রাত ১১:৪৩, শুক্রবার, ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
/ চট্টগ্রাম / মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকিতে সহিংসতার সাক্ষী রোহিঙ্গা শিশুরা
মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকিতে সহিংসতার সাক্ষী রোহিঙ্গা শিশুরা
অক্টোবর ১১, ২০১৭

করতোয়া ডেস্ক: কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সেখানে বাঁশের তৈরি রঙিন এক ছাউনি ঘরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের একটি দল বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। কেউ মাটিতে বসে বোর্ড গেম খেলছে, কেউ প্লাস্টিকের পশুপাখি নিয়ে খেলাধুলায় মত্ত। দু’জন তো আবার কার্টুন চরিত্রের কস্টিউম পরে লাফাচ্ছে। একজন সেজেছে নিমো, আর আরেকজন সিংহ।

ঘরটির দেয়াল জুড়ে রয়েছে মোমরঙে আঁকা নানা রকম ছবি। ছবিগুলো এঁকেছে এই রোহিঙ্গা শিশুরাই। সেখানে ফুটে উঠেছে তাদের নিজ চোখে দেখা ভয়াবহ সব সহিংসতা-হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি, যা মোমের চেয়েও নরম শিশুমনে গেঁথে গেছে ধারালো পেরেকের মতো।

ছবিগুলো বেশ কয়েকটাই এঁকেছে ১১ বছরের একটি ছেলে। ‘এটা আমার গ্রাম। ওরা এমন করে দিয়েছে,’ ছবিতে আঁকা পুড়তে থাকা ঘরবাড়ি, সেখানে আটকে পড়া লোকজন আর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হামলায় লাশ হয়ে পড়ে থাকা মানুষগুলোকে দেখাল ছেলেটা।

আরেকটি ছবির দিকে ইঙ্গিত করে সে ব্যাখ্যা করল, একটি খেলার মাঠে হঠাৎ করে সেনা সদস্যরা এসে ছেলেমেয়েদের মেরে ফেলল। অন্য একটা ছবিতে কালো আর বেগুনি রঙে আঁকা কয়েকটি হেলিকপ্টারের সঙ্গে এক সেনা সদস্যকেও দেখাল ছেলেটি, যাকে সে চোখের সামনে ছোট্ট আরেকটি শিশুর বুকের ওপর পা রেখে পায়ের নিচে পিষ্ট করে হত্যা করতে দেখেছে। বিহ্বল করে দেয়ার মতো এ বর্ণনা, যা শুনতেই বুক কেঁপে ওঠে, সেই স্মৃতি কিনা এইটুকুন বাচ্চা ছেলে নিজ চোখে দেখে আবার মনের ভেতর নিয়ে ঘুরে ফিরছে!
‘মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আমাদের ওপর নির্যাতন চালাত। আমি যখন ছবিগুলো আঁকি, আঁকার পর আমি ভালো বোধ করি,’ ছবির মধ্য দিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলো প্রকাশ করতে সুবিধা হয় বলে আল-জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সে জানায়। জাতিসংঘ শিশু তহবিল – ইউনিসেফের হিসেব অনুসারে, আগস্টে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ৬০ শতাংশই শিশু। নৃশংসতার সম্মুখীন হওয়ায় চরম মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকিতে থাকা এই শিশুকিশোরদের স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্যেই মানসিক স্বাস্থ্য কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) নামের স্থানীয় একটি এনজিও সংস্থা ইউনিসেফের সঙ্গে মিলে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য তৈরি এই নিরাপদ এলাকা পরিচালনা করছে। এটি ছাড়াও কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে আরও বেশ কয়েকটি এ জাতীয় ‘চাইল্ড ফ্রেন্ডলি স্পেস’ (সিএফএস) এবং স্কুল চালু করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ভয়াবহতা থেকে পালিয়ে আসা শিশুকিশোরদের মানসিক আঘাত ও ট্রমা থেকে বের করে আনতে যতটা সম্ভব কাজ করে যাচ্ছে ইউনিসেফ এবং স্থানীয় ত্রাণ সংস্থাগুলোর সহায়তায় পরিচালিত এই সেন্টারগুলো। এদের মূল উদ্দেশ্য, ছেলেমেয়েগুলো যেন একে অপরের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। কোডেকের সেন্টার ম্যানেজার লুৎফুর রহমান জানান, প্রথম প্রথম সিএফএস ও স্কুলগুলোর শিক্ষক এবং আউটরিচ কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে বাবামাদের কাছে সন্তানদের সেন্টারে পাঠানোর কথা বললেও তারা রাজি হতে চাইতেন না, ভয় পেতেন, জায়গাগুলো তাদের ছেলেমেয়ের জন্য নিরাপদ হবে কিনা।

এমনকি ছেলেমেয়েগুলো প্রথমে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে চাইত না। তাদের কাগজ আর আঁকাআঁকির সরঞ্জাম দিলে সেগুলো নিয়েও অস্বস্তিবোধ করত বলে জানান তিনি। চরম সংকটে থাকা রোহিঙ্গাদের মৌলিক চাহদার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রাথমিক চিকিৎসা (পিএফএ) দেয়ার কাজ করার কথা জানিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীরা। ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স’-এর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বরত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকাণ্ড ব্যবস্থাপক সিনথিয়া স্কট ট্রমার শিকার মানুষদের প্রথম কয়েক সপ্তাহ শুধু পিএফএ দেয়া হয়। কেননা ওই সময়টা কাউন্সেলিং বা তাদের অনুভূতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার নয়। তখন তাদের দরকার মূলত একটু সান্ত্বনা, অস্থির মনকে স্থির করা, যেন তারা স্বাভাবিকভাবে চিন্তা ও কাজ করার মতো অবস্থায় আসে। ‘ওই সময় মানুষ মনে করে তারা পাগল হয়ে যাচ্ছে। তখন বড় দায়িত্ব হলো তাদের শুধু বোঝানো যে, না, তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছো না,’ বলেন স্কট। মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত শিশুসহ সব বয়সী রোহিঙ্গার মাঝেই হঠাৎ করে ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যাওয়া, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা, তীব্র স্ট্রেস, প্রায় বারবার দুঃস্বপ্ন, অনিদ্রা, খেতে ও কথা বলতে না পারা এবং আরও বেশি জটিল কেসে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের দিকে নজর দিতে না পারার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাদের সবাইকে প্রথমে এটাই বোঝানো হয়: তারা এখানে নিরাপদ ও সুরক্ষিত এবং তারা একা নয়।
বোনকে কাঁধে নিয়ে ৭ বছরের রোহিঙ্গা শিশু ইয়োসার

মিয়ানমার নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা বেশির ভাগ রোহিঙ্গার জীবনের গল্প ইয়োসার হোসেনের মত। ইয়োসার হোসেনের বয়স মাত্র সাত বছর। গায়ে এখনো স্কুল ড্রেস, জীবনের তাগিদে ছোট বোনকে কাঁধে নিয়ে মেঠো পথে ধরে হাঁটতে শুরু করেছেন। গন্তব্য  বাংলাদেশ। ২৫ আগষ্ট সহিংসতার পর থেকে এভাবেই বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে প্রায় পাঁচ লাখের বেশি মুসলিম রোহিঙ্গা। যাদের দুই তৃতীয় অংশ শিশু বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ। রোহিঙ্গা শিশু ইয়োসার হোসেন জানায়, ‘সে(বোন) খুব ভারী। গত সপ্তাহে আমি বাবাকে হারিয়েছি, আমরা বাড়ি-দেশ সবকিছু হারিয়েছি। আমি ভাবতেও পারিনি সমস্ত রাস্তায় ওকে (বোন) বহন করতে পারব।’ ইয়োসার মা ফিরোজা বেগম বলেন, তাদের বাড়ি রাথাডং ছিলো , দুই সপ্তাহ আগে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। হঠাৎ করেই দেখে সবাই চিৎকার করছে এবং চারিদিকে শুধু আগুন আর আগুন। আমাদের সব কিছু পুড়ে গেল, ইয়োসার বাবা পালিয়ে আসতে গেলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিন বাচ্চা এবং আমি বেঁচে আসতে পেরেছি। ইয়োসারা ছয়দিন ধরে হাঁটছে। সঙ্গে আছে তার দুই খালা ও খালাতো ভাই বোন। তারা পথে যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে। খুব অল্প সময় নিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। যতক্ষণ নাফ নদীর কূল খুঁজে না পাওয়া যাবে ততক্ষণ চলতে থাকে ইয়োসারদের জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম। এপির ছবিতে ফুঠে উঠেছে ইয়োসার সংগ্রামের সেই চিত্র। বাংলাদেশে পৌঁছাতে এখনো তাদের পরিবারকে একদিন ধরে রিক্সা, ট্রাক,হেঁটে বাংলাদেশে আসতে হয়েছে। ইয়োসার এখনো স্কুল ড্রেস পড়া, গায়ে সাদা শার্ট, আর সবুজ প্যান্ট পড়া। সে এভাবেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসে। ইয়োসার জানায়, তার কালো জুতা ও মোজা ছিল, কিন্তু আসার সময় আনতে ভুলে গেছে। স্কুলের কথা তার খুব মনে পড়ছে। অবশেষে ২ অক্টোবর ইয়োসার এবং তার পরিবার বাংলাদেশে তাদের এক আত্মীয়র বাড়িতে এসে পৌছায়। এই দীর্ঘ পথ ইয়োসারকে তার ছোট বোনকে কাঁধে করে নিয়ে আসতে হয়েছে।
পাকিস্তানকে পাশে থাকার আহ্বান বাংলাদেশের

বাংলাদেশে নবাগত ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের বাড়িঘরে ফেরৎ পাঠানো নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পাকিস্তানকে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার ইসলামাবাদে পাকিস্তানের নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শাহিদ খাকান আব্বাসীর সঙ্গে দেখা করে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার তারিক আহসান এ অনুরোধ জানান। হাই কমিশনের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। প্রায় ৫ লাখের বেশি উদ্বাস্তু মিয়ানমার নাগরিককে আশ্রয় দেয়া এবং এ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই তার সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। হাই কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে বিদ্যমান ভুল বোঝাবুঝি নিরসন করতে ও শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ার আহ্বান জানান। সে লক্ষ্যে তিনি দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক করার প্রতি প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের হাই কমিশনার শাহিদ খাকান আব্বাসীকে জানান, দীর্ঘ সময় থেকে ঝুলে থাকা পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top