মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬
ad
১৪ এপ্রিল, ২০১৬ ১১:১০:০৪
প্রিন্টঅ-অ+
১৫ বছরেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলার বিচার
 বছর ঘুরে এলো পয়লা বৈশাখ। উৎসবে মেতেছে দেশ। ১৫ বছর আগের এই দিনে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হন। ওই ঘটনায় করা হত্যা মামলার বিচারকাজ শেষ হলেও সাক্ষীর অভাবে ঝুলে আছে বিস্ফোরক আইনে করা অপর মামলাটি। দফায় দফায় সমন জারির পরও সাক্ষী হাজির করতে পারেনি পুলিশ।

 

২০০১ সালে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হলেও আট বছর পর ২০০৯ সালের প্রথম অভিযোগ গঠনের পর বিস্ফোরক মামলায় মাত্র সাত জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। মাঝে প্রায় ৫ বছর মামলাটির বিচারকাজ স্থগিত ছিল। হত্যা মামলার রায়ের পর ২০১৪ সালে বিস্ফোরক মামলাটির বিচার পুনরায় শুরু হলে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এ মামলায় মাত্র দুজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষীর অভাবে বছরের পর বছর মামলাটি ঝুলে আছে।

 

বিএনপি নেতা ও প্রাক্তন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ এ মামলার চার আসামি এখনও পলাতক।

 

ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিনের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। আগামী ২৪ এপ্রিল মামলাটিতে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

 

মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘এই ঘটনায় করা দুটি মামলার মধ্যে একটির রায় হলেও অপর মামলায় সাক্ষীরা আসতে অবহেলা করছেন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আদালত যথাসময়ে সমন দিচ্ছেন।’

 

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, ‘পুলিশ সাক্ষী হাজির করতে না পারায় বিনাবিচারে আসামিরা এক যুগেরও অধিক সময় ধরে কারাগারে রয়েছে। যা কারো জন্যই কাম্য নয়। মূলত বিচারের নামে প্রহসন চলছে। আইন অনুসারে সাক্ষী হাজিরের দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু পুলিশ তা করতে পারছে না।’

 

তদন্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আসামিরা একটি গাড়িতে করে ঘটনাস্থলে বোমা এনেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই গাড়ি কিংবা গাড়ির ড্রাইভারকে আদালতে আনতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ছায়ানট কর্তৃপক্ষের কেউই এ মামলায় সাক্ষী দিতে আসেননি।’

 

১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউর আবু আবদুল্লাহ ভূঞা বলেন, ‘চার্জশিট হওয়ার পর বিস্ফোরক আইনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১ এবং হত্যা মামলাটি ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। দুটি মামলা যেহেতু একই ঘটনার, তাই ট্রাইব্যুনাল ২০০৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মামলা দুটি একই সঙ্গে একটি ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে চিঠি পাঠান। কিন্তু রেজিস্ট্রারের দফতর থেকে চার বছর কোনো নির্দেশনা না আসায় বিস্ফোরক আইনের মামলার বিচার স্থগিত ছিল। তবে হত্যা মামলায় রায় হয়ে যাওয়ায় তারা বিস্ফোরক আইনের মামলার বিচার শুরু করেছেন। কিন্তু সাক্ষী না আসায় বিচারে কিছুটা ধীরগতি হচ্ছে। তবে সাক্ষী হাজির করতে আদালত থেকে সমন এবং ওয়ারেন্ট পাঠানো হচ্ছে। সাক্ষীদের জানানো হচ্ছে, কিন্তু সাক্ষীরা আসছেন না। সাক্ষী হাজির করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’

 

বোমা হামলার ঘটনায় করা হত্যা মামলার রায় হয় প্রায় ১৩ বছর পর ২০১৪ সালের ২৩ জুন। রায়ে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ৮ জনের মৃত্যুদ- এবং ৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়। মামলাটি হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- নিশ্চিতকরণ) শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো- মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী ওরফে আবুল কালাম ওরফে আব্দুল মান্নান, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলালউদ্দিন, মো. তাজউদ্দিন, মাওলানা হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান, ও মুফতি আব্দুল হাই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো- শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা সাব্বির ওরফে আব্দুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ ও হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া।

 

আসামিদের মধ্যে হত্যা মামলার রায়ে মৃত্যুদ-াদেশপ্রাপ্ত পলাতক চার আসামি হলেন প্রাক্তন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার এবং হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে ওস্তাদ জাহাঙ্গীর বদর।

 

২০০১ সালের পয়লা বৈশাখের দিন ভোরে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের জায়গায় দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয় এবং পরে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে তা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে একটি এবং ১০-১৫ মিনিট পর আরেকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই সাত জন নিহত হন এবং ২০-২৫ জন আহত হন। পরে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে আরো তিনজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

 

এ ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। ২০০৬ সালের ১৯ নভেম্বর হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর মামলার জট খোলে। এ ছাড়া মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলাল উদ্দিন ও আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাকও নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এবং বর্ষবরণ উৎসবকে ইসলামবিরোধী উৎসব হিসেবে নিজেদের বিশ্বাসের কথা জানান। ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনকে আসামি করে ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরপর ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে গঠিত চার্জ সংশোধন করে ১৯৮০ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনের ৬ ধারা সংযোজন এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৬ ধারা বাতিলের আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আবেদনের শুনানি শেষে ওই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে ১৯৮০ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনের ৩ ও ৬ ধারায় সংশোধিত চার্জ গঠন করেন। এরপর থেকে সাক্ষীদের প্রতি সমন দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত সাক্ষীদের সময় দেওয়ার পরও আদালতে হাজির না হওয়ায় ২২ মার্চ থেকে সাক্ষীদের প্রতি সমনের পাশাপাশি ওয়ারেন্ট জারি করে আসছেন আদালত। সংশোধিত চার্জ গঠনের পর থেকে মাত্র দুজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত নয় জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে।

 

বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত ১০ ব্যক্তি হলেন- চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার দুবলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলামের ছেলে আবুল কালাম আজাদ (৩৫), বরগুনা জেলার বামনা থানার বাইজোরা গ্রামের আবুল হোসেন ওরফে এনায়েত হোসেনের ছেলে জসিম (২৩), কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার বিরামকান্দি গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে এমরান (৩২), পটুয়াখালীর সদর থানার ছোট বিমাই গ্রামের মৃত অবণী ভূষণ সরকারের ছেলে অসীম চন্দ্র সরকার (২৫), পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার কাজীপাড়া গ্রামের আবুল কাশেম গাজীর ছেলে মামুন (২৫), একই গ্রামের সামছুল হক কাজীর ছেলে রিয়াজ (২৫), একই এলাকার আবুল হাশেম গাজীর মেয়ে শিল্পী (২০), নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার রথি রুহিত রামপুর গ্রামের আবুল কালামের ছেলে ইসমাইল হোসেন স্বপন (২৭), ঢাকার দোহার থানার চরনটসোলা গ্রামের মৃত আয়নাল খাঁর ছেলে আফসার (৩৫) এবং এক অজ্ঞাত ব্যক্তি।  
 
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত

আইন ও অপরাধ এর অারো খবর