ভোর ৫:৫৩, শুক্রবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য

তুফান মাজহার খান:বেশ কয়েকবছর আগের কথা। ২০০৬ সাল। তখন দীপু ক্লাস ফাইভে পড়তো। তার মা বলেছিলেন পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে সিক্সে উঠলে তাকে একটা সাইকেল কিনে দেবে। সেও মন দিয়ে পড়াশোনা করতো। কারণ ছোট থেকেই দু’চাকার যানটার প্রতি বেশ আগ্রহী ছিল সে। তাছাড়া প্রাইমারী স্কুলে ৫ বছর ধরে যাচ্ছে সে পায়ে হেঁটেই। কখনো বাবা-মাকে বলতো না রিকশা ভাড়া দাও। কারণ সে জানতো এটা তার পরিবারের উপর বাড়তি চাপ। কেননা সে ছোট বেলা থেকে ‘নাই’ শব্দটার সাথে বেশ পরিচিত।

কারণ সে সবসময়ই দেখে এসেছে পরিবারে এটা নেই, ওটা নেই লেগেই আছে। তাই কখনো পরিবারকে চাপ দিয়ে কিছু আদায় করার কোনো ইতিহাস তার জীবনে নেই।  বাড়ি থেকে দীপুর স্কুলের দুরত্ব ছিল ১ কি.মি.। আবার যখন সিক্সে ভর্তি হবে তখন স্কুলের দূরত্ব যাবে আরও বেড়ে। কারণ হাই স্কুল ছিল বাড়ী থেকে প্রায় ২ কি.মি. দূরে। প্রতিদিন ভাড়া দেওয়ার সাধ্য তার বাবার ছিল না। তার বাবা ছিলেন ছুতার।

 এখনও তাই আছেন। তবে শারীরিক অবস্থা কিছু খারাপ হওয়ায় সেটি আর নিয়মিত করতে পারছেন না তিনি। অবশ্য কিছুকাল সরকারের একটা বিভাগে ছোট একটা চাকরিও করেছেন। তবে খুব সম্ভবত ২০০৫ এর দিকে তিনি শারীরিক অসুস্থতা দেখিয়ে চাকরিটা ছেড়ে দেন। আর বলতে গেলে এখন পেনশন ভাতা দিয়েই কোনোরকমে তাদের সংসার চলে। আদৌ তিনি অসুস্থ ছিলেন কিনা কিংবা কতটুকু ছিলেন দীপু তা জানতো না। এর কারণ তার বাবা কখনোই তাদের কাছে উনার ব্যক্তিগত কিছু শেয়ার করতেন না। প্রয়োজন ছাড়া দীপুও কোনো কথা বলতো না। এমনকি বাবা ডাকটুকুও না। দীপুর আজও জানা হয়নি তাদের সম্পর্কটা কেন এমন। থাক সে প্রসঙ্গ আজ আর বাড়ানোটা ঠিক হবে না।

তারপর মন দিয়ে লেখাপড়া করে পরীক্ষায় ভালো করলো দীপু। ফার্স্ট হলো ক্লাসে। সাধারণ গ্রেডে বৃত্তিও পেল সে। এবার খুশির অন্ত নেই। ঘরে সাইকেল আসবে। দীপুর চলার নতুন সঙ্গী হবে। সম্বল ছিল তার মায়ের পালা একটা ষাঁড় বাছুর। তার মা মনে মনে এটা বিক্রি করেই সাইকেল কিনে দিবেন ভেবেছিলেন। আর খুব যতœ করে সেটিকে প্রতিপালন করতেন তিনি।

যাতে দু-চারটে টাকা বেশি মিলে। দীপু দেখতো তার মা কি পরিমাণ কষ্ট করতেন। তার বাবা কাজের সুবাদে বাইরে থাকতেন। আর মা ঘর-গৃহস্থালির কাজ সামলে আবার গরুর পরিচর্যায় লেগে যেতেন। রোদ নেই, বৃষ্টি নেই তিনি কাজ করে যেতেন ক্রমাগত। একটু বিশ্রামের সময়টুকুও পেতেন না।এখন শুধু হাটবারের অপেক্ষা। হাটবার এলে গরুটা বিক্রি করে দীপুর ইচ্ছে পূরণ করা হবে।

 দীপুর খুশির অন্ত ছিল না। আঙ্গুলে দিন গুনতো কবে আসবে হাটবার। গরুটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসতো দীপু। মাঝে মাঝে কল্পনায় গরুটাকেই সাইকেল মনে করতো সে। কিন্তু ভাগ্যের এতই নির্মম পরিহাস যে হাটবারের আগেই গরুটা  চুরি হয়ে যায়। শুনেই বুকের বামপাশে চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব হয় দীপুর। চোখে আঁধার দেখে সে। মাথাটা কেমন ঘুরে আসে তার। তার মা তো রীতিমত কান্নাই জুড়ে দেয়। গরুর জন্য না। দীপুর সাইকেল আর কেনা হবেনা, সেজন্য। দীপু তার মাকে বললো, মা, কেঁদোনা। আমার সাইকেল লাগবেনা। আমি পায়ে হেঁটেই স্কুলে যাব। মনে আরও জেদ বাড়লো। ভালো করে লেখাপড়া করছে দীপু।

এবার সে অষ্টম শ্রেণিতে। বৃত্তির অনেকগুলো টাকা জমিয়েছে সে। প্রায় ৩০০০ টাকা। এদিকে তার মাও কিছু টাকা জমিয়েছেন। এবার দীপুর সাইকেল কেনা ঠেকায় কে? দীপু তার এক চাচার সাইকেল দিয়ে সাইকেল চালানো শিখলো। তার মা খুশি হলেন। সিদ্ধান্ত হলো নাইনে উঠলে সাইকেল কিনে দেবেন। সত্যিই তাই। আজ বাবার সাথে বাজারে গিয়ে সাইকেল কিনবে দীপু। তার খুশির অন্ত নেই। খুশিতে ভাতও খেতে পারলো না। বাজারে গেল। একি! বাবা সাইকেল না কিনে এগুলো কী কিনছেন? খন্ড খন্ড সাইকেল! রিং, টায়ার, টিউব, ফ্রেম সব আলাদা আলাদা, অবাক হলো দীপু।

পরে বুঝতে পারলো এগুলো জোড়া লাগিয়েই তৈরি করা হবে আস্ত একটা সাইকেল। পার্টসগুলো নিয়ে একটা বাইসাইকেল সার্ভিসিং এর দোকানে গেল তারা । দীপু অধীর আগ্রহ নিয়ে সাইকেল সেট করা দেখছে। ভেবেছিলো  ২/৩ ঘন্টায় করা হয়ে যাবে। বসে থাকতে থাকতে কোমর ব্যথা হয়ে গেছে তবুও বসেই আছে তারা। কিন্তু সাইকেলটা তখনো তার পূর্ণ রূপ পাচ্ছে না। দীপুর বাবা হোটেলে দুপুরের খাবার খাওয়ালেন। ভেবেছিলো বিকালে কাজ শেষ হয়ে যাবে। তাও হলো না। সাইকেল সম্পূর্ণ সেট করতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। দীপুর বাবা বললেন, সাইকেল চালিয়ে সাবধানে বাড়ী চলে যাও।

 দীপু অনেক খুশি। শেষ পর্যন্ত তো একটা সাইকেল হলো। পরদিন থেকে দীপু স্কুলে সাইকেল নিয়ে যেতো প্রতিদিন। তার নতুন বন্ধুকে পেয়ে সে যে কি পরিমাণ খুশি হয়েছিল তা সে ছাড়া আর কেউ জানে না। ছেলের খুশি দেখে বাবা-মাও খুশি। কিন্তু এই খুশি বেশিদিন ধরে রাখতে পারলো না তারা। কয়েকমাস যেতে না যেতেই ঘরের তালা ভেঙে দীপুর সাইকেল নিয়ে গেল চোরেরা। কারণ তারা যে ঘরে থাকতো তা ছিল আলাদা। আর যে ঘরে সাইকেল রাখতো তা ছিল কিছুটা দূরে। বাড়ীতে কোনো বাউন্ডারী না থাকায় নিরাপত্তা ছিল না ততোটা। তবে সাইকেল যে ঘরে রেখেছিলো সে ঘরে তালা লাগিয়েই রাখা হতো। তবুও সাইকেলটা আর ধরে রাখতে পারেনি তারা।

সকালে দীপু ঘুম থেকে ওঠে নামাজে চলে যায়। মসজিদ থেকে কোলাহল আর কান্নার আওয়াজ শুনে দীপু দৌড়ে বাড়ি আসে। বাড়ীতে আসতেই তার মা তাকে ধরে আরও কান্না জুড়ে দেয়। চেঁচামেচি শুনে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে যায় তাদের বাড়ীতে। কেউ কেউ আফসোস করছে। আবার কেউ কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে। বলছে, থাক কেঁদে বা আফসোস করে আর কী হবে? যা হবার তা তো হয়েই গেছে।

ইনশাআল্লাহ্ দীপু ভবিষ্যতে গাড়ি কিনবে। কেউ কিছুর জন্য ঠেকে থাকে না এমনও বলছে কেউ কেউ।দীপু কথা বলে না। শুধু দরজা ভাঙা ঘরটার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ থেকে জল ফেলতে থাকে।আজ দীপু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কিন্তু এখনও সে একটা সাইকেলের স্বপ্ন দেখে। কারণ তারচেয়ে বড় কিছুর স্বপ্ন দেখার সাধ্য আজও হয়নি তার।

শোভা ও মেঘার গল্প

 শরীফ সাথী:কোমরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীর কলকল স্রোত সামনে দিয়ে অবিরাম চলছে। তীরে আম্র কাননে শীতল ছায়া শিশু কিশোরের মায়ায় জড়াচ্ছে। প্রশস্ত খেলার মাঠে সবুজ ঘাসের পালক ঢেকে রেখেছে কোমল মাটি। পূর্ব দিকের পাকা রাস্তা ব্রীজ অতিক্রম করে চলেছে মানুষের সেবা দানে।
মধুময় সকাল সূর্যের আলোতে সাজিয়েছে প্রকৃতির নিদারুন ছোঁয়ায়।
দলবেঁধে হৈ হুল্লোড় করতে করতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবাধে আগমন ঘটছে কচি কচি শিশুদের।
মায়াভরা হাস্যোজ্বল মুখে পাকারাস্ত্া ঘেসে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী শোভা স্কুলে যাচ্ছে। হঠাৎ প্রচন্ড বেগে ধেঁয়ে আসছে স্যালো-ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার ভটভটি আলগামন আলমসাধু। শোভার সমবয়সী একটি মেয়ে দ্রুত রাস্তা পার হচ্ছে। আলগামনে পিষ্ট হওয়ার আগেই শোভা তড়িৎ হাত ধরে মেয়েটিকে টেনে ফেলল রাস্তার এক পাশে।
শোভা বলল,এই কোথায় যাচ্ছো এভাবে? এক্ষুনী সর্বনাশ হয়ে যেত।
মেয়েটি খুব ভয় পেয়ে গেলো। হাঁফাতে হাঁফাতে আমতা আমতা করে বলল,
দোকান থেকে পাওরুটি কিনে নিয়ে ফিরছিলাম।
শোভা বলল, তুমি ওভাবে আনমনে হয়ে ফিরছিলে কেন? এখনিতো বিরাট একটি অঘটন ঘটত। হতেও তো পারতো ভয়ানক দূর্ঘটনা? তাছাড়া তোমাকে আগেতো কখনো এখানে দেখিনি?
মেয়েটি বলল, আমি এই এলাকার না? ওই যে আম বাগানের ছায়ায় পলিথিন তিরপল দিয়ে ছাওয়া ছোট্ট টোমঘর করে আমরা আছি। আমরা বাস্তুুহারা, কেউ কেউ আমাদেরকে বলে বেদে। একেক এলাকায় গিয়ে আমরা এভাবেই বসবাস করে থাকি। এক দু মাস থেকে আবার অন্যত্র চলে যায়।
শোভা মেয়েটিকে ভাল ভাবে দেখে নিলো। মেয়েটির পরনে তালি দেওয়া প্যান্ট, সর্ব গায়ে অনায়াসে কাদা মাটি যেন সাদামাটাভাবে খেলা করছে। কুকড়ানো চুলগুলো আওলা ঝাওলা মাথার চারিপাশ।
শোভা বলল, এই তোমার নামটি কি?
মেয়েটি তড়িৎ উত্তর দিলো, মেঘা।
Ñখুব সুন্দর নাম তো ।  চলো মেঘা, নদী তীরের ঐ আম গাছের ছায়ায় বসে কথা বলি গল্প করি। রাস্তা পাকা হোক আর কাঁচা হোক কখনো আর এভাবে দৌঁড়ে রাস্তা পার হবে না। ভাল করে ডানে বামে নজর দিয়ে রাস্তা পার হবে।
মেয়েটি (মেঘা) বলল, -তোমাদের স্কুলের ম্যাডাম বুঝি এভাবে চলতে, রাস্তা পারাপারে ভালোভাবে চারিদিকে দৃষ্টি রেখে চলতে শিখিয়েছে?
শোভা বলল, Ñহ্যা। আমার আব্বু ও আম্মুতো বারবার সতর্ক হয়ে পথে যাওয়ার কথা বলে। কেন মেঘা? তোমার ম্যাডাম, বাবাÑমা কিছু শেখাই না তোমাকে?
Ñআমি তো স্কুলেই যাই না? আমিতো পড়ালেখায় করি না? আর আমার বাবা কখনো গাঁয়ে সাপ ধরতে যায়, আবার কখনো যায় বানর খেলা দেখাতে, আবার কোন কোন দিন নদীতে পুকুরে হারানো সোনার গয়না খুঁজতে যায়। আর আমার মা সকালে বের হয় সন্ধায় এক টুপলা চাল নিয়ে ঘরে ফেরে।
মেঘাকে দেখে শোভার মমতাবোধে প্রচন্ড মায়া মনের কোণে বাসা বাঁধলো। ভাবলো, মানুষের জীবন এত দূর্বিসহ কষ্ট ভরা হতে পারে। আমি বাবা মায়ের কত আদরে, সোহাগে-আহ্লাদে বড় হচ্ছি। নানান রকম আবদার আর হরেক রকম বায়নায় বিলাসিতা জীবন আমার। আর মেঘা? ঔ তো ওর মাÑবাবার সাথে বড় হচ্ছে। কিšু‘ কত পার্থক্য আমাদের দু’জন দু’জনের মাঝে। আমার মত এত সুযোগ সুবিধা ওর (মেঘার) নেই।
ভাবনা আর ভাবনাই কখন যে রাত্রে শোভার দু’চোখে ঘুম এসে গেছে, সকালে পাখির কিচির মিচির আওয়াজ কানের কাছে বাতাসে ঢেউ তুলছে ওঠো শোভা, ওঠো শোভা—সকাল হয়েছে ।
গ্রামে স্কুল হওয়ায় টিফিন খেতে শোভা বাড়িতে আসে। কিন্তুু শোভা আজ আম্মুকে বলল, আম্মু আজ তুমি টিফিন বেঁধে দাও, আজ দুপুরে টিফিনে বাসায় আসবোনা, স্কুলে খাব? শোভার আবদার মা না শুনে পারে। মেয়ে লেখাপড়াই খুব ভাল। ক্লাসের ফাষ্ট গার্ল।
শোভা টিফিন বাটি হাতে, বই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে গেলো। ঠিক টিফিনে বিরতি ঘন্টা বাজার সাথে সাথে
নদীর তীরে আম গাছের ছায়ায় মায়াবী মমতামাখা পরিবেশে এসে বসলো। শোভাকে আম গাছের ছায়ায় বসা দেখে, মেঘা ফ্যাল ফ্যাল করে শোভার দিকে তাকাচ্ছে আর ভাবছে কথা বলি। ভয়ে সাহস হচ্ছেনা।
শোভা মুচকি মুচকি হেসে মেঘাকে বলল, মেঘা এখানে এসো। বসো আমার পাশে।
আস্তে আস্তে মেঘা শোভার পাশে গিয়ে বসলো।
শোভা বলল, Ñদুপুরে কি খাও মেঘা?
মেঘা কোমর থেকে দুই টাকা বের করে শোভাকে দেখিয়ে বলল, একটি পাওরুটি কিনে খাই। দুপুরে কেউ (বাবা-মা) থাকে নাতো তাই?
শোভা বলল,Ñআজ থেকে তুমি প্রতিদিন টিফিনে আমার সাথে খাবে?
মেঘা বলল, Ñতা হয় না । তোমার ম্যাডাম বকবে। তোমার সহপাঠিরা হাসাহাসি করবে?
শোভা বলল, যাও হাতমুখ ধুয়ে এসো। কাল থেকে এভাবে আর নোংরা হয়ে থাকবে না। দুপুরে গোসল সেরে, হাত মুখ পরিষ্কার করে থাকবে। আমার অনেক ভালো ভালো পুরানো জামা আছে , কাল তোমার জন্য নিয়ে আসব, ঠিকআছে।
ভয়ে ভয়ে মেঘা বলল, ঠিকআছে । কিন্তুু তোমার আব্বুও আম্মু তোমাকে যদি বকা দেয়, আমাকে জামা দিলে?
-আমি বলবো, জামা গুলো আমার বান্ধবির জন্য নিয়ে যাচ্ছি, তাহলে আর কিছু বলবে না।
মেঘা বলল, তুমি খুব ভালো।
এভাবে দিন সপ্তাহ যেতে থাকে। দু’জন দু’জনের বুন্ধুত্বের গভীরতা বাড়তে থাকে। দু’জনে খুব আনন্দ করে। শিশুদের কানামাছি, লাফালাফি, লাটিম ঘোরানো, কপাল টিপাটিপ কত রকম খেলা-মনের আনন্দে দু’জনে দেখে। সাথে নাচ গান তো মজাই মজাই উপভোগ করে।
কিছু কিছু সময় শোভা মেঘাকে অ,আ ,ক,খ পড়া শিখাতে থাকে। পুতুল খেলার মেলা বসাই ওরা দু’জন প্রতিদিনই বিকালে।
মেঘা আজ বিকালে গত রাতের স্বপ্নের কথা শোভাকে শোনাচ্ছে এভাবে, শোভা আমি না গত রাতে স্বপ্নে পরীদের সাথে মেঘের ভেলায় চড়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছি। শুধু উড়ছি আর উড়ছি, দেখছি নিচের সবুজ সবুজ ঘাস ,লতাপাতা গাছ, নদীতে মাছের খেলা, নৌকা বেয়ে মাঝির ছুটে চলা। পাখিদের নেচে নেচে  সুরে সুরে গান গাওয়া। ফুলে ফলে সাজানো এই পৃথিবীর কত কিছু? খুব ভাল লাগছিল জানো শোভা, খুব ভালো লাগছিলো। কিন্তুু খুব খারাপ ও লাগছিলো।
– কেন মেঘা?
-তুমি সাথে ছিলে নাতো তাই?
-এইতো এখন তো আছি। নাও বাদামগুলো ঠুসঠাস করে করে ফাটিয়ে কে কত জোরসে খেতে পারে।
আজ খুব ভোরে শোভা ঘুম থেকে উঠেছে। হাত মুখ ধুয়ে নিজের ব্যাগে নতুন একটি বই খাতা কলম ভরে নিলো মেঘাকে দেবে বলে।
সকালে লেখা পড়া শেষে নাস্তা সেরে টিফিন হাতে নিয়ে আনন্দে যেতে থাকে স্কুলে। এগুলো মেঘাকে দেবে। লেখাপড়ার প্রতি তাকে আরও আগ্রহ আনাবে। মনের ভিতর ছটফট করছে। কখন এগুলো মেঘাকে দেবো কখন দেবো।
বাগানের পথ ধরে যেতে যেতে মেঘাদের টম ঘরের দিকে তাকায়। শুধু ফাঁকা আর ফাঁকা। শোভা জোরে দৌঁড়ে গেল। ঘর গেল কোথায়? ডানেবায়ে তাকালে চোখ পড়ে যাই আলমসাধুর ওপর সাজানো বাঁশ তিরপল। মেঘাদের সব টুকরো টুকরো আসবাব পত্র। শোভাকে দেখে মেঘা দৌঁড়ে কাছে এলো।
বলল, শোভা আমরা চলে যাচ্ছি? দূর শহরের কোন এক বাগান মাঠে? শোভার চোখের কোণে জল গড়াতে লাগলো। দু’জনে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলো।
ব্যাগ থেকে বই খাতা কলম বের করে শোভা বলল, তুমি লেখা শিখবে, পড়া শিখবে।
আর চোখে চেয়ে মনে মনে ভাবলো, গতকালের স্বপ্নের মতই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছ মেঘা।
মেঘা বিদায় নিয়ে চলে গেল ওর বাবা মায়ের সাথে। ছোট্ট শোভার হৃদয়ের স্পন্দন ব্যাথায় কাতরাতে থাকে। চোখের জল বলতে থাকে, মেঘা যেও না মেঘা যেও না।

সম্পর্ক

সাঈদ সাহেদুল ইসলাম:বিড়ালটার নাম বিলি। আজ ওর মন খুব খারাপ। সেদিন গৃহকর্তা তাকে লাঠি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ সে গৃহকর্ত্রীর রান্না করা এক টুকরো মাছ চুরি করে খেয়েছে। এক টুকরো কেন- কয়েক টুকরা মাছ খেলেও কোনো দোষ ছিল না। কিন্তু মাছের হাড়িতে মুখ দিয়েছে। সব তরকারি নষ্ট করেছে বলেই এত রাগ। কর্ত্রীর যুক্তি- ‘ওকে আর রাখা যাবে না।’ কর্তারও মন খারাপ।

বিলির এভাবে চুরি করাটা বিশ্বাসে মেলে না তার।হেমন্তের বিকেল। মাঠে পাকা ধানের মৌ-মৌ গন্ধ। গৃহকর্তা ধান কেটে বাড়িতে নিয়ে যায়। পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বিলি সেসব দেখে। ভাগ্যে সুখ না সওয়ার দুঃখ বাসা বাঁধে তার মনে। আজ কর্তার ঘরে নবান্নের উৎসব হবে। এই ভেবে পেটের চোঁ-চোঁ ক্ষুধা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সেদিনের মতো কর্তা আর ক্ষেতে আসবে না। বিলি ভাবে- মাঠে নেমে কিছু খাওয়া দরকার তার।

মাঠের এক জায়গায় কয়েকটা গর্ত। কিছু মাটি আলগা হয়ে আছে। এবার বিলির লোভ বেড়ে যায়। এসব জায়গায় ইঁদুর গর্ত করে লুকিয়ে থাকে। বিকেল শেষ প্রায়। একটু করে শীত দোলা দিচ্ছে। বিলির লোমগুলো খাড়া হয়ে ওঠে। ঘাপটি মেরে ইঁদুর বের হওয়ার প্রহর গোনে।চারদিক স্তব্ধ। ইঁদুর গর্ত থেকে ভাবছে জমির মালিক এতক্ষণে চলে গেছে। ধানও নিয়ে গেছে সব। কিন্তু ক্ষেতের মাঝে দু-একটা শীষ পড়ে থাকা স্বাভাবিক। ইঁদুরের আরো ধান চাই। অসময়ে বড় কাজে লাগবে সে ধান।

হেমন্তের সোনালি সূর্য ডুবুডুবু। ইঁদুর এবার গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে। চতুর বিড়ালের ক্ষুধার চাহিদা যেন তাকে আরো কৌশলী করে তোলে। এক মুহূর্ত দেরী না করে ধরে ফেলে ইঁদুরকে। ইঁদুর কাতরাতে থাকে- ‘আমাকে ছেড়ে দাও। দোহাই তোমার, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমার উপকার করব। আমাকে ছেড়ে দাও।’
বিলি ভীষণ রেগে যায়। সামনের দু’পায়ের নখ দিয়ে ইঁদুরকে চেপে ধরে বলে- ‘তুই আমার কী উপকার করবি বল? আমি ক্ষুধায় মারা যাচ্ছি, আর তোকে ছেড়ে দেব? আমার কর্তা আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি খুব ক্ষুধার্ত, তোকে এক্ষুণি খাব।

ইঁদুর বলে- ‘তুমি বিশ্বাস কর, আমি তোমার উপকার করব। আমার ছেলেমেয়েরা এখনো খুব ছোট। আমি গর্তে না ফিরলে ওরা মরে যাবে। তুমি আমার প্রাণের সাথে আরো অনেক প্রাণ নষ্ট করতে পারো না।’বিলি এবার আরো রেগে যায়- ‘তুই মিথ্যেবাদী, তোকে ছাড়ছি না।’‘বিশ্বাস কর, আমি তোমার ভালো কিছু করব। আমাকে খেলে তুমি মাত্র একবারই ক্ষুধা মেটাতে পারবে। কিন্তু আমি তোমার জন্য প্রতিদিন খাবারের ব্যবস্থা করব। আমার ছেলেমেয়েরা আছে। তাদের স্বার্থেই আমি মিথ্যে বলছি না।’
বিলির কানে কানে কী যেন বলতে থাকে ইঁদুরটা।

 বিলি রেগে গেলেও হঠাৎ তার মন গলে যায়। মনে পড়ে- কর্তার সাথে বসে বাড়িতে সে প্রায়ই দেখেছে সে কাহিনীটা। কখনো জেরি নামের ইঁদুরটা টম নামের বিড়ালকে কতভাবেই সাহায্য করেছে। টম ও জেরির ঝগড়া লেগে থাকলেও ওদের অন্তরের ভাব খুবই মজবুত।সাঁঝের বাতাসে কর্তার বাড়ির নবান্ন-উৎসবের রান্নার গন্ধ। বিলির নাকের সুড়সুড়ি বেড়ে যায়। বিলি তখন ইঁদুরের কথামত চুপি চুপি কর্তার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত। টেবিলে সাজানো হরেক রকমের খাবার। বাড়িতে বিলি নেই। কর্ত্রী নিশ্চিত যে খাবার কেউ নষ্ট করতে পারবে না। কাজ সেরে গৃহকর্ত্রী কক্ষে প্রবেশ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইঁদুর টেবিলে উঠে লাফালাফি শুরু করে দেয়। খাবার নষ্ট না করলেও কয়েকটা খালি প্লেট নিচে ফেলে দেয় সে।

বিলি খপ করে ইঁদুরকে ধরে কর্ত্রীর সামনে থেমে যায়। গৃহকর্ত্রী লক্ষ্য করে বিষয়টা। বিলি তার সামনের পা দুটো তুলে ক্ষমা ভিক্ষার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। বোঝাচ্ছে, সে খাবারগুলোকে ইঁদুরের উৎপাত থেকে রক্ষা করেছে। গৃহকর্ত্রীর বড় মায়া হয়। একটু হেসে বলে- ‘সাবাস বিলি, এই না ভালো কাজ করা। যা, ইঁদুরটাকে মেরে বাইরে ফেলে দিয়ে খেতে আয়।’গৃহকর্ত্রীর ইতিবাচক ভাষা বুঝতে পারে বিলি। লাফাতে লাফাতে ইঁদুরকে নিয়ে বাইরে ছুটে যায় সে। ইঁদুরটাকে ছেড়ে দিয়ে বলে- ‘ধন্যবাদ, ইঁদুর বন্ধু।’বিলির সাথে গৃহকর্ত্রীর সম্পর্ক জোড়া লাগাতে পেরে বড় আনন্দে নিজের গর্তের দিকে ছুটতে থাকে ইঁদুর।

শিয়ালের পাঠশালা

মোঃ আরিফুল ইসলাম:বাঘ কয়েক দিন ধরে কোনো খাবার পাচ্ছে না। জীবিত প্রাণী পাওয়া তো দূরের কথা, দু’একটা মৃত প্রাণীও পাচ্ছে না। সঞ্চয় করে রাখা খাবারের থেকে কোনো মতে দুই এক টুকরো মাংস আর পেট ভরে গাংনাই নদীর পানি খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাঘ পুরো বনে শিয়াল এবং বাঘকে বনের নির্জন এক অংশে একত্রিত করলেন বন রাজা সিংহের অজান্তে। সকলের উদ্দেশ্যে কিছু উপদেশ আর ক্ষোভ প্রকাশ করলের বাঘ।
ক্ষোভে বাঘ বলল,
– এই বনের আয়তন এতো বড় তবুও আমরা কেন পশু শিকার করতে পারছি না?
তৎক্ষণাৎ শিয়াল বলল,
– আমাদের তো বুদ্ধিও বেশি, তবুও আমরা কেন শিকারে ব্যর্থ হচ্ছি?
নরম সুরে বাঘ বলল,
– আসলে আমাদের মূল সমস্যা, আমাদের শিক্ষার অভাব।
শিয়াল বলল,
– মামা তাহলে এখন বুদ্ধি কি হবে।
বাঘ বলল,
– আমাদের মধ্যে কাউকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে।
শিয়াল বলল,
– মামা তাহলে কি আপনি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে চান, নাকি আমাকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত বানাতে চান?
বাঘ বলল,
– পন্ডিত সাহেব বনে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে, আর প্রকৃত শিক্ষা নেওয়ার জন্য সুদূর চান্দের দেশে আমি গেলে এসব কাজের কি হবে?
শিয়াল বলল,
– তাহলে এখন কি হবে মামা?
বাঘ বলল,
– কিছুই হবে না! বরং তুমিই চান্দের দেশে যাও, এতে তোমার অনেকটা সহজও হবে। তুমি তো বনের পন্ডিত।
সারা বনে ছড়ে গেল, শিয়াল পন্ডিত চান্দের দেশে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে গেছে।
শিয়াল তার আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী সুযোগটা কাজে লাগালো। বাঘের কথা মত বন ত্যাগ করলো শিয়াল পন্ডিত। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য চান্দের দেশের নামে অন্য বনে রওনা হলো। অন্য বনে এদিক-ওদিক ইচ্ছেমত কিছুদিন ঘুরলো। এরপর হঠাৎ একদিন ইয়া বড় একটা ব্লাকবোর্ড নিয়ে বনের মধ্যে পাঠশালা খুললো শিয়াল পন্ডিতে। বানর থেকে শুরু করে সবাই এমন কি বাঘও তাদের বাচ্চাদের শিয়াল পি তের পাঠশালায় ভর্তি করে দিল। আর সারা বনে ছড়িয়ে পড়ল, শিয়াল পন্ডিত চান্দের দেশ থেকে মাথা ভর্তি করে প্রকৃত শিক্ষা নিয়ে এসেছে।


শিয়াল পন্ডিতের পাঠশালার খবরটা সিংহের কানে পৌছতে তেমন দেরি হল না। সিংহ শিয়াল পি তের পাঠশালার খবর পেয়ে তো রেগে অস্থির। শিয়াল পন্ডিতকে শায়েস্তা করার জন্য হঠাৎ একদিন সিংহ শিয়ালের পাঠশালায় হাজির হলো। শিয়াল পন্ডিত পাঠশালায় পড়াতে পড়াতে দেখতে পেলো যে বন রাজা সিংহ তার দিকেই আসছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে শিয়াল পন্ডিত সিংহ কে দেখে তার শিক্ষার্থীদের পড়াতে শুরু করলো, ‘বন রাজা সিংহ, পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমতি এবং জ্ঞানী রাজা সিংহ। সিংহ হচ্ছে মহান রাজা। শিয়ালের পাঠশালর শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া দেখে সিংহ তো অবাক হয়েছে। নিজের সুনাম শুনে সিংহ তো রাগ ভুলেই গেলো।


সিংহ পাঠশালার কাছে আসতে না আসতেই সবাই এক সাথে সালাম দিলো। শিয়াল পন্ডিত বলল,
– রাজা মহাশয় আসুন আমার পাঠশালা দেখে যান। আপনার পায়ের ধূলোয় ধন্য হলো আমার পাঠশালা।
বন রাজা সিংহ এমন সালাম আগে কখনো কোনদিন কারো কাছ থেকে পায়নি। তাই তার বুকটা আনন্দে ভরে উঠলো। তাই শিয়াল পন্ডিতকে বলল,
– পন্ডিত সাহেব আমার কখনো কোনো প্রয়োজন হলে বলো।
শিয়াল পন্ডিত বলল,
– ঠিক আছে রাজা মহাশয়।
ওদিকে বাঘ মামা তো চিন্তায় অস্থির। শিয়াল পন্ডিতকে শিক্ষার জন্য আমি চান্দের দেশে পাঠালাম, আর এখন আমাকেই চিনছে না! আমি শিয়ালের পাঠশালা রাখবো না। যেই ভাবা সেই কাজ। রাতে অন্ধকারে শিয়ালের পাঠশালা ভাঙ্গবে বলে ঠিক করলো বাঘ মামা। শিয়াল তাই সিংহের কাছে গিয়ে আবেদন করলো যে,
– রাজা মহাশয় আজকে রাতে আমার পাঠশালার সকল শিক্ষার্থী নিয়ে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। এতে আপনাকে উপস্থিত থাকতে হবে।
বন রাজা সিংহ বলল,
– ঠিক আছে শিয়াল পন্ডিত, আমি যাবো।
সারা বনে বানর খবর ছড়িয়ে দিলো, আজকে রাতে শিয়ালের পাঠশালায় জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এতে উপস্থিত থাকবেন মাননীয় বন রাজা সিংহ মহোদয়। বনের সকল প্রাণী আনন্দে দিশেহারা।বাঘের কানে সিংহ উপস্থিত থাকার কথাটা পৌছা মাত্র ভয় পেয়ে গেল। তাই রাতে শিয়ালের পাঠশালায় আক্রমণ করার চিন্তাটা মাথা থেকে তাড়িয়ে দিলো।


এখন শিয়াল পি তের মাথায় শুধু একটাই চিন্তা কিভাবে বনের এই বাচ্চা প্রাণীদের খেতে পারা যায়। সেই কত দিন ধরে কোনো তরতাজা জীবন্ত প্রাণীর মাংস খাওয়া হয়নি। চিন্তায় যখন অস্থির তখন শিয়াল পি তের মাথায় ঠিক বুদ্ধি আসলো। পিকনিকে যাওয়ার নামে সব বাচ্চা প্রাণী তথা শিয়ালের পাঠশালার সকল শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে অন্য এক গহীন বনে যাবে। আনন্দ উল্লাসে দিন কাটবে। রাতের বেলা সব বাচ্চা প্রাণীদের একত্রে আবদ্ধ করবে। যেই ভাবা সেই কাজ। বনের সব প্রাণীর বাচ্চা নিয়ে শিয়াল পন্ডিত উধাও।
সিংহ বেজায় রাগান্বিত শিয়াল পি তের উপরে……।

ফুলপরীদের দেশে

আহাদ আলী মোল্লা:আফসানা ক্লাস টুতে পড়ে। কোরবানির ছুটিতে মামাবাড়ি বেড়াতে যায় সে। সঙ্গে বড় ভাই আফরোজ। জোছনা ভরা রাত। বিদ্যুত চলে গেলে মামি উঠোনে পাটি পেতে দেন। ওদের সাথে বড় মামাও পাটিতে বসেন। আফসানা বায়না ধরে আজ তাকে একটা ফুলপরীর গল্প শোনাতে হবে। বড় মামা খুব রসিক মানুষ। ওরা যখনই মামার বাড়ি যায় তখনই তিনি গল্প শোনান। রূপকথার গল্প। রাক্ষস খোক্ষসের গল্প। নবাব আর রাজা-রানীর গল্প। তবে মামা আজ বলতে লাগলেন পরীর গল্প। পরীরা কোথায় থাকে। কোথায় তাদের বাড়ি। তারা কী খায়। কত না প্রশ্ন আফসানার। মামা মজা করে করে জবাব দেন। গল্প শুনতে শুনতে উঠোনের পাটিতেই ঘুমিয়ে গেল আফসানা। ঘুমোনোর সাথে সাথে স্বপ্নের রাজ্যে চলে গেল। দেখতে শুরু করল স্বপ্ন।

আফসানা একটা ফুল বাগানে প্রজাপতি দেখছিলো। কয়েকটা রঙিন প্রজাপতি ফুলে ফুলে মধু খাচ্ছে। এমন সময় আকাশ থেকে উড়ে এলো দুই পরী। সাদা পাখনা ওয়ালা পরী। তাদের শরীর ফুলে ফুলে ঢাকা। হরেক রকম ফুল। মুখের হাসিতে যেন মুক্ত ঝরে পড়ছে। ওরা এসে বলল আমরা ফুলপরী। ফুলের দেশে আমাদের বাড়ি। তুমি কি যাবে আমাদের দেশে? দুই পরীর কথা শুনে খুশিতে বাগবাগ হয়ে উঠল আফসানা। সে ওদের পানে খানিক এগিয়ে গেল। বললো অবশ্যই আমি তোমাদের দেশে যাব।

ফুলের সাথে খেলব, ঘুরব আর মজা করব। কথা শেষ হতে না হতেই আফসানাকে ডানার মাঝে তুলে নিয়ে দুই পরী উড়াল দিল। কত পাহাড় কত অরণ্য ছাড়িয়ে নীল আকাশের সাদা মেঘের সারি ডিঙিয়ে ছুটলো তারা তাদের দেশে। পার হলো চাঁদের দেশ। তারার দেশ। কত না গ্রহের দেশ। তার পরে ফুলপরীদের দেশ। পরীদের দেশে ঢুকতেই ছুটে এলো আফসানার বয়সী ফুলপরীদের মেয়েরা। তাদের হাতে ফুলের ডালি। তারা ফুল ছিটিয়ে ছিটিয়ে আফসানাকে বরণ করে নিলো। কী আনুষ্ঠানিকতা। আফসানা অবাক হলো। এ কী! যেদিকে তাকাই ফুল আর ফুল। এ ফুল তো আমাদের দেশের মতো সাধারণ ফুল নয়। একেকটি ফুল দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। চার পাশ গন্ধে মৌ মৌ করছে। পরীর দেশের ফুলের রঙ-রূপও আলাদা।

হঠাত ফুলপরীদের আরও দুই মেয়ে ছুটে এলো আফসানার কাছে। বলল আজ থেকে তুমি আমাদের বন্ধু। তারা আফসানার গায়ে তাদের দেশের ফুলের তৈরি পোশাক পরিয়ে দিল। বলল এবার চলো রানী মা’র কাছে যাই। আফসানা প্রশ্ন করে রানী মা কে?
:রানী মা আমাদের সবার রাণী। মানে ফুলপরীদের রানী।
:উনি কোথায় থাকেন?
:চলো নিয়ে যাই, দেখে নিয়ো।
ফুলপরীদের মেয়েরা ডানায় চড়িয়ে ওদের রানী মা’র কাছে নিয়ে গেল আফসানাকে। রানী মাকে দেখে মন ভরে গেল তার। বিরাট এক সিংহাসনে বসে আছেন তিনি। ফুলের সিংহাসন। রানী মা’র সারা শরীরে হাজারো রঙের ফুল। আফসানাকে দেখেই ফুলপরীদের রাণী উঠে দাঁড়ালেন। এক গাল হেসে বললেন ‘এসো এসো আফসানা। ফুল পরীদের রাজ্যে তোমাকে স্বাগত জানাই।’ এবার আফসানার সারা দেহে হরেক রকমের গয়না পরিয়ে দিলেন তিনি। নূপুর, নোলক, চিকা, হার, ব্রেসলেট আরও কত গয়না। তবে সব গয়নাই ফুলের তৈরি। এরপর আরেক দল ফুলপরী নিয়ে এলো খাবার।

হরেক রকমের রান্নাবাড়া। খাওয়ার আগেই গন্ধে ওর মুখে পানি জমে গেল। খাওয়া দাওয়া করে দেখল পৃথিবীতে এমন স্বাদের খাবার সে কোনোদিনও খায়নি। এখানকার মাছ মাংসের আলাদা স্বাদ। যা খেতে ইচ্ছে, তা বলতে না বলতেই হাজির। এখানে কোনো কাজ নেই। শুধু খাওয়া আর আনন্দ করা। আফসানা খুব খুশি হলো। সে বললো আমি আর কোনো দিন এদেশ থেকে ফিরে যাব না। হাসলেন পরীদের রানী। তিনি বললেন এখানে থাকা যায় না। চিরস্থায়ী থাকতে হলে অনেক শর্ত আছে।
:কী কী সেই শর্ত বলুন রানী মা।
:তুমি কি পারবে তা পালন করতে?
:চেষ্টা করে দেখি রানী মা।


এখানে থাকতে হলে মিথ্যা বলা যাবে না। পরীর দেশে মিথ্যা চলে না। হিংসা চলে না। চলে না গালাগালি, মারামারি। পৃথিবীর কোনো বাজে আচরণ করা যাবে না। আফসানা খুশিতে আটখানা। সে বলল আমি তো এটাই চাই।রানী মা বললেন- এখানে থাকো। তবে সাবধান! শর্ত ভাঙলে এক ধাক্কায় পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়া হবে।আফসানা এসব স্বপ্নে দেখছিল। হঠাৎ বড় মামা আফসানার পিঠে ধাক্কা দিতেই ওর ঘুম ভেঙে গেল। দেখল সে পরীর দেশে নেই। পাশমোড়া দিয়ে উঠে বসে চোখ কচলাতে কচলাতে কান্না শুরু করল। বড় মামার ওপর তার খুব রাগ হলো। তিনি কেন তাকে জাগালেন। না হলে সে তো ফুলপরীদের দেশেই থাকত।

এক রাজ্যে দুই রাজা

 মোহাম্মদ অংকন:এক ছিল ঘন বন। সেই বনে এক বাঘ ও এক সিংহ বাস করত। তারা দু’জনেই নিজেদেরকে বনের রাজা মনে করত। এ নিয়ে মাঝে মাঝে বেশ ঝগড়াও হত। বাঘ বলত, আমিই বনের রাজা। সিংহ বলত, আমিই বনের রাজা। একটি বন অথচ দু’জনই রাজা হওয়ার দাবীদার। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারত না। তবে তারা দু’জনই এই দ্বন্দ্বের সমাধান আশা করত। কিন্তু কেউই রাজা ছাড়া অন্য কিছু হওয়ার কথা ভাবত না। এ নিয়ে নিকটবর্তী বনের রাজা হাতিও বেশ চিন্তিত। তার কাছে বিচার চাইতে এলেও কোনো সমাধান সে করতে পারত না।

একদা এই বনে এক দার্শনিক বেড়াতে এল। তার নাম ছিল শেয়াল। সে বন ঘুরে ফিরে দেখতেই সিংহ ও বাঘের তুমুল ঝগড়া লক্ষ্য করল। এমন অবস্থায় শেয়াল বাঘ ও সিংহের কাছে গেল এবং তাদের এই ঝগড়া করার কারণ জানতে চাইল। তারা ঝটপট বলে দিল। আমিই রাজা, আমিই রাজা বলে দু’জনই চিৎকার শুরু করে দিল। শেয়াল তখন বুঝতে পারল যে সমস্যাটি বেশ জটিল। তাদের শান্ত করিয়ে শেয়াল বলল, আমি তোমাদের এই সমস্যার সমাধান করে দিব। বাঘ ও সিংহ দু’জনই জিজ্ঞেস করল, কিভাবে? শেয়াল তখন বলল, তোমাদের বনের যাবতীয় তথ্য আমাকে দিতে হবে।

 তাহলে আমি তোমাদের এই বিষয়টির সমাধান অতি সত্ত্বর করতে পারব।
বাঘ ও সিংহ বনের সকল তথ্য সংগ্রহের জন্য কাজে লেগে পড়ল। বনের পরিমাপ, গাছপালা ও পশুপাখির সংখ্যা গণনা করল। তাদের জরিপে পাওয়া গেল, এই বনের দৈর্ঘ্য অনেক বড়, অনেক গাছপালা আছে। কিন্তু কোন প্রকার পশুপাখি নাই। এ নিয়ে তারা মোটেও চিন্তিত নয়। কিন্তু শেয়ালকে তথ্যগুলো দেওয়ার পর, ওদের চিন্তা ধরিয়ে দিল। শেয়াল বলল, শুধু রাজা দিয়ে কখনও একটি রাজ্য চলতে পারে না। প্রজা ও জন সাধারণেরও প্রয়োজন আছে। তোমাদের উচিৎ, বনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা। এজন্য তোমাদের অন্য বন থেকে সদস্য সংগ্রহ করতে হবে।

বেশ কিছু দিন পর দার্শনিক শেয়াল আবারও বনে ঘুরতে এল। সিংহ ও বাঘ বিপুল জনগণ নিয়ে শেয়ালের নিকট হাজির হল। তারা দু’জনই শেয়ালকে বলল, তোমার কথা মত এই বনে অনেক পশুপাখি নিয়ে এসেছি। এখন বলে দাও, কে হবে এই বনের রাজা? শেয়াল আশ্বাস দিয়ে বলল, ঠিক আছে। কে হবে রাজা, এর জন্য সাধারণ জনগণের কাছ হতে ভোট গ্রহণ করা হবে। যে বেশি ভোট পাবে, সে হবে এই বনের রাজা। বাঘ ও সিংহ বিষয়টি বুঝতে পারল এবং শেয়ালের কথা মত ভোটের আয়োজন করল। সারাদিন ব্যাপী ভোটগ্রহণ হল। অতঃপর শেয়াল ভোট গণনা করে দেখল যে দু’জন সমান ভোট পেয়েছে। দু’জনের মধ্যে একজনকে রাজা বানানো সম্ভব হল না।

শেয়াল বিকল্প ভাবনা ভাবতে শুরু করল। হঠাৎ তার মাথায় বুদ্ধি এল, বনকে দুটি এলাকায় বিভক্ত করা হবে। একাংশ বাঘ ও একাংশ সিংহকে দেওয়া হবে। দু’জন দু অংশের রাজা হবে। অন্যান্য পশুপাখিদেরও বিভক্ত করে দেওয়া হবে। শেয়ালের কথা মত দু’জনই রাজি হল। দু’জন দু অংশের রাজা হয়ে গেল। বাঘের রাজ্যে যেমন সুখ, সিংহের রাজ্যেও তেমনি সুখ।

বিভক্ত দুই রাজা বাঘ ও সিংহের সুখের খবরটা পাশের বনের রাজা হাতির কানে পৌঁছাল। হাতি একটু দূষ্টু চরিত্রের ছিল। তাই সে ভাবল, ওরা যেহেতু এখন বিভক্ত হয়ে গেছে, তাই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওদের রাজ্য দখল করা যায় কিনা। যা ভাবনা, তাই কাজ। রাজা হাতি পর্যায়ক্রমে বাঘ ও সিংহের রাজ্যে আক্রমণ করল। তারা নতুন রাজা হওয়ায় তেমন কিছু বুঝে না উঠতেই হেরে গেল। বন থেকে বিতাড়িত হল। হাতি মনের সুখে তার রাজ্যের সীমানা বাড়িয়ে নিয়ে রাজ্য পরিচালনা শুরু করে দিল।
একদা নদীর ঘাটে সিংহ ও বাঘের দেখা হল। তারা দু’জনই তাদের করুণ পরিণতির কথা আলোচনা করল। নিরুপায় হয়ে তারা ভাবল, নিজেদের ভাগাভাগি করাটা যে তাদের ভুল হয়ে গেছে। এমন সময় আবার ঐ দার্শনিক শেয়ালের সাথে তাদের দেখা হল।

 তার কাছে সকল ঘটনা খুলে বলল। শেয়াল বলল, দেখ, তোমরা দু’জনই শক্তিশালী। তবে কৌশলগত সিংহের কারণে হেরে গেছ। আজ যদি তোমরা একত্র থাকতে, তাহলে কি কেউ তোমাদের বন থেকে বিড়াতিত করতে পারত? সকলেই জানে, সিংহ ও বাঘ ভয়াবহ প্রাণী। এক বনে বাস করে নিজেদের মধ্যে গন্ডগল করায় আজ বিড়ালের চেয়েও ভীতু হয়ে গেছ। তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আগের মত এক সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিল।

 শেয়াল তখন দু’জনকে এক হয়ে হাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে করত বলল। দু’জন মিলে যুদ্ধ করবে, কথাটি শোনা মাত্রই দূষ্টু রাজা হাতি রাজ্য ছেড়ে পালাল। অতঃপর বাঘ ও সিংহ আগের জীবনে ফিরে গেল এবং শপথ নিল আর রাজা হওয়া নিয়ে কভু ঝগড়া করব না। তারা সমস্বরে বলে উঠল, আমরা দু’জনই রাজা। আমরা এক রাজ্যে দুই রাজা।

অল্প কথায় গল্প

শরীফ সাথী:পড়ন্ত বিকেল। বর্ষার টাপুর টুপুর বৃষ্টির ফোঁটা জানালার পাশে দাদু ও নাতির দেহের পরশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে শীতল বায়ুতে দোলা দিয়ে যাচ্ছে।প্রতিদিনের মতো আজও নাতির আবদার দাদু, আজও তো বৃষ্টি হচ্ছে গল্প শোনাও না।
দাদু কচি ঘাসের মত মুচকি হেসে গল্প বলা শুরু করল-
গহীন অরন্যে জনাজীর্ন কুঠি বাড়িতে বাস করতো দুই বন্ধু বেজী ঠুলি ও ফুলি।
প্রকৃতিরা বাড়ির চারিদিকে নিদারুন ভাবে খেলা করতো। পাশে পুকুরের চতুর্দিকে ফলের গাছ।
আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, তাল, নারিকেল, কদবেল, আমড়া, জলপাই, লেবু, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, পাকা লাল লাল ডালিম। আরো কত কিছু সবুজ ছায়া ঘিরে থাকতো। বাতাসের ঢেউয়ে পুকুরের জল থৈ থৈ করতো। মাছের দল এঁকে বেঁকে, দুলে দুলে খেলা খেলতো। ব্যাঙের ডাকে বর্ষা আসতো।
ঠুলি ও ফুলি শখের বসে বিভিন্ন পশু পাখির বিয়ের জন্ম দিনের অনুষ্ঠান করতো।
কি না আনন্দ হতো?
ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঝিঁঝি পোকার চিচি ঝিঝি ডাকাডাকি। বিভিন্ন মাছদলের লাফালাফি আর পাখিদের সুমিষ্ঠ গানে ভরে উঠতো কুঁঠিবাড়ির আঙিনা।
খেয়েদেয়ে আনন্দে চলতে থাকে তাদের মধুময় জীবন।
এবার প্রচন্ড খরা।
পানির স্তর নিচে নেমে পুকুরের জল কমে যাওয়ায় কষ্ট পেতে পেতে দেরিতে বৃষ্টির আগমন। দেরিতে হলেও পুকুর জলে ভর্তি হয়ে ব্যাঙের ও মাছদলের আনন্দের সীমা নেই।
সকাল-বিকাল ডাকাডাকি।
গাছ থেকে পাকাপাকা ফল পড়ে জলে। মাছ নাচে ব্যাঙ নাচে, নাচে ঘুগরো তালে।
এভাবেই দিন যেতে থাকে।
ব্যাঙের ডাকে বাদল নামে কত আনন্দে?
বেশী সুখ কি আর কপালে সয়?
হঠাৎ একদিন ভয়ংকর গোখরা সাপ চুপি চুপি এসে ফস করে একটি ব্যাঙ ধরে নিয়ে গেলো, পরের দিন পাখির ছানা ধরে চলে যায়।
এভাবে দিন মাস পেরুতে ব্যাঙ ও পাখিদের মধুময় ডাক আস্তে আস্তে কমতে শুরু করলো।বন্ধু বেজীদ্বয় ঠুলি ও ফুলি ব্যাঙ ও পাখির ছন্দ তালের ডাকে ঘুমাতো। তারা ভাবলো ডাক্ এতো কমে যাওয়ার কারন কি? তাই ব্যাঙ ও পাখির সর্দারকে ডেকে পাঠালো।
-জ্বী মহাশয়, কিছু বলছেন?

-হ্যাঁ। তোমাদের মায়া মমতা ভরানো মিষ্টি মধুর প্রিয় ডাকাডাকি এতো কম হওয়ার কারন কি?
ব্যাঙ ও পাখিদ্বয় সমস্ত ঘটনা খুলে বললো।বেজীদ্বয় রেগে অস্থির। মাথা ঠান্ডা করে ওদের শিখিয়ে দিলো যখনই গোখরা ধরতে আসবে, তখনই তোমরা সুরে সুরে ডাকবে-
“এসেছে এসেছেরে বন্ধ,ু এসেছে এসেছেরে বন্ধু”।তারপরের দিন গোখরার আসতে দেখে, ব্যাঙ ও পাখির ও হাঁসের দল মিষ্টি সুরে ডাকতে লাগলো-
‘‘এসেছে এসেছেরে বন্ধু, এসেছে এসেছেরে বন্ধু?’’

বন্ধু বলে সম্বোধন করায় গোখরা আনন্দে আটখানা। গোখরা মিছে মিছে হাসে, তালে তালে নাচে আর ভাবে মজায় মজায় খাবো।ঠিক এই সময় ঠুলি ও ফুলি হাজির। সামনে ফুলি ফুলের মত বিকশিত হয়ে খেলা দেখায় আর পিছন থেকে ঠুলি এক লাফে গোখরোর ঘাড় মটকে দিয়ে, দাঁতের ধারালো কাইচে দিয়ে গলা কেটে দিলো।
গোখরা কুপোকাত।
মুহুর্তে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেললো।
তারপর থেকে আবার আনন্দে গান গাইতে শুরু করলো, ব্যাঙ ও পাখিদের দল।
নাতি ফোঁকলা দাঁতে হেসে উঠে বললো, ঠিক হয়েছে দাদু ভাই—
ঠিক হয়েছে উচিৎ শিক্ষা হয়েছে।

দুষ্টু কাক ও বুড়িমা

 সোহেল রানা: গ্রামের চার রাস্তার মোড়ে ছিল একটা বড় বটগাছ। আর ঐ বটগাছের উপরে বাস করত একটা দুষ্টু প্রকৃতির কাক। দুষ্টু কাক সে গ্রামের এক বুড়িমাকে সবসময় জ্বালাতন করত। বুড়িমা যখনই বটগাছের নিচ দিয়ে যাতায়াত করত ঠিক তখনই দুষ্টু কাকটা বুড়িমার মাথার উপরে পায়খানা করে দিতো আর আনন্দে কা কা করে বুড়িমার এদিক ওদিক ঘুরঘুর করত। বুড়িমা যতদিন ঐ বটগাছের নিচ দিয়ে গিয়েছে ততদিনই ঐ দুষ্টু কাক পায়খানা করে বুড়িমার ভালো কাপড় নষ্ট করে দিয়েছে।


বুড়িমা কাকের এই কান্ডে কখনও রাগ না করলেও একদিন অনেক রেগে গিয়েছিলেন। রাগ হওয়ারই কথা। কারণ সেদিন তিনি অনেক পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। বটগাছের কাছে এসে তিনি অনেক সাবধানে তার নিচ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও পার পাননি। কারণ কাকটা আগে থেকেই ওত পেতে ছিল বুড়িমার কাপড় নষ্ট করে দেয়ার জন্য। সেদিন বুড়িমা লাঠি নিয়ে কাকটাকে ইচ্ছেমত তাড়া করেছিলেন। তাড়া করে আর কি তাকে নাগালে পাওয়া যায়? সে দিব্যি বটগাছের মাথার উপরে বসে বুড়িমাকে দেখে ব্যাঙ্গ করে কা কা করছিল।


বুড়িমা কাকের এই দুষ্টামির কথা কারও কাছে না বললেও এক কান দুই কান করতে করতে এলাকার মানুষের কাছে বিষয়টি আর অজানা ছিল না। কেউ কেউ বুড়িমাকে দেখে কা কা বলে রাগানোরও চেষ্টা করত। কিন্তু বুড়িমা ছিলেন খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ। তাই কারো কথাতে রাগ করতেন না বলে আর কেউ দ্বিতীয়বার এই কাজটি করত না। বুড়িমার সাথে কাকের এই ধরণের আচরণের কথা একদিন তার মেয়ের কানে পৌঁছালো। মেয়ে বুড়িমাকে কিছু না জানিয়ে তার ছেলেকে পাঠালো দুষ্টু কাককে শায়েস্তা করার জন্য।

 নাতি অনেকদিন পর বুড়িমার বাড়িতে বেড়াতে আসায় বুড়িমা তাকে অনেক আদর আপ্যায়ন করল। আপ্যায়ন শেষে নাতির যখন বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সময় হলো তখন বুড়িমা তাকে সাথে করে বটগাছ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসলো। নাতিও এটা চাচ্ছিল যে, তার নানি বটগাছ পর্যন্ত আসুক আর কাকটাকে হাতের নাগালে পাক। বটগাছের কাছে পৌঁছার আগেই বুড়িমার নাতি প্রস্তুত ছিল কাকটাকে আঘাত করার জন্য। যেই বুড়িমা বটগাছের নিচে আসলো আর ওমনি কাকটা বুড়িমার মাথার উপর পায়খানা করতে উদ্যত হলো। পায়খানা করার আগেই বুড়িমার নাতি একটা লাঠি ছুঁড়ে মারলো কাকের দিকে আর কাকটি নিজেকে লাঠির আঘাত থেকে রক্ষা করতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।


বুড়িমা নাতির এই কান্ডে অবাক হয়ে একবার কাকের দিকে আরেকবার নাতির দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকল। কাকটির অবস্থা খারাপ দেখে তিনি নাতিকে রেখে কাককে হাতে তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে অতিদ্রুত রওনা দিলেন। নাতিও ছুটলো নানির পিছন পিছন। কাকের প্রতি নানির এমন ভালোবাসা দেখে নাতির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। নানি কোনো কথা না বলে অনেক সেবা করে কাকটিকে সুস্থ্য করে তুললেন।

 তখনও কাকটি ঠিকমত দাঁড়াতে পারছিল না। তারপরও কাকটি বার বার বুড়িমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছিল। কেউ না বুঝলে নানি হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন কাকের কথা। তাই নাতিকে উদ্দেশ্য করে নানি বললেন, ‘দেখেছো নাতি? আজকে কাকটি তার ভুল বুঝতে পেরে বার বার আমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে। তাই সবসময় একটা কথায় মনে রাখবে, ‘শত্রুকে একমাত্র ভালো ব্যবহার ও ভালোবাসা দিয়েই আপন করা যায়, অন্য কিছু দিয়ে নয়’।

বাংলা ও বাঙালির কবিতা

মামুন মুস্তাফা :পাশ্চাত্য রেনেসাঁ নির্ভর সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ প্রভাবই বাংলা কবিতায় আধুনিকতার জন্ম দেয়। বলা আবশ্যক শুরুতে এ আধুনিকতায় লোকজ ও দেশজ প্রভাব গভীর ভাবে প্রোথিত ছিল না। উপরন্তু এ আধুনিকতা ছিল নাগরিক চেতনায় জারিত। উনিশ শতকে অমিত্রাক্ষরের বলিষ্ঠ পদচারণায় স্বাদেশিকতা ও ব্যক্তিবাদিতার মুক্ত চেতনার প্রকাশের মধ্য দিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা কাব্যের বিষয়-বক্তব্যে ও আঙ্গিক-বৈশিষ্ট্যে নবধারার পত্তন করেন যা আধুনিক চেতনার প্রকাশ নিশ্চিত করে।

তবে উনিশ শতকের শেষ দিকে রবীন্দ্রকাব্যে আধুনিকতার প্রকাশ ঘটে মূলত রোমান্টিক ব্যক্তিচেতনার মুক্ত প্রকাশের ভিতরে। আমাদের বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবস্থান যেমন চিরসত্য, প্রকৃত তেমনি তাঁর বিপুল কাব্যভাণ্ডারের অনেক ক্ষেত্রভূমি তাঁর ভিতরের সার নির্যাস আজও পাঠকের কাছে অনাবিষ্কৃত। তথাপি মানসী (১২৯৭), সোনার তরী (১৩০০), চিত্রা (১৩০২) ও বলাকা (১৯১৬) কাব্যগ্রন্থের ভিতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ আপামর বাঙালির মননে ঠাঁই করে নিয়েছেন। মূলত শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনাচরণ, সৃজনশীল রচনা ও চিন্তাচেতনার দর্শনতত্ত্বে ছিলেন আনন্দ-কল্যাণকামী ও সৌন্দর্যপিপাসু। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল দেশ ও বিশ্ব প্রেক্ষাপটে সমাজঅভ্যন্তরে সংঘটিত কিছু নৈরাশ্য, অপূর্ণতা আর অস্থিরতা। এ থেকে উত্তরণ এবং মুক্তির আকাক্সক্ষা তাই রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যদর্শনে একীভূত হয়েছে। ফলে উনিশ শতকে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের ভাব-বিন্যাস ঘটেছে প্রকৃতি-নারী আর সৌন্দর্যের কুসুম-কোমলে।

প্রকৃতি-নারী আর সুন্দরের আকাক্সক্ষাÑ এই ত্রিবেণী সঙ্গমে রবীন্দ্রনাথের কাব্যলক্ষ্মীর যে- দর্শন তার শুদ্ধ স্ফূরণ ঘটে সোনার তরী, চিত্রা ও মানসী কবিতাগ্রন্থে। এই তিনটি কাব্যের কবিতাগুলোর মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে শুভাশুভের কল্যাণ কামনা করেছেন সেখানে ‘নারী’র প্রতীকে উপস্থিত হয়েছে শান্তির সৌন্দর্য। ওই মানসসুন্দরীর ভেতরে যে কল্যাণাকাক্সক্ষা তা অব্যাহত থাকে মানসী, সোনার তরী ও চিত্রা কবিতাগ্রন্থে। ব্যক্তিমনের ভাবাবেগ ও কল্পনার সংঘাত এবং তা থেকে উত্তরণে সমাজ ও প্রকৃতির দ্বৈত সংকটময় অভিজ্ঞতা এর কবিতাগুলোতে দেখা যায়। বিশেষ করে  সোনার তরী ও চিত্রা কাব্যে তৎকালীন পূর্ব-বাংলা তথা বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর করুণ মুখশ্রীর সাথে বাংলার সৌন্দর্যময়ী ভুবনপ্রতিমার অনুরাগমিশ্র রূপ ফুটে উঠেছে। আবার এর ভেতরেই তৎকালীন বাংলার সমাজঅভ্যন্তরে নিহিত যাবতীয় কুসংস্কার, কুটিল আধিপত্যবাদ এবং উপনিবেশবাদী চেতনাকে অস্বীকারের মাধ্যমে আবহমান সৌন্দর্যজগত তিনি রচনা করেন।

উপনিবেশবাদী চেতনাকে অস্বীকার রবীন্দ্রনাথের ধর্ম-দর্শনকে অন্য স্তরে পৌঁছে দেয়। নিজ বাড়িতে নিরাকার ¯্রষ্টার উপাসনা তাঁকে মহাজাগতিক অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে। এখান থেকেই ধর্মচিন্তার শুরু। তখন থেকেই ধর্মচিন্তার ক্ষেত্রে মহাসত্যের বোধ কবির মননে জাগ্রত হয়। ফলে কবির বোধ ও বোধির জগতে উপনিষদ, রেনেসাঁপ্রসূত ব্যক্তিগত ঈশ্বরকল্পনার স্বাধীন প্রকাশ পরবর্তীতে তাঁর বলাকা (১৯১৬) কাব্যে অন্য লোকের সন্ধান করে।

বলাকা কাব্যে ব্যক্তি-আমি’র বিশ্ব পর্যটনে ঐশ্বরিক অস্তিত্ব-এষণা ছিল বস্তুনিষ্ঠ ও অনুভূমিক এবং ইতিহাসনির্ভর। রবীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উৎসারিত সৃজনচেতন পরিগ্রহ রূপলাভ করে এই কাব্যে। বিশুদ্ধ আত্মপরিচয় ও আত্মপূর্ণতার আত্মানুসন্ধানের মধ্য দিয়ে আমি’র অস্তিত্বে জন্মরোমান্টিক কবি বলাকা কাব্যে বৈশ্বিক সংকট ও সমাজদেশের যুগসন্ধির ধর্মদর্শন আবিষ্কার করেন মানবঅন্তরে এবং পৃথিবীলোকে। আর এর মাধ্যমে কালপরিক্রমায় মানবমনের নান্দনিক, দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপ আবিষ্কারের ভিতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা কবিতাকে বাঙালির চিরকালীন আধুনিকতার নন্দনতত্ত্বে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন।

২.
রাবীন্দ্রিক আধুনিকতাকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিত্ববাদী আমিত্বের জয়গান আর স্বাদেশিকতার সঙ্গে হুইটম্যানীয় মৃত্তিকা-ঘনিষ্ঠ মানবিকতার মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতায় নব্য আধুনিকতার সংজ্ঞা নির্মাণ করলেন কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের কাব্যে স্বদেশ, স্বজাতি ও স্ব-সম্প্রদায়ের মুক্তি ও কল্যাণাকাক্সক্ষা দেশপ্রেমের রসধারায় উদ্ভাসিত। স্বদেশ ও স্বজাতির উত্থান কামনা ও তাদের চিত্তে অনুপ্রেরণা সঞ্চারের ক্ষেত্রেও নজরুল কাব্যের ব্যাপকতর ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। তাঁর এই সত্তা সে-সময়ের ভারতবর্ষের সাধারণ তথা স্বাধিকার আদায়ের মানুষগুলোকে জাগিয়ে তোলে।
এ কথা সত্য কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদের কবিতাগুলোই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের কবিতায় অমরত্ব দান করেছে। নজরুলের সাম্যবাদী চেতনার ভেতরে দেশাত্মবোধ এবং জাতীয় ঐক্যের বীজ নিহিত ছিল। তাই তো তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিÑ এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার পূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে শোষক ও শোষিতের বেড়াজাল ভাঙতে চেয়েছিলেন। নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্বে সকল ভেদাভেদ ভুলে এক সমাজ গঠনে তৎপর ছিলেন। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ (১৯২৫) ও ‘সর্বহারা’ (১৯২৬) কাব্যদুটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

নজরুলের সাম্যবাদী চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘মানুষ’। আর ‘মানবিকতা’ তাঁর সাম্যবাদী চেতনার মূলমন্ত্র। আবার সাম্যবাদী কিংবা সর্বহারা কাব্যের ভেতরে নজরুল তাঁর ধর্ম-দর্শনকে নির্ণয় করলেন যার নাম ‘মানবধর্ম’। এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার গভীরে মানবধর্মের মধ্য দিয়ে কবি আবিষ্কার করেছেন তাঁর ¯্রষ্টাকে। অন্যভাবে বললে বলা যায় যে, নজরুলের এই ধর্ম-দর্শনের আকর হচ্ছে ‘সাম্যবাদ’। আর এর জীবনচৈতন্যে নজরুলের উপনিবেশ বিরোধিতা এবং জাতীয়তাবাদ কাজ করেছে। যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন কতকটা স্তিমিত এবং সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প চারদিকে ছড়াতে লাগলো তখন নজরুল ইসলাম বাঙালির সামনে নিয়ে এলেন মানবতাবাদের শাশ্বত বার্তা। তাই কবি বলতে পেরেছেনÑ ‘আমাদের মধ্যে ধর্মবিদ্বেষ নাই, জাতিবিদ্বেষ নাই, বর্ণবিদ্বেষ নাই, আভিজাত্যের অভিমান নাই। পরস্পরকে ভাই বলিয়া একই অবিচ্ছিন্ন মহাত্মার অংশ বলিয়া অন্তরের দিক হইতে চিনিয়াছি।’

নজরুল অসাম্প্রদায়িক ঐক্যের ভেতরে বিশ শতকের তৃতীয় দশকে সাম্যবাদী চেতনাকে প্রোথিত করলেন তাঁর কবিতা ও গদ্যে। পরবর্তীতে নজরুল পরিচালিত ‘লাঙল’ কাগজে আমরা দেখতে পাই ‘গণতান্ত্রিক সমাজবাদ’ কীভাবে লালন করেন কবি। পত্রিকাটি হয়ে উঠেছিল ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ের মুখপত্র’। নজরুলের আধুনিকতা বা আধুনিক দৃষ্টিচেতনার সব থেকে বড় মূলমন্ত্র এটি। সত্য ও নির্ভীক এই কবির এক হাতে ছিল ‘বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য’। তাই তিনি যুগপৎ ভাবে রচনা করে গেছেন প্রেমের সঙ্গীত এবং দ্রোহের কবিতা।

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত এই কবি সব সময় ছিলেন হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের প্রতি সহমর্মী। তাই তো কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল একাধারে শ্যামা সঙ্গীত ও ইসলামী গান রচনা করা। আর তাই কাব্যবস্তুর দিক দিয়ে তিনি বাংলা কাব্যে নতুন ভাবাদর্শের প্রতিষ্ঠাতা বা নতুন যুগের প্রবর্তক হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকেন। আর্য-অনার্য ও ইউরোপীয় সংস্কৃতি যখন দেশীয় সংস্কৃতিতে আত্মস্থ হতে থাকলো, তখন একমাত্র নজরুলের কাব্যেই এই সম্মিলিত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারিত্বের লক্ষণ আমরা দেখতে পাই। সে সময় হিন্দু-মুসলিম উভয়েই দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিধারার প্রতি উদাসীন ছিলেন, ঠিক তখন কাজী নজরুল দেশীয় কৃষ্টির সঙ্গে সঠিক সম্পর্কটি নির্ণয়ে সক্ষম হয়েছিলেন। সুতরাং কবি নজরুল শত ভ্রƒকুটি অগ্রাহ্য করে কাব্যকলার ঐতিহ্যে মানবতাবাদী সাম্যবাদের পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পেরেছিলেন বলেই তিনি বাংলা কবিতাকে পৌঁছে দিলেন গণমানুষের বক্ষে, বাংলা কবিতা বাঙালির নিত্যদিনের আচারপ্রথার চিরকালীন অংশ হয়ে উঠলো।

৩.
সময়, সমাজ ও ইতিহাস চেতনার আলোকে জীবন থেকে বহুমুখী বিষয়ের বিন্দু সঞ্চয় করে জীবন ও ব্যক্তি-আচরণের চরিত্র ব্যাখ্যাপূর্বক জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতায় আধুনিকতার নতুন ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। মূলত মালার্মে-ভ্যালেরি শিষ্য সুধীন্দ্রনাথের কলাকৈবল্যবাদ, বুদ্ধদেব বসুর দৈবানুভূতি, এলিয়টভক্ত বিষ্ণু দে’র দেশিবিদেশি পুরাণ প্রসঙ্গ ও ইতিহাস-ধৃত নেতিচেতনা এবং অমিয় চক্রবর্তীর ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপে জীর্ণ নাগরিক অবক্ষয়চিত্র পাশ্চাত্য আধুনিকতা আত্মীকরণের মাধ্যমে আধুনকি বাংলা কবিতায় বিষয় ও প্রকরণে দেখা দিল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তিরিশের এই নাগরিক চেতনার কবিকুল উল্লিখিত কাব্যচেতনার টানেই বহির্বিশ্বকে ঘরে এনে তোলেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদিতা ও আত্মরতির পথ ধরে। প্রকৃতপক্ষে মালার্মে, ভ্যালেরি, বোদলেয়ার, এলিয়ট ও ইয়েটস তিরিশের কবিসংঘের চেতনায় প্রধান হয়ে ওঠেন। ফলে পশ্চিমে যেমন উল্লিখিত কবিবৃন্দ, তেমনি পূর্বে এই বাংলায় তিরিশের প্রধান কবিগণ বাংলা কবিতায় আধুনিকতার নতুন প্রবর্তক হিসেবে নাম লেখালেন।

বাংলা আধুনিক কবিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী হিসেবে চিহ্নিত তিরিশের প্রধান কবিসংঘ প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর পরিবেশে পাশ্চাত্য কবিতার বিষয় ও প্রকরণ প্রাচুর্য অঙ্গীকারের মধ্যেই নেতিবাদী জীবনচেতনার কার্যকারণ নির্ণয় করলেন মূলত কলোনিশাসিত সমাজের বিচিত্র অসঙ্গতির গভীর থেকে। ঐ অসঙ্গতির ভেতরে দেখা দিল একরাশ নৈরাশ্য আর দীনতা, সমাজের অবক্ষয়িত রূপ, নিঃসঙ্গতা এবং শূন্যতা, অস্তিত্বের প্রশ্নে সংশয় ও টানাপোড়েন। আর এগুলোর ভেতরেই তিরিশের এই প্রধান পাঁচ কবি বাঙালির জীবন অনুধ্যানে বাংলা কবিতার আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধনে সমর্থ হয়েছিলেন।

এ কথা মানতে হবে যে, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পাশ্চাত্য সমাজব্যবস্থায় নিহিত ক্লেদ, হিংসা, হতাশা, নৈরাশ্যের ভেতরে উদ্ভুত নব্য-আধুনিকতাকে বাংলা কবিতায় নিয়ে এলেন তিরিশের এই প্রধান পাঁচ কবি। ফলে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নিসর্গ, ইতিহাসচেতনা, আধুনিক যুগযন্ত্রণা সুররিয়ালিজম, ইমেজিজম আবার কখনো ন্যাচারালিজম দ্বারা আক্রান্ত। সুতরাং জীবনানন্দের কবিতায় পরাবাস্তবতা বাক্সময় হয়ে ওঠে এবং কবিতায় ঐন্দ্রজালিক মায়াজাল সৃষ্টি করে। ফলে জন্ম-মৃত্যু-সাধ, ইচ্ছা-বাসনা-কামনা, প্রকৃতি-প্রেমÑ প্রতি স্তরে জীবনানন্দের কবিতায় পরাবাস্তবতা এমন এক দর্শনে আক্রান্ত যা বাঙালিকে আবেগী করে তোলে। মালার্মের কবিতার আধুনিকতায় উদ্বেল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা নৈর্ব্যক্তিক ও নাস্তিতে আস্থাবান। সুধীন দত্তের কবিতায় নশ্বরতার ক্রন্দনের মধ্যেও বাঙালির চিরন্তন মনে স্বপ্ন বোনে, প্রতীকাশ্রয়ী হয়ে ওঠে এবং সাংগীতিক। ফলে তাঁর কবিতার মননশীলতা বাঙালির নিঃসঙ্গ ভূমিতে আশার সঞ্চারী হিসেবে দেখা দেয়। ব্যাপক রবীন্দ্র-প্রভাব সত্ত্বেও অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা কসমোপলিটান, ইমেজিস্ট এবং ইম্প্রেশনিস্ট। তিনি পশ্চিমা কাব্য-উপাদানকে বাংলা ও বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে নাগরিক কবিতা রচনা করেছেন। আর এর মাধ্যমে বাঙালির জীবনধারাকে বিশ্ব-জীবনধারার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করেছেন। অমিয়র এই যোগ সূত্র মূলত অস্তিবাদী চিন্তনের বহির্প্রকাশ। ফলে তাঁর কবিতা শুভ ও কল্যাণচেতনা বহন করে বাঙালির কাছে। প্রধানত বোদলেয়ার দ্বারা আক্রান্ত হলেও মূলত বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ইংরেজি ও ইউরোপীয় কাব্যবৈশিষ্ট্যের নানা স্তরে চারিত। ফলে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজের ক্ষয়িষ্ণু নৈতিকতা থেকে তাঁর কবিতায় এসেছে অবিশ্বাস, দেহকেন্দ্রিকতা, ক্ষণবোধ এবং ‘ক্লেদজ কুসুম’। আর এর ভেতর দিয়েই তাঁর কবিতায় নিঃসঙ্গতা ধরা দিয়েছে বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষা, আনন্দ-বেদনা, অচরিতার্থতা এবং অস্তিত্ববোধের ভেতরে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় সাহিত্যকে অবিমিশ্র গন্তব্যের দিকে নিয়ে গিয়েছিল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুনর্পাঠ। তারই সার্থক রূপায়ন দেখি বিষ্ণু দের সমাজবাদী চেতনায় উদ্ভাসিত কবিতাগুলোতে। ফলে বিষ্ণু দের কবিতা বাংলার চিরকালীন সমাজব্যবস্থায় বাঙালির মন ও মেজাজ এবং শ্রেণি-সমাজকে স্পষ্ট করে।

পশ্চিমা নবআধুনিকতা নগরায়ন ও শিল্পায়নের অবিমৃষ্য রূপ। ফলে পশ্চিমা সমাজে দেখা দিল নতুন করে যৌনকাতরতা, ক্ষুধা, আর্থিক মন্দার ভেতরে যন্ত্রণাকাতর জীবনের উচ্চাকাক্সক্ষা। সামাজিক-রাজনীতিক-আর্থিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিটি পর্যায়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনে যন্ত্রসভ্যতার প্রতি অনাস্থা পশ্চিমা দুনিয়ায় মানব অস্তিত্বে সংকট ঘনীভূত করে এবং সৃষ্টি করে একরাশ নৈরাশ্য। পশ্চিমা আধুনিকতার ভেতরে নৈরাশ্যবিহার, না-অর্থক অস্তিত্বে নিমজ্জিত এবং ভবিষ্যৎ ভাবনায় সংশয়ী তিরিশের এই কবিসংঘই প্রথম বাংলা আধুনিক কবিতাপর্বে বাঙালির মনন, বোধ ও বোধির জগতে বাংলা কবিতাকে দাঁড় করান এক ব্যতিক্রমী দ্যোতনায়। পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাকে আত্মস্থ করে এবং তাকে দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করে রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা আধুনিক কবিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তিরিশের প্রধান এই পাঁচ কবি। তিরিশের কবিদের কবিতাবলয় সম্পর্কে উপর্যুক্ত মন্তব্য সকল সমালোচকের দৃষ্টিতে একইরকমভাবে ধরা পড়েছে। সুতরাং আমার এ কথাগুলোও তাদেরই পুনর্পাঠ মাত্র।

’৪৭ উত্তর দেশভাগের পটভূমিতে উভয় বাংলার আধুনিক কবিতার নিরীক্ষায় সচেষ্ট মননশীল কবিগোষ্ঠী তিরিশের কাব্যধারার অনুরণনে মাতৃঐতিহ্য, নিজস্ব মিথ ও সংস্কৃতির ভাবধারায় স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি সংযোজনে সমর্থ হয়েছিলেন। তখন সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দুই রাষ্ট্রের দুই প্রাদেশিক বাংলার সমাজব্যবস্থায় আশা ও স্বপ্নভঙ্গের চরিতার্থতা এবং তার সীমবদ্ধতা বা সম্ভাবনার সমন্বিত পরিচর্যায় আধুনিক বাংলা কবিতার চেতনাজগৎ নির্মিত হতে থাকলো। পরবর্তীতে দশকের পর দশকব্যাপী রাষ্ট্র, সমাজ ও জনমানুষের জীবনব্যবস্থায় সংঘটিত ঘাত-প্রতিঘাতে বাংলা কবিতাও হয়ে উঠেছে সেই বস্তুস্বরূপের অনুষঙ্গী। আর তাই উভয় বাংলার সমাজব্যবস্থায় নিহিত জনমানুষের চিন্তাচেতনা, অভিরুচি, আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-চরিতার্থতার সমন্বয়ে বাংলা ভাষার আধুনিক কবিতার চেতনা ও প্রকরণ হয়ে উঠলো কখনো ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ, আবার কখনো জীবননিষ্ঠ। য়

ভূতের নৃত্য

রণজিৎ সরকার :তোমাকে কি জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়ে ছিলাম। মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য। কিন্তু তুমি ভয় না দেখিয়ে মানুষকে হাসিয়েছ, আনন্দ দিয়েছ। তোমার কি মনে নাই। তুমি ভূত। মানুষ নও।’ খুব রাগভাবে বলল ভূতের বস ভুতুম।‘আমার সব মনে আছে বস। আমি পৃথিবীতে গিয়ে দেখি, দুঃখী মানুষের সংখ্যা বেশি। দুঃখী মানুষকে ভয় দেখিয়ে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে, আনন্দ  দেওয়া ভালো। তাই মজা করে হাসিয়েছি। এটা কি আমার অপরাধ হয়েছে বস?’ বিনয়ের সাথে কথাগুলো বলল ভূতের ছানা ভুলুক।
‘অপরাধ নয়। তুমি আমার কথা শুনলে না কেন? দায়িত্ব অবহেলা করেছে।’  বলল ভুতুম।
‘বস, আমি পরিস্থিতির শিকার।’
‘তুমি যে ভূত। তা কি সবাই চিনেছে।’
‘না না, আমাকে কেউ চেনে নাই। চেনার প্রশ্নই আসে না।’
‘কেন? না চেনার কারণ কি ভুলুক?’

ভূতের ছানা আনন্দে নৃত্য করতে লাগল। তার নৃত্যশৈলী দেখে ভূতের বস অবাক হলো। সে ভাবল- মানুষের মাঝে গিয়ে সে নৃত্য শিখে এসেছে। ভুলুকের নৃত্য অপলক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল সে। নৃত্য শেষ হলে ভূতের বস হাততালি দিল। ‘কেমন হয়েছে বস?’ ভুলুক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।‘তুমি নৃত্য শিখলে কার কাছে থেকে?’
‘বস আমি তো মানুষের মাঝে গিয়েছিলাম। সেখানে এক নৃত্যশিল্পীর সাথে পরিচয় হয়। তার নাম পরি। তার নৃত্য দেখে আমার নৃত্য শিখতে ইচ্ছা হলো। তাই আমি তাকে বলি, তুমি যদি আমাকে নৃত্য না শেখাও তাহলে তোমাকে কিন্তু ভয় দেখাব।

 নৃত্যশিল্পী আমাকে বলে, ভয় দেখানোর কে তুমি। তখন আমার পরিচয় দিলাম। আমার পরিচয় শুনে সে ভয়ে কাঁপতে লাগল। আবার বললাম, তুমি আমাকে নৃত্য শেখাও তাহলে তোমার কোন ক্ষতি হবে না। আর খবর দার আমি যে ভূত তা কিন্তু কাউকে বলা যাবে না। নৃত্যশিল্পী রাজি হয়ে গেল। সে আমাকে নিয়মিত কয়েক দিন প্র্যাকটিস করালো। আমি শিখে গেলাম নৃত্য।‘শরীর, ছন্দ, আত্মা, মন, সংগীত-এসব নিয়ে নান্দনিক ছন্দিত শরীরী প্রতিমাই হলো নৃত্য। বেশ ভালো করেছে ভুলুক। আচ্ছা, তুমি না কাউকে ভয় দেখাও নি, বললে।‘নিজের স্বার্থের জন্য কথায় ভয় দেখিয়েছি বস। তার তো কোন ক্ষতি করিনি।’
‘তোমাকে আবার যেতে হবে, পৃথিবীতে।’
‘কেন বস?’
‘এবার যাবে। অন্য একটা কারণে। কারণটা হলো তুমি গিয়ে একটা তালিকা করবে।’
‘কিসের তালিকা বস।’
‘কারা কারা শিশু নির্যাতন করেছে, এখনো করছে। তাদের একটা তালিকা করবে।’
‘তালিকা করে কি হবে বস।’
‘আমরা তাদের শাস্তি দেব।’
‘তাহলে কি এবার আমি একাই পৃথিবীতে যাব বস।’
‘তুমি একাই যাবে। চকচকে তালিকা করবে। তালিকা করা শেষ হলে, নিয়ে আসবে আমার কাছে। তারপর সবাই গিয়ে তালিকার নাম ধরে ধরে তাদের শাস্তি দেব।’
‘ঠিক আছে বস। আমি যাব।’
ভূতের ছানা ভুলুক চিন্তায় পড়ল। কীভাবে তালিকা করবে। মানুষের মাঝে না মিশলে তো দুষ্ট লোকদের তালিকা করা যাবে না। কিন্তু কীভাবে মানুষের সঙ্গে মিশব। কীভাবে কি করব। পরামর্শ নেওয়ার জন্য বসকে বলতে চেয়ে সাহস পেল না সে। ইচ্ছাটার কথা বললে যদি তাকে আবার পৃথিবীতে না পাঠায়। তাহলে তো তার নৃত্যশিল্পী পরির সাথে দেখা হবে না। নৃত্যশিল্পীকে সব খুলে বলব। তার সাথে মিশে অপরাধীদের তালিকা করব।
ভুলুক পৃথিবীতে এল। এসে বন্ধু পরির কাছে গেল।
‘আমি মানুষের মাঝে মিশতে চাই। কিন্তু কেউ যেন বুঝতে না পারে আমি ভূত। এখন তুমি বল। আমি কি করব।’ নৃত্যশিল্পীর কাছে গিয়ে বলল ভুলুক।
‘তোমার তো অনেক বুদ্ধি আছে। তুমি তো বিভিন্ন সময় নানা রকমের রূপ ধরতে পার। তুমি মানুষের রূপ ধরো।’ বলল নৃত্যশিল্পী।
‘তুমি ঠিক বলছ।’ এই বলেই ভুলুক খুশিতে নাচতে লাগল। নৃত্যশিল্পীও নাচতে লাগল। নাচতে নাচতে ভুলুক মানুষের রূপ ধারণ করল।
নৃত্যশিল্পী ভুলুকের মানুষ রূপ দেখে অবাক হল।
‘তুমি তো মানুষ হয়েছ। কিন্তু তোমার মুখটা দেখে একটু কেমন কেমন যেন লাগল। আমার মনে হয় কেউ তোমাকে চিনে ফেলতে পারে।’ নৃত্যশিল্পী অবাক হয়ে বলল।
‘কেমন কেমন লাগছে। মুখে কিছু দিতে হবে?’ ভুলুক মুখ নাড়তে নাড়তে বলল।
‘আমি নৃত্য করার আগে সাজি। তোমাকে ফ্রেসলুক দিয়ে সাজাব। ফ্রেসলুক দিয়ে সাজালে কেউ তোমাকে চিনতে পারবে না। আমি আর তুমি ঘুরে ঘুরে দুষ্ট লোকের তালিকা তৈরি করব।’ নৃত্যশিল্পী বলল।
নৃত্যশিল্পীর এমন কথা শুনে ভুলুক খুশিতে নৃত্য করতে লাগল।
‘থাম থাম, তুমি তো দেখছি, আমার চেয়েও ভালো নৃত্য শিখেছ।’
ভুলুক নাচ থামাল।
‘আমার পরিকল্পনা কি জানো?’
‘কী?’
‘আমি ভূতরাজ্যের সবাইকে নৃত্য শেখাব। আমি হব সবার নৃত্যগুরু।’
‘তুমি কি জানো, বাংলাদেশে কাকে নৃত্যগুরু বলা হয়।’
‘আমি কি নৃত্যের মানুষ, এ সব বিষয়ে খোঁজ খবর রাখব। তুমি বলো, আমি শুনি। বিষয়টা আমার জানা থাক। একদিন আমিও ভূতের রাজ্যের নৃত্যগুরু হব।’
‘আচ্ছা বলছি শোনো, বাংলাদেশের নৃত্যগুরু হলেন- লায়লা হাসান।’
‘ও, আচ্ছা। তোমার সাথে কি তার পরিচয় আছে।’
‘আমরা তো একি অঙ্গনের মানুষ। পরিচয় থাকবে না কেন। মজার বিষয় কি জানো, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বিশেষ একটা নাটকে অভিনয় করেছি তার সাথে আমি। নাটকটা নৃত্যবিষয়ক। আমার চরিত্রটাও কিন্তু নৃত্যশিল্পীর।’
‘নাটকটা কোথায় প্রচার হয়েছিল?’
‘বিটিভিতে।’
‘নাটকটা আমি দেখতে চাই। কীভাবে দেখব?’
‘ইউটিউবে সার্চ দিলে পাবে। আমি তোমাকে সার্চ দিয়ে দেখাব।’
‘তাই। তার কাছে একদিন নিয়ে যাবে আমাকে ভুলুক।’
‘ঠিক আছে, তোমাকে নিয়ে যাব।’
ভুলুক আবারও খুশিতে নৃত্য করতে লাগল। পরদিন মুখে ফ্রেসলুক লাগিয়ে বের হলো দুষ্ট লোকের তালিকা করতে। ঢাকা বিভাগের দুষ্ট লোকের তালিকা তৈরি করল। সেই তালিকা দিল বসকে। তালিকা ধরে ধরে তারা শাস্তি দিতে লাগল অপরাধী সবাইকে।

বুক পকেটে একটা জোনাকি পোকা

মাহীব রেজা: বৈশাখের খর দুপুর? খাঁ খাঁ করছে চারপাশ? মহাসড়কের কালো পিচ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সাড়ি সাড়ি যানবাহন? ঐ যে, দূরে মরীচিকা দেখা যাচ্ছে? মনে হয় রাস্তাটা বুঝি বৃষ্টিভেজা? ‘রৌদ্রদাহ’ বলতে ঠিক যেমনটা বোঝায়, ঠিক সেরকম অবস্থা? এমন সময় স্কুল থেকে ফিরছে একটা ছেলে? হাতে ক্যান্টিন থেকে কেনা কোনো এক নামিদামী কোম্পানীর কোল্ড ড্রিংকস্?


একটু বাদেই বেশ দামী একটা কালো কুচকুচে গাড়ি এসে থামল? গাড়ির ড্রাইভার শশব্যস্ত হয়ে ছেলেটার কাঁধ থেকে ব্যাগ নিল, পেছনের সিট’টাতে রাখতেই গাড়ির একটা দরজা খুলে উঠে পড়ল ছেলেটা? ভেতরটা বুঝি বেশ ঠান্ডা—গাড়িতে ঢুকতেই ছেলেটা বেশ স্বস্তি পেল বলে মনে হল? খানিক পরে গাড়ির ভেতর বেশ জোরে গান বাজতে লাগল? একটা সময় মহাসড়ক ধরে সাঁই সাঁই করে এগিয়ে চলল গাড়ি, মিলিয়ে গেল হাজারো গাড়ির ভীড়ে?


দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল পুচকে একটা ছেলে? বয়স কত হবে? এগারো কি বারো বছর? নাম রকি? ওর কাঁধে ব্যাগ নেই? হাতে কোল্ডড্রিংকস্ও নেই? এও একটা গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, তবে, সে তার যাত্রী নয়? আবার, এ গাড়িটা ঐ কালো গাড়ির মত আয়েসি নয়? এর ভেতরটা ফাঁকা, এখানে গান বাজে না? তবে এটারও চার চাকা, স্টেয়ারিংও আছে? যাত্রীদের বসার জন্য আছে ফোম বসানো নরম সিট? মাঝে মাঝে রকির সাধ জাগে, সিটগুলোয় বসে দূরে কোথাও চলে যাবে, কিন্তু শেষমেশ তা হয়ে ওঠে না?


গাড়িটার নাম – ‘লেগুনা’? যাত্রী বহন করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়? জাহাজের যেমন খালাসি থাকে, নৌকার মাঝি, বাসের হেল্পার— তেমনি রকি হচ্ছে এই ‘লেগুনা’র হেল্পার? যিনি এই গাড়িটা চালান, তাকে ‘ওস্তাদ’ বলতে হয়? রকি গাড়ির পেছনের দিকটাতে ঝুলে ঝুলে যায়? ব্যাপারটা বেশ বিপদজনক, কিন্তু রকির এতে কোনো অসুবিধাই হয় না? মাঝে মাঝে গাড়ির গায়ে শক্ত করে থাপ্পড় বসিয়ে সিগন্যাল দেয়? প্রাণবন্ত সে? গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাত্রী ডাকে?


তবে আজ স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে রকি’র খুব অন্যরকম লাগছে? সাদা ধবধবে শার্ট পরে, চুল আচড়ে, কি পরিপাটি হয়ে সবাই স্কুলে এসেছে? সবাই ওর মত? এদের মাঝে নিজেকে খুব বেমানান লাগে? পরনে বিবর্ণ জামা, পকেট-ছেঁড়া প্যান্ট, চুল এলোমেলো? লজ্জায় একেবারে নুইয়ে পড়ে রকি? গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আবার যাত্রী ডাকতে শুরু করে?


সেদিনের সন্ধ্যা? রকি ক্লান্ত দেহে রাস্তার একটা পাশে হেলান দিয়ে বসে আছে? সূর্য ডুবেছে কিছুক্ষণ আগে? লাল আভায় চারদিক ভরে গেছে? যাকে বলে -‘গোধূলি’? রকি’র মনে হাজার রকমের কল্পনা দানা বাঁধছে? স্কুল, কুচকুচে কালো গাড়ি কিংবা বিস্তৃত নদীর বালিময় চরে ‘ঘুড়ি-লাটাই’ নিয়ে ছুটোছুটি–সবকিছু? সব কল্পনা কেন জানি ওলট-পালট  হয়ে জট পাকিয়ে যায়? একটা প্রশ্ন তাকে বারবার জিগ্গাসিত করে তোলে–‘কবে সে ছুটি পাবে!’


আমাদের কালো কুচকুচে গাড়ির গান শোনার ছেলেটাও ছুটির কথা ভাবছে? সামনে গরমের ছুটি? কি মজা হবে? বন্ধুদের নিয়ে ‘মুভি পার্টি’ করা যাবে? একটা সাইকেল রেস হলেও মন্দ হয় না? বিকেলে রেস্টুরেন্টে তো যেতেই হবে? ভাবছে প্রাইভেটগুলো বাদ দিলেও মন্দ হয় না, কিন্তু স্যার-ম্যাডামদের ভরসা নেই, ঠিক বাবা-মা কে সব জানিয়ে দেবে?


তবে রকির ছুটি আলাদা রকমের? ছুটিটা আদৌ তার জন্য আনন্দের হবে কিনা সে জানে না? ছুটিতে বেশ খানিকটা টাকা পাওয়া যাবে? এইবার ব্যবসাটা বেশ জমেছে? ওস্তাদ মনে মনে খুব খুশি? হয়ত বোনাসও দিয়ে দিবে? ভাবতে ভাবতে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারে নি?


পরদিন ঠিক দুপুর বেলায় চুপচুপ করে স্কুলের সামনে চলে এসেছে সে? সে দেখে, আজ অনেক গাড়ি ? সাদা, কালো, লাল, বেগুনি–কত রংয়ের? এর মাঝে ঐ সেদিনের কুচকুচে কালো গাড়িটা সে খুঁজতে থাকে? না, খুঁজে পায় না সে? দেখে ওর বয়সী ছেলেমেয়েরা হাতে কোল্ডড্রিংকস্ নিয়ে গাড়িতে উঠছে? এবার একজন নয়, অনেকে? প্রায় সবকটি গাড়িতেই গান বাজছে? সবকটিই সাঁই সাঁই করে চলছে রাস্তা দিয়ে, মহাসড়ক দিয়ে আর মিলিয়ে যাচ্ছে অনেক গাড়ির ভীড়ে?


লেগুনার স্টেয়ারিং মাঝে মাঝে ধরে রকি? মুখ দিয়ে গুনগুনিয়ে গান করে? ভাবে এইতো গান বাজছে গাড়িতে? জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকলে ভাবে ঠান্ডা হাওয়া, ঠিক ঐ গাড়িগুলোর মত? আর ক’দিন পরে হয়ত মহাসড়ক ধরে সেও তার লেগুনা চালাবে? সাঁই সাঁই করে চালাবে? পার্থক্য শুধু–‘কোনোদিন স্কুলে যাওয়াটা হবে না?’
আজকের সন্ধ্যেটা বেশ গরম? রকি শার্ট খুলে একপাশে রেখে দেয়? আজ গোধূলি নেই? ঘুটঘুটে অন্ধকার? মনে হয় চাঁদ দেরিতে উঠবে? দুটো ডালভাত খেয়ে নিয়েছে রকি? এবার ঘুমিয়ে পরতে হবে? আরেকটা দিন হাতছানি দিয়ে ডাকছে? পরশু ছুটি হবে? রকি বাড়ি যাবে? ছোট্ট ভাইবোন দুটো নিশ্চয়ই বেশ বড় হরয় গেছে?


শার্টটা আবার পরে নেয় রকি? হঠাৎ দেখে বিবর্ণ শার্টের বুকপকেটে জ্বলজ্বলে আলো জ্বালছে একটা জোনাকি? মুচকি হাসে সে? পকেট থেকে বের করে উড়তে যেতে দেয় অজানায়? চেয়ে দেখে চারপাশটা ভরে গেছে অসংখ্য জোনাকির আলোয়? মনে মনে ভাবে, “যা! জোনাকি! তোকে ছুটি দিলাম?” আবার হাসে? কি সব আজগুবি ভাবছে সে, জোনাকি কি ওর মত লেগুনার হেল্পার যে তাকে ছুটি দেওয়া যাবে?
এদিকে মস্ত বড় বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে কুচকুচে কালো গাড়ির ছেলেটা ভাবছে—
”ইশ্! কি সুন্দর জোনাকি! একটা যদি বুকপকেটে পুরতে পারতাম!!”

জান্নাতারার স্কুল

তমসুর হোসেন: জান্নাতারা আজ ডাক্তার আংকেলের কাছে যাবে। বাবার কাছে সে কোনদিন যাবেনা। সেদিন সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। আংকেল তাকে সুস্থ করে তুলেছে। খুব পেট ব্যথা করছিলো তার। ব্যথায় অস্থির হয়েছিলো জান্নাতারা। কোন উপায় না দেখে মা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে।

 

ডাক্তার আংকেল তাকে হাসপাতালের ইনডোরে ভর্তি করে। খুব মনোযোগ দিয়ে ওকে পরীক্ষা করে ডাক্তার আংকেল। তারপর স্যালাইনের সাথে অনো ইনজেক্সন পুশ করেছে তার শরীরে। ঘুমের ইনজেক্সনও দিয়েছে ব্যথার তীব্রতা কমানোর জন্য। খুব জলদি আরাম পেয়েছিলো জান্নাতারা। নেশার মতো গাঢ় ঘুম এসেছিলো তার চোখের গভীরে। ঘুম থেকে যখন সে জেগেছিলো তখন পেটের ব্যথা একটুও ছিলোনা। ব্যথা কমে যাওয়ায় মাকে সে বলেছিলো,
‘মা, চলো বাসায় যাই।’
‘এখন তো বাসায় যাওয়া যাবেনা।’
‘সুস্থ হয়ে গেছি। কেন যাওয়া যাবেনা?’
‘তোমার আংকেল আসুক। উনি যেতে দিলে যাবে।’
‘আংকেল কেন আসেনা?’
‘সময় হলে আসবে।’
‘কখন সময় হবে? আমার যে একটুও ভাল্লাগ্ছে না।’
‘আংকেলের কতো কাজ। কতো রোগী দেখতে হয়!’


বালিশে মুখ গুঁজে চুপ করে শুয়ে থাকে জান্নাতারা। নার্স শরীরের তাপ মেপে গেছে। বিছানার চাদর পাল্টিয়ে ঔষধ দিয়ে গেছে। ওয়ার্ডের সব রোগীরা নাস্তা খাচ্ছে। ওর পেটেও খিদা লেগেছে। কিন্তু ওয়ার্ডবয় নাস্তা দিচ্ছেনা। নার্সকে বেশ কয়েকবার বললো জান্নাতারা,
‘খিদে পেয়েছে। নাস্তা কখন দেবেন আমাকে?’
‘ডাক্তার আসুক। ডাক্তার লিখলে নাস্তা পাবে।’
‘কখন আসবে ডাক্তার?’
‘নয়টা বাজলে আসবে।’
জান্নাতারার মোটেই ভালো লাগছে না। খেতে ইচ্ছে করছে তার। আংকেল এখনও আসছে না। যদি কালকে আংকেল না আসে। অন্য আংকেল যদি খেতে না দেয়। তখন কি করবে জান্নাতারা। মাকে সে বিরক্ত করে। রাতে মা জেগে ছিলো। একটুও ঘুমাতে পারেনি। বাবা আসেনি ওকে দেখতে। বাবার বাড়ির কেউ আসেনি। আর একটা মহিলাকে বিয়ে করেছে বলে বাবাকে ডিভোর্স দিয়েছে মা । কী কালো দেখতে মহিলাটা! একটুও ভালো লাগেনা। ওই বজ্জাত মহিলাকে নিয়ে বাবা কতো ব্যস্ত। ওর অসুখের কথা শুনেও এলোনা বাবা।

 

মা ওকে নিয়ে নানু বাড়িতে চলে গেছে। অনেক দিন হলো নানু বিছানায় শুয়ে থাকে। একটুও উঠতে পারেনা। মামা চাকুরি করে ঢাকায়। নানুর নামে টাকা পাঠিয়ে দেয় মামা। সেই টাকায় খুব কষ্টে নানুর সংসার চলে। তার ওপর মা ওকে নিয়ে নানু বাড়িতে থাকে। ডাক্তার আংকেল ওর অষুধের ব্যবস্থা করেছেন। মায়ের কাছে টাকা নেই। দাদী তাকে কতো ভালবাসত। সে দাদীও দেখতে আসেনি। জান্নাতারা চাদরের নীচে লুকিয়ে চোখের পানি ফেলে। কখন ডাক্তার আংকেল ওর বেডের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি জান্নাতারা। ওকে দেখে আংকেল বলে,
‘এখনও পেট ব্যথা করে?


কথা বলতে সংকোচ লাগে জান্নাতারার। গলায় জড়তা । মাথা নেড়ে না সূচক জবাব দেয় সে।
‘ঠিক আছে। অষুধ লিখে দিচ্ছি। এখন মুখে খেতে পারবে।’
‘আংকেল। আমি বাড়ি যাবো।’
এখন যাওয়া যাবেনা। সুস্থ হলে যাবে।’
‘আমি যাবো।’
‘পাগল মেয়ে! এখানে কি অসুবিধা। তোমার অসুখ তো সারেনি।’
‘সেরেছে। বাড়িতে গিয়ে অষুধ খাবো।’


ওর মাথায় হাত দিয়ে বুঝিয়ে বলে ডাক্তার আংকেল। ব্যথা কমলেও রোগ সারতে অনেক বাকি আছে। বাড়ি চলে গেলে রোগ বেড়ে যেতে পারে। তখন অপারেশন করেও সামাল দেয়া সম্ভব হবেনা। আংকেলের কথা অমান্য করতে পারেনা সে। যদি পেটের ব্যথা আরও বেশি হয়। তখন পেট কেটে ভুড়ি বের করলে খুব কষ্ট পাবে সে। খেলার সাথীদের কথা ভাবে জান্নাতারা। কেউ তাকে দেখতে এলোনা। আতিকা, রুবেল, লাবণী, পুজা, মঈনুল একবারও এলোনা দেখতে । নিশ্চুপ পড়ে থাকে সে। রুগীর লোকদের হট্টগোল চিকিৎসার পরিবেশ নষ্ট করে। মারধরের রোগীরা বিছানা আঁকড়ে থাকে শক্ত কাগজ পাওয়ার আশায়।


জান্নাতারার শরীরে জ্বর দেখা দিলো। তার সাথে ঘন ঘন কাশি ডাক্তারকে ভাবিয়ে তুললো। এত জলদি মুখে মেডিকেশন দেয়া ঠিক হয়নি। ব্লাড টেষ্ট করে টাইফয়েড ধরা পড়লো। এখন চলবে দীর্ঘ চিকিৎসা। হালকা খাবার খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়লো সে। ডাক্তার আংকেল প্রত্যহ দু’বার করে দেখতে লাগলো জান্নাতারাকে। জ্বর নামলো সাত দিন পর। আরও পাঁচ দিন পর ছুটি হলো তার। ডিসচার্জ কাগজ লিখে ডাক্তার আংকেল বললো,
‘বাড়ি যাচ্ছো। আমাকে দেখতে আসবেনা?’
‘আসবো।’
‘কখন আসবে।’
‘অষুধ খাওয়া শেষ হলে আসবো।’
‘সময়মতো অষুধ খেও। আর দুষ্টুমি করবে না।’
‘আংকেল। আমাদের বাসায় আসবে।’


দুদিন পর ডাক্তার আংকেল এলো জান্নাতারাকে দেখতে। হেড টিকেট থেকে ঠিকানা জেনে বাড়ি বের করতে পেরেছে। একটা সুন্দর জামা এনেছে আংকেল। কয়েক রকমের ফল। সাথে অনেক কিছু। এসব দেখে মা খুব আপত্তি করলো। কি দরকার ছিলো এসব নিয়ে আসার। মা আংকেলের জন্য খাবার করতে চাইলো। আংকেল কিছুই খেলো না। জান্নাতারাকে  নিয়ে ওদের ছোট্ট গ্রামখানা ঘুরে দেখলো। ওর ছবি তুললো ডাক্তার আংকেল।
‘এতো ছবি কি করবে ?’
‘যখন তোমাকে মনে পড়বে তখন দেখবো।’
‘আমাকে কেন মনে পড়বে আংকেল?’
‘তুমি আমার হারিয়ে যাওয়া মা। মা দেখতে তোমার মতো ছিলো।’
‘ঠিক বলছো ডাক্তার আংকেল?’
‘মাকে মিথ্যে বলতে পারি।’


বাড়ি ফিরে এসে মায়ের বানানো নাস্তা খেলো আংকেল। মাকে অনেক কথা বললো আংকেল। জান্নাতআরার পড়াশুনার বিষয়ে কথা বললো। মায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করে বললো,
‘শোন নাজমা। তোমার নাম ধরে বলছি।’
‘বলুন ভাইজান। আমি আপনার বোনের মতো। নাম ধরলে খুশি হবো।’
‘জান্নাতের পড়ার ভার আমি নিলাম।’
‘আপনি ওকে সুস্থ করে তুলেছেন। এতেই আমি সন্তষ্ট হয়েছি।’
‘এটা আমার কর্তব্য। মন দিয়ে কাজের কথা শোন।’
‘বলুন ভাইজান। মন দিয়ে শুনছি আমি।’
‘কাল থেকে ওয়ার্ডে আসবে। মাষ্টার রোলে আয়ার কাজ করতে হবে।’
‘জ্বি ভাইজান। আপনি যা বলবেন করবো।’
‘জান্নাতের বয়স কতো হলো?’
‘ছয় বছর হলো। দুই এক মাস বেশিই হতে পারে।’
‘কোথায় পড়াবে ভাবছো?’
‘এখনও ভাবিনি। আপনি বলুন কোথায় পড়বে?’


হাসপাতালের পাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে জান্নাতারার নাম ভর্তি করা হলো। নতুন বই নিয়ে সে প্রতিদিন সকালে স্কুলে যায় মায়ের সাথে। অটো গাড়ির দুলুনিতে পড়া মনে করতে করতে সে পৌঁছে যায় স্কুলের গেটে। টিফিনের সময় তার খোঁজ নিতে আসে ডাক্তার আংকেল। ওর জন্য টিফিন নিয়ে আসেন তিনি। টিফিন খাওয়া হলে গল্প করে চলে যায় ডাক্তার আংকেল। এবার জান্নাতারাকে খুবই পরিশ্রম করতে হবে। ডাক্তার আংকেল বলেছে তাকে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হতেই হবে। ওর এখন একটাই সাধনা। ক্লাশের বইগুলো বুঝে বুঝে মুখস্ত করে ফেলা। ভালো করে না পড়লে মা বলে ডাকবেনা ডাক্তার আংকেল। ওর মনে খুশির ঢেউ নাচে। বাবা যদি তাকে দেখতে না আসে তাতে দুঃখ নেই। দাদী না আসলেও কষ্ট নেই তার। ডাক্তার আংকেল তার মনের সব বেদনা দূর করে দিয়েছে। এই আনন্দে ভরে গেছে তার ছোট্ট মন।

কুটুম পাখি

আহাদ আলী মোল্লা: গো ধরে বসে থাকে সোজি। সে কিচ্ছু খাবে না। এমনকি পানিটুকুও মুখে দেবে না আর। আগে পাখির মাংস সরাও। তারপর খাওয়ার কথা বলো। কাটতি কবুল। যে কথা সেই কাজ সোজির। দুপুর গড়িয়ে যায়। সবারই খিদে পেয়েছে। কিন্তু সোজিকে একা রেখে কিভাবে খাবে। সবাই চিন্তায় পড়ে যায়।

ওর নানু ভাইয়াতো রীতিমতো ঘাবরে যান। চিন্তারই বিষয়। হঠাৎ সোজির ছোট মামা ঢোকেন বাড়িতে। সবাইকে চুপচাপ দেখে কৌতূহল জাগে তার। তিনি প্রশ্ন করেন কী হয়েছে সবার মুড অফ যে? সোজির নানি মুখ খোলেন। সে আর বলিসনে। পাখির মাংস রান্না নিয়ে বাড়িতে তোলপাড় আজ। একটু খুলে বলো কী হয়েছে? জানতে চায় সোজির ছোট মামা।


সোজি ক্লাস ফোরে পড়ে। বার্ষিক পরীক্ষার পর স্কুল ছুটি। এরই মধ্যে বাসায় বেড়াতে আসেন ওর নানা। বায়না ধরে নানা বাড়িতে বেড়াতে যাবে। দু’দিন পরই চলে যায় নানাবাড়ি। চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে গ্রামের নাম বাঘাডাঙ্গা। রাইসা বিল আর ভৈরব নদীর তীর ঘেঁষে গ্রামটি।

বিলের প্রশস্ত স্বচ্ছ জল আর ভৈরবের কূল কূল ¯্রােত খুব মন কাড়ে ওর। সকাল-বিকেল ভৈরবের ধারে গিয়ে খানিক দাঁড়িয়ে থাকে। কত পাখির আনাগোনা। কত রকম ডাক তাদের। বড় মামা এক ভাঁড় রস এনে সোজিকে ডাকে। কই এসো রস খাবে। টাটকা রস।


 এখনই গাছ থেকে খুলে নিয়ে আসলাম। সোজি লেপ মুড়ি দিয়ে বসে বসে একটা ছবি আঁকছিল। গ্রামীণ দৃশ্য। হঠাৎ মামার ডাক শুনে সে বাইরে বেরিয়ে এলো। মামা ওর হাতে এক গেলাস রস দিয়ে বললেন আরেক গেলাস খাবি মা। সোজি বললো নল দিয়ে খাবো। নল কোথায় পাবো? মামা হেসে জবাব দেয়। নানি রান্না ঘর থেকে সাড়া দিয়ে বললেন এই তো নল আমার কাছে।

 

তিনি একটি পাঠকাঠি ভেঙে নল বানিয়ে সোজিকে দিলেন। পাঠকাঠির নল দেখে ফিক করে হেসে ফেললো সে। তাই নিয়ে খুব হাসাহাসি চললো খানিক। পাঠকাঠির নল দিয়ে গেলাসের পুরো রস খেয়ে ফেললো সোজি। কিন্তু শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে সে। সাত সকালে ঠান্ডা রস খেলে একটু এমন হয় বললেন নানা। চল বাজার থেকে ঘুরে আসি।


 নানুর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে সোজি। গ্রামের পাশেই কার্পাসডাঙ্গা বাজার। এখানে এক সময় ইংরেজদের রাজত্ব ছিল। পড়ে আছে ভাঙাচোরা নীলকুঠি। হাঁটতে হাঁটতে দেখান নানু ভাই। সোজি হরেক রকম প্রশ্ন করে। নানু ভাই জবাব দেন। বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে কার্পাসডাঙ্গা বাজার ১০ মিনিটের পর। ছোট বাজার। সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে। আশপাশ গ্রামের সাধারণ মানুষ এখানে কেনাকাটা করে। বাজারে উঠতেই সোজির চোখে পড়লো অনেক পাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন। নানুর সঙ্গে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সোজি। হরেক কিছিমের পাখি।


এসব পাখি এর আগে কোনোদিন দেখেনি সে। কিচির মিচির করে ডাকছে পাখিগুলো। সব পাখির পা দড়ি দিয়ে বাঁধা। ডানা ঝাপটায় উড়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু পারে না। পাখিগুলো বড্ড অসহায়। সোজির খুব মায়া হয়। ওর নানা বড় বড় ঠ্যাংওয়ালা দুটো পাখি কিনে নেন।

এবার বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করেন। সোজি প্রশ্ন করে এ পাখির নাম কী নানু ভাই? ওর নানা নাম বলতে পারেন না। তিনি বলেন যেসব পাখি দেখলাম একটারও নাম জানিনে আমি। তবে এদের নাম অতিথি পাখি। অতিথি পাখি নাম হলো কেন? আবার প্রশ্ন করে সোজি।


 নানু উত্তর দেন? সে অনেক কথা। তাও বলো নানু ভাই। আগ্রহ আর কৌতূহলে ওর মুখটা যেন ফ্যাঁকাসে হয়ে ওঠে। নানু বলেন, শোন তাহলে। এসব পাখি হাজার হাজার মাইল দূরের দেশে থাকে। সেখানে এদের বসবাস। যখন শীতকাল আসে ওদের দেশ বরফে ঢেকে যায়। সেখানে থাকলে বরফে জমে ওরা মারা যাবে। তাই ওদের দেশ ছেড়ে আমাদের দেশে বেড়াতে আসে।

 শীত শেষে আবার ফিরে যায় নিজের দেশে। সামান্য কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে বেড়াতে আসে বলে এদের নাম অতিথি বা কুটুম পাখি। তুই যেসব পাখি দেখলি, এগুলো আমাদের ওই রাইসা বিল থেকে ধরা। ওরা বিলে সারাদিন খেলা করে, রাতে ঘুমায়। তখন শিকারীরা ফাঁদ পেতে ওদের ধরে। পাখির মাংস খুব মজা। আজ তোকে নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াবো বলেই দুটো কিনলাম।


নানুর কথায় খুশি হতে পারে না সোজি। ওর খুব মায়া হয়। কষ্টে দু’চোখ ছলছল করে ওঠে। সে নানুকে প্রশ্ন করে, আচ্ছা নানু ওরাতো আমাদের কুটুম। আমাদের আত্মীয়। ওদেরকে ধরে ধরে জবাই করে খাওয়া কি আত্মীয়দের কাজ? সোজির প্রশ্ন শুনে নানু হো হো করে হেসে ওঠেন।

শান্ত গলায় সোজি জানায়, না নানু ওদেরকে জবাই কোরো না। ছেড়ে দাও। কুটুম পাখির মাংস আমি খাবো না। কিন্তু সোজির কথায় কেউ আমল দেয় না। হেসেই উড়িয়ে দেয় সব কথা। ঝুড়েকুটে রান্না হয় অতিথি পাখি। সোজির বারণ কেউ শোনে না। ওর খুব মন খারাপ।

 সোফায় গো ধরে বসে থাকে সে। কিচ্ছুতেই ওই মাংস খাবে না সে। ছোট মামা সব শুনলেন। বললেন ঠিক। সোজির কথাই ঠিক। কুটুম পাখির মাংস আমিও খাবো না আর কোনো দিন। এখন থেকে আমিও এর বিরোধিতা করবো। প্রতিবাদ করবো। তিনি পুরো মাংস প্রতিবেশী দুই এতিম ভাই-বোনকে দিয়ে এলেন। এরপর ছোট মামা বললেন, আয় সোজি এবার সবাই একসাথে মাছভাত খাই। সোজি ফিক করে হেসে উঠলো।

বোকাদের রাজ্য

অলোক আচার্য্য: অনেক অনেক দিন আগের কথা। পৃথিবীতে একটা অদ্ভত দেশ ছিল। আসলে দেশ না সেই দেশের মানুষ ছিল সবথেকে বেশি অদ্ভুত। সে দেশের সব মানুষই বোকা ছিল। দেশে একটাও চালাক মানুষ ছিল না। কতটা বোকা তা ছিল ধারণার বাইরে।

চাইলেই বাইরের দেশের যে কেউ সে দেশের কোন মানুষকে ঠকিয়ে আসতে পারতো। তাদের বোকামির একটা নমুনা দেই। যদি তাদের নাকে কোন মাছি ঘন্টার পর ঘন্টা বিরক্ত করে তাহলেও মাছিটাকে কেউ মারতে যাবে না। কয়েকবার তাড়ানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু যদি মাছি না যায় তাহলে কাচি দিয়ে নিজের নাকটাই কেটে ফেলবে।


 আর নাক না থাকলে মাছি কোথায় বিরক্ত করবে! এরকম আরও আছে। বোকা হওয়ায় কেউ মিথ্যে কথাও বলত না। বলবে কি? মিথ্যে কিভাবে বলতে হয় তাই তো জানতো না। কেউ কাজ ফাঁকি দিত না। কাজ ফাঁকি দিয়ে যে আরাম করা যায় তাই বুঝতো না। ঘুষের কোন কারবার ছিল না।

 

যার যা পাওনা তা বুঝিয়ে দেওয়া হতো। চুরি ডাকাতি বা কোন জুলুম ছিল না। সেজন্য সেদেশে কোন পুলিশের দরকার হতো না। একজন রাজা অবশ্য ছিল। সপ্তাহে একদিন সবার সাথে হাসি তামাশা করতো। অন্য রাজ্যের খোঁজ খবর নিত। মজার ব্যাপার হলো কোন বাচ্চা লেখাপড়ায় ফাঁকি দিত না।


 সবাই ঠিক সময়ে পড়তে বসতো। তাই কেউ ফেল করতো না। কেউ কাউকে ঠকাতো না। এ নিয়ে অবশ্য তাদের খুব আফসোস ছিল। তারা কেন এত বোকা। একটু চালাক হলে কি এমন ক্ষতি হতো! তারা যে বোকা সেটা তারা নিজেরাও জানতো। তারা চাইতো তাদের যদি একটু বুদ্ধি থাকতো। কিন্তু কিভাবে চালাক হতে হয় তাই তো তারা জানতো না। একদিন তারা সবাই মিলে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলো।


 তাদের যেন সবাইকে চালাক করে দেওয়া হয়। তারা আর বোকা থাকতে চায় না। সৃষ্টিকর্তা সাথে সাথে তাদের প্রার্থনা শুনলেন। সৃষ্টিকর্তার আশির্বাদে তাদের ভেতর চালাক হওয়ার ক্ষমতা এলো। তাদের বুদ্ধিমত্তা বেড়ে গেলো। চালাক হওয়ার সাথে সাথে তাদের হাবভাব পাল্টাতে লাগলো। তাদের চলাফেরা কথাবার্তায় পরিবর্তন এলো। একজন আরেক জনকে ঠকাতে আরম্ভ করল।


 ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করতে লাগলো। দেখতে দেখতে তাদের দেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। অশান্তিতে ভরে গেল দেশ। তারপর সবাই আবার একত্রিত হলো। বুঝতে পারলো চালাক হতে চেয়েই আজ এই বিপদ। তারচেয়ে বোকা থাকা অনেক শান্তি ছিল। তারা আবার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলো যেন তাদের আগের অবস্থা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এবারো সৃষ্টিকর্তা তাদের কথা শুনলেন। তাদের আবারো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিল। বোকাদের রাজ্যে আবারো শান্তি ফিরে এলো।

ডে কেয়ার সেন্টার কর্মজীবী মায়েদের জন্য কতটা নিরাপত্তা দিচ্ছে

করতোয়া ডেস্ক: সরকারি চাকরিজীবী কল্পনা কর রাজধানীর একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে থাকেন। তার ফ্ল্যাটের প্রতিটি কামরায় ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো।স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরিজীবী। বাসায় গৃহকর্মীর কাছে থাকে তাদের ছোট্ট কন্যা রূপন্তি। তাই নিশ্চিন্ত থাকার জন্য এই ব্যবস্থা।সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও সরাসরি সম্প্রচার হয় মায়ের মোবাইল ফোনের পর্দায়।

এভাবেই সন্তানকে নজরে রাখা ও সরকারি দায়িত্ব পালন একসাথে সারেন কল্পনা কর।তার এই ব্যবস্থাটি অভিনব। কিন্তু মূল সমস্যাটি থেকেই যাচ্ছে। তার সন্তানটি বেড়ে উঠছে একজন অপ্রশিক্ষিত গৃহকর্মীর কাছে।কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশেই এবং বাংলাদেশেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মজীবী মায়েরা এ ধরণের পরিস্থিতিতে পড়লে তার সন্তানকে দিবা-যতœ কেন্দ্র বা ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে যাচ্ছেন।


কল্পনা বলছেন, তিনিও চেয়েছিলেন মেয়ের ডে-কেয়ার সেন্টারে দিতে। অনেকগুলোতে ঘুরেও ছিলেন তিনি। কিন্তু কতগুলোর মান নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। কতগুলোর খরচ তার পক্ষে বহন করা সম্ভব না। আর কোন নীতিমালা না থাকায় বেসরকারী ডে-কেয়ার সেন্টারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও তার সন্দেহ দূর হয়নি।
তাই সিসিটিভি পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন তিনি। এভাবে চাকরি চালিয়ে যেতে পারছেন তিনি।কিন্তু জেবিন হক পারেননি। ২০০৫ সালে যখন প্রথম সন্তান আসে তখন ইন্টারনেটের এত বাড়-বাড়ন্ত ছিল না, বেসরকারি ডে-কেয়ারও তেমন একটা ছিল না মিসেস হকের ভাষায়।


ফলে সেই আমলের বিবিএ-এমবিএ পাশ করা মিসেস হক ঢাকার থাই দূতাবাসের লোভনীয় চাকরিটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।আজ তার পরিচয় শুধুই একজন গৃহবধূ।‘নিউক্লিয়াস’ পরিবার ঃ কল্পনা বলছিলেন, তাদের ‘নিউক্লিয়াস’ পরিবার। বাড়িতে মা-বাবা কিংবা শ্বশুর-শাশুড়িকে পান না তারা।

 

ফলে সন্তানের দেখভাল তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।বাংলাদেশে যৌথ পরিবারের ধারণা থাকলেও আস্তে আস্তে সেটা হারিয়ে যাচ্ছে।ঢাকার মত বড় শহরগুলোতে এখন আর যৌথ পরিবার দেখা যায় না বললেই চলে।আর এ কারণে, কর্মজীবী মায়েদের চ্যালেঞ্জও বেড়েছে।ঘরোয়া ব্যবস্থা ঃ এসব মায়ের সমস্যা সমাধান কল্পেই ঢাকাসহ বিভিন্ন সিটি ও বড় বড় জেলা শহরগুলোতে আজকাল অনেক ডে-কেয়ার সেন্টার দেখা যায়।


রাজধানীর একটি ডে-কেয়ার সেন্টার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সেন্টারটি চালান তনিমা ফারহানা। এক রুমে স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি থাকেন।
বাকী রুমগুলো ডে কেয়ার সেন্টার।একেবারে ঘরোয়া ব্যবস্থা। মিসেস ফারহানা বলছিলেন, তিনি ইটালিতে ছিলেন কয়েক বছর। সেখানে একটি প্রি-স্কুলে তিনি চাকরি করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এই ডে কেয়ারটি করেছেন।

এই ডে কেয়ারটিতে শিশুপ্রতি সর্বোচ্চ খরচ সাড়ে সাত হাজার টাকা। নানা রকম প্যাকেজ রয়েছে এদের।সরকারী উদ্যোগ ঃ সরকারী উদ্যোগের মোট ৪৩টি ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে বাংলাদেশে। অধিকাংশই অবশ্য ঢাকায়। এর বাইরে বগুড়াসহ কয়েকটি জেলা শহরে সরকারি ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে।

 

এগুলো পরিচালনা করে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর।একটি রয়েছে অধিদপ্তরের সদর দপ্তরেই।এক কর্মদিবসের দুপুরবেলায় সেখানে গিয়ে দেখা গেল শিশুরা মধ্যাহ্নভোজ শেষে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে।এখানে সরকার থেকেই বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা হয়।


মাসিক খরচ শিশুপ্রতি মোটে ৫০০ টাকা। ধারণ ক্ষমতা ৫০ জন।যদিও সেদিন মোটে ৯টি শিশু এসেছে।
হলিফ্যামিলি হাসপাতালের অফিস সহকারী শারমীন আক্তার তার সন্তানকে এখানে রেখে অফিসে যান প্রতিদিন। তিনি বলছিলেন, এই ডে-কেয়ারটিতে সন্তানকে রাখতে পারেন বলেই চাকরিটি করতে পারছেন তিনি।জানা যাচ্ছে ,সরকারী ৪৩টি ডে কেয়ার সেন্টারের মোট ধারণ ক্ষমতা ২৮শ’র কিছু বেশী।আরো কুড়িটি ডে-কেয়ার রয়েছে পাইপলাইনে।


এগুলোর ধারণ ক্ষমতা হবে ৬শ। মহিলা অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক সাহিন আহমেদ চৌধুরী বলছেন, এতদিন পর্যন্ত সরকারী ডে কেয়ার সেন্টারগুলো শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্য ছিল। এখন উচ্চবিত্তদের জন্য ব্যয়বহুল ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মাণের দিকেও মনযোগী হয়েছেন তারা।

 

সরকারী অফিসে ডে-কেয়ার নেই ঃ বাংলাদেশে গত দুই দশকে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণ। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করছে লক্ষ লক্ষ নারী। সেখানে ঢাকার অভিজাত এলাকার হাতে গোনা বেসরকারী ডে কেয়ার কিংবা সারা বাংলাদেশের জন্য সরকারী উদ্যোগের তিন কিংবা সাড়ে তিন হাজার আসন কতটুকু পর্যাপ্ত?


ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি সংস্থা শিশু এবং মায়েদের নানা অধিকার নিয়ে কাজ করে।
সংস্থাটির পরিচালক খুরশীদ জাহান বলছেন,  প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছে প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক বীমা প্রতিষ্ঠানে ডে কেয়ার সেন্টার নির্মাণের।কিন্তু বাস্তবতা হল বেশীরভাগ সরকারী অফিসেই ডে-কেয়ার সেন্টার নেই।তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানাগুলোর একটি বড় অংশেরই ডে-কেয়ার নেই।


রয়েছে কয়েকটি বহুজাতিক এবং স্থানীয় কিছু নামকরা প্রতিষ্ঠানে।স্টেট অব দ্য আর্ট ঃ ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জিপি হাউজ নামে পরিচিত গ্রামীণ ফোনের প্রধান কার্যালয়টি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন একটি ভবন। এই ভবনটিতেই রয়েছে সুপরিসর একটি ডে কেয়ার সেন্টার। যাকে বলে স্টেট অব দ্য আর্ট। এখানে কার্যক্রম শুরু করার সময় থেকেই ডে কেয়ার সেন্টারটি চালু রয়েছে।


ঢাকার বেসরকারী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক, ব্র্যাক ব্যাংক, টেলিকম প্রতিষ্ঠান রবি ও বাংলা লিংক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানেরও এমন আধুনিক মানের ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকেরও রয়েছে একটি ডে-কেয়ার সেন্টার। সচিবালয়েও একটি পূর্ণাঙ্গ ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে।বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনকে তারা প্রতিনিয়ত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন এজন্য। তবে অগ্রগতি খুব একটা নেই।


এমনকি মিসেস জাহান বলছেন, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যন্ত বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।এদিকে, বেসরকারী উদ্যোগে যেসব ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে উঠছে তাদের জন্যও নেই কোন আইন কিংবা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান।তাই সেগুলো নিয়েও মায়েদের মধ্যে এক ধরণের উদ্বেগ রয়েছে।মহিলা অধিদপ্তর অবশ্য বলছে এ বিষয়ক একটি আইনের খসড়ার কাজ এখন চলছে।

খুকির টিয়া পাখি

মো. মাঈন উদ্দিন:কালবৈশাখী ঝড়ে সেদিন প্রকৃতি লন্ড ভন্ড হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সঙ্গে শীলাবৃষ্টি হওয়ায় প্রাণীকূলও পড়েছিল অস্তিত্ব রক্ষার হুমকিতে। ঝড় থামল বটে কিন্তু তখনো টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল।  খুকি দৌঁড়ে বের হয়ে গেল আম কুঁড়াতে। কিছু দূর এগুতেই সে সামনে মৃত পাখি দেখতে পেল। একটা নয় দুইটা নয়, অনেকগুলো! নিঃপ্রাণ পাখির নিথর দেহ দেখে খুকুর মন ভারাক্রান্ত হলো।

সে আম কুঁড়ানোর কথা একেবারেই ভুলে গেল। দু’পা সামনে এগুতেই তার চোখে পড়ল একটি টিয়া পাখির ফুটফুটে ছাঁনা, মরা পাতার নিচে হামাগুড়ি দিয়ে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। থমকে দাঁড়াল খুকি। তার কৌতুহলী দৃষ্টি ঐ টিয়া ছাঁনার প্রতি। ছাঁনাটি হয়তো তার মা-বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে। হয়তো তার মা-বাবা এই ঝড়ের তান্ডবে প্রাণ হারিয়েছে। খুকিকে দেখে ছোট্ট পাখি প্রাণের ভয়ে পত্র পল্লবে মুখ লুকালো। খুকির মনে পাখিটির প্রতি গভীর মমতা জন্মালো। সে দুই হাতে পাখিটিকে ঝাঁপটে ধরল। অজানা আতঙ্কে পাখি কিচিরমিচির শব্দে চেঁচিয়ে উঠল।

 কিন্তু ডানা ঝাঁপটানোর শক্তি তার গায়ে ছিল না। খুকির আনন্দ যেন আর ধরে না। সে তার পরনের জামা দিয়ে খাখি-ছানার শরীর হতে পানি মুছে দিল। পাখিও যেন খুকির সোহাগ বুঝতে পারল। আদর পেয়ে কিচিরমিচির বন্ধ করল । খুকি বাসায় ফিরে তার বাবা-মাকে হাতের পাখিটি দেখালো। তার বাবা-মা খুব খুশি হলো। তাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘বাহ্ কি চমৎকার পাখি।’

 

তার বাবা বললেন, ‘কিন্তু মা, পাখিটি ছেড়ে দাও। বনের পাখিকে বনেই সুন্দর দেখায়, ঘরে নয়।’ খুকির অভিমানী উত্তর, ‘কখনো না, এটা আমার পাখি। আমার পাখি অসুস্থ। তার সেবা দরকার। এখন ছেড়ে দিলে সে মরে যাবে।’ তার বাবা আর কোন কথা বললেন না। পরের দিন খুকির বাবা তাকে পাখির খাঁচা এনে দিলেন। খুকি প্রতিদিন ছানাকে খাবার দেয়, পানি দেয়, খুকির যতœ পেয়ে পাখিটি অল্প দিনের মধ্যেই নাদুস-নুদুস হয়ে উঠল। তার গায়ের চিকচিকে সবুজ রং সবার মন কাড়ে।

 খুকি পাখিটিকে নাম দিল-টুকু। অপরিচিত কেউ ঘরে ঢুকলেই টুকু কিচিরমিচির শুরু করে দেয়। সে যেন সতর্কবার্তা পাঠায় ঘরের মালিকের কাছে। খুকি জামা পরে ব্যাগ হাতে স্কুলে যাবে আর এমনি টুকুর দম ফাঁটা কিচিরমিচির। খুকি দৌড়ে এসে টুকুর সামনে দাঁড়ায়-স্কুলে যাবে টুকু? টুকু যেন বলতে চায়-হ্যা আমিও তোমার সাথে স্কুলে যেতে চাই। টুকু স্কুল থেকে ফেরার পর টুকুর আবার সেই চেঁচামিচি। খুকি টুকুর অভিমান বুঝতে পেরে বলে-ও রাগ করেছিস, তাই না? এক মিনিট অপেক্ষা কর, তোর খাবার নিয়ে আসছি।

 

খুকি খাবার নিয়ে এলে টুকুর কিচিরমিচির বন্ধ হয়। খুকি বাহির থেকে খেলাধুলা করে ফিরলে টুকু খুকিকে দেখেই গগনবিদারী চেঁচামিচি শুর” করে দেয়। খুকি খাঁচার সামনে এসে চোখ বড় বড় করে বলে, ‘ও, তোর হিংসা হচ্ছে বুঝি? তুই আমার সাথে বাইরে খেলতে যেতে চাস, তাই না? টুকুর নিরবতা যেন বলতে চায়-হ্যাঁ আমি তোমার সাথে খেলতে যেতে চাই। খুকিকে টিয়া পাখির সঙ্গে এমন অন্তরঙ্গ আলাপরত দেখে তার মা-বাবা চোখ টিপে হাসে।


খুকির গায়ে অসহ্য জ্বালাপোড়া নিয়ে জ্বর আসে। একদিন পরই তার গায়ে গুটি বসন্ত দেখা দেয়। গুটি বসন্ত নিয়ে খুকির স্কুলে যাওয়া বন্ধ। আজ দশদিন হয়ে গেল খুকি বাসায় অঘোষিত বন্ধি। বাবা-মা উভয়েই চাকরিজীবী হওয়ায় তারা সারা দিন বাইরে থাকেন। খুকির একমাত্র কথা বলার সঙ্গী টুকু। খুকি এ ক’দিনে বন্ধুত্বের জ্বালা মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করেছে। তার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। খুকি চিন্তা করছে-অল্প ক’দিনে সে ঘরে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে অথচ টুকু দিনের পর দিন একা এই খাঁচায় বন্ধি।

 

কত কষ্টই না তার হচ্ছে। সে বিছানা ছেড়ে টুকুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দু’হাতে খাঁচা আলতো করে ধরে স্থির দৃষ্টিতে টুকুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘টুকু তোর খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না? তুই কিছু না বললেও আমি বুঝতে পাচ্ছি। আমি জানি তোর মা-বাবাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। আজ তোর মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর কথা, অথচ আমি তোকে জোর করে খাঁচায় বন্ধি করে রেখেছি। আমার ভুল হয়ে গেছে রে টুকু।’ পরের দিন সকাল বেলা মা-বাবা অফিসে যাওয়ার আগেই খুকি তাদের ডেকে বলল, ‘টুকুকে ছোট্ট খাঁচায় বন্ধি করে রাখা আমাদের একদমই ঠিক হচ্ছে না। তাই টুকুকে আমি মুক্তি দিতে চাই।


খুকির মা বললেন, ‘খুব ভাল কথা।’ খুুকি টুকুর খাঁচার দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘টুকু, তোকে আজ মুক্ত করে দিলাম। তোর যেখানে খুশি উড়ে যা।’ খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে টুকু ফুরৎ করে উড়ে বাহিরে চলে গেল। খুকি, তার মা-বাবা উৎফুল্ল চিত্তে টুকুর মুক্তভাবে উড়ার দৃশ্য দেখছে। সবাইকে চমকে দিয়ে টুকু উঠানের চারিদিকে চক্কর দিয়ে আবার উড়ে এসে খুকির মাথায় বসল।

 

কিচিরমিচির করতে লাগলো। সে যেন বলতে চাচ্ছে, ‘খুকি ঐ ঝড়ের দিন আমার মা-বাবা মরে গেছে। এই পৃথিবীতে আপনজন বলতে আমার কেউ নেই। সেদিন তুমি আমাকে না বাঁচালে আমি হয়তো মরেই যেতাম। তাই তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তুমিই আমার আপনজন। আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না। খুকির প্রতি টুকুর ভালোবাসা দেখে খুকি বেজায় খুশি হলো। সে অট্টহাসি দিয়ে দৌড়ে তার রুমে চলে গেল। টুকুও উড়ে চলল খুকির পিছন পিছন। এই দৃশ্য দেখে খুুকির মা-বাবা তৃপ্তির
হাসি হাসলেন।

শহীদের দেয়া সেই শার্ট

ফজলে রাব্বী দ্বীন: মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল রাফির। দরজার বাইরে পায়ের টুংটাং শব্দ। এত রাতে আবার ওখানে কে এল? চোর কি হবে? টর্চ হাতে নিয়ে সন্দিহান রাফি এগিয়ে চলল দরজার বাইরে। আস্তে করে দরজাটা খুলতেই অন্ধকারে জ্বোনাক পোকার মত কিছু একটা তার নজর কাড়ল।

 

পোকাটা দেখতে এতটাই সুন্দর যে রাফি আর সহ্য করতে পারল না। দ্রুত সেটাকে ধরার জন্য পোকার পিছন পিছন ছুটতে লাগল। বাঁশবাগানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে প্রায়। এমন সময় কোথা থেকে যেন দাদু এসে হাজির। পিছন থেকেই তার কাধে হাত রাখল যেই, অমনি বুকটা ধুক করে উঠল রাফির।
‘এতরাতে এখানে কি করছ দাদুভাই? জান না জায়গাটা ভালো না?’


‘কেন দাদু, ঘর থেকে উঠোনে আসা বারণ নাকি? আর আমিতো উঠোনের মধ্যেই ঐ জ্বোনাক পোকাটাকে ধরার জন্য দৌড়াদৌড়ি করছি।’
‘উঠোনের মধ্যে মানে? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে দাদুভাই? দেখছ না এটা বাঁশবাগানের তলা। উঠোন ছেড়ে প্রায় পঞ্চাশ হাত দূরে চলে এসেছ। আর কখনই এই মাঝরাতে একা বাইরে বের হবে না। এটা হচ্ছে গ্রাম। তোমাদের মত শহর না। আর কোন কিছুর জন্য দরকার পড়লে আমায় ডাক দিবে। আমি সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিব।

দাদুর কথা শুনে রাফি রীতিমত চমকে উঠে। অনেক দিন পর তার বাবা-মা তাকে গ্রামে আসতে দিয়েছে। পরিক্ষা শেষে মাত্র কয়েকটা দিন ভালোভাবে যেন কাটে সেই প্রত্যাশায়। গ্রামের সবুজ শ্যামল সুন্দর পরিবেশ রাফির হৃদয়টাকে একেবারে সজীব করে তোলে। কিন্তু এইবার গ্রামে এসে কেমন যেন সবকিছুই উলট পালট লাগছে। মাঝরাত্রে কেন যে সে ঘরের বাইরে চলে এসেছিল তা কে জানে!


পরের দিন ঠিক একই সময়। রাত যখন গভীরে গিয়ে পৌঁছে রাফির তখন ঘুম ভেঙ্গে যায়। দরজার বাইরে কারও পায়ের খটখট শব্দ ভেসে আসে কানে। পায়ের শব্দ শুনে রাফি একদমই ঠিক থাকতে পারছে না। তাকে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত সেই শব্দ কাছে টানতে চায়।

 

ইচ্ছে করছে দাদুকে ডাক দিতে। কিন্তু পারছে না কিছুতেই। সটাৎ করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় রাফি। তারপর টর্চ ছাড়াই দরজার বাইরের দিকে হাঁটতে থাকে। আবারও সেই সুন্দর জ্বোনাক পোকাটাকে ধরার নেশায় দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। ধীরে ধীরে পৌঁয়ে যায় সেই বাঁশবাগানের তলায়।

 রাফির হঠাৎ সেন্স ফিরে আসে। চারদিকে লক্ষ করে সে বুঝতে পারে কোথাও হয়ত একটা ভুলের শিকার হতে যাচ্ছে। না হলে কেন সে এই অন্ধকারে একা একাই এখানে আসবে? ভয়ে ঠকঠক করে সারা শরীর কাঁপছে। এমন সময় সেই জ্বোনাক পোকাটার দিকে চোখ গেল রাফির।

 

জ্বোনাক পোকাটা আস্তে আস্তে মানুষে রূপান্তরিত হচ্ছে। ঠান্ডা শীতল রাত্রিতে শরীর বেয়ে ঘাম নামা কি আর নির্ভয়ে কচুশাখ তোলা মানে? রাফির দু’পাটি দাঁত যেন চিরতরে লৌহের দন্ডের মত লেগে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় রূপান্তর হওয়া পূর্ণাঙ্গ একটা মানুষের মুখ থেকে কথা বের হল, ‘ভয় পেও না বন্ধু। আমি তোমার কোনই ক্ষতি করব না। আমার একটা উপকার করার জন্য তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি।


মানুষটার কথা শুনে রাফির চিন্তা কিছুটা দূর হলেও ভয় কমছিল না। কাপা গলায় দু’একটা কথা সেও বলল, ‘কিন্তু আপনি কে? ভূ..ভূ..ভূ…’
‘না, আমি ভূত নই। তবে তোমার মত জ্যান্তও নই। আমি শহীদ হয়েছিলাম সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। নিজের দেশকে বাঁচানোর জন্য স্বাধীনতার লাল পতাকা নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিলাম এইদিক দিয়ে। আর এই এখানেই, এই বাঁশবাগানের তলাতেই আমাকে ঐ ঘাতক নরপিশাচ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা গুলি করে মেরেছিল।

 

আমি শহীদ হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু আমি আমার ছোট্র ছয় বছরের সোনামানিক ছেলেটাকে আর দেখতে পাইনি। দেখার বড্ড শখ ছিল। আমার স্ত্রী জমেলা আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে দিত না। কিন্তু আমি ভাবতাম, আমরা যদি বসে থাকি তাহলে এই দেশটাকে স্বাধীন করবে কে? কিভাবে অর্জিত হবে স্বাধীনতা?


‘এখন আপনার ছেলেটা কোথায়?’ কথার মাঝে টুপ করে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে রাফি। চাঁদের আলোয় সবকিছু দিনের মত পরিষ্কার লাগছে।‘ঐ যে দূরে মাটির যে একটা ঘর দেখতে পাচ্ছ সেখানেই আমার ছোট্ট মানিক অতিকষ্টে বেঁচে আছে। তার দুটা পা নেই। মা-বাবার আদর পায়নি বাকি জীবন। আমার মৃত্যুর খবর শুনে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল আমার স্ত্রী। তারপর আর কোনদিন চোখ খুলে নি। তুমি আমার একটা উপকার করবে বন্ধু?’
‘হ্যাঁ করব, অবশ্যই করব। তার আগে বল আমাকে কি করতে হবে?’


‘তেমন কিছু না। শুধু এই ছোট্ট শার্টটা আমার ছেলেকে দিয়ে আসবে। তার জন্য একাত্তরের সময় বাজার থেকে কিনেছিলাম কিন্তু ঐ নরপিশাচদের জন্য আমার ছেলের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তুমি আমার এই উপকার করলে আমার আত্মাটা বড়ই শান্তি পাবে।রাফির ভয়ে কাপা শরীর এবার কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন দেওয়া একটা মানুষের মুখ থেকে এতগুলো কষ্টের ইতিহাস শুনে কিভাবে ঠিক থাকা যায়? প্রকৃত দেশপ্রেমের চিত্র তো ফুটে উঠে এখানেই। রাফি আর দেরী না করে শহীদ হওয়া মানুষটার কাছ থেকে ছোট্ট সেই শার্টটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়।


 এবার দূরের সেই মাটির ঘরটার দিকে ছুটতে থাকে। পিছন পিছন সেই মানুষটাও হেঁটে চলেছে। ভাঙ্গা দরজাটায় নক করার কোন প্রয়োজন পড়েনা। রাফি সোজাসোজি মাটির সেই ঘরটাতে ঢুকে পড়ে। ঘরের ভিতর ঢুকেই দেখে খুব কষ্টকাতর অবস্থায় একটা গরীব নিঃস্ব লোক বসে আছে। লোকটার চোখে নির্ঘুমের ছাপ। না জানি কত দিন ধরে অনাহারে কাটাচ্ছে বেচারা।

 রাফি চোখের জল আর ধরে রাখতে পারল না যখন পা হারা সেই লোকটার সামনে তারই বাবার দেওয়া ছোট্ট শার্টটা মেলে ধরল। শার্টটা দেখামাত্রই রাফির হাত থেকে খামচি মেরে সেটা বুকের ভিতর জড়িয়ে নিল লোকটা। তারপর হাউমাউ করে ‘বাবা..বাবা..’ বলে অঝরে কাঁদতে লাগল।

রাফির গ্রামে কাটানো দিনগুলো শেষমেষ সুমধুর হয়ে উঠেনি। একজন বীর শহীদের ছেলের জন্য মনটা তার সবসময় কেঁদেছে। সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতেও পেরেছে। পা হারা সেই লোকটাকে নিয়ে নতুন চিন্তার অধ্যায় শুরু করেছে। তাকে আগে শহরে ফিরে যেতে হবে।


 তারপর সংবাদ কর্মীদের মাধ্যমে সারাদেশে এই খবরটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর শহীদের ছেলে হয়েও আজ কেন তাকে পঁচে মরতে হচ্ছে সেই মাটির পরিত্যক্ত ঘরটায়? জবাব চাই, দিতে হবে জবাব। রাফির মনের মধ্যে অনেক অনেক প্রশ্ন। পরদিন গ্রাম ছেড়ে শহরে যাবার সময় একবার সেই মাটির ঘরটার দিকে হাঁটা দিয়েছিল রাফি। গিয়ে দেখে পা হারা সেই লোকটা তার বাবার মতন জ্বোনাক পোকা হয়ে সারা ঘরটাতে আলো ছড়াচ্ছে!

অচেনা শহর

মো. শামীম মিয়া : বাবা ঢাকা শহরে গেছেন, আসবেন সাত দিন পর তা ছোট্ট ইতি জানতো। তবুও মাকে বার বার জিজ্ঞাসা করে মা বাবা ঢাকা থেকে কখন আসবে ? মা ইতির মনের অবস্থা বুঝতে পারে, ইতির মনটা বেশ খারাপ কেননা বাবাই যে ইতির একমাত্র খেলার সাথী । ইতিও যেন বাবার কলিজার এক টুকরো মাংস। অভাব অনটনের সংসার জীবন বাঁচানোর তাগিদে ছুটতে হয় শহরে।

 ঢাকা যাওয়ার সময় বাবা ইতিকে বলে গেছেন বাড়ীতে আসার সময় তোমার জন্য অনেক গুলো খেলনা নিয়ে আসবো। ইতিও ঝটপট বলে দিয়েছে, মাটির হাড়ি পাতিল আনবা, আমি ভাত তরকারী রান্না করবো তুমি আর মা খাবে। বাবা ইতির কপালে একটা চুমা দিয়ে চলে গেলেন ।

রাত হলেই ইতি ছটফট করতো, কান্না করতো, সহজে ঘুমায়না, রোজ রাতে নতুন একটা গল্প বলতেই হবে। মা বেশি গল্প জানতো না, যা জানতো সব বলা শেষ। মা ইতিকে শান্তনা দিতো তোমার বাবা ঢাকা থেকে অনেক অনেক গল্প শিখে আসবে, বাবা না আসা পযন্ত শুধু ঘুমাও আর ঘুমাও।


সাতদিন হয়ে গেছে, বাবা আসবে বলে ইতি এখনো কিছু মুখে দেয়নি। যাকে দেখা পায় তাকেই বলে, আজ আমার বাবা আসবে, আমার জন্য অনেক কিছু আনবে। ইতি বাবার পথও চেয়ে বাড়ীর সামনে বড়ই গাছটার নিচে বসে আছে। অনেকক্ষন হয়ে গেলো বাবা আসছে না ইতি দৌড়ে একবার মার কাছে যায়, আরেক বার গাছটার নিচে আসে। সন্ধ্যা হয়ে এলো তবুও বাবার খোঁজ নেই।

 সন্ধ্যার ঝাঁপসা আলোতে দুর দুরান্তে দুইটা লোককে দেখা যাচ্ছে, ইতি দৌড় দেয় লোক দুটির দিকে। কাছে গিয়ে দেখে হ্যাঁ তার বাবা এবং এক চাচা আসছে। ইতি বাবার কাছে গিয়েই বাবাকে ঝাপটে ধরে আর বলে, বাবা তোমার জন্য সকাল থেকে ঐ বড়ই গাছটার নিচে বসে আছি তুমি আসবে বলে। বাবা ইতিকে কোলে নিয়েই চুমা খেতে লাগলো। হঠাৎ চাচা বললো, কীরে কিভাবে আসলি দেশের যে অবস্থা তোর কোন সমস্যা হয়নি তো ? বাবা বললো, অল্পের জন্য বেঁচে গেছি মিলিটারিদের হাত থেকে।

 ঢাকা শহরের করুন অবস্থা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের যেন সেখানেই সূচনা এককেটা রাত যেন সেখানে ভয়াল কালরাত্রির মত, পোড়া কাঠ আর লাশ জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা একেক দিনের নতুন সূর্য উঠছে। ইতি বাবার মুখের  দিকে তাকিয়ে আছে, আর শুনছে বাবার কথা গুলো।

চাচা বললো, এখানেও তো কম নয়। বাড়ীর কাছে আসা মাত্রই চাচা বাবাকে বললো, পরে কথা হবে এই বলে তিনি চলে গেলেন। আঙ্গিনায় বাবা আসা মাত্রই ইতি বাবার কোল থেকে নেমেই চটের ব্যাগটা খুলতে থাকে আর বলে বাবা আমার জন্য কি কি এনেছো ?

 বাবা বললো, তুমি যা যা চেয়েছো আমি তাই এনেছি মা। ঘরে গিয়ে সব বের করো। ইতি মাথা নাড়িয়ে চলে যায় ঘরে। বাবা ইতির মার কাছে এসে বলে ইতির মা দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে পাকিস্তানী বাহিনী পরিকল্পিত ভাবে গণহত্যা করছে বাঙালিদের ।

আমরা বাঙ্গালীরাও পাকিস্তানীদের উচিত শিক্ষা দিবোই। মা বললো, হ্যাঁ আমিও শুনলাম সেদিন রহমতের কিশোরী বোনটাকে পাকিস্তানীরা ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছে। মার দু-চোখে তখন দু-ফোঁটা পানি টলমল করছিলো। বাবা বললো, ইতির মা পাকিস্তানীরা আমাদের দেশকে তাদের আয়ত্তে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা করছে।

 কিন্তু আমরা জনতা ছাত্র সমাজ পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবোই। ইতির মা আমার বাবা বলতো , মানুষের যত গুলো অনুভুতি আছে তার মধ্যে সুন্দর অনুভুতি হচ্ছে ভালোবাসা। আর এই পৃথিবীতে যত গুলো ভালোবাসা আছে তার মধ্যে তীব্র ভালোবাসা টুকু হতে পারে শুধু মাত্র মাতৃভুমির জন্য। যারা কখনো নিজের মাতৃভূমির জন্য ভালোবাসা টুকু অনুভব করেনি তাদের মতো র্দুভাগা আর কেঊ নেই। ইতির মা আমি সৌভাগ্যবান হতাম যদি যুদ্ধে যেতে পারতাম।

 ইতির মা জানতো বাবা এই কথাই বলবেন, মা বাবার দিকে তাকিয়ে বললো, হ্যাঁ আমি চাই তুমি যুদ্ধে যাও দেশ মাকে রক্ষা করো পাকিস্তানীদের হাত থেকে। রক্ষা করো দেশের লক্ষ লক্ষ মায়ের সম্মান। মার দু-চোখে দু-ফোটা জল চিকচিক করছিলো। মা আরো বললো, ইতির বাবা আমার যদি উপযুক্ত এক মাত্র সন্তান থাকতো তাহলে আমি অনেক আগেই তাকে যুদ্ধে পাঠাতাম।

 বাবা বললো, কিভাবে যুদ্ধে যাবো জানিনা, কার সাথে যাওয়া যায় বলতো ইতির মা ? মা বললো, রহমত না কি যুদ্ধে যাবে। তুমি ওর সাথে কথা বলো। বাবা ঘরে না যেয়ে গেলেন রহমতের বাড়ী। রহমত বাবার মুখে দেশ প্রেম ও অন্তরে দেশের জন্য ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হলেন, এবং বললেন তুমি বাড়ী যাও যে কোন সময় আমরা যুদ্ধে যাবো। বাবা মাথা নাড়িয়ে বললো, ঠিক আছে। এই বলে বাবা  এলেন বাড়িতে। অনেক রাত হয়েছে বাবা ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই দেখেন ইতি চুপটি করে বসে আছে বাবার অপেক্ষায়।

 বাবা বললেন, মা তুমি ঘুমাওনী এখনো ? ইতি বললো, বারে তোমার মুখে গল্প না শুনে কী আমি ঘুমিয়েছি কখনো ? বাবা ইতির কপালে চুমা দিয়ে বললো, ঠিক আছে তাহলে গল্প শোনো। আজ তোমাকে নতুন একটা গল্প বলবো গল্পের নাম অচেনা শহর।

সেখানে তারাই যেতে পারে যাদের কে সৃষ্টির্কতা পছন্দ করে। তবে একদিন সেই দেশের বাসিন্দা আমরা সবাই হবো। যারা এই পৃথিবীতে ভালো কাজ করবে তারা সেখানে বিশালবহুল বাড়িতে থাকবে, কোনকিছুর অভাব থাকবে না। ইতি মনোযোগ সহকারে শুনছে বাবার কথা।

 বাবা বললো, শহরটার চারদিক থাকবে ফুলে ফলে ভরা যার যা মন চাইবে তাই পাবে। পরীর মত উড়তেও পারবে। সেই শহরে সবাই যখন যে যেথায় যেতে চাইবে সেথায় যেতে পারবে। মা পাশের রুম থেকে বললো, ইতির বাবা খেতে এসো সারাদিন তো কিছুই খাওনি ইতিকেও নিয়ে এসো। বাবা মার কথার উত্তর দেওয়ার আগেই শুরু হলো ঠাসঠাস গুলির শব্দ ।

 মা দৌড়ে এলেন এ ঘরে এসে ইতিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন আর বললেন ইতির বাবা গ্রামে হয়তো  মিলিটারি ঢুকে পড়েছে। ঘরের আলোটা নিভে দাও যাতে ওরা মনে করে এখানে কোন মানুষ থাকেনা। বাবা তাই করলেন । প্রায় দশ মিনিট পর দয়জায় কে যেন কড়া নাড়ছে ? ইতির মা ইতিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আছে। বাবা হাতে নিলেন ইয়া বড় একটা লাঠি।

 বাবা রাগি কন্ঠে বললেন কে ? উত্তর এলো মৃদু কন্ঠ আমি রহমত দরজা খোলো। বাবা দরজা খুলে দিলেন, রহমত ঘরে ঢুকে নিজেই দরজা বন্ধ করে বললেন আমাদের কে এখনি যেতে হবে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানীরা। বাবা অনেক আগেই ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে । বাবা করুন মুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

 মা দু-চোখের পানি মুছে বললো, কিছু খেয়ে যাও সারাটা দিন মুখে কিছুই দাওনি ? বাবা কিছু বলার আগেই রহমত বললো, ভাবী আমাদের সাথীরা বটতলায় অপেক্ষা করছে, গ্রামের পশ্চিমে গোলাগুলি হচ্ছে, আমাদের এখনি যেতেই হবে। বাবা আর কোন কথা না বাড়িয়ে তার গায়ের চাদরটা নিলেন, দেখলেন ইতি ঘুমিয়ে গেছে অনেক আগেই, বাবা ইতির কপালে একটা চুমা দিয়ে কাদা কন্ঠে বললেন, ইতির মা ইতিকে দেখে রেখো। মা কথা বলা মাত্রই কেঁদে উঠতেন তাই মাথা নাড়িয়ে বললেন ঠিক আছে। নিজের কষ্ট বুকে রেখে শুধু মা বললেন, নিজের প্রতি খেয়াল রেখো।

 বাবা আর রহমত চলে গেলো, যুদ্ধের উদ্দেশ্যে। মা ঘরের আলো নিভে দিয়ে নিরবে কাঁদছে। এদিকে ইতি ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে ভাঁসছে । ইতি স্বপ্নে এসেছে সেই অচেনা শহরে, ঐ যে দুর দুরান্তে পরীর মতো ডানাসহ বাবাকে দেখা যাচ্ছে, সঙ্গে রহমত চাচাও আছে। ইতি দৌড়ে যায় সেখানে বাবা, বাবা বলে ডাকছে বাবা কেন যেন শুনচ্ছে না। রহমত চাচা, চাচা বলে ডাকলেও শুনচ্ছে না।

 ইতি বাবা এবং চাচাকে ধরতে চায় কিন্তু ধরতে পারেনা। বাবা আর রহমত চাচা এই ফুলের গাছ থেকে অন্য ফলের গাছে যাচ্ছে। সবাই মিলেমিশে উড়ে বেড়াচ্ছে কারো সাথে কারো ঝগড়া নেই। আমাদের দেশের মতো নেই গোলাগুলি। সবার মুখেই হাসি। ইতি ক্লান্ত হয়ে বসে পরে এবং বাবার সাথীদের বলে আমার বাবাকে একটু ডেকে দাওনা কেউ কী আমার কথা শুতে পারছো না ?

 হঠাৎ বাবা চোখের আড়ালে চলে গেলো ইতি বাবাকে আর খুজে পেলো না। হঠাৎ ইতি ঘুমের মধ্যে চিৎকার দিয়ে উঠলো, বাবা আমায় ছেড়ে যেওনা বাবা। মা পাশের রুম থেকে দৌড়ে এসে বললো, কি হয়েছে মা। ইতি চোখ মেলে দেখলো অনেক আগেই সকাল হয়েছে।

ইতি মাকে অচেনা শহরের কথা বললো। মা চোখে পানি আর রাখতে পারলো না, কেন না মা তো বুঝেছে বাবা অচেনা শহর বলতে কোন শহরের কথা বোঝাচ্ছে। মা বুঝে গেছেন তার স্বামী হয়তো শহীদ হয়েছে যদি ইতির স্বপ্ন সত্য হয়। দিনের পর দিন চলে যায় বাবা আর ফিরে আসেনা।

 ইতি আর মা সেই বড়ই গাছের নিচে বসে থাকে বাবার আশায় বাবা আসবে বলে। একদিন এই দেশটা স্বাধীন হলো। সবাই লাল সবুজ পতাকা নিয়ে আনন্দ মিছিল করছে ইতি হাতের ইশারাই, মাকে বললো দেখো মা ঐ দেখো লাল সবুজ পতাকার মধ্যে বাবাকে দেখা যাচ্ছে, বাবা হাসছে। মা বাকশূন্য অবস্থায় লাল সবুজ পতাকার দিকে পাথর চোখে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে ঝরনার মতো পানি ঝড়ছেই।

স্বাধীনতা দিবসে

মোনোয়ার হোসেন:দীপুর কী যে ভাল লাগছে ! স্কুল জুড়ে আজ সাজসাজ রব । সবাই নতুন, ধোপদুরস্ত কাপড় পরে ঘুরছেন। স্কুলের মাঠ পরিস্কার করে ঝকঝকে করা হয়েছে ।  লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, সাদা রঙের কাগজ কেটে সুন্দর করে নকশা তৈরী করে আঠা লাগিয়ে দড়িতে বেঁধে টাঙ্গিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেয়ালে, দরজার সামনে সুন্দর সুন্দর আলপনা আঁকা হচ্ছে । সুমি আপু, নীলা আপুসহ ক্লাস ফাইভের ছেলে-মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে এসব করছে । মৌ ম্যাডাম ঘুরে ঘুরে পুরো বিষয়টা তদারকি করছেন । দীপুর বয়স ছয় বছর । বাড়ির পাশে স্কুল হওয়ায় সকালে ঘুম থেকে উঠে সেও সুমি আপুর সাথে স্কুলে এসেছে । তার মতো আরো অনেকে ভাইয়া , আপুর হাত ধরে স্কুলে এসেছে । সমবয়সি  ছেলেমেয়েদের হাত ধরে দৌড়ে দৌড়ে  ঘুরে ঘুরে এসব দেখছে দীপু ।
দীপুর কী যে ভাল লাগছে !
ইশ ! যদি আমিও কাজ করতে পারতাম !
ঠিক তখনই ডাক পড়ে তার ।
এই দীপু ?
সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে আসে দীপু। জ্বি-সুমিপু ।
ঐ রঙের ডিব্বাটা একটু দে তো আমাকে।
বীরপুরুষের মতো রঙের ডিব্বাটা সুমি আপুকে এগিয়ে দেয় সে ।
আপু ?
বল ।
আজ কী স্কুলের বিয়ে ?
কয়েকদিন আগে মৌরি আপুর বিয়েতে গিয়েছিল দীপু। মৌরি আপুর বিয়েতে এরকম রঙ বেরঙের কাগজ দিয়ে বাড়ি সাজানো হয়েছিল । সে থেকে দীপু জানে বিয়ের বাড়ি রঙিন কাগজ দিয়ে সাজাতে হয় ।
দীপুর কথা শুনে হেসে উঠে সুুমি । কেনো রে ?
মৌরি আপুর বিয়ে বাড়ির মতো স্কুল সাজাচ্ছ যে!
আরে বোকা, স্কুলের আবার কখনো বিয়ে হয় নাকি ?
তাহলে স্কুল সাজাচ্ছো কেনো ?
আজ ২৬ মার্চ। আমাদের স্বাধীনতা দিবস । বুঝলে ?
কি হয় দিবসে ?
একটা শয়তান দেশ ছিল । নাম পাকিস্তান । ১৯৭১ সালে তারা আমাদের উপর আকস্মিক আক্রমন করে । আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করি । এইদিন থেকেই যুদ্ধের শুরু হয়েছিল। তাই আনন্দে প্রতি বছর এই দিন আমরা স্বাধীনতা দিবস পালন করি । এই দিবসে আনন্দ করি । স্কুলে স্কুলে খেলাধুলা করি । আমরাও আজ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আমাদের স্কুলে খেলাধুলা করব । তাই স্কুল সাজাচ্ছি।
তাহলে আমিও ক্রিকেট খেলব ।
দীপুর কথা শুনে আবারো হেসে উঠে সুমি। হাসতে হাসতে বলল, আচ্ছা ,আচ্ছা, খেলিস ।
সুমির কথার অর্থ দীপু কী বুঝল কে জানে !
মাথা নেড়ে বলল, আইচ্ছা ।

পূজার পড়ালেখা

রণজিৎ সরকার: পূজার ভোরে ঘুম থেকে উঠল। হাতমুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসল। ক্লাসের পড়া পড়তে লাগল। একটু পর মা সকালের নাস্তা নিয়ে এলেন। নাস্তা খাওয়া শেষ করে স্কুলড্রেস পরল পূজা। তারপর স্কুলে যাওয়ার জন্য মায়ের সঙ্গে বাসা থেকে বের হলো ও। বাসষ্ট্যান্ডে স্কুলবাস আসে। বাসা থেকে বাসষ্ট্যান্ড একটু দূরে। হেঁটেই আসা যায়। স্কুলবাসে করে নিয়মিত স্কুলে যায় পূজা। বাসা থেকে বাসষ্ট্যান্ডে আসার পথে সেলুন, চায়ের দোকান, হোটেলের কাজ করে এমন ছেলেমেয়েরা স্কুলড্রেস পরা পূজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এ বিষয়টা পূজা ও পূজার মা লক্ষ করে। একদিন ওদের দিকে তাকিয়ে পূজা বলল, ‘আচ্ছা মা, আমি প্রতিদিন স্কুলে আসা-যাওয়া করি। ওরা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কেন? ওরা কি আমার সাথে স্কুলে যেতে চায়?’

মা বুঝতে পারেন। এই শিশুরা কেন পূজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। পূজার মতো স্কুলড্রেস পরে স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে হয়তো ওদের। তাই তাকিয়ে থাকে। কিন্তু ওরা কি করে স্কুলে যাবে। ওরা কাজ করে অন্যের দোকানে। পূজা মায়ের ডান হাত ধরে আছে। মা কোন উত্তর দিচ্ছেন না। তাই পূজা মায়ের হাত ধরে জোরে টান দিয়ে বলল, ‘ও মা, মা, তুমি বলছ না কেন? ওরা কি আমার মতো স্কুলে যেতে চায়?’

মা পূজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তোমার মতো ওরাও স্কুলে যেতে চায়। সেজন্যই হয়তো তোমার স্কুলব্যাগের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।’
পূজা বলল, ‘মা, আমি তো নিয়মিত স্কুলে যাই। কিন্তু ওরা স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে আমার স্কুলে যাওয়া দেখে কেন?’
মা দাঁড়িয়ে আশপাশে দোকানগুলো পূজাকে দেখিয়ে বলল, ‘ওরা তো এই দোকানগুলোতে কাজ করে। তাই তোমার মতো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয় না ওদের।’
পূজা বলল, ‘আচ্ছা মা, তুমি তো একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। মানুষ গড়ার কারিগর। তুমি ওদের জন্য পড়ালেখার সুযোগ করে দিতে পারবে না?’
পূজার কথা শুনে স্কুল শিক্ষিকা মা ভাবনায় পড়ে গেলেন। বিষয়টা নিয়ে এভাবে আগে কখনো ভাবেননি তিনি। আজ পূজার কথা শুনে ভাবতে বাধ্য হলেন। পূজা আবার বলল, ‘মা তুমি কিছু ভাবছ?’
‘ওদের নিয়ে ভাবছি, দেখি কিছু করা যায় কি না।’
মা মেয়ে আবার হাঁটতে লাগল। বাসষ্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল। স্কুলবাস এল। পূজা বাসে উঠে গেল স্কুলে। পূজার মা ভাবছে- বাসষ্ট্যান্ডের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলব। দুইটা ছেলেকে পেলেন। বয়স আট কি দশ বছর হবে। একজন সেলুন শ্রমিক রায়হান ও অন্যজন লেদযন্ত্রের শ্রমিক সুমন। ওদের বলল, ‘আচ্ছা, তোমাদের প্রায়ই দেখি আমি যখন মেয়েকে নিয়ে যাই। তখন তোমার পূজার স্কুলব্যাগের দিকে তাকিয়ে থাক। কিন্তু কেন তাকিয়ে থাক? আমাকে একটু বলবে?’
রায়হান বলল, ‘আপনার মেয়ে মতন ইস্কুলে যেতে মন চায়। পড়ালেহা করতে ইচ্ছা করে। আমরা পড়ালেহা শিখুম। আপনি শিখাবেন পড়ালেহা?’
সুমন বলল, ‘আমিও পড়ালেহা শিখাতে চাই।’ পূজার মা বললেন, ‘তোমরা কি সত্যি সত্যি পড়ালেখা করবে?’
ওরা দুজন একসঙ্গে বলল, ‘আমরা পড়ালেহা করার সুযোগ চাই।’


ওদের পড়ালেখার আগ্রহ দেখে পূজার মা বললেন, ‘আমি তোমাদের পড়ালেখার সুযোগ করে দেবো। আমার কাছে পড়ালেখা করবে। সময় করে বাসায় ডাকব তোমাদের।’  
ওরা পড়ালেখা শিখতে পরবে বলে খুশিতে হাততালি দিল। পূজার মা বললেন, ‘তোমরা প্রস্তুত থাক। কয়েক দিনের মধ্যেই ডাকব। তোমরা কাজের ফাঁকে এসে পড়ালেখা শিখবে। পারবে না আসতে?’‘অবশ্যই পারব আফা। আপনি যেদিন ডাকবেন আমরা যামু।’


পূজার মা ওদের বিস্কুট কিনে দিলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার ভালো থাক, আজ যাই। পরে আবার দেখা হবে।’  এই বলে পূজার মা বাসার দিকে যেতে যেতে ভাবতে লাগলেনÑ ওদের তো কথা দিলাম। কিন্তু কখন ওদের পড়ালেখা শিখাব। যাক, স্কুল শেষ করে বিকেল থেকে পড়াব। নানা কিছু ভাবতে ভাবেতে বাসায় পৌঁছে গেলেন মা।
পূজা স্কুলে পৌঁচ্ছে ক্লাসরুমে ঢুকে বেঞ্চে ব্যাগ রাখল। ক্লাসে উপস্থিত বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন রকমের গল্প করতে লাগল। অ্যাসেম্বলির জন্য ঘণ্টার ঢং ঢং ঢং শব্দ হলো। সবাই গিয়ে শহীদ মিনারের সামনে জাতীয় সংগীত গাইতে লাগল। একটু পর ক্লাস শুরু হলো। ক্লাস শেষে স্কুল ছুটি হলো। স্কুলবাসে উঠল পূজা। বাসষ্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়ে আছেন মা। বাস থেকে নেমে পূজা মায়ের হাত ধরল। তারপর পূজা বলল, ‘মা তুমি কি এদের নিয়ে কিছু ভেবেছ?’
‘ভেবেছি।’
‘কি ভেবেছ মা?’
‘প্রথমে দুই জনকে নিয়ে লেখাপড়া শুরু করব। তারপর ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়াব। আর এই দুই জনের মাধ্যমে অন্যেদের নিয়ে আসাব। ওদের দেখে অন্যরা উৎসাহ পাবে।’
‘ভালো পরিকল্পনা করেছ মা।’‘সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে পারলে দেশের লাভ। আমারও লাভ। এদের মাঝে পাঠদান করতে পারলে নিজেকে নিজের কাছে ধন্য মনে করব।’
মায়ের কথা শুনে মুচকি হাসি দিয়ে পূজা বলল, ‘আমিও তোমার মতো মাকে নিয়ে গর্ববোধ করব।’
মা হেসে ফেলেন। মা মেয়ে বাসার দিকে হেঁটে গেল। কয়েকদিন পর রায়হান আর সুমনকে নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করল। তারপর ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে গেল। তখন সুবিধাবঞ্চিত ও কর্মজীবী শিশুদের নিয়ে শিশুকল্যাণ স্কুল নাম দিয়ে শিক্ষাকার্যক্রম ভালোভাবে শুরু করল বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত। শিশুকল্যাণ স্কুলের জন্য এত এলাকায় পূজার মায়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। শিক্ষকতার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত ও কর্মজীবী শিশুদের নিয়ে কাজ করার জন্য পূজার মায়ের প্রতি সবার সুদৃষ্টি পড়ল। পূজার মা পুরো উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হলেন। এবং জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ নারী শিক্ষক হিসেবে পুরস্কার পেলেন। তিনি পুরস্কার পেয়ে উৎসাহিত হয়ে আরও মনোযোগ দিলেন শিশুকল্যাণ স্কুলের প্রতি। খুব ভালোভাবেই চলছে শিশুকল্যাণ স্কুলের কার্যক্রম। মায়ের সাফল্যে ও কার্যক্রমে সব সময় গর্ববোধ করে পূজা। ভালোভাবে পড়ালেখা করে দেশ ও দশের জন্য ভালো কিছু করবে এমনটাই স্বপ্ন দেখছে পূজা।

পরীর দেশে

মোস্তফা কামাল গাজী: আফনান আজ খুব খুশি। শীতকালীন ছুটি হয়েছে। দীর্ঘ পনেরো দিন স্কুল বন্ধ। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে ও। মা বলেছেন, আজকে ওরা সবাই নানুবাড়ি যাবে। ছুটি পেয়ে আনন্দে একরকম লাফাতে লাফাতে বাড়ি পৌঁছুলো।  মায়ের গলায় ঝুলে জিজ্ঞেস করলো, ‘আম্মু, আমরা কখন নানু বাড়ি যাচ্ছি?’
‘এইতো বাবা! বিকেলেই রওনা হবো। তুমি গোসল করে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।’ আফনান দৌঁড়ে যায় দাদুর কাছে।
‘দাদু, আমরা নানুবাড়ি যাচ্ছি। তুমি যাবে না আমাদের সাথে?’

 
‘না দাদুভাই, আমি যেতে পারছি না। হাঁটুতে ব্যথা। ভালোভাবে হাঁটতে পারি না। তোমরাই যাও।’ আফনান কিছু না বলে গোসল করতে চলে গেলো।
বিকেলে রওনা হলো ওরা। বাগেরহাট জেলায় আফনানদের নানাবাড়ি। এবার শীতে সব খালা আর মামারা আসছেন। সাথে যাচ্ছেন আব্বু-আম্মু আর আপু। খুব খুশি লাগছে ওর। দীর্ঘদিন পর নানা-নানীর সাথে দেখা হবে। মামাত ভাই চিন্টু ঝন্টুরা আসবে। ওদের সাথে খেলাধূলা হবে। কত্তো মজাই না হবে! এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে নানুবাড়ি পৌঁছে গেলো টেরই পেলো না। নানু এসে কোলে তুলে চুমু দিলেন গালে। কেউ চুমু দিলে আফনানের বিরক্ত লাগে। একদলা থুথু দিয়ে গাল ভরে যায়। ঘিন ঘিন লাগে। অন্যকেউ চুমু দিলে চিৎকার চেঁচামেঁচি শুরু করে দিতো। নানু বলে কিছু বললো না।

একহাত দিয়ে শুধু মুছে নিলো গালটা। চিন্টু ঝন্টু আগেই চলে এসেছিলো। ওদের সাথে হৈ হুল্লোড় করেই কাটছে সময়। সন্ধ্যায় নানু পিঠা বানালেন খেজুর রস দিয়ে। সে কী মজা খেজুর রসে! টাটকা রস না খেলে আসল মজাটা পাওয়া যাবে না। পারুলদের ডোবার পাশে একটা খেজুর গাছ আছে। কাল আসার পথে দেখেছিলো। তাতে একটা রসের হাঁড়িও ঝুলছিলো। মনে মনে ঠিক করলো কাল সকালে রস খাওয়ার অভিযানে নামতে হবে। কাউকে জানালো না এ কথা। চিন্টু ঝন্টুকেও না। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে পড়লো রস খাওয়ার জন্যে। খুব শীত পড়েছে আজ। হুহু করে শীতল বাতাস বইছে। ঠা ায় শরীর জমে যায় যায় অবস্থা। গছের কাছে গিয়ে দেখে গাছে হাঁড়িটা নেই। নিশ্চয় করিম নানা এতোক্ষণে নিয়ে গেছেন ওটা। মনটা খারাপ হয়ে গেলো ওর। তখন দেখলো, গাছের মাথায় লাগানো বাঁশের চোঙ দিয়ে টপটপ করে রস ঝরে পড়ছে এখনো। হাঁড়ির রস খেতে না পারলে কী হবে? ঝরে পড়া রস তো খেতে পারে!

 জিহ্বা দিয়ে রস ছোঁয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো। খেজুর গাছটা ডোবার দিকে খানিকটা বাঁকানো। রসের ফোঁটা মৃদু বাতাসে এদিক ওদিক করছিলো। রসের সাথে মুখটাও এদিক ওদিক করতে গিয়ে ঝুপ করে ডোবার জলে পড়ে গেলো আফনান। পঁচা, নোংরা পানি। তার ওপর তীব্র শীত। বাড়িতে গেলে আম্মুর বকুনি আর পিটুনি তো আছেই। সব মিলিয়ে করুণ এক অবস্থা। শীতে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি এলো। ভয়ে কাঁচুমাচু করছে। ওর এ অবস্থা দেখে তো চোখ ছানাবড়া মায়ের। আচ্ছামতো কয়েক ঘা লাগিয়ে দিলেন। রান্নাঘর থেকে নানু এসে ছাড়িয়ে নিয়ে গেলেন। না হলে হয়তো আরো খেতে হতো। সারাদিন গোমরা মুখে বসে রইলো। কারো সাথে কোনো কথা বললো না।
নানুবাড়ির পাশে একটা বড় মাঠ। বিকেলে ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা করে এখানে।

মাঠ পেরুলেই একটা জঙ্গল। সেখানে আছে  বিরাট এক আমগাছ। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের দিকটায় গেলো গেলো ও। আমগাছে লটকানো একটা দোলনায় বসে রইলো। আশেপাশে কেউ নেই। অন্যসময় বড় মাঠটায় ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা করতো। আজ সব কেমন ফাঁকা। সকালের ঘটনায় মনটা এখনো ওর খারাপ। মা শুধু শুধুই মারলো। শীতে এ অবস্থা দেখে কোথায় আদর করে ওকে পরিষ্কার করে দেবে, তা না করে অকারণে মারলো। আর কক্ষনও কথা বলবো না মায়ের সাথে। মনে মনে এসব ভাবতে থাকলো। হঠাৎ কোত্থেকে যেনো একটা মেয়ের মিষ্টি হাসি ভেসে এলো কানে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখলো না।


‘আমি তোমার পেছনে।’ কে যেনো বললো হঠাৎ। পেছন ফিরে দেখে একটা ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে দুটো ডানা। হাতে যাদুর লাঠির মতো কিছু একটা। মিটমিট হাসছে মেয়েটা। আফনান জিগ্গেস করলো, ‘কে তুমি?’
‘আমি পরী। দূর দেশে থাকি। আমার নাম সাবিহা। তুমি এখানে এমন গোমরা মুখে বসে আছো কেনো?’
বিস্ময় ধরে রাখতে পারছে না আফনান। একটা পরী ওর সাথে কথা বলছে! বইতে পরীর গল্প পড়েছে। আজ প্রথম পরী দেখলো।
আফনান বললো, ‘আম্মু আজ আমাকে খুব মেরেছে, বকেছে। তাই মন খারাপ।’
কথায় কথায় সাবিহার সাথে খুব ভাব হয়ে গেলো আফনানের।
আফনান বললো, ‘আমি শুনেছি, তোমাদের দেশ অনেক সুন্দর।’
‘ওমা, তুমি আমাদের দেশের কথা কার কাছ থেকে শুনলে?’
   ‘নানু বলেছেন’
‘ঠিক বলেছেন উনি। আমাদের দেশ খুব সুন্দর। ফুল আর পাখিদের মেলা বসে সেখানে। প্রজাপতিরা ডানা মেলে উড়ে। ঝর্ণা আছে, মেঘের ভেলা আছে। আমরা মেঘের ভেলায় চড়ে খেলাধূলা করি। তুমি যাবে আমাদের দেশে? আব্বু-আম্মু তোমাকে পয়ে খুব খুশি হবেন।’আফনান খানিকটা ভেবে বললো, ‘যাবো। আম্মু আমাকে শুধু মারে আর বকা দেয়। তাই চলে যাওয়াই ভালো। আমাকে নিয়ে চলো তোমাদের রাজ্যে। আর আসবো কখনো ফিরে।”তাহলে চোখ বন্ধ করে আমার হাত ধরো। যতোক্ষণ না বলবো চোখ খুলবে না।’ আফনান তাই করলো। ওর মনে হলো বাতাসের ওপর উড়ছে। একটু পর সাবিহা বললো, ‘এবার চোখ খুলো।’


চোখ খুলে চোখের সামনে শুধু বিস্ময় দেখতে পেলো আফনান। কতোই না সুন্দর পরীর দেশ! চারদিকে ফুলের বাগান। ফুলে ফুলে উড়ছে প্রজাপতিরা। গাছগুলো জ্বলছে। যেনো ওতে বাতি লাগানো রয়েছে। মাথার ওপর ভাসছে মেঘেরা। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে একটা ঘরের সামনে এসে থামলো ওরা। সাবিহা বললো, ‘এটাই আমাদের বাড়ি।’ আফনান মনে মনে ভাবলো, এটা আবার কেমন বাড়ি! ব্যাঙের ছাতার মতো ওপরটা। চারপাশে সোনালী পাথর দিয়ে ঘেরা। ঢুকার জন্য বিচিত্র একটা দরোজা। দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত একটা আওয়াজ দিলো সাবিহা।

সাথে সাথে দরজা খুলে গেলো। ঘরে গিয়ে দেখা হলো সাবিহার আব্বু-আম্মুর সাথে। ওকে খুব আদর করলেন তারা। বললেন, ‘বাবা, তুমি এখানেই থাকবে আমাদের সাথে, কেমন?’ একদিকে মাথা কাত করে আফনান বললো, ‘আচ্ছা।’ নাম না জানা অনেক রকমের খাবার খাওয়ালেন তারা। এরপর খেলতে বের হলো ওরা। অনেকক্ষণ পাখি আর প্রজাপতিদের সাথে আনন্দে মেতে ছিলো। মেঘের ভেলায় চড়লো। সন্ধ্যা নামতেই আম্মুর কথা মনে হতে লাগলো আফনানের। মা নিশ্চয় এতোক্ষণ ওকে না পেয়ে চিন্তা করছেন,কান্নাকাটি করছেন। মূহুর্তেই মন খারাপ হয়ে গেলো ওর। কান্নাও পাচ্ছে। মায়ের কোলে ফিরার জন্যে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠলো। সাবিহাকে বললো, ‘আমাকে আম্মুর কাছে দিয়ে এসো। আমি আর থাকতে চাই না এখানে।’
‘সে কী! তুমি না বলেছিলে এখানে থেকে যাবে? আর কখনো যাবে না।’
আফনান কেঁদেই দিলো। বললো, ‘আমি থাকতে চাই না। আমাকে মায়ের কাছে দিয়ে এসো…..।’
‘এই আফনান, ঘুমের ভেতর কাঁদছো কেনো তুমি? কী হয়েছে বাবা?’
মায়ের ডাকে জেগে উঠলো ও। এতোক্ষণ তাহলে স্বপ্ন দেখছিলো। উঠে মা’কে জড়িয়ে ধরলো। মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগলো আর বলতে লাগলো, ‘উঁ উঁ মা,  তোমাকে খুউব ভালোবাসি। আর কখনো তোমায় ছেড়ে যাবো না।’
মা ওকে পরম আদরে জড়িয়ে নিলেন।

বইমেলায় রুবাইদা গুলশানের ‘বিভ্রমে নীলাম্বরী’

অমর একুশে বইমেলায় কবি ও কথাশিল্পী রুবাইদা গুলশানের প্রথম কবিতার বই ‘বিভ্রমে নীলাম্বরী’ প্রকাশিত হয়েছে। বনভূমির ঝরে যাওয়া পাতা, পাখি, ফুল, সোনালি দিগন্ত, সূর্যাস্তের রক্তিম লালিমার সাথে জমে ওঠা গল্প-কথার ৭৬টি কবিতা নিয়ে সাজানো বইটি প্রকাশ করেছে মূর্ধণ্য প্রকাশনী।
 
‘বিভ্রমে নীলাম্বরী’ সম্পর্কে রুবাইদা গুলশান বলেন, “হাসির প্রলেপে ঢাকা পড়া কষ্টগুলো যেন রঙধনুর সাত রঙ, কষ্টের এক এক রঙে ব্যথাগুলো ঝরে পড়ে টুপটাপ শব্দ করে নীলাম্বরী’র হৃদয়াকাশে। এলোমেলো আকাশে কখনো ভাসে মনোরম মেঘ, কখনো সাদা আর নীলের মিষ্টি লুকোচুরি, কখনো কালো মেঘের ঘনঘটায় আকীর্ণ হঠাৎ বৃষ্টি হয়ে মিশে যায় মাটির উঠোনে। অতঃপর গল্প জমে ওঠে বনভূমির ঝরে যাওয়া পাতা, পাখি, ফুল, সোনালি দিগন্ত, সূর্যাস্তের রক্তিম লালিমার সাথে। কখনো সে গল্প বোবাকান্নার মতো। বিভ্রমের বেড়াজালে ছাপিয়ে ওঠা আনন্দের ঝরনাধারা হয়ে গোপনে সুর আসে ভেসে আলো আঁধারে মিশে অনুভবের আঙিনা জুড়ে, ‘বিভ্রমে নীলাম্বরী’।”
 
বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। বইমেলার ৬৩৮-৬৩৯ নং স্টলে পাওয়া যাবে ‘বিভ্রমে নীলাম্বরী’।
 
রুবাইদা গুলশানের জন্ম ঠাকুরগাঁওয়ে। পৈতৃক নিবাস যশোর। বাবা আতাউর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি কোম্পানি কমান্ডার এবং মহান মুক্তিযোদ্ধা। মা সালেহা রহমান গৃহিণী।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগ হতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রুবাইদা গুলশান। স্বামী গোলাম সরোয়ার একজন চিকিৎসক।
 
অমর একুশে বইমেলা ২০১৬-তে রুবাইদা গুলশানের উপন্যাস ‘অন্তরালে বর্ণফুল’ প্রকাশিত হয়।

 

কাঠ বিড়ালী ও বিড়াল

,কুদ্দুস ইশায়ী ,কাঠ বিড়ালী ও বিড়ালের শত্রুতা অনেক দিনের। কাঠবিড়ালী তার একটা নিজেস¦ এরিয়ার মধ্যে চলাফেরা করে। গাছে গাছে পেয়ারা, আম, বাতাবী নেবু খায়। মাটিতে নেমে এসে চলাফেরা করে। কোন মানুষ তাকে ধরার চেষ্টা করলে দৌড়ে গিয়ে গাছে চরে। কাঠবিড়ালী ধরা খুব কষ্টকর। তবু যে ধরা পরে না তা নয়, ধরা পরে। শিকারীরা পারে না এমন কাজ পৃথিবীতে নাই। কাঠবিড়ালী যে পোষ মানে না তাও না, পোষ মানে। শিকারীদের একটা ধারনা বনে পশু যত শক্তিশালী হোক তাকে পোষ মানানো যাবে।

 বনের পশুদের যদি শারিরীক কোন নির্যাতন না করে বন্দি রেখে তাদের খাবার দাবার ভরণ পোষন ঠিক মত করা যায় একদিন পোষ মানতে দ্বিধা করবে না। তখন যদি খাঁচা খোলাও থাকে সে তার মনিবকে ফাঁকি দিবে না। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এই ধারনা সম্পুর্ণ ভুল। মানুষকে কখনও পোষ মানানো যায় না। উপকার করলে ক্ষতি করার চেষ্টা করে। সুনাম করলে দুর্নাম করার চেষ্টা করে। কাছে টানলে আঘাত করার চেষ্টা করে। কাঠবিড়ালী এক মনিবের খাঁচায় অনেক দিন ধরে বন্ধি আছে। মনিব কাঠবিড়ালীকে খুব ভালবাসে। গাছের পাকা পেঁপে, পাঁকা কলা, পেয়ারা, বাতাবী নেবু সব এনে দেয়। সেগুলো কাঠবিড়ালী মজা করে খায়। এই মনিবের বাড়ি আরো আছে পোষা বিড়াল, পোষা কুকুর।

 পাখিদের মধ্যে আছে ময়না, টিয়া, কবুতর ও কোয়েল পাখি। আলাদা একটা ঘর আছে। সেই ঘরে এই শিকার করা বন্য পশুপাখি লালন পালন করে। বিড়ালের একটাই রাগ কুকুর তাকে দেখতে দৌড়িয়ে যায় কামড়াতে। বাড়ির মনিব তার কোন খোঁজ রাখে না। কাঠ বিড়ালীকে বাজার থেকে ভাল ভাল খাবার এনে দেয়। তাহলে কি তার এই বাড়িতে থাকা আদৌ ঠিক হচ্ছে। হচ্ছে না। মনিব এক চোখে লবন দেখে অন্য চোখে মিষ্টি দেখে। বিড়াল রেগে বাড়ি থেকে চলে যায়। সিদ্ধান্ত নেয় সে আর এ বাড়িতে কোনদিন আসবে না। যদি মনিব তার চরিত্র ঠিক করে এক নীতিতে সবাইকে দেখে সেদিন আসবে। বিড়াল মনের রাগে এক বিধবার বাড়িতে আসে। বিধবার দুই কুলে কোন আপনজন নাই। বিড়ালকে দেখে তার মায়া জাগে।

 কাছে ডেকে, গায়ে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো তুই আমার কাছে থাক। বেটাপুত্র যা ছিল সবাই ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। তুই আমাকে ফাঁকি দিসনা। আমি যা খাব তোকেও তা খাওয়াব। আমি যেখানে থাকবো তুই আমার পাশে থাকবি। বিড়াল ঘার নাড়িয়ে স¦াগত জানাল। বেশ সুখেই  কাটছিল দিনকাল। এদিকে মুনিবের ঘুম হারাম। কোথায় গেল তার পোষা বিড়াল? মুনিবের মেয়ে অর্পনা যে বিড়ালকে কাছে করে মাছ ভাত খাওয়ায় সে তার বাবাকে বিড়াল নিয়ে আসার জন্য খুঁজে বের করার জন্য বেশ কয়েকদিন হলো তাগাদা দিয়ে আসছে। মনিব তার পোষা বিড়ালকে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে।

পেয়ে যায় বিধবার বাড়িতে। কিন্তু বিধবা সে তার পোষা বিড়ালকে ফেরত দিবে না। মনিব অনেক বুঝিয়ে তবে পোষা বিড়ালকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। কাঠবিড়ালী এতদিন কবজি ডুবিয়ে খেয়েছে। বিড়ালকে মনিবের সাথে দেখে রেগে গড়গড় করতে থাকল। বিড়াল এবার হাটঘাট বেঁেধই মাঠে নেমেছে। হয় কাঠবিড়ালী এ বাড়িতে থাকবে না হয় আমি থাকব। কাঠবিড়ালীও সিদ্ধান্ত নিয়েছে একবার যদি খাঁচা থেকে ছাড়া পাই এ গ্রাম থেকে একেবারে জঙ্গলে চলে যাব। কাঠবিড়ালী আর বিড়ালের এই ঝগড়া কেউ জানে না। দুজন দুজনাকে দেখলে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে।

মনিব যে তাদের আশ্রয়দাতা সেও জানে না তাদের ঝগড়ার কারণ। দিন গড়াতে লাগল। একদিন মনিব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরে। সেইদিন কোন পশুপাখিকে খাবার দিতে পারেনি। খাবার যা ছিল বিড়াল খেয়ে ফেলেছে। মনিব যেখানে শুয়ে ছিল বিড়াল মনিবের পাশে গিয়ে ঘুমিয়ে পরে। মনিব বুঝতে পারে বিড়াল তাকে খুব ভালবাসে। অসুস্থ অবস্থায় মনিব বিড়ালের গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। বিড়াল মনে মনে ভাবে আমি এত কাছে থাকার পরেও আমাকে চেন নাই। কি দরকার ছিল, আমার শত্রু কাঠবিড়ালীকে ঘরে রাখতে। এবার তারাও নইলে আর তুমি সুস্থ হতে পারবে না।

মনিবের একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিল, তাকে দিয়ে পশুপাখিগুলোকে যত্ম নিত। যত্মের কোন রকম অভাব ছিল না। কারণ মনিব অসুস্থ হলেও কর্মচারীকে সব সময় পশুপাখিকে খেয়াল রাখার কথা স¥রণ করিয়ে দিত। কাঠবিড়ালী ও বিড়াল কেন এত আক্রোশ তার একটা বাস্তব কথা বলি। বিড়াল সবে মাত্র ছানা প্রসব করেছে। কাঠবিড়ালী তার দুইটি বাচ্চাকে পায়ে পিষিয়ে মেরে ফেলে। বিড়াল সেটা  নিজে চোখে দেখেছে। প্রতিবাদ করার জন্য এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কাঠবিড়ালীর দল ছিল একতা। কিছু করতে পারে নি। বিড়াল বুকে কষ্ট নিয়ে দিন গুনতে থাকে। কোন দিন যদি এমন সময় আসে সেই দিন তার প্রতিশোধ নিবে। মায়ের চোখের সামনে যদি কোন নেমক হারাম বাচ্চাকে মেরে ফেলে মা কেমন হতে পারে। সেই দিন থেকে কাঠবিড়ালী ও বিড়ালের ঝগড়া। কাঠ বিড়ালীও বলে আমি যতদিন বন্দি খাঁচায় আছি তুই আমাকে কিছুই করতে পারবি না। আর বিড়াল বলে খাঁচাতো আমি যে কোন মুহুর্তে ভাঙতে পারি। এটা আমার কাছে এমন কিছুই না। শুধু মনিবের খাই, পরি, পাহারা দেয়, তাই মনিবের ভয়ে কিছুই বলি না। আমার জন্য মনিব কষ্ট পাবে এই ভেবে কাঠবিড়ালীকে কিছু বলি না। নইলে কাঠবিড়ালীকে আস্ত খেয়ে ফেলতাম। প্রতিশোধ নিতাম বাচ্চাদের।

রসচুরির গল্প

মোহাম্মদ আল-আমিন ইসলাম, পৌষ মাস শুরু হয়েছে। জনিদের গাঁয়ে পৌষমেলা বসে। সেই পৌষমেলায় জনির মামাতো ভাই শাহেদ, জিশান জনিদের বাড়িতে আসে। মেলারদিন বিকালে জনি ওর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে মেলায় যায়। মেলায় গিয়ে নাগরদোলা, লাঠিখেলা, পুতুলখেলা দেখে, জিলাপি-মন্ডা মিঠাই, মিষ্টি খেয়ে, তিনজনে পাঁচটি বাঘের মুখোশসহ অনেক কিছু কিনে নিয়ে জনিদের বাড়িতে আসে। মেলা শেষের দু-দিন পর জনি ওর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে নানা বাড়ি যাওয়ার জন্য দুপুরে রওয়ানা দেয়। যেতে যেতে ঠিক বিকেলে ওরা ওদের গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

 জনি বিকেলে, মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে মামার ঘরে খাওয়া দাওয়া করে এবং মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে খেলাধুলা করে মাগরিবের আযানের দিকে ঘরে ফিরে আসে। রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর মামাতো ভাই সাহেদ, জিশানের সঙ্গে ঘুমাতে গিয়ে খেজুর রস চুরির বুদ্ধি করে ঘুমিয়ে পড়ে।
রাত পেরিয়ে যখন সকাল হয়, তখন জনি, জিশান, শাহেদ ঘুম থেকে উঠে রস চুরির জন্য মেলায় কেনা বাঘের মুখোশ পড়ে খেজুর বাগানের দিকে রওয়ানা হয়। তখন চারদিক ছিল নিঝুম-নিরব ও কুয়াশায় ঘেরা। তবে ওরা বাঘের বাড়তি মুখোশ দুটি নিতে ভোলে নি।


হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণের মধ্যে খেজুর বাগানে পৌঁছে যায় ওরা। বাগানে পৌঁছে গিয়ে গাছে বাঁধা রসের কলস পারার জন্য শাহেদ ও জিশান গাছে ওঠে । আর ওদেরকে সাহায্য করার জন্য জনি গাছের নিচে রয়ে যায়। তবে গাছে উঠতে না উঠতেই ছোট্্র এক পুঁচকে এসে ওদেরকে দেখে গিয়ে, গাছের মালিককে বলে দেয়। গাছের মালিক শাহেদ, জিশান, জনির সমবয়সী তার ছেলে রহিমকে একটি লাঠি হাতে দিয়ে বলে, খেজুর গাছের নিচে মুখোস পড়া যে ছেলে থাকবে তাকে লাঠি দিয়ে মাথায় মারবি। রহিম বাবার কথা শুনে চলে গেলে, বাবা রহিমের সমবয়সী ভাই রতনকেও একই কথা বলে পাঠিয়ে দেয়। রহিম খেজুর বাগানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওকে জিশান, জনি, শাহেদ ধরে বাড়তি মুখোশের একটি মুখোশ পড়িয়ে দেয়।

 তারপর ওরা সুযোগ বুঝে দৌড়াতে থাকে এবং বাড়তি মুখোশটি মাটিতে ফেলে দিয়ে যায়। সেই মুখোশটি রহিমের ভাই রতন নিজের মুখে পড়ে। রহিম জিশান, জনি, শাহেদের পিছনে দৌড়ায়। আর রহিমের ভাই রতন রহিমের পিছনে দৌড়ায়, রহিমকে রসচোর ভেবে জিশান, জনি, শাহেদ দৌড়াতে দৌড়াতে রহিমের অদৃষ্টি হয়ে যায়। রহিম তাই বাড়িতে ফিরে আসার জন্য বাড়ির মুখে ঘোরে। ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে রহিম রতন দ্ভুাই সামানা সামনি হয় এবং দুজন-দুজনকে রসচোর ভেবে দুজনার মাথায় দুজনে লাঠি দিয়ে মারে লাথি।

 দুজনে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। রহিম-রতনের বাবার রস বিক্রি করে শীতকালে সংসার চলে। তাই রাতে খেজুর গাছে রসে কলস ভরার জন্য বেঁধে রাখে এবং সকালে তা বিক্রির জন্য গ্রামে বের হয়। ছোট পুঁচকের কথাতে ছেলেদের রসচোরদের সাজা দিতে পাঠিয়ে নিজেও বেরিয়ে পড়েন রসের কলস নিয়ে গ্রামে বের হওয়ার জন্য। কিন্তু খেজুর বাগানে এসে দেখেন রসের কলস একদম ফাঁকা। তাই তিনিও মুখোশ পড়া রসচুরি করা ছেলেদের সাজা দেওয়ার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে চললেন। কিছুদূর যেতে না যেতেই তিনি দেখতে পেলেন নিজের ছেলের মত দুটো ছেলের মুখে মুখোশ ।

 ওদের মাথা ফেঁটে গেছে, ওরা অজ্ঞান হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে। হাত দিয়ে মুখোশ দুটো খুলে দেখেন ছেলে দুটি তার নিজের ছেলে রহিম-রতন। রহিম-রতনকে হাসপাতালে নিলেন ওদের বাবা। রহিম-রতন সুস্থ হয়ে মুখোশ পড়া ছেলেদের সম্পর্কে বাবাকে জানাল। বাবা রহিম-রতনের মুখে মুখোশ পড়া ছেলেদের সম্পর্কে জেনে, ভাবে ছেলেরা রসচোরের মজা দিতে গিয়ে, নিজেরাই নিজেদের রসচোর ভেবে মজা দিল। বাবা মুখোশ দুটোকে হাতে নিয়ে আরও বলতে থাকে, হায়বে মুখোশ তোর জন্যই আমার ছেলেদের এই দশা।

বিলটুর স্বপ্ন

আজ বিলটুর স্কুলে বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতা। ওর মনে তাই বেশ খুশি খুশি ভাব। ওদের স্কুলে এ বছর অনেকগুলো বিষয়ে প্রতিযোগিতা হবে। প্রত্যেক বিষয়ে প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকারীদের এ বছর স্কুলের পক্ষ থেকে দামি দামি পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে। তাই শুনে বিলটুও এবছর তিনটি বিষয়ে নাম দিয়েছে। দীর্ঘ লাফ, ২০০ মিটার দৌড় এবং মোরগের লড়াই-য়ে। যদি তার ভাগ্যে একটা পুরস্কার কোন রকমে জুটে যায় তাহলে তো আর কথাই নেই। সবার কাছে ওর তখন কত দাম বেড়ে যাবে। সবাই তখন বলবে কত ভালই না খেলে বিলটু। আহ! আমরা যদি ওর মত  অত ভাল খেলতে পারতাম, ইত্যাদি।

এসব কথা ভেবে ভেবে ওর মন আনন্দে ভরে উঠে। তারপর সকাল ৮টা না বাজতেই গোসল করে, পেটভরে খেয়ে রওনা হয়ে গেল স্কুলের দিকে। এক এক করে সবাই স্কুলে হাজির হল। সকাল ১০টায় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার সুচনা হল। স্কুলের ভাইস চেয়ারম্যান মিস্টার আর,কে দত্ত প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করলেন। প্রথমে স্থির হল বালকদের দীর্ঘ লাফ দিয়েই প্রতিযোগিতা শুরু হবে। তাই প্রথমেই এসে গেল বিলটুর পালা। ও দুই মিনিটেই প্রস্তুত হয়ে গেল। মনে মনে ভাবতে লাগল এবার সে রাসেদ ও রতন কে টেক্কা দিয়ে লাফের একটা পুরস্কার নেবেই। তারপর ক্রিড়ার শিক্ষক বাঁশি বাজিয়ে এক এক জনকে ডাকতে লাগল লাফ দেওয়ার জন্য।

বিলটু ভাবতে লাগল আর যদি কোন কারণে লাফের পুরস্কারটা ফসকে যায় তাহলে আরও দুটো প্রতিযোগিতা তো বাকি রয়েছে। তখন ও দেখিয়ে দেবে তাকে সবাই যা ভাবে আসলে সে তা নয়। বলতে বলতে বিলটুর পালা এসে গেল। বাঁশি বাজার সাথে সাথেই সে খুব জোরে দৌড়ে এসে গায়ের জোরে একটা লাফ দিল। কিন্তু পড়ল সবার থেকে দুই-তিন হাত পিছনে। ওর লাফ দেখে সবাই বলল, “ আহারে লাফ একটা মেরেছে বিলটু।” কেউ বলল, “ ওরে বিলটু ফাস্ট হয়েছে।” অবশেষে আরও কয়েক বার লাফ দিলে, লাফের কোন পরিবর্তন হলো না দেখে ক্রিড়ার শিক্ষক ওকে বাদই দিলেন। লাফের পুরস্কারটা সত্যি সত্যিই ওর ফসকে গেল। দীর্ঘ লাফে প্রথম হল রতন আর দ্বিতীয় রাসেদ।

 বিলটুর খুব রাগ হল। ও মনে মনে বলল, “দৌড়ের সময় দেখিয়ে দেব ঐ রতন বেটাকে। দৌড়ের সময় ওকে যদি আমি ল্যাং মেরে  ফেলে না দিই তাহলে আমার নাম বিলটুই নয়। তারপর এল দৌড়ের পালা। স্যার সংকেত দেওয়ার সাথে সাথেই দৌড় শুরু হয়ে গেল। কিছু দুর এসে বিলটু রতনকে ল্যাং মেরে ফেলতে গিয়ে নিজেই পা ফসকে পড়ে গেল। তারপর উঠে আবার যখন দৌড় শুরু করল তখন রতন প্রায় দড়ি ছোঁয় ছোঁয়। বিলটু বৃথা ওর পিছু ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু পারলনা। সবার শেষেই তাকে দড়ি ছুঁতে হল। ওর মন থেকে পুরস্কার পাবার চিন্তাটা ক্রমশঃ ফিকে হয়ে আসতে লাগল। ভাবল পুরস্কার বুঝি ওর ভাগ্যে নেই। তা না হলে দুটি প্রতিযোগিতাতেই তার স্থান হল সবার নিচে। তাই পুরস্কারের আশা ও এক রকম ছেড়েই দিল। কিন্তু শেষ চেষ্টা করতে দোষ কি এখনও তো তার একটা প্রতিযোগিতা বাকি আছে। কিছু বলাতো যায়না হয়তো এবার সে একটা পুরস্কার পেয়েও যেতে পারে। তাছাড়া লাফ ও দৌড়ে সে পুরস্কার পেলনা বলে মোরগের লড়াইতে পাবে না এমন তো কোন কথা নেই। নতুন উদ্যম নিয়ে তাই সে আবারও মাঠে নামলো।

 প্রাণ পনে লড়াই করতে লাগল অন্যদের সাথে। কিন্তু কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই গোপিনাথের কনুইয়ের কয়েকটা জাব্দা ঘা খেয়ে চিত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। ওকে দেখে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। রাগে তখন বিলটুর দম বন্ধ হয়ে আসছে। কাউকে কিছু না বলে মুখ কালো করে সোজা বাড়ির দিকে হাঁটা দিল ও। খানিক দুরে এসে ওর পা আর যেন উঠতে চাইলনা। আসলে তিনটি খেলাতেই তো সে ওর সাধ্যমত চেষ্টা করেছে। সাধ্যমত কষ্ট করেছে। তাই সে এখন পরিশ্রান্ত। তাই রাস্তার পাশের একটা বাবলা গাছ তলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল সে। তার পর সোজা বাড়ি গিয়ে বারান্দার ভাঙ্গা খাটের উপর ধপাস করে শুয়ে পড়ল। আর শোয়া মাত্রই ক্লান্তিতে ওর ঘুম এসে গেল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ও স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।

 স্বপ্নে দেখতে লাগল দৌড়ে ও প্রথম হয়েছে। তাই প্রধান শিক্ষক ওকে বলছে, “ বিলটু তোমার পুরস্কারটা নিয়ে তবেই বাড়ি যেও।” তাই পুরস্কার নেওয়ার আশায় স্কুলের একটা বারান্দায় সে বসে আছে। বসে বসে সে খেলা দেখছে। সমস্ত খেলা শেষ হতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একটু পরেই পুরস্কার বিতরণী শুরু হল। প্রধান শিক্ষক দৌড়ে প্রথম স্থান অধিকারী হিসাবে বিলটুকে পুরস্কার নেওয়ার জন্য ডাকলেন। ও এগিয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে তাকে একটা সেলুট জানালো। তারপর বাড়ি ফেরার জন্য বাইরে এসে দেখল রাত অনেক হয়েছে। একা একা বাড়ি ফিরতে তার একটু ভয় ভয় করছিল। কিন্তু কাউকে না পেয়ে শেষে একাই রওনা হল। কিছু দুর এসে সে যেন পথ হারিয়ে ফেলল। এ-সে কোথায় এসেছে ? এ তো তার বাড়ি ফেরার রাস্তা নয়। ওর বড় ভয় করতে লাগল। ঠিক ঐ সময় সে তার সামনে দেখতে পেল কতক গুলো কবর। ঠিক মাঝখানের কবরটার উপরে দাড়িয়ে একটা কালো রঙের মানুষ। নিশ্চয় ভূত টুত কিছু একটা হবে। তাকে দেখা মাত্র বিলটুর বুক ছ্যাঁৎ করে  কেপে উঠল।


প্রথমে ও দৌড়ে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু কি আশ্চার্য, ওর পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে আছে। ও কোন মতে দৌড়াতে পারলনা। তারপর ও চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে চাইল। কিন্তু তাও পারলনা। ওর মুখে কথা ফুটলনা। ওর সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে  আসতে লাগল। ওই ভুতটা ওকে হাত ছানি দিয়ে ডাকতে লাগল। কিন্তু বিলটু সেখান থেকে এক পাও নড়ছেনা দেখে ভুত নিজেই এগিয়ে এল। তার পর বলল, “ বা! বেশ সুন্দর পুরস্কার পেয়েছিস তো। তোর পুরস্কারটা আমার কাছে দেতো।” বিলটু পুরস্কারটা দেবেনা বলে আগলে রাখতে চাইল। তখন ভূতটি বলল, “ দে বলছি, নইলে তোর ঘাড় মটকাবো।” এই বলে ভূতটি বিলটুর হাত থেকে পুরস্কারটা কেড়ে নিল। বিলটু তখন ভূতের হাত থেকে পুরস্কারটা নেবার চেষ্টা করল।

অমনি ভূতটি বিলটুর হাত ধরে তাকে একেবারে আকাশে ছুড়ে দিল। বিলটু হারালো তার পুরস্কারটা। আকাশে গিয়ে বিলটু দেখতে পেল অনেক গুলো গ্রহ পাশাপাশি দাড়িয়ে। ও তখন এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে লাগল। এক গ্রহে গিয়ে দেখতে পেল কতকগুলো মানুষ। মানুষ গুলো তার বোন সীমার ছোট পুতুলটির চেয়েও অনেক ছোট। মানুষ গুলো বিলটুকে দেখে আক্রমণ করল। বিলটু সব কটাকে এক একটা ঘুষি মেরে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। তারপর এল একটা বড় আকারের মানুষ। সে এসে বিলটুকে গলাধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল সেই গ্রহ থেকে। তারপর এক সময় সে ধপাস করে এসে পড়ল পৃথিবীতে। যেই পড়া অমনি গেল তার ঘুম ভেঙ্গে। দেখল সে পড়ে আছে তাদের সেই ভাঙ্গা খাটের নিচে। আসলে সে কোন গ্রহ থেকে পড়েনি। খাট থেকে নিচের মাটিতে পড়ে গেছে, এই যা।

পুন্ড্রনগরে একদিন

দিনটি ঠিক বৃহস্পতিবার ছিল। আমাদের স্কুলে প্রতি বৃহস্পতিবার সংস্কৃতি আসর অনুষ্ঠিত হয়। গত বৃহস্পতিবার আসরে হঠাৎ বনভোজনে যাওয়ার আনন্দ উল্লাসের কথা
আলোচনা করলেন স্কুলের শারিরীক শিক্ষার আব্দুল হান্নান স্যার। বনভোজনের আনন্দ উল্লাসের কথা শুনে সবাই একমত যে, আমরা সকল শিক্ষার্থীরা একদিন বনভোজনে যাব। হঠাৎ রুমান বলে উঠল, আগামী শুক্রবার আমরা সবাই বনভোজনে যাবো। এর পক্ষে কতজন, হাত তোলো দেখি? সঙ্গে সঙ্গে
আসরে উপস্থিত সকল শিক্ষার্থীরা হাত তুললো এবং বলল, হ্যাঁ আগামি শুক্রবারই বনভোজনে যাওয়ার তারিখ ঠিক করা হোক। রুমান তার প্রস্তাবের সফলতা পেয়ে দারুণ উল্লাসিত।

 শিক্ষার্থীদের আশানুরূপ সম্মতি দেখে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান মন্ডল সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন , তো তোমরা কোথায় যেতে চাচ্ছ, এ বলে স্যার তার কক্ষে গেলেন। স্থান নির্বাচন নিয়ে তুমুল দ্বিমত বিরাজ করলো আসরে। ইতিমধ্যে আতাউর স্যার কক্ষ থেকে এসে, দ্বিমত
সংশোধনের জন্য সবার উদ্দেশ্যে বললেন, শোনো আমরা আগামী শুক্রবার সকাল ৮ টায় প্রাচীন বাংলার রাজধানী খ্যাত এবং বর্তমান সার্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী তথা সার্কের সদস্যকৃত দেশসমূহের সাংস্কৃতিক রাজধানী মহাস্থানগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিব।


 আর হ্যাঁ বনভোজন ফি বাবদ জন প্রতি ১৫০ টাকা আগামী পাঁচদিনের মধ্যে জমা দেওয়ার আদেশ করা হলো এবং সেই সঙ্গে তোমরা সবাই সকাল ৭টার মাঝে স্কুল ক্যাম্পাসে এসে পৌছবে। আর হ্যাঁ আমরা যেহেতু বনভোজনে যাচ্ছি এতে তো অবশ্য অবশ্যই একটা ব্যানার লাগবে গাড়ির সামনে ঝুলানোর জন্য? এতে আমরা একটা স্লোগান দিতে চাই। তোমাদের মাঝে কি কেউ পারবে ছন্দময় দুলাইনের স্লোগান তৈরি করে দিতে? ইতিমধ্যে আমিনুল আরিফকে উদ্দেশ্য করে বলল, কবি ভাই প্লিজ একটা স্লোগান তৈরি করো… না… প্লিজ …। অবশেষে আমি আমিনুলের অনুনয়নে লিখলাম ছন্দময় দুচরণের স্লোগান :
“বন্ধুত্বের সাজোন গোজন
মহাস্থানগড়ে বনভোজন।”


স্লোগান টি পড়ে দারুণ খুশি আতাউর স্যার। এরপর স্যার আসরটি সমাপ্ত ঘোষণা করলেন।
বনভোজনে যাওয়ার জন্য নানা অপেক্ষার প্রহর হিসাব করতে করতে অবশেষে হাজির হলো কাঙ্খিত শুক্রবার। সাতটার পূর্বেই প্রায় সকল শিক্ষার্থী স্কুল ক্যাম্পাসে এসে হাজির হয়েছে। যারা এখনো আসেনি তাদের বন্ধু বান্ধবীরা ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বলছে। আমাদের বনভোজনের গাড়িটা নির্দিষ্ট সময়ে স্কুল ক্যাম্পাস ত্যাগ করলো। গাড়ির ভিতরে সবাই একসঙ্গে অনেক মজা হলো।


আমরা যখন মহাস্থানগড়ে পৌছেছি তখন ঘড়ির কাটা ঠিক ১০ টার কাছাকাছি। রাস্তা পাশে আমাদের গাড়িটা যখন থামল তখন চোখে পড়লো সারি সারি তিন চাকা ভ্যানগাড়ি ভর্তি আগাম আলু। জিজ্ঞাসা করে জানলাম যে, উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ সবজি বাজার তথা মহাস্থান বাজারে বিক্রি করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কারেন্ট নিউজে পড়েছি অবশ্য, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয় বগুড়ায়। আমি সাব্বির, আমিনুর আর শারিরীক শিক্ষার আব্দুল হান্নান স্যার বাজারে গেলাম বনভোজনের রান্নাবান্নার জন্য তরিতরকারি কিনতে । বাজারে হরেক রকম নাম জানা অজানা সবজি দেখে মগ্ধ হলাম। শুধু আমরাই না হান্নান স্যারও কোনোদিন এসব সবজি দেখেননি।
অনেক পরিশ্রম হলো বাজার করতে। মস্ত বড় বাজার।

 এদিকে আতাউর স্যার রান্না বান্নার জন্য সকল আসবাবপত্র গাড়ি থেকে নামিয়ে এনেছে । বাজার থেকে নিয়ে আসা সকল সব্জি সল্প সময়ের মধ্যে কাটাকাটি শেষ করলো আমাদের সহপাঠী মিথন, উম্মে হানি, মিলা, ফাতেমা, মার্জিয়া আর নিঝুম। ওরা ছয়জনে যেমন পটু সব্জি কাটাকাটিতে ঠিক তেমনি পটু রান্না বান্নার কাজে। ওরা কাজের জন্য কোনো বাবুর্চি সঙ্গে নিতে দেয়নি। এদিকে রান্নার কাজ চলছে আর আমরা বাকীরা সবাই ঘুরতে বের হলাম। প্রথমে আমরা গেলাম দূর্গা প্রাচীরের পশ্চিম দিকে কালীদহ সাগরে এরপর সোজাসুজি প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘরের সামনে। জন প্রতি বিশ টাকা বিনিময়ে প্রবেশ পত্র সংগ্রহ করলাম। এরপর আমরা সবাই একসঙ্গে জাদুঘরে প্রবেশ করলাম। জাদুঘরের দরজা পার হওয়ার পরপরই চোখে পড়লো বাহারি ফুলের সুভাষিত বাতাসে খেলা করা হাজারো ভ্রমর মৌমাছি। জাদুঘরের ভিতরে অনেক পুরনো ঐতিহ্য দেখতে পেলাম। জাদুঘর দেখা শেষ করেই বেরিয়ে আসলাম রাস্তার পাশে।


রাস্তার পূর্ব পাশেই গোবিন্দ ভিটা। জন প্রতি পাঁচ টাকা প্রবেশ পত্রের মূল্য। আমরা সবাই একসঙ্গে আবার প্রবেশ করলাম গোবিন্দ ভিটায়। হঠাৎ ইতিমধ্যে জুমা নামাজের আযান দিলো। আমরা বন্ধুরা সবাই তাড়াতাড়ি করে গোবিন্দ ভিটা দেখা শেষ করলাম। এরপর নামাজ পড়ার জন্য রওনা দিলাম মাজার মসজিদের উদ্দেশ্যে। উত্তরবঙ্গের মধ্যে সর্ব বৃহত্তম জুমার জামায়াত এখানে অনুষ্ঠিত হয় বলে বড়দের মুখে অনেক শুনেছি। জন প্রতি পাঁচ টাকা ভাড়ায় জাদুঘর থেকে মাযার গেটে এসে পৌছিলাম। তাড়াহুড়া করে ওযু করে জামায়াতে দাড়াতে দাড়াতেই সূরা ফাতিহা শেষ। নামাজ শেষে আমরা সবাই হযরত শাহ সুলতানের মাযার জিয়ারত করে পিকনিক পয়েন্টে ফিরে আসলাম। এরপর খাওয়া -দাওয়া হলো। তবে হ্যাঁ খাওয়ার পূর্বে ছিলো একটা অসাধারণ সুস্বাদু খাবার ঐতিয্যের ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের কটকটি। এটি শুধু এই মহাস্থানগড়েই পাওয়া যায়। খাওয়ার পর ছিলো কুইজ প্রতিযোগিতা। কুইজ প্রতিযোগিতায় কেউ বিজয়ী হতে পারেনি। অথচ প্রশ্নগুলো ছিলো খুব সহজতর।

একাত্তরের গপ্প

 সাকি সোহাগ ,রহিমন বিবির কান্না কিছুতেই থামছে না। সে গলা ছেড়ে দিয়ে কাঁদছে।
আমাদের গ্রামটি শহরের খুব নিকটে। শহরে এখন তুমুল যুদ্ধ। তারপরেও গত কয়দিন ভালোই ছিল আমাদের এই গ্রামটি। আজ দুপুরে রহমত মিয়া মুক্তি বাহিনী থেকে এসে গ্রামের সবাই কে বলে দিয়েছে                                            
-খুব শীঘ্রি আমাদের গ্রামে মিলাটারিরা ঢুকে পরবে ।


তাই সবাই যার যার জীবনের ভয়ে এদিক সেদিক যেতে লাগলো। রহিমন বিবি তার যুবক দুই ছেলেকে নিয়ে আমাদের বাড়ীতে এসেছে বাবার কাছে। বাবা ও আমি সহ জব্বার আলী আর মুনসি মিয়া বেরুচ্ছি বাংকার খুঁড়তে এমন সময় রহিমন বিবি এসে বাবাকে বলছে – বড় মিয়া গো আমরার দুই পুত কেও লোন বাংকার খুরোনের লাই। আমরার তো কেউ নাই আমরা যামু কই!


আমরা সবাই মিলে আমাদের পুকুর পাড়ের সাথে লাগানো জমিনটার পূর্ব পাশে খুঁড়তে শুরু করলাম। মনসির মা’য় কাঁথা নিলো, রহিমন বিবির ঘরে চিড়া ছিল এক বোয়াম, সেটাও সাথে নিলো। আমার মা তো নাই, থাকলে হয়তো অনেক খাবার সাথে নিতো আমার জন্য। আমার মায়ের জীবনটা অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছে শয়তান মিলাটারিরা।


আমাদের প্রায় দুই দিন লাগলো বাংকার খুঁড়তে। জব্বার আলীদের বাঁশ ঝার থেকে কয়েকটা বঁাঁশ কাটা হলো। সেগুলো কবরের খারাল এর মত করে কেটে নেওয়া হলো। ওগুলো পরে আমরা বাংকারের উপরে ব্যবহার করি, তার উপরে আবার বাঁশের চাটাই বিছায়। সব উপরে মাটি দিয়ে ঢেকে রাখি। এক পাশে একটু ফাঁক রাখা হলো যাতায়াত করার জন্য। খুব ছোট একটা ফাঁক একজনের বেশি যাওয়া আসা করা যায় না। আমরা যে যার প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে রাতেই বাংকারে থাকার ব্যবস্থা করলাম। আমাদের ঘরে মোম ছিল কয়েকটা, সেগুলো সহ বাবা আরো কিছু মোম কিনে দিলো। রাতে খুদ রান্না হলো সাথে আলু ভর্তা। আমার এখনো মনে পরে সেই রাতের কথা, কেবল ঐরাতেই পেট ভরে খেয়েছিলাম আগামী ছ’মাসের মধ্যে।


রহিমন বিবি কাঁথা বিছায়তাছে বাংকারের ভিতর। এক পাশে মোম জ্বলছে অবিরত। মোমের জ্বলা দেখে মনে হচ্ছে -আমাদের থেকেও ঐ মোমটা বড় অসহায়।
বাংকারের এক কোনে আমরা সবাই বসে আছি, শোয়ার জন্য। আমরা সবাই শুই নাই। বাবা আর জব্বার আলী উপরে উঠলো বিড়ি খাওয়ার জন্য।
বাবা বিড়ি টানতে টানতেই অন্যমনষ্ক ভাবে বলছে –
‘দেখ মিয়া জব্বার আলী, আমরা তো এ দেশেরই মানুষ, এই দেশ জাতি সমাজ সবই তো আমাদের, দেশের জন্য কিছু করা উচিত।’
জব্বার আলী বিড়িটা মুখ থেকে সরিয়ে আকাশ দিকে ধুয়া ছাড়ছে আর বলছে –
‘হ মিয়া ঠিকই কইছেন।’


বাংকারের মধ্যে থাকতে হঠাৎ কবরের কথা মনে পরাই সারা শরির শিহরে উঠলো। এখানে এত মানুষ, কিন্তু কবরের মধ্য শুধু একা থাকতে হবে। এখানে আলো আছে, সেখানে আলোও থাকবে না, চারিদিকে শুধু অন্ধকার।


আর গভিরে যেতে ইচ্ছে করলো না ভয় করছে, খুব ভয়। হঠাৎ গুলির শব্দে সবাই আঁতকে উঠলে। ফটফট করে উপরে কয়েকটা গুলি করার শব্দ হলো।
বাবা আর জব্বার আলী যুদ্ধে যাবে। বাবা যাওয়ার সময় আমার দিকে একবার করুন চোখে তাকালো। সেই চাহনি যে শেষ চাহনি হবে তা আমি কখনই জানতাম না।
বাবা ও জব্বার আলী যাওয়ার কয়েক দিন পর শোনা গেল রহিমন বিবির স্বামী মারা পরছে। রহিমন বিবির কান্না সামলাতে মনসির মা’য় সিওরে বসে আছে। ছেলে দু’জন শব্দ ছাড়া কাঁদছে। সব যুবক ছেলেরাই শব্দ করে কাঁদতে পারে না। মুনসি মায়ের আঁচল ধরে আছে। চোখ দু’টি টলমল করছে এই বুঝি কাঁদবে।


রহিমন বিবির ছেলেরা বাবার এই মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছে না। তারা দু’জনেও যুদ্ধে যাবে মায়ের কাছে আব্দার করলো। মায়ের মন তাই কী যেতে দেবে ! কিন্তু রহিমন বিবি শক্ত মনে বলছে – ‘যা তোরা, তোরার বাবার প্রতিশোধ নিবি।’


পরদিন সকালে ওরা দুই ভাই যুদ্ধে বেরুলো। দুই ভাইকে বিদায় দিয়ে রহিমন বিবি অসুস্থ হয়ে পরলো প্রায়।
সেদিন আর খাওয়ার কিছু নেই। একটু চিরা ছিলো আমি আর মুনসি মিয়া খেয়ে শুয়ে পরলাম। কিন্তু ঘুম ধরছে না খিদার যন্ত্রনায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা হয়নি। খুদায় দাঁড়াতে পারছি না। মুনসি মিয়া এখনো ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ বাংকারের উপর থেকে জব্বার আলীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বোধহলো খাবার নিয়ে
আসছে। কিন্তু না রহিমন বিবির বড় ছেলের রক্তাক্ত তাজা লাশ নিয়ে আসছে, ছোট ছেলের লাশ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ইপ্সিতা আর ডাকটিকেট পল্লব শাহরিয়ার

স্কুল থেকে ফিরে ঘরে ঢুকেই ভুরু কুঁচকে গেল ইপ্সিতার। তার লেখা প্রথম চিঠিটা পড়ে আছে পড়ার টেবিলে, তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে লেখা, যে কিনা তাকে ছেড়ে অনেক দুরে আছে।

‘বাবা’ তোমাকে যে বললাম চিঠিটা পোস্ট করে দিতে, তুমি দিলে না, এখন ওর জন্মদিনটা চলে যাবে আমার চিঠি আর পৌছাবে না। ঘরে ঢুকে বাবা বলে আরে শুধু খসখসিয়ে চিঠি লিখে খামে পুরলেই হবে? চিঠির পায়ে চাকা কই?
চাকা? আমি তো ঠিকানা লিখেই দিয়েছি।

ওরে আমার বোকা মেয়ে, চাকা মানে স্ট্যাম্প, বাংলায় যাকে বলে ডাকটিকেট। যেটা ছাড়া চিঠির একচুলও নড়ার উপায় নেই।
এটা তো জানা ছিল না, ইপ্সিতার চোখ দু’টো চিকচিক করে ওঠে, তার মানে কি বাবার হাত ধরে আবার একটা না-জানা অন্ধকার গুহার সন্ধান পাবে সে? বাবা বলো না স্ট্যাম্প কি?

গলা খাঁকরিয়ে শুরু করে বাবা। ‘স্ট্যাম্প বা ডাকটিকেট হচ্ছে একটা খুব ছোট্ট কাগজের টুকরো যেটা চিঠিপত্র পাঠানোর কাজে লাগানো হয়। এই স্ট্যাম্প তৈরি করার জন্য বিশেষ ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত আয়তকার এই কাগজের টুকরোটার গায়ে তার দাম মানে ১ টাকা ২ টাকা লেখা থাকে। স্ট্যাম্প পাওয়া যায় ডাকঘরে। যে ঠিকানায় চিঠি যাবে তার দূরত্ব মেপে ঠিক দামের ডাকটিকেট খামের ওপর সেঁটে দিতে হয়। আবার খামের ওজন বেশি হলে বেশি দামের ডাকটিকেট লাগাতে হয়।’

ইপ্সিতার মাথায় তিরবেগে প্রশ্ন ছুটে আসে। ‘আচ্ছা বাবা, এটা প্রথমবার কে আবিষ্কার করে?’
‘শুনলে অবাক হবি। আজ থেকে দেড়শো বছরেরও আগে ১৮৪০ সালের পয়লা মে ব্রিটেনে তৈরি হয় বিশে^ও প্রথম ডাকটিকেট পেরি ব্ল্যাক। স্যার রোনাল্ড হিল প্রথম ডাকটিকেট বানানোর প্রস্তাব দেন। আর সেই স্ট্যাম্পে ছবি ছিল রানি ভিক্টোরিয়ার।’

‘আচ্ছা বাবা, পৃথিবীর সব দেশেই তো ডাকটিকেট আছে তাই না?’ ইপ্সিতার চোখে শুধুই টুকরো টুকরো কাগজ আর তাকে ঘিরে জিজ্ঞাসা চিহ্ন।
হ্যাঁ, তা আছে। তবে সব দেশের কথা বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তার চেয়ে কিছু অদ্ভুত ডাকটিকেটর কথা বলি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাকটিকেট তৈরি হয়েছিলো চিনে ১৯১৩ সালে। আবার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরও ডাকটিকেট হল ব্লু নোজ স্ট্যাম্প। ১৯২৯ সালে এটি কানাডায় তৈরি হয়। বছর দশেক আগে ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ক্রিস্টালখচিত স্ট্যাম্প বানায়। ২০০৫ সালে ফ্রান্স প্রথমবার সুগন্ধী ডাকটিকেট প্রকাশ করে, মিষ্টি আনারসের গন্ধে ভরপুর ছিল সেই স্ট্যাম্প।

২০০৩ সালে রাশিয়া ডেভিস কাপকে মনে রেখে ক্লে-টেনিস কোর্টেও ডাকটিকেট তৈরি করেছিলো, আর তাতে নাকি সত্যিকারের ক্লে ব্যবহার করা হয়েছিলো। এরকম আরো অনেক উদ্ভট ডাকটিকেট সারা বিশ^ জুড়ে ছড়িয়ে ছটিয়ে আছে। যেমন টিনের পাতে ডাকটিকেট, সুতোর কাজের ডাকটিকেট, কর্কের ডাকটিকেট। তবে এদের সব্বার মধ্যে সবচেয়ে মহার্ঘ ডাকটিকেট হল ট্রেসকিলিং ইয়েলো স্ট্যাম্প। মজার ব্যাপার কী জানিস, ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত এই সুইডিশ স্ট্যাম্পটা আসলে ছাপার ভুলে তৈরি হয়েছিল। মানে স্ট্যাম্পটা ছাপার সময় সবুজ বদলে হলুদ রঙে ছাপা হয়েছিল। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই ডাকটিকেট এর দাম ছিল ৩০ লক্ষ ডলারেরও বেশি। তারপর ২০১০ সালে আবার এটাকে বিক্রি করা হয় তবে তার দাম প্রকাশ করা হয়নি।

ইপ্সিতা ভাবতে থাকে। ভাবে এই কাগজের টুকরোর কথা, ভাবে সাদা পাতায় লেখা অক্ষর-শব্দ-বাক্যগুলো এই কাগজের টুকরোটা ছাড়া কীরকম অসহায়, যেন ডানা কাটা পাখি। আজ বাবা না বললে সে জানতেই পারত না। তার মাথার মধ্যে কেমন একটা তেরেকেটে তাকতাক নেচে চলে বিস্ময়। ঘুরপাক খায় অবাক হওয়াগুলো। একটা ছোট্ট কাগজ, অথচ তাকে নিয়ে সারা দুনিয়া কীসব কান্ড কারখানাই না হয়েছে, হয়ে চলছে।
‘আর একটা শেষ কথা বলি’.. বাবার কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় সে। বাবা বলে চলে জানিস, অনেক মানুষ আছেন, যাদের শখ ডাকটিকেট সংগ্রহ করা, এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করা। একে বলে ফিল্যাটেলি’। বাবা উঠে পড়ে।
ইপ্সিতা খাম বন্ধ চিঠিটা নিয়ে ওলটাতে থাকে, হঠাৎ মাথায় আসে আসল কথাটাই তো জানা হল না। ‘আমার চিঠিটার জন্য কত টাকার স্ট্যাম্প লাগবে বললে না তো?’
বাবা অন্য ঘর থেকে হেসে বলে ‘পাঁচ টাকার….’

অনামিকার শীত ভাবনা মোনোয়ার হোসেন

অনামিকার মনটা ভালো নেই। গাড়ি চলছে। জানালার পাশে বসে উদাস দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে সে।
মাহিনুর , শাহীন , বাবলীর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে তার। কত অসহায় তারা।

 ভালো খেতে পারে না,  পরতে পারে না। স্কুলে যাওয়া তো দূরের কথা ! এই প্রচন্ড শীতেও তাদের গায়ে শীতের কোনো মোটা কাপড় নেই। পাতলা ছেঁড়া কাপড় পড়ে ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে দৌড়ে প্লাস্টিকের বটল কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
আজ শুক্রবার। ভাইয়ার অফিস বন্ধ। বিকেলে ভাইয়ার সাথে বাইরে ঘুরতে বের হলো অনামিকা।


ছুটির দিনে ভাইয়া তাকে নিয়ে প্রায় বাইরে ঘুরতে বের হয়। আইসক্রিম খাওয়ায়। ফুচকা খাওয়ায়।
এখন শীতকাল। শীতকালে অনামিকার ফুচকা খুব পছন্দ। ভাইয়া তাকে সংসদ ভবন এলাকায় মন্টু মামার ফুচকার দোকানে নিয়ে গেল। মন্টু মামার ফুচকা খুব পছন্দ তার।  ফুচকা দোকানের সামনে গাড়ি থামাতেই তিনজন ছোট ছোট বাচ্চা দৌড়ে এলো গাড়ির কাছে। তাদের কাঁধে একটা করে বস্তা ঝুলানো ,গায়ে ছেঁড়া, ময়লা জামা। পায়ে জুতা নেই। ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে।

বটল আছে আফা?
অনামিকা তাকালো তাদের দিকে। তাকিয়ে হাসলো সুন্দর করে। তোমাদের নাম কী?
আমার নাম মাহিনুর।
আমার নাম শাহীন।
আমার নাম বাবলী।

বাহ ! খুব সুন্দর নাম তো তোমাদের। তোমরা এই ঠান্ডারদিনে শীতের মোটা কাপড় না পরে খালি পায়ে হাটঁছ কেন? ঠান্ডায় কাঁপছ তো!
আফা, গরীব মাইনষের আবার ঠান্ডা ! ঠোঁট উল্টিয়ে বলল মাহিনুর । বাবলী বলল,  পেটের ভাত জোটেনা, জুতা আর শীতের কাপড় কিনবো কেমনে?
কেন? তোমাদের বাবা-মা নেই?
নাহ। তিনজনেই বলল।
কোথায় গেছে তোমাদের বাবা-মা?
জানিনা।
অনামিকার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাইয়া ! চলো।
কেন খুকি? ফুচকা খাবি না?  
নাহ্।
কেন?
আজ আমার ভালো লাগছে না।
কেন? কী হয়েছে?
কিছু না ভাইয়া। তুমি বাসায় চলো। বলে অনামিকা গাড়িতে উঠে বসল ।
আন্দালিবও গাড়িতে উঠল।

গাড়ি চলছে। অনামিকা গাড়িতে বসে উদাস দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে। ভাবছে বাবলীদের কথা। একই ছাদে বাস করে কত পার্থক্য, কত ফারাক আমাদের মাঝে? একটু শীত করলে আমরা কেমন কুঁকড়ে উঠি আর ওরা দিব্বি প্রতিটি মুহূর্ত শীতের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। ভাবতে ভাবতে অনামিকার চোখে পানি চলে আসে। মনে পড়ে ছোটবেলার পড়া একটা কবিতার কথা – সবার সুখে হাসবো আমি কাঁদবো সবার দু:খে,  নিজের খাবার বিলিয়ে দিবো অনাহারীর মুখে।
অনামিকাকে উদাস থাকতে দেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো আন্দালিব। কী হয়েছে খুকী?
ভাইয়া ! তোমাকে একটা কথা বলব?  
বল খুকী।  
রাগ করবে না তো?  
আরে পাগলি ! হেসে বলল আন্দালিব। আমি কখনো তোর কথায় রাগ করেছি ? বল।
তুমি আমাকে দশ হাজার টাকা দিতে পারবে?
অবাক হলো আন্দালিব। অনামিকা কখনো তার কাছে এতো টাকা চায়নি। অবাক হয়ে তাকাল অনামিকার দিকে। তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, এত টাকা দিয়ে কী করবে তুই?
দরকার আছে আমার। দিবে?
ঠিক আছে।
আনন্দে চিকচিক করে উঠল অনামিকার চোখ।  জানতাম ভাইয়া?
কী?
তুমি আমাকে না বলবে না।
হেসে উঠল আন্দালিবও। তাই?
হুম, মাথা মোটা। অনামিকাও হাসে। ভাইয়া ! আর একটা কথা।  
আবার কী কথা?
আগামীকাল আমাকে আর একটু সময় দিতে পারবে?
কেন?
দরকার আছে। বলো না,  পারবে?
হুম।
খুশিতে গদগদ করে উঠে ভাইয়ার গলা জড়িয়ে ধরলো অনামিকা। উমমা….! জড়িয়ে ধরে ভাইয়ার দুইগালে টপাটপ  দু’টো চুমু খেলো। আমার লক্ষী ভাইয়া !  
পরেরদিন অনেকগুলো মোটা শীতকাপড় আর কোম্বল কিনে ভাইয়ার সাথে সংসদ ভবন এলাকায় এলো অনামিকা।  
গাড়ি থামতেই আজও গাড়ির কাছে দৌড়ে এলো মাহিনুর , শাহীন আর বাবলী।
গতকালের চেয়ে আজ ঠান্ডার প্রকোপ বেড়েছে।

অনামিকা দেখলো আজও পাতলা কাপড় পরে ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে ওরা। ওদেরকে কাছে ডাকলো। সবার হাতে একটা করে মোটা কম্বল আর শীতবস্ত্র দিলো।
কম্বল আর শীতবস্ত্র পেয়ে খুশিতে কেঁদে ফেললো তারা। আফা , আপনে মানুষ না,  ফেরেসতা। আল্লাহ আফনারে অনেক বড় করবো,  অনেক বড়।
আনন্দে কেঁদে ফেললো অনামিকাও। ভাইয়া ! দেখছো , কত অল্পতে খুশি ওরা। অথচ ওদের এই ছোট চাহিদাটুকুও পূরণ করতে পারছি না আমরা।  
হতভম্ব আন্দলিব জড়িয়ে ধরলো অনামিকাকে। আজ তুই সত্যিই আমার চোখ খুলে দিলে খুকী। আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা কাকে বলে?  সত্যি আজ আমি তোর ভাই হিসেবে গর্বিত। সত্যি আমরা কী পারিনা তোর মতো করে ভাবতে? আমাদের সব বোধ , বিবেক , মানবতা কী শেষ হয়ে গেছে?



Go Top