শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬
ad
১৪ এপ্রিল, ২০১৬ ১১:১১:৫০
প্রিন্টঅ-অ+
অবক্ষয় রোধে বৈশাখী ডাক

এক বছর আগে বাংলা নতুন বছর বরণে সবার উৎসবে ছায়া ফেলেছিল যৌন নিপীড়নের ঘটনা; তারপর পুরো বছরজুড়ে শিশুহত্যা, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে এবার অবক্ষয় রোধের ডাকই আসতে যাচ্ছে বৈশাখ বরণের নানা কর্মসূচিতে।

উগ্রবাদীদের তৎপরতার মধ্যে লেখক-প্রকাশক, বিদেশি, ভিন্ন মতবালম্বী হত্যার মধ্যেও এই সময়ে সামাজিক অবক্ষয়গুলো বড় হয়ে চোখে ধরা দিয়েছে এসব কর্মসূচি আয়োজকদের মধ্যে।

গতবারের নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় পহেলা বৈশাখে ‘নিরাপত্তার জন্য’ উদযাপনের অনুষ্ঠানে সরকারের কড়াকড়িও প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে অনেকের মনে।

আবার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যার পর সারাদেশে আন্দোলনের মধ্যে আসা এবারের বর্ষবরণ উৎসব কারও কারও কাছে প্রতিরোধের আহ্বান নিয়েও আসছে।

এসব মিলিয়েই ১৪২৩ বঙ্গাব্দকে বরণের প্রস্তুতি এখন বাংলাদেশজুড়ে, বুধবার চৈত্রসংক্রান্তির নানা আয়োজনে ১৪২২ সালকে বিদায় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় তা।

রাজধানীতে বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় এবার সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান নিয়ে মূল প্রতিপাদ্য ঠিক হয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকে নেওয়া, ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’।

চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেনের কথায়, “অন্তরাত্মাকে বিকশিত করার মাধ্যমেই কেবল এসব সমস্যার সমাধান হতে পারে। তাই এবারের মূল প্রতিপাদ্যও ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’।

“প্রতিবারই আমরা শুভ কামনা নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করি। এবছর আমাদের মূল ভাবনার জায়গাটা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। যার ফলে এখন মায়ের হাতে সন্তান, সন্তানের হাতে মা খুন হচ্ছে। সেই সঙ্গে ধর্ম ব্যবসায়ীদের আস্ফালনসহ নানা অবক্ষয় চলছে।”

“আমরা এসব থেকে মুক্তি চাই, আলোর দিকে যেতে চাই।”

চারুকলার শোভাযাত্রা আয়োজক শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ক খালিদ হাসান রবিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ের শিশু নির্যাতন এবং মা ও শিশুর সম্পর্কের দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে শোভাযাত্রার শুরুতেই থাকবে টেপা পুতুলের আদলে মা ও শিশুর কাঠামো, যার উচ্চতা হবে ২০ থেকে ২৫ ফুট।”

হত্যা-ধর্ষণ আর শিশুহত্যার প্রেক্ষাপটে মা ও সন্তানের সম্পর্ককে প্রাধান্য নিয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।

বিভিন্ন লোকজ অনুষঙ্গ ও কাঠামোকে সঙ্গী করে শোভাযাত্রাটি চারুকলার সামনে থেকে বের হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (সাবেক হোটেল রূপসী বাংলা) সামনে ঘুরে আবার চারুকলার সামনে ফিরে শেষ হবে।

প্রতিবছরের মতো এবারও রাজধানীতে নতুন সূর্যের সঙ্গে রমনা বটমূলে গেয়ে উঠবে ছায়ানট। এই প্রভাতী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও শেষ হয়েছে।

এক যুগের বেশি সময় আগে বোমাহামলার বেদনাদায়ক সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও রমনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা থাকবে, তার মহড়াও ইতোমধ্যে হয়েছে। বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরাও।   

শাহবাগে ঢাকা শিশু পার্কের সামনে এবং ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও অনুষ্ঠান থাকছে বরাবরের মতোই।

গতবার টিএসসিতে সংঘটিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি চারশ’ বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট সদস্য ক্যাম্পাসে মোতায়েনের কথা জানিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা পার্ক, রবীন্দ্র সরোবর, হাতিরঝিলসহ সকল উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠান ৫টা পর্যন্ত চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছে ডিএমপি। তবে ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠান আয়োজনে কোনো বাধা থাকছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভুভুজেলা ও মুখে জড়ানো মুখোশ মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হযেছে। তবে হাতে ধরা মুখোশ ব্যবহার করা যাবে।

বাংলা নববর্ষের উৎসব-পার্বণ ‘জাতীয় অর্থনীতিকে বেগবান করার পাশাপাশি মানুষের মাঝে মৈত্রী ও সম্প্রীতি স্থাপনে বিশেষ ভূমিকা পালন’ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক শুভেচ্ছা বাণীতে তিনি বলেন, “অতীতের সব গ্লানি ও বিভেদ ভুলে বাংলা নববর্ষ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমাদের ঐক্য ও সংহতি আরো সুদৃঢ় করবে, বয়ে আনবে অফুরন্ত আনন্দের বারতা- বাংলা নববর্ষে এটাই হোক সকলের প্রত্যাশা।”

এবারের পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্ত্বাকে আরও বিকশিত করার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শক্তি জোগানোর কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এক বাণীতে তিনি বলেন, “দেশব্যাপী বৈশাখী মেলা, চৈত্রসংক্রান্তির পালা-পার্বণ, নববর্ষের প্রতিটি মিছিল-শোভাযাত্রা পরিণত হোক মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বৈষম্য এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের হাতিয়ারে।

“১৪২৩ সন সকল জরা ও গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালির জীবনে বয়ে আনুক সুখ, সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দ - এই প্রত্যাশা করছি।”

৫০০ বছর আগে আকবরি আমলে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য যে সালের প্রবর্তন হয়েছিল, তা এখন বাঙালির সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে।

সবার প্রত্যাশা নিয়ে বসন্তের শেষ দিন সোমবার রাত পোহালেই প্রথম সূর্যের হাত ধরে আসবে নতুন বাংলা বছর ১৪২৩।
 
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত

জাতীয় এর অারো খবর