সকাল ৯:১৪, শনিবার, ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
/ রাজনীতি / এতিমখানা দুর্নীতি মামলা খালেদা জিয়ার বিচার শেষ পর্যায়ে
এতিমখানা দুর্নীতি মামলা খালেদা জিয়ার বিচার শেষ পর্যায়ে
ডিসেম্বর ৫, ২০১৭

জিয়া এতিমখানা ও দাতব্য দুর্নীতি মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পাওয়ার পর আত্মপক্ষ সমর্থনে বাকি বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।  মঙ্গলবার এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় তার আত্মপক্ষ সমর্থন শেষ হওয়ার পর দুইপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য ১৯, ২০ ও ২১ ডিসেম্বর দিন রেখেছেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। এর মধ্যে দিয়ে দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নয় বছর আগে দুদকের দায়ের করা এ মামলা বিচারের শেষ পর্যায়ে উপনীত হল। যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হলেই মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসবে।   

মঙ্গলবার এ মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের শেষ দিন প্রায় তিন ঘণ্টা বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকার সময় ক্ষমতার কোনো অপব্যবহার তিনি করেননি, অন্যায় প্রভাবও কখনও খাটাননি। খালেদা জিয়া বলেন, তার বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়েছে ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে’।

তিনি সম্পূর্ণ ‘নির্দোষ’ এবং বেকসুর খালাস পাওয়ার যোগ্য। এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ অগাস্ট তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দেন। তার পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ অভিযোগ গঠন করে খালেদাসহ ছয় আসামির বিচার শুরু করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন- খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমান, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ। খালেদা জিয়া, সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদ এ মামলায় জামিনে আছেন। খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমান গত নয় বছর ধরে দেশের বাইরে, তার বিরুদ্ধে এ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। এছাড়া কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।

আত্মসমর্পণ করে জামিন
এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৩০ নভেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থনে সপ্তম দিনের মত বক্তব্য দেওয়া কথা ছিল খালেদা জিয়ার। সেইসঙ্গে দাতব্য ট্রাস্ট মামলায় হাজিরর তারিখ ছিল। কিন্তু তিনি নিজে না গিয়ে হরতালে নিরপত্তার কারণ দেখিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে সময়ের আবেদন পাঠান। ওই আবেদন নাকচ করে দুই মামলাতেই সেদিন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন বিচারক আখতারুজ্জামান। আর আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি সেখানেই শেষ করে বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপে যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য ৫, ৬ ও ৭ ডিসেম্বর দিন ঠিক করে দেন। খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া সেদিন বলেছিলেন, হরতাল শেষে দুপুরের পর খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু আদালত পরোয়ানা জারি করায় তা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার সকালে আইনজীবীরা খালেদা জিয়ার আত্মসমর্পণ করে জামিন এবং যুক্তিতর্ক স্থগিত করে আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চেয়ে দুই মামলায় চারটি আবেদন জমা দেন।  

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খালেদা জিয়া বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের মাঠে বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে পৌঁছালে সেসব আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়। আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন ও মাহবুব উদ্দিন খোকন।

জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, হরতালের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত কারণে খালেদা জিয়া আগের দিন সময়মত আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি। ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনে বাকি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। অন্যদিকে দুদকের পক্ষে মোশাররফ হোসেন কাজল মঙ্গলবারই যুক্তিতর্ক শুরুর আবেদন জানিয়ে বলেন, খালেদা জিয়া জামিনের শর্ত ভঙ্গ করেছেন। সুতরাং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তার আর নেই। শুনানি শেষে বিচারক খালেদার জামিন মঞ্জুর করেন এবং যুক্তিতর্ক শুরুর আদেশ প্রত্যাহার করে আত্মপক্ষ সমর্থনের বাকি বক্তব্য উপস্থাপনের অনুমতি দেন। তবে ওই বক্তব্য মঙ্গলবারই শেষ করতে বলেন।

এর পরপরই জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে সপ্তম দিনের বক্তব্য উপস্থাপন শুরু করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তার আইনজীবীরা জানান, জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে আত্মপক্ষ সমর্থনে লিখিত বক্তব্য জমা দিতে বলেছে আদালত। এ মামলাতেও ১৯ ডিসেম্বর তারিখ রাখা হয়েছে। সেদিন খালেদার আত্মপক্ষ সমর্থনে মৌখিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চাওয়া হবে। আর জিয়া দাতব্য ট্রাস্টের নামে আসা তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ অগাস্ট তেজগাঁও থানায় অন্য মামলাটি হয়। তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চার জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। পরের বছরের ১৯ মার্চ শুরু হয় বিচার।

আত্মপক্ষ সমর্থনে যা বললেন খালেদা জিয়া
জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে মোট সাত দিন বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। মঙ্গলবার প্রায় তিনঘণ্টা ধরে পড়া লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের বোর্ডে তিনি ছিলেন না। ওই ট্রাস্ট গঠন, তহবিল সংগ্রহ, পরিচালনা বা লেনদেনের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বা তখনকার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। ওই ট্রাস্টের নামে বগুডা বা আশুলিয়ায় জমি কেনার সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং তার নামে কোনো হিসাবও খোলা হয়নি বলে খালেদা জিয়ার ভাষ্য। এ মামলার বাদী ও এক নম্বর প্রসিকিউশন উইটনেস হারুন অর রশিদ কোনো দালিলিক প্রমাণ দেখাতে পারেননি অথবা আদালতে জমা দিতে পারেননি।

তিনি নিজে তদন্ত কর্মকর্তা হিসাবে দেওয়া সাক্ষ্যে আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন। খালেদা জিয়া বলেন, বাদী আমার বিরুদ্ধে জবানবন্দিতে বলেছেন- আমার দুই ছেলে এবং আত্মীয় মুমিনুর রহমানকে দিয়ে আমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করিয়েছি। এ কথা আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য বলে থাকেন। এগুলো সব ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও মনগড়া। এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রথম দিন ১৯ অক্টোবর খালেদা জিয়া দাবি করেন, এতিমদের জন্য আসা একটি টাকাও তছরুপ বা অপচয় করা হয়নি, তা ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে। ২৬ অক্টোবর তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে এ মামলা ‘ভুয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। ২ নভেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থন করে তৃতীয় দিনে খালেদা বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে তাকে ‘সরাতে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার নীলনকশা’ বাস্তবায়ন করছে ক্ষমতাসীনরা।

আর ১১ নভেম্বর বলেন, বাংলাদেশে বিচারকরা স্বাধীনভাবে আইন মেনে বিচার করতে পারেন কি না, তার এ মামলার রায়েই তার প্রমাণ আসবে। দেশে বিচার ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার পাবেন কি না- তা নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন ১৬ নভেম্বর। সর্বশেষ ২৩ নভেম্বর তিনি এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের দুদকে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওইদিনই জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলায় খালেদার আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু হয়। প্রথম দিনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি নিজেকে ‘সম্পূর্ণ নির্দোষ’ দাবি করেন।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top