সকাল ৮:১২, বুধবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ দেশজুড়ে / রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নয়, বাংলাদেশের : সেনাপ্রধান মিন অং
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাথে বৈঠকে মিয়ানমার সেনাপ্রধান মিন অং ××× নিষেধাজ্ঞায় ভালো ফল আসবে না : অর্থ সচিবের হুঁশিয়ারি
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নয়, বাংলাদেশের : সেনাপ্রধান মিন অং
অক্টোবর ১২, ২০১৭

করতোয়া ডেস্ক : রোহিঙ্গাদের আবারও বাঙালি আখ্যা দিয়ে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান বলেছেন, উপনিবেশের কালে ব্রিটিশ শাসকরা তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে তাদের নিয়ে এসেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্কট মার্সেলের সঙ্গে এক বৈঠকে এই মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার তার ফেসবুক পেজে এমনটা জানানো হয়েছে। ডি-ফ্যাক্টো সরকার শাসিত মিয়ানমারে সেনাপ্রধান মিন অংকেই সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কদিন আগে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি প্রমাণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

সাম্প্রতিক সহিংসতার শিকার হয়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাকে খুব একটা বিচলিত হতে দেখা যায়নি। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করে তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য তিনি ব্রিটিশদের দায়ী করেন। বলেন, ‘বাঙালিদেরকে ব্রিটিশরাই মিয়ানমার নিয়ে আসে। তারা আমাদের দেশি নয়। এমনকি তারা রোহিঙ্গাও নয়। তারা শুধুই বাঙালি।’ জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর থেকে জানানো হয়, মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী রোহিঙ্গাদের উপর নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে। তাদের বাড়ি ও ফসল পুড়িয়ে দিয়েছে। ২৫ আগস্ট হামলার পর চালানো সরকারি বাহিনীর নিধনযজ্ঞে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৬৫ জন মানুষের সঙ্গে জাতিসংঘ-কর্মীদের আলোচনার ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মিয়ানমার ২৫ আগস্টে নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বললেও ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে এর আগে থেকেই সেখানে জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে দেশটির ডি ফ্যাক্টো সরকারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির। গত বছর নির্বাচনে জয়লাভ করে দায়িত্ব নিলেও আদতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতেই সব ক্ষমতা রয়েছে। মিন অং হ্লায়াং বলেন, ‘বাঙালিরা আরসার নেতৃত্বে হামলা চালিয়েছে। নিজেরা বাঁচতে পারবে না জেনেই তারা পালিয়ে যাচ্ছে।’ আগেও রোহিঙ্গা প্রশ্নে একই অবস্থান নিয়েছেন মিন অং। ১৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার)  নিজের সরকারি ফেসবুক পেজে তিনি  রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠী বলে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তার দাবি, রোহিঙ্গারা কখনও মিয়ানমারের জাতিগত গোষ্ঠী ছিল না; এটি ‘বাঙালি ইস্যু’। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সৃষ্ট এই পরিস্থিতির জন্য মিন অং ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। তিনি সবসময়ই চেয়েছেন রোহিঙ্গারা ফিরে যাক। মিন অং বলেন, বাঙালিরা বাংলায় ফিরে যাক। তারা হয়তো অন্য দেশেও পালিয়ে গেছে। সেখানেও হয়তো নাগরিকত্ব দাবি করেছে। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ‘অনেক বাড়িয়ে’ বলা হচ্ছে। আর এর পেছনে অনেক সংবাদমাধ্যম অপপ্রচার চালাচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞায় ভালো ফল আসবে না  
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযানের জেরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা কারও জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব ইউ টুন টুন নাইং এ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বলে মিয়ানমার টাইমসের এক প্রতিবেদনে বুধবার জানানো হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে পুলিশের ওপর রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর থেকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ছে।

সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়েছে। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর ছয় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনও রোহিঙ্গা মুসলিমরা রাখাইন ছেড়ে পালাচ্ছে। আক্রমণাত্মক অভিযানে লাখো রোহিঙ্গা পালিয়ে আসার ঘটনায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। মিয়ানমার টাইমস বলছে, ‘যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় তাহলে কয়েক বছরের উন্নয়নের পর দেশটির বর্তমান অর্থনীতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।’ ‘মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এটা ভালো কোনো লক্ষণ নয়।

নিষেধাজ্ঞা আরোপের অর্থ হচ্ছে কোনো দেশকে অর্থনৈতিকভাবে অন্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাধা দেয়া। তারা আমাদের অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকার ও দেশের সঠিক উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে এবং এটা ভালো কিছু নয়’- বলেন ইউ তুন তুন নাইং। মিয়ানমারের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় তাহলে অর্থনীতির ওপর সরাসরি কোনো প্রভাব পড়বে না। বাণিজ্য এবং সহযোগিতার মাত্রা কম থাকায় এতে কোনো সমস্যা হবে না।’ তবে জাতিগত শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে দেশটিকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এটি দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’ মিয়ানমার টাইমস বলছে, মিয়ানমার এখনও গণতান্ত্রিক যাত্রা ও জাতীয় ঐক্যের পথে শুরুর দিকে রয়েছে। তুলনামূলকভাবে দেশটির অর্থনীতি দ্রুত অগ্রগতি লাভ করছে। আগের বছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; যা ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে নতুন বিনিয়োগ আইন কার্যকর করা হয়েছে এবং শিগগিরই নতুন কোম্পানি আইনও অনুমোদন পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়া বেশ কিছু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও গভীর সমুদ্র বন্দরে বড় ধরনের বিনিয়োগের ব্যাপারে আলোচনা চলছে। ফলে নতুন নতু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে এসব কিছুই বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখপাত্র ইউ জ্য হতেই বলেন, ‘কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা চলছে সেটি কোনো ব্যাপার নয়; তবে গণতন্ত্রের রূপান্তর, অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখা এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা পশ্চিমাদের উচিত হবে না।’

মিয়ানমার টাইমস বলছে, দেশীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী প্রশাসন থেকে বর্তমান সরকার, সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। তবে জাতিগত, ধর্মীয় এবং সামরিক বিষয়গুলো এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ইউ ইয়ে মিন ওও বলেন, ‘মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও অনৈক্য দেখা দিতে পারে।’ ইউ তুন তুন বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে মিয়ানমারের অর্থনীতিতে তা সীমিত প্রভাব ফেলতে পারে। নিষেধাজ্ঞার কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ব্যবসা বাণিজ্যের ওপর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিয়ানমারের ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত। চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের তুলনায় ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কম হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা মিয়ানমারের অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে না।’

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top