সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৬
ad
২৩ এপ্রিল, ২০১৬ ১২:৩৫:৪৩
প্রিন্টঅ-অ+
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি : বিচারে ধীরগতি
পোশাক শিল্পে বড় দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির তিন বছর পূর্ণ হতে চললেও এখনো ঘাতকদের আনুষ্ঠানিক বিচারের আওতায় আনা হয়নি । আসামিদের মধ্যে এখনো ১২ জন পলাতক রয়েছেন। বিচার প্রক্রিয়া চলছে ধীরগতিতে।

 

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাজধানীর অদূরে সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৬ জন নিহত হন। আহত হন প্রায় ২ হাজার জন, নিখোঁজ থাকে আরো অনেকে।

 

ওই ঘটনায় ৩টি মামলা হয়। ভবন ত্রুটিপূর্ণ জেনেও শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে মামলাটি করে পুলিশ, সরাসরি হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন নিহত শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলী আক্তার এবং বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করার অভিযোগে ইমারত আইনে মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।

 

৩টি মামলার মধ্যে পুলিশের এবং নিহত শ্রমিক জাহাঙ্গীরে স্ত্রী শিউলী আক্তারের মামলা ২টি একসঙ্গে এবং অপরটির আলাদা তদন্ত হয়েছে। ঘটনার দুই বছরের বেশি সময় পর ২০১৫ সালের ১ জুন তদন্ত শেষে আদালতে পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর।

 

পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগে ভবন মালিক সোহেল রানা ও তার মা-বাবাসহ ৪১ জনকে এবং ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ১৮ জনকে আসামি করা হয়। দুটি অভিযোগপত্রে মোট আসামি ৪২ জন। এর মধ্যে সোহেল রানাসহ ১৭ জন দুটি মামলারই আসামি।

 

এ ছাড়া রানা প্লাজা নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে পৃথক আরেকটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্ত শেষে এ মামলায় কমিশন অভিযোগপত্র দাখিল করলেও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় আদালত তা গ্রহণ না করে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশের এবং রাজউকের মামলার নথি প্রস্তুত হলেও মামলার ৪১ আসামির মধ্যে এখনও ১২ আসামি পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও প্রজ্ঞাপন জারি করতে চলে গেছে প্রায় ১১ মাস।

 

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এই বিষয়ে বলেন, ‘অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো এই দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের নানা প্রশ্ন জাগছে, কারণ বিচারের একটা স্বাভাবিক গতি থাকে। এই দুর্ঘটনার নানা বিষয়ের অগ্রগতি নিয়ে অনেক কিছুই জানার ব্যাপার থাকে। বিশেষ করে রানা প্লাজার ক্ষেত্রে এ কথাটা প্রযোজ্য। কারণ এই দুর্ঘটনা সারা বিশ্বকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। তাই এ দুর্ঘটনায় দায়ীদের বিচার খুব মনোযোগের সঙ্গে একটা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে শেষ করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল। সেখানে যদি অবহেলা দেখা যায় তাহলে নানা প্রশ্ন উঠবেই।’

 

চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবীর বলেন, ‘তদন্ত দীর্ঘ সময় নিয়ে হলেও আমরা আশা করছি অচিরেই আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার কাজ শুরু হবে। রাষ্ট্রপক্ষ মামলা দুটি প্রমাণের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। বিচার কাজ শুরুর জন্য মামলা বিচারিক আদালতে এসেছে। আগামী ২৮ এপ্রিল আসামিদের উপস্থিতি ছাড়াও মামলা বিচারের জন্য আমলে গ্রহণ করার দিন ধার্য রয়েছে। ওইদিন আদালত মামলার চার্জ গঠনের জন্য তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন। চার্জ গঠন হলে সাক্ষীর মাধ্যমে বিচার শুরু হবে।’

 

হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে আসামিরা হলেন ভবন মালিক মো. সোহেল রানা, প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, মো. আব্দুল সামাদ, উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. জামশেদুর রহমান, ইমারত পরিদর্শক মো. আওলাদ হোসেন, মো. আব্দুল হামিদ, সোহেল রানার বাবা মো. আব্দুল খালেক ওরফে খালেক কুলু, সাভার পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ড কমিশনার মোহাম্মদ আলী খান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান রাসেল, নিউওয়েব বাটন লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইথার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, মো. আমিনুল ইসলাম, সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. সরওয়ার কামাল, আবু বকর সিদ্দিক, মো. মধু, অনিল দাস, মো. শাহ আলম ওরফে মিঠু, মো. আবুল হাসান, সোহেল রানার মা মর্জিনা বেগম, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, মো. ইউসুফ আলী, মো. সহিদুল ইসলাম, মো. আতাউর রহমান, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সাবেক উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. আব্দুস সালাম, বিদ্যুৎ মিয়া, তাসলিম, সাভার পৌরসভার বরখাস্তকৃত মেয়র আলহাজ্ব মো. রেফাত উল্লাহ, মো. আমিনুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলাম, উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. বেলায়েত হোসেন, ইথার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জান্নাতুল ফেরদৌস, মো. শরিফুল ইসলাম ভূইয়া, মনোয়ার হোসেন বিপ্লব, সৈয়দ শফিকুল ইসলাম ওরফে জনি, রেজাউল ইসলাম, নান্টু কন্ট্রাকটর, আব্দুল মজিদ, নয়ন মিয়া ও পরিদর্শক প্রকৌশল মো. ইউসুফ আলী।

 

আসামিদের মধ্যে প্রথম ছয়জন কারাগারে, পরের ২৩ জন জামিনে এবং শেষের ১২ জন পলাতক রয়েছেন। ইমারত নির্মাণ আইনের  মামলায় ১৮ জন আসামির মধ্যে দুইজন কারাগারে, ১১ জন জামিনে এবং পাঁচজন পলাতক রয়েছেন। পলাতক মাহবুবুল আলম ছাড়া বাকি ১৭ জনই হত্যা মামলার আসামি।

 

এদিকে রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর পরই ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামে দুদক। নকশাবহির্ভুত ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন সভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করে দুদক। ভবনটি সোহেল রানার বাবার নামে হওয়ায় ওই সময় মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে বাদ দিয়েই তার বাবা-মাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। তদন্তে সোহেল রানাই ভবনের মূল দেখ-ভালকারী ছিলেন প্রমাণ হলে চার্জশিটে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

 

মামলার বাদি ও তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক এসএম মফিদুল ইসলাম ওই বছরের ১৬ জুলাই সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের ৫(২) ধারা ও দণ্ডবিধি ১০৯ ধারায় চার্জশিট দাখিল করেন। এ মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক এম আতোয়ার রহমান গত ৬ মার্চ দুদকের দেওয়া এই অভিযোগপত্রে ত্রুটি থাকায় পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মামলাটি ফের তদন্ত করে বিচারক আগামী ৮ মে চার্জশিট দাখিলের দিন ধার্য করেছেন।

 

এসম্পর্কে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘এই মামলার চার্জ শুনানিকালে বিচারকের কাছে মনে হয়েছে, তদন্তে আরো কিছু আসামি এখানে সংযুক্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। যার ফলশ্রুতিতে এটা অধিকতর তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। নতুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত দিন ধার্য করেছেন। ওই দিনে চার্জশিট দাখিল হলে আশা করছি পুনরায় এ মামলার কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে পারব।’

 

এ প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ মেনে চলার নৈতিক দায়িত্ব ও আইনগত বাধ্যবাধকতা সবার রয়েছে। আশা করব, আদালতের নির্দেশ দুদক গুরুত্বসহকারে নেবে এবং শিগগির দুদক তার ব্যর্থতা থেকে সরে এসে সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।’

 

ভবন নির্মানে দুর্নীতি মামলায় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সোহেল রানা , তার বাবা আব্দুল খালেক , মা মর্জিনা বেগম, মোহাম্মদ আলী খান, এনায়েত হোসেন, রেফাত উল্লাহ, বজলুজ সামাদ আদনান, মাহমুদুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম, আনিছুর রহমান ও সরোয়ার কামালসহ প্রমূখ।

 

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রানা প্লাজা নামক ভবন ধসে ১ হাজার ১১৭ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যায়।  সে হিসেবে নিহত হয় ১ হাজার ১৩৬ জন। আহত হয় আরো অনেকে। উদ্ধারকৃত ৮৪৪ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রেখে ২৯১ জনের  লাশ শনাক্ত না হওয়ায় জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে ৭৮ জন।
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত

আইন ও অপরাধ এর অারো খবর