সকাল ৮:০৩, বুধবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / হিজরি সনের ইতিকথা ও তাৎপর্য
হিজরি সনের ইতিকথা ও তাৎপর্য
অক্টোবর ১২, ২০১৭

মাও: মো: রায়হানুর রহমান :রাসূল (সা.) এর আগমনের পূর্বে সন গণনার ইতিবৃত্ত: ইসলাম আসার আগে আরবে সমষ্টিগতভাবে কোন তারিখের প্রচলন ছিল না। সে সময় তারা প্রসিদ্ধ ঘটনা অবলম্বনে যেমন ইবরাহীম (আ.) এর অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার বছর, কাবাঘর নির্মাণ করার বছর, বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুদ্ধ যেমন: বাসুস, দাহেস, হারবুল ফুজ্জার ইত্যাদি নামের বছর, আমূল ফিল বা হস্তিবাহিনীর বছর, রাসূল (সা.) এর নবুওয়াত লাভের সন থেকে নবুওয়াতি বছর বা সন, যে বছর আবু তালিব ও রাসূল (সা.) এর স্ত্রী খাদিজা (রা) মারা যান সে বছরটি আমুল হুযুন বা শোকের বছর নামে পরিচিত। তবে উমার (রা.) এর হিজরি সন প্রচলন করার আগ পর্যন্ত আরবে মোটামুটি হস্তিবর্ষই প্রচলন ছিল। (আল কামিল ফিত তারিখ লি ইবনিল আছির, ১/৯ পৃষ্ঠা।)

হিজরি সন প্রবর্তনের কারণ: (এক) হিজরি সনের সাথে ইসলামের বেশ কিছু ইবাদত সংশ্লিষ্ট। প্রতি বছর রোযা, ঈদ, যাকাত, হজ ইত্যাদি ইবাদত পালন হয় এই চন্দ্র মাসকে কেন্দ্র করে। মহান আল্লাহ বলেন, “লোকে তোমাকে জিজ্ঞেস করছে নবচন্দ্র সমূহের ব্যাপারে। বলে দাও যে, এটি মানুষের জন্য সময়সমূহের নিরূপক ও হজের সময় নির্দেশক। (সূরা বাকারাহ: ১৮৯)। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর। তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে শা’বানের তারিখ ত্রিশদিন পূর্ণ কর। (বুখারি: ১৮৭১, মুসলিম: ২৩৮৫, নাসাঈ: ২১২৩)।

(২) চন্দ্রের উদয়-অস্তের তারতম্যের কারণে চন্দ্রের ডুবে যাওয়া, সরু ও মোটা হওয়া এবং আলোর হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়া এবং সেই সাথে আবহাওয়ার তারতম্য ঘটা ইত্যাদির মধ্যে মানুষের জন্য নানাবিধ কল্যাণ নিহিত আছে। চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীতে নদী-সমুদ্রে জোয়ার ভাটা ঘটে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চন্দ্রকে করেছেন জ্যোতির্ময় এবং এর জন্য নির্ধারিত করেছেন কক্ষসমূহ। যাতে তোমরা জানতে পার বছর সমূহের সংখ্যা ও হিসাব। আল্লাহ এসব সৃষ্টি করেছেন সত্য সহকারে। (সূরা ইউনুস: ৫)। সুতরাং চন্দ্র মাসের সাথে প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। (তিন) আল্লামা আইনির বর্ণনা মতে, একবার আবু মূসা আশয়ারী (রা.) উমার (রা.) এর কাছে চিঠি লেখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অনেক ফরমান আসে কিন্তু তাতে কোন তারিখ লেখা থাকে না। তাই যদি সময়ক্রম নির্ধারণের জন্য সাল গণনার ব্যবস্থা করতেন তবে খুব ভাল হতো। অপর বর্ণনায় এসেছে, উমার (রা.) এর কাছে একবার একটি দলিল পেশ করা হয় যাতে কেবল শা’বান মাসের নাম লেখা ছিল। তিনি বললেন, এ বছরের শা’বান নাকি আগামী বছরের শা’বান? তারপর হিজরি সন প্রবর্তন করা হয়। (রাসুলে রাহমত, ২০৮ ও ২০৯ পৃষ্ঠা)।


যেভাবে হিজরি সন প্রবর্তন করা হলো: ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, উমার (রা.) যখন সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তখন তিনি পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। সভায় সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) রাসূল (সা.) এর ওফাত থেকে সাল গণনার প্রস্তাব দেন। তালহা (রা.) প্রস্তাব দেন নবুওয়াত প্রাপ্তির বছর থেকে এবং আলি (রা.) হিজরতের বছর থেকে সন গণনার প্রস্তাব দেন। পরে সবাই আলি (রা.) এর প্রস্তাবে ঐকমত্য পোষণ করেন। (রাসূলে রাহমত, ২০৮ ও ২০৯ পৃষ্ঠা।) রাসূল নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে ২৭ সফর মোতাবেক ৬২২ ঈসায়ী সনের ১২ তারিখ দিবাগত রাতে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের জন্য রওনা দেন। সঙ্গে ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। (আর রাহীকুল মাখতুম: ১৭৪ পৃষ্ঠা)। তিনি ২০ সেপ্টেম্বর ৬২২ ইং মোতাবেক ৮ই রবিউল আউয়াল ১৩ নববী সনের সোমবার কুবায় পৌছেন। (রাসুলে রাহমত, ২০৫ পৃষ্ঠা)। কিন্তু আরবি সনের প্রথম মাস মহররমের সাথে মিল করার জন্য হিজরি সন গণনা শুরু করা হয় ১৬ জুলাই ৬২২ খৃষ্টাব্দ থেকে। হিজরি সনের মাসের নামসমূহ ও তার অর্থ: আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই। তন্মধ্যে চারটি মাস হারাম (সম্মানিত)। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং তোমরা এর মধ্যে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।

 (সূরা তাওবা: ৩৬) হিজরি বারটি মাস: মহররম (নিষিদ্ধ, সম্মানিত, যেহেতু উক্ত মাস সম্মানিত), সফর (শূন্য/ খালি, এ মাসে আরবরা যুদ্ধ বা বাণিজ্য সফরে যাওয়ার কারণে তাদের বাড়িঘর শূন্য হয়ে যেত), রবিউল আউয়াল (প্রথম বসন্ত), রবিউস সানি (দ্বিতীয় বসন্ত, এ দুই মাস আরবে বসন্ত ঋতু থাকত, তাই এর নাম রাখা হয়েছে জুমাদিল উলা (বরফ জমিবার প্রথম মাস), জুমাদিল উখরা বা জুমাদিউস সানি (বরফ জমিবার দ্বিতীয় মাস,) এ দু’মাসে আরবে বরফ জমত। ইবনে কাসির বলেন, সম্ভবত: যে বছর এ মাসগুলোর নামকরণ করা হয় সে বছর এ দুই মাস আরবে বরফ জমেছিল, পরবর্তীতে আরবে যে অবস্থাই হোক না কেন মাসের নামসমূহ অপরিবর্তিত রাখা হয়), রজব (সম্মান করা), শা’বান (ছড়াইয়া পড়া, আরবরা এ মাসে ব্যবসা-বাণিজ্য, লুট-তরাজ ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত), রমজান (গরমের মাস, এ মাসে আরবে অত্যাধিক গরম পড়ত), শাওয়াল (উটের লেজ উচাইয়া সংগত হবার মাস) যুলক্বাদ (উপবিষ্ট থাকা, আরবরা এ মাসে যুদ্ধ ও সফর স্থগিত রেখে বাড়িতে বসে থাকত), যুল হিজ্জাহ বা যুল হাজ্জাহ (হজের মাস, আরবরা এ মাসে হজ পালন করে থাকে)। (সূত্র: তাফসিরে ইবনে কাছীর, ৪/৬৯০-৬৯৩ পৃষ্ঠা)।

বর্ষ গণনায় হিজরতের ঘটনাকে প্রাধান্য দেয়ার তাৎপর্য: মহানবী (সা.) এর জন্ম, নবুওয়াত, মি’রাজ, ওফাতসহ একাধিক বিষয়ে সন গণনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সন গণনার প্রচলন করা হয়। এর কিছু তাৎপর্য নিচে উল্লেখ করা হলো:১) সুহাইলি (রা.) বলেন, সাহাবাগণ সাল গণনার বিষয়ে হিজরতকে প্রাধান্য দিয়েছেন সুরা আত তাওবার ১০৮ নং আয়াতের প্রেক্ষিতে। এতে প্রথম দিন তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে (মসজিদে কুবার) কথা বলা হয়েছে। এই দিন হচ্ছে সেই দিন যেদিন ইসলামের বিশ্বজয়ের সূচনা হয়েছে। সেজন্য সাহাবাগণ এ দিনকে সন গণনার জন্য বেছে নিয়েছেন।

(ফাতহুল বারি: ৭/২৬৮)।২) হিজরত অর্থ ত্যাগ করা। ইবনে হাজার আসকালানী (রা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ বস্তু পরিত্যাগ করাকে হিজরত বলে। (ফাতহুল বারি, ১/১২ পৃষ্ঠা, সীরাত বিশ্বকোষ, ৫/২৫৮ পৃষ্ঠা)। মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের ঘটনা দীনের স্বার্থে মহানবি (সা.) ও সাহাবাদের ত্যাগের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এর মাধ্যমে কাফিরদের পরাজয় এবং দ্বীনের বিজয়ের দরজা উন্মুক্ত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ কর, কাফিররা যখন তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করার জন্য, হত্যা করার অথবা নির্বাসিত করার জন্য। আর তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন। আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী।’ (সূরা আল-আনফাল: ৩০)।

৩) আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের বাস্তব উদাহরণ হিজরত: আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আবু বকর (রা.) বলেছেন, (হিজরতের সময়) আমি আমাদের মাথার উপরে মুশরিকদের পা দেখতে পেলাম যখন আমরা সাওর গুহায় ছিলাম। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি তারা কেউ নিজের পায়ের দিকে তাকায়, তবে সে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তখন রাসূল (সা.) বললেন, হে আবু বকর! তুমি এমন দুই ব্যক্তি সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ কর, যাদের তৃতীয় জন হলেন স্বয়ং আল্লাহ। (বুখারি: ৩৫২৩)। আল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে স্মরণ কর, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন। যখন কাফিররা তাকে বের করে দিয়েছিল এবং সে ছিল দুইজনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিল; সে তার সঙ্গীকে বলেছিল, চিন্তিত হয়োনা, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। অত:পর আল্লাহ তার উপর স্বীয় প্রশান্তি বর্ষণ করেন এবং তাকে সাহায্য করেন এমন সৈন্যবাহিনী দ্বারা যা তোমরা দেখ নাই। (সূরা আত-তাওবা: ৪০)।


৪) হিজরত ফজিলত ও মর্যাদার কাজ: আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, আল্লাহর পথে নিজেদের জান-মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, আল্লাহর কাছে তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে। আর তারাই সফলকাম। তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাদের রব স্বীয় দয়া ও সন্তুষ্টির এবং এমন জান্নাতের যাতে রয়েছে স্থায়ী শাস্তি। (সূরা আত তাওবা: ২০-২১)। উমার ইবনে খাত্তাব (রা.) সূত্রে। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, সকল কাজের ফলাফল নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি নিয়ত অনুসারেই কাজের প্রতিফল পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্যে হিজরত করেছে, তার হিজরত সেদিকেই হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। পক্ষান্তরে যার হিজরত দুনিয়া হাসিল করা কিংবা কোনো নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হবে, তার হিজরত সে লক্ষ্যেই নিবেদিত হবে। (বুখারি: ৫৪)।

৫) হিজরত মানুষকে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়: পূর্ববর্তী বছরের পাপ থেকে তাওবা করে নতুন বছরে পাপ থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা করার নাম হিজরত। প্রতি বছর হিজরি সন মুমিন বান্দাকে সে কথাই স্মরণ করে দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) সূত্রে। রাসূল (সা.) বলেছেন: যার জবান ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ সেই প্রকৃত মুসলিম। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিষিদ্ধ কার্যাবলী পরিত্যাগ করে সেই প্রকৃত মুহাজির (হিজরতকারী)। (বুখারি: ১০, মুসলিম: ৬৭)। সম্ভবত: এ সকল কারণে সাহাবাগণ সন গণনায় হিজরতের ঘটনাকে গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ অধিক জ্ঞাত।
লেখক : ধর্মীয় শিক্ষক,
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া।
[email protected]
০১৭৩৯-৮৫০৬৫৬

এই বিভাগের আরো খবর



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top