রাত ৪:৩৭, শুক্রবার, ২৩শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / ‘আরাকান’ রাজ্য বাংলাদেশেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ
‘আরাকান’ রাজ্য বাংলাদেশেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৭

অনেক ঐতিহাসিকের মতে খৃষ্টপূর্ব ২০০০ সালে আরাকানের জনমানবহীন বনজংগল পাহাড় টিলা আবৃত এলাকায় আর্য বাঙালি রোহিঙ্গারা বসতি স্থাপন করে। খৃষ্টপূর্ব ১০০০ সালে রোহিঙ্গা বাঙালিরা উত্তরের নদী ও সাগর বেষ্টিত সমতল ভূমিতেও বসতি স্থাপন করে। আবার কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতো খৃষ্টপূর্ব ১০০০ সালে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের অধিবাসী বাঙালিরা প্রাচীন বঙ্গের অন্তর্গত সর্ব দক্ষিণের আরাকান রাজ্যে বসতি স্থাপন করে।

 পরবর্তীতে তারা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত হয়। রোহিঙ্গাদের নচাট বাংলি (যারা নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় কথা বলে) নামেও অভিহিত করা হয়। প্রাচীন বঙ্গ বঙ্গভূমি নামেও পরিচিত ছিল। আর এই বঙ্গভূমির অধিবাসী আদিবাসী শুধু বাঙালিরাই ছিল। কিন্তু ইংরেজ শাসন আমলের শুরুতে ইংরেজ বাহিনীর অভিযানের কারণে আসাম ও উত্তরের পাহাড়ি এলাকা থেকে বিভিন্ন উপজাতিরা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করে উপজাতি নামে পরিচিত হয়। প্রাচীন বৃটিশ সাম্রাজ্যের মানচিত্র অনুযায়ী উত্তরে চীন, রাশিয়া, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পূর্বে চীন সীমানা কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, পশ্চিম পারস্য (ইরান) সীমানা পর্যন্ত বৃটিশ সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। প্রাচীন বৃটিশ মানচিত্রে ভারতবর্ষের পূর্ব দিকে বিহার, উড়িষ্যা, অসম, বঙ্গ ও বার্মাকে দেখানো হয়েছিল।

 অবশ্য বৃটিশ সাম্রাজ্য দক্ষিণে থাইল্যান্ড (ব্রহ্মদেশ) ও মালয়েশিয়া (মালয়) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রাচীন বঙ্গের অধিবাসীরা বেঙলি বা বাঙালি নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন বঙ্গ বা বাংলার সীমারেখা ছিল পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সকল জেলা উত্তরে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের জেলাগুলি সহ আসামের কাছাড়, করিমগঞ্জ, বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, সিলেট পূর্বে ত্রিপুরা, পার্বত্য ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দক্ষিণ পূর্বে আরাকান যার আদিবাসী অধিবাসীরা রোহিঙ্গা বাঙালি। বঙ্গ বা বাংলার সর্ব দক্ষিণে বঙ্গপোসাগর।  


১৯৪৭ সালে ১৫ই আগস্ট ভারতবর্ষ ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ধর্মীয় দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। কিন্তু ভাষাগত জাতিগত তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়নি। যার ফলে পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান এবং ভারত বা ইন্ডিয়া এই তিনটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। অপরদিকে বার্মা বা মায়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে। আর প্রাচীন বঙ্গ বা বাংলা তিন চার টুকরোয় বিভক্ত হয়ে যায়। বাংলার পশ্চিম অংশ ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, মধ্যপূর্ব অংশ পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) উত্তর পূর্বের কিছু অংশ ভারতের আসামের মধ্যে পড়ে আবার দক্ষিণ পূর্বের কিছু অংশ অর্থাৎ ‘আরাকান’ বার্মা বা মায়ানমারের মধ্যে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে বাঙালি জাতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা পাঠ্যবইয়ের ‘আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধটি স্থান পায়।

 এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি মহাকবি আলাওল আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এছাড়া আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বার্মা অর্থাৎ মায়ানমারের সামরিক শাসকবর্গ দেশ, রাজ্য, প্রদেশ, জেলা ও এলাকার ১০০০ এর অধিক নাম পরিবর্তন করে এবং বার্মার নাম ‘মায়ানমার’ আরাকানের নাম ‘রাখাইন’ রাখা হয়। গত ১১ নভেম্বর ২০১৬ সালে রাখাইন অর্থাৎ আরাকান প্রদেশে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাঙালির বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং হত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক কালো দিন। এই দিন আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে শহীদ হন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেনাবাহিনী সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতির সুরক্ষা করা।

 প্রয়োজনে সেনা অভিযানের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বাঙালি জাতির স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের রাজনীতিতে নাক গলানো নয়। আবার রক্ষী বাহিনী সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল দেশের এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষা করা। তেমনি পুলিশ বাহিনী সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। ১৯৭৬ সালে প্রথম দিকে রোহিঙ্গা বাঙালিদের উপর নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়।

 রোহিঙ্গাদের উপর সবচাইতে বর্বর নির্যাতন শুরু হয় ১৯৮২-৮৩ সালে। লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাঙালিকে হত্যার পর তাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে বাস্তুচ্যুত করে সাড়ে তিন থেকে চার লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয় উদ্বাস্তু শরণার্থী করে। নোয়াখালী চট্টগ্রামবাসী বাঙালিদের ৪,০০০ (চার হাজার) বছরের আদি বাসস্থান আরাকানকে বাঙালি শূন্য করার ষড়যন্ত্র নিয়ে রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে মায়ানমারের সামরিক জান্তা। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। দেশে-বিদেশে বাঙালি হত্যা-নির্যাতনের সংবাদে বঙ্গবন্ধুর অন্তর ব্যথিত ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতো। জাগো বাঙালি জাগো। অন্যায় অত্যাচার হত্যা নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধের সময় এসেছে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-গবেষক
০১৮৬২-৪৮১৯৯৭



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top