বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৬
ad
১৪ এপ্রিল, ২০১৬ ১১:০৩:৪৬
প্রিন্টঅ-অ+
মানবতার গানে নতুনের আবাহন

মৌলবাদের রক্তচক্ষু, সমাজ ও পরিবারের অবক্ষয় আর অন্যায় লোভকে পেছনে ফেলে মানবতাকে জাগানোর গানে রমনা বটমূলে বঙ্গাব্দ ১৪২৩ কে স্বাগত জানালো ছায়ানট।

পৃথিবীর আবর্তনে প্রতিদিনের মতো সূর্য উঠলেও বৃহস্পতিবার তা ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। এ সূর্য যে ভোর নিয়ে এসেছে, তাতে বাংলা পঞ্জিকায় সূচনা ঘটেছে নতুন বছরের।

চিরনতুনের ডাক দিয়ে আসা পহেলা বৈশাখ রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে বাঙালির মনে; তার প্রকাশ ঘটেছে নারী-পুরুষের রঙিন সাজে, শিশুর মুখের হাসি আর বর্ণিল পোশাকে।

নানা আয়োজনে, নানা আঙ্গিকে বর্ষবরণ চলছে দেশজুড়ে। এই উৎসবে বৈশাখী আবাহনের সুরে মিশে আছে নিদাঘের ‘অগ্নিস্নানে’ এই পৃথিবীর শুদ্ধ হয়ে ওঠার প্রত্যাশাও।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পী অভিজিৎ কুণ্ডুর রাগালাপ ‘রাগ গুনকেলি’তে শুরু হয় রমনা বটমূলে ছায়ানটের এবারের বর্ষবরণের আয়োজন। এরপর রাগ নিয়ে আসেন শিল্পী সুস্মিতা দেবনাথ শুচি।

নতুনের আবাহনে একক কণ্ঠে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জাগো সকল অমৃতের অধিকারী’ গানটি নিয়ে আসেন শিল্পী ইলোরা আহমেদ শুক্লা।

শিল্পী সত্যম কুমার দেবনাথ শোনান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমি কেমন করিয়া জানাব’ গানটি। বড়দের দলের সম্মিলিত কণ্ঠে ‘ওই মহামানব আসে’ পরিবেশনের পর এটিএম জাহাঙ্গীর শোনান ‘এখনো ঘোর ভাঙে না তোর যে’।

এরপর সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়, ‘আমি ভয় করব না, ভয় করব না’, ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’, ‘টলমল টলমল পদভরে বীরদল চলে সমরে’, ‘বল ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ, নব যুগ ঐ এল ঐ’, ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে’, ‘আমরা তো উজ্জ্বল সূর্য’, ভোর ক’রে যাই কালরাত্রি’, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’, ‘মানুষ ছেড়ে খ্যাপা রে তুই’, ‘বাংলা ভূমির প্রেমে আমার প্রাণ হইল পাগল’, ‘বাংলা মা’র দুর্নিবার আমার তরুণ দল’ প্রভৃতি গান।



পহেলা বৈশাখে সূর্যোদয়ের পর রাজধানীর রমনা বটমূলে গানে গানে নতুন বাংলা বছরকে বরণ।
এর বাইরে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘সবারে বাসরে ভাল’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘কোন কুসুমে তোমায় আমি’, ‘ভাইয়ের দোরে ভাই কেঁদে যায়’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘একদিন যারা মেরেছিল তারে’, সলিল চৌধুরীর ‘ও মাঝি ভাই ভাই ও’  লালনের  ‘যেখানে সাঁই’র বারামখানা’ প্রভৃতি এককভাবে পরিবেশন করেন শিল্পীরা।

১৫টি একক গান, ১২টি সম্মিলিত গান, তিনটি আবৃত্তি ও পাঠ দিয়ে সাজানো হয় অনুষ্ঠান। প্রায় দেড়শ শিল্পী অংশ নেন পরিবেশনায়।

বিগত বছরগুলোর মতো এবারও অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশনও পুরো অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করে।

সকাল সোয়া ৬টায় রাগালাপে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠান ৮টা ৩৫ মিনিটে শেষ হয় জাতীয় সংগীতে। ছায়ানটের অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য অনুসারে জাতীয় সংগীতের আগে শুভেচ্ছা কথন নিয়ে আসার কথা ছিলো ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুনের। তিনি অসুস্থতার জন্য আসতে না পারায় সহ-সভাপতি  ডা. সারওয়ার আলী ওই কথনটি পড়ে শোনান।


কথনের শুরুতেই বলা হয়েছে ছায়ানটের এই  বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপট।  

“প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে বিজাতীয় শাসনের দাপটে বাঙালি পরিচয় হারাতে বসেছিলাম আমরা। সেই দুঃখদিনে কিছু বাঙালি এই বটমূলে জড়ো হয়ে বাঙালির গান আর কবিতা আবৃত্তি করে বাঙালিকে তার ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দিল। নববর্ষের সেই প্রভাত বাঙালির চেতনা ফিরিয়ে আনল। বটমূলে মিলিত হয়ে বাঙালি আপন জাতিসত্তার পরিচয়ে সমৃদ্ধ হলো।

সনজীদা খাতুনের কথনে এরপর উঠে আসে বাংলার, বাংলাদেশের ইতিহাস।

“সাংস্কৃতিকভাবে শুধু নয়, পূর্ব-পশ্চিমের অর্থনৈতিক বৈষম্য অনুধাপবন করে পূর্ব বাংলা ফুঁসে উঠল। তারপর স্বাধীনতার জন্য কত রক্তপাত, নারীত্বের-মনুষ্যত্বের কত অবমাননার ভিতর দিয়ে এলো প্রিয় স্বাধীনতা। তারপরেও হত্যার রাজনীতিতে দেশপ্রেমিকদের হটিয়ে বাঙালিত্বে অবিশ্বাসীরা শাসন ক্ষমতা দখল করল। এতো ওঠাপড়ার পরেও অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে উন্নয়নের মুখ দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ।”

এক বছর আগে বাংলা নতুন বছর বরণে সবার উৎসবে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ছায়া ফেলে যায়। বছরজুড়ে মুক্তমতের প্রতিনিধিদের ওপর হামলা, শিশুহত্যা, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে এবার অবক্ষয় রোধের ডাক এসেছে বৈশাখ বরণের কর্মসূচিতে।

“ধর্মের নামে গোপন ষড়যন্ত্রের বিরাম নেই। ক্ষমতা দখলের জন্য জ্বালাও পোড়াও নীতির নিষ্ঠুর লীলা অব্যাহত রয়েছে। যে ধর্ম আমাদের আশ্রয় স্বরূপ, যে ধর্ম আমাদের ধারণ করে রেখেছে, তার অপব্যাখ্যা দিয়ে যুক্তবাদী বিজ্ঞান সচেতন মানুষদের হত্যা করা শুরু হলো। বিভ্রান্ত মানুষ আজ যেন শিশু হত্যা আর নারী নির্যাতনে মেতে উঠেছে। ধর্মের রাজনীতিতে শাসনের গদিতে বসবার লোভের সঙ্গে যোগ দিয়েছে নানা অন্যায় লোভ।”

সনজীদা খাতুন বলেন, “আসুন এই ঐতিহাসিক বটমূলে আজ ১৪২৩ সালের পহেলা বৈশাখে আমরা মানবতা উদ্বোধনের কাজ করবার শপথ নিই। সৃষ্টিশীল কাজের ভিতর দিয়ে  সাধারণ মানুষের কাছে যাই। মানবিক সমাজ গড়ে তুলবার পবিত্র দায়িত্ব মাথায় তুলে নিই। দেশের মানুষদের জন্য সকলের অন্তর ভালোবাসায় পূর্ণ হোক। জয় হোক মানবতার। শুভ নববর্ষ।”
 
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত

জাতীয় এর অারো খবর