সকাল ৯:১৩, শনিবার, ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
/ আর্ন্তাজাতিক / সৌদি আরব ছাড়লেন সাদ হারিরি
সৌদি আরব ছাড়লেন সাদ হারিরি
নভেম্বর ১৮, ২০১৭

সৌদি আরব সফরে গিয়ে সেখান থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হইচই ফেলে দেওয়া লেবাননের সাদ আল হারিরি রিয়াদ থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।

শুক্রবার গভীর রাতে দেওয়া এক টুইটে তিনি সৌদি বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা জানান। তার সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও ফ্রান্স যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

“আমি এয়ারপোর্টের পথে,” টুইটে লেখেন সাদ। পরে হারিরি পরিবারের মালিকানাধীন ফিউচার টেলিভিশন চ্যানেলও স্ত্রীকে নিয়ে সাদ রিয়াদ ছেড়েছেন বলে জানায়।

চ্যানেলটির খবরে বলা হয়, “সাদ হারিরি তার স্ত্রীসহ নিজের প্রাইভেট জেটে রিয়াদ বিমানবন্দর ছেড়ে লা বুরজে (প্যারিসের কাছে) বিমানবন্দরের দিকে রওনা হয়েছেন।”

শনিবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে সাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

সাদের ফ্রান্স সফর লেবাননকে ঘিরে দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুধবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ সাদ ও তার পরিবারকে লেবাননে আমন্ত্রণ জানান। পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর চলাচল যে সীমিত নয়, সাদ সৌদি আরব ত্যাগ করলে তা বোঝা যাবে ফরাসী কূটনীতিকদের এমন ভাষ্যের মধ্যেই ম্যাক্রোঁর এই আমন্ত্রণের খবর আসে।

ফ্রান্স সফরের পর সাদ বৈরুত ফিরে যাবেন এমনটা ধারণা করা হলেও তার দল ফিউচার মুভমেন্টের সাংসদ ওকাব সাকর জানান, দেশে ফেরার আগে সাদ আরব দেশগুলোতে ‘সংক্ষিপ্ত সফর’ করতে পারেন।

পরে সুইডেনে দেওয়া এক বক্তব্যে ম্যাক্রোঁও বলেন, “সামনের দিন বা সপ্তাহগুলোতে সাদ নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।”  

এ মাসের শুরুতে সৌদি আরব সফরে গিয়ে সেখান থেকে পাঠানো এক টেলিভিশন বার্তায় লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সাদ। পদত্যাগের কারণ হিসেবে ‘নিজের প্রাণনাশের হুমকির’ কথা জানান, এজন্য ইরান ও তাদের সমর্থিত হিজবুল্লাহকে দোষারোপ করেন তিনি।

তার এই আকস্মিক ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন টানাপোড়েনের জন্ম দেয়। সাদের অভিযোগের প্রত্যুত্তরে ইরান বলে, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ানোর ষড়যন্ত্রেই লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা।

সৌদি আরব ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সাদের রিয়াদ সফরে গিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা এবং দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে না আসায় তাকে ‘জিম্মি’ করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করে লেবানন।  

হিজবুল্লাহ নেতা সাইয়েদ হাসান নাসরুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, সাদকে ‘আটকে রেখে’ সৌদি আরব লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সাদের দল ফিউচার মুভমেন্ট এক বিবৃতিতে লেবাননের রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বৈরুতে ফেরত আসা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে।

দুই বছরের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর গত বছর লেবাননের ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে সুন্নি ও শিয়া সমর্থিত প্রধান দলগুলোর সমঝোতায় প্রধানমন্ত্রী হন সাদ হারিরি, সমঝোতায় অংশ নেওয়া শিয়া রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সমর্থনে প্রেসিডেন্ট হন মিশেল আউন।

২০০৫ সালে গাড়ি বোমা হামলায় সাদের বাবা রফিক আল-হারিরির মৃত্যুর পেছনে শিয়া এই গোষ্ঠীটির হাত আছে বলে কারো কারো সন্দেহ।

গত সপ্তাহে আউন ‘সৌদি আরব সাদকে আটকে রেখেছে’ বলে অভিযোগ করেন। বৈরুতে ফিরে না এলে সাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হবে না বলেও জানান তিনি।

সৌদি আরব ও সাদ শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ‘হিজবুল্লাহ বৈরুতের রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো দখলে নেওয়ার’ কারণেই লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বলেও দাবি করেছে রিয়াদ। লেবাননে ইরান সমর্থিত শিয়া গোষ্ঠীটির প্রভাব কমাতে না পারায় তারা সাদ নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনাও করেছে।

শুক্রবার এক টুইটে সাদও বলেছেন, আটক নয়, লেবাননের ভবিষ্যৎ ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতেই তিনি রিয়াদে অবস্থান করছেন।

আগের দিন লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জিবরান বাসিল হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, সাদ দেশে না ফিরলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্কট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বৈরুত ।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানকে প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে সৌদি আরব। হিজবুল্লাহকে দিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সিরিয়া, ইয়েমেন ও বাহরাইনে হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ রিয়াদের।

রাজনৈতিক দল হিসেবে হিজবুল্লাহকে মেনে নিতে আপত্তি না থাকলেও সৌদি আরব চায় তারা অস্ত্র সমর্পণ করুক; অন্যদিকে শিয়া এ গোষ্ঠীর দাবি, লেবাননকে রক্ষা করতে বাধ্য হয়েই অস্ত্র ধরেছে তারা।

সুন্নি, শিয়া, দ্রুজ ও খ্রিস্টান বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদে ১৯৭৫ সাল থেকে লেবাননে দেড় দশক ধরে গৃহযুদ্ধ চলে। পরে এক রাজনৈতিক সমঝোতায় সংঘাতের আপাত অবসান হয়।  ঐতিহ্য অনুযায়ী, সুন্নি অংশ থেকেই দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত হয়; যে অংশে সাদ এখনো সবচেয়ে প্রভাবশালী।

ম্যাক্রোঁর সঙ্গে সাদের বৈঠকের পরদিনই আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরান প্রসঙ্গে আলোচনা করতে মিশরের কায়রোতে একত্রিত হবেন। তাদের বৈঠক থেকে তেহরানের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে বলে আশা রিয়াদের।

যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, লেবানন নিয়ে ইরানকে চাপ দেওয়ার কৌশলে সৌদি আরবের সঙ্গে অন্যরা একমত নাও হতে পারেন।

“লেবানন কতটা করতে পারে, এই বিষয়ে সবার মধ্যেই একটা সাধারণ বোঝাপড়া আছে। সে কারণে কেউই সৌদি আরব ও ইরানের পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে লেবাননেকে বেছে নেবে না,” আশা বৈরুতের কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাহা ইয়াহিয়ার।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top