সকাল ৯:০৯, শনিবার, ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
/ দেশজুড়ে / ছিটমহল বিনিময়ের পর এখন ওরা ভারতীয় নাগরিক
জন্মস্থানের মানুষ কাছে পেয়ে চোখের জলে আদর অভ্যর্থনা
ছিটমহল বিনিময়ের পর এখন ওরা ভারতীয় নাগরিক
ডিসেম্বর ৬, ২০১৭

সামসউদ্দীন চৌধুরী কালাম, (হলদিবাড়ী-কুচবিহার) ভারত থেকে ফিরে : ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতের পর স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশ ভূখন্ডের সাথে এবং ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতের ভূখন্ডের সাথে একীভূত হয়। ছিটমহল বিনিময়ের পর ভারতের অভ্যন্তরের বাংলাদেশী ছিটমহল থেকে কোন মানুষ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ না করে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে ভারতেই অবস্থান করছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতের ছিটমহলগুলো থেকে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে ওই বছরের ২২ নভেম্বর থেকে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার অভ্যন্তরের বিলুপ্ত ছিটমহলের ২০১টি পরিবারের প্রায় এক হাজার জন ভারতে চলে যান। পঞ্চগড় জেলার বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো থেকে যাওয়া ৯৬টি পরিবারকে পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার হলদিবাড়ী থানায় এবং বাকি জেলা থেকে ভারতে চলে যাওয়া নাগরিকদের একই জেলার মেখলিগঞ্জ ও দিনহাটা সাব-ডিভিশনের দু’টি অস্থায়ী শিবিরে রাখা হয়েছে।   

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কুচবিহার জেলার হলদিবাড়ী থানার কৃষি খামারে অস্থায়ীভাবে নির্মিত এনক্লাভস সেটেলমেন্ট ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ছিটমহল বিনিময়ের পর ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে পঞ্চগড় জেলায় অবস্থিত বিভিন্ন ছিটমহল থেকে ৯৬টি পরিবারের প্রায় পাঁচশ’ জন ভারতে চলে আসেন। নতুন এ ভারতীয় নাগরিকদের অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে এখানে। দুই বছরে এই ক্যাম্পে অবস্থান করার সময় মারা গেছেন ৫ জন। জন্ম হয়েছে নতুন ১২ শিশু। এ সকল পরিবারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে রেশন হিসেবে বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে ৩৫ কেজি চাল, ৫ লিটার সরিষার তেল, ৫ লিটার কেরোসিন, ২ কেজি লবণ, ৫ কেজি মসুর ডাল ও দেড়কেজি করে গুঁড়া দুধ। রেশন ছাড়াও সংসারের দৈনন্দিন অন্যান্য খরচসহ ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা আশপাশের গ্রামে কৃষিকাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। অস্থায়ী শিবির নির্মাণের সময়ই এখানে দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। নাগরিকদের সুবিধার জন্য এখানে একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছেলে মেয়েরা আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। সরবরাহ লাইনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পানীয় জল দেয়া হচ্ছে। অস্থায়ী শিবিরে গিয়ে কথা হয় পার্বতী চরণ রায়ের (৬৮) সাথে। পেশায় একজন কৃষক। আগে তার ঠিকানা ছিল বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বর্তমানে বিলুপ্ত দৈখাতা ছিটমহলে। নিজের দুই বিঘা জমির সাথে অন্যের জমি চাষ করে তার ৬ সদস্যের সংসার চলত। দুই বছর আগে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ছিটমহল বিনিময়ের সময় অন্যদের সাথে তিনিও চলে আসেন ভারতে। বর্তমানে তার ঠিকানা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার হলদিবাড়ী কৃষি ফার্মের ভেতরে এনক্লাভস সেটেলমেন্ট ক্যাম্পের অস্থায়ী শিবিরে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে খুবই মিস করছি। বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহলে জন্ম নিলেও বড় হয়েছি বাংলাদেশের আলো বাতাসে। বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের সকল সুবিধা ভোগ করেছি। দুই বছর কেটে গেছে কিন্তু বাংলাদেশের মাটির টান এখনও ভুলতে পারিনি। ভুলতে পারি না সেখানকার মানুষগুলোকে। মন চায় সেই মানুষগুলোর কাছে যেতে। কিন্তু পারি না। পাসপোর্ট ভিসা করে যেতে অনেক ঝামেলা। একই ধরনের কথা বললেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত কোটভাজনী ছিটমহল থেকে আসা নতুন ভারতীয় নাগরিক সন্তোষ রায় (৬৫)। তিনি জানান, ভাই আপনারা বাংলাদেশ থেকে আমাদের দেখতে এসেছেন। খুব ভাল লাগছে। চোখে জল ধরে রাখতে পারছি না। আপনাদের সাদর অভ্যর্থনা। নিজ জন্মস্থানের মানুষগুলোকে কাছে পেলে কার না আনন্দ লাগে। তিনি বলেন, আপনাদের লেখনির জোরেই ছিটমহল বিনিময় হয়েছে। বদলে গেছে ৪৭ বছরের ইতিহাস। আমরা আগে নিজ ভূমে পরবাসী ছিলাম। ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পর আমরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে শিখেছি। ভারত সরকার আমাদের অনেক কিছু দেয়ার চেষ্টা করছে। থাকার জন্য অস্থায়ীভাবে ক্যাম্প করে দিয়েছে। নাগরিকত্ব দিয়েছে। নির্বাচনে আমরা ভোটও দিতে পারছি। আমাদের জন্য পাকা বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। রেশন দিচ্ছে। বিদ্যুৎ, পানি, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলেই আমাদের সকল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হবে।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top