন্তর্ভূক্ত। খাতনা করা, গোঁফ খাটো করা, নখ কাটা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা এবং নাভীর নিচের পশম মুন্ডন করা। (মুসলিম: ৪৮৬)। জন্মের পর শিশুদের খাতনা করানো হলে মূত্রনালির প্রদাহ ৯০ শতাংশ হ্রাস পাবে । খাতনা না করালে লিঙ্গে পাঁচড়া, গণেরিয়া ও সিফিলিস জাতিয় রোগ বেশি হবার সম্ভাবনা থাকে ।

১৫) অজু করার উপকারিতা: চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, মানব দেহের বিষাক্ত পদার্থসমূহ লোমকুপের গোড়া দিয়ে বের হয়ে হাত, পা, মুখ ও মাথার উপর এসে থেমে যায়। খোলা অঙ্গসমূহ ধোয়া না হলে ধূলাবালি পতিত হয়ে লোমকুপের গোড়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিষাক্ত উপাদানসমূহ পুনরায় দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বিভিন্ন ধরণের বিষাক্ত ফোঁড়া ও টিউমার বা এ জাতীয় রোগ ব্যাধি হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। দেহের ওই অঙ্গসমূহ ধোয়ার ফলে বিষাক্ত পদার্থসমূহ দূরীভূত হয়ে যায়।

১৬) সালাতের উপকারিতা: দেহকে সচল রাখার জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু রক্ত সঞ্চালন, অক্সিজেন প্রবাহ এবং বিপাক। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখা যায় যে, সালাত আদায়ের মাধ্যমে দেহের রক্ত সঞ্চালন, অক্সিজেন প্রবাহ এবং বিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক ও সক্রিয় থাকে। ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সালাতের মধ্যে ঠিকমতো রুকু সিজদা করার ফলে শরীরে ৩৬০টি জয়েন্ট এবং ২০৬টি হাঁড় সমানে প্রভাবিত হয় এবং মস্তিষ্কের অতি সূক্ষ¥ কৌশিক জালিকায় রক্ত প্রবাহিত হয়। নিয়মিত সালাত আদায়ের দরূণ বিপাক ক্রিয়া দ্রুত ঘটে এবং কোষের ভিতর শক্তি তৈরি হয় । আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাত মেনে চলি ।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন  পাবলিক স্কুল ও কলেজ , বগুড়া।
rrahman.rr75@gmail.com
০১৭৩৯-৮৫০৬৫৬   

এই বিভাগের আরো খবর

উৎপাদিত রফতানি পণ্যের গুণগতমান জরুরি

রায়হান আহমেদ তপাদার:বাংলাদেশকে নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে যারা কাজে লাগাতে চান, তারা বর্তমানে ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। উন্নত দেশের ভোক্তা সাধারণরা পণ্য বা সেবা কেনার ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগতমান এবং কোম্পানির সুনামের দিকে বেশি জোর দিলেও বাংলাদেশের ভোক্তাসাধারণের ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু আলাদাভাবেই উপস্থাপিত হয়। আমাদের নিজস্ব ভোক্তা বাজারে ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে শুধু পণ্যের গুণগতমান, বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান বা উৎপাদনকারী কোম্পানিই জড়িত নয় এর সঙ্গে এ দেশের সংস্কৃতির একটা নিবিড় সম্পর্ক মিশে আছে। আমাদের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড ইজ এ সেট অব মেমোরিজ’ কথাটা বেশ জোরালোভাবেই লেপটে আছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বহু দিন টিকে থাকার জন্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলতে চেষ্টা করে। বিষয়টি ‘মুলা তোলার চেয়ে বেগুন তোলা অনেক ভালো’র সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ মুলা তো একবারই তোলা যায়;কিন্তু বেগুন তোলা যায় বারবার।

কোম্পানিগুলো যেহেতু বহুদিন ব্যবসা করতে চায়, তাই ভোক্তাদের কাছে তাদের পণ্যের চাহিদা, গ্রহণযোগ্যতা, পণ্যের মান, সুখ্যাতি ইত্যাদি ধারাবাহিকভাবেই বৃদ্ধি করতে বাধ্য থাকে। কোনো একটি কোম্পানি তার ক্রেতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে; ক্রেতার আকাক্সক্ষা তার পণ্যের ভেতর দিয়ে কীভাবে পূরণ হচ্ছে; কতটা মানসম্পন্ন পণ্য বাজারে আসছে; ভোক্তা কোন পণ্যকে কীভাবে চাইছে; কোম্পানি হিসেবে কতটা সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করছে; শ্রমিকের শ্রমকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে ইত্যাদি নানাবিধ বৈশিষ্ট্যের সুষম সমন্বয় কোনো পণ্য বা সেবার ভেতর প্রকাশিত হলে তখন সেটা একটা আদর্শ ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। অবশ্য তার জন্য প্রচারণা দরকার, ক্রেতার মনে আস্থা সৃষ্টির জন্য এসব গুণসংবলিত পণ্য বা সেবা বারবার স্মরণ করে দেয়া দরকার।


বিশ্বজুড়েই ভোক্তাগোষ্ঠীর ব্র্যান্ড দেখে পণ্য বা সেবা কেনার জোরালো প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ভালো ব্র্যান্ডের পণ্য হলে ক্রেতা তার বিনিময়ে তুলনামূলক বেশি অর্থ খরচ করতে দ্বিধা করছেন না। অন্যদিকে অখ্যাত ব্র্যান্ড হলে বেশিরভাগ সময়ই ভোক্তার মনে পণ্যের গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতা দ্বিধাদ্বন্দ্বের পড়ছেন অথবা পণ্য ক্রয় না করেই ফিরে যাচ্ছেন। ভোক্তাসমাজ কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য বা সেবা ক্রয় করার ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত ধারণা, রুচি, আচরণ, সংস্কৃতি ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য বিবেচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। তাই ভোক্তাদের চাহিদা মাথায় রেখেই কোম্পানিগুলোর তাদের পণ্য বা সেবা বাজারজাত করতে হয়।

ব্র্যান্ডের প্রাথমিক ধারণার সঙ্গে বর্তমান যুগের ধারণার বেশ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রথম দিকে পণ্যের মোড়কে মালিক বা কোম্পানির লেবেল সেঁটে দিয়ে ব্র্যান্ড বোঝানো যেত; কিন্তু বর্তমানে ব্র্যান্ড হলো একটি নাম, স্মারকচিহ্ন, প্রতীক, নকশা, বিশেষ করে এগুলোর সমন্বয়ে গঠিত কোনো রূপ, যার মাধ্যমে কোনো কোম্পানি বাজারে বিদ্যমান প্রতিযোগীদের থেকে নিজের পণ্য বা সেবা আলাদাভাবে উপস্থাপন করে থাকে। ব্র্যান্ডিং হলো একটি ধারাবাহিক বা চলমান প্রক্রিয়া। বাজারে খোলা সোডা পাওয়া গেলেও মানুষ সোডামিশ্রিত কোকা-কোলা কিনতে বেশি আগ্রহী। কিন্তু কেন? কারণ কোকা-কোলা নিজেই একটি ব্র্যান্ড হয়ে তার বাজার ধরে রেখেছে। কোকা-কোলা ক্রেতার আস্থার একটা জায়গা দখল করে নিয়েছে। অপরদিকে টাঙ্গাইলের চমচম বা তাঁতের শাড়ি, মিরপুরের বেনারসি, রাজশাহীর সিল্ক, বগুড়ার দই, ফখরুদ্দিনের কাচ্চি, কুমিল্লার চমচম, পদ্মার ইলিশ, রাজশাহীর আম ইত্যাদি প্রত্যেকটি যেন এক একটি ব্র্যান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আমাদের এসব পণ্যের সঙ্গে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, জাতিসত্তার পরিচয়, বাঙালির ঐতিহ্য যেন মায়ের শাড়ির আঁচলের মতো জড়িয়ে আছে আমাদের মনে। আপনি যখনই এসব পণ্যের কথা ভাববেন, তখনই আপনার স্মৃতিপটে একটি চিত্রকল্প এসে যাবে অজান্তেই। তাছাড়া বাংলার নকশিকাঁথার কথা ভেবে দেখুন প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান এ দুনিয়ায় সূচিশৈলীর এ পণ্যের আবেদন যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। যেমন নরওয়ের টেলিনর কোম্পানি এ দেশের মানুষের আবেগের জায়গাটা বুঝতে ভুল করেনি। চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার জোবরা গ্রাম থেকে শুরু হওয়া গ্রামীণ ব্যাংক আজ নিজেই একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এ গ্রামীণ ব্যাংক বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নতুন করে পরিচয় করে দিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে গ্রামীণ ব্যাংক বেশ জোরালো ভূমিকা রেখেছে। টেলিনর যখন বাংলাদেশে ব্যবসা করতে এলো, তখন গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রামীণ শব্দটি নিয়ে গ্রামীণফোন ব্র্যান্ড তৈরি করতে বসল।

আজ তারা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত মোবাইল কোম্পানি। পাটকে বলা হয় সোনালি আঁশ। একসময় বিশ্ববাসী সোনালি আঁশের দেশ বলতে বাংলাদেশকে চিনত, জানত। সে পাটশিল্প আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে বললেই চলে। পাটের ব্যবহার বর্তমানে বস্তা, চট, দড়ি, কার্পেটের মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির মুখে আজকের বিশ্বে দূষণমুক্ত বিশ্ব গড়তে হলে পরিবেশবান্ধব পাটের কথা গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। মেধা ও বর্তমান প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পাটকে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। ২০১৪ সালে বিদেশি এবং দেশীয় কোম্পানিগুলোকে তাদের পণ্য ভারতে তৈরি করতে আগ্রহী করার জন্য মেড ইন ইন্ডিয়া’ নামের ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগ নেয় ভারতের সরকার। বলা হয়ে থাকে, ভারতের এ উদ্যোগেই আমেরিকা ও চীনকে ডিঙিয়ে ভারত বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সেরা দেশের তকমা পায়।


দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করলে দেশকে এগিয়ে নেয়া যায়। আমাদের দেশকে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। শ্রীলঙ্কা তার দেশকে রিফ্রেশিং শ্রীলঙ্কা হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে। মালয়েশিয়া ট্রুলি এশিয়া, থাইল্যান্ড ‘অ্যামেজিং থাইল্যান্ড, চীন সারা বিশ্বের কারখানা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে। সিঙ্গাপুরের জাতীয় আয়ের ৭৫ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে, আর আমাদের আসে ২ শতাংশের মতো। অথচ আমাদের নিজেদের বিশ্বের সামনে তুলে ধরার মতো অনেক কিছু আছে। আমাদের আছে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত; সুন্দরবনের মতো প্রকৃতির এক অভাবনীয় অবদান আমাদের ভূখন্ডের অবস্থান করছে; জাফলং,তামাবিল, সেন্টমার্টিন দ্বীপের মতো অবকাশ যাপনের স্থান; জলাবরণ খ্যাত রাতারগুল; জল পাথরের শস্য খ্যাত বিছানাকান্দি; রেইন ফরেস্ট লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান; সাজেকের মতো মনোমুগ্ধকর, দৃষ্টিনন্দন অনেক প্রাকৃতিক জায়গা আমাদের আছেÑ যা পর্যটনের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ভালো উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের চমকপ্রদ সাফল্য আছে।

ওষুধ শিল্পেও বাংলাদেশের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশে বাংলাদেশ থেকে ওষুধ রফতানি হচ্ছে। তবে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? বলতে পারেন, আমাদের সমস্যা অনেক আছে। সমস্যা থাকবেই। গন্তব্যে পৌঁছতে হলে সমস্যার মধ্য দিয়েই সামনে যেতে হবে। নেতিবাচক দিকগুলো পেছনে ফেলে রেখে বিশ্বের কাছে ইতিবাচক বাংলাদেশকে তুলে ধরতে হবে। জাপান, জার্মানি, কোরিয়ার তৈরি পণ্যের মান ভালো হবেই এমন অন্ধ ধারণা অনেক ক্রেতাই পোষণ করেন। আবার ইরাক,আফগান যুদ্ধের মতো নানা কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকে মনে মনে ভিন্ন চোখে দেখলেও মেড ইন আমেরিকা’র পণ্যের প্রতি মানুষের আস্থার কমতি নেই আজ অবধি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই বলুন আর জাপান, জার্মানিই বলুন কেউই দ্রুত এ অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলেই বিশ্বে তাদের এমন ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়েছে। এসব দেশই ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।আমাদের প্রচুর জনশক্তি আছে। বিদেশে এ জনশক্তি রফতানিও করছি আমরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি প্রবাসী বাংলাদেশীর বসবাস। তারা বাংলাদেশের হয়ে ইতিবাচক ইমেজ তৈরি করে দেশের জন্য ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করতে পারেন। দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রেখে ব্র্যান্ডের শক্তি বাড়ানোর ওপর যেমন জোর দিতে হবে, তেমনি বিদেশে বাজার সৃষ্টি এবং তা ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

বিদেশে শুধু জনশক্তি রফতানি না করে দক্ষ, শিক্ষিত জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বদৌলতে বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’র সাক্ষাৎ পাওয়াটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। যেকোনো দেশের জন্য একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগকে সফল করার জন্য একদিকে যেমন বিভিন্ন ধরনের রয়েছে কৌশল এবং ডকুমেন্ট এর প্রয়োজন অন্যদিকে তেমনি প্রয়োজন রয়েছে দক্ষতা, ইচ্ছা শক্তি, উপস্থিত বুদ্ধিসহ নানাবিধ ব্যক্তিগত যোগ্যতা। শুধুমাত্র পড়ালেখা করে যেমন ব্যবসায়ী হিসাবে সফল হওয়া যায় না তেমনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নানাবিধ যোগ্যতা দিয়েও একটি ব্যবসা সফল করা যায় না। পৃথিবীতে তাই নানা সময়ে নানা ব্যবসায়ী বিশেষজ্ঞগণ ব্যবসায়িক জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রকার ব্যবসা মডেল উপস্থাপন করেছেন। এখানে তেমনি একটি ব্যবসা মডেল সহজভাবে উপস্থাপন করা হলো ব্যবসায়ীক জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য। একজন উদ্যোক্তা যদি তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা দিয়ে এই মডেলটি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পারেন তাহলে একজন উদ্যোক্তা হিসাবে সফল হবার সুযোগ অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। তার সাথে দেশের অর্থনীতিও বৃদ্ধি পাবে।
লেখক: কলামিস্ট
raihan567@yahoo.com

এই বিভাগের আরো খবর

হিংসায় নয়, ভালবাসায় গড়তে হবে ভবিষ্যৎ

আতাউর রহমান মিটন :কার যে কিসে আনন্দ সেটা বোঝা কঠিন! সরকারি দলের আনন্দ ক্ষমতায়, বিরোধী দলের আনন্দ সরকারের বদনামে। পিঁপড়ার আনন্দ মিষ্টিতে, আর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগির আনন্দ করলায়! একইভাবে আমাদের কষ্টেরও কোন সীমা নেই! নানাজনের মনে নানা রকমের কষ্ট! কারও কষ্ট নীল তো কারো আবার গাঢ় বেগুনি! কিন্তু খুব গভীর থেকে দেখলে বোঝা যায় আসলে সকল কষ্টের মূলে রয়েছে অনাকাঙ্খিত বিচ্ছিন্নতা। মানুষ হিসেবে আমরা ভাঙা এক টুকরো কাঁচের মত হয়ে যাই, আমাদের আর কোন ব্যবহার থাকে না, যখন আমরা পরস্পরের সাথে বিচ্ছিন্ন হই। সে কারণেই বোধ হয় বলা হয়, ‘ঐক্যেই মুক্তি’!


ছাত্রজীবনে একটি বাক্যকে জীবনের গান হিসেবে নিয়েছিলাম যার শুরুটাই ছিল, ‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ় বলে বলীয়ান …’। কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই ঐক্যের পতাকা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। সেই সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি, প্রিয় সেই শহর থেকে দূরে চলে এসেছি, এমনকি প্রিয় অনেক মানুষের সাথেও এখন দেখা হয় না প্রায় এক যুগ পার হলেও। অবশ্য চোখের দেখা না হলেও হৃদয়ের টান কিন্তু একটওু কমেনি! আমি আমার ফেলে আসা তারুণ্য, আমার শহর এবং প্রিয় মানুষগুলোর কথা এখনও মনে করি। তাদের সাফল্য কামনা করি এবং অধির আগ্রহ নিয়ে তাদের সাথে আবার দেখা হবার প্রহর গুণি।

কারণ, কবি গুরুর মত করে বলতে হয়, ‘পুরানো সেই দিনের কথা … চোখের দেখা, প্রাণের কথা সেকি ভোলা যায়’! প্রাণের কথা বলবার জন্য মনটা এখনও ব্যাকুল হয়ে থাকে। বন্ধুদের সাথে মনটা মিলতে চায়। সবাই জানেন, বন্ধুদের সাথে বারে বারে মিলতে পারা, একটা পুনর্মিলনী হওয়া সত্যিই একটা আনন্দের ব্যাপার। কারণ, চাইলেই আমরা আবার শৈশবে ফিরতে পারব না। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখবেন আমাদের মনটা বারে বারে শৈশবের কাছে ফিরতে চায়। শৈশবই আসলে জীবন। তাই শৈশবে ফিরতে চাওয়া মানে জীবনের কাছে ফিরতে চাওয়া। সে কারণেই কবি আকুতি জানিয়ে বলছেন, ‘আয় আরেকটি বার আয়রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়’!


প্রত্যেক মানুষই দারুণ আবেগপ্রবণ। তার রাগ ও ভালবাসা উভয়ই প্রবল। কিন্তু জীবন সুন্দর হয় তখনই যখন রাগকে অবদমিত করে ভালবাসা উপরে নাচতে থাকে। হিংসায় ভরা জীবন কারোরই কাম্য নয়। হিংসুটে বন্ধুকে কেউ পছন্দ করে না, সযতেœ এড়িয়ে চলে। ব্যক্তি জীবনে শুধু নয়, জাতীয় জীবনেও আমরা লক্ষ্য করব, মানুষের প্রতি ভালবাসার আধিক্য নেতার ‘চিরঞ্জীব’ হওয়ার ভিত্তি। যে নেতা হিংসার দ্বারা তাড়িত হয়ে রাজ্য শাসন করেন, তাঁকে কেউ পছন্দ করেন না। আমরা কি পাকিস্তানের তদানীন্তন সামরিক শাসক আইয়ূব খানকে আমাদের আদর্শ মনে করি? আমরা কি আমাদের সন্তানদের তার মত হতে উদ্বুদ্ধ করি? কারণ তিনি আমাদের কাছে বন্ধুত্বের, ভালবাসার প্রতীক নন।

আইয়ূব খান ব্যক্তিগতভাবে কেমন মানুষ ছিলেন তা আমরা জানি না, কিন্তু আমরা জানি তিনি বাঙালীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন, তিনি আমাদের প্রতি কখনই ভালবাসা প্রদর্শন করেন নি। তিনি আমাদের প্রতি পরশ্রীকাতর হয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। যে মানুষটি কখনই আমাদের ভালবাসতে পারেন নি, আমাদের প্রতি ভালবাসা দেখান নি, আমরাও তাকে আপনজন ভাবতে পারিনি। মিয়ানমারের অং সান সুচীকে এখন আর আমরা আদর্শ ভাবি না কারণ তাঁর সরকার নিজের দেশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভালবাসার বদলে হিংসার আগুনে পুড়ে মেরেছে। অহিংস আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে যিনি একদিন শান্তিতে ‘নোবেল পুরস্কার’ লাভ করেছিলেন, রাজনৈতিক হিংসার হ্যাট পরার কারণে সেই তিনিই আজ বিতর্র্কিত। সুযোগ থাকলে তাঁর নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়া হতো এমন কথাও বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছে।


সুতরাং ইঙ্গিতটা খুবই পরিষ্কার, মানুষ ভালবাসার পক্ষে। রাগ বা প্রতিহিংসার পক্ষে নয়। ভালবাসা মিলন ঘটায়, জন্মের সুযোগ সৃষ্টি করে কিন্তু রাগ বা প্রতিহিংসা বিচ্ছেদ ঘটায়, দুরত্ব বাড়ায় এবং আগুনে ঘি ঢালে! রাগ বা প্রতিহিংসা আমাদের কাম্য নয়। বৌদ্ধরা আমাদের মুসলিমদের উপর আক্রমণ করেছে সেই রাগে বা প্রতিহিংসায় আমরা যদি বৌদ্ধদের উপর হামলা চালানোর কথা ভাবি সেটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই প্রতিহিংসার পক্ষে কোন যুক্তি নেই, থাকতে পারে না। আমরা সকলেই যদি সেটা বুঝি তাহলেই কেবল আমরা শান্তিময় আগামী গড়তে পারব অন্যথায় আমাদের সকলকে হিংসার আগুনে পুড়ে মরতে হবে দিনের পর দিন। আমি মনে করি, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সম্পাদিত সাম্প্রতিক চুক্তিটি বাস্তবায়নে নানা সংশয় ও অবিশ্বাস থাকলেও এটা একটা ‘শুভ লক্ষণ’। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চেয়েছে, নিঃসন্দেহে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 এই সময়ে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে পথ হাঁটলে এই চুক্তি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত করাটা কঠিন হবে।
বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিজে দেশে ফিরিয়ে নিলেই সেখানে শান্তি ফিরে আসবে এমন গ্যারান্টি কেউই দিতে পারবে না, যদি না সংঘাতময় উভয় জনগোষ্ঠী পরস্পর হিংসার মনোভাব থেকে বের হয়ে আসে। অতীতের ক্ষত বুকে নিয়ে ভবিষ্যতের সুদিন গড়ে তোলাটা কঠিন। বাংলাদেশেও আমরা অনেক অতীত ভুলিনি, ভুলতে চাইনি। সে কারণে আমাদের সমাজও বিভক্ত। আমরা এখনও সুযোগ পেলেই নিজেদের মধ্যে সংঘাতে মেতে উঠি। এভাবে সংকটের সমাধান হয় না। আমরা যদি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের শান্তিময় প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে চাই তাহলে মিয়ানমার সরকারকে ভালবাসার হৃদয় নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মুসলিম রোহিঙ্গাদের সর্বাঙ্গে বিরাজমান ক্ষতস্থানগুলোতে সহৃদয়তায় মলম লাগাতে হবে।

 নিশ্চিত করতে হবে মুসলিম রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, তাদের জন্য সমান নাগরিক সুবিধা ও অধিকার। দুটো বিবাদমান জাতিসত্ত্বার মধ্যে বিরাজমান ইস্যুগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে নয়, বরং দায়িত্বশীল হয়ে সহৃদয়ভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। এটা শুধু মিয়ানমার সরকারকে করতে হবে এমন নয়, নিপীড়িত-নির্যাতিত রোহিঙ্গাদেরও এ বিষয়ে উদার ও সংবেদনশীল হতে হবে। বুঝতে হবে মিয়ানমার তাদের মাতৃভূমি। তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তাদেরকেই গড়ে তুলতে হবে। স্বাধীনতা কারো দয়ায় পাওয়া যাবে না। নিজেদের অধিকার সুরক্ষায় নিজেদের সচেতন ও উদ্যোগী হওয়ার কোন বিকল্প নেই। ষড়যন্ত্রের মাইন পোতা রয়েছে সর্বত্র, পা ফেলতে হবে সাবধানে। বাংলাদেশে বসে থেকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব বা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যাবে না। ফিরে যেতে হবে স্বদেশে। জনগণের মধ্যে আস্থা ও ভালবাসার শক্ত ভিত গড়তে হবে, জনগণকে সাথে নিয়েই নিজ দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে বিরাজমান বৈষম্যের স্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে।


বাংলাদেশের কাছে থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমরা শিখতে পারেন। একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করলেও আমাদের বিজয়ের ভিত্তি ছিল আমাদের জনগণের ঐক্য। ১৯৭১ সালে আমরা বিভক্ত ছিলাম না। জনতার ঐক্যের বরমাল্যে আমরা বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। একথা সত্য যে, রাজনীতির খেলাটা বেশিরভাগ সময়ই ভয়ঙ্কর এবং নৃশংস হয়। মিয়ানমারে গত বছরে যা হয়েছে তা আমাদের সাথেও হয়েছে ১৯৭১ সালে। আমরাও পালিয়ে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছি।

কিন্তু আমরা বিশ্ব বিবেকের আস্থা অর্জন করেছিলাম বলেই আমাদের স্বাধীনতার দাবি খুব দ্রুততর সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। আমরা যদি কোন কারণে আবার বিভক্ত হয়ে যাই, আমাদের মধ্যে জাতিগত বিভক্তি রেখা যদি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাহলে একটি মহল সেই সুযোগ গ্রহণ করবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আমরা যে ধরনের সহিংসতায় মেতে উঠেছিলাম তা যেন কোনভাবেই আবার দেখা না দেয় সেই সতর্কতা আমাদের সকলকে দেখাতে হবে। সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় বসতে চাওয়ার মধ্যে কোন অপরাধ হয়তো নেই। কিন্তু সেই পথটা গণতান্ত্রিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। চরম সহিংসতা, প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি আমাদের কাম্য নয়। ওরকম পরিস্থিতিতে সুযোগ নেয়, কায়েমী স্বার্থবাদী ও পরাজিত শক্তি। সে কারণেই আমাদের সাবধান হওয়াটা জরুরি।


বাংলাদেশের জনগণ শান্তিপ্রিয় ও বন্ধুবৎসল। অন্যথায় রোহিঙ্গা থেকে আসা প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ নিরাপদে এদেশে প্রবেশ করতে পারত না। আমরা শুধু রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ই দেইনি বরং তাদের থাকা, খাওয়া, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাধ্যমত সহযোগিতা করেছি। এখনও আমাদের শত শত স্বেচ্ছাসেবী টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিরলসভাবে সেবা দিয়ে চলেছে। এই ভালবাসা ও বন্ধুত্ববোধ আমাদের সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমরা এই দৃষ্টান্তের উত্তরোত্তর বিকাশ চাই। আমরা চাই আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন ব্যক্তিরাই নির্বাচিত হবেন যারা চিন্তায় ও কর্মে সৎ, মানবিক, পরমতসহিষ্ণু এবং শান্তিপ্রিয়। আমরা কোন দখলবাজ, লুটেরা, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজ বা তাদের গডফাদারদের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাই না।

 বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বময় নেতা ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা গত ২২ নভেম্বর সংসদীয় দলের সভায় বলেছেন, ‘কারো মুখ দেখে আমি মনোনয়ন দেব না। সকলের আমলনামা আমার কাছে আছে।’ আমি জানিনা সেই আমলনামায় কি লেখা আছে। কিন্তু আমরা প্রার্থনা করি যেন সেখানে জনআকাঙ্খার প্রতিফলন থাকে। নেত্রী যদি দেশের মানুষের হৃদয়ের কথা শোনেন তাহলে তিনি শুনবেন, বাংলাদেশের মানুষ কোন অন্ধকারের অপশক্তিকে, কোন দুর্বৃত্ত গডফাদারকে তাদের নেতা হিসেবে দেখতে চায় না। তারপরও যদি সেই অপশক্তি ষড়যন্ত্রের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়, নমিনেশন পেপারে নেত্রীর কলমের স্বাক্ষর নিতে সক্ষম হয়, তাহলে সেটা হবে আমাদের চরম দুর্ভাগ্য। আমরা বাংলাদেশের জনগণ সকল দলের কাছেই মুখচেনা নয়, বরং ‘স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি’দের  মনোনয়ন দেয়ার অনুরোধ জানাই।

ক্ষমতার দম্ভে আমরা যেন নিজেদের ‘বন্ধুহীন’ করে না ফেলি। একদলীয় শাসন দিয়ে সুশাসন হয় না। জীবনের সৌন্দর্য্য বহুমাত্রিকতায়, একগুয়েমীতে নয়। রাজনীতি করতে হলে জানতে হবে দেশ পরিচালনায় মানুষের শক্তি কতখানি। মানুষের শক্তি সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হলে, মানুষের জন্য হৃদয়ে প্রেম জেগে উঠলে আপনা থেকেই মনের শক্তি বিকশিত হবে। ভালবাসার শক্তির চেয়ে বড় কিছু নেই। ¯্রষ্টা তার সৃষ্টিকে ভালবাসেন বলেই এখনও শক্তিধর শয়তান সফল হতে পারেনি। শয়তানকে পরাভূত করে সত্য ও ন্যায়কে তুলে ধরতে শিখতে হবে। সেটা অন্যকে খাটো করে নয়। রাজনীতি করলেই হিং¯্র হতে হবে এমন কথা কে বলেছে? আমরা অবশ্যই এমন সমাজ চাই না যেখানে ‘জ্ঞানীরা অশ্রুজলে ভাসবে আর গাধারা মাথার উপরে নাচবে’। সেই দুঃসময়ের মুখোমুখি যেন আমাদের হতে না হয়!
লেখক: সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
-০১৭১১৫২৬৯৭৯

এই বিভাগের আরো খবর

শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারীদের দিকে সুনজর দিন

রিপন আহ্সান ঋতু:বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক হতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও শিক্ষক নিবন্ধন সনদ প্রয়োজন। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন আইন ২০০৫ অনুসারে, শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে হলে আগে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এ আইন অনুসারে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) থেকে নিবন্ধিত ও প্রত্যায়িত না হলে কেউ কোনো বেসরকারি স্কুল বা কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারবেন না। স্কুল বা কলেজে শিক্ষক হওয়ার জন্য আলাদা আলাদাভাবে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয় অর্থাৎ উভয় পদের জন্য আলাদা আলাদা প্রশ্নে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এজন্য প্রশ্নপত্র থেকে শুরু করে সিলেবাস, সবকিছুই আলাদা। ফল প্রকাশের ৯০দিনের মধ্যে সনদপত্র পাঠানো হয় স্থায়ী ঠিকানার জেলা শিক্ষা অফিসে। এর আগে ওয়েব সাইটে দেওয়া ফলাফল সাময়িক প্রত্যয়নপত্র হিসেবে ধরা হয়।

 

এই নিয়মের প্রায় একযুগেরও বেশি সময় ধরে নেওয়া শিক্ষক নিবন্ধনের মোট ১৩টি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় একলাখ সনদধারী শিক্ষক এখনও নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন। এরই মধ্যে আবার ১৩তম নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু ও ১৪তম পরীক্ষার প্রিলিমিনারির ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। শূন্য পদের সংকট থাকায় অপেক্ষমাণদের নিয়োগ দিতে বিলম্ব হচ্ছে। এদিকে অভিযোগ উঠেছে, এরই মধ্যে জাল সনদে নিয়োগ নিয়েছেন ৬০হাজার ভুয়া শিক্ষক। যাদের বেতন ফেরত চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে চিঠি প্রেরণ করেছেন। এছাড়া এক থেকে ১২তম ব্যাচের সনদধারীদের করা রিটের বোঝাও চেপে আছে  নন-গভর্নমেন্ট টিচার্স রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড সার্টিফিকেশন অথরিটি (এনটিআরসি) -এর ঘাড়ে।


 সবমিলিয়ে শিক্ষক নিয়োগে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে এই সনদ অর্জন করতে হয়। প্রথম থেকে দ্বাদশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা একই পদ্ধতিতে হলেও সরকার এটাকে আরও সাংগঠনিক এবং জবাবদিহিতামূলক করার জন্য বেশকিছু কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা লাখো বেকার চাকরি প্রত্যাশীর মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। পুরো প্রক্রিয়া কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বচ্ছ নিয়োগের একটি প্রক্রিয়া চালুর ব্যবস্থা করে। পিএসসির (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) আদলে মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে। দেশের প্রায় ৩০ হাজার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেযোগ্য শিক্ষক নির্বাচন করে নিয়োগ দেওয়া এই কর্তৃপক্ষের কাজ। ত্রয়োদশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকে সরকার নতুন পদ্ধতি চালু করেছিল। মূলত ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০০৫’ সংশোধনের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নতুন পদ্ধতি চালু করে। বিধি অনুযায়ী, বছরের নভেম্বরে কর্তৃপক্ষ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে জেলার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শূন্য পদের তালিকা সংগ্রহ করবে। তিনি সে অনুযায়ী চাহিদাপত্র কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চাকরি প্রার্থীদের আবেদন গ্রহণ করে যথাক্রমে প্রিলি, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণদের উপজেলা, জেলা এবং জাতীয় পর্যায়ে মেধা তালিকা প্রকাশ করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো এই মেধাক্রম অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ করবে।


 ১৩তম নিবন্ধন পরীক্ষায় ৬ লাখ ২হাজার ৩৩জন প্রার্থী ছিলেন, তার মধ্যে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৫৭ জন অংশগ্রহণ করেছিল। প্রিলিতে ১ লাখ ৪৭হাজার ২৬২জন উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় ১লাখ ২৭হাজার ৬৬৪জন অংশগ্রহণ করেন। লিখিত পরীক্ষায় প্রতি শূন্য পদের বিপরীতে ৩জন করে পাস দেখিয়ে ১৮হাজার ৯৭৩জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণ করা হয়। চলতি বছরে মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনও আলোর মুখ দেখেনি। নিয়োগ তো দূরের কথা, ত্রয়োদশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় কর্তৃপক্ষ এক বড় ধরনের গলদ তৈরি করে। তারা শূন্য পদের বিপরীতেই শুধু লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে। অর্থাৎ যে উপজেলাতে পদশূন্য রয়েছে শুধু সেই এলাকার লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা প্রার্থীদের উত্তীর্ণের ফলাফল প্রকাশ করে। আবেদনের সময় কোন উপজেলা বা জেলায় শূন্য পদ রয়েছে তা উল্লেখ না করে আবেদন সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। কিন্তু ফলাফল প্রদানের সময় পদ শূন্য এলাকার প্রার্থীদের ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যা তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। ১৪তমশিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা-২০১৭-এর প্রিলিমিনারি টেস্টের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। স্কুল পর্যায়ে একলাখ ৪ হাজার ৬৯৪জন এবং কলেজ পর্যায়ে একলাখ ৫হাজার ১৮১জনসহ মোট ২লাখ ৯হাজার ৮৭৫জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। স্কুল পর্যায়ে পাসের হার শতকরা ২০দশমিক ৮১ভাগ এবং কলেজ পর্যায়ে পাসের হার শতকরা ৩৪ দশমিক ৬৪ভাগ।


 সার্বিক পাসের হার শতকরা ২৬দশমিক শূন্য ২ভাগ। এনটিআরসিএ ঐচ্ছিক বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে প্রার্থী মনোনয়ন দিচ্ছে। ১২তম ব্যতীত ১-১১তমে যারা শিক্ষক নিবন্ধন সনদ অর্জন করেছেন তাদের কাছে বেশি নম্বরের গুরুত্ব ছিলনা। ন্যূনতম ৪০নম্বর পেলেই সনদ অর্জন করা যে তো। তাই তারা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে বা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। ফলে অনেক মেধাবী কম নম্বর পেয়ে সনদ অর্জন করায় এখন নিয়োগে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই তাদের মধ্যে চরম  হতাশাও অসন্তোষ বিরাজ করে। শিক্ষক নিবন্ধন সনদে ‘নিয়োগের যোগ্য’ কথাটি উল্লেখ রয়েছে। তাহলে তিন বছর পর তারা নিয়োগের অযোগ্য হবেন কেন? রেজিস্ট্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য মনোনীত প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষক যদি লিখিত পরীক্ষায় অনূর্ধ্ব ৪০নম্বর পেয়ে পরবর্তীতে সরকারি প্রাথমিকে নিয়োগ পেতে পারেন, তবে শিক্ষক নিবন্ধন সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাবেননা কেন? অন্যদিকে প্রায় ১৫ হাজার ১৯জন পুল শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে যদিও তারা দেড়শত টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে এটি স্থায়ী হওয়ার নিশ্চয়তা দেবে না এই শর্তে সই করে ছয়মাস মেয়াদে নিয়োগ লাভ করেন। কিন্তু নিয়োগের যোগ্য হয়েও শিক্ষক নিবন্ধন সনদপ্রাপ্তরা নিয়োগ পাবেন না কেন?  ইতোমধ্যে ১-১২তম সকল শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারীদের নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য হাইকোর্টে তিনটি রিট দায়ের করা হয়েছে। আরো ২টি রিট দায়ের করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মহামান্য হাইকোর্ট তৃতীয় রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে রিটকারীদের কেন নিয়োগ দেওয়া হবে না, চলমান শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম ও ১৩তমদের পরীক্ষা কেন স্থগিত রাখা হবে না তা জানতে চেয়ে শিক্ষা সচিব, মাউশির মহাপরিচালকও এনটিআরসিএ’র চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছেন।


 এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ মহাবেকায়দায় পড়েছে। তাই তারা ১৩তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের কোন ধরনের সনদ দিতে নারাজ যদিও বিজ্ঞপ্তিতে সনদ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। সনদ প্রদান করা হবেনা বলেই উপজেলা ভিত্তিক শূন্য পদের বিপরীতে লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর প্রাপ্তদের পাস দেখানো হয়েছে। সেখানেও সেই গলদটা রাখা হয়েছে। শূন্যপদ, এলাকা উল্লেখ না করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, যা চাকরি প্রার্থীদের মাঝে নানা প্রশ্নের উৎপত্তি করেছে। এটার অবস্থাও বিগত ১৩তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার মতো হবে কিনা? এটা মন্ত্রণালয়ের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটা প্রক্রিয়া মাত্র। তাছাড়া প্রথম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত যে সার্টিফিকেটধারী প্রার্থীরা রয়েছেন সরকার তাদের সবার বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। অর্থাৎ বিশাল একটি সংখ্যা শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার প্রাপ্ত সনদপত্র নিয়ে বসে আছেন, যা কার্যত অকার্যকর। দেশে প্রতিবছর একলাখ স্নাতক বের হচ্ছে। সরকার তাদের নিয়ে কতটা হিসাব কষছে তারাই ভালো বলতে পারবে। বেকারদের অনেকের লক্ষ্য থাকে এই নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে প্রাপ্ত সনদ নিয়ে একটি চাকরি করার।


সুতরাং শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টা পরিষ্কার করা উচিত। ৬ লাখ ছেলেমেয়ে আবেদন করল, আপনারা একটা মোটা অঙ্কের টাকা পেলেন-এটা হিসাব না করে দায়িত্বের কথা ভাবুন। বেকারদের আবেগ নিয়ে মজমা না করাই শ্রেয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো প্রায় ৬০হাজার শূন্য পদ রয়েছে। প্রথম ই-রিকুইজিশনে প্রায় ২লাখ ৫০ হাজার প্রার্থী আবেদন করলেও বাস্তবে হবে মাত্র প্রায় দেড়লাখ। কারণ লক্ষাধিক প্রার্থীরই স্কুল, কলেজ, প্রদর্শক, কম্পিউটার ইত্যাদি বিষয়ে একাধিক শিক্ষক নিবন্ধন সনদ থাকায় তারা দুই বা ততোধিক ক্যাটাগরিতে আবেদন করেছেন। ইতোমধ্যে পুরাতন নিয়মে ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিংবডিও নতুনভাবে এনটি আরসিএ কর্তৃক প্রায় ২০হাজার নিবন্ধনধারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনেকেই উচ্চ বেতনে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি করছেন। অবৈধ সনদধারীর সংখ্যাও একেবারে কম হবেনা।


 এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, বেকার শিক্ষক নিবন্ধনধারী আছেন একলাখ দশ হাজার বা তার চেয়ে কিছু বেশি। যেখানে প্রায় ৬০ হাজার পদশূন্য রয়েছে সেখানে সকল বেকার শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারীদের নিয়োগ নিশ্চিত করা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হবেনা। হয়তো দুই/তিন বছরের মধ্যেই সকলকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে যদি সরকার আন্তরিক হয়। তবে সরকারের আন্তরিকতা কতটুকু হবে তার মাত্রা নির্ভর করছে মহামান্য আদালতের চূড়ান্ত রায়ের উপর। মানবিকতা শুধু মহামান্য আদালত দেখাবেন তা হতে পারে না। সরকারকেও শিক্ষিত বেকার শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারীদের দিকে সুনজর দিতে হবে। আমি আশা নয় বিশ্বাস করি সরকার অবশ্যই মিডিয়া, আদালত ও আইনজীবীদের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সরবরাহে আন্তরিকতার পরিচয় দিবে যাতে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বৈধ সব নিবন্ধন ধারীদের মেধা ও মননশীলতাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে শূন্য আসনের বিপরীতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে সক্ষম তার পরিচয় দিতে পারেন। সরকার সকল বৈধ শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারীদের নিয়োগ নিশ্চিত করবে বলেই বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারী বেকার সমাজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান।
লেখক: কথা সাহিত্যিক ও সংগঠক
মোবা: ০১৭১৭৪৯৬৮০৩

এই বিভাগের আরো খবর

শিক্ষাক্ষেত্রে বাণিজ্য-অরাজকতা-অব্যবস্থাপনা

হাবিবুর রহমান স্বপন :শিক্ষাক্ষেত্রে চলছে হ য ব র ল অবস্থা। প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করা যাচ্ছে না। শিক্ষকদের বদলী নিয়ে চলছে বাণিজ্য। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শিক্ষকরা সৃজনশীল প্রশিক্ষণ পাওয়ার পরেও ফলাফল শূন্য। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা অব্যাহত আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই, ভাইস চ্যান্সেলরের পদ শূন্য।  এছাড়াও সরকারের নেয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চলছে অব্যবস্থাপনা। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা প্রকল্পের কোন অগ্রগতি নেই। যেসব উপজেলায় সরকারি মাধ্যমিক স্কুল-কলেজ নেই, সেগুলোতে এখনো স্কুল-কলেজ সরকারি করা যায়নি।

 কারিগরী শিক্ষা সম্প্রসারণে কোন সমন্বিত কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়নি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে শিক্ষা না পাওয়ায় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা গ্রাম পর্যায়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে শিক্ষা প্রশাসন। খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত দুই বছরের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অর্ধেকই সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারছেন না। এর ফলে নিষিদ্ধ নোট-গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করেই মূলত সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা টিকে আছে বলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। সৃজনশীল পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ প্রশ্ন করতে পারে ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ শিক্ষক এবং আংশিক প্রশ্ন করতে পারেন মাত্র ২৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ শিক্ষক। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়েনি।

২০১০-এর শিক্ষা নীতিতে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। সুশিক্ষা ও মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষক। এ প্রসঙ্গে অশতিপর বিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. খোরশেদ আলম মন্তব্য করলেন, ‘মেধাবীরা  যতদিন শিক্ষকতা পেশায় না আসবে বা নিয়োগ দেয়া হবে ততদিন এই অবস্থার উন্নতি হবে না। ভাল ছাত্র-ছাত্রী যদি শিক্ষক হয় তা হলে তারা শিক্ষার নতুন নতুন কৌশল  নতুন নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে খুব স্বল্প সময়ে আয়ত্ব করতে পারবেন এবং তা  প্রয়োগও করতে পারবেন। যে শিক্ষক নিজেই কিছু জানেন না বা দুর্বল তিনি কি করে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি বুঝাবেন? এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বললেন, ‘আমাদের দেশে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি মোটেই সন্তোষজনক না। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হন। তারা অনেক সময় তাদের প্রভাব খাঁটিয়ে নিজের আত্মীয়-স্বজন অথবা দলীয় অনুসারীদের অথবা উৎকোচের বিনিময়ে খারাপ শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। সেইসব দুর্বল শিক্ষকগণ কি শিক্ষা দিবেন?’
 
সংবাদপত্রেই খবরটি পড়লাম। শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবির বলেছেন, ‘আসলে সৃজনশীল বিষয়ে প্রশিক্ষণের নামে ঋণের অর্থে বিদেশ ভ্রমণের প্রতিযোগিতা চলছে। আমলা একান্ত কর্মকর্তা ও সুযোগ সন্ধানী শিক্ষা কর্মকর্তারা ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ করছেন। প্রকৃত শিক্ষকরা বিদেশে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না। প্রশিক্ষকদেরও তা দেয়া হচ্ছে না। আবার দেশে যে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয় তা কেবল খাওয়া-দাওয়া ও ভাতা নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এজন্য বড় বড় প্রকল্পের হাজার হাজার কোটি টাকা অপব্যয় হচ্ছে। দেশের ঋণের বোঝা বাড়ছে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেসিপ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে। মূল্যবান বৈদেশিক মূদ্রার অপব্যবহার  হচ্ছে নানা কৌশলে!


কোচিং বাণিজ্য ঠেকাতে ঢাকার ২৪টি সরকারি বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ৫’শ শিক্ষককে বদলীর সুপারিশ করেছে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যেসব শিক্ষককে বদলীর সুপারিশ করা হয়েছে তারা সকলেই একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে কোচিং বাণিজ্য করছেন। কোচিং বাণিজ্যের নামে এইসব শিক্ষকগণ অভিভাবকদের জিম্মি করে মোটা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই শিক্ষকরা ১০ বছর থেকে ৩৩ বছর পর্যন্ত এক বিদ্যালয়েই রয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার পাশাপাশি কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অর্থ উপার্জন করছেন।

কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করার কথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সকল কর্মকর্তাগণ বলছেন দীর্ঘ দিন ধরে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বন্ধ করা যায়নি গাইড বা নোট বই। শুধুমাত্র শিক্ষকদের দোষারোপ করলে যথার্থ হবে না। কারণ শিক্ষকগণ একই স্কুলে কি করে বছরের পর বছর চাকুরিরত আছেন? এর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও জড়িত। বদলী নিয়ে চলে বাণিজ্য। বদলী না করার জন্যও উৎকোচের লেনদেন হয়, যা ‘ওপেন সিক্রেট’। ঢাকার বাইরের অন্যান্য জেলা শহরেরও একই চিত্র। জেলা শহরে সাধারণত একটি বালক এবং একটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। এক স্কুল থেকে অপর স্কুলে বদলী করা হলেও উক্ত শিক্ষক থাকেন সেই শহরেই। তাতে তার প্রাইভেট বা কোচিং বাণিজ্যে কোন অসুবিধা হয় না। এভাবে চাকুরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উক্ত শিক্ষকের চলে কোচিং বাণিজ্য। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বদলী নিয়ে চলে বাণিজ্য। পাবনায় একটি সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ রয়েছেন প্রায় ছয় বছর। আর একটি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরেও অজ্ঞাত কারণে তাকে বদলী করা হয়নি।  

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। এবারও জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষার (জেএসসি) প্রথম দিনে ৬০ হাজার ৮শ ৯৩ জন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। এই অনুপস্থিতির কারণ কি? অনুসন্ধান করলে বড় ধরনেই ঘাপলা আবিষ্কার হবে। আমার জানা মতে গ্রামাঞ্চলে এমন কিছু স্কুল আছে, যেসব স্কুলে মাত্র দুই বা তিনজন শিক্ষক। আবার কিছু স্কুল আছে যেগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র এক’শ বা তারও কম। অথচ ওই সব স্কুলে খাতা-কলমে বেশি শিক্ষার্থী দেখানো হয়। বেশি শিক্ষার্থী দেখানোর পেছনেও আছে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য। বেশি শিক্ষার্থী দেখিয়ে বই বরাদ্দ নেয়া হয়। পরে এইসব বিনা মূল্যের বই বাজারে বিক্রি করা হয়। আরও একটি খবর পড়লাম সংবাদপত্রে। তা হলো : শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিদেশ সফরে থাকায় উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি নীতিমালা-২০১৭ এখনও চূড়ান্ত করতে পারেনি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)।

পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা যাচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রী অতিসম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষকদের দোষারোপ করেছেন। গত কয়েক বছর মেডিক্যাল এবং ডেন্টাল কলেজে ভর্তিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ করা হলেও এবারে এই অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এর কারণ কি? বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর থেকে এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা গেল, এবার মেডিক্যাল এবং ডেন্টাল কলেজে ভর্তিতে প্রশ্নপত্র তৈরি, ছাপানো এবং তা কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করার ফলেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা এড়ানো গেছে। এর চেয়েও সত্যটা হচ্ছে প্রশ্নপত্র তৈরি, ছাপানো এবং বন্টন ব্যবস্থা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তার শতভাগ সততার সঙ্গে তা সম্পন্ন করেছেন। তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য ঘটনা থেকে রক্ষা পওয়া গেছে। এতে প্রমাণিত হয়েছে, এই দেশে সৎ-নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি এখনও অনেকেই আছেন।

উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম-অব্যস্থাপনার কথা প্রায়শঃই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারি নিয়োগে চলছে অরাজকতা। শিক্ষক নিয়োগে মেধাকে বা ভাল ফলাফলের চেয়ে উৎকোচের বিনিময়ে অপেক্ষাকৃত খারাপ ফলাফল করা ব্যক্তিকে চাকুরি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমন কয়েকটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্তও হয়েছে এবং হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে সান্ধ্যকালীন কোর্স। এই কোর্সকে ইতোমধ্যেই সরাসারি বাণিজ্য বলে চিহ্নিত করেছেন, সরকারেরই বিভিন্ন এজেন্সি সমূহ। এছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ ভাইস চ্যান্সেলর নেই। ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর দিয়ে চলছে ২৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের বেশির ভাগেরই নেই নিজস্ব ক্যাম্পাস। ভাড়া বাড়িতে ছোট্ট পরিসরে চলে ক্লাস। সরকার বারংবার নিজস্ব ক্যাম্পাস করার তাগাদা দেয়ার পরেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে, আর্থিক অনিয়ম তার অন্যতম। ইতোমধ্যেই কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যন্সেলরের দুর্নীতির নথি পর্যালোচনা করছে দুদক। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিট যথাযথভাবে হয় না তা সংবাদ মাধ্যমের খবরেই পড়লাম।

বর্তমান সরকার বহু আগে ঘোষণা করে যে, যেসব উপজেলায় সরকারি স্কুল কলেজ নেই সেসব উপজেলায় একটি করে কলেজ ও একটি করে বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সরকারি করা হবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এটি ছিল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নানা জটিলতায় তা বাস্তবায়নে ধীরগতি। কেন এই ধীরগতি বা বিলম্ব? তালিকা হয়েছে। যেসব স্কুল-কলেজ সরকারি করা হবে সেগুলোতে চিঠিও দেয়া হয়েছে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠানে সকল প্রকার মেরামত কাজ এবং শূন্য পদে শিক্ষক-কর্মচারি  নিয়োগ করা যাচ্ছে না। বহু পদ শূন্য অথচ নিয়োগ বন্ধ। কেন কি কারণে সরকারের এই মহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। তা নিয়ে নানা কথা বাজারে প্রচলিত আছে। স্কুল-কলেজ সরকারিকরণের তালিকা নিয়েই প্রথম জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার জনপ্রতিনিধি একটি প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন।

 আর সরকারি কর্মকর্তাদের দেয়া তালিকায় রয়েছে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম। অনেক স্থানের পুরাতন বা প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সংসদ সদস্যের পছন্দের নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম পাঠানো হয়েছে বা তিনি সেই প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করার জন্য সুপারিশ করেছেন। তাতে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিলম্বিত হচ্ছে সরকারিকরণের কাজটি। সরকারিকরণের ক্ষেত্রে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উপজেলা সদরে অবস্থিত সেই প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেয়ার সরকারি নীতিমালাও অনেক ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের আরও একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারের সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা : প্রতিটি উপজেলায় একটি কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার। সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোন অগ্রগতি নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান শিক্ষা বা কারিগরী শিক্ষার গুরুত্বারোপ করে বলেছিলেন, ‘কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে আমাদের সন্তানদের’। তিনি এভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি শিক্ষায়। বিশ্ব আজ বিজ্ঞান বা কারিগরী শিক্ষায় অনেক অগ্রসর, অথচ আমরা এখানো মান্ধাতা আমলের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে হবে নতুন প্রজন্মকে। তা না হলে আমরা বিশ্বের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারবো না।

সর্বোপরি শিক্ষাক্ষেত্রের সকল প্রতিবন্ধকতা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে। এর জন্য দরকার একাগ্রতা বা সততা। যেহেতু শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি অর্থ বরাদ্দ বেশি তাই এখানে দুর্নীতিও ব্যাপক। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা যায় কি-না তা ভেবে দেখতে হবে। উল্লেখ্য যা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বেশ  কয়েকটি রয়েছে। মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা মনিটরিং জোরদার করা দরকার। নানা প্রকার পাবলিক পরীক্ষার কারণে কলেজ সমূহে ক্লাস হয় না। পাবলিক পরীক্ষা সমূহ অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে দুটি পরীক্ষা কেন্দ্র  স্থাপন করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
সর্বোপরি ভাল শিক্ষক নিয়োগ, প্রাইভেট ও কোচিং শিক্ষা বন্ধ করে শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম  শিক্ষার চেয়ে কুশিক্ষা পাবে যা হবে দেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
hrahman.swapon@gmail.com
০১৭১০-৮৬৪৭৩৩ 

এই বিভাগের আরো খবর

সহিংসতার বলি হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্ক

আব্দুল হাই রঞ্জু :ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ নিয়েই রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রে যখন ঘুঘ, দুর্নীতি, লুটপাট ব্যাপকতা লাভ করে, তখন মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক অবক্ষয় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ফলে সামাজিক অনাচার, হিং¯্রতা, সহিংসতার আগ্রাসন বাড়তেই থাকে। বিশেষ করে একটি ভোগবাদী রাষ্ট্র কাঠামোয় গুটিকতক মানুষের লোভ লালসা, বিত্ত বৈভবে সমৃদ্ধ হওয়ার নিরব প্রতিযোগিতা চলে। মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ে। ধনীর চেয়ে গরিবের সংখ্যাও বাড়ে পাল্লা দিয়ে। যদিও আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা বলে থাকে, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে, নিকট ভবিষ্যতে দেশ থেকে দরিদ্রতাকে চির বিদায় দেয়া হবে। হয়ত এ দাবি করার পিছনে দেশের উন্নয়ন, হাটবাজার, নগরায়নের ব্যাপ্তি, শহর কেন্দ্রিক জৌলসে ভরা বিপনী বিতানের ছড়াছড়িকে ইঙ্গিত করা হয়।

 বাস্তবে কিন্তু যে হারে নগর, মহানগর  কিম্বা মফস্বল শহরগুলোয় বিপণী বিতান স্থাপিত হয়েছে, সে হারে ক্রেতার সক্ষমতা বিশেষ কোন উৎসব ব্যতিত চোখে পড়ে না। অর্থাৎ দেশের স্বল্প সংখ্যক মানুষের আয় উন্নতি বাড়লেও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আর্থিক দৈন্যতা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। যা প্রমাণের জন্য শহরমুখী প্রতিটি মানুষের চোখে দেখা অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। যেমন- দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটলেই দোকানিদের হাকডাক কানে পড়ে। অনেকেই বিনয়ের সঙ্গেই ডাকাডাকি করেন। বিশেষ কাজে মাঝে মধ্যেই ঢাকায় অনেকেই আসা যাওয়া করেন আমাকেও মাঝে মধ্যে ঢাকা যেতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমি ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানের রমনা ভবনের সামনে দিয়ে হাঁটছিলাম। এক দোকানির ডাক শুনে দাঁড়ানো মাত্রই বললেন, সকাল থেকে কোন বেচা বিক্রি হয়নি। ওনার আগ্রহ দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যবসা কেমন চলছে? জবাবে বললেন, ভাই ব্যবসা একেবারেই মন্দা। আমারও মনে হল, বাস্তবে ব্যবসায়ীদের মন্দ সময় চলছে। আর এটাই স্বাভাবিক।


কারণ পুঁজিবাদী অর্থনীতির দেশে কিছু মানুষ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধায় অর্থে বিত্তে সমৃদ্ধ হবেন। যার উপার্জিত অর্থে ব্যবসার প্রসার ঘটাবেন। জৌলুসে ভরা বিপনি বিতানে থরে থরে পসরা নিয়ে দোকানিরা অপেক্ষা করবেন কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে আসলে, ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। যে কারণেই এখন ব্যবসায় মন্দাভাব বিরাজ করছে। অর্থাৎ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অর্থ গুটিকতক মানুষের মাঝে কেন্দ্রিভূত হবে। ফলে একচেঁটিয়া পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। যারা বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে নানা খাতে বিনিয়োগ করবে। ফলে দেশের ছোট, মাঝারি ধরনের শিল্প ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বহুজাতিক কোম্পানির গর্ভেই বিলিন হবে। এভাবে কর্মসংস্থান হারানোর সংখ্যাও বাড়বে, বেকারত্ব বাড়বে এবং মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন মানও নি¤œমুখী হবে। স্মরণে রাখতে হবে, দুর্নীতি, লুটপাট এবং ঘুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে, তারই গর্ভে জন্ম নিবে হতাশা, অনৈতিকতা, সহিংসতা ও নির্মমতার। মানুষের বিত্ত-বৈভবে সমৃদ্ধ হওয়ার কোন সীমারেখা নেই।

 যার যত অর্থ হবে, সে ততই আরো বিত্তশালী হওয়ার চেষ্টা করবে। ফলে কপর্দক শূন্য হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশিদার হয়ে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে অনেকেই কলাগাছ হচ্ছেন। যাদের কেউ কেউ আরো বিত্তশালী হতে নিকৃষ্ট ব্যবসা মাদকের পথেও হাঁটতে কুণ্ঠাবোধ করছেন না। এ ভাবেই দেশটিতে মাদকের বিভৎসতা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। অনেকেই হতাশার চোরাবালিতে মাদকাসক্ত হচ্ছে, আবার কেউ কেউ বিত্তশালী পরিবারের অঢেল অর্থের কারণেও বিপথগামী হচ্ছে। পরিবারের কর্তা শুধুই ছুঁটছেন অনৈতিক অর্থের পাহাড় গড়তে, আর অর্থ বিত্তের কারণে অজান্তেই নিজের সম্পদ সন্তানটি মাদকাসক্ত হয়ে পরিবারের বোঝা হচ্ছে। এ ধরনের পরিবারের সংখ্যা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। ফলে মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে খুন হচ্ছেন প্রিয় বাবা, মা, ভাই বোন। কারণ একজন মাদকাসক্ত ছেলে কিম্বা মেয়ের কাছে মাদকের অর্থের যোগানই মুখ্য। আবার অঢেল অর্থের কারণে বিকৃত যৌন পাপাচারের সম্ভাবনাও বাড়ে। যা নিয়ে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। আবার কেউ কেউ পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়েন। অর্থাৎ অসুস্থ পরিবার ও সমাজে সন্দেহ, অবিশ্বাস বাড়তেই থাকে। ফলে মানুষের মধ্যে প্রেম-ভালবাসা, ¯েœহ, মায়া মমতার বদলে হিং¯্রতার পথই প্রশস্ত হয়।

সুত্র মতে, গত দেড় মাসে পারিবারিক সহিংসতার বলি হয়েছে ২৯ জন। স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন, স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন, মায়ের হাতে ভাই-বোন খুন, এমনকি ছেলের হাতে বাবা মাকে নির্দয় ভাবে খুন হতে হচ্ছে। এ অবস্থা দেশের নিভৃত পল্লী থেকে নগর মহানগর পর্যন্ত দিনে দিনে বিস্তৃত হচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে পারিবারিক সহিংসতা কিম্বা সামাজিক সহিংসতার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরাও মনে করি, সুস্থ ধারার সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে না পারলে খুন খারাপির পরিমাণ কমানো সম্ভব হবে না। এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে গোটা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সিলিং করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারের অভিভাবকদের আন্তরিক হয়ে নিজের ভবিষ্যত সম্পদ সন্তানদের মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। যেন কোন সন্তান বাবা-মায়ের অবহেলা কিম্বা উদাসীনতায় মাদকাসক্ত হয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

 আগেই বলেছি, দেশের অভ্যন্তরে গুটিকতক উচ্চাভিলাসী অর্থখোররা আরো বিত্তশালী হতে মাদকের মতো অধ:পতিত ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশলে মাদকের চালান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে আনা নেয়া করছে। গত ৯ নভেম্বর খোদ রাজধানীতে রোগি পরিবহনের নামে অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর ৯৫ কেজি গাঁজা পরিবহনের সময় গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়ে। কিন্তু পরিবহনে জড়িতরা ব্যতিত এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে য়ায়। কিন্তু কেন তাদেরকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, যা আমাদের বোধগম্যের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। অথচ দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে একের পর এক সফলতার দৃষ্টান্ত যেখানে প্রতিয়মান হচ্ছে, সেখানে মাদক স¤্রাটরা কেন ধরা পড়ছে না? হয়ত এ বিষয়ে উপযুক্ত জবাব আইন শৃঙ্খলা বাহিনীই ভাল বলতে পারবেন। তবে, আমরা খালি চোখে যা দেখি তাহলো, ভোগবাদী সমাজ

ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে যারা দেশ শাসন করেন, তারা শ্রেণি স্বার্থ রক্ষাকেই বেশি প্রাধান্য দেন। ফলে চুনোপুটিরা ধরা পড়লেও অতি ক্ষমতাধর বিত্তশালীরা বরাবরই দৃষ্টির বাইরেই থেকে যান। আমাদের বিশ্বাস, দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিক হলে এবং স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে বাধা না পেলে মাদক সা¤্রাজ্যকে ধ্বংস করা কঠিন কোন কাজ হবে না। যেখানে জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শক্তিশালী জঙ্গি বাহিনীকে পরাস্ত করতে এ দেশে এ্যালিট ফোর্স র‌্যাব, পুলিশ বাহিনী ও সহযোগী সংস্থাগুলো প্রতিনিয়তই সফল অভিযান পরিচালনা করছেন, সেখানে মাদকের আগ্রাসন বন্ধ করা কেন সম্ভব হয় না? যা জাতীর প্রতিটি নাগরিকের একমাত্র জিজ্ঞাসা।

এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বাস্তব সত্যকে উপলব্ধিতে নিয়ে মন্তব্য করেছেন, সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক অনুশাসন ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, অনৈতিক সম্পর্ক, সহনশীলতার অভাব, দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন, আত্মকেন্দ্রীকতা, অসচ্ছলতা, বেকারত্ব ও পরিবারের মধ্যে সহিষ্ণুতার অভাবের কারণে সামাজিক ও পারিবারিক সহিংসতা বেড়েই চলছে। এ প্রসঙ্গে মনোচিকিৎসক ডা: মোহিত কামাল বলেন, মাদকের কারণে ‘হেলুসিনুশেনের’ কারণে পরস্পরের প্রতি সন্দেহ বাড়ছে। যা মানসিক রোগের উপসর্গ তৈরি করছে। আবার মাদকের প্রভাবে সন্তানের সঙ্গে পরিবারের সম্পর্কও নষ্ট হচ্ছে। ফলে সমাজ এমন অস্থির পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক চিন্তার জায়গা লোপ পাওয়ায় সহিংসতার বলি হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্ক। অর্থাৎ ঘুরে ফিরেই মাদকের বিরূপ প্রভাবই যে সুস্থ সমাজ গঠনের পথে বড় অন্তরায় তাই প্রমাণিত হচ্ছে অর্থাৎ মাদকের আগ্রাসনে নির্মমতা, সহিংসতা, হিং¯্রতা দিনে দিনে গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। এসব কারণে তরুণ তরুণীরা পর্নোগ্রাফীর দিকে ঝুঁকছে। যার ফলে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা বাড়ছে।

পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ নিয়েই যে রাষ্ট্রে আমাদের বসবাস, সে রাষ্ট্রকে বাসোপযোগী করতে হলে মাদকের আগ্রাসন যে কোন মুল্যে বন্ধ করতেই হবে। আর মাদকের আগ্রাসন বন্ধ করতে না পারলে ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক বন্ধনের অভাবে পারিবারিক সহিংসতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে রোধ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাষ্ট্র যন্ত্রগুলোকে সততার সাথে পেশাদারিত্বকে নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সততার সাথে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে এবং সামাজিকভাবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করলে মাদকের আগ্রাসন অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব হবে। আর তা করতে না পারলে পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা মহামারিতে রূপ নেবে, যা নির্দ্ধিধায় বলা যায়।
   লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

এই বিভাগের আরো খবর

সবখানেই বিশাল ফারাক!!

মীর আব্দুল আলীম:“ধান-চালের দরে বিশাল ফারাক” আজকের (১৮ নভেম্বরের) পত্রিকার শিরোনাম দেখে ভাবি এ দেশে ফারাক নেই কোথায়? রাজনীতিতে, এক দলে আরেক দলে ফারাক, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে ফারাক, সামাজিক বন্ধনে ফারাক, মায়া মমতায় ফারাক, ভ্রাতৃত্ব, মাতৃত্ব, পিতৃত্বের বন্ধনে এখন বিস্তর ফারাক। এই ফারাক দেখেইতো শিল্পিরা গায়- “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”। সত্যিই আমরা আগে (ছোট বেলায়) অনেক সুন্দর দিন কাঁটিয়েছি। সেই দিন আজ কোথায়? রাজনীতিতে ফারাক :
রাজনীতিতে একদলের সাথে আরেক দলের ফারাক থাকাটাই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক হলেইতো বিপদ। এমনটাইতো এখন হচ্ছে। এখন দলাদলীর ফারাকটা কিন্তু অনেক বেড়েছে। ক্ষমতাসীন দল এলাকায় দাবড়ে বেড়ায়, আর বিরোধীরা চুপচাপ ঘাপটি মেরে থাকে, খুব একটা নড়েচড়ে করে না। এখন কিন্তু এমন না। একেবারে ল্যাং মারামারি চলে দলাদলিতে। একের পর এক মামলা, সাথে থাকে হামলা। বাড়ি ছাড়া করা, দুনিয়া ছাড়া করা, দেশ ছাড়া করা কোনটাই বাদ যায় না। আগে কিন্তু এমনটা ছিলো না। একদলের লোক আরেক দলের দাওয়াতে গিয়ে আনন্দে সামিল হতেন। আড্ডা দিতেন চায়ের টেবিলে। এখন ধান আর নৌকার টেবিল আলাদা। কোথাও কোথাও বিয়ে বাড়িতে এমন মার্কার প্যান্ডেলও নাকি আলাদা হয়। বাড়ির শিশুরাও দলাদলিতে জড়ায়। খেলতে গিয়ে নৌকার পরিবারের লোক, নৌকার পরিবারের শিশুদের সাথে খেলাধুলা করে। ধানওয়ালার শিশুরা আলাদা খেলে। দলদারী যারা করেন তাদের বিরোধীদের সাথে রীতিমত মুখ চাওয়াচায়িও হারাম কোথাও কোথাও। তাহলে দলাদলিতে, মার্কায় মার্কায় ফারাকটা কত -এটাই ভাবুন পাঠক!

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ফারাক :
এই ফারাকটা ভয়াবহ! জাতির জন্য অসহনীয়। আগে শিক্ষক ছিলেন বাবার মত। এখন শিক্ষকতো কখনো কখনো অর্থে কেনা কর্মচারি। এমন ভাবনা অনেক শিক্ষার্থীর মাঝে। আর বাবা যদি ম্যানেজিং কমিটির কেউ হন তাহলে শিক্ষকদের ক্ষেত্র ভেদে হয়তো ঐ মর্যাদাটাও আর থাকে না। ফেল করে ক্লাস টপকাতে না পারলে শিক্ষক বেচারার চাকরিটাই তখন খোয়া যায়। এটা সব ক্ষেত্রে নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়, এই হচ্ছে আজকের শিক্ষকদের মর্যাদা! এদিকে একশ্রেণির শিক্ষকই আজ আগের শিক্ষকের মত শিক্ষক নন। প্রফেশনাল শিক্ষক। তাঁরা টিউশনি আর টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। তাই শিক্ষার্থীরাও তাদের দেখেন সেই দৃষ্টিতেই। বলতে হয় ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক সেই আগের জায়গায় নেই। শিক্ষকরা এখন শিক্ষার্থীদের শাসন করতে যায় না। এটা রাষ্ট্রিয়ভাবে মানা। আমাদের শিক্ষকরা আমাদের যেভাবে শাসন করেছেন, এমন শাসন করলে আজকের শিক্ষকরাতো লাশ হবেন! ছাত্র অভিভাবক মিলে শিক্ষকের চামড়া তুলে নিবেন। চোখ-মুখ ভোঁতা করে দিবেন। আমার মনে আছে, ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন। সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাবার পথে স্যারকে (শিক্ষক) দেখে তড়িঘড়ি নামতে গিয়ে জংলায় পড়ে পায়ের হাড় ভেঙ্গেছিলাম। এখনও বুড়া বয়সে শিক্ষকদের দেখলে শরীরে কাঁপুনি ওঠে। এখনকার ছাত্ররা শিক্ষকদের শাসনকে বাড়াবাড়ি ভাবে। উল্টো ছাত্ররাই শিক্ষকদের ধমক দেয়। মাঝে মধ্যে পত্রিকায় শিক্ষকদের গায়ে চড় থাপ্পর, কিল ঘুসি আর জীবন কেঁড়ে নেয়ার খবর পাই। গোবেচারা শিক্ষকরা অসহায় অনেক ক্ষেত্রেই। ছাত্ররা সুযোগ পেলে বলে স্যার বেত্রাঘাত করেছেন। অমনি ঐ শিক্ষক মশায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রিয় ব্যবস্থা। ছাত্র শিক্ষককে ডরাবে কি, শিক্ষকদেরই ছাত্রদের ভয়ে বুক দুরু দুরু থাকে। এ জায়গাতে ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্কের বিস্তর ফারাক হয়েছে। এ ফারাক দুর করা দরকার, তা না হলে জাতির অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে।  

সামাজিক বন্ধনে ফারাক : “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”। আগের সেই দিন আছে কি? আমগাছ তলায় আম পেড়ে, পাড়ার লোকশুদ্ধ ভর্তা বানিয়ে খাওয়া; মায়ের হাতের চাল ভাজা, সিম বিচি খেয়ে বিকেল পাড়া করা, আর কত কিছুই না ছিলো। দুপুর না গড়তেই গাঁয়ের মাঠে ছেলে-বুড়া সবাই মিলে গ্রামীণ খেলায় মত্ত হতাম। সেই দিন কোথায় আজ? আমার দু’টো ছেলের কথা বলি। ওরা সকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছোটে। দিন ধরে কোচিং করতে করতে সন্ধ্যা। এরপর বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা আর প্রতিবেশির সময় নেবার সময় কোথায়? আমি যে ফ্লাটে থাকি সে বিল্ডিংয়ে ১৬৮টি বড়সর ফ্লাটে প্রায় ১৪শ’ লেকের বাস। একটি বড় গ্রাম আরকি। গুনে গুনে ৭/৮ জনের নাম জানি। ছেলেরা তাও জানে কিনা সন্দেহ। বছরখানেক আগে আমার পাশের ফ্লাটের এক ভদ্রমহিলার অকাল মৃত্যু হয়েছে। যে রাতে তিনি মারা গেছেন, আমার পরিবারের কেউ জানেন না সে খবর। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে …… পাশে মানুষের সমাগম থেকে পরে

বিষয়টি জানতে পারলাম। এইতো শহুরে জীবন। আর আমরা আগে কি দেখেছি? ২/১ দিন গাঁয়ের কারো সাথে দেখা নেইতো মন আনচান করতো। এখন কেউ কারো খোঁজ রাখে না। সে সময় কোথায় হারিয়ে গেলো? বড্ড ব্যস্ত আমরা। নিজেদের নিয়েই ব্যস্ততা বেশি। সামাজিক বন্ধনের ফারাকটা বুঝলেনতো পাঠক? ভ্রাতৃত্ব, মাতৃত্ব, পিতৃত্বের বন্ধনে ফারাক : বাস্তব ঘটনা। পত্রিকায় খবর হয়েছে। উর্দ্ধতন এক কর্মকর্তার পিতা মারা গেছেন বৃদ্ধাশ্রমে। পুত্রকে বাবার মারা যাবার খবরটা দেয়া হলে তিনি জানালেন-‘আমি এখন মিটিংয়ে আছি। লাশ আঞ্জুমানে দিয়ে দিন’। হায় পুত্র! ঠাকুরগাঁয়ে এক মায়ের ঘটনা সবাই জানেন। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। ডিসি সাহেব গিয়ে পুত্রের নির্যাতনের শিকার মাকে এনে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ছেলেকে দেন হাজতে। মা তো জ্ঞান ফিরে একই প্রলাপ- ‘আমার ছেলে কোথায়? তোমরা তাকে মেরোনা”। এমন হাজারো উদাহরণ আছে আমাদের ঘুণে ধরা এ সমাজের। মা-বাবার প্রতি সন্তানের মায়া মমতার ফারাক কিন্তু এখন বেশ লক্ষনীয়। ভাই ভাইকে টাকার জন্য, জমির জন্য খুন করছে। ভাইয়ে ভাইয়ে ফারাক বেড়েছে। ভ্রাতৃত্বের, মাতৃত্বের, পিতৃত্বের বন্ধনে চিড় ধরেছে। এ চিড় জোড়া লাগানো না গেলে আমাদের যে আর অবশিষ্ট কিছু থাকে না।

ধর্মীয় বন্ধনের ফারাক :
আমাদের যারা হিন্দু বন্ধুবান্ধব ছিলো তাদের সাথে খুব ভাব ছিলো আমাদের। হিন্দু বন্ধুরা আমাদের বাসায় এসে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে খুব প্রশংসা করত। আমরাও হিন্দু বাড়িতে গিয়ে লাড়–, লাবড়া, লুচি খেয়ে আনন্দ করতাম। আর সেই আমরাই নানা ছুতয় হিন্দু বাড়ি পুঁড়িয়ে দেই। দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনা, গত ২৮ অক্টোবর রংপুরের গঙ্গাচরে টিটো রায় নামের এক ব্যক্তি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তার অপরাধের শাস্তি আইন অনুযায়ী হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা কেন? আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতা ও অধৈর্যের প্রকাশ ঘটছে। এ ধরনের সহিংসতা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশের মানুষের মাঝে হতাশার সৃষ্টি করেছে। হিন্দু বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার এ ঘটনা সরকার কিংবা দেশের মুসলিম সম্প্রদায় ভালো দৃষ্টিতে নেয়নি। কোন ব্যক্তিবিশেষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের খেসারত কেন জাতি দেবে? কেউ কান্ডজ্ঞানহীনভাবে কোন কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে। টিটো রায় ভুল করতে পারে; এটাতে টিটো রায়ে অপরাধ। এটাতো গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের অপরাধ নয়। তাহলে এতগুলো হিন্দু বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হলো কেন? মানুষগুলো সহায় সম্বল হারাবে, তাও আবার বিনাদোষে, এটা কেমন কথা? এতো কিছুর পরও কিন্তু আমরা একটি বিষয় খুব লক্ষ করেছি। হিন্দু মন্দিরে ও বাড়িঘরে যখন হামলা চলছিলো, তখন তাদের রক্ষার জন্য স্থানীয় অনেক মুসলিম এগিয়ে এসেছেন, প্রতিরোধ গড়েছেন, এমনকি হামলাকারীদের হাতে আহতও হয়েছেন। এটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের ভালোবাসার ফল। আমরা বাঙালি এটাই হোক আমাদের পরিচয়। এদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ হোক, আমাদের মানসিকতা বদলে যাক চিরতরে, এটাই প্রত্যাশা। ধান-চালে দামের ফারাক :


শুরুতেই “ধান-চালের দরে বিশাল ফারাক”পত্রিকার শিরোনাম দিয়ে লেখা আরাম্ভ করেছিলাম। ধান চাল নিয়েই কিছু বলা হয়নি এখনও। এখন এ প্রসঙ্গে আসা যাক। এদেশে দ্রব্যমূল্যের ফারাকটা নতুন নয়। পাইকারি বাজারে শসার দাম ২০ টাকাতো খুচরা বাজারে এর দাম ৫০ টাকা। কোন কিছুতেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই যে যার মত দাম হাকে; লাভ গোনে নিজেদের মতো করে। দেশে এখন চালের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। সিন্ডিকেট ওয়ালারা চাল বেঁচে টাকার পাহাড় গড়ছে। বাজারে নতুন ধান উেেঠছে। চালের দাম কমছে না। আবার কৃষকরা ধানের দামও পাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত ধানের মূল্যের সঙ্গে বর্তমান বাজারে বিক্রিত চালের দরের বিশাল ফারাক থাকায় বোরোর পর এবার আমন সংগ্রহ অভিযানও ব্যর্থ হওয়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ফের হুমকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি ভরা মৌসুমেও চালের দর আগের মতোই চড়া থাকবে বলে বাজার-সংশ্লিষ্ট অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গত ১২ নভেম্বর খাদ্য অধিদপ্তর প্রতি টন ধানের মূল্য ২৬ হাজার ৬৭ টাকা ৫৬ পয়সা ঘোষণা করেছে। অথচ টিসিবির মূল্য তালিকা অনুযায়ী ওইদিন বাজারে মোটা চাল (স্বর্ণা-চায়না ইরি) প্রতি কেজি ৪২ থেকে ৪৬ টাকা

পাইজাম-লতা ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারি মানের চাল ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা, নাজির-মিনিকেট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং সরু চাল ৫৮ টাকা থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। মিলমালিকদের মতে, এক মণ ধানে সর্বোচ্চ ২৭ কেজি চাল পাওয়া যায়। সে হিসেবে সরকার নির্ধারিত ধানের দর অনুযায়ী প্রতি কেজি চালের দাম হবে ৩৮ টাকা। অথচ বাজারে এ দামে সর্বনিম্নমানের চালও নেই। ধান চালের দামে এমন ফারাক হবে কেন? আর স্বাভাবিকভাবেই কৃষকরা এমন দামের ফারাক রেখে কেউ সরকারের কাছে ধান বিক্রি করবে বলে মনে হয় না। এদেশে সব কিছুতেই ফারাক বেশ চোখে পড়ার মতো। এ দুরত্ব, এ অসংগতি কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে, সরকারকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ভাবে চললে মানুষ আর মানুষ থাকে না, দেশ আর দেশ থাকবে না। আসুন আমরা আমাদের সমাজে, পরিবারের, রাষ্ট্রের ফারাকগুলো কমিয়ে আনি। আর তাতেই দেশের মানুষ ভালো থাকবে, দেশ সমৃদ্ধশালী হবে, সুন্দর দেশ হবে বাংলাদেশ। সেই দিনের প্রত্যশায় রইলাম আমরা।  
লেখক ঃ সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট।
e-mail-newsstore13@gmail.com
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

এই বিভাগের আরো খবর

সাতই মার্চের ভাষণের বিশ্বস্বীকৃতি অর্জন

আ, ব, ম রবিউল ইসলাম :অবশেষে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সমগ্র জাতির জন্য এটি এক অনন্য অর্জন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন। ১৮ মিনিটের এই ভাষণে, ১২৪১ শব্দের এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু কোন লিখিত পান্ডুলিপি ব্যবহার করেননি। সেই ভাষণে তিনি বাঙালির মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের আহবান জানান। আবেগে, বক্তব্যে, দিক-নির্দেশনায় ওই ভাষণটি ছিল অনবদ্য। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণটিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ঐতিহাসিক গেটিসবার্গ ভাষণের সঙ্গে তুলনা করা হয়। সমাজের সর্বস্তরের মুক্তিপাগল মানুষ সেদিনের সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি শুনতে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সমবেত হয়েছিল।

 শুধু ৭ মার্চের ভাষণকে নিয়ে অনেক দেশি-বিদেশী গবেষক গবেষণা করেছেন, অনেক কবি কবিতা লিখেছেন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চে  এক ঐতিহাসিক পেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এই জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনতে মানুষের ঢল নেমেছিল। সাদা পান্জাবি-পাজামা এবং মুজিব কোট পরিহিত শেখ মুজিব ৩.২০ মিনিটে মঞ্চে উঠেন। চারিদিকে অসংখ্য শ্লোগানের মাঝে তিনি দিপ্ত কন্ঠে বলেন ”এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”। ঐ দিন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের মুজিবের বাসভবনে সকাল থেকেই অসংখ্য নেতা-কর্মিরা জড়ো হতে থাকে। সবার মধ্যে নানা আলোচনা চলতে থাকে ঐ দিনের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে। নেতারাও বঙ্গবন্ধুকে ভাষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে অনুরোধ করতে থাকে। এই সময়ে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মীনি বেগম ফজিলাতুন্নেছা বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দান করেন যে, কারো কথায় আবেগের মুহূর্তে তেমন কিছু ভুল না করতে। তিনি বলেছিলেন, ’আপনার যা মনে চাইবে আপনে ভাষণে  তাই বলবেন, মনে রাখবেন সাড়ে সাত বাঙালি আপনার দিকে তাকিয়ে আছে।’
 
১৯৬৯- এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক আইয়ুব খাঁন ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর ক্ষমতায় এসে নতুন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। সেই  নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। গণতন্ত্রের ধারা অনুসারে পাকিস্তানের শাসনভার পাওয়ার কথা আওয়ামী লীগের অর্থাৎ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্থান্তর না করার ও গণতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১-এর ৩ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তান জাতীয় পষিদের অধিবেশন ডেকেছিলেন। কিন্তু কোন কারণ ছাড়াই তিনি হঠাৎ ১লা মার্চ এক ঘোষণায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এই ষড়যন্ত্রমূলক ঘোষণা শুনেই পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। ”জয় বাংলা’, ’বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, জাগো জাগো বাঙালি জাগো’ ইত্যাদি স্লোগানে শহর-বন্দর- গ্রাম আন্দোলিত হয়। এই পটভূমিতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণটি ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে প্রদান করেন।

গত ৩১ নভেম্বর ইউনেস্কো বিশ্বের ৭৮টি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল, নথি ও বক্তৃতাকে এই স্বীকৃতি দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিটি (আইসি) ’মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ (এমওডব্লিউ) কর্মসূচির আওতায় ওই ৭৮টি দলিলের মনোনয়ন নির্বাচন করে। এই তালিকায় জায়গা পেতে হলে যেকোনো ঘটনার গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহাসিক প্রভাব থাকতে হয়। ঐতিহাসিক এই স্বীকৃতি পেতে ইউনেস্কোকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল সরবরাহ করেছেন ফ্রান্সের প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মো. শহিদুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। এ জন্য বাংলাদেশের পক্ষ ওই স্বীকৃতির সপক্ষে ১০টি প্রয়োজনীয় নথি, প্রমাণপত্র ও তথ্য জমা দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করে।

৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে স্বীকৃতি চেয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে ১২ পৃষ্ঠার আবেদেনটি করা হয়েছিল, তাতে এর ঐতিহাসিক পেক্ষাপট ও বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, ব্রিটিশ  ঐতিহাসিক জ্যাকব এফ ফিল্ড বিশ্বের সেরা বক্তৃতাগুলো নিয়ে একটি সংকলন গ্রন্থ বের করেন। ’উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস; দ্য স্পিচেস দেট ইন্সপায়ার হিস্ট্রি’ বইয়ে ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের গত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে যুদ্ধকালে দেওয়া  বিশ্বের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তৃতা হিসাবে বলা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে  বিশ্ব আন্তর্জাতিক রেজিষ্ট্রার স্মারকে ( মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রার) অন্তর্ভূক্ত করায় ইউনেস্কো ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ নানা ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠান।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক
০১৭১৮-৯৩৪৮৪৭

এই বিভাগের আরো খবর

মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে

মোঃ মামুন-উর-রশিদ :আমরা মানুষ সৃষ্টির সেরাজীব। সৃষ্টিকর্তা সকল সৃষ্টির মাঝে মানুষকে শ্রেষ্ঠ হিসাবে সৃষ্টি করেছে। কারণ মানুষ হিসাবে তাদের ‘মান’ এবং ‘হুশ’ আছে।  আর ‘মান’ এবং ‘হুশ’ আছে বলে তাদের মানবিক গুনাবলী আছে। মানবিক গুণাবলীর মাধ্যমে মানুষকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার জন্য কিছু নিয়ম কানুন, প্রথা আইন ইত্যাদি মেনে চলতে হয়। যাকে আমরা মূল্যবোধ বলতে পারি।

ফলে মানুষ হিসাবে আমরা মানবিক মূল্যবোধের অধিকারী হয়েছি। একটি সুন্দর, মননশীল ও সাবলীল বাসযোগ্য আবাসস্থল করার জন্য মানুষরা তাদের মানবিক মূল্যবোধ প্রয়োগ করে তাদের কার্যসাধন করে থাকে।কিন্তু আজ আমাদের সমাজে কি মানুষরা সেই মানবিক মূল্যবোধ প্রয়োগ করতে পারে? তারা কি মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন কার্য সাধন করে? তারা কি ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক স্বার্থে এই মূল্যবোধ প্রয়োগ করে? আরও কত প্রশ্ন জাগে মনে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বেশ কিছু ঘটনার ফলে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে আমরা মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়েছি? আমাদের মাঝে কি কোন মানবিকতা আছে? সাম্প্রতিক কিছু ন্যক্কারজনক কার্যক্রম আমাদেরকে মানুষ হিসাবে মানবিক গুণাবলী বা মুল্যবোধের অধিকারী হয়েছি কি না? সেই প্রশ্ন জাগে সকলের মনে? নি¤েœ বর্তমান সময়ে সংগঠিত কিছু ঘটনার উল্লেখ করলাম, তাহলে বুঝা যাবে আমরা কতটুকু মানবিক মূল্যবোধের অধিকারী? অথবা আমরা কি মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছি বা ফেলছি?

এক. গত ১লা নভেম্বর ঢাকার কাকরাইলে মা-ছেলেকে হত্যা করার ঘটনা সিনেমাকেও হার মানিয়েছে। চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক ৬০০ কোটি টাকার মালিক আ: করিম ও তৃতীয় স্ত্রী শারমীন আক্তার মুক্তা প্রথম স্ত্রী সামছুন্নাহার ও তার ছেলে সামছুল করিম শাওনকে দুনিয়া থেকে উঠে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মুক্তা তার ভাই আল আমিন জনিকে ব্যবহার করে তাদেরকে হত্যার জন্য। ইতিমধ্যে আঃ করিম তার দ্বিতীয় স্ত্রীকেও সে এভাবে তাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রথম স্ত্রী ও তৃতীয় স্ত্রীকে মুখোমুখী দাঁড় করে। অন্য একজন সুন্দরীকে মালাবদলের অপেক্ষায়। এছাড়া আঃ করিম আরও অনেক সুন্দরীর সাথে লিভ টুগেদার করেছেন বলে জানা যায়। তাহলে শুধু শারীরিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য প্রথম স্ত্রী, জন্ম দেওয়া সন্তানকেও হত্যা করতে পিছপা হয়নি। তাহলে মানবিক মূল্যবোধ আমাদের কোথায়?


দুই. অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়া প্রবাসী নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলায় খৈনকুট গ্রামে আঃ  সালামের স্ত্রী বিউটি বেগমের পরকীয়া সম্পর্কে দেখে ফেলায় স্বামীর ভাতিজি আজিজা খাতুনকে পুড়িয়ে হত্যা করে। বিউটির ভাই, ভাতিজা শুধু তাকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি,তাকে অপবাদ দেওয়া হয়ে মোবাইল চোর হিসাবে। মুলতঃ বিউটি বেগমের পরকীয়া বা অবৈধ সম্পর্ক যাতে না প্রকাশ হয় তাই এই হত্যাকান্ড চালানো হয়েছে। তাহলে চিন্তা করুন, আমাদের মানবিক মুল্যবোধ ও নৈতিকতা কোথায় পৌঁছিয়াছে?

তিন. গত নভেম্বর মাসের ২ তারিখে রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় ঘটে যায় আর একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা। বাবা-মেয়েকে হত্যা করা হয় স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্কের কারণে। স্বামী জামিল শেখ ও ছোট অবুঝ শিশু নুসরাতকে পিটিয়ে এবং বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। স্ত্রী আরজিনা ও তার পরকীয়া প্রেমিক গাড়ি চালক শাহীন মল্লিক। দীর্ঘদিন থেকে সাবলেটে থাকা শাহিন মল্লিককে আরজিনার চোখের সামনে স্বামীকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ  করে এবং নিজের মেয়েকে হত্যা করার হুকুম দেয় জন্মদাতা মা। পরে এটাকে ডাকাতির ঘটনা হিসাবে সাজাতে চায়। তাহলে চিন্তা করুন কোথায় হারিয়ে গেছে আমাদের মানবিক মূল্যবোধ? কি আমাদের মানসিকতা?


চার. বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার একটি কলেজ অধ্যক্ষকে পিটিয়ে মারাত্মক ভাবে জখম করে দলীয় কিছু ক্যাডার? অধ্যক্ষের অপরাধ ছিল একজন নেতার কলেজ কমিটিতে মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সে নেতার আবার কমিটিতে মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করে এ ক্ষেত্রে নতুন একজনকে অবৈধভাবে অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ দেয়। নেতাদের অবৈধ কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার জন্য অধ্যক্ষকে চরম মারপিটের শিকার হতে হয়েছে। তাহলে বলুন, কোথায় আমাদের মানবিক মুল্যবোধ।


পাঁচ. বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলার জিয়ানগর ইউপি’র হেলেঞ্চা মীরপাড়া গ্রামের ওয়ার্ড পর্যায়ের এক নেতার কু-পুত্র ছেলে হুজাইফাতুল ইয়ামিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ফলে ৯ম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী রোজিফা আকতার সাথীকে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নিতে হয়। যে মেয়েটি ক্লাসের প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হতেন, পিএসসি এবং জেএসসি পরীক্ষায় যে মেধার  স্বাক্ষর রেখে গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়েছিল,তাকে বেছে নিতে হলো আত্মহত্যার পথ। শুধু অপমানের কথা সহ্য করতে না পেরে। তাহলে আমাদের আগামী প্রজন্মের কিরূপ মানবিক মূল্যবোধের অধিকারী হচ্ছে।


ছয়. সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার আমানপুর গ্রামের তরুণী রূপা খাতুন এর মতো উজ্জীবিত যে স্বপ্ন দেখতো। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিল দেশ গড়ার অগ্রযাত্রায়। কিন্তু সম্ভাবনাময় তরুণীকেও চলন্ত বাসের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হতে হলো। হিং¯্র অমানুষের দল তাকে শুধু ধর্ষণই করেনি তাকে হত্যা করে তার লাশ বাস থেকে ফেলে দিয়েছিল বগুড়া-ময়মনসিংহ রোডের শালবন এলাকায়। তাহলে চিন্তা করুন, আমাদের মানবিক মূল্যবোধ কোথায়?


সাত. নিজের  প্রেমিকাকে পছন্দ হওয়ায় অন্তরঙ্গ বন্ধুকে গ্রীলমিস্তি আবুল কালামকে হত্যা করে নিজের ঘরে মেঝেতে লাশ পুতে রাখে আর এক বন্ধু শামীম হোসেন এবং তার এক সহকর্মী স্বাধীন। মোবাইলের সুত্র ধরে পরে পুলিশ শামীমকে গ্রেফতার করলে, পরে সে স্বীকার করেছেন সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুকে হত্যা করে চাপাতির আঘাতে।
আট. বরগুনা জেলায় আমতলী উপজেলায় প্রেমিক নিজে প্রেমিকা মালা আক্তারকে সাত টুকরা করে হত্যা করে এবং পরে কয়েক টুকরা লাশ পাচার করতে চেয়েছিল যদিও পরে চেক পোষ্টে ধরা পড়ে। পরে পুলিশ প্রেমিক আলমগীর হোসেন পলাশকে গ্রেফতার করে। প্রেমিকার দাবি ছিল তাকে বিবাহ করার । তাহলে চিন্তা করুন আমাদের কতটা মানবিকতা?


নয়. সর্বশেষ বাংলাদেশ বিমানের চাকা খুলে পড়ে আকাশ থেকে। যখন বিমান যাত্রা করে সৈয়দপুর থেকে ঢাকার দিকে। তাহলে চিন্তা করুন বিমানের দায়িত্বশীলরা কতটুকু দায়িত্ববান? উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে কি আমরা আমাদের মানবিক মুল্যবোধকি হারিয়ে ফেলছিনা? আসুন আমরা হারানো মানবিক মুল্যবোধকে ফিরে বাংলাদেশকে একটা সোনার বাংলাদেশ গড়ি।
লেখক : সাংবাদিক-কলেজ শিক্ষক  
mamun_bd1976@yahoo.com
০১৭১১-০১০১২১

এই বিভাগের আরো খবর

নতুন অতিথি শীত

য়দ আহমেদ অটল:আর সব ঋতু থেকে শীতের ভিন্নতা আছে। অন্যসব ঋতু গোপনে এসে অনেকটা গোপনেই চলে যায়। একমাত্র বসন্ত ছাড়া। আর শীতের গর্ভেই তো বসন্তের জন্ম। গ্রীস্মের দোর্দন্ড প্রতাপ এখন জীবনকে বিষিয়ে তোলে। তবে শীত আমাদের জানান দিয়েই আসে। শীত কে-না ভালোবাসেন। তাই আমাদেরও থাকে শীতের প্রস্তুতি। শীতের সেই প্রস্তুতি চলে ঘরে ঘরে। শহর-বন্দর-গ্রাম সর্বত্র শীতের একটা আলাদা আদর আছে। শীতের আছে ভিন্ন এক ভালোবাসা। শীতে আছে ওম, আছে উষ্ণতা। এখন প্রায় সারাদেশেই শীতের আমেজ। মাঠে মাঠে নতুন ফসল গুনগুনিয়ে গান গায়। ধানের শীষে দোলা দিয়ে যায় ঠান্ডা বাতাস। কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে ফসলের কাটা-মাড়াইও। ধান গাছে দোলা দেয়া বাতাসে কৃষক আছেন ফুরফুরে মেজাজে।

 যদি ফসলের উৎপাদন খরচটা উঠে ঘরে বাড়তি কিছু আসে। সেই আশায় অগ্রহায়ণে প্রাণ জুড়াবে কিষাণ-কিষাণী। যদি গত বন্যার রেশ কেটে বাড়তি ফসল ওঠে তবেই এক আলাদা আনন্দ, আলাদা ভালোবাসা। প্রতি বছরই শীতে আসে নতুন ফসল, সাথে সেই নতুন ভালোবাসাও। এই শীত যেমন পুরনো হয় না, তেমনি ভালোবাসাও। এখন গ্রামের মেঠো পথের ঘাসের ডগায় আর সবজি গাছের পাতায় পাতায় আছে শিশিরের আহ্বান। সবুজ ঘাসের মাঠে পা রাখলেই শোনা যায় শীতের গল্প। যেন নতুন রুপে সেজেছে চেনা প্রকৃতি অচেনা হয়ে। শহর-গ্রামে রাতগুলো মনের আনন্দে ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে মায়াবী পরিবেশ উপহার দিচ্ছে। সন্ধ্যায় নামছে হিমেল বাতাস। রাজপথ মাতিয়ে গলা ছেড়ে হাঁকডাক আছে সিদ্ধ ডিমওয়ালার। শেষ রাতে গায়ে জড়াতে হচ্ছে নকশী কাঁথা। সাত সকালে চায়ের দোকানে খেজুর গুড়ের ঘ্রাণ মন মাতিয়ে দেয়। আর শীত মানেই তো পিঠা। শীত এলে গ্রাম-গঞ্জের ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়। স্বজনদের আপ্যায়নে পিঠা তো থাকাই চাই। এসব পিঠার মধ্যে আছে দুধ চিতই, ভাপা, পাটি শাপটা, নারকেলের কুলের পিঠা আরও কত রকমারি পিঠা। চুলার পাশে বসে গরম ভাঁপা পিঠা খাওয়ার স্বাদই নাকি আলাদা।

 এই শীতকে উপলক্ষ করে ঘরে ঘরে চলে প্রস্তুতি। শীত আসবে বলে কথা। আর সব ঋতুতে এমনটা দেখা যায় না। শীতের আরেক উৎসব নবান্ন। নতুন ফসলের সে এক আরেক আনন্দ। রাজধানীতে পহেলা অগ্রহায়ণ নবান্ন উৎসব পালিত হয়েছে। খবর এসেছে- এবারের শীতে ঠাকুরগাঁও থেকেও দেখা যাচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া। হিমালয় পর্বতমালার অংশ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে প্রতিদিন মানুষ ভিড় করছেন। ঠাকুরগাঁয়ের সদর উপজেলার বুড়িরবাঁধ এলাকায় এছাড়াও ঠাকুরগাঁও শহরের চৌরাস্তা, বাসস্ট্যান্ড, টাংগন ব্যারেজ, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে উত্তর দিকে তাকালেও কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া দেখা যাচ্ছে। ভারতের সিকিম ও নেপালের সীমান্তাঞ্চলে অবস্থিত এ পর্বতের চূড়া অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ওই এলাকাগুলো থেকে দেখা যায়। দর্শনার্থীদের ভাষায় ‘এখন সূর্যের হালকা আলোয় চূড়াটি জ্বল জ্বল করছে। সূর্যের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চূড়াটি লাল হয়ে ওঠে। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে আগে থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা চূড়া দেখা যায়।


আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী রাজধানীতে এখনো শীত আসেনি। আবহাওয়া অফিস বলেছিল কয়েকদিনের বৃষ্টি আর সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপে রাজধানীতে শীত জেঁকে বসবে। সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে অগ্রহায়ণের প্রথম দিন আকাশ মুখ গোমড়া করেছিল বটে কিন্তু শীত আর আসেনি। তবে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। প্রতিবছরই সারাদেশের তুলনায় রাজধানীতে শীত আসে দেরিতে। আবার বিদায়ও নেয় আগে- ভাগে। যেন তার কতই তাড়া! সেই শীত হাঁটি হাঁটি পা পা করে রাজধানীতে আসছে। শেষ রাতে শীত শীত ভাব থাকলেও দিনে আবার গরম। তবে রাজধানীতে শীত আসুক বা না আসুক ভাপা পিঠা পাওয়া যাচ্ছে সর্বত্র। ছোট বড় সব শহরেই বার মাস চিতই পিঠা পাওয়া গেলেও ভাপা পাওয়া যায়না। ইতিমধ্যে রাজধানীর পথের মোড়ে মোড়ে পাওয়া যাচ্ছে গরম ভাপা পিঠা। বাজারে উঠতে শুরু করেছে শীতের সবজি। ফুলকফি, বাঁধা কফি, সিমসহ আরও সব সবজি।

 তবে দামের কথা বলবেন না। এই শহরে কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া পণ্যের দাম বাড়ে। দাম বৃদ্ধিটা যেন অনেকটা ছেড়ে দেওয়া গরুর মতো। যে মাঠে খুশী সেই মাঠে ঘাস খায়। যখন খুশী বৃদ্ধি পায়। যেন দেখার কেউ নেই। আসলে দেখার দায়িত্বে কেউ না কেউ আছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি সে দায়িত্ব পালন করেন না। সেদিন সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী বললেন- বাজারে এখন চালের দাম স্বাভাবিক। এ নিয়ে আপত্তি দেখলাম ফেসবুকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সব আওয়াজ পাওয়া যায়। রাজধানীর লেপ-তোষকের দোকানে এখন শীতের পুরো আমেজ। দোকানীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। পাড়া-মহল্লায় হাক-ডাক শোনা যাচ্ছে ‘লেপ-তোষক বানাবেন, লেপ-তোষক’। তার মানেই- শীত এসেছে দ্বারে। সেই সাথে ফুটপাত গুলোতে এসেছে শীতের পোশাক- বাহারি কম্বল আর নকশী করা কাঁথা। ব্যবসায়ীদের মতে, শীতেই তাদের ব্যবসা জমে বেশি। শীতে যে বিকিকিনি শুরু হয় তা চলবে রোজ পর্যন্ত। নগর জীবনে শীত আসে ভিন্ন আমেজে। পীচ ঢালা রাজপথে এক ঘেয়ে ছুটে চলা নাগরিক জীবনে শীত মনে-প্রাণে আমেজ ছড়িয়ে দেয়। পরিবেশের ‘বৈরীতার কারণে’ শহর-নগরে বছরের অধিকাংশ সময় তাপমাত্রার তীব্রতা বেশি থাকে।

 আর গাছপালা পরিবেষ্টিত গ্রাম-গঞ্জে বাতাসের ছায়ায় মানুষ প্রাণ জুড়ায়। নগরে সেই সুযোগ নেই। যা কিছু পার্ক এখানে- সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল তা হারিয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে ইমারত, দালান-কোঠা। বাণিজ্যিক ভবন। এখানে টাকার গরম, ক্ষমতার গরম এবং আবহাওয়ার গরমে শীত নগর জীবনে প্রিয় একটি সময়। স্কুল- কলেজের পরীক্ষা শেষে এই শীতেই জমে উঠবে পিকনিক। শীতে ফুল ফোঁটে বেশি। কিন্তু নগরে গাছও নেই, ফুলও নেই। ফুল আসে শাহবাগে, রাজধানীর বাইরে থেকে। শাহবাগ সেই ফুল ছড়িয়ে দেয় গোটা রাজধানী। নগরের মানুষের ফুল দেখার সময় নেই। ট্রাফিক সিগনালে ব্যক্তিগত গাড়িগুলো থমকে দাঁড়ালে ফুলের মালা নিয়ে দৌড়ে যায় রনবী’র টোকাইরা। সাহেব- মেম সাহেবরা জানালার কাঁচ খুলে কেউ কেউ ফুল কেনেন। কেউ রজনীগন্ধা কেউবা গোলাপ। আমরা সেই ছোট বেলায় শীতের সাত-সকালে পাড়ার বাসা-বাড়িতে শেফালী ফুল চুরি করতে যেতাম। অথবা গাছ থেকে পড়া ফুল কুড়িয়ে নিতে। হবিটা ছিল মালা গাঁথার। সেই ফুলের সৌরভ টেনে নিয়ে যেত অচেনা ভালোবাসায়। আদর করে মা তার মেয়ের নাম রেখেছিলেন শেফালী। সেই শেফালী সৌরভ ছড়ায় ঘরে ঘরে।

ফুটপাতের শীত
রাজধানী থেকে শুরু করে শহরের ফুটপাতের মানুষদের কাছে শীত আসে ভিন্নভাবে। যাদের আমরা বলি ছিন্নমূল মানুষ। শীত তাদের জন্য তেমন একটা ‘ভালোবাসা’ নিয়ে অসে না। কেননা শীত তাদের জীবনে উপস্থিত হয় কষ্ট দিতে। শীতের আমেজ তাদের জন্য নয়। ঝুপড়িতে বাস করে ঠান্ডা কনকনে বাতাসে তাদের ওম নিতে হয় কাঠ-খড়ের আগুন জ্বালিয়ে। ছেঁড়া কাথা চেপে শরীরের তাপকে ধরে রাখতে ব্যর্থ চেষ্টা করে। এ এক ভিন্ন জীবন। এটা মানুষের জীবন নয়। একই আকাশের নীচে, একই বাতাস নিয়ে, রক্তের রং একই হওয়া সত্বেও সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদ। কোন মানুষই একগাদা ধন-সম্পদ নিয়ে জন্মায় না। আবার মৃত্যুর পর অর্জিত সম্পদ নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার কোনো সুযোগও নেই।

 তার মানে এই সমাজই মানুষে মানুষে ব্যবধান সৃষ্টি করে রেখেছে। সমাজের কিছু লোক আছেন যারা ফুটপাতবাসী বা গরিবদের জন্য শীতবস্ত্র নিয়ে হাজির হন। রকমারি ছবি তুলে খবরের কাগজে তা ছাপিয়ে, টেলিভিশনে ছবি দেখিয়ে ‘মহান’ হতে চান। এ এক বিচিত্র মানসিকতা। আবার মধ্যরাতে কেউ কেউ শীত বস্ত্র নিয়ে হাজির হন ফুটপাতে। যারা ফুটপাতের অধিবাসী তারাও জানে ব্যাপারটা। তাই তীর্থের কাকের মত শীতল শরীর নিয়ে অপেক্ষা করেন একটি শীতবস্ত্রের জন্য। আমি বলি- ‘ওরা শীতে মরে, এরা ছবি তোলে’। দেশটা স্বাধীন হয়েছিল সবার জন্য। রক্ত দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই সব মানুষেরা কতটা সুখে আছেন সে প্রশ্ন তো আছেই। কনকনে শীতে ফুটপাতে ঘুম খুঁজে পাওয়া দুস্কর। ঘুম ওদের থেকে নির্বাসিত।  
       
আসছে অতিথি পাখি
শীতে আমাদের দেশে অতিথি হয়ে আসে পাখি। তাই তাদের বলা হয়, অতিথি পাখি। সবুজের ছায়া ঘেরা প্রকৃতির মোহে পাখিরা আমাদের কাছে আসে, ভালোবাসা নিয়ে- ভালোবাসা দিতে। তাই বলাই যায়- পাখিরাও আমাদের ভালোবাসে। সব দেশে পাখিরা যায় না। সংবাদপত্রে খবর এসেছে নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যের সন্ধানে এ বছর শীত মাথায় নিয়ে আসতে শুরু করেছে অতিথি বা পরিযায়ী পাখি। প্রতি বছরই এই পাখিরা আসে। অতিথি পাখির আশ্রয়স্থল মূলত হাওড় অঞ্চল। বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, পাবনার চলন বিল এ জন্য বিখ্যাত। এই সব পাখি আসে ভারতের মেঘালয় এমনকি সুদূর সাইবেরিয়া থেকে। পাখিদের অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত রাজধানী লাগোয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এ বছর অক্টোবরের শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয় সুইমিং পুলের কাছের লেকটিতে প্রথম অতিথি পাখি আসতে দেখা গেছে বলে খবর হয়েছে।

প্রতি বছরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি পাখি নিয়ে মেলার আয়োজন করা হয়। আসছে জানুয়ারিতে বসবে সেই মেলা। ইস, পাখিরা যদি জানতো- ওদের জন্য আমাদের কত মমতা তবে নিশ্চয় ওরা আমাদের আরও ভালোবাসতো। মনে হয় পাখিরা আমাদের দরদের কথাও জানে- তা না হলে ওরা সেই সাইবেরিয়া-মেঘালয় থেকে আমাদের কাছে আসবে কেন! এই হলো শীতের বাংলাদেশ।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট    

০১৫৫২-৩২২৯৪২

এই বিভাগের আরো খবর

ছোট মন নিয়ে বড় জাতি গড়া যায় না

আতাউর রহমান মিটন :মানুষের হৃদয় যেখানে ভেঙে যায়, হৃদয়ের ছোঁয়ার যেখানে অভাব, সেখানে আমরা কেউই বাস করতে চাই না। ভালবেসে বিয়ে করার পরেও, সারাজীবন একত্রে থাকার অঙ্গীকারের পরেও, সাত পাঁকে নিজেদের বাঁধার পরেও, সেই হৃদয়ের উষ্ণতা যখন কমতে শুরু করে তখন মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশ্য কখনও কখনও সেই বিচ্ছিন্নতা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। একই ছাদের নীচে বাস করে বটে কিন্তু হৃদয়ের আঙিনায় ছোটাছুটি করে না। পরস্পরকে আলিঙ্গন করে না পরম মমতায়!


‘ভালবাসা’ শব্দটা উচ্চারণের সাথে সাথে আমাদের মানসপটে একটি নারী-পূরুষ ‘লাইলী-মজনু’ বা ‘রোমিও-জুলিয়েট’ হয়ে উদ্ভাসিত হয়। আমরা ঐ কাহিনীগুলোকে শ্রেষ্ঠ প্রেমের গল্প বলে জানি। কিন্তু ওগুলো সবই বিচ্ছেদের গল্প। তাহলে কি বিচ্ছেদই আসলে প্রেম? না আমি তা মনে করি না। প্রেম কখনই বিচ্ছেদ নয়। প্রেম আসলে যুক্ততা। প্রেম আসলে ‘ক্ষমা’ দিয়ে সমুখে এগিয়ে যাবার সক্ষমতা’। এটা নারী-পুরুষের বিষয় যেমন, নেতা ও জনগণের বিষয়ও তেমন। আমরা বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ভবিষ্যতের শাসনভার মূলতঃ দুটি প্রধান দলের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। আর ঐ দল দুটি পরস্পর হিংসায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের হিংসা বা প্রতিহিংসার ‘বলি’ হচ্ছি আমরা সাধারণ জনগণ।


আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছি বিধায় ‘ভালাবাসা’ দিয়ে কাউকে জয় করার শিক্ষা নিচ্ছি না। আমরা একজনকে পুঁতে ফেলে বা দাবিয়ে রেখে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার চেষ্টায় মত্ত। আমাদের শিক্ষার ভেতরেই সেই গলদটা রয়ে গেছে। কেমন করে? একটা সত্য গল্প বলি। আমি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি। শিক্ষকদের সাথে এক সভায় আমি সেদিন প্রস্তাব করলাম, আগামী বছর থেকে আমাদের বিদ্যালয়ে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ইত্যাদি বাদ দেয়া হোক। কারণ, একটা ক্লাসে দু’জনকে প্রথম করা যায় না। কোন না কোনভাবে শিক্ষক শেষ পর্যন্ত একজনকে একটু বেশি নম্বর দিয়ে প্রথম করে দেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা কেউ জানতে পারে না। আমি বললাম, এটার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, আমাদের শিক্ষকমন্ডলী আমার কথা মেনে নিলেন বটে কিন্তু তারা মেনে নিতে পারলেন না।

 একজন বলেই বসলেন, ‘আমরা অভিভাবকদের কাছে কি জবাব দেব’? সত্যিই তো! অভিভাবক হিসেবে আমরা সবাই আমাদের সন্তানদের প্রথম বা দ্বিতীয় দেখতে চাই। ‘আমরা সবাই ভাল’, ‘সবাই সমান’ এই শিক্ষাটা আমরা নিজেদের জীবনে পাইনি। সে কারণে নিজেদের সন্তানদের আমরা অশুভ প্রতিযোগিতার পাঁকে ফেলে দিতেই আমাদের যত আনন্দ! সে কারণেই ৬৯% শতাংশ অভিভাবক স্কুলে শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে সম্মত। এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই!


অসহ্ষ্ণিুতার এই সত্যটা আমাদের জীবনে আরও নানাভাবে জায়গা করে আছে। আজকাল পরিবারের মধ্যেই শিশুদের প্রাণ হারাতে হচ্ছে। কখনও কখনও পরম ‘মমতাময়ী মা’ অবতীর্ণ হচ্ছেন ঘাতকের ভূমিকায়। হত্যা করছেন কোলের সন্তান। সন্তানের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন বাবা বা মা। এই যে অসহিষ্ণুতা, এই যে ঘৃণা, এই যে ধ্বংসাত্মক আচরণ এই সবই আমরা শিখছি, আমরা আয়ত্ব করছি আমাদের জাতীয় জীবন থেকে। আমরা একটি দরদি সমাজ গঠনের চেয়ে, সকলের জন্য সমান সুযোগের দেশ গঠনের চাইতে অপরজনকে দাবিয়ে রেখে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার যে অশুভ পাঁয়তারা চালাতে শিখছি, তা আমাদের হৃদয়কে বিকশিত করছে না, বরং সংকুচিত করছে।  


আমি শুধু সমস্যার কথা তুলতে চাই না। আমাদের সমস্যা সমাধানের পথে চলতে হবে। দিন বদলাতে হবে। সংগঠিত হতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে জমিতে চাষীর পা পড়ে না, সেখানে আগাছায় ভরে যায়। দেশ রাজনৈতিক দলগুলোই শাসন করবে কিন্তু দলগুলোর দায়িত্ব বা নেতৃত্ব যেন অসুরের হাতে চলে না যায়। এটা সত্য যে, সমাজে ভাল মানুষেরা আজ পরস্পর বিচ্ছিন্ন, কিন্তু দৃর্বৃত্তেরা খুবই সংগঠিত। তারা চাইলেই হরতাল করতে পারে। গাড়ি বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু ভাল মানুষেরা এখন প্রতিবাদও করতে পারে না। সবার মধ্যেই আজ যেন ‘… সদা ভয়, সদা লাজ, পাছে লোকে কিছু বলে’! লোকে পেছনে কি বলবে সেটা ভেবে আমরা যদি শামুকের মত নিজেদের গুটিয়ে রাখি তাহলে সমাজটা বাসের উপযোগী থাকবে না।  


গত ডিসেম্বরে জাপানের সিজুওকা গিয়েছিলাম। কপাল ভাল ছিল, শহরের কোল ঘেঁষে পরম মমতায় দাঁড়িয়ে থাকা ফুজি পাহাড়টিকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। মিসিমা শহরের এক পাহাড়ে বসানো বাইনোকুলার দিয়ে বরফে আচ্ছাদিত ফুজি পাহাড়ের চূড়াটাকে উপভোগ করেছি ¯িœগ্ধতায়! কি চমৎকার অভ্রভেদী সৌন্দর্য! এমনি সৌন্দর্য ভিন্নভাবে আমাদেরও আছে। আমাদের আছে বিশাল হৃদয়ের সমুদ্র। যার পাশে গেলেই আমাদের মনটা বিশাল হয়ে ওঠে। সেখানে গেলেই আমরা হৃদয় অনুভব করি। হৃদয় কি তাহলে অন্য কোথাও নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু বিশালের পাশে গেলে সেটা আরও বড় হয়ে যায়। আমাদের জ্ঞানের চোখ খুলে যায়। কারণ সত্য জ্ঞানের উৎস মানুষের হৃদয়। সে কারণেই মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় কিছু নাই।


আমরা আমাদের নেতাদের কাছে হৃদয়ের বিশালত্ব দেখতে চাই। একলা মানুষ টুকরা মাত্র। যে যত একা, সে তত ক্ষুদ্র! সবাইকে নিয়ে থাকাটাই বিশালত্ব। ঘরের ভেতরে থেকে ফুটো দিয়ে বাইরে সামান্যই দেখা যায়। কিন্তু ঘরের ছাদে এসে বা ঘরের বাইরে মাঠে এসে দাঁড়ালে দেখা যায় বিশাল আকাশ! দেখা যায় আরও অনেক কিছু। একইভাবে, জীবনকে, রাজনীতিকে, দেশ পরিচালনাকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দেখলে সবটা দেখা হবে না। এতে করে মনের ভেতরে বিশালত্ব ভর করে না। আকাশ না দেখলে, সমুদ্র না দেখলে কে বুঝবে বিশালত্ব আসলে কাকে বলে? আকাশে চাঁদ একা থাকলে ততটা ভাল লাগত না যদি না সেখানে হাজার তারা থাকত। হাজার তারার ভেতরে পূর্ণিমার চাঁদ তার অপরূপ রূপে আমাদের কাছে উদ্ভাসিত হয়।

 আমাদের হৃদয়ে প্রেম জাগ্রত হয়, আমরা হিংসা দূরে সরিয়ে প্রেমে ভেলা ভাসাই!
সেজন্যই আমরা সুন্দর রাজনীতির পাঠশালা চাই। আমরা নেতার কুটিলতা, কদর্য, হিংসায় পূর্ণ চেহারা নয়, পবিত্র, ¯িœগ্ধ, কোমল হৃদয়ের সৌরভ উপভোগ করতে চাই। নেতাকে আমরা মাঠে নামতে অনুরোধ জানাই। একটা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করে একটা সুন্দর খেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ চাই। সেটা নির্বাচন হোক কিংবা বিচারালয়! ক্ষমতার দৌরাত্মে সবকিছু ‘আমার’ স্বার্থে পরিচালনা না করে, অধঃপতনের পথে না হেঁটে না সকলকে সাথে নিয়ে বিকাশের পথে হাঁটার আহ্বান জানাই। আমরা চাই, আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দ আমাদের স্বপ্ন দেখাবেন, তারা আমাদেরকে দুর্বৃত্তায়ন শেখাবেন না। আমরা সুন্দরের সাথে বাস করতে চাই। কারণ, সুন্দর হতে হলে সুন্দরের কাছে যেতে হয়। সুগন্ধির সাথে চললে নিজের গায়েও সুগন্ধ লেগে যায়, যেমন ঘটে দুর্গন্ধেও!  


মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। কেউ বাঁচতে পারবে না। কিন্তু বেঁচে থাকে কি? মানুষের কর্ম। মানুষের লেখালেখি। পৃথিবীর আলো যদি কারও মধ্যে জ্বলতে থাকে তাহলেই সে পৃথিবীর অন্ধকার দূর করতে পারবে। মানুষের মধ্যে আলো কোথা থেকে জ্বলে, ওর মধ্যে কি বাল্ব থাকে? আলো থাকে হৃদয়ে। হৃদয়ের আলো অন্তহীন, অফুরান। কারণ সেটা সৃষ্টিকর্তার দান।


আমরা সবাই জানি, মাটির গায়ে সুগন্ধ না থাকলেও ঐ মাটির বুকে জন্মানো গোলাপ ভরে থাকে সুগন্ধে। একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আমাদেরকে পৃথিবীর সুন্দরতম সৃষ্টিগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে, বাড়িতে বাড়িতে সুগন্ধিময় গোলাপের চাষ বাড়াতে হবে। মানুষের দুঃখে কাঁদতে পারে এমন শিশুর মত কোমল হৃদয় সম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।


অনেকেই মনে করেন, দেশটা অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। বিশেষ করে মাদকের সর্বনাশা ছোবলে আমাদের প্রায় প্রতিটি ঘরে আজ অশান্তির আগুন জ্বলছে। আর এই সর্বনাশা মাদকের বাণিজ্য চলছে এক শ্রেণির রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়ে। সবাই সবকিছু জানে। সভা, সমাবেশ, বিবৃতি, লোক দেখানো গ্রেফতার সবই হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই পাল্টায় না। বরং হাজত বা জেল থেকে বেরিয়ে এসে দুর্বৃত্তরা আরও প্রতাপশালী হয়ে ওঠে।


নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে। রংপুরসহ দেশের ৬টি সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আগামী বছরে হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে জেতাটা একটা পুরস্কার বটে! আর সেই পুরস্কার পেতে সবারই ভাল লাগে। কিন্তু সত্যিকারের নেতৃত্ব কখনই পুরস্কারের প্রত্যাশা করে না। কারণ, নির্বাচনে সব সময় জয় হবে এমন কোন কথা নেই। ভোটে জিতে ক্ষমতায় যাওয়া আর মানুষের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য আসন ধরে রাখা এক নয়। মরে গেলে দেশের ক্ষমতা হারাতে হয়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জয় করা আসন মরণেও হারায় না। সেটা যদি আমরা বুঝতে না পারি তাহলে আমাদের দেশকে আমরা আলোর পথে নিতে পারব না।


যার মন সুন্দর নয়, তার পক্ষে সুন্দরের চর্চ্চা করা কঠিন। যে নেতা ক্রমাগত টাকার পেছনে পাগলের মত ছুটছেন, যিনি টাকাকে প্রায় ঈশ্বরের জায়গায় বসিয়েছেন, সেই মুখচেনাদের বদল করতে হবে। ভোট দিতে হবে সুন্দরের সপক্ষে। জীবনটা সাপলুডু খেলা নয়। জীবন একটাই। সুন্দর জীবন গড়তে মানবিক নেতৃত্ব চাই। ছোট মনের পরিচয় দিয়ে বড় জাতি গড়ে তোলা যাবে না। অপশক্তির বিরুদ্ধে সুন্দর মনের মানুষগুলোকে আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মনের ভেতরে প্রেম জাগিয়ে তুলতে পারলে শক্তি আপনা থেকেই বাহুতে ভর করবে। মনের শক্তি জেগে উঠবে সকল প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে। সত্য ও সুন্দরের জয় হোক।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯

 

এই বিভাগের আরো খবর

গ্রহণযোগ্য ও জবাবদিহিতার নির্বাচন

মোহাম্মদ নজাবত আলী:আমাদের দেশের নাম সাংবিধানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার গণতান্ত্রিক। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সরকার পরিবর্তন, বহালের মূল নিয়ামক শক্তি। এর বাইরে যাওয়া গণতন্ত্রের বিধান নয়। সংবিধানের ভিতর থেকেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এবং সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে এটাই স্বাভাবিক।সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের মেয়াদ ৫ বছর। সরকার মেয়াদ শেষে জাতীয় সংসদের নির্বাচন হবে ২০১৮সালে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন করতে হবে। আবার এ কথাও বলা আছে, তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৯০দিনের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে এমনটি বলা আছে। কিভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা যায় সে লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন, দেশের রাজনৈতিক দল ও বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে সংলাপও সম্পন্ন করেছেন। ইতিমধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় দু’টি দলের মধ্যে ব্যাপক তোড়জোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 বর্তমান শাসক দল আবারও ক্ষমতায় আসতে চায়। অন্যদিকে বিএনপি মনে করছে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হলে তারাই সরকার গঠন করবে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারিতে যে নির্বাচন হয়েছিল তা গণতান্ত্রিক ধারাই অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন না। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় সরকারকে নির্বাচন করতে হয়েছিল। যদি নির্বাচন না হতো তাহলে দেশে সাংবিধানিক ধারায় বিপর্যয় ঘটতো এবং অসাংবিধানিকভাবে সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশংকা ছিল। গত নির্বাচনে বিএনপি না এলে কতগুলো ছোটখাটো দলকে সাথে নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে শতকরা কতভাগ ভোট পড়েছিল তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা যে কোনো রাজনৈতিক দলের অধিকার রয়েছে। বিএনপি অংশ না নেয়ায় তারা সে নির্বাচনকে এক তরফা বলেন। ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ না করলে সেটাতো এক তরফা হবেই এটাতো স্বাভাবিক। তবে এবার নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে বলে দেশবাসী প্রত্যাশা করে। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না এলে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয় না। এবারে নির্বাচনে জাতীয় পার্টি নাকি ৩০০টি আসনে শুধু প্রার্থীই দিবেনা তারা নাকি সরকারও গঠন করবে !

 
আমাদের দুর্ভাগ্য যে প্রতি ৫বছর পর নির্বাচনের সময় এলেই রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যায়। এর মূল কারণ কোন পদ্ধতি বা কার অধীনে নির্বাচন হবে। আমাদের রাজনৈতিকদলগুলো এখনো এ বিষয়ে কোনো ঐক্য মতে পৌঁছিতে পারেনি। আওয়ামীলীগ বার বার বলে এসেছে, আসছে নির্বাচন হবে সংবিধান মোতাবেক। সংবিধানের বাইরে তারা যাবেন না। কারণ তারা যদি সংবিধানের বাইরে যায় তাহলে তারা বিপদে পড়তে পারে। তারা ক্ষমতায় থেকে ছিটকে পড়লে তাদের নেতাকর্মীরা বিপদে পড়বে হয়তো যানমালের ক্ষতি হতে পারে এমনকি তাদের দেশ ছাড়া করা হবে (এমন কথা বলেছিলেন ওবায়দুল কাদের)। তাই আওয়ামীলীগকে আবারও ক্ষমতায় আসতে হবে নইলে তাদের সামনে বড় বিপদ। আমাদের দেশে যে দলই হোক ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় থাকতে না পারলে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হবে। কারণ নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে পূর্ববর্তী সরকারের অনেক পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা(উন্নয়ণ প্রকল্প) বাতিল করা হয়। আর এটা করা হয় প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে। এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধরনের সংস্কৃতি চলে এসেছে অনেক আগে থেকেই।


অথচ উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে এ ধরণের সংস্কৃতি নেই। পূর্ববর্তী সরকারের ভালো কাজ অব্যাহত ও পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হয়। যা হোক বিএনপি চাচ্ছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। তারা কখনো সহায়ক সরকার তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের কথা বলছেন। এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে তারা ক্ষমতায় যাবে বলে তাদের বিশ্বাস। আর যেতে না পারলে তাদের অস্তিত্বও সংকটে পড়বে। বিএনপির দাবী সহায়ক, তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক। বিএনপির দাবী অনুযায়ী সরকারের রূপরেখা সংবিধানে নেই। সংবিধানের বাইরে বিএনপির এ দাবী কি শাসকদল মেনে নিবে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা এ দাবী মেনে নিবে না। কারণ আওয়ামীলীগ অনেক আগে থেকেই বলছে আগামী নির্বাচন হবে সংবিধান মোতাবেক, আর বিএনপির দাবী অনুযায়ী নির্বাচন করতে হলে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে।

 

বিএনপি কি সংবিধান পরিবর্তন করতে সরকারকে বাধ্য করতে পারবে? সাংগঠনিক শক্তি ও সক্ষমতা বিএনপির রয়েছে? তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামীতে নির্বাচন হবে সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে হয় আলোচনা করে তার একটি পথ বের করবো। আমরা চাই মানুষ মৌলিক ও সাংগঠনিক অধিকার প্রয়োগ করবে যার যার প্রতিনিধি সে সে বেছে নিবে। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য ইতিবাচক আমাদের আশান্বিত করে। অতিসম্প্রতি বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সোহরাওয়ার্দি সমাবেশ করতে গেলে সেখানে তাদের নেতাকর্মীদের গাড়ি বহরে বাধা প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। মানুষ তার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করতে গেলে তাদের সাধারণ মত প্রকাশের অধিকার দিতে হয়। রাজনৈতিকদলগুলোকে সভা সমাবেশ করার নিশ্চয়তা দিতে হয়। অর্থাৎ প্রতিটি রাজনৈতিকদলকে জনমত সৃষ্টিতে সমান অধিকার দেয়া অর্থাৎ যাকে  বলা হয় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। আর এটা অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ পক্ষপাতহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের জন্য বলা যেতে পারে পূর্ব শর্ত।

 আমরা অনেক সময় জ্ঞানীগুণী মণীষীদের বক্তব্য আমলে নিতে চাই না। যেমনটি আমরা মনে রাখিনা ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সে অমর উক্তি, তুমি যা বলছে তা আমি মানিনা, কিন্তু তোমার বক্তব্য উপস্থাপনে অধিকার আমি আমার জীবন দিয়ে রক্ষা করবো। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি যে নীতিতেই হোক, যে ক্ষেত্রেই হোক সব মানুষ যে একই সুরে একই কথা বললে এমনটি ভাবার কোনো যুক্তি নেই। যদি তাই হতো তাহলে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি বলতে কিছুই থাকবে না। মানব সভ্যতা থেমে যেত। প্রগতি বলে কোনো কিছুই থাকতো না। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই তাহলে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে মত প্রকাশের সুযোগ দেয়া উচিত।

 

যানজট, দেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার নামে মানুষের সভা, সমাবেশ, মিছিল করার গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়া যায় না। আবার গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, জননিরাপত্তা বিঘিœত করা স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। জাতীয় নির্বাচনে সাধারণত যারা জড়িত থাকে ইংরেজিতে বলে স্টেক হোল্ডার। এ স্টেকহোল্ডার প্রথমত ভোটার। অর্থাৎ সাধারণ জনগণ মনে করেন, তাদের তাদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের আশা পূরণ হবে, দেশভালভাবে পরিচালিত হবে। এছাড়াও যারা স্টেকহোল্ডার আছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিদলগুলো। কারণ যেসব রাজনৈতিক দল অংশ গ্রহণ করে তারা চাইলে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে হতে পারে। আবার এরা চাইলে নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা, এমনকি ভন্ডুলও হতে পারে। তাই একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাজনৈতিকদলগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশে ৪২টি নিবন্ধিত ছোট বড় রাজনৈতিক দল হয়েছে। এসব দলগুলোর মধ্যে নীতি, আদর্শ, ভিন্নতা থাকলেও এক জায়গায় মিল হয়েছে তা হলো জনকল্যাণ। আর ক্ষমতায় গিয়ে রাজনৈতিকদলগুলো জনগণের পাশে দাঁড়াতে চায় দেশ ও জনগণের মঙ্গল করতে চায় এটা স্বাভাবিক কেননা জনগণকে নিয়েই তো রাজনীতি, জনগণকে বাদ দিয়ে রাজনীতি চলতে পারে না। তাই ক্ষমতায় যেতে হলে জনগণকে নিয়েই যেতে হয়। ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের চূড়ান্ত রায় দেয়। সে রায়ে কোনো দল বা জোট সরকার গঠনের সুযোগ পায়। পক্ষান্তরে কোনো দল বা জোট বিরোধী দলে অবস্থান করে।

 

আওয়ামীলীগ, বিএনপি তাদের মিত্রদের নিয়ে জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়। আগামীতে হয়তো জোটবদ্ধ নির্বাচন হবে। ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হচ্ছে নির্বাচন। আর ক্ষমতায় যাওয়ার মূল শক্তি হচ্ছে জনগণ। অর্থাৎ জনগণই ঠিক করবে কোন দল বা জোটকে ক্ষমতায় বসাবে। তবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিকদলগুলোর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। কেননা একটি অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিকদলের সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে অংশগ্রগণকারী রাজনৈতিকদল বিশেষ করে বড় দু’টি দল যদি মনে করে তারা ভোট ডাকাতি করবে না, ব্যালট পেপার ছিনতাই করবে না, ভোটারদের বা প্রতিপক্ষকে ভোট কেন্দ্রে আসতে বাধা দিবে না বরং ভোটারদের ভোট প্রদানে উৎসাহিত করবে তাহলে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা খুব কঠিন কাজ নয়। তবে এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনেরও যথেষ্ট দায়িত্ব ও ভুমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক দলের স্বদিচ্ছা ও নির্বাচন কমিশনের সততা ও নিরপেক্ষতায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে পারে।


দেশবাসীর প্রত্যাশা আগামী নির্বাচন হবে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। কিন্তু এখন থেকেই নির্বাচন কোন পথে কোন পদ্ধতিতে, কার অধীনে হবে তার নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সোহরাওয়ার্দির সমাবেশে খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছেন, হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন, অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হবে না। তাই নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার জানিয়ে দিয়েছে আগামী নির্বাচন হাসিনার অধীনে নয় নির্বাচন হবে ইসির অধীনে। সে নির্বাচনে বিএনপিকে আসতেই হবে।

 

বিএনপির ‘না’ আওয়ামীলীগের ‘হবে’ এই নিয়ে আওয়ামীলীগ বিএনপি বলা যায় পরস্পর মুখোমুখী। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সহায়ক বা তত্বাবধায়ক সরকার বলে বর্তমান সংবিধানে কিছু নেই। বিএনপির দাবী অনুযায়ী তা করতে গেলে অবশ্যই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কিন্তু আওয়ামীলীগ সে পথে যাবে বলে মনে হয় না। আগামী নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের উচ্ছাস ও শংকা দেখা দিয়েছে।  শংকা এ কারণে যে, বড় দু’টি দল যদি নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকে তাহলে দেশে অরাজকতা বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্যের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। রাজনৈতিকদলগুলোর মধ্যে, আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকতে পারে কারণ সবাইতো একই পথে এক মতে চলবে না। কিন্তু কোন পদ্ধতিতে বা কার অধীনে নির্বাচন হবে এ নিয়ে ঐক্যমত জরুরি। রাজনৈতিক নেতাদের বোঝা দরকার ঐক্যমত তৈরি না হলে দেশে যে ভয়াবহ অবস্থা ও পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার খেসারত তো জনগণকে দিতে হয়। তাই জনগণের মন থেকে শংকা দূর করতে পারে দেশের বিজ্ঞ রাজনিতিকরা, আর তা হতে পারে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।


অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিকদলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত তৈরি হওয়া জরুরি ও নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা। কোন পদ্ধতিতে কার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিকদলগুলোকে ঠিক করতে হবে। এটা করতে যদি রাজনৈতিকদল বিশেষ করে আওয়ামীলীগ বিএনপি ব্যর্থ হয় এবং যদি কোনো অনাকাংখিত ঘটনা ঘটে তাহলে দেশ, জাতি, গণতন্ত্র হবে ক্ষতিগ্রস্ত। কেননা অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের সুখকর নয়।
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

এই বিভাগের আরো খবর

বর্তমান বিশ্বায়নে উৎপাদনমূখী সমবায়ের ভূমিকা

মোঃ শফিকুল আলম:শুরুতেই বলতে হয় পৃথিবীতে যত মহাদেশ আছে এশিয়া মহাদেশ একটি শান্তিকামী ও শক্তিশালী মহাদেশ। মহাদেশ সমূহের মধ্যে অন্যতম বললে ভুল হবে না। কেননা যে দেশটির কথা বলছি তারই স্বপক্ষে উদ্ধৃতি হিসেবে বলছি মানব সম্পদই দেশের চালিকা শক্তির উৎস। আর এশিয়া মহাদেশ এর একটি অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ সম্ভাবনাময় উন্নয়নশীল বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে ছোট্ট একটি দেশ হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য বড় বড় দেশের তূলনায় মানব সম্পদ, অন্যান্য সকল সম্পদে পরিপূর্ণ এ দেশটি। জন সম্পদকে  শিক্ষা, প্রশিক্ষণে সমৃদ্ধি করতে পারলে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আরো পরিচিতি লাভ করবে। যে দেশে এত মানব সম্পদ সঠিকভাবে শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে পারলে দেশ যেমন উন্নত হবে তেমনি মানব সম্পদও সম্পদে পরিণত হবে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে পরিকল্পনা মাফিক একদল মানুষ যখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পূঁজির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করে পড়ে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয় তখন তাকে বলা হয় সমবায়। সমবায় পদ্ধতি গণসচেতনতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রতিকুলতা মোকাবেলা, নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা এবং সমবেতভাবে টিকে থাকার মন মানসিকতা সৃষ্টি করা ও নীতিতে বিশ্বাস করা। আর এজন্য প্রয়োজন সমবায় সমিতি  এক একটি উৎপাদনমূখী উদ্যোক্তা সৃষ্টি যা বাস্তবমূখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। উন্নয়নমূখী পদক্ষেপ এবং টেকসই করতে সমবায় একটি বহুল পরীক্ষিত সংগঠন। সমবায় ও উন্নয়ন পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। উন্নয়নকে চলমান রাখতে যেমন প্রয়োজন উদ্যোক্তা সৃষ্টি তেমনি উন্নয়নের সুবিধা গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দিতে প্রয়োজন সমবায়ের শক্তি।

বর্তমান বিশ্বয়ায়ন তথ্য প্রযুক্তিতে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিকস নির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কলাকৌশল সমৃদ্ধ যন্ত্রপাতি। বিশ্ব আজ প্রযুক্তি নির্ভর। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তথ্য সরবরাহ করতে অপারগ একথা আর বিশ্বাসযোগ্য নয়। দেশে প্রচুর মানব সম্পদ আজ বেকার, জলে ভাসা কচুরি পানার ন্যায় ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট্ট একটি চাকুরীর সন্ধানে কতই না কষ্ট করতে হচ্ছে। উজানে যাবার কোন উপায় নেই। মনে হয় এ যেন সোনার হরিণ। দেশ তথা প্রশাসন আজ যে পর্যায়ে উন্নয়নের ধারাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে, আমি এ প্রচেষ্টাকে সাধুুবাদ জানাই। কিšুÍ জনবলকে উন্নয়ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করতে যে প্রক্রিয়া বিদ্যমান তাতে সাধারণ পরিবারের পক্ষে যোগান দিয়ে সেই কাঙ্খিত সোনার হরিণটির প্রাপ্তি বড়ই কঠিন বিষয়। সম্ভব নয়! আমি মনে করি দেশের যে বেকার যুুবক, যুবতিদেরকে উন্নত মানের প্রযুক্তি নির্ভর প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোভাবের উপর বর্তায়। ফলে দেশের বেকার সমস্যা সৃষ্টি রোধ হবে, দেশ উন্নত হবে সেই সঙ্গে কর্মজীবিরা স্বাবলম্বী হতে সক্ষম হবে। দেশ সত্যিই উৎপাদনমূখী হবে, পণ্য বিপণনের যথোপযুক্ত বাজারজাত করণে সরকারি/বেসরকারি উদ্যোক্তা সৃষ্টিসহ বহির্বিশ্বের দেশগুলোতে দেশের পণ্য সরবরাহের একটা উদ্যোগ সৃষ্টি করতে হবে। আর এ বিষয়ে সরকারী প্রচেষ্টা যথাযথভাবে গ্রহণ করলে দেশের জনগণ যেমন দরিদ্রতার গ্লানি দূর করতে সক্ষম হবে তেমনি বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করবে। সফলতা সেদিন আর বেশী দূরে নয়, দেশ সত্যিই সুনাম অর্জনে সচেষ্ট হবে।  

আমাদের বাংলদেশে যে মানব সম্পদ আছে তা সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে মানব সম্পদ রপ্তানিতেও একটা বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে ফলে বিদেশী রেমিটেন্স বৃদ্ধির আরেক সুযোগ সষ্টি হবে। সমবায় ভিত্তিক অনেক সম্ভাবনাময় সমবায় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সমবায় সমিতির অধীনে অনেক সদস্য আছে তাদেরকে সঠিকভাবে কাউন্সিলিং করে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করানো সম্ভব। যারা সমাজে অবহেলিত তারা কর্মমূখী হতে সচেষ্ট হবে। এ ব্যাপারে সমবায় সমিতিগুলোকে আরো বেশি বেশি কাউন্সিলিং করতে হবে। আর এ সক্ষমতা সৃষ্টি হবে সমবায় মূলনীতিতে। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে সব নীতির উপর আস্থা, বিশ্বাস স্থাপন করেই দেশে সমবায় সমিতিগুলো সরকারি অনুমোদন পেয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা হচ্ছে সমবায়ের ৭টি নীতিমালা-(১)স্বতঃস্ফূর্ত এবং অবাধ সদস্যপদ; (২) সদস্যদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ; (৩) সদস্যদের আার্থিক অংশগ্রহণ; (৪) স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীনতা;(৫) শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং তথ্য; (৬) আন্তঃসমবায় সহযোগিতা এবং (৭) সামাজিক অঙ্গীকার। আমাদের জানা মতে ১৮৪৪ সালে ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট চরম বেকারত্ব ও দারিদ্রের কবল থেকে উত্তরণ এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিতে সমবায় জন্ম লাভ করেও মহাজনী শোষণ-শাসনের হাত থেকে সাধারণ কৃষকদের রক্ষার জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে সমবায়ের বর্ণাঢ্য আগমন ১৯০৪ সালে। বাংলাদেশের মত এই প্রবীণতম সংগঠনটির অনেক উত্থান পতন থাকলেও এর উন্নয়নের ক্রমবিকাশ বেশ সমৃদ্ধ।

এ দেশে সমবায় সমিতিগুলোর মধ্যে কিছু কিছু সমবায় সদস্য দিকভ্রান্ত। সমবায় আদর্শ, নীতিমালা, আইন, বিধিমালা ও উপ-আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী চলার পথে অজ্ঞতা, অস্পষ্টতা ও অপপ্রয়োগের কারণে সমবায় তার আসল চরিত্র হারাচ্ছে। আবার কিছু কিছু দৃষ্টচক্র নামধারী সমবায় সমিতির কর্ণধারগণ কুচক্রের কারণে দেশের অনেক সহজ সরল কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অর্থ দুষ্টচক্র নামধারী সমবায়ীদের কারণে প্রতিভাবান সমবায় সমিতিতে হেয় প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। আবার সুযোগ সন্ধানী কিছু মানুষের অবৈধ আনাগোনা, সমবায়ীদের সহায় সম্পদ কুক্ষিগত করার প্রবণতা, সমবায়কে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহারে প্রভাব-বিস্তার ও নেতৃত্ব ভিন্নখাতে প্রভাবিত হওয়ায় সমবায়ের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। সমবায় সমিতিগুলো নানা জটিলতা ও সমস্যায় জর্জরিত। আবার তাদের নিজস্ব উদ্যোগ ও সততা, নিষ্ঠা একতায় প্রভূত উন্নতি সাধন করে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

আমি একজন সমবায় সংগঠক হিসেবে বলতে চাই মানব কল্যাণ সঞ্চয় ঋণদান সমবায় সমিতি লিঃ নিজস্ব উদ্যোগে ও নিষ্ঠা-একাগ্রতায় প্রভূত উন্নতি সাধন করে অনুসরনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপনে বদ্ধপরিকর। জীবন মানের উন্নয়ন, দুর্বল অবস্থান থেকে সবল অবস্থান, ঐক্যবদ্ধ শক্তির মহিমায় সকল বিরুদ্ধ অবস্থাকে মোকাবেলা এবং সম্মানজনকভাবে বিচরণ করতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবণতা। সমবায়ীদের প্রত্যাশাকে মহিমান্বিত করেছে সমবায়। আর একজন সচেতন সমবায়ীর করণীয় হচ্ছে সমবায় কেন, কিভাবে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, আর্থিক পরিকল্পনাকে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, কার্যক্রম পরিচালনা, নেতৃত্ব ও নির্বাচন, সভা-অনুষ্ঠান, হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণ ও প্রস্তুতকরণ, অডিট, সামাজিক কর্মপন্থা নির্ধারণ, সমবায়ীদের ভাল-মন্দ ও করণীয় ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব আরোপই হবে সমবায় সমিতির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
আরো একটি বিশেষ লক্ষ্যনীয় দিক হচ্ছে সমবায় সমিতির কর্মির সাথে সদস্যদের নিবিড় যোগাযোগ প্রাতিষ্ঠানিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা। একই সাথে প্রয়োজনে সদস্যের চাহিদা মোতাবেক সেবা দেয়া। সদস্যদের প্রশিক্ষিত করা, প্রকল্প সম্পর্র্কে তাদের সুস্পষ্ট ধারণা ও নীতিমালা অনুযায়ী অঙ্গীকার রক্ষা করা।

 উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সদস্যদের লেনদেনে সহায়তা, ঋণ প্রাপ্তিতে ৫-প পদ্ধতি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সমবায় সমিতির কর্মিদেরকে এ সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। প্রকল্পের সুযোগ সুবিধার ভিত্তিতে সদস্যদের সেবা দেয়া। সমবায় নীতি অনুযায়ী সদস্য সংগ্রহের পদ্ধতি গবসনবৎ এবঃ গবসনবৎ-অর্থাৎ সদস্যদের মাধ্যমে সদস্য অর্জন। একজন কর্মিই পারে সদস্য বৃদ্ধি এবং সমবায় সমিতির সেবার মান উৎকৃষ্ট এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলেই সদস্য টেকসই হয়। ঋণ গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের আয়েরও চালিকাশক্তি সদস্যরা। কর্মসূচী বাস্তবায়নে কর্মিকে যেমন মাঠ পর্যায়ে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়, আবার সদস্যদেরকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে ধরে রাখতে একজন কর্মির জন্যে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতির সকল শাখায় সমবায় সমিতিগুলো তাদের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করুক। সর্বোপরি বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা এবং সরকারের “রূপকল্প ২০২১” বাস্তবায়নে সমবায় মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সমবায় সমিতিগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালনে ব্রতী হওয়া প্রয়োজন। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দরিদ্র নিরসনে সমবায়ের ভূমিকা অপরিসীম।

১৯০৪ সাল থেকে এ উপমহাদেশে সমবায় আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সমবায় আন্দোলন বর্তমান অবস্থানে এসেছে। সমবায় সমতিগুলোকে উৎপাদনমূখী ও বিপণন কর্মকান্ডে নিয়োজিত করা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি সমিতিকে বিভিন্ন পণ্যের নিজস্ব ব্রান্ড চালু করতে হবে; উদাহরণ হিসেবে ঢেকি ছাটা চাল, খামারের গাভী পালন, দুধ ও মাংস সরবরাহ, মাছ চাষ, রাসায়নিক মুক্ত বিভিন্ন ফল, সব্জি, গ্রামীণ মুড়ি বিপণন, কাঠের ফার্নিচার ব্যবসা, বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নত চুলা তৈরির ব্যবসা, জৈব সার তৈরি, বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরি, মাশরুম চাষ ও বিপণন, খাঁটি ঘি, খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন, বিভিন্ন জাতের হস্তশিল্প, পোষাক তৈরি প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, মোবাইল মেরামত প্রশিক্ষণ ইত্যাদি তৈরি ও বিপণনের ব্যবস্থা করা। ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে মান-সম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করা। এ ধরনের পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে সমবায় সমিতিগুলো যত বেশি বিনিযোগ করবে ও সক্ষমতা বাড়বে ততই সমৃদ্ধি হবে। একই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিতেও কার্যকর অবদান রাখতে পারবে। “উৎপাদনমুখী সমবায় করি, উন্নত বাংলাদেশ গড়ি” একটি সময়োপযোগী সমবায় প্রতিপাদ্য। সমবায় সমিতিগুলোকে এ প্রতিপাদ্যের সাথে একাত্মতা পোষণ করে উৎপাদনমুখী কর্মকান্ড জোরদার করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালনে সক্রিয় হতে হবে।

লেখক ঃ সাবেক কর্মকর্তা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বর্তমানে সমবায় সংগঠক,
মানব কল্যাণ সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিঃ বগুড়া সদর, বগুড়া,
০১৭৩-১২৮০৪০২

এই বিভাগের আরো খবর

শীতের আগমনী বার্তায় নবান্ন উৎসব

মাহমুদ হোসেন পিন্টু :নবান্ন বিষয়ক মিথ নবান্ন বাংলার ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব। বাংলার কৃষিজীবী সমাজের শস্য উৎপাদনের যে সকল আচার অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়। নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম।‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ নতুন অন্ন। অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিনে এই উৎসব হয়ে থাকে। অমুসলিম রীতিতে নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে এবং আত্মীয় স্বজনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড় সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন।বৈদিক যুগে সৌর মতে বছর গণনার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। আমন ধান কাটা ও খাজনা আদায়ের হিসাব-নিকাশ কেন্দ্রিক হালখাতাকে কেন্দ্র করে অগ্রহায়ণ কে বৎসর এর প্রথম মাস ধরা হতো অতীত এক সময়ে।

নতুন ধানে আজ হবে রে নবান্ন  
মাঠে এখন সোনা-রঙা ধানের সমারোহ। সারাদেশে পুরোদমে শুরু হয়েছে আমন ধান কাটার  উৎসব। শুরু হয়েছে নতুন ধানে নবান্ন উৎসব। মরা কার্তিকের পর অগ্রহায়ণে এই নবান্ন উৎসব। ধান কাটা, মাড়াই, বাছাই, আর বিক্রি নিয়ে কৃষকরা এখন দারুণ ব্যস্ত-বাম্পার ফলনে বেশ খুশি কৃষক। আমাদের নবান্ন উৎসবে, চিত্রকলায় সাহিত্যে, খনার বচনে, গানে, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে জীবন-জীবিকা অর্থনীতির সঙ্গে ধান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

নবান্নের এই ধান শুধু আমাদের খাদ্য নয়, নিরাপত্তার নিয়ামক আমাদের সমৃদ্ধি আমাদের প্রাণ। এ জন্যেই আমাদের কৃষক ধান চাষে লাভের মুখ না দেখলেও অসীম মমতায় আঁকড়ে ধরে আছে ধানের জমি। হাজার বছরের ঐতিহ্যের শেকড় যেন বৃক্ষের বদ্ধ মূলের মত দৃঢ় ও সংহত। উৎসব আয়োজন চলছে গ্রামের ঘরে ঘরে নবান্নের। ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ আমাদের বাংলাদেশ যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি এবং কমে যাচ্ছে ঋতু বৈচিত্র্য। তারপরও এখনও যার রূপের ছটাঁ খানিকটা হলেও রয়ে গেছে, এমন এক ঋতু হেমন্ত। ঋতুর তালিকায় হেমন্তের অবস্থান চতুর্থ। হেমন্তের শুরুর দিকে যেমন শরতের শেষ চিহ্ন কাশফুল হেমন্তের বাতাসে উড়ে বেড়ায়, তেমনি শেষ দিকে ভোরের কুয়াশা-শিশির ও ঠান্ডা হওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শীত আসছে। আসছে নবান্ন।
হেমন্তের অপরূপ বৈচিত্র্য :

রূপ বৈচিত্র্যের এ খেলা চলে সারা বছর বাংলার অপরূপ শোভায় মুগ্ধতার হেমন্ত কুণ্ঠাজড়িত লাজদীপ্ত পায়, আলো-আধারির কুয়াশা গায়ে মেখে হেমন্তের অভিষেক শুরু হয় বাংলার আঙিনা জুড়ে। ধুসর ছায়ায় হেমন্ত পরিপূর্ণ হেমন্তের ধুসর পান্ডুরতা অনেকেই দেখেছেন, জীবনানন্দ দেখেছেন অন্যভাবে ‘অঘ্রাণ এসেছে আজ পৃথিবীর বনে সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে হেমন্ত এসেছে তবু হেমন্ত কল্যাণময়ী। হেমন্ত লক্ষ্মী, হেমন্ত অন্ন ধাত্রী, হেমন্ত শান্ত সৌম্য। হেমন্ত অন্নপূর্ণা। হেমন্ত তুলে দেয় শস্য সবুজের সম্ভার নানা কারণে হেমন্ত আমাদের অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। এক সময় হেমন্তে দেশের মাঠে প্রান্তরে দেখা যেত ধান আর ধান, স্তুপীকৃত পাকা ধান আর কাঁচা ধান গাছের ভ্যাপসা গন্ধে মৌ মৌ করতো পুরো এলাকা। জমি চাষের মতো গরু দিয়ে চলত মাড়াইয়ের কাজ। হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফলে ঘরে উঠত স্বপ্নের ধান। ঘরে ঘরে পালিত হতো নতুন ধানে নবান্ন উৎসব ও পিঠা পুলির উৎসব। এই উৎসবের আমেজ লেগে থাকত পুরো হেমন্ত জুড়ে।


নাগরিক সভ্যতায় পৃথিবীর ব্যস্ততম নাগরিক আমি। পঠন-পাঠান এর সময় আর পাই না। অথচ এই আমি মধ্য রাত পর্যন্ত পাঠে নিমগ্ন থাকতাম। জ্যোৎ¯œা রাতে হেমন্তের নান্দনিক ভিন্নতা ও তার সৌন্দর্য দেখতাম কুয়াশা উষ্ণতায় শিশিরের আল্পনা আঁকতাম নিমগ্নে। খেজুর রসের মিষ্টি ও ঘ্রানের আকণ্ঠ নিমগ্ন হতাম। নান্দনিক অদ্ভুত রূপ-রস ঘ্রাণ আস্বাদন করতাম। সবাইকে চমকে চমকে দিয়ে বলতে চাই, আমি হেমন্ত নিয়ে এসেছি হাতের মুঠোয়। কিন্তু হয় না। গ্রামের নিজস্ব একটা ঘ্রাণ আছে। খড়ের ধোঁয়া। গোয়াল ঘর। সবুজ গাছের। ঘাসের। জীবন থেকে একটা একটা করে হেমন্ত হারাচ্ছি। পরিবেশ বিপর্যয়ে প্রকৃতি এখন বিরূপ। হেমন্তকে খুঁজতে হয়। আমাদের সন্তানেরা কেবল তিন ঋতু টের পায়। আমাদের সন্তানরা হেমন্ত খুঁজবে ইন্টারনেট সার্চ করে। হেমন্ত কি বিলুপ্ত হবে। এখন দেশের অধিকাংশ অঞ্চল থেকেই হারিয়ে গেছে হেমন্তের পাকা ধান ঘরে তোলা আর ঐতিহ্যবাহী নবান্ন। গরু দিয়ে মাড়াইয়ের জায়গা দখল করে নিয়েছে মাড়াইকল। কেন হারিয়ে গেছে সেই ঐতিহ্য, তারও আছে নানা কারণ। যেমন জলবায়ুর পরিবর্তন, পরিবেশ বিপর্যয়, পানি প্রবাহে বাধা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনসহ অনেক কিছু।


প্রকৃতির নিয়মের বাইরে নয় আজকের হেমন্তেও। এটাই প্রকৃতির নীতি। তাই বিদায়ের আগে হেমন্তের কাছে অনুরোধ  শীতকে যেন বলে আমাদের এই কথা, ‘শীত, তুমি এসো আমাদের কাছে আশীর্বাদ হয়ে? শিশিরে ধোয়া সবুজ ঘাস হিম কুয়াশা আর রূপালী রোদ্দুর শীতের সকালকে সাজায় ভিন্ন এক স্নিগ্ধতায়। ধানের মাঠে সবজির বাগানে, জলশূন্য নদীর বুকে শিশিরভেজা মেঠোপথে, গাঢ় সবুজ নবান্ন উৎসব। মাঠে মাঠে তাই পাকা ধানের সোনারূপ কৃষকের মুখে হাসি জাগায়। রূপসী বাংলায় মাঠজুড়ে সেসব সোনালি ধান কেটে আঁটি বেঁধে রাখে কৃষকেরা। তারপর নিয়ে যায় তাদের নিকোনো উঠোনে। মাড়াই করে গোলায় তোলা ধান। সকালে খেজুরের রসের আস্বাদনে মোহিত হয় সবাই। আর খেজুর রস দিয়ে করা পিঠে-পায়েস-ফিরনি ভালোবাসে না এমন বাঙালি একজনও বোধ করি খুঁজে পাওয়া ভার। আবার আরেক সোনা রঙে মাঠে ভেসে যায়! সর্ষেফুল। কী অপরূপ দিগন্ত অবধি ছুঁয়ে থাকা সর্ষেফুল আর কী তার মিষ্টি গন্ধ! মন ভরে যায় সেই সৌরভেও।

 আগুনে পোড়ানো নাড়ার ধোঁয়া সন্ধেবেলা কুয়াশায় মিশে যায়। বাতাস কিছু বা ভারী করে আর কেমন এক মায়াবী গন্ধে ভরে যায় চারদিক। সন্ধ্যা গড়িয়ে যায় শুক্লপক্ষে রাতের মনমাতানো জোছনাররূপ যে কাউকে জাদু করে। ভোলায় সে রূপে। সে রূপে মুগ্ধ কবি জীবনানন্দ দাশও তাই বলেন ‘মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে/আমার মুখের দিকে-ডাইনে আর বাঁয়ে/পোড়া জমি-খর-নাড়া-মাঠের ফাটল. শিশিরের জল।’ মাঠের এ বিরাণদশা, দৈন্যদশা ঘুচে যায়  অচিরেই। আবার মাঠে মাঠে শোভা পায় রকমারি শাকসবজি। ঘরের কাছে ঘেঁষে এক ফালি জমিনে কৃষকবধূ সযতেœ সবজির বাগান আগলে রাখে ফুলকপি, গাজর, শিম, পালং, ধনে পাতা কী নেই সে বাগানে কৃষক তখন বা দূরে মাঠের কাজে ব্যস্ত, ছেলেমেয়েরা কোঁচায় মুড়ি নিয়ে বসে পড়েছে ক্ষেতের পাশে পাখি তাড়াতে রবিশস্য গমের মৌসুম যে শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে পাখপাখালির উৎপাত। কৃষকের ছেলেমেয়েরা পাখি তাড়াতে তাড়াতে খেজুরগুড়ের সঙ্গে মুড়ি দিয়ে সকালের খাবারটা সেরে নেয় মাঠেই। গোয়ালঘরের পাশেই লাউয়ের মাচা। নিচে লাল টুসটুসে টমেটোর বাগান। স্বাস্থ্যবতী ফুলকপির সারি।

 কাছেই বা কোথাও হেলেঞ্চা অযতেœ বড় হয় গ্রামগুলো কেমন মায়াবী। দূরের যে গস্খামটি দেখা যায় আর কাছেও, সেও কেমন ¯িœগ্ধতায় ভরা, সবুজে মোড়া। ঘরের দাওয়া থেকে মাঠে নেমে যাওয়া সরু মেঠোপথ, সামনে দিগন্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া দূরের সড়কপথেও কেমন একাকার হয়ে থাকে। দূরের তালগাছের  সারির ওপারে যেতে মন চায়। মনে হয় কী যেন আছে ওখানে দূরন্ত কৈশোরের ডানপিটে দিনগুলোতেও যেমন অচেনা মনে হতো, এখনো কেমন যেন রহস্যঘেরা লাগে গ্রামগুলোকে, ওই দিগন্তছোঁয়া গ্রামে গেলেই আকাশ ছোঁয়া যাবে! ওখানে যে আকাশের সঙ্গে গ্রামটি মিতালি করছে! মনে হয় যেন ওখানে আকাশ মাটিতে নেমে এসেছে।এই হেমন্ত যেন সেই রহস্যময়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। হিম হিম সারা বেলা আর কুয়াশার আস্তরণ নিকটকেও কেমন দূর করে দেয়!
নবান্নের বাংলার পিঠা আবহমান কালের ঐতিহ্য ঃ

নতুন ধানে নবান্নের পিঠার কত যে বাহার চন্দ্রপিঠা, ক্ষীরপুলি, নারকেল পুলি, ভাজা পুলি, কাঁচা পুলি, দুধ পুলি। এ ছাড়া চিতই দলুই, পাটিসপটা, ছিট পিঠা, চই, দুইচই, দুধচিতই, কাঁঠাল পিঠা, কলা পিঠা, তালের পিঠা, গুড় পিঠা, নারকেল পিঠা, ভাপা পিঠা, পাঁপর পিঠা, পোয়া পিঠা, ফুলপিঠা ইত্যাদি। নতুন ধান উঠলে কৃষক খুসির জোয়ারে ভাসে, আত্মীয় স্বজন নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায়। পঞ্চ ব্যঞ্জন রান্না করে পিঠা বানায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নতুন ধানের চিতাই পিঠা দিয়ে ক্ষেত্র দেবতার পূজা করে। আসলে হেমন্তও শীতকাল পিঠাপুলির জন্য। বাড়িতে নতুন জামাই এলে বা অনুষ্ঠানে পিঠার আয়োজন করা হয়। নবান্ন উৎসবে সাধারণত তৈরি হয় চিতই তেলপিঠা বা ভাপা পিঠা, পালপোয়া, চন্দ্র পলি ও ক্ষীরগুলি সহ বিভিন্ন ধরনের পুলি পিঠা, ফুল পিঠা বা নকশি পিঠার কথায় আসি। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই পিঠার নাম পাক্কোয়ান। কুমিল্লার লোকেরা বলে খান্দসা চাল, দুধ ক্ষীর, নারকেল গুড় বা চিনি দিয়ে যেসব পিঠা তৈরি হয়।

 নকশি পিঠায় থাকে ফুল লতাপাতা পশুপাখি কুলা, লাভল কই মাছ, ইত্যাদির আদল। ফুল পিঠা বাঙালি রমনীর নিপুণ শিল্পকল্প ও সৌন্দর্য চেতনার অন্যতম ফসল। এবার ভাপা পিঠা কথায় আসি। একটি নবান্নের অন্যতম আকর্ষণ। ভাপা পিঠা বানানোর জন্য লাগে চালের গুঁড়ো এ টুকরো পরিষ্কার ন্যাকড়া ছোট বাটি। এই পিঠা তৈরি হয় বাষ্পে বা ভাবা দিয়ে। এই পিঠার ভেতরে পুরো পুর হিসাবে দেওয়া হয় গুড় ও নারকেল। গরম এই পিঠাতে খেজুরের রস ঢেলে দিলে চমৎকার একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তার স্বাদ বলে বা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। নবান্নের এই বিলাসী ব্যস্ত, রসনার তৃপ্তি পিঠা দিন দিন তার গৌরব হারাচ্ছে। আমরা এখন তাই ফাস্ট ফুড, সরমা, পিজা, চিকেন বার্গার প্রজন্ম। সম্পন্ন পরিবারের গৃহিনীরা মাইক্রো ওভেনে বানাচ্ছেন প্যান কেক। অচিরেই হয়তো দেখা যাবে নবান্নের পিঠা হয়ে উঠেছে লুপ্ত প্রায় এক গ্রামীণ শিল্প।
কৃষকের ঘরে নেই আমেজ বাংলার নবান্ন উৎসবে:

হেমন্তের শুরুতে শীতের আগমনী বার্তা অগ্রহায়ণ থেকে শুরু হয় শীত শীত ভাব। শীতের রুক্ষ্মতা এবং নির্মমতার সমস্ত প্রকৃতি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। গ্রামীণ জনপদ দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ আছে কিন্তু কৃষকের ঘরে নেই নবান্নের আমেজ। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবে কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। সিকি শতাব্দী পূর্বেও নবান্নের ধান কাটার উৎসবে মুখরিত হতো গ্রামের প্রতিটি আঙ্গিনা। গ্রামীণ জনজীবনে নবান্ন উৎসব এখন শুধুই স্মৃতি। নবান্ন শ্রেণীহীন এক অসাম্প্রদায়িক উৎসব। নবান্ন উৎসবে বাঙালি জাতিকে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করে। নবান্নের পরশে মানুষ সংস্কৃতিবান হয়। নবান্ন উৎসব বাঙালির জনজীবনে অনাবিল আনন্দ, সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক এই প্রত্যাশা সবার। হেমন্তের সবুজ মাঠে দিগন্ত জোড়া ফসলের সময় থেকেই এই ‘নবান্ন উৎসব’ শুরু হয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক
mahmud.pintu@gmill.com
০১৭১১-৮৭৫৬৮৮

এই বিভাগের আরো খবর

‘ঘোড়ারোগ’ মুক্ত রাজনীতি প্রয়োজন

আতাউর রহমান মিটন:একটা অস্থির সময়ে প্রবেশের অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনীতির মাঠ। প্রকৃতিতে শীতের আভাস বাড়ার সাথে সাথে গরম হতে শুরু করেছে বাংলাদেশের রাজনীতি। ক্ষমতার শেষ বছরের দিকে ধাবিত দলটির মধ্যে ধৈর্য্য খুব দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রায় সারা দেশেই তৃণমূল পর্যায়ে কতিপয় নেতা-কর্মিদের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার অসহনীয় হয়ে ওঠার সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। আর তার দায় এসে পড়ছে সামগ্রিকভাবে সরকারের উপর।

একদিকে প্রধান বিচারপতির প্রথা বহির্ভূত ‘পদত্যাগ’ এবং অন্যদিকে বিএনপি’র আয়োজিত সমাবেশে সারাদেশ থেকে দলীয় নেতা-কর্মিদের অংশগ্রহণে বাধাদানের অভিযোগ, আমাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তপ্ত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদল মনে করেন, প্রধান বিচারপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে বিচার বিভাগকে ‘ভারমুক্ত’ করেছেন, আবার আরেকদল মনে করেন সরকার সত্যিই বিএনপি সমাবেশে নেতা-কর্মিদের যোগদানে বাধা সৃষ্টি করে ‘ছোট মনের পরিচয়’ দিয়েছে। এই উভয় অভিমত জনতাকেও বিভক্ত করে ফেলেছে নিঃসন্দেহে। উত্তাপের সৃষ্টি সেই বিভক্তির ঘর্ষণে!

মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকেই। অধৈর্য্য কি তাহলে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও বিরাজমান? ঢাকায় বিএনপি’র সমাবেশে দলীয় নেতা-কর্মিদের আসতে বাধা দিয়ে সরকারি দল বিরোধীদলের প্রতি সমঝোতা নয়, বরং সংঘাতের বার্তা দিয়েছে। এটা আমাদের কাঙ্খিত ছিল না। প্রায় দেড় বছর পর গত রবিবার ঢাকায় বিএনপি যে বিশাল সমাবেশ করেছে সেটা অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের জন্য এক বিরাট ‘সতর্ক সংকেত’। কিন্তু সেই সংকেতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার চাইতে ধ্বংসাত্মক পথে বাধা তৈরি কোন শুভ ফল বয়ে আনবে না। কারণ, মানুষ নেতিবাচক রাজনীতি পছন্দ করে না।

সাধারণ মানুষ রাজনীতির মাঠ গরম হচ্ছে দেখে উৎকণ্ঠিত বোধ করতে শুরু করেছে। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠছে বুক। আবার আমাদের দেশটা জ্বালাও, পোড়াও সময়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে না তো! রাজনীতিতে মত পার্থক্য থাকবেই। কিন্তু তাই বলে সন্ত্রাসের ‘হোলি খেলায়’ মত্ত হয়ে ওঠা কখনই কাম্য নয়। রংপুরের ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘সন্ত্রাস’ কিসের আলামত? চলমান রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা কি এই বিস্তৃতির আগুনে ‘ঘি’ ঢালছে? ভিন্নমতকে পুঁতে ফেলার একটা ‘অশুভ চেষ্টা’ রাজনীতিতে দৃশ্যমান। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই প্রবণতাকে অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে করে। তারা শান্তি চায়। নিরাপদে কাজে যেতে চায় এবং নিরাপদে নিজ ঘরে, নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চায়। অভিভাবক হিসেবে সরকারকেই সেই সুরক্ষা বেষ্টনি নিশ্চিত করতে হবে।

সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সরকার সঠিক আচরণ করেছে এটা সাধারণ মানুষ মনে করে না। কেবলমাত্র দুর্নীতির অভিযোগের কারণে বা অসুস্থতার কারণে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। রশি টানাটানি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ক্ষমতার দম্ভ এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এমনিতেই আগামী ৩১ জানুয়ারি সুরেন্দ্রকুমার সিন্হা প্রধান বিচারপতির মেয়াদ শেষ করতেন। মাত্র আড়াই মাস আগে হঠাৎ করে এভাবে তাঁর পদত্যাগ অবশ্যই অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর সরকার নিজেদের দায় অস্বীকার করলেও মানুষ সেটা পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না।

ইতোমধ্যে দেশবাসী জানেন যে, সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নিয়ে আসা হলে, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে উক্ত সংশোধনী খারিজ করে দেন। এই সরকারের আমলেই নিয়োগ পাওয়া প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্রকুমার সিনহা’র সঙ্গে এই রায় নিয়েই সরকারের সংঘাতের শুরু। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উক্ত রায়ে সংসদ ও সরকারের বিরুদ্ধে নানা আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি।

উত্তেজনা শুরু হওয়ার পরে কয়েকটি অনুষ্ঠানে সুরেন্দ্রকুমার সিনহাও সে সময় পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে নানা ধরনের অশুভ ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তাঁর সেইসব মন্তব্য এবং সামগ্রিক কর্মকান্ড সরকারের সাথে এক বিরাট অবিশ্বাস ও দুরত্ব সৃষ্টি করেছিল। প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্বশীল পদে থেকে এত বড় আস্থার সংকট বা অবিশ্বাস নিয়ে নির্বিঘেœ দায়িত্ব পালন করা সত্যিই কঠিন। সে কারণেই এটা বলা কঠিন যে ‘পদত্যাগ’ ছাড়া সম্মানজনক অন্য কোন বিকল্প আসলে ছিল কি না। তবে এই ঘটনাগুলো আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক অধঃপতনেরই ইঙ্গিত প্রকাশ করে। বিদেশে আমাদের সরকারের ভাবমূর্তি এর ফলে উজ্জ্বল হয়েছে, তা আমি মনে করি না।

বিএনপি’র রোববারের সমাবেশে কোন সহিংসতা সৃষ্টি করেনি। জনতার কাছে সেটাই স্বস্তির বিষয়। প্রায় তিন মাস লন্ডনে থাকার পরে ঢাকায় এটাই প্রথম বিএনপি নেত্রীর সমাবেশ। অনেকে আশঙ্কা করলেও এই জনসভায় তিনি চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বা উত্তেজনা ছড়ানোর মত কোন বক্তব্য দেননি। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন সেটা তাদের দলীয় বক্তব্য এবং নতুন কিছু নয়। ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’ একথাটাও তাদের নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শেষ পর্যন্ত বিএনপি শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে তো? সকলেই বিশ্বাস করেন, নির্বাচন বর্জনের মত বোকামী দলটি আর করবে না। বিএনপি’র আন্তর্জাতিক মিত্ররাও সম্ভবতঃ একই মনোভাব পোষণ করেন। কিন্তু দলের ভেতরে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, এরশাদের অধীনে দুইবার নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি প্রমাণ করেছে তাতে তাদের দলের তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। বরং যারা দলের সুবিধাভোগী, মৌসুমী নেতা এরা দল ছেড়ে চলে গিয়েছে। এবারও সেটা হতে পারে কিন্তু তাতে জনগণের মনে বিএনপি’র ভাবমূর্তি কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত যাই হোক, সাধারণ মানুষ বিএনপিকে নির্বাচনে দেখতে চায়। বিএনপি ছাড়া জাতীয় নির্বাচন ‘এক দলের খেলা’ হয়ে যায়। সেখানে জয়-পরাজয়ের আলাদা কোন মূল্য নেই। এর ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হবে না। জাতীয় সংসদে দুটি প্রধান শক্তিশালী উপস্থিতি দেশ ও জনগণের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য। গণতন্ত্রকে যদি আমরা জনগণের শাসন বলে মানি, তাহলে সেই জনগণের শক্তিশালী ও স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি ছাড়া আমরা এগুবো কিভাবে! আমরা চাইব সিটি কর্পোরেশনের মত আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ সকল দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে এবং দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পথ সুগম করবে।

এটা পরিস্কার যে, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী এই মুহূর্তে বিএনপিকে নির্বাচনে টেনে আনতে চায়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি কেউই চান না। প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোটে জিতে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষা হলেও তাদের গণতন্ত্র বিকশিত হয়নি। সে কারণেই ক্ষমতাসীন দল এবার যথেষ্ট সতর্ক। বিএনপিকে ভোটের ময়দানে রাখতে তাদের সুরও নরম। দ্বিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সভা করতেও সরকার অনুমতি দিয়েছে। সারাদেশে বিএনপি কর্মিরা সীমিত পরিসরে হলেও মাঠে নামতে শুরু করেছে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও। এগুলো সবই ইতিবাচক। কিন্তু তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি যদি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে সত্যি সত্যি নির্বাচনে অংশ নিতে না চায় তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুনরায় অশান্ত হয়ে উঠবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা জনগণ এমন একটি পরিস্থিতি পরিহার করার জন্য উভয় দলের কাছে আহ্বান জানাই। আমরা শান্তি চাই।
 
দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। রংপুরে যা ঘটানো হয়েছে তা সত্যিই আমাদের মর্মাহত করেছে। আমরা এ ধরনের উস্কানী বন্ধে সকলের সহযোগিতা চাই। আমাদের মনে রাখতে হবে, আগুনের বিপরীতে আগুন নিয়ে খেললে শেষ পর্যন্ত উভয়কেই ছাই হয়ে যেতে হয়। সাম্প্রদায়িকতার আগুনে আমাদের দেশ পুড়ে যাবে, এটা আমরা কোনভাবেই হতে দেব না। আমাদের রাজনীতিতেও ক্ষমার ঘোষণা আসছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকিতে ছেলের খুনিকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন ৬৬ বছরের এক মুসলিম বৃদ্ধ। বলছেন, ‘ওকে ক্ষমা করে দিলাম, কারণ ইসলাম ক্ষমার কথাই বলে।’ ধর্মের মুখ কখনই অত্যাচারের হতে পারে না। ধর্ম আমাদের শেখায় উদার হতে, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমার পথে চলতে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অতীতে যারাই সংঘাতের পথে চলেছে, তারাই টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আমরা দৈনন্দিন জীবনের সর্বত্র কথায় কথায় ধর্মের বুলি আওড়াতে দেখি।

 কিন্তু কতজন আসলে ধর্মীয় অনুশাসন ও প্রকৃত শিক্ষা, মূল্যবোধ মেনে চলে সেটা আমার কাছে এক বিরাট প্রশ্ন! ধর্ম যা শেখায়, আমাদের মধ্যে ক্ষমা, ভালবাসা ও প্রীতি জাগিয়ে তোলার যে পথ দেখায়, সে পথ থেকে বিচ্যুত হওয়াটা কাম্য নয়। ধর্মের পথ মনুষ্যত্বের পথ। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনও নি¤œগামী। প্রগতিশীলতার একটা শূন্যতা সেখানে এখনও বিরাজমান। এই শূন্যতা পূরণ করার জন্য যোগ্যদের  রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে। অন্ধকারকে গালাগাল দিয়ে লাভ হবে না, ছোট্ট হলেও একটা মোমবাতি জ্বালালে কিছুটা অন্ধকার দূর হবে। এভাবে সবাই একটু একটু করে দায়িত্ব নিলে একটা বড় আলোর মিছিল তৈরি হবে। সেটাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে যুব সমাজকে এর জন্য দায়িত্ব নিতে হবে।

আমরা শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদদের হাতে আমাদের দেশের শাসনভার ছেড়ে দিয়েছি সুশাসনের জন্য। রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে আদর্শের ভিত্তিতে কিন্তু দেশ পরিচালিত হবে জনতার আকাঙ্খায়। একদলীয় শাসন বা পশ্চাৎমুখীন নীতি ও কৌশল দিয়ে সমৃদ্ধ আগামী গড়ে উঠবে না। মানুষ এখন সচেতন। সবার হাতে স্মার্ট ফোন। সবার হাতে ক্যামেরা ও ইন্টারনেট কানেকশন। সুতরাং সকলেরই সাবধান হওয়া উচিত। একটি সুন্দর আগামী গড়ে তোলার স্বপ্ন যেন আমাদের পথচলার সাথী হয়, আমরা আমাদের শ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদদের কাছে সেটাই প্রত্যাশা করি।

ক্ষমতার শেষ সময়ে এসে অসহিষ্ণুও হয়ে ওঠা আমাদের রাজনীতির এক পুরোনো ‘ঘোড়ারোগ’। আত্মবিশ্বাস কমে গেলে মানুষ ক্রমশঃ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। তাহলে কি বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের মেয়াদ সত্যিই ফুরিয়ে যাচ্ছে! এই অস্থিরতা কি তারই লক্ষণ? টেকসই রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে দলবাজি, ক্ষমতাবাজি ও দুর্নীতিবাজমুক্ত সমাজ। কথাটা শরীকেরা শুধু মুখে না বলে অন্তরে ধারণ করলে এবং সেই মোতাবেক পরিচালিত হলে জাতি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। জনতার জয় হোক।

লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯

এই বিভাগের আরো খবর

চেতনায় জাগরণে বই

হাসনাত মোবারক:আজকের লেখার শিরোনামটি ব্যবহার করে থাকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাথে আমার পরিচয় ঘটে বানান সংশোধনী ও বই পত্রিকার মারফতে। একটা সময় এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলা বানান ও পান্ডুলিপি সম্পাদনা ও সংশোধনী বিষয়ে অল্প কিছুদিনের জন্য প্রশিক্ষাণার্থীদেরকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিত। এই কোর্সটি অল্পদিনের হলেও প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য বেশ কাজের ছিল । আর আমি সেই সুযোগটিই  কাজে লাগিয়েছিলাম। উপকৃতও হয়েছি ঢের। অবাক হয়েছিলাম। ষোলো কোটি মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। সেখানে আমরা  ওই সেশনে মাত্র চৌদ্দ পনেরোজন অংশগ্রহণ করেছিলাম।  সেই কয়েকজনের মধ্যেও  এখন পর্যন্ত দু’তিনজন ব্যতীত কেউ আর বানান সংশোধনী বা পা-ুলিপি সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মধ্যে নেই।


যাই হোক, ওই প্রতিষ্ঠানটির হয়তো ওরকম কোনো গরজই ছিল না। দেশের মানুষকে ঘটা করে জানিয়ে বা ডেকে এনে প্রশিক্ষণ দিবে। আবার এও হতে পারে, এই কোর্সটি সফলভাবে সম্পন্ন করে বৈষয়িকভাবে খুব লাভবান হওয়া যায়, তাও তো নয়। এতসব কারণে পেছনের কারণও  থেকে যায়, প্রথমত জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, দ্বিতীয়ত মানুষ শুদ্ধ করে বাংলা লিখতে বা বলতে পারাটা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে খুব বেশি অর্থবহ বলে মনে হয় না। তাই বাংলা শিখতে বা শুদ্ধভাবে লিখতে চেষ্টাও করে না অনেকে। তবে এ কথা সত্য যারা বাংলা ভাষাকে ভালোবাসেন, এদের সংখ্যা অল্প হলেও ক্ষতি নেই।


যাই হোক বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি কথা না লিখে শিরোনামটি নিয়ে কিছু কথা লিখি বা বলি। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের অন্যতম কাজের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিভাগীয় পর্যায় ও জেলা ভিত্তিক সৃজনশীল বইমেলার আয়োজন করা। গত ২৩ অক্টোবর ২০১৭ ইং তারিখে রাজশাহীতে শুরু হয়েছিল আটদিনব্যাপী বইমেলা। এই বইমেলার নাম দেয়া হয়েছিল রাজশাহী বইমেলা (২০১৭)। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে ও রাজশাহী জেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত রাজশাহী কলেজ মাঠে শুরু হয়েছিল আট দিনব্যাপী বইমেলা। এই বইমেলাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় সব প্রকাশনা সংস্থা অংশগ্রহণ করেছিল। আমি এই লেখাটি বইমেলা শেষ হওয়ার পর কেন লিখতে বসলাম। পাঠকের এমন ভাবনাও থাকতে পারে। হ্যাঁ। বিজ্ঞজনেরা জানেন, ‘বর্ষা চলে গেলে সর পড়ে শরতে।’

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কর্তৃক আয়োজিত বইমেলা খুব সফল হয়নি। কেন হয়নি ? তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে প্রথম কারণ বইমেলা শুরুর সাথে সাথে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু। এমন কথা কেউ কেউ বলেছেন। এমন যুক্তিটা আসলে ধোপে টেকে না। কেননা ভর্তি পরীক্ষার সাথে রাজশাহীর বইমেলার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সব রাজশাহীর বাইরের। এই সময়ে বইমেলার আয়োজনটি করে প্রকাশনা কর্মকর্তাদের আবাসন ব্যবস্থার সংকট ঘটেছে। এই যুক্তিটি বেশ অর্থবহ। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় ব্যাপক আকারে আবাসন সংকট দেখা  দেয়। সৃজনশীল প্রকাশনাগুলোতে যারা কর্মরত, তাদের বেতন ভাতা ও পদমর্যাদা অনুযায়ী উচ্চ আবাসনগুলোতে থাকা সম্ভব নয়। তাই এই কর্মকর্তারা কয়েকদিনের জন্য বিপাকে পড়েছিলেন।

রাজশাহী বইমেলা ২০১৭ তে বেশিসংখ্যক জনগণকে সম্পৃক্ত করা যায়নি। এর ফল ভোগ করেছে প্রকাশনা সংস্থাগুলো। রাজশাহী বইমেলায় ( ২০১৭) ভালো বিক্রি না হওয়ার অন্যতম কারণ স্থান নির্বাচন। মেলা শুরু হওয়ার আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগও অন্যতম কারণও বলে মনে করি। আর অন্যসব ব্যবস্থার সাথে যোগাযোগ করতে পারলেও আবহাওয়ার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় গণ মাধ্যম সংস্কৃতিজনদের সাথে বইমেলার ব্যাপারে কথা বলে জানতে পেরেছি। তা হলো প্রচার যথাযথ হয়নি। প্রচারে প্রসার। এটা বিপণন ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত।

 এই  অমোঘ শর্তটি বইমেলার ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা হয়নি। এই প্রশ্নটিও মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়। বই এবং বইমেলা নিয়ে অনেক দিন যাবৎ কাজ করছি। তাই কোনো কোনো গণমাধ্যম থেকে বইমেলা নিয়ে কিছু লিখি। গত ফেব্রুয়ারিতে একটি গণমাধ্যমে লিখেছিলাম ‘তারা বাণিজ্যমেলাকে যেভাবে জনসাধাণের মাঝে নিয়ে যেতে পেরেছে, আমরা কিন্তু বইমেলার আনন্দের ঢেউ কেন্দ্র থেকে তীরে পৌঁছাতে পারিনি।’ জেলাভিত্তিক এই বইমেলার আয়োজনটি অনেক ফলপ্রসু বটে। বিশ^সাহিত্যকেন্দ্রের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বদৌলতে দেশের মানুষকে সৃজনশীল বইপাঠে অনেকটা উৎসাহের জোগানদাতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। তুলনারহিত এই কাজটি আরও অনেকে করছেন।

 কেউ ব্যক্তি উদ্যোগে আবার কেউ বা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভ্রাম্যমাণ বইমেলার একটা ট্রেন্ড তৈরি করেছেন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘দিশা’র প্রধান নির্বাহী মো. সহিদ উল্লাহ। তিনি একজন বইপ্রেমী মানুষ। তাই দিশা’র অঙ্গসংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ আলোঘর কার্যক্রম।’ আলোঘর কার্যক্রমের মাধ্যমে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের হাতে সৃজনশীল বই তুলে দিতে চালু করেছেন, ভ্রাম্যমাণ বইমেলা। একটি স্লোগানও দিয়েছেন,‘প্রতিদিন বইমেলা, প্রতিজনে একটি বই।’ অসাধারণ একটি থিম। এই ধারাবহিকতায় গত ২২.১০.২০১৭ তারিখ হতে ২৯.১০.২০১৭ তারিখ পর্যন্ত রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একদিনের জন্য ভ্রাম্যমাণ বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল।

 এই উদ্যোগটি অবশ্যই একটি মাইলফলক উদ্যোগ বলে মনে করেন বিদ্ব্যজনেরা। ২৪.১০.২০১৭ তারিখে রাজশাহী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হেলেনাবাদ, প্রাঙ্গণে আলো ঘরের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘আলোঘর ভ্রাম্যমাণ বইমেলা।’ সেই বইমেলাতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, রাবির দর্শন বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক মহেন্দ্র নাথ অধিকারী। কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক আলোঘরের এমন উদ্যোগ দেখে অভিভূত হন এবং তিনি বলেছিলেন উদ্যোগটি আরো আগে নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি।’ হ্যাঁ। বরেণ্য কথাশিল্পীর ঠিকই বলেছেন।
 
সমাজ বদলাতে বা সামাজিক উন্নয়নে যুগে যুগে খুব অল্পসংখ্যক মানুষেরই আবির্ভাব ঘটে। তবে ভ্রাম্যমাণ বইমেলার যে ট্রেন্ড বা প্রচলন অবশ্যই বিস্তৃত করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের বইমুখী করে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বই নিয়ে উপস্থিত হতে হবে। কেননা আজকালকার শিক্ষার্থীরা এত বেশি ব্যস্ত থাকে বা ব্যস্ত রাখে কোচিং সেন্টারগুলো। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজে উৎসাহদাতা হিসেবে খুব বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করে না। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার জন্য সমবেতভাবে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে আমাদের ভবিষৎ উজ্জ্বল হবে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
০১৭৫০-৯৩৬৯১৯

এই বিভাগের আরো খবর

তিন দশকের সাফল্য আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী

আব্দুস সামাদ পলাশ :২৯ বছর আগে এক সন্ধ্যায় বগুড়ার উডবার্ণ পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে আমার একক নৃত্য সন্ধ্যার মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী। সেই দিনের সেই সন্ধ্যায় হল ভর্তি দর্শকের মুহুর্মুহু করতালিতে আমার নাচের ইন্ধন জুগিয়েছিল। যদিও অনুষ্ঠানটি দর্শনীর বিনিময়ে উপভোগ করেছিল দর্শকরা। ১৯৮৮ সালে ১১ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী। সেই থেকে অবিরাম পথচলা। একদিনের জন্যও থেমে থাকতে হয়নি আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠীকে। দূর্বার গতিতে নাচ, নাটক, আবৃত্তি গান নিয়ে সেই যে পথচলা। কিন্তু মাঝে এসে গানকে গুডবাই জানাতে হয়েছিল। ২০১৮ সাল থেকে আবারো গানকে বরণ করছি। কারণ সবকিছুরই শিখানোর জন্য যোগ্য শিক্ষক দরকার, যেটা বগুড়াতে পাওয়া বড় মুশকিল।

 বর্তমানে নাচ ও আবৃত্তি সমানতালে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এগিয়ে চলছে। নতুন নাটক মঞ্চায়নের জন্য শিল্পীদের মাঝে ব্যাপক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে অনিয়মিতভাবে আমরা ক’জন বুলেটিন নামক একটি পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। যার সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোবিন জিন্নাহ্। ইতিমধ্যেই পত্রিকাটি সুধি মহলে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। অবহেলিত সুবিধা বঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের নিয়ে গঠিত আমাদের সংগঠন ঋদ্ধ সৃজন-এর প্রশিক্ষণ ক্লাসে দু’শতাধিক ছেলে-মেয়ে কাজ করছে। প্রশিক্ষণের কোন সম্মানি ছাড়াই নৃত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে তারা। এটা করছি আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে। গরিব অসহায় এই ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে মানুষের মত মানুষ হোক এবং একজন ভালো শিল্পী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাক- এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

 আমরা এ বছর থেকে নৃত্যকলায় ৫ বছরের সার্টিফিকেট কোর্স শুরু করেছি। ৫টি ব্যাচে এই কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। প্রতি বছর শেষে এই কোর্সে যে সর্বোচ্চ নম্বর পাবে সে ‘মাষ্টার কালু শেখ স্মৃতি পদকে’ ভূষিত হবে। মাষ্টার কালু শেখ বগুড়ায় একজন সুনামখ্যাত নৃত্য পরিচালক ছিলেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার। আজ তিনি বেঁচে নেই, আমি বেঁচে আছি তাঁর কাজ নিয়ে। তাঁর সৃষ্টি করা অনেক নৃত্যনাট্য পরিচালনা করে আমি পেয়েছি অনেক প্রশংসা। তার মধ্যে ওমর খৈয়ামের হাফিজের স্বপ্ন, নাগা, শিকারী সহ লাভ ইন জঙ্গল এবং খন্ড নৃত্য জিপসী, জেলে নৃত্য, সাপুড়ে নৃত্য পরিবেশন করে পেয়েছি ব্যাপক সাফল্য। ১৯৮৮ সালে ১১ নভেম্বর যে সাফল্যের নৌকাতে ভাসছি আজও সেই নৌকা অব্যাহত আছে।

 সাফল্যকে কেমন করে স্পর্শ করতে হয় সেটা শিখেছি আমাদের এই সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা মোজাম্মেল হক-এর কাছ থেকে। তিনি যে সাফল্যর সিঁড়িতে হাঁটছিলেন, আমরা ঠিক তেমনি তাঁর পিছু পিছু হেঁটেছি। তাইতো এই ত্রিশ বছরে সাফল্য আমাদেরকে ছেড়ে যেতে পারেনি। সাফল্যকে আমরা ধরে রেখেছি। ১১ নভেম্বর আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী’র গৌরবের একটি দিন। তাইতো সাফল্য গাঁথা নিয়ে লিখতে বসেছি। দেশে-বিদেশে দর্শক আমাদের সাফল্যের মুল চাবিকাঠি।

দর্শক এখন আর সস্তা বিনোদন পছন্দ করে না। তাইতো আমরা হাজির হয়েছি সাধক ফকির লালন-এর বারামখানা নিয়ে। যার সাফল্য দর্শকরা সহসাই স্পর্শ করতে পারে। ঠিক তেমনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ধ্রুপদী নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা যা বোদ্ধা দর্শকদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। এরকম আরো অনেক নৃত্যনাট্য লাইলী-মজনু, ময়মনসিংহ গীতিকা মহুয়া, ইছামতির বাঁকে দর্শক নন্দিত হয়েছে। আমরা এই ত্রিশ বছরে শিখেছি কি করে পথ চলতে হয়। কি করে একজন প্রতিভাবান শিল্পীকে তাঁর সাফল্যের উচ্চ শিখরে তুলে দিতে হয়।

আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের শিখিয়েছি মাদককে না বলুন, বাল্য বিবাহ বন্ধ করি, ইভটিজিং থেকে দূরে থাকি। পাশাপাশি ভাল মানুষ হিসেবে এদেশের উন্নয়নে ঝাঁপিয়ে পড়ার। আজকে আমাদের যে সাফল্য এই সাফল্য আমাদের একার নয়। এই সাফল্য আমাদের অভিভাবক সহ সবার। তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক- এই সাফল্য থেকে যেন পিছিয়ে না পড়ি। এই সাফল্যের নৌকায় যে ভাবে ভাসছি, এভাবেই যেন ভাসতে পারি। বগুড়া সহ দেশবাসীর কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা। সবাইকে নূপুরের শুভেচ্ছা।
লেখক ঃ নৃত্যশিল্পী ও সভাপতি
আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী, বগুড়া
০১৭১৯-৭৭১৩৯১

এই বিভাগের আরো খবর

রক্তাক্ত ১১ই নভেম্বর ’৭১-বাবুরপুকুর হত্যাকান্ড

আকবর আহমদ :বগুড়া থেকে নাটোর রোডে ১২ কি.মি. যেতেই, শাজাহানপুর উপজেলার তিতখুর গ্রাম পার হওয়ার সময় হাতের বাম দিকে “বাবুরপুকুর” এ চোখে পড়ে “বিমূর্ত পাঁজর” শহীদ স্মৃতিসৌধ। শহীদ স্মৃতি স্তম্ভের স্মারক ভাস্কর্যটির নকশা করেছেন রংপুরের শিল্পী অনিকরেজা। উক্ত স্মৃতি স্তম্ভটিতে শিল্পী দেখিয়েছেন, শহীদদের বুকের পাঁজরের আদলে নির্মাণ করা সুউচ্চ বেদির গায়ে মেশিনগানের গুলির ২৮টি ছিদ্র চিহ্নসহ একটি বিমূর্ত শিল্পকর্ম হিসেবে।

যেখানে ১৪ জন শহীদদের জন্য দু’টি করে ছিদ্র এবংতাদের বক্ষে দেশাত্ব বোধের চেতনায় লেখা- বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি, চিনে নিক দুর্বৃত্ত, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়ি টির তীরে এই বাংলায়, কোনঠে বাহে জাগো সবায়, জয়বাংলা বাংলার জয়, মোদের গরব মোদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা, ও আমার দেশের মাটি তোমার তরে ঠেকায় মাথা, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি ইত্যাদি শ্লোগান।

কিন্তু কেন এই “বিমূর্ত পাঁজর”? কারা এই ১৪ জন শহীদ ? কি করে তাঁরা শহীদ হলেন ?
১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের নভেম্বর মাস। ১১ তারিখ। কোন কোন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বাড়ি এসেছেন স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে। রমজানের ২১ তারিখ শেষ রাতে সকলে যখন সেহরী খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, সেই সময় শান্তি কমিটির সহযোগিতায় পাক হানাদার বাহিনীরা হানা দেয় ঠনঠনিয়ার শাহ পাড়া, মন্ডলপাড়া, তেঁতুলতলা, হাজীপাড়া ও পশারীপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায়।

পাকিস্তাৃিনদেরৃ দালাল আনিসুর রহমান এর সহযোগিতায় হানাদার বাহিনী সেসব বাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা মান্নান পশারী ও তার ভাই হান্নান পশারী, ন্যাপ কর্মী ওয়াজেদুর রহমান টুকু, জালাল মন্ডল ও তার ভাই মন্টু মন্ডল, আব্দুস সবুর ওরফে ভোলা মন্ডল, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম, আলতাফ আলী, বাদশা শেখ, বাচ্চু শেখ, ফজলুল হক খান, টিএন্ডটির অপারেটর নূর জাহান, আবুল হোসেন ও তার পিতা গেদু জিলাদার, ছোটভাই আশরাফ আলী, জনাব আলী ও তার পুত্র জাহাঙ্গীর খন্দকার, সিবের আলীসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩জনকে।

পাক বাহিনী এই ২১ জনকে বাড়ি থেকে বের করেই হাত ও চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নেয়। শত কাকুতি-মিনতি কিছুই থামাতে পারেনি হানাদারদের। গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বগুড়া-নাটোর মহাসড়কের পাশে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বাবুরপুকুরে। সঙ্গেই ছিল শান্তি কমিটির নেতা আনিসুর রাহমান। সেই রাজাকার-ই আটকৃকতদের মধ্য থেকে ১৪ জনকে সনাক্ত করে দেয়। তার সনাক্ত করা টিএন্ডটির মহিলা অপারেটর নূরজাহানসহ ১৪ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। তারপর বায়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিথর শহীদদের শরীরের উপর চালানো হয় নির্মম নিষ্ঠুরতা। বাঁকি ৭ জনকে সেখান থেকে ছেড়ে দেয় হানাদাররা। সেই দিন যারা পাক বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল তারা হলেন শহীদ আবুলের পিতা গেদু জিলাদার ও ছোট ভাই আশরাফ আলী, জনাব আলী ও তার পুত্র জাহাঙ্গীর খন্দকার, সাবের আলী এবং অজ্ঞাত ২ জন। সেখানে হত্যাযজ্ঞের পর লাশ সারিবদ্ধ ভাবে সেখানে ফেলে রাখা হয়।

প্রাণে বেঁচে আসা ৭ জনের কাছে খবর পেয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বাবুরপুকুরে ছুটে যায় লাশের সন্ধানে। কিন্তু সেখান থেকে লাশ আর আনতে পারেনি। সেখানেই কবর দেওয়া হয় ১৪ শহীদের। বাবুরপুকুরে নির্মমভাবে খুন হওয়া শহীদদের নিজ হাতে কবর দিয়েছিলেন আলাউদ্দিন মাষ্টার। স্থানীয় তিতখুর গ্রামের মহানুভব ব্যক্তি আলতাফ হোসেন, এ্যাড. আফতাব উদ্দিন, এ্যাড. রাশেদুর রহমান মরিস, আলাউদ্দিন মাষ্টার ১৫ শতাংশ জমি শহীদদের স্মরণীয় করে রাখার জন্য স্মৃতিস্তম্ভের নামে দান করেছেন। সেই জমির উপর-ই এই ১৪ জন শহীদ স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে “বিমূর্ত পাঁজর”।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ কিনতে এ রকম ত্রিশ লক্ষ মানুষকে রক্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশ পরিবার-ই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতার নিকট থেকে চিঠি ও দুই হাজার টাকার চেক পেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন জাতির জনকের সমবেদনা। জাতির জনক এই শহীদদের সর্বোচ্চ সম্মানিত করে বলেছিলেন – “বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে সমস্ত বীর সন্তান আত্মাহুতি দিয়ে গেলেন, তাঁদের স্মৃতিকে আমরা যেন ভুলে না যাই।”৪৬ বৎসর পর আজ আমরা কি পেরেছি জাতির এ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যথাযথ মর্যাদা দিতে ? আমরা কি তাঁদের পরিবার-পরিজনের খোঁজ রেখেছি? কেমন আছেন তাঁরা ? আদৌ কি তাঁদের উত্তরসুরি কেউ বেঁচে আছেন ?
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
ahmad.akbar32@gmail.com
০১৭৭২-৭৮১৩০১

এই বিভাগের আরো খবর