ভোর ৫:৫৫, শুক্রবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ মতামত

তাহমিনা আকতার পাতা:শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর সে দেশের সেনাবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের করুণ রূপরেখা। বর্তমান বিশ^ এই নিয়ে তোলপাড়। চলছে আলোচনা-সমালোচনা এবং মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি ধিক্কার। জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন দেশের বিশ^ নেতারা এই নির্যাতন বন্ধের আহবান জানাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু রোহিঙ্গাদের উপর অমানবিক অত্যাচার চলছেই। গত ২৫ আগষ্ট ২০১৭ থেকে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা ঢলে প্রায় পাঁচ লাখ শরণার্থী বাংলাদেশে আসায় যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং হতে পারে আরো বেশি সমস্যা তা সামাল দিতে বাংলাদেশ কতোটা প্রস্তুত সেটাই এখন ভাবছেন সংশ্লিষ্ট বোদ্ধা মহল। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার অপারেশন্স আ্যন্ড ইমার্জেন্সি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মেদ আবদিকার মোহামুদ এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা

‘ইউএনএইচসিআর’ এর সহকারী হাই কমিশনার জর্জ ওকোথ ওবেবা কক্সবাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে এ ব্যাপারে বিভিন্ন শঙ্কা এবং সমস্যার কথা গুরুত্ব সহকারে জানিয়েছেন। শরণার্থীদের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি অনেকেই অনুরোধ জানিয়েছেন রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধের। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ বেড়েই চলছে প্রতিদিন । নির্যাতনের মুখে দেশান্তরী হওয়া রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয়ের একমাত্র জায়গা মনে করছেন তারা। বাংলাদেশ সরকার ও এদেশের জনগণ রোহিঙ্গাদের এমন চরম বিপদে পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। বলা যায় এটা বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। তবে বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব সহকারে মনে করেন হঠাৎ করে এতো অল্প সময়ের মধ্যে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা প্রবেশ করাতে বাংলাদেশও গুরুতর এবং মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে।

জটিল এ পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে সম্মিলিত পদক্ষেপের যথেষ্ট প্রয়োজন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর করুণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সারা বিশ^ ধিক্কার দিচ্ছে। গণহত্যা, নারী নির্যাতন, গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নারী-পুরুষ, শিশু-যুবা, বৃদ্ধ কেউই এ নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি। গাছ-পালা, পরিবেশের সাথে মানুষকেও চরম অমানবিকভাবে পোড়ানো হচ্ছে। বলা যায় রোহিঙ্গাদের প্রিয় বসত ভিটা এখন পোড়া ছাইয়ে পরিণত হয়েছে আর মিয়ানমারের আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রোহিঙ্গা নির্যাতনের আর্তচিৎকার, লাশ পোড়া গন্ধের করুণ পরিবেশ। আজকের পৃথিবী যখন সভ্যতাকে জয় করে আরো বেশি সভ্য হবার স্বপ্ন দেখছে এমন সময়ে মিয়ানমারের অসভ্য, অমানবিক নির্যাতনের ঘৃণিত কার্যকলাপ আমাদের বিবেককে নতুন করে ধাক্কা দিচ্ছে একথা সত্য নয় কি ? নাফ নদ পেরিয়ে রোহিঙ্গারা ¯্রােতের মতো বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

 এতো বিশাল জনগোষ্ঠি সামাল দেয়া এখন নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মিয়ানমার সেনা দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গারা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের ফলে নানা সংকটেরও সৃষ্টি হচ্ছে। তবে রোহিঙ্গারা যদি এদেশের মধ্যে এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে তাহলে বাংলাদেশের পরিবেশের উপর চরম প্রভাব পড়বে। এজন্য এদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের মাধ্যমে হিসাবের আওতায় রাখতে হবে এবং শরণার্থী ক্যাম্পে থাকা উচিত। যদিও এ উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। এবারে জাতিসংঘের ৭২তম সাধারণ অধিবেশনের মূল বিষয় ছিলো রোহিঙ্গা ইস্যু। বিশ^ নেতারা মিয়ানমারের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন এবং এর সমাধানের উপায় বের করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশের মানুষ, বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা সহ বিশে^র বিভিন্ন দেশ প্যারিস, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালায়েশিয়া ও আরো অনেক রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের পক্ষে সমবেদনা জানিয়ে মিটিং-মিছিল বিক্ষোভের মাধ্যমে এ নিপীড়ন বন্ধের আহবান জানিয়েছেন। মানবিকতার প্রশ্নে সাহায্য সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসতে বলেছেন।

বেয়নেটের খোঁচায় হত্যা, গণহত্যা, নারী নির্যাতন সহ এমন কোন হীন কাজ নেই যা মিয়ানমার সেনাবাহিনী করেনি। রাখাইন যুবক দেখলেই তারা গুলি করে মেরে ফেলছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের একটি প্রদেশ রাখাইন। এ অঞ্চলটি আরাকান রাজ্য হিসেবেও পরিচিত। অনেক আগে থেকেই এ রাজ্যে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ সহ নানা ধর্ম বর্ণের লোক বাস করে আসছে। বার্মা নাম বদলে মিয়ানমার হয়েছে। রোহিঙ্গারা এই মিয়ানমারেরই নাগরিক। কিন্ত বর্তমানে তাদের উপর যে নির্যাতনের খড়গ চলছে তাতে প্রশ্ন উঠেছে রোহিঙ্গাদের ধর্ম, বর্ণই কি তাদের উপর নির্যাতনের প্রধানতম কারণ? মানুষের প্রতি মানুষ কেমন করে পারে এতটা নির্দয়, বর্বর ও পাষন্ড হতে পারে? কক্সবাজারের তিন জেলার ৬০ হাজার একর বনভুমি এখন রোহিঙ্গাদের বসতি। উখিয়ার কুতুপালং থেকে সুবিস্তৃত সীমারেখা টেকনাফের মুছনী পর্যন্ত ছোট-বড় মিলে শতাধিক পাহাড়ে পাহাড়ে বসবাসের জন্য ঢল নেমেছে রোহিঙ্গাদের।

 বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রাখাইনরা পাহাড় কেটে কেটে  ঘরবাড়ি তৈরি করছে। এতে পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশংকা রয়েছে। পরিবেশবিদরা মনে করেন এর ফলে নতুন করে পাহাড় ধসের আশংকা রয়েছে। শরণার্থীরা প্লাষ্টিক ও বাঁশ দিয়ে কোনো মতে তাঁবু টাঙিয়ে বাস করছে। রয়েছে খাবার পানির সমস্যা ও স্যানিটেশন সমস্যা। শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে মানবেতর জীবযাপন করছে।

মিয়ানমার দেশটিতে রোহিঙ্গারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছিল। কিন্তু তাদের উপর সে দেশের সামরিক বাহিনীর, নির্দয়, হত্যাকান্ডের বর্বরতার চিত্র সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে উদ্বেগজনক শরণার্থী সমস্যা। শান্তিতে নোবেল জয়ী গণতন্ত্রকামী মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি। মিয়ানমার দেশটি নিয়ে কথা উঠলেই সু-চির নামটি আগে আসে। যিনি একসময় মানুষের শান্তির জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নোবেল বিজয়ী হয়েছিলেন আজ তারই দেশে কেন এত হত্যা, বর্বরতা, নিষ্ঠুরতার অশান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে? শান্তির জন্য যে নোবেল বিজয়- তার পেছনে লুকিয়ে নেই তো কোন ধোকাবাজির ধোয়াশা খেলা? এ প্রশ্ন এখন বিশ্বের মানুষের মুখে মুখে।

অং সান সুচি আরো বলেছেন- রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণে ভীত নয় মিয়ানমার। তার এই কথার উপর ঘটনার গুরুত্ব সম্পর্কে উদাসিনতা দেখে মানুষ যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। রোহিঙ্গা নির্যাতন, নারী ধর্ষণ ও গণহত্যার অভিযোগে সুচি এবং দেশটির সেনাবাহিনীর উপর বিভিন্ন দেশে গণআদালতে মামলার বিচার শুরু হয়েছে। পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস থেকে আমরা এক সময় জেনেছি মোঘল শাসন আমলে আরাকান রাজ্য দখল, লুটতরাজ, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ কার্য সংঘটিত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে পৃথিবী অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এক সময়ের বার্মা আজকের মিয়ানমারে যে পৈশাচিক, জঘন্য ঘটনা ঘটে চলেছে তা সব আমলের ইতিহাসকে হার মানিয়েছে বোধ হয়। আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের উপর এমন নির্দয় জুলুম অত্যাচার আজকের সভ্যতা কোন চাদরে ঢাকবে?

বাংলাদেশ ছোট একটি দেশ দরিদ্রতা, অধিক জনসংখ্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সহ দেশটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। এতো বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে রোহিঙ্গাদের বাড়তি চাপ বাংলাদেশ কতোটা সামাল দিতে পারবে সে বিষয়টিই এখন দেখার বিষয়। তাছাড়া বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশের উপর বাড়তি চাপ পড়বে। বেড়ে যেতে পারে সন্ত্রাসি কর্মকান্ড, রাহাজানি সহ নানা অপরাধ কর্ম। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন নজিরবিহীন রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটে পড়ে আছে বর্তমান বাংলাদেশ। সামনে এ সংকট আরো বাড়তে পারে।

দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট ছাড়া রয়েছে আরো নানামুখী সংকট। জানা অজানায় তৈরি হচ্ছে ঘটনার নানা ঘনঘটা। রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা কোন্দল লেগেই আছে। যত্রতত্র খুন, নারী নির্যাতন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যার করালগ্রাসে মানুষ এবার কম কষ্ট পায়নি। আছে চাল নিয়ে চালবাজি খেলা। চালের দরদাম বাড়া কমার খেলা। আতপ চাল পোকা-মাকড়ের বসত গড়া অন্যরকম চালবাজি কাহিনী। আরো আছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে নির্বাচনের ভোট যুদ্ধের আগাম প্রসÍুতি। দলের অভ্যন্তরে কোন্দল, বিবাদ, মারামারি হতাহতের নানা ঘটনা। মাদকদ্রব্য সেবনে তরুণ সমাজ নতুন করে ভবিষ্যতকে অন্ধকার পথে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর নামী-দামি হোটেল ও বারগুলোতে সিসার ভয়াবহ নেশায় বুদ হয়ে থাকে তরুণ-তরুণী সহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। এ খবর একটি দেশের জন্য মোটেই সুখকর নয়। চলতে চলতে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে নারী নির্যাতন। বাংলাদেশে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও নারী নির্যাতন চলছেই। হোক সে যে কোনো বয়সের মেয়ে। এ সমস্যা থেকে আমাদের বাঁচার উপায় আছে কি? একটি সমস্যা শেষ হয় আর একটি শুরু হয় এভাবেই চলছে সময় দেশ জাতি। হয়তো সমাধান হবে হয়তো বা হবে না। সময়ই বলবে কথা নদী মাতৃক বাংলাদেশের পদ্মা মেঘনা যমুনার ঢেউ কোন দিকে গড়ায়।  
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক -আইনজীবী  
জজ কোর্ট, ঢাকা।
০১৭১১-৮২৫৫৫৪

এই বিভাগের আরো খবর

নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দুর্ভোগ

মোঃ আমিনুল ইসলাম  :আমাদের দেশের ৯৮% মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বেসরকারি। মোট বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৭,০০০ এবং নন-এমপিও ভুক্ত (বেতন বিহীন) প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮,০৫৫টি। ২০১০ সালে  এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারির সংখ্যা ছিল প্রায় ১,২০,০০০ জন এবং ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ লাখ। গত ৬ বছরে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিও ভুক্ত না হওয়ার কারণে বন্ধ হয়েছে প্রায় ২৮১৩টি নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মোট সংখ্যা ৫,২৪২টি এবং এতে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ এবং শিক্ষক-কর্মচারির সংখ্যা ৭৫০০০ জন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষক ও কর্মচারিদের সরকারি বেতন ভাতাদির অংশ (গচঙ) প্রদান এবং জনবল কাঠামো সম্পর্কিত নির্দেশিকা প্রণীত হয় ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সালে। মার্চ ২০১৩ সাল পর্যন্ত তা সংশোধিত হয়।

 এই নীতিমালা হিসেবে এমপিওভুক্তি করণে সুবিধাপ্রাপ্তির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রেডিং এ- (১) একাডেমিক স্বীকৃতির তারিখ, (২) কাম্য সংখ্যক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, (৩) কাম্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর সংখ্যা, (৪) কাম্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর পাশের হার। এই চারটি শর্ত নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও ভুক্তির জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই উল্লিখিত শর্তগুলো পূরণ করা সত্ত্বেও বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আট বছর যাবৎ এমপিওভূক্ত হয়নি। মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে প্রায় বলে থাকেন যে, নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওকরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু দীর্ঘ আট বছর যাবৎ নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভূক্ত হয়নি এটাকে কি আদৌ চলমান প্রক্রিয়া বলা যায়?

 
২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপিও নীতিমালা তৈরির নির্দেশনা দিলে সে অনুযায়ী নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওকরণ করা হয়নি আজও। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে জাতীয় সংসদে বাজেটোত্তর প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষা মন্ত্রী বলেন বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওকরণ নির্দেশিকা  চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর এমপিওকরণ প্রসঙ্গে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আন্দোলনের সময় শিক্ষামন্ত্রী নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিকরণের জন্য তিন মাস সময় নিয়েছিলেন। যা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়াও জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ১৭তম বৈঠকে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে তা পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেন। যা এখন বাস্তবায়ন হয়নি।


২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের জন্য মোট প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দ হয়েছে ৬৫ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ১৬.৪% এবং শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৩ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য রাখা হয়েছে ৫ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরের তুলনায় ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বেশি হলেও এর প্রতিফলন শিক্ষা খাতে তেমন নেই। নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরেও এমপিও খাতে অর্থমন্ত্রী পৃথক কোন বরাদ্দ রাখেননি এবং এ প্রসঙ্গে বাজেট বক্তৃতায় কোন বক্তব্য তুলে ধরেননি। যা ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা নন-এমপিও শিক্ষকদের হৃদয়ে কষ্টের রক্তক্ষরণ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী কি নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পরিবার-পরিজন নিয়ে একটুও ভাবেন না?


নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ বিনা বেতনে পাঠদান করিয়ে যে ছাত্র-ছাত্রীদের তারা দেশের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। একসময় সেই ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের শিক্ষা জীবন শেষ করে দেশ সেবায় তাদের কর্ম জীবন শুরু করেন এবং পরিবর্তিত হয় সেইসব ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন উন্নয়নের ভাগ্য, কিন্তু পরিবর্তন হয়না শুধু তাদের সেই বেতন বিহীন নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের। অনেক শিক্ষক বিনা বেতনে শিক্ষক হিসেবে অবসর নিয়েছেন। কেউবা আবার বেতনের অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। আমরা কি পারিনা জাতি হিসেবে এ শিক্ষকগুলোকে সম্মান জানাতে? জাতীয় সংসদের বেশ কয়টি অধিবেশনে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও ভুক্তির জন্য স্পীকার, হুইপ এবং সংসদ সদস্যগণ বার বার অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান এবং শিক্ষামন্ত্রীকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বললে, তিনি বলেন যে অর্থ প্রাপ্তির সাপেক্ষে এবং এমপিও নির্দেশিকা অনুসরণ পূর্বক ভবিষ্যতে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।


গত জানুয়ারি ২০১৭ সালে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিও ভুক্তি করণের জন্য ঢাকায় মানববন্ধন এবং অনশন কর্মসূচি পালন করতে গেলে বর্তমান সরকার দলের কয়েকজন এমপি এবং মন্ত্রী তাদের আগামী অর্থবছরে এমপিওভুক্তির জন্য আশ্বস্ত করেন। কিন্তু ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে তার কোন প্রতিফলন বাজেটে পরিলক্ষিত হয়নি। ইতিপূর্বে শিক্ষকরা বেশ কয়েক বার আন্দোলন করতে গেলে তাদের ওপর পুলিশের লাঠি চার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং পিপার স্প্রে নিক্ষেপ সহ অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। আবার অনেকে না ফেরার দেশেও পাড়ি দিয়েছেন।


শিক্ষা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার মূলক বিষয়। শিক্ষক উন্নত ও সভ্য জাতি তৈরি করবে। কিন্তু শিক্ষককে সরকার পারিশ্রমিক দেবেনা। তাহলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং একটি উন্নত জাতি হওয়ার স্বপ্ন আমরা দেখব কিভাবে? শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে আমরা কি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত হতে পারবো? বর্তমান সরকারের ভিশন-২০২১ এর সফল বাস্তবায়ন করতে হলে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এমপিও ভুক্ত করার গুরুত্ব অপরিহার্য। সরকার পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে করে বিশ্বকে যেভাবে হতবাক করে দিয়েছে, তেমনি সকল নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একযোগে এমপিওভুক্তকরণ করে দেশের শিক্ষা সম্প্রসারণ অগ্রযাত্রাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা। নন-এমপিওভূক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণের বছরে দুইটি ঈদ উৎসবের সময় তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক আর্থিক কষ্টে তাদের উৎসবগুলো পালন করে। যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।


নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো ফলাফল করেছে এরকম একটি প্রতিষ্ঠান নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার জোতবাজার মহিলা কলেজ। এটি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ও ২০০৪ সালে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়। কলেজটিতে বর্তমানে মোট শিক্ষক-কর্মচারির সংখ্যা ২৯ জন এবং ছাত্রী সংখ্যা ২৮৫ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ কলেজটির পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল গড়ে প্রায় ৯৬-৯৮%। ২০১৬ সালে কলেজটি থেকে শত ভাগ ছাত্রী পাশ করে এবং ৪ জন জিপিএ-৫ পায়। কলেজটির শিক্ষকগণ বিনা বেতনে পাঠদান করে প্রায় ১৫ বছর ধরে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

অথচ কয়েকবার আশ্বাস দেওয়ার পরও ভালো ফলাফল করেও কলেজটি আজও বেতনভুক্ত (গড়হঃযষু চধুসবহঃ ঙৎফবৎ) হয়নি। যা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আমাদের নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আকুল আবেদন যে, তিনি যেন দেশের সকল নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একযোগে এমপিওভুক্ত-করণের ঘোষণা দিয়ে  নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক কর্মচারিদের দুঃখ দুর্দশাকে দূর  করে দেন। তাহলে দেশের সকল  শিক্ষক সমাজ ও তার নিকট কৃতজ্ঞ থাকবে।
লেখক ঃ প্রভাষক,  
জোতবাজার মহিলা কলেজ
মান্দা, নওগাঁ।
০১৭৪০৮২১৮২৮

এই বিভাগের আরো খবর

সাফল্যের নতুন উচ্চতায় নৃত্যনাট্য বারামখানা ও মহুয়া

বজলুল করিম বাহার :৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বগুড়া’র স্বনামখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী’র আয়োজনে দু’দিনব্যাপী শারদ নৃত্য সন্ধ্যায় শহীদ টিটু মিলনায়তনে লালন শাহের জীবন, আখড়া কেন্দ্রীয় কাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রযোজনা বারামখানা ও ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে মহুয়া নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ হয়েছে। ছুটির আমেজ ছুঁয়ে শারদীয় উৎসবমুখর সন্ধ্যায় আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী’র কলাকুশলীবৃন্দ নিরন্তর হৃদয়াবেগে ও পরম নিষ্ঠার সাথে অনবদ্য এক নৃত্য ও নৃত্যের ছন্দে সকল দর্শক যে বিমোহিত করে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন এটা স্বীকার করা অত্যুক্তি বলে মনে হবেনা।

প্রথম দিবসে নৃত্যনাট্য বারামখানা পরিবেশনার আগে বাংলাদেশ ও ভারতের নন্দিত শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনের মুগ্ধতাও ভুলবার নয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর ভারত থেকে আগত নৃত্যশিল্পী সুইটি দাস-এর ধ্রুপদী নাচ ও সিলেটের কমলগঞ্জের একঝাঁক নৃত্যশিল্পীর মনিপুরী নৃত্য সকলকে সম্মোহিত করে রেখেছিল।

 বিশেষ ভাবে বলতে হয় সিলেটের ঢুলি শিল্পী ও নৃত্যশিল্পীর মাঝে ঠমকের পুং পারষ্পরিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে রেখেছিল। এরপর শুরু হয় নৃত্যনাট্য বারামখানা’র সেই কাংক্ষিত পরিবেশনা। মরমি বাউল সাধক লালন শাহ্-এর জীবদ্দশায় তাঁর আখড়া কেন্দ্রিক জটিলতা, ধর্মব্যবসাকে ভিত্তি করে আখড়ায় নেমে আসা নির্যাতনের স্বার্থান্বেষী চিত্র, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসহায় সুফি মানুষদের গানের মাধ্যমে অহিংস প্রতিরোধ ইত্যাদি সুুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে নৃত্যনাট্যের কুশলী সঞ্চালনের দ্বারা। এর আগে বারামখানা নামের নাট্যানুষ্ঠান প্রযোজনা করেছে এ দেশের স্বনামখ্যাত নাট্য সংগঠন ঢাকা থিয়েটার। ঢাকা থিয়েটার প্রযোজিত এ নাট্যটির নামকরণ করা হয়েছিল বারামখানা নামে।

লালনের একটি গান থেকে এই নামটি নেওয়া হয়েছিল। বারামখানা’র নানা অর্থ রয়েছে। তবে লালন-এর বসবাসের জায়গা বা আখড়াকেও বারামখানা বলা হয়। অনেকে সৃষ্টিকর্তার আবাসস্থল হিসেবেও একে চিহিৃত করেন। তবে এই নৃত্যনাট্যে লালনের আখড়াকে বারামখানা বোঝানো হয়েছে। বারামখানা নৃত্যনাট্যে আখড়া কেন্দ্রিক বিদ্যমান পরিস্থিতিকে বোঝাতে লালন-এর যে গানগুলো চয়ন করা ও গাওয়া হয়েছে তা এই নৃত্যনাট্যের ধারাবাহিকতা প্রকাশে সুন্দরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং গানের সাথে সাথে নৃত্যনাট্যের অংক অনুযায়ী নৃত্যশিল্পীদের নৃত্যের পরম্পরা ও সিংক্রোনাইজেশন অনবদ্য হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

 বিশেষত লালন সাঁই-এর চরিত্রে রূপদানকারী মাহাবুব হাসান সোহাগকে ধন্যবাদ দিতে তাঁর এই চরিত্রে একাত্ম হয়ে যাওয়ার দক্ষতা দেখে। নৃত্যনাট্যের পুরুষ ও নারীদল উভয়েই দলীয় নৃত্য ভালো লেগেছে। আখড়া আক্রমণকারী পুরুষ দলীয় নৃত্যের পরিবেশনা মুখোশ পরা অবস্থায় দৈহিক অভিব্যক্তি কাহিনীর সাথে চমৎকার হয়েছে। এক কথায় দলীয় টিমওয়ার্ক গানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কোরিওগ্রাফির নৈপুণ্য অনন্য করে তুলেছে এই নৃত্যনাট্যকে এই সংগঠনের প্রাণপুরুষ আব্দুস সামাদ পলাশ-এর নির্দেশনায় বারামখানা’র পরিবেশনার সাফল্য আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠীকে এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে বিদ্দজনেরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।

তবে একই প্রসঙ্গে একটি উপস্থাপনা করা যায় বারামখানা এমনিতেই একটি ভারী কঠিন কাঠামোর নৃত্যনাট্য। দিব্যজ্ঞানী লালন ফকিরকে উপলব্ধিতে আনা ততোধিক নিষ্ঠা ও শ্রমলব্ধ ব্যাপার। সেজন্য বারামখানা পরিবেশনার সময় প্রতিটি অংকের ঘটনাপ্রবাহ সুর করে বিবৃত করার সুযোগ করে দিল। তাতে শ্রোতা সাধারণের এই নৃত্যনাট্যের ঘটনা বুঝতে পারা সহজ হতো বলে অনুমিত হয়। এই নৃত্যনাট্যের সিরাজ সাঁই চরিত্রে রূপদান করেছেন আব্দুস সামাদ পলাশ। লালনের প্রধান ভাবশিষ্যা রূপে আনা আক্তার যথাযথ ভূমিকা পালন করেছেন। নৃত্যনাট্যের সব কলাকুশলীই তাদের পরিশীলিত দক্ষতা দেখাতে যে প্রয়াস রেখেছেন তার জন্য তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।


কন্ঠসঙ্গীতে ফরিদা পারভিন, শফি মন্ডল, চন্দনা মজুমদার, পার্বতী বাউল, শাহানাজ বেলী ও রিংকু পরিবেশিত লালন গীতির সাথে নৃত্যের সিংক্রোনাইজেশন উতরে গেছে। ভালো লেগেছে দর্শকদের ভালো লেগেছে এর রূপসজ্জার ধরন-ধারনে। যা অপরিহার্য তা তারা ব্যবহার করেছেন। আব্দুস সামাদ পলাশ-এর নৃত্য নির্দেশনায় ও লায়ন আব্দুল মোবিন জিন্নাহ্-এর নাট্য নির্দেশনায় ক্রমেই যে উৎকর্ষের খোলস ছড়াচ্ছে এর প্রমাণ বারামখানা’র মঞ্চায়নে সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে। উৎসবের দ্বিতীয় দিবসে ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে মহুয়া নৃত্যনাট্যটি পরিবেশিত হয়।

দ্বিজ কানাই রচিত এতদ অঞ্চলের জনপদের এই প্রেমকাহিনী নিয়ে যাত্রা পালা ও চলচ্চিত্র তৈরী হয়েছে। সাঁপুড়ে কন্যা মহুয়া ও জমিদার তনয় নদের চাঁদ এর প্রেমের সম্পর্ক, বিচ্ছেদ ও আত্মাহুতির মাধ্যমে এক বিয়োগান্ত পরিণতি এর কাহিনী। মালিহা তাবাসসুম খেয়া ও মাহাবুব হাসান সোহাগ, মহুয়া ও নদের চাঁদ এর মূখ্য চরিত্রে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। হোমরা বাইদা ও তার দলীয় নৃত্য পরিবেশনাও একে প্রাণবন্ত করে তুলতে পেরেছে। আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী’র এই শারদ নৃত্য সন্ধ্যা পরিবেশনা বহুকাল যে দর্শকদের স্বস্তি যোগাবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
লেখক ঃ কবি ও প্রাবন্ধিক

এই বিভাগের আরো খবর

এখনো খাদ্য ঘাটতিতে আমরা……

‘নার্গিস জামান :তেলে তেল জমে/ চাকেতে জমে মধু! বিত্তবানেরা সুখে ভোগে/ গরীবের ভাগে কদু!’ চার লাইনের এই চতুরঙ্গি দিয়ে আজকের লেখা শুরু। বলবো ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে। আমার আজকের বিষয়, ‘এখনো খাদ্য ঘাটতিতে আমরা’ অথবা ‘আমরা কি আদৌ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ?’ সে উত্তর খোঁজার আগে বলবো- বাতাসে কাদের যেন ‘কষ্ট’ শুনতে পাই। স্বচ্ছল সুখ ছায়ার গন্ডিটুকু পেরিয়ে বাইরে কান পাতুন, আপনিও শুনতে পাবেন সেই ‘কষ্ট’।
ধান, ঘাস, মাছ, হাঁস সব নিয়ে গেল;
অকাল গাঙ্গের জল!
নিলনা কেবল দুঃখটুকু,
হাওড়িয়াদের কষ্ট অতল!
কথা সত্য! দূর্যোগ কখনো ছাড় দেয়না। পানি নেমে গেছে, হাওড়বাসীর দুঃখ নামেনি কেবল!
তবে প্রকৃতি তার রহস্যময়তা দেখাতেই পারে, এটা নতুন কিছু নয়। আর পুরনো কথা হলো, জেনে বুঝেও আমরা সতর্ক নই। রুদ্র প্রকৃতিকে থামানো সম্ভব নয়, সম্ভব নিজেদের সেভ করা। প্রতিষেধকের মত আগেই মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকা। কিন্তু প্রতিটি দূর্যোগই আমাদের শিক্ষা দিয়ে যায়, তবুও আমরা শিখিনা, সতর্ক হই না। এপ্রিল ২০১৭ সুনামগঞ্জ সহ কয়েকটি জেলা ভাসিয়ে নিলো বন্যার জল। সমস্ত ফসল তলিয়ে গেল, চারদিকে অপ্রাপ্তি, হতাশা আর স্বপ্ন ভঙ্গের বিষবাষ্প! কিন্তু কেন? আমরা না খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ! পুরো দেশ নয়, দেশের মাত্র একটি অঞ্চল প্লাবিত, একটি মাত্র আবাদি মৌশুম, বোরো নষ্ট হয়েছে। আমন পেয়েছি, সামনে আবার আমন পাব। তথাপিও কেন দৌড়াদৌড়ি, ছুটোছুটি? তবে কি হঠাৎ বিপদ কাটিয়ে উঠার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই আমাদের? যদি থাকতো, দেশের মোট উৎপাদিত শস্য দিয়ে একটি অঞ্চলের এক মৌশুমের বিপর্যয় অনায়াসেই কাটিয়ে নেয়া যেত। যদি বলি খাদ্য ঘাটটিতে আছি আমরা? তর্ক বেঁধে যাবে।

 কিন্তু যদি বলি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ আমরা, এখানেও খটকা লাগে। যেহেতু মজুদ কম থাকার কারণে বন্যা মোকাবিলায়, সাথে সাথে চাল আমদানির জন্য ছুটোছুটি করতে হয়েছে। অথচ আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ! স্বয়ংসম্পূর্ণ মানে কি? অভিধান বলে, স্ব-আত্ম আর স্বয়ং- নিজ চেষ্টা দ্বারাই সিদ্ধি লাভকারী। ইংরেজিতে বলে ঈড়সঢ়ষবঃব রহ ংবষভ, ঝবষভ ংঁভভরপরবহঃ. বলছি আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, আবার দূর্যোগ হোক আর নাই হোক চাল আমদানির জন্য ছুটছি। কথা আর কাজে কেমন যে বৈপরিত্য বিরাজ করছে না? আজ চালের মূল্য ৫০-৭০ টাকা ! চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে শুল্ককে দায়ী করা হচ্ছে। জনগণ মনে করে শুল্ক কোন সমস্যা নয়, সমস্যা অন্য কোথাও। আগেও শুল্ক দিয়েই চাল আমদানি করা হত! মন্ত্রীরাই বলছেন, চাল নিয়ে চালবাজি হচ্ছে। যদি তাই হয় তবে সব কিছুর আগে ‘শর্ষের ভূত তাড়াতে হবে। এত কিছু কাজও হচ্ছে বলে মনে হয়। খবর পাওয়া যাচ্ছে- অভিযানের ফলে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। নিশ্চয় এটা আশার কথা।   


আমাদের দেশ নরম মাটির দেশ। এখানে শস্য উৎপাদনে বিপ্লব ঘটানো যেতে পারে। অন্তত দেশীয় শস্যগুলোর জন্য যেন আমদানি নির্ভর হতে না হয় আমাদের, সেই দিক বিবেচনা করে কৃষিকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের একের পর এক বিশাল বাজেট, এখানে কৃষি ও কৃষকের প্রাধান্য সর্বাগ্রে দিতে হবে, কারণ খাদ্য মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে প্রধান চাওয়া। ভাতের হাহাকার সবচেয়ে বড় হাহাকার! কবি রফিক আজাদ অভুক্তদের মনের কথাই বলেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র চিবিয়ে খাব।’ আমরা কৃষির দিকে একটু তাকাই। কৃষকদের সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড় করানো হয়েছে বলে দাবি করছি আমরা। অথচ কৃষকদের মাঝে হাহাকার বিদ্যমান।

তারা উৎপাদন খরচ আর উৎপাদিত ফসলের মাঝে যোগ বিয়োগ করে কোন উদ্বৃত্ত পাচ্ছে না। এক কৃষক বললেন, লেবার খরচ বাঁচাতে নিজের ধান মাড়াই, সিদ্ধ, শুকনো করছি নইলে যা ধান পেয়েছি তার চেয়ে খরচ যায় বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এএফও) আমাদের সেরেস পদকে ভূষিত করেন। অথচ আমাদের কৃষক দিশেহারা পাখির ন্যায় ছটফট করছে! কিন্তু কেন? তলিয়ে দেখা দরকার। কৃষক যদি ফসলের ন্যায্য মূল্য বা উৎপাদিত খরচের তুলনায় বেশি মূল্যে ফসল বিক্রয় করতে পারে তাহলে তারা খেয়ে পরে তাদের হাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকবে, তখন তারা নিজেরাই উদ্যম নিয়ে আবাদ করতে পারবে, হাত পাততে হবে না। তাদের ভর্তুকি বা প্রণোদনাও দিতে হবেনা।

 যুগ যুগ তাদের ভর্তুকি না দিয়ে আমরা ফসলের মূল্যের দিকে নজর দিলে তা ফলপ্রসূ হবে। সহায়তা বলতে ভালো বীজ, ভালো চারা, সুলভে সার, প্রশিক্ষণ এসবে সহযোগীতা করা যেতে পারে। কিন্তু আবাদ করার জন্য কৃষকের নিজের অর্থ থাকবে যখন, তখনই কৃষক ও কৃষিকে স্বনির্ভর বলতে পারবো। তাদের ফসলের মূল্যায়ন করতে হবে। বিজ্ঞ কর্তৃপক্ষের সে সম্পর্কিত নানান দিকগুলো ভাবতে হবে এবং ব্যবস্থা নিতে হবে। আমদানির প্রভাব যেন কৃষকদের ওপরে না পড়ে তা দেখতে হবে।

আগে দেশি পণ্যের মূল্যায়ন তারপরে আমদানি। কথায় আছে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। সময় থাকতেই কৃষিকে স্বনির্ভর করতে না পারলে ভবিষ্যতে এদেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা দেশীয়ভাবে যোগান দেয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদের কৃষিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে আগে, তাহলে অভ্যন্তরীণ শস্য দিয়েই আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবো এক সময়। আমদানি করতে হবেনা হয়ত। দূর্যোগ থাক না থাক চাল আমদানি করতেই হচ্ছে বরাবর। যেখানে দেশে ৬৫% মানুষ কৃষিজীবি সেখানে কৃষিখাতে আমাদের সর্বোচ্চ বাজেট রাখা প্রয়োজন, আগে খাদ্য নিরাপত্তা তারপরে অন্যকিছু।

 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর ২ কোটি ৬৪ লাখ টন চাল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে, কিন্তু (বি আই ডি এস) তাদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর ২ কোটি ৮৬ লাখ টন চাল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সরকারিভাবে যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়, তাতে উৎপাদিত খাদ্যের পরিমান ৫ থেকে ৮ শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হয় এবং খাদ্যের ভোগ ১৫ শতাংশ কম দেখানো হয় ফলে চালের প্রকৃত উৎপাদন এবং ভোগের মধ্যে ২০ শতাংশের মতো ব্যবধান পরিলক্ষিত।

সেখানে আরো বলা হয়, ‘বিগত সময় থেকেই লক্ষ্য করা গেছে যে, আমাদের সরকারগুলোর একটি সাধারণ প্রবণতা হলো তারা সাফল্যকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখাতে চায় আর ব্যর্থতাকে আড়াল করতে চায়। ৯ জুন/১৭ আরেকটি জাতীয় দৈনিক প্রকাশ, দারিদ্র্যের হার কমে ২৩.২ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী দারিদ্র্যে কমে দাঁড়িয়েছে ২৩.২ শতাংশ সংস্থার হিসেব অনুযায়ী অতি দারিদ্র্য ১২.৯ শতাংশ। দারিদ্র্যতা কমেছে এটা আশার কথা।

 কিন্তু এখনো ২৩.২ শতাংশ দারিদ্র্য এবং ১২.৯ শতাংশ অতি দারিদ্র্যতা রয়েছে এ দেশে। ৩১মে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবসে আরেকটি দৈনিক প্রকাশ, “পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে চার কোটি লোক দারিদ্র্য সীমার নীচে আর ২ কোটি লোক রয়েছে যারা চরম দারিদ্র্য সীমার নীচে।” তাহলে ২ কোটি লোক এখনো অতি দারিদ্র্য সীমার নীচে অনাহার অর্ধাহারে বাস করছে। একজন ব্যক্তি তার অর্জিত আয় দিয়ে ২২শ ক্যালরি পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের সামর্থ্য থাকলে তাকে দারিদ্র্যমুক্ত বলা হয়। এর কম খেলে দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে বলে ধরা হয়। আর ১৮শ ক্যালরির কম হলে অতি দারিদ্র্যের তালিকায় বিবেচনা করা হয়। তাহলে কি করে বলবো আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যেখানে ২ কোটি লোক ১৮শ ক্যালরি খাদ্য জোটাতে পারছে না।

 দেশ এগিয়েছে দারিদ্র্যও কমেছে বটে কিন্তু দারিদ্র্য নির্মূল হয়নি এখনো। ছোট্ট একটি দেশে মোট ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ২ কোটি মানুষ অর্ধাহারে বা অনাহারে থাকাটা কম কথা নয় কিন্তু। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘দারিদ্র বিমোচনের যে সাফল্য এতে আমাদের সামাজিক সুরক্ষা সঠিকভাবে এগিয়েছে তবে এ ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দারিদ্র্য কমে আসায় আত্মতুষ্টিতে ভোগার কারণ নেই।’ তাহলে আমরা এখনো বুক ফুলিয়ে বলতে পারিনা, আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আপনি আমি নিজে ভরপেট খেয়ে যদি ভাবি, বাহ! দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ তাহলে চলবেনা বরং ওই ২ কোটি মানুষের ভরপেট খাদ্যও নিশ্চিত করতে হবে এখনো, উৎপাদন কিংবা আমদানি যে করেই হোক। আর আমদানি যদি করি, তাহলেই বা কি করে বলি, আমরা খাদ্যে, কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ? নিরসন হোক নিশ্চিত হোক ওই দুই কোটি অতি দারিদ্র্যের খাদ্য নিরাপত্তা, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক ঃ সহকারী শিক্ষক
০১৭৩০-২৬৪৪৯৭

এই বিভাগের আরো খবর

শিক্ষার মান নিয়ে কথা

প্রফেসর মোঃ খালিকুজ্জামান চৌধুরী :শিক্ষার্থীর জীবনে প্রত্যেকটি পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা ও উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা কিছুটা আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে বলে মনে করি। কারণ তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় প্রথম শ্রেণি থেকে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণের পর সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। পরীক্ষায় পাস করলে তার স্কুল জীবনের সমাপ্তি ঘটে। পরীক্ষার ফলাফলের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় শিক্ষার্থীর ১০ বছরের অর্জন যা তার শিক্ষা জীবনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

আর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে তার কলেজ জীবনের সূচনা হয়। ২ বছর মেয়াদী কোর্স শেষে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। পরীক্ষায় পাস করে সে তার পছন্দমতো বিষয় ও প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখে- সামনে উন্মোচিত হয় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের দ্বার। অবশ্য পছন্দের বিষয় ও প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য ভর্তিযুদ্ধে লড়তে হয় তাকে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে টিকে থাকতে হয়। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে অধীর আগ্রহ নিয়ে ফলাফলের অপেক্ষায় থাকে শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিভাবক ও আত্মীয়-স্বজনও তাকিয়ে থাকেন ফলাফলের দিকে।

প্রসঙ্গত স্মরণ করছি চলতি ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত দুটি পরীক্ষা- এসএসসি ও সমমান এবং এইচএসসি ও সমমান। প্রথমটির ফল প্রকাশিত হলো ৪ মে, ২০১৭ আর দ্বিতীয়টির ২৩ জুলাই, ২০১৭। দুটি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিগত বছরগুলোর তুলনায় পাসের হার কমে গেছে, কমে গেছে জিপিএ- ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। দেশের শিক্ষাবিদ ও গুণীজনরা বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবে না দেখে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘পরীক্ষার এরূপ ফলাফলে আমি অসন্তুষ্ট নই, কারণ শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ।

পরীক্ষার খাতা ভালোভাবে মূল্যায়ন করার কারণেই এ ফল হয়েছে। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি প্রশংসাযোগ্য।’ আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন। পরীক্ষায় পাস ফেল নিয়ে না ভেবে শিক্ষার মান বাড়াতে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করে গড়ে তুলে এর গুণগত মানের দিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রয়োগ করেছি। পরীক্ষার খাতা দেখার পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন করা হয়েছে, তা সময়োপযোগী।’ শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি ভালো লক্ষণ। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।

এবার উক্ত দুটি পরীক্ষায় উত্তরপত্র মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতিকে প্রশংসাযোগ্য বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন অনেকেই। প্রসঙ্গত, বিগত বছরগুলোতে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় মূল্যায়ন পদ্ধতি কেমন ছিল বিষয়টি উঠে এসেছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও সমমান এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান উভয় পরীক্ষাতেই পরীক্ষার্থীদের খাতাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। পরীক্ষকগণ নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে ভালো ফলাফল দেখিয়েছেন।

এতে তুলনামূলক কম মানের শিক্ষার্থীরা ভালো বা আশাতিরিক্ত ফল পেয়ে গেছে- পাসের হার বেড়েছে, জিপিএ- ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। বিগত বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করার পেছনে বিভিন্ন কারণের মধ্যে এটি একটি বড় কারণ বলে মনে করা হয়। পরীক্ষক সূত্রে প্রকাশ, তারা নির্দেশনা অনুযায়ী ভালো ফল দেখানোর জন্য পরীক্ষার্থীদের নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে: ‘পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের গাফিলতি ছিল।

তারা কেউ কেউ পরীক্ষার্থীদের খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেননি। তারা অনেক ক্ষেত্রে অনুমানভিত্তিক নম্বর দিয়েছেন।’ এ প্রসঙ্গে আমাদের কথা হলো: নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে ভালো ফল দেখানো আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও এটি প্রকৃত ভালো নয়। এতে কোনো লাভ হয় না; বরং শিক্ষার্থীদের ক্ষতিই করা হয় যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রতীয়মান হয়েছে। আর পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পরীক্ষকদের গাফিলতি দায়িত্ব অবহেলার সামিল।

দায়িত্ব অবহেলার কারণে উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়িত না হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে অন্ধকার নেমে আসতে পারে- অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে তাদের ভবিষ্যৎ জীবন। তাই এটাকে সহজভাবে দেখার নয়। পরীক্ষকদের গাফিলতি বা দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ পেলে তা রোধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন নয়, দায়িত্ববোধ নিয়ে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে তথা শিক্ষার্থীদের জীবন গড়তে এটি দরকার।


শিক্ষার মানোন্নয়নে জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান চর্চার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানস্পৃহা জাগ্রত করে তুললে তারা জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকাটা বড়। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে দেশে জ্ঞান চর্চার বড়ই অভাব। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো করতে না পেরে মানসিক যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ভালো জিপিএ- ভালো সার্টিফিকেট নিয়েও অনেকে কোনো জায়গাতেই স্থান করে নিতে না পারায় বেকার বসে আছে।

এর প্রধান কারণ জ্ঞানের অভাব। জ্ঞানের চর্চা নেই। এ প্রসঙ্গে সাবেক শিক্ষা সচিব এবং সাবেক পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ড. সা’দত হোসাইনের কথা মনে পড়ছে। এক পর্যায়ে তিনি চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘তোমরা ২ পাতা নির্ভুল বাংলা এবং ২ পাতা নির্ভুল ইংরেজি লিখে আমাকে দেখাও, আমি তোমাদের চাকরি দেব।’ তাঁর এই কথাগুলোর মধ্যে ধ্বনিত হয়েছে জ্ঞানের দৈন্যদশা। দেশে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হতাশার সুরে কথা বলেছেন গুণীজনরা। এখানে আমার শিক্ষক ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথা স্মরণ করছি। তিনি বলেছেন, ‘সারাদেশে এখন জ্ঞানের চর্চা নেই। গবেষণা নেই। প্রকাশনা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য গবেষণা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। গবেষণা হলেও তার সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে।’

শিক্ষার নামে বাণিজ্য শিক্ষার মান উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায়। বর্তমানে দেশে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। জনসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। কোচিং সেন্টারগুলো রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এসবের লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের জ্ঞানস্পৃহা জাগ্রত করে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করা এবং সঠিক নির্দেশনা দিয়ে তাদের জীবন গড়তে সাহায্য করা। কিন্তু তা না হয়ে যদি মূল লক্ষ্য হয় বাণিজ্যিক, তা হলে সেটি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্যও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারগুলোতে খোঁজ নিলে দেখা যায়, কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে – এগুলোর উদ্দেশ্যই হয়ে দাঁড়িয়েছে মুনাফা অর্জন।

ভয়াবহ চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বর্তমানে দেশে মোট ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছে। বাকি বেশির ভাগই ব্যবসার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। জ্ঞান বিতরণের দিকে এসব শিক্ষাঙ্গনের কোনো দৃষ্টি নেই। পড়ালেখার উপযোগী পরিবেশ নেই। খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়েই মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই মানহীন শিক্ষক। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। লাইব্রেরি-ল্যাবসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাব রয়েছে। খেলাধুলার জন্য কোনো মাঠ নেই। গবেষণা হচ্ছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো গবেষণা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ম-নীতি ও আইন-কানুনের তোয়াক্কা করছে না। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সনদ ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত।

শিক্ষার মানোন্নয়নে জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান চর্চার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা থাকবে। লাইব্রেরি-ল্যাবসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষার উপকরণ থাকবে। খেলাধুলার জন্য মাঠ থাকবে। ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ করে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়ম-নীতি ও আইন-কানুন মেনে চলতে হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা থাকবে ইতিবাচক। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবেন সরকার।

মানহীন শিক্ষার গুরুত্ব নেই। মানহীন শিক্ষা গ্রহণ করে ঘরে বসে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বর্তমানে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। লক্ষ লক্ষ ছেলে-মেয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে কোনো চাকরি না পেয়ে বেকার জীবন কাটাচ্ছে। যেসব গ্রাজুয়েট সৃজনশীল নয়, উৎপাদন কাজে অংশগ্রহণের উপযোগী না তাদের অবস্থা আরও করুণ। এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। সমস্যা সমাধানে কর্মমুখী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের দেশের সবাই মৌলিক শিক্ষা লাভ করবে।

কিন্তু সবাইকে উচ্চশিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সবাই উচ্চশিক্ষিত হলে এদের কর্মসংস্থান করা হবে কোথায়? মৌলিক শিক্ষা গ্রহণের পর একটি বড় অংশ চলে যাওয়া উচিত বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাতে। এসএসসি বা সমমান পাস করার পর একটি অংশ চলে যাওয়া উচিত কারিগরি শিক্ষার পথে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হলে দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এতে দেশের অর্থনীতি সচল হবে, উৎপাদন বাড়বে। যারা তুলনামূলক বেশি মেধাবী তারা যাবে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। উচ্চশিক্ষিতরা গবেষণা করবে, বড় বড় ক্ষেত্রে নিজেরা যুক্ত হয়ে দেশের জন্য অবদান রাখবে।

বিশ্বায়নের যুগ চলছে। মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। সময়ের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে অনেক দেশ। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা পিছিয়ে থাকতে পারি না। আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। বেকারত্ব ঘুচিয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের নিমিত্তে, অব্যাহত প্রতিযোগিতায় স্থান করে নিতে এবং একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে মানহীন নয়, মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ আবশ্যক।  
 লেখক ঃ অধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত)
০১৭১৮-৭৪৭৪৪১

এই বিভাগের আরো খবর

নৃশংস বর্বরতা : প্রাণ যাচ্ছে বিনা বিচারে

আব্দুল হাই রঞ্জু  :আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমাদের সংবিধান আছে। সে অনুযায়ী আইনও আছে। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয় না, অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য। উল্টো আইনের কথা বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ কেউ সুযোগ নিয়ে থাকেন। প্রকৃত অর্থে অনেক রক্তের বিনিময়ে দেশটি স্বাধীন হলেও কার্যত আইনের শাসনের প্রয়োগের বদলে অপপ্রয়োগই দেদার হচ্ছে। সংগত কারণে মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়, যা আমাদের সংবিধানের পুরোপুরি লংঘন। যখন কোন মানুষ আইনকে হাতে তুলে নেয়, তখন ন্যায় বিচারের বদলে বর্বরতা, নৃশংসতার আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ আইনের আওতায় অপরাধিদের বিচার হলে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে একজন অপরাধীও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়।

 কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, দেশে আইন-আদালত থাকলেও অনেকেই সে সবের তোয়াক্কা না করে চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, ধর্ষক হিসেবে কাউকে চিহ্নিত করে বেধড়কভাবে মারপিট করায় অনেকের জীবন প্রদীপ নিভে যায়। কিন্তু এভাবে সন্দেহের বশিভূত হয়ে কাউকে গাছে বেঁধে মারপিট করলে প্রকৃত শাস্তির বদলে মৃত্যুই যেন হয় তার শেষ ঠিকানা। কিন্তু এভাবে কাউকে নির্যাতন করে পঙ্গু করা কিম্বা খুন করা কোন সভ্য রাষ্ট্রে ঘটে না অথচ অসভ্য ও বর্বর যুগের মতোই আমাদের সমাজে অনেক প্রভাবশালী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে খুন খারাপি করেই চলছে। কিন্তু এটা যে আইনের লংঘন এবং চরমভাবে অপরাধের শামিল হলেও কার্যত এ ধরনের অপরাধীদের বিচার আমাদের দেশে হয় না।

একদিকে প্রভাবশালী অন্যদিকে সাক্ষীর অভাব, প্রকৃত আলামতের অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। আইন হাতে তুলে নেয়ার সংস্কৃতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক বেড়েছে। পুলিশ বিভাগ ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য মতে, গত আট বছর গণপিটুনিতে ১ হাজার ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি বছরে মৃত্যু হয়েছে ৫৭ জনের (সুত্র: দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, তাং- ২৮/০৯/১৭)। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার অভাবে গণপিটুনির মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ঘটনাকে বিচার বহির্ভূত বলাই যথার্থ। যখন কোন দেশে বিচার বহির্ভুত ঘটনা ঘটে, তখন আইনের শাসনের অপমৃত্যু ঘটে। যা সুস্থ ধারার একটি রাষ্ট্র কাঠামোয় কেউই আশা করে না।

কিছুদিন আগে চোর সন্দেহে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সিলেটের কিশোর রাজন। সে ক্ষত না শুকাতেই অতি সম্প্রতি চুরির অভিযোগে ময়মনসিংহের কিশোর সাগরকে প্রভাবশালীরা গাছের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক মারপিট করায় সেও চলে যায় না ফেরার দেশে। অথচ চুরি বলতে মোবাইল চুরি কিম্বা ছোট খাটো অভিযোগে এসব কিশোরদের নরপশুরা কিভাবে পিটাতে পিটাতে মেরে ফেলতে পারে, যা ভাবতেও অবাক লাগে। অথচ যখন ওদের ওপর নির্মম নির্যাতন চলে, তখন প্রত্যক্ষদর্শীরা মজা করলেও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।

 উল্টো এসব নির্মমতার দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে তা যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। প্রকৃত অর্থে রাজন, সাগর যে চুরি সংগঠিত করেছে, তার প্রমাণই বা কোথায়? অর্থাৎ এখন মানুষের জীবনের মুল্য সবচেয়ে কমে এসেছে। তা না হলে হাসতে হাসতে যারা এ ধরনের খুন খারাপি সংঘটিত করছে, তাদের তো কোন বিচার হয় না। কিন্তু ভুললে চলবে না, প্রভাবশালীরা যতই শক্তিধর হোক না কেন, তাদের বিচারের আওতায় আনতে না পারলে প্রকৃত অর্থে আইনের শাসনকে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। হতভাগা দর্জি বিশ্বজিৎকে ঢাকায় কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল। সে খুনের ঘটনা গণমাধ্যমের সুবাদে কম বেশি দেশের মানুষ দেখেছে। দ্রুত বিচার ট্রাইবুলালে সে নির্মম হত্যাকান্ডের বিচারে নি¤œ আদালত প্রকৃত অপরাধীদের মৃত্যুদন্ড দিলেও আপিলে অধিকাংশ মৃত্যু দন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। তবুও বলবো, সে নির্মমতার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। এ ভাবে প্রতিটি হত্যাকান্ডের বিচার দ্রুত বিচার আইনে স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করে, তা কার্যকর হলে আইন হাতে তুলে নেয়ার দু:সাহসিকতা অনেকাংশেই কমে আসবে।

শুধু বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার রায়ই নয়, এর পাশাপাশি গত ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর রাজন হত্যার রায়ে ৪ জনের ফাঁসীর আদেশ হয়। এরপরে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনির সংখ্যা অনেকটাই কমে আসে। যা ২০১৭ সালে এসে আবার বাড়তে শুরু করে। অতিসম্প্রতি বগুড়ায় ২০ বছরের রাসেল নামে এক শ্রমিকের পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা করা হয। এ নির্মম ঘটনায় রাসেলের বাবা বাদি হয়ে থানায় মামলা করলে অভিযুক্ত রুবেলকে পুলিশ গ্রেফতারে সক্ষম হয়। তাকে ৫ দিনের রিমান্ডেও নেয়া হয়েছিল। শুধু রুবেলের রিমান্ডই নয়, ময়মনসিংহের সাগর হত্যার অভিযুক্ত আসামী আক্কাছকে পুলিশ গ্রেফতার করে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল। শুধু রিমান্ডে নিলেই হবে না, এ ধরনের অপরাধে অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত না হলে শিশু কিশোর হত্যা প্রবণতা রোধ করা কঠিন হবে।

দেশে নৃশংসতা-নির্মমতা দিনে দিনে ভয়ংকর অবস্থার দিকেই যাচ্ছে। অপরাধীরা এতই বেপরোয়া যে, যাদের হাত থেকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, অভাবী গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীও রেহাই পাচ্ছেন না। গত ১ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভৈরব ব্রীজের টোল প্লাজার পাশেই ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে এক পুলিশ কনস্টেবল প্রাণ হারায়। এ ঘটনাই প্রমাণ করে ছিনতাইকারীরা সাম্প্রতিক সময়ে কি পরিমাণ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আর এক মর্মান্তিক ঘটনা আমাদেরকে দারুনভাবে ব্যথিত করেছে। দিন মজুর বাবার মেধাবী ছেলে আল-আমিন। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে আল-আমিনই বড়। বগুড়ার নন্দিগ্রাম উপজেলার জামরুল গ্রামে ওদের বাড়ী। দিন মজুর বাবা রফিকুল ইসলামের পক্ষে আল-আমিনের লেখা পড়ার খরচ যোগানো সম্ভব ছিল না।

একমাত্র অবলম্বন লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে টিউশনি করে জোগাড় করতেন পড়ালেখার খরচ। এভাবে এইচএসসি পর্যন্ত পাস করে আল-আমিন গত বছর বগুড়ার আজিজুল হক সরকারি কলেজে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। নিজের লেখপড়ার খরচ সংগ্রহের পাশাপাশি দিন মজুর বাবাকে কিছুটা আর্থিকভাবে সহায়তার কথা চিন্তা করেন। শেষ পর্যন্ত টিউশনির কিছু জমানো টাকা, আর বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে ধার নেয়া টাকায় একটি ব্যাটারি চালিত রিক্সা কিনেন। দিনে ক্লাস করেন, আর রাত হলেই রিক্সা নিয়ে নেমে পড়েন শহরে। অটো রিক্সার উপার্জনে  নিজের খরচ আর বন্ধু বান্ধবদের ধার পরিশোধ করা ভাল ভাবেই চলছিল। কিন্তু কপাল খারাপ, হতভাগ্য আল-আমিন গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রিক্সা নিয়ে বের হলে ছিনতাইকারীরা আল-আমিনকে ছুরিকাঘাত করে রিক্সাটি নিয়ে চম্পট দেয়।

 রক্তাক্ত অবস্থায় জনৈক রিক্সা চালক আল-আমিনকে শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু আল-আমিনের যে পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়েছে, তাকে আর  বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মুহূর্তেই হতভাগা আল-আমিনের স্বপ্ন ছিনতাইকারীদের ছুরির নিচে ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। কি দুর্ভাগ্য আল-আমিনের। রিক্সা চালিয়ে মেধাবী আল-আমিন স্বপ্ন দেখছিলেন, লেখাপড়া শেষ করে এক উজ্জল ভবিষ্যতের। কিন্তু সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দুর্ভাগার কালো রাত সহসাই প্রভাত হয় না। শুধু একা আল-আমিনের জীবন প্রদীপ নিভে যায়নি, নিভে গেছে গোটা পরিবারের স্বপ্নের প্রদীপ। কিন্তু কেন? আমাদের সমাজটা কেন দিনে দিনে অমানবিক হয়ে উঠছে? হয়ত উত্তর মেলানো কঠিন। তবে, এটুকু বলা যায়, অন্যায়, ব্যাভিচার, দুর্নীতি, লুটপাটের গর্ভেই জন্ম নেয় সন্ত্রাস, সহিংসতা আর নির্মমতা। পুঁজিবাদি রাষ্ট্র কাঠামোয় এটাই বাস্তবতা।

যে সমাজ ব্যবস্থায় লুটপাট, দুর্নীতি, শোষণ, বৈষম্যের যাঁতাকলে বৃহৎ জনগোষ্ঠী নিষ্পেষিত হবে, আর গুটিকতক মানুষের ভোগবিলাস, বিত্তবৈভবের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে মাদক আর অনৈতিকতার বিশাল সামাজ্য। অর্থাৎ বিত্তবৈভবে সমৃদ্ধ হতে মাদকের মত ব্যবসা করতেও বিত্তশালীরা পিছিয়ে পড়ে না। যাদের কারণে মাদক রোধ ও চুনোপুটি মাদক ব্যবসায়ীরা ব্যাঙের ছাতার ন্যায় গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। আর মাদকের অর্থ যোগাতে তরুণ যুবকরা ছিনতাই, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি থেকে শুরু করে খুন খারাপি করতেও দ্বিধা করছে না। ফলে আমাদের দেশটিতে প্রতিনিয়তই খুন খারাপির ঘটনা দেদার ঘটছে। যাদের কাছে আল-আমিনের মত জীবন সংগ্রামী হতভাগ্য মেধাবীর মৃত্যু তুচ্ছ কোন ঘটনা মাত্র। সে কারণে আমাদের দেশে মাদকের মামলায় দুর্বল তদন্ত, ক্রটিপূর্ণ অভিযোগ পত্র, সাক্ষীর অনুপস্থিতির জন্য ৬০ ভাগ আসামীই খালাস পেয়ে যায় (সুত্র: দৈনিক সমকাল, তাং-০১/১০/১৭ ইং)। এটাই বাস্তবতা, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানিরা প্রভাবশালী ও শক্তিধর। যাদের বিরুদ্ধে সহসাই কেউ সাক্ষী দিতে সাহস পান না। ফলে যা ঘটার তাই ঘটছে।


মোদ্দকথা, ঘুঁনে ধরা এ সমাজব্যবস্থায় বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসুত্রিতা, সাক্ষীর অভাব, অনৈতিক সুবিধা আদায়ের মতো ঘটনার কারণে প্রকৃত অর্থে আইনের শাসনের বড়ই অভাব। ফলশ্রুতিতে চোর সন্দেহে বর্বরতা, আবার অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপরাধ শিশু কিশোররা প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়ে জীবন হারাচ্ছে। দেশে ন্যায়ের শাসনকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে এ ধরনের অরাজকতা রোধ করা কঠিন হবে। একমাত্র মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ, ন্যায়-অন্যায় বোধের চেতনা জাগ্রত না হলে বৈষ্যমে ভরা এ সমাজ ব্যবস্থা নিরিহ, দুর্বল ও অসহায় শোষিত মানুষের ন্যায় বিচার কোন দিনই প্রতিষ্ঠিত হবে না। এটাই নিখাদ সত্য।  
 লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

এই বিভাগের আরো খবর

হিজরি সনের ইতিকথা ও তাৎপর্য

মাও: মো: রায়হানুর রহমান :রাসূল (সা.) এর আগমনের পূর্বে সন গণনার ইতিবৃত্ত: ইসলাম আসার আগে আরবে সমষ্টিগতভাবে কোন তারিখের প্রচলন ছিল না। সে সময় তারা প্রসিদ্ধ ঘটনা অবলম্বনে যেমন ইবরাহীম (আ.) এর অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার বছর, কাবাঘর নির্মাণ করার বছর, বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুদ্ধ যেমন: বাসুস, দাহেস, হারবুল ফুজ্জার ইত্যাদি নামের বছর, আমূল ফিল বা হস্তিবাহিনীর বছর, রাসূল (সা.) এর নবুওয়াত লাভের সন থেকে নবুওয়াতি বছর বা সন, যে বছর আবু তালিব ও রাসূল (সা.) এর স্ত্রী খাদিজা (রা) মারা যান সে বছরটি আমুল হুযুন বা শোকের বছর নামে পরিচিত। তবে উমার (রা.) এর হিজরি সন প্রচলন করার আগ পর্যন্ত আরবে মোটামুটি হস্তিবর্ষই প্রচলন ছিল। (আল কামিল ফিত তারিখ লি ইবনিল আছির, ১/৯ পৃষ্ঠা।)

হিজরি সন প্রবর্তনের কারণ: (এক) হিজরি সনের সাথে ইসলামের বেশ কিছু ইবাদত সংশ্লিষ্ট। প্রতি বছর রোযা, ঈদ, যাকাত, হজ ইত্যাদি ইবাদত পালন হয় এই চন্দ্র মাসকে কেন্দ্র করে। মহান আল্লাহ বলেন, “লোকে তোমাকে জিজ্ঞেস করছে নবচন্দ্র সমূহের ব্যাপারে। বলে দাও যে, এটি মানুষের জন্য সময়সমূহের নিরূপক ও হজের সময় নির্দেশক। (সূরা বাকারাহ: ১৮৯)। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে ইফতার কর। তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে শা’বানের তারিখ ত্রিশদিন পূর্ণ কর। (বুখারি: ১৮৭১, মুসলিম: ২৩৮৫, নাসাঈ: ২১২৩)।

(২) চন্দ্রের উদয়-অস্তের তারতম্যের কারণে চন্দ্রের ডুবে যাওয়া, সরু ও মোটা হওয়া এবং আলোর হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়া এবং সেই সাথে আবহাওয়ার তারতম্য ঘটা ইত্যাদির মধ্যে মানুষের জন্য নানাবিধ কল্যাণ নিহিত আছে। চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীতে নদী-সমুদ্রে জোয়ার ভাটা ঘটে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চন্দ্রকে করেছেন জ্যোতির্ময় এবং এর জন্য নির্ধারিত করেছেন কক্ষসমূহ। যাতে তোমরা জানতে পার বছর সমূহের সংখ্যা ও হিসাব। আল্লাহ এসব সৃষ্টি করেছেন সত্য সহকারে। (সূরা ইউনুস: ৫)। সুতরাং চন্দ্র মাসের সাথে প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। (তিন) আল্লামা আইনির বর্ণনা মতে, একবার আবু মূসা আশয়ারী (রা.) উমার (রা.) এর কাছে চিঠি লেখেন যে, আপনার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অনেক ফরমান আসে কিন্তু তাতে কোন তারিখ লেখা থাকে না। তাই যদি সময়ক্রম নির্ধারণের জন্য সাল গণনার ব্যবস্থা করতেন তবে খুব ভাল হতো। অপর বর্ণনায় এসেছে, উমার (রা.) এর কাছে একবার একটি দলিল পেশ করা হয় যাতে কেবল শা’বান মাসের নাম লেখা ছিল। তিনি বললেন, এ বছরের শা’বান নাকি আগামী বছরের শা’বান? তারপর হিজরি সন প্রবর্তন করা হয়। (রাসুলে রাহমত, ২০৮ ও ২০৯ পৃষ্ঠা)।


যেভাবে হিজরি সন প্রবর্তন করা হলো: ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, উমার (রা.) যখন সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তখন তিনি পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। সভায় সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) রাসূল (সা.) এর ওফাত থেকে সাল গণনার প্রস্তাব দেন। তালহা (রা.) প্রস্তাব দেন নবুওয়াত প্রাপ্তির বছর থেকে এবং আলি (রা.) হিজরতের বছর থেকে সন গণনার প্রস্তাব দেন। পরে সবাই আলি (রা.) এর প্রস্তাবে ঐকমত্য পোষণ করেন। (রাসূলে রাহমত, ২০৮ ও ২০৯ পৃষ্ঠা।) রাসূল নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে ২৭ সফর মোতাবেক ৬২২ ঈসায়ী সনের ১২ তারিখ দিবাগত রাতে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের জন্য রওনা দেন। সঙ্গে ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। (আর রাহীকুল মাখতুম: ১৭৪ পৃষ্ঠা)। তিনি ২০ সেপ্টেম্বর ৬২২ ইং মোতাবেক ৮ই রবিউল আউয়াল ১৩ নববী সনের সোমবার কুবায় পৌছেন। (রাসুলে রাহমত, ২০৫ পৃষ্ঠা)। কিন্তু আরবি সনের প্রথম মাস মহররমের সাথে মিল করার জন্য হিজরি সন গণনা শুরু করা হয় ১৬ জুলাই ৬২২ খৃষ্টাব্দ থেকে। হিজরি সনের মাসের নামসমূহ ও তার অর্থ: আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই। তন্মধ্যে চারটি মাস হারাম (সম্মানিত)। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং তোমরা এর মধ্যে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।

 (সূরা তাওবা: ৩৬) হিজরি বারটি মাস: মহররম (নিষিদ্ধ, সম্মানিত, যেহেতু উক্ত মাস সম্মানিত), সফর (শূন্য/ খালি, এ মাসে আরবরা যুদ্ধ বা বাণিজ্য সফরে যাওয়ার কারণে তাদের বাড়িঘর শূন্য হয়ে যেত), রবিউল আউয়াল (প্রথম বসন্ত), রবিউস সানি (দ্বিতীয় বসন্ত, এ দুই মাস আরবে বসন্ত ঋতু থাকত, তাই এর নাম রাখা হয়েছে জুমাদিল উলা (বরফ জমিবার প্রথম মাস), জুমাদিল উখরা বা জুমাদিউস সানি (বরফ জমিবার দ্বিতীয় মাস,) এ দু’মাসে আরবে বরফ জমত। ইবনে কাসির বলেন, সম্ভবত: যে বছর এ মাসগুলোর নামকরণ করা হয় সে বছর এ দুই মাস আরবে বরফ জমেছিল, পরবর্তীতে আরবে যে অবস্থাই হোক না কেন মাসের নামসমূহ অপরিবর্তিত রাখা হয়), রজব (সম্মান করা), শা’বান (ছড়াইয়া পড়া, আরবরা এ মাসে ব্যবসা-বাণিজ্য, লুট-তরাজ ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ত), রমজান (গরমের মাস, এ মাসে আরবে অত্যাধিক গরম পড়ত), শাওয়াল (উটের লেজ উচাইয়া সংগত হবার মাস) যুলক্বাদ (উপবিষ্ট থাকা, আরবরা এ মাসে যুদ্ধ ও সফর স্থগিত রেখে বাড়িতে বসে থাকত), যুল হিজ্জাহ বা যুল হাজ্জাহ (হজের মাস, আরবরা এ মাসে হজ পালন করে থাকে)। (সূত্র: তাফসিরে ইবনে কাছীর, ৪/৬৯০-৬৯৩ পৃষ্ঠা)।

বর্ষ গণনায় হিজরতের ঘটনাকে প্রাধান্য দেয়ার তাৎপর্য: মহানবী (সা.) এর জন্ম, নবুওয়াত, মি’রাজ, ওফাতসহ একাধিক বিষয়ে সন গণনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সন গণনার প্রচলন করা হয়। এর কিছু তাৎপর্য নিচে উল্লেখ করা হলো:১) সুহাইলি (রা.) বলেন, সাহাবাগণ সাল গণনার বিষয়ে হিজরতকে প্রাধান্য দিয়েছেন সুরা আত তাওবার ১০৮ নং আয়াতের প্রেক্ষিতে। এতে প্রথম দিন তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে (মসজিদে কুবার) কথা বলা হয়েছে। এই দিন হচ্ছে সেই দিন যেদিন ইসলামের বিশ্বজয়ের সূচনা হয়েছে। সেজন্য সাহাবাগণ এ দিনকে সন গণনার জন্য বেছে নিয়েছেন।

(ফাতহুল বারি: ৭/২৬৮)।২) হিজরত অর্থ ত্যাগ করা। ইবনে হাজার আসকালানী (রা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ বস্তু পরিত্যাগ করাকে হিজরত বলে। (ফাতহুল বারি, ১/১২ পৃষ্ঠা, সীরাত বিশ্বকোষ, ৫/২৫৮ পৃষ্ঠা)। মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের ঘটনা দীনের স্বার্থে মহানবি (সা.) ও সাহাবাদের ত্যাগের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এর মাধ্যমে কাফিরদের পরাজয় এবং দ্বীনের বিজয়ের দরজা উন্মুক্ত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ কর, কাফিররা যখন তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করার জন্য, হত্যা করার অথবা নির্বাসিত করার জন্য। আর তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল করেন। আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী।’ (সূরা আল-আনফাল: ৩০)।

৩) আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের বাস্তব উদাহরণ হিজরত: আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আবু বকর (রা.) বলেছেন, (হিজরতের সময়) আমি আমাদের মাথার উপরে মুশরিকদের পা দেখতে পেলাম যখন আমরা সাওর গুহায় ছিলাম। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি তারা কেউ নিজের পায়ের দিকে তাকায়, তবে সে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তখন রাসূল (সা.) বললেন, হে আবু বকর! তুমি এমন দুই ব্যক্তি সম্পর্কে কি ধারণা পোষণ কর, যাদের তৃতীয় জন হলেন স্বয়ং আল্লাহ। (বুখারি: ৩৫২৩)। আল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে স্মরণ কর, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন। যখন কাফিররা তাকে বের করে দিয়েছিল এবং সে ছিল দুইজনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিল; সে তার সঙ্গীকে বলেছিল, চিন্তিত হয়োনা, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। অত:পর আল্লাহ তার উপর স্বীয় প্রশান্তি বর্ষণ করেন এবং তাকে সাহায্য করেন এমন সৈন্যবাহিনী দ্বারা যা তোমরা দেখ নাই। (সূরা আত-তাওবা: ৪০)।


৪) হিজরত ফজিলত ও মর্যাদার কাজ: আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, আল্লাহর পথে নিজেদের জান-মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, আল্লাহর কাছে তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে। আর তারাই সফলকাম। তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাদের রব স্বীয় দয়া ও সন্তুষ্টির এবং এমন জান্নাতের যাতে রয়েছে স্থায়ী শাস্তি। (সূরা আত তাওবা: ২০-২১)। উমার ইবনে খাত্তাব (রা.) সূত্রে। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, সকল কাজের ফলাফল নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি নিয়ত অনুসারেই কাজের প্রতিফল পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্যে হিজরত করেছে, তার হিজরত সেদিকেই হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। পক্ষান্তরে যার হিজরত দুনিয়া হাসিল করা কিংবা কোনো নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হবে, তার হিজরত সে লক্ষ্যেই নিবেদিত হবে। (বুখারি: ৫৪)।

৫) হিজরত মানুষকে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়: পূর্ববর্তী বছরের পাপ থেকে তাওবা করে নতুন বছরে পাপ থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা করার নাম হিজরত। প্রতি বছর হিজরি সন মুমিন বান্দাকে সে কথাই স্মরণ করে দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) সূত্রে। রাসূল (সা.) বলেছেন: যার জবান ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ সেই প্রকৃত মুসলিম। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিষিদ্ধ কার্যাবলী পরিত্যাগ করে সেই প্রকৃত মুহাজির (হিজরতকারী)। (বুখারি: ১০, মুসলিম: ৬৭)। সম্ভবত: এ সকল কারণে সাহাবাগণ সন গণনায় হিজরতের ঘটনাকে গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ অধিক জ্ঞাত।
লেখক : ধর্মীয় শিক্ষক,
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া।
[email protected]
০১৭৩৯-৮৫০৬৫৬

এই বিভাগের আরো খবর

মিয়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাই

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ :গোটা বিশ্ব এতদিন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত, নিপীড়িত, সুবিধা বঞ্চিত ও অবহেলিত জাতি হিসেবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নামই জানত। অথচ এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর গায়ে সন্ত্রাসবাদের তকমা লাগিয়ে কী ভয়াবহ নৃশংস তান্ডবটাই না চালাচ্ছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। ২৫ আগষ্ট রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি নিরাপত্তাবাহিনীর তল্লাশিচৌকিতে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মী (আরসার) ধোঁয়া তুলে জান্তা বাহিনী ও এনএলডি (ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি) সরকারের নির্দেশে একেবারে হিটলারী কায়দায় চরম যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজটি করে যাচ্ছে মিয়ানমারের পুলিশ, সীমান্ত প্রহরী ও নিরাপত্তাবাহিনী। এই জনগোষ্ঠীটি বহুকাল থেকেই মিয়ানমারে বসবাস করছে।

 কিন্তু মিয়ানমার সরকার কিছুতেই মেনে নিতে চাচ্ছেন না যে রোহিঙ্গা তাদের দেশের নাগরিক। তারা মনে করেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা মুসলিম অভিবাসী। অতএব নৃগোষ্ঠী হিসেবে মিয়ানমারে তাদের কোন স্থান নেই। তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত, সরকারি চাকুরি থেকে বঞ্চিত, তারা নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারে না, তারা চাইলেও দুটি সন্তানের বেশি নিতে পারবেন না। সন্তান ধারণের উপরও তাদের নিষেধাজ্ঞা। এভাবে একটি জাতি কিভাবে চলতে পারে। একটি জাতিকে তলানিতে ফেলে তার মাথার উপর পা দিয়ে আরেকটি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

এটি মানবাধিকারের কোন সংবিধানে লেখা আছে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার উদারনৈতিক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে সমাদৃত ছিল, কিন্তু ১৯৬২ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সেই সময় সরকার প্রধান হন সেনাবাহিনীর তৎকালীন সেনা প্রধান নে উইন। সেনাবাহিনী মিয়ানমারে ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের দুর্দিনের শুরু হয়। তাদের ভাগ্যাকাশে অন্ধকার নেমে আসে। ১৯৭৮ সালেও মিয়ানমারের জান্তা সরকারের অত্যাচারে ২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে এসেছিল।

 সেই সময় বাংলাদেশ সরকারের চাপের কারণে অবশ্য শেষ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমার সরকার পুনরায় মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়েছিল। সেই সময় ১৯৭৮ সালে প্রখ্যাত স্কটিশ ভূগোলবিদ ফ্রান্সিস বুকানন রাখাইন অঞ্চলের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আরাকানের নৃগোষ্ঠী হিসেবে  উল্লেখ করেন। এরপর ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার এই অপমানের জ্বালা মিটাতে  ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে একটি নাগরিকত্ব আইন পাশ করেন। যা মিয়ানমারে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন নামে পরিচিত। এই আইনটি পাশের পর রোহিঙ্গার প্রতি বৈষম্য দিনের পর দিন আরো বেড়ে যেতেই থাকে।

 সেই সময় গোটা বিশ্বে এই নিয়ে তৎকালীন জান্তা সরকারের ব্যাপক সমালোচনাও হয়। কিন্তু মিয়ানমারের জান্তা সরকার কারো কথাকেই কর্ণপাত না করে একটি জাতিকে অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করে আইনটি পাশ করে। তারপর থেকেই মিয়ানমারের কখনো সরকারি বাহিনী আবার কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণিদের হাতে রাখাইনের এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হতে থাকে। মালেশিয়ার কুয়ালালামপুরে গঠিত পারমানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনালে মানবাধিকার কর্মি বৃটিশ প্রবাসী ড. মং জার্নি রোহিঙ্গাদের উপর এসব নির্যাতনের নাম দেন স্লো জেনোসাইড বা মন্থর গণহত্যা।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সাথে এনএলডি বা অং সান সুচির সম্পর্কটা যে মধুর না তা আমরা সবাই জানি। এছাড়াও  মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিন থেকে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ বা নাক গলানোটাকে সেদেশে সাধারণ জনগণ কতটা সহ্য করেন কিংবা জান্তা বাহিনীর প্রতি সাধারণ মিয়ানমার বাসীর মনোভাবটা কী ? কম বেশি সেটাও আমরা জানি। তাদের মধ্যে এত বৈরিতা থাকা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে তারা মোটামুটি একমত আর সেটি হচ্ছে যেকোনভাবেই হোক রোহিঙ্গাদের তারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত করবেন। এই বিষয়ে তাদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই।

 আমরা জানি মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী বা সামরিক বাহিনী  গোটা বিশ্বের মধ্যে অসভ্য ও কূটকৌশলী একটি বাহিনী। তাদের অতীত ইতিহাস আমরা মোটামুটি খুব ভাল করেই জানি। জান্তা বাহিনীর এরকম অসভ্য ও নির্লজ্জ আচরণে গোটা বিশ্ব তেমন একটা বিস্মৃত না হলেও যে মহিলাটি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন সেই মানুষটির দেশে এরকম একটি মানবিক বিপর্যয় ঘটছে অথচ তিনি এই ব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ হয়ে আছেন। এটা কিভাবে মেনে নেয়া যায়? তিনি যে একেবারেই কথা বলছেন না ঠিক তা না। তিনি মাঝে মধ্যে একটু দুই চার লাইনের কথা বলছেন তবে সেগুলো একেবারে অবান্তর ও গাধামী কথা ছাড়া আর কিছুই না। এসব কথা একজন মূর্খ লোকের মুখেও আশা করা যায় না। তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। গোটা বিশ্বের প্রতি তার নৈতিক ও মানবিক একটি দায়-দায়িত্ব রয়েছে। যেটি তিনি চাইলেও এড়িয়ে চলতে পারেন না। মিয়ানমারের রাখাইনে জাতি নিধন প্রক্রিয়া যখন একেবারে শেষের দিকে ঠিক তখনই তিনি গোটা বিশ্বকে বোকা বানানোর উদ্দেশ্য ভাষণ প্রদান করেন।

 তিনি ভাষণে বলেন এই রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ছেড়ে কেন বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে এই বিষয়ে তিনি তেমন কিছুই জানেন না এবং তার এনএলডি সরকার খুব শীঘ্রই এর কারণ উদঘাটন করবেন। মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপিডোর সিটি হল থেকে তিনি এই ভাষণ প্রদান করেন। অং সান সুচি বলেন মিয়ানমার সরকার শান্তি চায়, শান্তির প্রতি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাখাইনে শান্তি ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য তার সরকার সব ধরণের প্রচেষ্টা চালাবে। এছাড়াও তিনি বলেন আন্তর্জাতিক মহল চাইলেই মিয়ানমার ভ্রমণ করতে পারেন আর এজন্য তার সরকার ভীতু না।

 তিনি শুধু দায় এড়ানোর জন্যই মূলত ভাষণটি দিয়েছেন। তাছাড়া মিয়ানমারের রাখাইনে এখন তো আর কোন রোহিঙ্গাই নেই। জান্তা বাহিনীর জাতি নিধন প্রক্রিয়াই যাদেরকে সামনে পেয়েছে তাদেরকেই মেরে ফেলেছে আর বাকি যারা প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছেন তারা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। মোটা দাগে যে কথাটি তা হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল এখন রোহিঙ্গা শূন্য। মিয়ানমার সরকার ঠিক যা চেয়েছিল তাই হয়েছে। জান্তা বাহিনী চেয়েছিল রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা নামক জাতি গোষ্ঠীটিকে একেবারে মূলোৎপাটন করে ফেলতে এবং তারা তা করেছেনও বটে।


আমরা জানি যে রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমারের মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিক কফি আনানকে প্রধান করে একটি কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন মিয়ানমার ভ্রমণ করেন এবং একটি পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট করেন এবং সেই সাথে এই সব রোহিঙ্গাদের কিভাবে মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায় এই নিয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। কফি আনান কমিশন ২৪ আগষ্ট প্রস্তাব পেশ করার পরের দিন রাতেই একসাথে ৩০টি পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ চালানো হয়। এখন প্রশ্ন হল কফি আনানের প্রস্তাব পেশ করার ঠিক পরের দিনই কেন হামলাটি সংঘটিত হল। তাও আবার এক সাথে ৩০ টি নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিতে। এখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে তাদের এটি একটি সাজানো নাটক। আর কেনই বা তারা আনান কমিশনের প্রস্তাব পেশের ঠিক পরের দিনই হামলাটি করলেন। আনান কমিশনের প্রস্তাবে তো রোহিঙ্গাদেরই স্বার্থ সংরক্ষণের কথাই উল্লেখ রয়েছে।

 এতে সন্দেহ নেই যে ২৫ আগষ্টের হামলাটি মূলত করা হয়েছিল আনান কমিশনের প্রস্তাবকে নস্যাৎ করার জন্যই। সুতরাং আমরা বলতে পারি ২৫ আগষ্টের এই সন্ত্রাসী হামলার পিছনে মিয়ানমার সরকারেরই ডান হাত রয়েছে। আনান কমিশনের প্রস্তাবকে নস্যাৎ করার জন্য মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর এটি একটি কুটকৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের উপর যে জান্তা বাহিনী একটি জাতিগত নিধন এবং হত্যাযজ্ঞ চালাবে এটি তাদের পূর্ব পরিকল্পনায় ছিল। এছাড়া তারা তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধের মতো এইসব অবৈধ কাজকে বৈধতা দেয়া এবং গোটা বিশ্বের পরাশক্তিধর দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্য আরসা নাটকের অবতারণা করেছেন। কারণ মিয়ানমার সরকার খুব ভাল করেই জানেন যে রোহিঙ্গারা যেহেতু মুসলিম জনগোষ্ঠী সুতারাং তাদের গায়ে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ বা সন্ত্রাস্বাদের তকমাটি জুড়ে দিলে বর্তমান বিশ্ব সেটিকে খুব পজিটিভলি নিবে এবং এটা তারা খুব ভাল করেই জানত। তাদের সেই কৌশল অনেকাংশেই কাজেও দিয়েছে। কারণ ভারত, চীন ও রাশিয়া এই তিনটি পরাশক্তিধর দেশ বাংলাদেশের খুবই বন্ধুপ্রতিম দেশ।


ভারত সরকার আমাদের বার বার একটি কথা বলেই আশ্বস্ত করেন যে ভারত বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে সব সময়ই বাংলাদেশের পাশেই থাকবে আর এই ব্যাপারে বাংলাদেশ যেন নিশ্চিন্ত থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশের এরকম একটি দুর্দিনে আমরা ভারত, রাশিয়া এবং চীন কাউকেই পাশে পাচ্ছিনা বরং তারা আমাদের প্রতিপক্ষ হয়ে কাজ করছেন। রাশিয়া, চীন এবং ভারতের সাথে মিয়ানমারের যেমন বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে ঠিক বাংলাদেশের সাথে সেরকম বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। তবে এই বাণিজ্যের শতকরা হারটি তুলনামূলকভাবে একটু কম বা বেশি হতেই পারে। তবে সেটি যাই হোক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হলে আনান কমিশনের প্রস্তাবগুলোকে কার্যকর করতে হবে। সেই সাথে মিয়ানমারকে বিশ্বের পরাশক্তিধর দেশগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন কায়দায় চাপ দিতে হবে। তবে শুধু কথার চাপে কাজ হবে না। অর্থনৈতিকভাবে অবরোধ করে তা দ্রুর্ত কার্যকর করতে হবে। আর এজন্য ভারত, রাশিয়া এবং চীন আমাদের পাশে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক ঃ সংগঠক ও প্রাবন্ধিক  
[email protected]
০১৭৫০-৫৩৪০২৮

এই বিভাগের আরো খবর

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন এবং সড়ক দুর্ঘটনা

মীর আব্দুল আলীম:এবার আমরা ফাস্ট হয়ে গেলাম। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এমন প্রতিবেদনই প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও)। সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, চালকের মাদক গ্রহণ, সিটবেল্ট না বাঁধা, হেলমেট ব্যবহার না করা এবং শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহারকারী তথা চালক, যাত্রী ও পথচারীরা দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই প্রতিদিনই রাস্তায় তাজ প্রাণ ঝরে যাচ্ছে।

২০১৭ সালের এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১ হাজার ৯৬০জনেরও বেশি মানুষ আহত এবং পঙ্গু হয়েছেন আরও কয়েকগুণ মানুষ। প্রতি মাসে ২ শ’ ১৮ জন এবং প্রতি দিন গড়ে ৭ দশমি ২৫ জন মানুষ মারা গেছে। চলতি বছর জাতীয় দৈনিকের একটি শিরোনাম এমন-‘২৪ ঘণ্টায় সড়ক কেড়ে নিল ২৫ প্রাণ।’ অর্থাৎ ঘণ্টায় একজনেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। এ থেকেই বোঝা যায়, দিন দিন কী পরিমাণ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে সড়ক দুর্ঘটনা। এ দেশে প্রতিদিন এ পরিমান মানুষকি রাহাজানি, খুন খারাবিতে মারা যায়? দুরারোগ্য ক্যান্সারে মৃত্যুর হার কি এতো? সত্যিই সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে।  


সড়ক দুর্ঘটনা এ যেন অলঙ্ঘনীয় ব্যাপার মৃত্যুদূত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। ঘর থেকে বের হয়ে আবার ঘরে ফেরা যাবে কি? এমন সংশয় বরাবরই থেকে যায়। এ প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব পাওয়া কঠিন বাংলাদেশে। প্রশ্ন হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ ঝরে যাবে? নিত্যনৈমিত্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনার  দায় কার? কে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর? প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে মানুষকে। কোনো দুর্ঘটনায় গোটা পরিবারও শেষ হয়ে যাচ্ছে। অতীতে এমন নজিরও রয়েছে।  একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, আর এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে, সরকারিভাবে নতুন নতুন সুপারিশ তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। পাগলা ঘোড়ার লাগামও মনে হয় টেনে রাখা সম্ভব, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষের নিস্তার নেই, তার লাগাম টানে কার সাধ্য! সড়ক দুর্ঘটনার এমন মৃত্যুমিছিল যেন নিত্যদিনের দুঃসংবাদ! বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১২ হাজার মানুষের। দুর্ঘটনাকবলিত কোনো যানবাহনের চালককে আটক করা হলেও বেশির ভাগ সময়ই তাদের শাস্তি হয় না।

 ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমস্যা, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা, জরুরি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনাহীনতাও দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে দায়ী। শুধু চালকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে শতভাগ নৈতিক ও কঠোর থাকতে পারলেই দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এটা ঠিক যে, দেশের বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। এসব যান চালানোর জন্য চাই দক্ষ ও বিবেচক চালক। এই বিপুল সংখ্যক যোগ্য চালক তৈরির জন্য দেশে কি কোনো সুষ্ঠু কার্যক্রম রয়েছে? এমনকি লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদের চলার পথে আরো সতর্ক থাকা এবং ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে মেনে চলার ব্যাপারে কোনো কর্মশালা কিংবা প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও কি নিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আসলে সব পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। একটি সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে উদ্যোগী হতে হবে। না হলে যে কেউ যে কোনো দিন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ইহধাম ত্যাগ কিংবা পঙ্গুত্ববরণ করবে, তা নিঃসংশয়ে বলা যায়।

ক’দিন আগে গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে বৈধ যানবাহনের সংখ্যা ১৩ লাখেরও বেশি। অথচ বৈধ চালকের সংখ্যা মাত্র ৮ লাখ। বাকি যানবাহন যাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, তাদের লাইসেন্স বৈধ নয়। অনেকের একাধিক লাইসেন্সও আছে। স্বাভাবিকভাবেই এ অবৈধ লাইসেন্সধারী গাড়িচালকরা গাড়ি চালাতে গিয়ে আইনের ধার ধারেন না। সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত নন, এমন চালকের সংখ্যাও নেহায়েতই কম নয়। এই চালকদের পেছনে আছে শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতা, যে কারণে এদের শনাক্ত করাও হয়ে পড়েছে দুষ্কর। সঙ্গত কারণে চালকরাও তাই বেপরোয়া।

বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। কেননা এ পরিস্থিতি একটি দেশের পক্ষে কিছুতেই স্বস্তির হতে পারে না। স্মর্তব্য যে, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এ যাবৎ অনেক কথা বলা হয়েছে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সড়কপথ আজো নিরাপদ হলো না। সড়কপথের ‘যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত’ কথার কথা হয়েই থেকে গেল। মাঝে মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার যেসব তথ্য গণমাধ্যমে উঠে আসে তা একটি দেশের জন্য দুর্বিষহ এবং আতঙ্কের অথচ সরকারের কর্তব্য হওয়া দরকার জনগণের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘রোড সেফটি’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে পাঁচটি প্রধান ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এগুলো সরকার সংশ্লিষ্টরা মেনে চললে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে। এগুলো হলো গাড়ির গতি, মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানো, হেলমেট ব্যবহার, সিট বেল্ট ব্যবহার ও শিশুর সুরক্ষা ব্যবস্থা। যে পাঁচটি কারণ দেখানো হয়েছে সেগুলোর প্রতিকার না হলে, দুর্ঘটনা তো কমবেই না, বরং দিন দিন বেড়ে যেতে থাকবে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় কারণ গাড়ির বেপরোয়া গতি। অদক্ষ চালকের হাতে বেপরোয়া গতির যানবাহন হয়ে উঠেছে মৃত্যুর দূত। গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ কঠোর না হলে এটা থামানো যাবে না। সড়কভেদে প্রতিটি যানবাহনের জন্য গতি নির্দিষ্ট করে তা মানতে বাধ্য করতে হবে। দক্ষ চালক তৈরির ক্ষেত্রে কোন ছাড় দেওয়া যাবে না। যাকে তাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করা না গেলে কখনোই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।

 একই সঙ্গে বন্ধ করতে হবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও প্রমিসেস মেডিকেল লিমিটেডের গবেষণা অনুযায়ী, মাদকাসক্ত চালকের কারণে দেশে ৩০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দেশবাসী প্রত্যাশা করেন। মাদকাসক্ত চালকের লাইসেন্স বাতিল করাসহ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। চালকদের সিটবেল্ট ব্যবহারের প্রতি অনীহা গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিও বেশির ভাগই সচেতন নন। এছাড়া যেখানে সেখানে রাস্তা পারাপার তো রয়েছেই। এক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়গুলোতে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না।

প্রয়োজনে এসব আইনের ব্যত্যয়ে জরিমানার অংক দ্বিগুণ করা যেতে পারে। এতে চালকেরা সচেতন হবেন। এসব ছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনা না কমার একটি বড় কারণ, দায়ী চালকদের বিচার না হওয়া। দোষী হলেও চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হার খুবই কম। এতে চালকরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। চালকদের সঙ্গে মালিক প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন সংগঠনগুলোকেও সচেতন হতে হবে। মালিক প্রতিষ্ঠানকে চালক নিয়োগের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে, নিজের চালকের প্রতি নজর রাখতে হবে। দুর্ঘটনায় আহত নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে মালিকপক্ষ নিজ স্বার্থেই সচেতন হবে।  

এক গবেষণায় দেখা যায়, নানা কারণে দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরযানে ১০০টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নত দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক হাজার মোটরযানে দুর্ঘটনা ঘটে সর্বোচ্চ তিন দশমিক পাঁচ ভাগ। অন্যদিকে আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার যানবাহনে ১৬৩ জন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ১২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে চলতি ২০১৭ সালের এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১ হাজার ৯৬০জনেরও বেশি মানুষ। আহত এবং পঙ্গু হয়েছেন আরও কয়েকগুন মানুষ। প্রতিবছরই এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে আর তা রোধ করা যাচ্ছে না।

কথায় বলে ‘ঘুমন্ত লোকের ঘুম ভাঙানো সম্ভব, কিন্তু জেগে জেগে ঘুমালে জাগানো কঠিন।’ শত চেষ্টায়ও তাকে জাগানো যায় না। কেউ নিজ থেকে সচেতন হয় না। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যেন সেই দশা। কয়েক মাস আগে খোদ জাতীয় সংসদে অনভিজ্ঞ ও অল্পবয়সী হেলপার বাস-মিনিবাস চালানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানালেন যোগাযোগমন্ত্রী। তিনি বলেন, গাড়ির সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সে হারে দক্ষ চালক বাড়ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক অমূল্য প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক, শিশু, নববধূ-বরসহ পুরো বরযাত্রী, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা এমনকি সাবেক মন্ত্রীও এ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নিহত হওয়ার খবর আমরা পত্রিকার পাতায় প্রত্যক্ষ করেছি, যার একটিও সহজভাবে মেনে নেওয়া যায় না।  

প্রশ্ন হলো সড়ক দুর্ঘটনা ছাড়া এমন কোন দিন আছে কি? এ নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না কেন। সরকার সংশ্লিষ্টরা সচেতন হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে বাড়ছে কেন? সকলের আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। দুর্ঘটনা না কমায় প্রশ্ন জাগে, বিষয়টিতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি কিনা? সড়ক দুর্ঘটনার জন্য আমরা কেবল চালকদেরই দায়ি করি। পরিবহন মালিকরা কি দায়ি নন। তারা কেন লাইসেন্স বিহীন চালকের হাতে গাড়ি তুলে দেন। যারা অবৈধ চালকদের রাস্তায় গাড়ি চালাতে দেয় তাদের দায়ি করি না। যাদের চোখের সামনে ফিটনেসবিহীন গাড়ি  চলে তাদের দায়ি করি না। যারা অসচেতন হয়ে রাস্তায় চলে তাদের দায়ি করি না। শুধু চালকদের ওপর দোষ চাপিয়ে কেবল দুর্ঘটনার দায় এড়ানো যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিকতা, সচেতনতা, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা আশা করি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮

এই বিভাগের আরো খবর

অটিস্টিক শিশুরা আমাদেরই সন্তান

কুমকুম ইয়াসমিন :নেহালকে আমি তার ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। এখন তার বয়স এগারো বছর। চুপচাপ থাকে। কথা বলতেই চায়না। তাকে দেখলে হঠাৎ করে কিছুই বোঝা যাবে না। গভীর মনোযোগ দিয়ে সে হয়ত ছবি আঁকছে। তাকে ডাকলে সে সাড়া দেয় না সহজে। ছবি আঁকে। ছবিটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে তারপর আবার আঁকায় মন দেয়। তাকে দেখলে মনে হয় তার যাবতীয় পৃথিবী ঐ এক টুকরা কাগজে আর রং পেন্সিলে। যখন বার বার করে ডেকে জিজ্ঞেস করা হয়- তুমি কী করছো? সে উত্তর দিবে- নেহাল ছবি আঁকছে।

একদিন তাদের বাসায় আমার শিশু কন্যাকে নিয়ে বেড়াতে গেছি। আমার মেয়েটির হাতে কয়েকটি চিপসের প্যাকেট। বাসায় মাত্র ঢুকেছি। নেহাল কোথা থেকে ছুটে এসে আমার মেয়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিপসের প্যাকেটগুলো কেড়ে নিয়ে ছুটে অন্য ঘরে চলে গেল। কোনো কথা বলল না বা আমার মেয়ের সাথে খেলাও করল না। তার অনেক আচরণ ঠিক স্বাভাবিক শিশুর মত নয়। তার বাবা মা দুজনেই উচ্চশিক্ষিত মানুষ।

 তারা চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারলেন, সে স্নায়বিক বিকাশগত বা অটিজম সমস্যায় আক্রান্ত অটিস্টিক শিশু। এটি বংশগত বা মানসিক রোগ নয়। এটিকে ইংরেজিতে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বলা হয়। অটিজম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ অঁঃড়ং থেকে, যার ইংরেজি হল ‘ংবষভ’ আর বাংলা হল ‘স্থীয়’। নিজের ভিতর মগ্ন থাকে বলে তাদের অটিস্টিক শিশু বলা হয়। ১৯৪৩ সালে আমেরিকান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিও ক্যানার প্রথম অটিজম সনাক্ত করেন। অটিস্টিক শিশুরা আপাতদৃষ্টিতে দেখতে একজন সাধারণ শিশুর মত। কিন্তু তাদের সাথে কিছু সময় কাটালে কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে যা অন্য শিশুদের চেয়ে আলাদা।

সাধারণত তিন বছর বয়সের মধ্যেই অটিজমের লক্ষণ প্রকাশ পায়। সামাজিক সম্পর্ক তৈরি, যোগাযোগ দক্ষতা ও আচরণের বিষয়ে তাদের অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে এ শিশুরা চরমভাবে অনীহা প্রকাশ করে। সে নিজের মধ্যে আলাদা, একাকী, নিজস্ব এক জগত তৈরি করে বসবাস করে, সেই জগতে সে কারো অনুপ্রবেশ পছন্দ করে না। সমবয়সী শিশুদের সাথেও সে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে না আবার দেখা যায় হঠাৎ করেই সে কাউকে শারীরিক আঘাত করে বসে। কোলে নেয়া বা আদর করা বা তাকে স্পর্শ করে থাকা সে পছন্দ করে না। সে তার পছন্দের খেলনা বা বস্তু অন্য কাউকে দিতে চায় না।


 অনেক সময় অতি তুচ্ছ বস্তুও সে দিনের পর দিন আগলে রাখে। বাকযন্ত্র, জিভ, তালু, ঠোঁট বা ধ্বনির উচ্চারণে কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলেও এ শিশুরা সঠিক বাক্য তৈরিতে অপারগ হয়। সে সাধারণত, আমি খাব বা আমি যাব, না বলে বলে, আমি খাবে বা আমি যাবে অথবা নিজের নাম ধরে বলবে- নেহাল খাবে বা নেহাল যাবে। আচরণে পুনরাবৃত্তি এ ধরনের শিশুদের আর একটি সমস্যা। আনন্দিত হলে সে হাততালি দিতেই থাকে বা হাঁসতেই থাকে, থামতে চায় না। একই কাজ সে বিরতিহীন ভাবে করে যেতে থাকে। একই শব্দ বা বাক্য বার বার বলে।

তার চারপাশের পরিচিত পরিবেশের মধ্যে কোন পরিবর্তন ঘটলে সে তা মানতে চায় না। অস্বাভাবিক আচরণ, জেদ বা কান্না করতে থাকে। অটিস্টিক শিশুরা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী না হলেও তাদের ৩০ শতাংশের বুদ্ধি বা আই কিউ স্বাভাবিক শিশুর চাইতে কম থাকে। ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ শিশুর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কম বুদ্ধিমত্তা দেখা যায়। তবে কিছু কিছু অটিস্টিক শিশুর মধ্যে কোন কোন বিষয়ে চমৎকার পারদর্শিতা লক্ষ্য করা যায়। সাধারণভাবে সংগীত, অংকন, আবৃত্তি, গণিত, কম্পিউটার চালনা ইত্যাদি বিষয়ে অনেক সময় অতি উচ্চমানের পারঙ্গমতা দেখায়। রেগে গেলে বা বিরূপ পরিবেশে ২৫% শিশু খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়।


বিশ্বে প্রায় প্রতি ১১০ জনে ০১ জন এ সমস্যায় ভুগছে। ঈবহঃবৎ ঋড়ৎ উরংবধংব ঈড়হঃৎড়ষ এর তথ্যমতে, আমেরিকায় প্রতি ৬৮ জনে ০১ জন অটিস্টিক। বাংলাদেশও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশী শিশুদের মধ্যে অটিজমের হার ০.৮ শতাংশ, অর্থ্যাৎ প্রতি হাজারে ৮ জন। সর্বশেষ আদমশুমারী মতে দেশে ৯.৭% মানুষ কোন না কোন প্রতিবন্ধকতার শিকার। মোট প্রতিবন্ধকতার এক শতাংশকে আন্তর্জাতিকভাবে অটিজমের শিকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সেই হিসেবে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা দেড় লাখ।ছেলে বা মেয়ে শিশু যে কেউ এ সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় এটি স্পষ্ট যে, মেয়ে শিশুর চেয়ে ছেলে শিশুর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাড়ে চার গুণ বেশি।

একটি পরিবারে যখন একজন শিশুর আগমনী বার্তা শোনা যায় তখন ঐ অনাগত শিশুটিকে ঘিরে মা-বাবার মনে অনেক স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, পরিকল্পনা দোলা দিয়ে যায়, যা ধীরে ধীরে পুরো পরিবারটির মধ্যে সঞ্চালিত হয়। শিশুটি যখন পৃথিবীতে আসে তখন সুস্থ সবল শিশু দেখে পরিবারের আনন্দের সীমা থাকে না। কিন্তু যখন শিশুর মধ্যে অটিজম সমস্যা দেখা দেয় তখন পরিবারটি গভীর দুঃখে নিমজ্জিত হয়। কী করবেন, কেন এমন হল, কী করা উচিত, কার কাছে গেলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যাবে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন।

অনেক বাবা মা সন্তানের এই অস্বাভাবিকতার জন্য নিজেদেরকে দায়ী ভাবেন বা ভাবতে বাধ্য হন। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক স্ট্যাটাস, শিশুর প্রতি বাবা মায়ের আচরণ, অর্থনৈতিক অবস্থা, মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদির কোন প্রভাব নেই। তবে অটিজম বিশেষজ্ঞগণ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন, যেমন- মস্তিষ্কের গঠনগত কোন ত্রুটি, অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক ক্রিয়া, শরীরে নিউরো-কেমিক্যালের অসামঞ্জস্যতা, জিনগত জটিলতা, জন্ম মুহূর্তে অক্সিজেনের অভাব, জন্মপূর্ব বা জন্মের পরবর্তীকালে জটিল রোগ সংক্রমন ইত্যাদি। উল্লেখিত কারণগুলোর জন্য বাবা মাকে দায়ী করা যায় না। তাই কষ্ট, বিষন্নতা, মানসিক চাপ জয় করে শিশুর বিষয়ে ইতিবাচক ও গঠনমূলক মনোভাব গঠনে তৎপর হতে হবে।


 অটিজম বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি, চিকিৎসক, শিক্ষক, থেরাপিস্ট ও সহায়ক প্রতিষ্ঠানের উচিত সঠিক সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে শিশুর পরিবারের ভ্রান্ত ধারণা দূরীভুত করে কার্যকর সহায়তা দেয়া। বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক উন্নত কৌশলগত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সঠিক আচরণের মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুর জীবন অর্থবহ, কর্মময় ও স্বাভাবিক করা এবং সমাজের একজন পরিপূর্ণ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এই শিশুরা একে অন্যের চেয়ে আলাদা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্টমন্ডিত। তাদের দক্ষতা, আচরণ ও প্রতীভা আর একজন অটিস্টিক শিশু থেকে ভিন্ন।

এ ভিন্নতার বিষয়টি ও শিশুর অটিজমের তীব্রতা, ধরন, যোগাযোগ ও ভাষার দক্ষতা,আগ্রহ, আচরণ মাথায় রেখে সঠিক কর্মপরিকল্পনা, প্রশিক্ষণের ধরন, প্রাসঙ্গিক সহায়তা দিতে হবে। শিশুর পছন্দের পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি খেলার ছলে তাকে কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। উৎসাহ, প্রশংসা ও পুরষ্কারের মাধ্যমে তাকে শিখাতে হবে। শারীরিক শাস্তি প্রদান এমনকি তিরষ্কার করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। অটিজম বিষয়ে প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষকের নিকট হতে পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী আচরণ করতে হবে।

 শিশুটি যাতে পরিচিত বা অপরিচিত কারো দ্বারা শারীরিক বা মানসিক বা যৌন হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। তাদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ স্কুল বা প্রয়োজনে সাধারণ স্কুলে দিতে হবে। স্কুলিং কার্যক্রম মেধাবী অটিস্টিক শিশুকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষক ও অভিভাবকের নিবিড় সম্পর্ক এবং উপযুক্ত শিক্ষা পদ্ধতি ও পরিবেশ নির্বাচন এ ধরনের শিশুদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। শিশুর উন্নয়নের জন্য অভিভাবকের উচিত অটিস্টিক বিষয়ে অনুষ্ঠিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে নিজের সমস্যা তুলে ধরে অন্যের তথ্যবহুল মতামত গ্রহণ করা। এছাড়া অকুপেশনাল থেরাপি চিকিৎসা অটিজমের ক্ষেত্রে ভাল কাজ দেয়।


অটিজম একটি মনোবিকাশগত সমস্যা হলেও কোন কোন অটিস্টিক শিশু অসম্ভব মেধাবী ও প্রতিভাবান হয়ে থাকে। বিশ্বে এমন নজির বিরল নয়। কোন বিশেষ ক্ষেত্রে তারা বিশেষ পারদর্শিতার সাক্ষর রাখে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন, পদার্থবিদ্যার কিংবদন্তী আলবার্ট আইনস্টাইন, বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন, ডাচ চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যানগগ, সুরস্রষ্টা মোজার্ট এর মত বহু খ্যাতিমান ব্যক্তি অটিজমে আক্রান্ত ছিলেন। অটিজম তাদের বিকাশের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তাঁরা স্বমহিমায় আকাশের তারকার ন্যায় প্রজ্বলিত। তাই তাদেরকে অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা না করে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচনা করে প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রত্যয়ী হতে হবে।

অটিস্টিক শিশুদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা, আগ্রহ, মনোযোগ প্রশংসনীয়। তিনি বলেছেন, অটিস্টিক শিশুরা আমাদেরই শিশু, তারা সমাজের বাইরে নয়, সরকার ও রাষ্ট্র তাদের পাশে সবসময় আছে। প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য কন্যা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অটিজম বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল এডভাইজরি কমিটি অব অটিজম এন্ড নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারের চেয়ারম্যান সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও প্রণোদনা অটিস্টিক শিশু কল্যাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘ অটিজম আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারের জন্য আর্থ সামাজিক সহায়তা’ শীর্ষক প্রস্তাব উপস্থাপন করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ’ অ্যাওয়ার্ড এ ভূষিত হয়েছেন। সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কল্যাণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ নামে দুটি আইন পাশ করেছে। অতএব, প্রতিবন্ধী শিশুদের বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই। এখন দরকার ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা। মানবিক আচরণ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ, অবিরত প্রেষণা প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতে আনা সম্ভব।   
লেখক : প্রধান শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক  
মুন্নুজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বোয়ালিয়া, রাজশাহী।
[email protected]

এই বিভাগের আরো খবর

চালকল শিল্প এবং ভোক্তার স্বার্থ

আব্দুল হাই রঞ্জু :বাংলাদেশের অর্থনীতি মুলত কৃষিনির্ভর। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদার পুরোটাই এখনও দেশীয় ভাবে উৎপাদিত খাদ্যশস্যে পুরণ হয় না। কম বেশি প্রতি বছরই চাল ও গম আমদানি করতে হয়। তবে গম আমদানির পরিমাণ কমে না আসলেও চাল আমদানির পরিমাণ তলানিতে চলে এসেছিল। বলতে গেলে চালের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে আমরা পৌঁছে গেছি। এরপরও সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব, অদুরদর্শিতা এবং ভ্রান্ত খাদ্য নীতিমালার কারণে আবার আমরা খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে অনেক দুর পিছিয়ে গেছি। মুলত সরকারের খাদ্য নীতিমালার দুর্বল দিকগুলি তুলে ধরতে আজকের এ লেখার অবতারণা। অতীতে এ বিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। বাস্তবে আমরা লেখালেখি করলেও সরকারের তরফে বিষয়গুলোকে কিছুটা আমলে নিলে হয়ত চালের বাজার নিয়ে এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

যেহেতু আমাদের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, সেহেতু কৃষিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের যে কোন বিকল্প নেই, যা বলার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, কৃষি উৎপাদনে আমরা যতদুর এগিয়েছি, সে অনুপাতে দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই স্ব-উদ্যোগে কৃষিভিত্তিক ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের হাসকিং মিল চাতাল গড়ে উঠলেও যা সরকারের খাদ্য বিভাগের ভ্রান্ত নীতিমালার কারণে চরম সংকটের মুখে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশের প্রায় ১৫/১৬ হাজার হাসকিং মিল চাতাল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ায় চাল বিপণনের ক্ষেত্রে গুটিকতক স্বয়ংক্রিয় চাল কলের আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে নিভৃত পল্লী অঞ্চল পর্যন্ত গড়ে ওঠা হাসকিং মিলগুলো ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাল সরবরাহের স্বাভাবিক গতির পরিবর্তন হয়েছে।

 এখন হাসকিং মিলগুলো বন্ধ থাকায় স্বয়ংক্রিয় চালকলের উৎপাদিত চালের ওপর সাধারণ ভোক্তাদের চালের যোগান শতভাগ নির্ভরশীল হয়েছে। ফলে স্বয়ংক্রিয় চালকলের মালিকগণের একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের বেঁধে দেয়া দরেই ভোক্তাদের চাল কিনতে হচ্ছে অথচ এক সময় হাসকিং মিলের প্রস্তুতকৃত চালের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় চাল কলের প্রস্তুতকৃত চালের মধ্যে এক ধরনের সুপ্ত প্রতিযোগিতা বিরাজমান ছিল। মুলত হাসকিং মিলে প্রস্তুতকৃত চালের মুল্য তুলনামুলকভাবে স্বয়ংক্রিয় চাল কলে প্রস্তুতকৃত চালের চেয়ে কম থাকে, আর কম মূল্যের প্রস্তুতকৃত চাল সাধারণ ভোক্তাদের সামর্থের মধ্যেই থাকতো। যাদের সক্ষমতা বেশি, তারা স্বয়ংক্রিয় চাল কলের প্রস্তুতকৃত চাল চড়া দামে কিনে খোতা। আর দেশে সাধারণ ভোক্তাদের সংখ্যাই অনেক বেশি। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোক্তার যোগান যে হাসকিং মিলে থেকে পুরণ হতো, তা বন্ধ হলো কিভাবে?

সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের উচ্চাভিলাসী কিছু কিছু আমলার মতে, যেহেতু দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, সেহেতু হাসকিং মিলে প্রস্তুতকৃত চাল আর অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করার প্রয়োজন নেই। তারা এমন নীতিমালা প্রণয়ন করলেন, যে নীতিমালার বিনির্দেশ মত চাল স্বয়ংক্রিয় চালকল ব্যতিত হাসকিং মিলে প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন করায় সরকারের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার পুরো চালই বলতে গেলে স্বয়ংক্রিয় মিলে প্র¯ুÍতকৃত চাল দিয়েই পুরণের চেষ্টা চলতো।

যদিও সরকারের খাদ্য বিভাগ হতে গত ২০১৪ সালের পর থেকে হাসকিং মিলের সাথে চুক্তিবদ্ধ না হওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করা ছিল। সে অনুযায়ী এরপরে আর হাসকিং মিলের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু চালকল মালিকদের সংগঠনের আবেদন নিবেদনের কারণে ২০১৪ সালের পর হাসকিং মিলের সাথে খাদ্য বিভাগ চুক্তি করলেও হাসকিং মিলারগণ স্বয়ংক্রিয় চালকল থেকে চাল কিনে এনে সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহ করতো। যা খাদ্য বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ পর্যন্ত অবগত ছিলেন।

 এসব কারণে ৩/৪ বছরের মধ্যে হাসকিং মিলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। একটু খেয়াল করলেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, হাসকিং মিলগুলো সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে স্বয়ংক্রিয় চালকলের চাল কিনে চুক্তির চাল পরিশোধ করায় হাসকিং মিলগুলো শুধুমাত্র মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয় চালকলের প্রস্তুতকৃত চাল হাসকিং মিলারদের মাধ্যমে সরকারি খাদ্যগুদামে মজুদ হয়েছে। যা অনেকটা জেগে ঘুমানোর মতোই অবস্থা।

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তর কয়েক বছর ধরেই জেগে ঘুমানোর কারণে একমাত্র কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠা হাসকিং মিল শিল্পকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়েছে। এই শিল্পে লাখ লাখ মহিলা ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। যাদেরকে কাজ হারিয়ে বেকার হতে হয়েছে। শুধু শ্রমিকই নয়, এ শিল্পের সাথে জড়িত প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে ছোট ছোট ধান ব্যবসায়ী, পরিবহনে জড়িত ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত পড়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, চলতি মৌসুমে ধানের বাড়তি বাজারের কারণে ছোট ছোট হাসকিং মিলগুলো সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ না হওয়ার কারণে খাদ্যমন্ত্রী ১৬ হাজার চাল কলকে কালো তালিকাভুক্ত করেছেন। যেখানে আইনে আছে, শুধুমাত্র আগ্রহী মিলারগণই চুক্তিবদ্ধ হতে পারবেন। সকলকে চুক্তিবন্ধ করতে হবে, অভ্যন্তরীণ চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

তাহলে কেন এবং কোন যুক্তিতে ১৬ হাজার মিলকে কালো তালিকাভুক্ত করা হলো? বাস্তবতা হচ্ছে, এই মুহূর্তে সরকারের চালের প্রয়োজন, তাই সবাই কেন চুক্তি করলেন না? কথা হলো, সরকারি খাদ্য গুদামে তো গত বছর থেকেই চাল গম মজুদের পরিমাণ কম ছিল। খাদ্য শস্য মজুদের যে সংকট তাতো আকষ্মিক ছিল না। সরকারি খাদ্য গুদামে চালের মজুদ কমে আসার পর তা পুরণের লক্ষ্যে উপযুক্ত সময়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এটাই বাস্তবতা, আর সে ব্যর্থতা ঢাকতে চাল কলকে কালো তালিকাভুক্ত করা সহ নানা অভিযোগ উত্থাপন করা হচ্ছে।

 খাদ্য অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকেই বলেছিলেন, যেহেতু কাবিখার মতো প্রকল্পে এখন টাকা দেয়া হচ্ছে, আবার সরকারি বিভিন্ন চ্যানেলে খাদ্য শস্যের সরবরাহ কমে এসেছে, সেহেতু এখন আর অভ্যন্তরীণভাবে বেশি পরিমাণ চাল সংগ্রহের প্রয়োজন নেই। সুতরাং আমরা এখন আর বেশি পরিমাণ চাল সংগ্রহ করবো না বলেও ওনারা মন্তব্য করেন।

কপাল খারাপ, মাত্র এক মৌসুমের উজানের ঢলে হাওরের ধান নষ্ট ও ‘নেকব্লাস্ট’ রোগে ফলন বিপর্যয় মোকাবেলায় সরকারকে নিদারুন কষ্টে পড়তে হয়েছে। নিশ্চয়ই ওনাদের জানা থাকার কথা, জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার মতে, যে কোন রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অন্তত: ৬০ দিনের আপদকালীন খাদ্য মজুদ রাখা জরুরি। সে মতে, আমাদের ১ দিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার মেট্রিক টন অর্থাৎ ৬০ দিনের প্রয়োজন প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার টন খাদ্যের। কোনকালেই আমাদের দেশে ৬০ দিনতো দুরের কথা, ৩০ দিনেরই খাদ্য মজুদই ছিল না। অথচ খাদ্য বিভাগের পক্ষে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যশস্য সংগ্রহের উপযোগি পরিবেশ অনুকুলে থাকার পরও শুধু অদূরদর্শিতার দরুণ খাদ্য নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে পড়েছে।

অথচ চালকল মালিক, আমদানিকারক, খাদ্য শস্য ব্যবসায়ীরা যেন খাদ্য মজুদ সংকটের কারণে অতি মুনাফার জন্য ভোক্তাদের কষ্টের কারণ হতে না পারে, যা নিশ্চিত করতে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য মজুদ রাখা বাঞ্ছনীয়। যেহেতু এখনও আশ্বিন কার্তিক মাস এলেই সরকারকে খোলাবাজারে চাল আটা বিক্রি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, সেহেতু সরকারিভাবে খাদ্য মজুদের যে গুরুত্ব তাকে খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই। বরং হাসকিং মিলগুলোকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে স্বল্প সুদে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা করে আধুনিকায়ন করতে না পারলে স্বয়ংক্রিয় চালকলের একচেটিয়া আধিপত্যকে রোধ করা সম্ভব হবে না।

এজন্য সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা, সরকারি বিভিন্ন চ্যানেলে চাল সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং সরকারের ‘খাদ্যবান্ধব’ জনপ্রিয় কর্মসূচিকে সফল করতে হলে, প্রণীত বর্তমান খাদ্য নীতিমালার সংশোধন এনে সহনীয় পর্যায়ে বিনির্দেশ পুন:নির্ধারণ করে সকল হাসকিং মিলগুলোকে সরকারের সাথে চুক্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে বাজারে প্রতিযোগিতা ফিরে আসবে এবং স্বয়ংক্রিয় চাল কলের একচেটিয়া আধিপত্য অনেকাংশেই রোধ হবে। তাহলে অন্তত: এ বছর চালের বাজারে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা আর ভবিষ্যতে ঘটার সম্ভাবনাও থাকবে না। তা না হলে সুযোগ সন্ধানী আমদানিকারকদের দৌরাত্ম্যকে রোধ করা কঠিন হবে। সে জন্য স্থিতিশীল বাজার ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ কার্যক্রমের সফলতা, সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে হাসকিং মিলগুলোকে পুনর্জীবিত করা একান্তভাবে অপরিহার্য্য।
  লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮

 

এই বিভাগের আরো খবর

কারখানায় আগুন : আর কতো স্বপ্নের মৃত্যু!

মামুন রশীদ :কারখানায় আগুন! সংবাদ মাধ্যমের এরকম শিরোনাম আমাদের চোখ সওয়া, গা সওয়া হয়ে গেছে। কদিন পর-পরই সংবাদ মাধ্যমে এরকম শিরোনামে আগুনে ঝলসে যাওয়া কিছু মানুষের খবর প্রকাশ হয়। খবরের সঙ্গে থাকে জ্বলতে থাকা কারখানার ছবি অথবা স্বজনের আহাজারি। হয়তো খবর প্রকাশের পরদিন আরো কিছু ফলোআপ থাকে। যদি মৃতের সংখ্যা বেশি হয়, অথবা আগুন না নিভে থাকে।

আর না হলে ওইদিনই চাপ পড়ে যায় আগুনের লেলিহান শিখার ভয়াবহতা। মাঝখান থেকে আগুনে পুড়ে কয়লা হয় কিছু মানুষ, শেষ হয়ে যায় কিছু স্বপ্ন। হারিয়ে যায় সম্ভাবনাময় প্রাণ। আর হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের দুর্ভোগ, তাদের আহাজারি, তাদের কষ্টÑচাপা পড়ে যায় প্রতিদিনের অসংখ্য খবরের মাঝে।

 সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর সকালে মুন্সীগঞ্জে একটি টেক্সটাইল কারখানায় আগুন লাগার খবর এসেছে সংবাদ মাধ্যমে। কারখানার ছয় জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর দিয়ে আরো কয়েকজনের নিখোঁজ হবার কথা বলা হয়েছিল। প্রথম দিন যে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদটি স্থান পেয়েছিল সংবাদ মাধ্যমে, পরদিন আর সেই মূল্য পায়নি। তাই নিখোঁজ মানুষগুলোর সন্ধান আদৌ মিলেছে কিনা সংবাদপত্র থেকে জানতে পারিনি। আরো অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ খবরের ভিরে হারিয়ে গেছে নিখোঁজ মানুষদের খবর।

এই ঘটনা এবারই নয় শুধু, প্রতিবারই। কারখানায় আগুন লাগে, মানুষ পুড়ে ছাই হয়। আমরা বেদনার্ত হই, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পড়ে অসহায় ভাবে পুড়ে মরা মানুষগুলোর জন্য আমাদের চোখ ছলছল করে ওঠে, আর্দ্র হয়। কিন্তু আগুন লাগা থামে না। আগুনে মানুষগুলোকে পুড়িয়ে মারার জন্য যারা দায়ী তাদের শাস্তির কথা পড়তে পারি না। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নিয়মমাফিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তারা সময়মতো প্রতিবেদনও জমা দেয়। কিন্তু সেই প্রতিবেদন থেকে সমাধানের পথ খুঁজে নিতে আমরা দেখি না।


আমাদের সামনে আজো টাটকা, দগদগে ক্ষত তৈরি করে দাঁড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার নিমতলীর এক রাসায়নিক কারখানার অগ্নিকা । এই সেদিনের তাজরীন গার্মেন্টস কারাখানার অগ্নিকা , রাজধানীর চিড়িয়াখানা রোৃেড এক প্লাস্টিক কারখানায় লাগা আগুন। ২০১০ সালে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাে  আমরা হারিয়েছিলাম ১২৪ জনকে। ভয়াবহ সেই ঘটনার পরই মনে হয়েছিল, শিল্পকারখানায় আগুনে পুড়ে আর কাউকে মরতে হবে না। এভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কোন মানুষকে শ্রম বিক্রি করতে হবে না। কিন্তু সে আশার মুখে ছাই দিয়ে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে।

শুধু কি আগুনে পুড়ে? আরো কতোভাবেই যে কারখানায় শ্রমিকের মৃত্যু আজ সহজলভ্য হয়ে উঠেছে, তা লিখেও শেষ হবে না। আর সেইসব দুর্ঘটনায় আমাদের হারিয়ে যাওয়া অসহায় শ্রমিকের সংখ্যারও ইয়াত্তা নেই। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে শিল্প-কারখানায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজারেরও বেশি শ্রমিক।

 এসআরএস ও ব্লাস্ট প্রতিনিধিদের তথ্যে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে ৩২৮টি দুর্ঘটনায় ৪৯০ জন, ২০১৩ সালে ২৮৯টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৫১০ জন, ২০১৪ সালে ২৭১টি দুর্ঘটনায় ৩২০ জন, ২০১৫ সালে ২৮২টি দুর্ঘটনায় ৩৭৩ জন ও ২০১৬ সালে ২৫৮টি দুর্ঘটনায় ৩৮২ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে কর্মক্ষেত্রেই এই শ্রমিকরা প্রাণ হারিয়েছেন। অথচ আমাদের শ্রম আইনে স্পষ্ট বলা আছে, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সেবা এবং নিরাপত্তা সুবিধা প্রতিটি শ্রমিকের বৈধ এবং আইনগত অধিকার।

আমাদের শ্রম আইন ২০০৬-এÑপরিচ্ছন্নতা, বায়ু চলাচল এবং তাপমাত্রা ব্যবস্থা, কৃত্রিম আর্দ্রকরণ, জনবহুলতা, আলোর ব্যবস্থা, অগ্নি সংক্রান্ত ঘটনা, অতিরিক্ত ওজন, বিল্ডিং এবং যন্ত্রপাতির সুরক্ষা, যন্ত্রপাতিকে ঘেরাও করা, চলমান যন্ত্রপাতির উপর বা কাছাকাছি কাজ করা, বিস্ফোরক বা দাহ্য গ্যাস ও ধুলা, বিপজ্জনক ধোঁয়ার বিরুদ্ধে সতর্কতা, ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থার কথাগুলো বিভিন্ন ধারায় স্পষ্ট করা আছে। যাতে করে কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশ থাকে। বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা থেকে একথা তো স্পষ্ট যে, বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রম আইনে যা আছে তার সঠিক প্রয়োগ নেই। যদি প্রয়োগ থাকতো, আইনের বাস্তবায়ন থাকতো তাহলে প্রতিনিয়ত এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটা সম্ভব হতো না।

 আইনের যেমন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নেই, তেমনি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের যথাযথ ক্ষতিপূরণও দেয়া হয় না। এমনকি ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ন্যূনতম মানদ ও নির্ধারিত নেই। আর চলমান আইনে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের যে পাওনা তাও যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেয়া হয় না, এমন অভিযোগের নজিরও অনেক। যদি যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ হতো, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক তার ন্যায্য পাওনা বুঝে পেতো তাহলে বারেবারে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতো না।


শ্রমিকের কর্মপরিবেশ নিরাপদ এবং নিশ্চিত না কেউ শ্রমিক নিয়োগ করতো না। নিমতলীর অগ্নিকাে র পর গঠিত তদন্ত কমিটি ২৩ দফা সুপারিশ করেছিল। কমিটির সুপারিশে রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থের কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম  আবাসিক এলাকার বাইরে নির্ধারিত পল্লীতে সরিয়ে নেয়াসহ নানান বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের প্রচলিত আইনের সঙ্গে তদন্ত কমিটির সুপারিশের কোনটিই যে যথাযথভাবে প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন হয়নি, একের পর এক দুর্ঘটনা তারই প্রমাণ। আর তাই আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো হয়ে উঠছে এক একটি মৃত্যুকূপ। যারা ছিনিয়ে নিচ্ছে সম্ভাবনাময় প্রাণ। আমাদের স্বপ্ন।
লেখক : সাংবাদিক-কবি
[email protected]
০১৯১২-৩০৬৩৫৬

এই বিভাগের আরো খবর

মাদক চাই না, মাদকমুক্ত সমাজ চাই

মোঃ মামুন-উর-রশিদ :প্রতিটি জিনিসের দুইটি দিক থাকে। একটি হলো ভালো আর একটি হলো মন্দ। এই ভালো মন্দকে বিভেদ করার জন্য আছে দেশীও আইন, সামাজিক নিয়ম এবং সর্বোপরি মানুষের বিবেক। অনেক ভালোমন্দকে বিবেক দিয়ে ই বিবেচনা করতে হয়। সেক্ষেত্রে মন্দকে গ্রহণ না করার ব্যাপারই বিবেক সিদ্ধান্ত দেয়। এমনি একটি মন্দ জিনিস হলো মাদক। এই মাদক সমাজের তরুণের থেকে শুরু করে ছড়িয়ে পড়েছে কিশোরদের মাঝে।  

কিশোররা যখন তরুণ হচ্ছে, তখন পরবর্তি কিশোররাও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা সহ এমনকি কুকুর মারার ইনজেকশন সেবন করছে আমাদের দেশের মাদকসেবীরা। এছাড়া তারা টিকটিকির লেজের, গাছের আটার পিছনেও ছুটছে তারা, কারণ সেগুলো মাদকসেবীদের কাছে মাদকের মর্যাদা লাভ করেছে। সুতরাং নিরীহ ক্ষুদ্র টিকটিকিও রক্ষা পায়নি তাদের হাত থেকে। আসলে বর্তমানে দেশে মাদকের ব্যবহার বেড়েই চলছে ব্যাপক হারে। শহর থেকে অজপাড়াগাঁও পর্যন্ত এমন কোন স্থান পাওয়া যাবে না, যেখানে মাদকের বিস্তৃতি ঘটেনি।

আর এতে ঝুঁকে পড়েছে উঠতি বয়সি তরুণ কিশোররা এবং বেকার তরুণরা। কারণ এখন অনেক অভিভাবক এখনো অন্ধকারে পড়ে আছে তাদের ছেলে-মেয়েদের প্রতি তারা দেখাচ্ছে উদাসিনতা। সমাজের দু/চার জন সচেতন ব্যক্তি ঐ সব উদাসিন অভিভাবককে কিছু বলতে গেলে বরং তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের বিপত্তি, হুমকি এবং এমনকি প্রাণ নাশের হুমকির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। সুতরাং সমাজের অনেক সচেতন ব্যক্তির ইচ্ছা থাকলেও বিপত্তির ভয়ে পরের সন্তানের ব্যাপারে আর আগ্রহী হয় না। তারা ভাবে – ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’/বা ভিক্ষা চাইনা, কুত্তা সামলাও”। এর পিছনে সবচেয়ে উল্লেখ করার মত যে কারণ তাহলো চরম দারিদ্রতা।

 পিতা মাতা যখন সন্তানদের ভরন পোষণে ব্যর্থ হচ্ছে তখন তাদের তরুণ বা কিশোর সন্তানেরা অন্যের বাগানের শাক সবজি, অন্যের গাছের সুপারি অথবা শহরে ছিচকে চুরির মাধ্যমে টাকা উপার্জন করে টাকা নিয়ে এসে অভিভাকদের হাতে দিচ্ছে, তখন অভিভাবকরা ওই প্রদত্ত টাকার উৎস খোঁজে না। তাছাড়া অন্য যে কোন কিছুতেই শাসন করছে না, তাদের সন্তানদেরকে। তাছাড়া বেকারত্বের অভিশাপে ছেলেমেয়েরা বেশী বেশী মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

গ্রামাঞ্চলে কিছু অনুশাসন বা নিয়ন্ত্রণের কারণে শুধুমাত্র উঠতি বয়সি ছেলেরাই মাদকের আগ্রহী হয়ে উঠছে। কিন্তু শহরাঞ্চলে ছেলে ও মেয়ে উভয়ে সমভাবে মাদকের দিকে আগ্রহী হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শহর অঞ্চলে কেউ কারো খোঁজ নেওয়ার মতো কোন সময় নেই। সুতরাং শহরের ছেলে মেয়েরা স্কুল, কলেজ ক্যাম্পাসে, পার্ক, নির্জন এলাকায়, গলি পথে, দোকানে মাদক গ্রহণ করছে। যেখানে জনসমাবেশ সেখানে তারা প্রকাশ্যে বিড়ি, সিগারেট গ্রহণ করছে।


এই বিড়ি, সিগারেট অবশ্যই উৎসাহিত করছে পরবর্তিতে আরো বড় ধরনের মাদক গ্রহণ করতে। এসব মাদক ক্রয় করার জন্য তাদের টাকা উপার্জন করতে হয়। যেহেতু তাদের মাদকের টাকা উপার্জনে তেমন কোন ক্ষেত্রে পরিবেশ নেই তখন তারা ঝুঁকে পড়ে অন্ধকার পথে। শুরু করে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, জমিদখল, চাঁদাবাজি ইত্যাদি। পরবর্তিতে উক্ত অপকর্ম গুলোর কুফল হিসাবে অনেকে মৃত্যু বরন করতে হয়েছে।

অন্যদিকে মাদকাসক্ত ব্যক্তি/ তরুণ/কিশোররা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এসব মাদকাসক্তরা হারায় স্মৃতিশক্তি এমনকি বোধ শক্তিও। মাদকাসক্তরা সব সময়েই এক সিরিঞ্জ ব্যবহার করার ফলে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে তাদের সকল আশা আকাঙ্খা নিমিষেই ধুলিস্যত হয়ে যায়। ফলে তার মৃত্যুতে উক্ত পরিবারের ও মানুষিক মৃত্যুও  ডেকে নিয়ে আসে, অশান্ত করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। মাদকের অর্থ সংগ্রহ করতে পরিবারের সদস্যদের সাথে মাদকাসক্তের দূরত্ব বাড়তে থাকে। দ্বন্দ্বে খুন হয় ভাই, বোন, পিতা মাতার মতো স্বজনরাও?

উদাহরণ স্বরূপ, ঢাকায় মিরপুরে পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী নিহত হয় তাদের মাদকাসক্ত কন্যা ঐশি দ্বারা। কারণ হিসাবে দেখা গেছে অঢেল অর্থ, ছেলেমেয়েদের প্রতি উদাসিনতা এবং মাদকাসক্ত বন্ধুদের সঙ্গদোষে পাল্লায় পড়ে জন্মদাতা পিতামাতাকে নেশাজাতীয় পানীয় পান করিয়ে অচেতন অবস্থায় তাদেরকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। শুধু তাই নয় অনেক অজানা খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, পারিবারিক নির্যাতন সবকিছু মিলে ছোট বড় অনেক অপরাধ বাড়ছে এ মাদকের জন্যই।

অবশ্য আশার বাণী এই যে, উক্ত জাতীয় সমস্যাকে চিহ্নিত করে শহরে-গ্রামে মাঝে মাঝে আলোচনা, সেমিনার, সভা, সিম্পোজিয়াম নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যাতে মানুষের মাঝে মাদকের ক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হন এবং জীবন বিনাশী এ মাদককে না বলে। এ ক্ষেত্রে সরকার বেসরকারী সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা গুলো এ ব্যাপারে বিপুল  অর্থ ব্যয় করেন। তবে এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকে মানুষের মাঝে অনেক সচেতনতার দাবী করেন। কাজের কাজ হচ্ছে কি? কী করেই বা হবে? আমরা আসলে গোড়া উৎপাদন না করতে পারলে এসব সভা, সমাবেশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম কোন কাজ হবে না।

 যারা মাদক উৎপাদক, পাচার বহন ও সরবরাহ করে তাদের দিকে আগে দৃষ্টি দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে উন্নত নৈতিকতার অধিকারী হতে হবে। তাছাড়া পত্র পত্রিকা মারফত জানতে পারা যায় যে, দেশের সীমান্ত দিয়ে ভারত, মিয়ানমার সহ আরও অনেক দেশের মাদক দ্রব্যাদি দেশের মধ্যে প্রবেশ করছে। কিন্তু এসব চোরাচালানের খবর কি প্রশাসন জানেন না? অবশ্যই জানেন এ ক্ষেত্রে না জানার তেমন কোন ব্যাপার না। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ গুলো বাংলাদেশকে মাদকের একটি নিরাপদ বাজার তৈরী করেছে। আর এদেশের অনেক রাঘোব বোয়াল সেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থেকে আমাদের তরুণ সমাজকে মাদক সমাজে পরিণত করছে। তাদেরকে গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে পারলে মাদক ব্যবসার পরিমাণ ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা নিঃ সন্দেহে কমে আসবে। যারা বিরাজমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন, যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে লঙ্ঘন করে অবিরত তারা নিঃ সন্দেহে অন্যায় করে।

আর অন্যায় কারীরা চিরদিনই মানুষিক ভাবে দূর্বল হয়। মাদকের সঙ্গেঁ যারা জড়িত তারা এই অন্যায় কাজটিই করছেন। একটি সুন্দর, সুখী, সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে চাই মাদকমুক্ত সমাজ। তাই আমাদের দেশকে উন্নতির পথে নিতে হলে এবং আগামী প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, ভেঙ্গে দিতে হবে মাদকের কালোহাত। আমাদের আগামী প্রজন্মকে দিতে হবে সঠিক দিক নির্দেশনা, তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে হবে আশার আলোর জগতে। আসুন আমরা সবাই মিলে জাতিকে বাঁচাই, আগামী প্রজন্মকে বাঁচাই, বাংলাদেশকে বাঁচাই বাঙালি ও বাংলাদেশ দীর্ঘজীবি হউক।
লেখক ঃ সাংবাদিক, কলামিষ্ট, কলেজ শিক্ষক
[email protected]
০১৭১১-০১০১২১

এই বিভাগের আরো খবর

লাল ঝান্ডার জসিম মন্ডল

সৈয়দ আহমেদ অটল:বিদ্যমান সমাজের প্রতি শ্রমিক নেতা জসিম উদ্দিন মন্ডলের কোন আস্থা বা বিশ্বাস ছিল না। বৃটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ তিন আমলের সমাজকেই তিনি দেখেছেন অতি কাছ থেকে। তিনি জীবন দিয়ে বুঝেছেন সব সমাজের একটাই নীতি তা হলো শোষণ। মানুষ মানুষকে শোষণ করে। সেটা কোন সভ্য সমাজ হতে পারে না। শোষকের কোন জাত-ভেদ নেই। তাই তিনি ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে। আর আজীবন শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সেই লড়াইয়ে তার আহবান ছিল ‘এই সমাজ ভাঙিতেই হইবে।’ এই ছিল তার সারা জীবনের বিপ্লবী বাণী।

পুঁজিবাদী সমাজের পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক সমাজে বিশ্বাসী ছিলেন এই আজীবন বিপ্লবী। আপোষহীন এই মানুষটি অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকীর শততম বর্ষে (১৯১৭ সালের ১৭ অক্টোবর রুশ বিপ্লব সংগঠিত হয়) ৯৫ বছর বয়সে গত ২ অক্টোবর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন। তবে রেখে গেছেন তার চিন্তা-চেতনা, যা আগামী প্রজন্মের কাছে শোষণহীন সমাজ বিনির্মাণে সহায়ক হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ১৯২২ সালে জন্মগ্রহণ করে জসিম মন্ডল ১৯৪০ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন লাল ঝান্ডার সক্রিয় কর্মি। তার প্রিয় রং ছিল লাল। তাই লাল ঝান্ডার নীচে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন দ্বিধাহীন চিত্তে।

কমরেড জসিম মন্ডলের সাথে আমার প্রথম দেখা ১৯৭০ সালে বগুড়ায় ছাত্রাবস্থায়। তখন গোটা পূর্ব বাংলা এক তেজোদীপ্ত আন্দোলনে মুখর। ঊনসত্তর থেকে শুরু হয়েছিল সেই ১১ দফার আন্দোলন। তিনি থাকতেন পাবনার ঈশ্বরদীতে। চাকরি করতেন রেলে। প্রায়ই বগুড়া আসতেন বগুড়ার শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করতে। বগুড়ায় তার সখ্যতা ছিল কমরেড মোখলেসুর রহমান, কমরেড আবদুল লতিফ, কমরেড সুবোধ লাহিড়ী, মোশারফ হোসেন মন্ডল, শ্রমিক নেতা আবদুস সাত্তার তারা প্রমুখের সাথে।

তার জনসভা সফল করতে বগুড়া শহরে মাইকিং করেছি, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগিয়েছি বন্ধুদের সাথে। মনেই আছেÑ সে সময় ছাত্রইউনিয়নের ভাল পোস্টার লিখতেন ফিরোজ আহমেদ সুজা, ফিরোজ ভাই। রাত জেগে তার লেখা পোস্টার আমরা রাত জেগেই সারা শহরের দেয়ালে সেঁটেছি। ১৯৬৯ থেকে ’৭২ পর্যন্ত জসিম মন্ডল বগুড়ায় যত জনসভায় বক্তৃতা করেছেন তার কোনটাই শোনা বাদ যায়নি। জসিম মন্ডল, কোথায় গেল সেইসব দিনরাত্রি!  

এই সমাজ তিনি কেন ভাঙতে চেয়েছিলেন? জসিম মন্ডল তার বক্তৃতায় স্পষ্ট বলেছেন-‘দরখাস্ত করে, পানিপড়া দিয়ে, কেবলই স্লোগান দিয়ে এই সমাজ একচুলও পরিবর্তন করা যাবে না। সমাজতন্ত্র ছাড়া কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। চল্লিশের দশক থেকে আজ পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা বড় লোকের, জোতদারের, মহাজনের সরকার। এরা শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করবে না। শ্রমিকের রাজনীতি বুঝে, অংক করে, জীবন বাজি রেখে লড়াই করে এই সমাজ ভাঙতে হবে এবং ভাঙিতেই হবে।

শ্রমিককেই লড়াই করে ও বিপ্লবের মাধ্যমে এই বড় লোকের সমাজ ভেঙে তার নিজের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমি কমিউনিস্ট পার্টি করেছি এবং এখনো করছি পেটের যন্ত্রণায়, ক্ষুধার তাড়নায়, বাঁচার জন্যে ও অন্যকে বাঁচাবার জন্য। এই হাত দিয়ে ব্রিটিশকে গুলি করেছি, পাকিস্তানীদের মেরেছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছিÑ আজও এই সমাজ ভাঙার জন্য কাজ করছি। তোমরা না ছাত্র। তোমরা না যুবক। তোমাদের ভয় কিসের? শ্রমিক শ্রেণীর আদর্শ গ্রহণ করে ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই সমাজ ভাঙার লড়াই করতে হবে।’   

বাবা হাউস উদ্দীন মন্ডল রেলওয়েতে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে তিনিও রেলের চাকরিতে ঢুকে যান। বাবার চাকরির সুবাদে সিরাজগঞ্জ, রানাঘাট, পার্বতীপুর, ঈশ্বরদী, কোলকাতায় বসবাস করেন। বাবার সাথে কোলকাতায় নারকেলডাঙা রেল কলোনিতে বসবাসকালে মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে মিছিলে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝিতে শিয়ালদহে মাসিক ১৫ টাকা বেতনে রেলের চাকরিতে যোগ দেন। চাকরির পাশাপাশি কাঁস্তে-হাতুরিখচিত লাল ঝান্ডার একজন সক্রিয় কর্মি হয়ে ওঠেন। সে বছরই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)’র সদস্যপদ লাভ করেন।

 ১৯৪১-৪২ সালে জসিম মন্ডল চাকরিতে প্রমোশন পেয়ে ‘সেকেন্ড ফায়ারম্যান’ হন। রেল শ্রমিক আন্দোলনে তিনি জ্যোতি বসুর সহকর্মি ছিলেন। ১৯৪৬-এর নির্বাচনে রেল আসনে জ্যোতিবসু’র নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় অংশ নেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর জসিম মন্ডল পার্বতীপুর এবং তাঁর বাবা ঈশ্বরদীতে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৪৯ সালে রেলের রেশনে চাউলের পরিবর্তে খুদ সরবরাহ করলে রেল শ্রমিক ইউনিয়নের ‘খুদ স্ট্রাইকের’ অপরাধে জসিমউদ্দিন মন্ডলসহ ছয় নেতার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়।

একপর্যায়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং রেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে চাকরিচ্যুত করে। ১৯৫৪ সালে তিনি মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর আবার তাঁকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। এ সময় রাজশাহী জেলে কিছুদিন থাকার পর তাঁকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বদলি করা হল। ১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬২ সালের দিকে আবার গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৪ সালে মুক্তি পান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতা চলে যান। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

 শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন তিনি। একজন সাধারণ রেল শ্রমিক থেকে হয়ে উঠেছিলেন শ্রমিক নেতা। জসিম মন্ডল উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন শ্রমিক এলাকায় সক্রিয়ভাবে আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। বক্তৃতায় খুবই সাধারণ ভাষায় শাসক- শোষকের শোষণের কর্মকান্ড তুলে ধরতেন। যা সাধারণ মানুষ সহজেই গ্রহণ করতেন। জসিম মন্ডল যখন বক্তৃতা করতেন তখন জনতা থাকতেন পিনপতন নীরবতায়।

সব ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে ৭৭ বছর আপোষহীন সংগ্রাম করেছেন। কি পেয়েছেন, আর কি পাননি- সে কথা জানা হয়নি। রেলের আগুনের তাপে তাপে শরীর-মন দুইই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল জসিম মন্ডলের। যে উত্তাপ আপোষ বা সুবিধাবাদী হতে শেখায়নি। যে আগুন লোহা গলায়, সেই আগুনেই সমাজ পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। আর অন্যদেরও উত্তপ্ত করেছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামে। জীবনে ১৭ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা জসিম উদ্দিন মন্ডলের জন্ম ১৯২২ সালে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায়।


আরেক বক্তৃতায় জসিম মন্ডল বলেন ‘এতো সুন্দর সমাজ, এতো উন্নত হচ্ছে তারপরও আমি এই সমাজ ভাঙতে চাই এই জন্যেই- আমি রেলে করে ৬০ গাড়ি চাল নিয়ে এলাম আর বাড়িতে এসে খাটে বসেছি। আমার বউ এতটুকু ভাত দিচ্ছে। আমি বললাম- এই ভাত দিয়ে কিছু হয়? বলল, চাল এতটুকুই ছিল। তা হলে ৬০ গাড়ি চাল নিয়ে আসলাম, আর আমার ঘরে চাল নাই। গুষ্ঠি মারি আমি এই সমাজের, গুষ্ঠি মারি এই আইনের। কোন শালার আইন মানা হবে না।

আমি বৃটিশের আইন মানি নাই, আমি পাকিস্তানের আইন মানি নাই। আমি দুইটা শ্রেণিতে বিশ্বাস করি। একটা গরিব শ্রেণি, একটা ধনিক শ্রেণি। একটা বড় লোক, একটা গরিব লোক। গরিব লোককে না ঠকালে, গরিবকে পয়সা কম না দিলে কোন শালা বড় লোক হতে পারে না। আমি এই রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। এই জন্যই আমি কমিউনিস্ট পার্টি করি। বুঝেই করি।’আমাদের আজকের সমাজ নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু হয় ‘অস্বাভাবিক’ভাবে।

সমাজে নারীরা প্রতিনিয়ত নিগৃহীত হচ্ছেন। ধর্ষিত হচ্ছেন, তারপর হত্যা করা হচ্ছে। সমাজ ঘুষ-দুর্নীতিতে ভরপুর। শিক্ষিত সরকারি-বেসরকারি লোকেরা নানা অপকর্মে জড়িত। এমন একটি পঁচা-গলা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে হলে নতুন মানুষ চাই। লোভহীন, আপোষহীন মানুষ চাই। কমরেড জসিম মন্ডলের মত মানুষ চাই। কিন্তু সমাজে সেই মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সমাজে ঈমানদার মানুষের আজ বড়ই অভাব। যে মানুষ মানুষকে ভালবাসে। মানুষের সৎভাবে, সৎপথে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। অথচ যা মানুষের অধিকার। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, এক কঠিন কাজ।

যে জন্য নানা নির্যাতন তো বটেই, এমন কি জীবন পর্যন্ত দিতে হয়। সেই কঠিন কাজটি নিজের জীবনের ব্রত হিসাবে নিয়েছিলেন জসিম মন্ডল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনগণের ‘কমরেড’। এ এক কঠিন কাজ। আপদ মস্তক শ্রমিক ছিলেন বলে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজ গঠনের কোন বিকল্প নেই এই সত্যকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। সেটাই তো স্বাভাবিক। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের কমিউনিষ্ট।   

আমার সাথে তার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল বছর খানেক আগে ঢাকায় কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) অফিসে। কথা হয়েছিল সাংবাদিক হিসাবে একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার। রাজীও হয়েছিলেন। তিনি ঢাকায় এলে সাধারণত উঠতেন যাত্রাবাড়িতে মেয়ের বাসায়। কিন্তু কেন জানি, সেই সাক্ষাৎকারটি আর নেয়া হয়নি। যখন সেই সাক্ষাৎকার নেয়ার খুবই প্রয়োজন বোধ করলাম তখন তিনি খুবই অসুস্থ। গত কিছুদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। একদিন শুনলাম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ভাবছিলাম আর বোধ হয় তার সাক্ষাৎকার নেয়া হয় না। হলোও তাই। তবে তার শেষ বক্তৃতা শুনেছিলাম সিপিবির সর্বশেষ কংগ্রেস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত লাল পতাকার সমাবেশে। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল মুষলধারে। সেই বৃষ্টির মধ্যে জসিম মন্ডল বক্তৃতা শেষ করেছিলেন তার সেই বিখ্যাত উক্তি দিয়ে ‘এই সমাজ ভাঙিতেই হইবে।’প্রিয় কমরেড, শোষনমুক্ত প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে আপনার সারা জীবনের সংগ্রামকে জানাই লাল সালাম।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট    
[email protected]
০১৫৫২-৩২২৯৪২

এই বিভাগের আরো খবর

সময়খেকো শহরের বদনাম ঘুচাতে ‘চলন্ত রাস্তা’

আতাউর রহমান মিটন :নিউটন সাহেবের মাথায় আপেল পড়েছিল বিধায় পদার্থবিদ্যার যুগান্তকারী আবিষ্কারটি হয়েছিল। সেদিন এই বিজ্ঞানীর মাথায় আপেল না পড়ে ইট পড়লে কি হতো তাই ভাবছি। পাগলামি মানুষের মধ্যে নানাভাবে বাস করে। আমাদের অভ্যস্ত জীবনে হঠাৎ ব্যতিক্রম কিছু করলে বা বলে বসলে সেটাকে আমরা পাগলামি বলে উড়িয়ে দেই। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু চিরকালই ‘পাগলখ্যাত’ একদল মানুষ ব্যতিক্রম কিছু চিন্তা করেছে বলেই আমরা নতুন নতুন আবিষ্কারের সাথে পরিচিত হচ্ছি এবং আমাদের জীবনে গতি বেড়েই চলেছে।  

গতি মানুষের আরাধ্য। মানুষ আরও গতি চায়। বড় বড় প্লেনগুলো এখন যে গতিতে চলছে তারও চেয়ে বেশি গতি আমাদের কাম্য। আমরা আরও দ্রততার সাথে একজন আরেকজনের কাছে পৌঁছাতে চাই। ইন্টারনেট এর গতিও থ্রি জি হলে আমাদের চলছে না, আমরা ফোর জি বা ফাইভ জি চাই। অনেকেই আছেন যারা এখন টেরাবাইট গতি পাবার স্বপ্ন দেখছেন। গতিময় এই সভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে কি আমাদের ঢাকা শহর?

ঢাকার মত সময়খেকো শহর পৃথিবীতে খুব কমই আছে। এশিয়ার মধ্যে শীর্ষ হতাশার শহর ঢাকা। বিশ্বব্যাংক এর গবেষণা বলছে, ঢাকায় বর্তমানে যানবাহনের গতি ঘন্টায় ৭ কিঃ মিঃ। মহানগরের যানজট পরিস্থিতি উন্নত না হলে আগামী কয়েক বছরে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘন্টায় ৪ কিঃ মিঃ। অর্থাৎ  মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতির চাইতেও কম। একজন স্বাভাবিক মানুষ ঘন্টায় ৫ কিঃ মিঃ বেগে হাঁটেন। ঢাকা শহরের তীব্র এই যানজটের ফলে প্রতিদিন ১২ লক্ষ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে আর বছরে অপচয় হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। আর্থিক ক্ষতির চাইতেও এই যানজটের অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ যা অর্থমূল্যে বিচারের চেয়ে মানবিক দিকে থেকে দেখা ভাল।

যেমন, শহরে এখন এম্বুলেন্সও ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়। কোথাও কেউ সময়মত পৌঁছাতে পারে না। গাড়িগুলো জ্যামে বসে অযথা হর্ণ বাজাতে থাকে আর সেই শব্দ দূষণের শিকার হয়ে যাত্রী ও পথচারীদের মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়। চলাচলে বিড়ম্বনার অজুহাতে শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে আর তার প্রভাবে সমস্যার ভয়াবহতা আরও তীব্র হচ্ছে। যানজট পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা যায় কিন্তু সেটার প্রয়োজনীয়তা নেই কারণ ভুক্তভোগী আমরা প্রায় সকলেই। প্রশ্ন হচ্ছে এর থেকে বের হওয়ার উপায় কি?

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের যানজট কমাতে সরকার উড়াল সেতু বা ফ্লাইওভার তৈরি করছে। ঢাকায় শুরু হয়েছে মেট্রো রেল বসানোর কাজ। আরও ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অতীতে চেষ্টা হয়েছে নদীপথকে জনপ্রিয় করার। কিন্তু কোন কিছুই সমস্যার তীব্রতা কমাতে পারছে না। অনেকের মতেই গণ পরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণ একটা কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এতে করে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের পরিমাণ কমে যাবে। ফুটপাতগুলোকে দখলমুক্ত করে যথাযথভাবে ব্যবহারের উপযোগী করা হলে অনেক মানুষ কাছাকাছি দুরত্বে পায়ে হে্ঁেটও চলাচল করতে পারবে। অনেক মহল থেকে দাবি উঠেছে মহাসড়কে বাইসাইকেল চলাচলের জন্য আলাদা লেন তৈরি করার যাতে করে মানুষ বাই সাইকেলে যাতায়াত করে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমায়। পাতাল ট্রেন এর কথাও বলেন কেউ কেউ। অনেকের মতে, ঢাকা শহরের সম্প্রসারণ ও বিকেন্দ্রীকরণ একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এই ধরনের প্রায় সবগুলো বিকল্প নিয়েই আলোচনা-সমালোচনা আছে। সরকার এই বিকল্পগুলো নিয়ে কাজ করছেন।

যানজট সমস্যা কেবল ঢাকাতেই নয়, বরং বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলা শহরেরই একটা মারাত্মক সমস্যা হিসেবে নাগরিক জীবনে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। মানুষ নানা প্রয়োজনে নগরমুখী হচ্ছে। সেটা জেলা শহরেও যেমন, আবার ঢাকা শহরেও তেমনি। কোনভাবেই নগরমুখী এই জন¯্রােত ঠেকানো যাবে তা আমার মনে হয় না। জাপানের রাজধানী টোকিও শহরেও প্রতিদিন মানুষ বাড়ছে। ট্রেন ষ্টেশনগুলোতে গিজগিজ করছে মানুষ। অফিসের সময়ে টোকিও শহরেও গা ঠেসাঠেসি করে ট্রেনে চলাচল করতে হয়। সেখানে মাটির উপরে যেমন ট্রেন চলছে তেমনি মাটির নীচেও চার-পাঁচতলা পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন লাইনের ট্রেন চলাচল করে। মানবজট টোকিও শহরেও আছে। আমি নিউইয়র্কসহ বিশ্বের বহু দেশেই ভয়াবহ যানজট দেখেছি। এর মধ্যে ব্যাংককের যানজট আমার কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ মনে হয়েছিল। এখন কিন্তু ব্যাংককের অবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। অবস্থা পাল্টেছে কুয়ালালামপুর ও দিল্লীতেও। আরও নাম বলা যায়। মূল কথা হলো যানজট পরিস্থিতি উন্নয়নে দেশে দেশে প্রকল্প নেয়া হয়েছে কিন্তু সেখানে কিছুটা ফল পাওয়া গেলেও যানজট থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া যায়নি।  

সাধারণতঃ বড় শহরগুলোর যানজট পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখন খুবই জনপ্রিয় হলো উড়াল পথ নির্মাণ। অনেক দেশেই মাটির নীচে চলছে ট্রেন, উপরে আছে দু’তিন স্তরের উড়াল সেতু। মাটির উপরের দুই স্তরের উড়াল সেতুর মাঝে চলছে ট্রেন আর তার উপরে চলছে গাড়ি। সব মিলিয়ে একই স্থানে ৪ তলা বিশিষ্ট বা তারও বেশি স্তরের সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব। ধনী দেশগুলোতে নতুন নতুন বিকল্প রাস্তা তৈরির পাশাপাশি এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প বেশ জনপ্রিয়। অনেক নিন্দুকের মতে, এর নেপথ্যে কারণ হলো কন্সট্রাকশন্স বাণিজ্য, যার সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকে সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিবর্গ। যত বড় প্রকল্প, কমিশন থেকে শুরু করে কন্সট্রাকশন্স থেকে অর্জিত আয় তত বেশি। অতএব সকলের ঝোঁক ঐসব মেগা প্রকল্পের দিকে। জনগণের মগজ ধোলাইটাও সে কারণেই এসব মেগা প্রকল্পের পক্ষেই করা হয়ে থাকে। আমাদের কাছেও সে কারণেই উন্নয়ন মানে ‘মেগা প্রকল্প’ বাস্তবায়ন। আমরা মুখে মুখে পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই বিকল্প এর কথা বলব কিন্তু বাস্তবে ‘উপায় নেই’ অজুহাত দিয়ে মেগা প্রকল্পকেই স্বাগত জানাব। এটা একটা দুঃখজনক বাস্তবতা।

আমি আধুনিক বিকল্প নির্মাণের পক্ষে। কিন্তু ব্যয় কমানোটাকেও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঢাকা মহানগরের মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রতি কিঃমিঃ ১৬০ কোটি। আর মেট্রো রেল প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতি কিঃ মিঃ ৩৪২ কোটি টাকা প্রায়। আমাদের দেশে এখনও যেখানে প্রতি চারজনে একজন প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাদ্য কিনতে পারে না, সেখানে এত ব্যয়বহুল বিকল্প রাস্তা একটি আদর্শ হতে পারে কিনা তা ভাবা দরকার। সরকার মেগা প্রকল্প হাতে নিলেও টাকার যোগানটা কিন্তু আমরা অর্থাৎ দেশের সাধারণ মানুষেরা দেয়। আমাদের রাজস্ব আয়ের প্রায় ৬০% আসে ভ্যাট থেকে। একজন ভিৃক্ষুকও সেই ভ্যাট এর যোগানদার। সুতরাং যানজট নিরসনে একটি ব্যয় সাশ্রয়ী, আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও গতিশীল বিকল্প আমাদের সকলেরই কাম্য।

সম্প্রতি ঢাকায় যানজট নিরসনে একটি বিকল্প ধারণা উপস্থাপিত হয়েছে। ‘চলন্ত রাস্তা’ নামে এই বিকল্প ধারণাটি প্রথমে উপস্থাপিত হয় ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে ৯ সেপ্টেম্বর। আর গত সপ্তাহে এই ধারণার একটি মডেল তিনদিন ধরে প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালা গ্যালারীতে। আমি উভয় কর্মসূচিতে উপস্থিত থেকে প্রকল্পের ধারণাটি বোঝার চেষ্টা করেছি। ‘চলস্ত রাস্তা’ উপস্থাপক এর মত আমিও কোন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নই। নিতান্তই ঢাকার রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে যে নির্মম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি সেই অভিজ্ঞতার লেন্স দিয়ে মনে হয়েছে, ‘চলন্ত রাস্তা’ একটা বিকল্প হতেই পারে। পরিবহন ব্যবস্থাপনায় এটা একটা মৌলিক ধারণা বলেই আমি মনে করি। বিশ্বের যে কোন শহরেই মূল রাস্তা রেখেই এই ‘চলন্ত রাস্তা’ পদ্ধতিটি বাস্তবায়ন করে সুফল পাওয়া সম্ভব। কোন বহুতল ভবনে ওঠার জন্য একটা সময় পর্যন্ত আমরা কেবল সিঁড়ির কথাই ভাবতাম। কিন্তু এখন সেখানে যোগ হয়েছে লিফট, এসেছে এসকেলেটর বা ‘চলন্ত সিঁড়ি’। লিফট বা এসকেলেটর এর মতই চলার পথে ‘চলন্ত রাস্তা’ একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে বলে আমি মনে করি।

‘চলন্ত রাস্তা’ এই ধারণাটি আমাদের সামনে এনেছেন বাংলাদেশে সুস্থ ও বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যতম একজন পরিচালক আবু সাইয়ীদ। চলচ্চিত্র শিল্পে অনন্য অবদানের জন্য তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি একজন নির্মাতা, তিনি নির্মাণের লক্ষ্যে ভাবেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে ছবিটা মনের পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে হয়। যানজটমুক্ত একটি শহরের বিকল্প সে কারণে প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তোলাটা তার পক্ষে সহজ হয়েছে। সাইয়ীদ ভাইকে ধন্যবাদ জনস্বার্থে এমন একটি বিকল্প ধারণা উপস্থাপনের জন্য।

কি এই ‘চলন্ত রাস্তা’? এটা পাঠকের সুবিধার্থে এখানে একটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। এই রাস্তার মূল ধারণাটি “রোড এন্ড ভেইকেল ডাইভারসিফিকেশন” এর ভিত্তিতে দাঁড় করানো হয়েছে। এটি রাস্তার মাঝ বরাবর অথবা রাস্তার দুইপাশে ফুটপাতের উপর নির্মাণ করা যেতে পারে। সাধারণভাবে রাস্তার দু’ধারে ফুটপাতের প্রায় ৮-১০ ফুট উঁচুতে পিলারের উপর ৬ ফুটের একটি স্থায়ী প্লাটফরম এবং প্রতিটি ৬ ফুট সাইজের ৩ লেন এর একটি চলন্ত সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ট্রেনের মত এই চলন্ত সড়কের উপরে বগি থাকবে যেখানে বসে বা দাঁড়িয়ে যাত্রীরা সর্বোচ্চ ৪০ কিঃ মিঃ গতিতে যাতায়াত করতে পারবে। নির্দিষ্ট সময় পর পর কিছু সময়ের জন্য এই চলন্ত রাস্তা থামবে এবং যাত্রীরা অনায়াসে ওঠানামা করতে পারবে।
 
পাঠকের পক্ষে আমার এই লেখা থেকে ‘চলন্ত রাস্তা’ সম্পর্কে একটা পূর্ণ ধারণা পাওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ এর কারিগরী, বাস্তবায়ন, পরিচালনা, পরিবীক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় রয়েছে যা আমার এই সামান্য লেখায় ফুটে ওঠেনি। সেটা সঙ্গত কারণে সম্ভবও নয়। তাই আমি উৎসাহী পাঠকদের অনুরোধ করব আপনারা বিস্তারিত জানার জন্য ‘চলন্ত রাস্তা’ ধারণার উপস্থাপক আবু সাইয়ীদ এর সাথে সরাসরি (০১৫৫৯০২৪১১২ বা  ধনঁংধুববফ২০০৭@মসধরষ.পড়স ) যোগাযোগ করুন। মনে রাখতে হবে বিজ্ঞানী গ্রাহাম বেল এর টরে টক্কা ফোন বিবর্তিত হয়ে আজকের স্মার্ট ফোন এর রূপ লাভ করেছে। রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন থেকেই আজকের সুপারসনিক উড়োজাহাজ চলে এসেছে। সিঁড়ির বিকল্প হিসেবে লিফট এসেছে। তাহলে স্থির রাস্তার বিকল্প হিসেবে ‘চলন্ত রাস্তা’ আবির্ভূত হতে পারবে না কেন? আমি মনে করি ‘চলন্ত রাস্তা’ একটি মৌলিক ধারণা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণের উচিত এই ধারণা বিশ্লেষণ করা এবং এর যথাযথ বাস্তবায়নযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

আমেরিকা, জাপান, জার্মান, রাশিয়া, চীন  প্রভৃতি দেশ এগিয়ে গেছে তাদের জনগোষ্ঠীর সৃজনশীলতায়। জনগণ সেখানে সৃষ্টি করেছে আর সরকার সেই সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব দরবারে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। আমাদের দেশের সরকারেরও  উচিত জনগণের সৃজনশীলতাকে বিকশিত হতে সুযোগ দেয়া। দেশের আনাচে-কানাচে অনেক প্রতিভা রয়েছে, বিজ্ঞান মেলায় এমন অনেক সৃজনশীল প্রকল্প তুলে ধরা হয় যা প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাবে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। আমরা সরকারের কাছে মেধা বিকাশে সহযোগিতার আহ্বান জানাই। বাংলাদেশের লুকিয়ে থাকা, অনাদরে অবহেলায় হারিয়ে যাওয়া মেধাগুলোকে পরিপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার দাবী জানাই।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯

 

এই বিভাগের আরো খবর

ইয়াবা ছাড়–ন : মিয়ানমারকে না বলুন

 মীর আব্দুল আলীম :যে মিয়ানমার মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করছে, সে মিয়ানমারকে কিন্তু আমরাই আর্থিকভাবে সাহায্য করছি। এখন সরকারি হিসাবেই দেশটিতে দিনে সেবন হয় ২০ লাখ মিয়ানমারের ইয়াবা বড়ি। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে স্রোতের মতো ইয়াবা ঢুকছে বাংলাদেশে। যেখানে ২০১০ সালে ৮১ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট আটক হয়েছিল, সেখানে ২০১৬ সালে আটকের সংখ্যা দাঁড়ায় তিন কোটি। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইউনাইটেড সান স্টেট আর্মিসহ কিছু অপরাধী গোষ্ঠী ইয়াবা বিস্তারের প্রধান রুট করেছে বাংলাদেশকে।

তিন কোটি ইয়াবা আটক হলে কতো কোটি ইয়াবা বাংলাদেশে বিক্রি করছে মিয়ানমার সে হিসাবের দায়িত্বটা না হয়  পাঠক আপনাদেরকেই দিলাম। সরকারি হিসাব ধরেই আমি একটা হিসাব দিতে চাই আপনাদের। দিনে ২০ লাখ ইয়াবা সেবন করলে এ হিসাবে মাসে ৬ কোটি আর বছরে ৭২ কোটি ইয়াবা বড়ি সেবন করছে এদেশের মানুষ। প্রশ্ন এখন এর দাম কত? শুনেছি ৩ শ’ থেকে ৯ শ’ টাকায় নাকি এক একটি ইয়াবা বিক্রি হয়। ৯শ’ নয় সর্বনিম্ন ৩ শ’ টাকা দামই যদি ধরি তবে বছরে বিক্রিত ইয়াবার দাম আসে ২১ হাজার ৬ শ কাটি টাকা।

 আর মাসে মিয়ানমার থেকে কিনছি ১ হাজার ৮ শ’ কোটি টাকার ইয়াবা। একদিন মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা বিকি হচ্ছে ৬০ কোটি টাকার ইয়াবা। এটাতো সরকারি হিসাব  আর বেসরকারি হিসাবে এর পরিমাণ অনেক বেশি। প্রতিদিন দেশে মিয়ানমারের অস্বাস্থ্যকর আচার, অটেকসই ছাতা, সেন্ডেল, জুতাসহ বিভিন্ন নিম্নমানের পণ্য বিকি হচ্ছে লাখ লাখ টাকার। এর বেশি বিক্রি হয় পাবত্য জেলাগুলোতে। আমারা কেন মুসলিম হন্তারকদের পণ্য ব্যবহার করছি? যারা এসব পণ্য এখনও ব্যবহার করছেন তারা সেসব পণ্যে যে মুসলিম ভাই, বোন আর নিস্পাপ শিশুদের রক্ত মাখা আছে তা ক্রয়ের আগে কি লক্ষ করে দেখেছেন? মিয়ানমার ইয়াবাসহ বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে বিক্রি করে আমাদের কাছ থেকেই পাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কেন এখনও তাদের পণ্য কিনছি আমরা? মায়া মমতা বলে কি কিছু নেই আমাদের। মিয়ানমার যেভাবে মানুষ মারছে তার নজির কি বিশ্বের কোথাও আছে? এত নিষ্ঠুরতা কি সওয়া যায়। তাদের তৈরি ইয়াবাসহ সকল পণ্য এখনও কেন আমরা বর্জ্যন করছি না।


যারা ইয়াবা সেবন করেন তারা একটু লক্ষ্য করুন। আপনার অর্থইতো প্রতিদিন যাচ্ছে ঘুরে বার্মার পকেটে। আপনারা যদি জন্তু, জানোয়ার না হয়ে যদি মানুষ হন এমন লাশ দেখে আপনাদের হৃদয় ঠিকই নাড়া দেবার কথা। আপনারাই বলুন মিয়ানমারের মুসলমান এই শিশুদের কি অপরাধ? কেন মা-বাবা, পরিবারসহ তাদের এভাবে হত্যা করা হচ্ছে? আপনারাতো ভালই জানেন, আপনারা যে ইয়াবা সেবন করছেন তা মিয়ানমারের তৈরি। খুনি মিয়ানমারের রক্তচোষাদের পকেটেই প্রতিদিন আপনার অর্থ যাচ্ছে। আপনি মুসলমান, বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিষ্টান যে ধর্মের হউন না কেন আপনি কিন্তু মানুষ; অবশ্যই পশু নন। মনে রাখবেন আপনি বাঙালি; বাংলাদেশের গর্বিত মানুষ। আপনি নিশ্চয় নিষ্ঠুর মানুষ নন। আপনিই মিয়ানমারের জুলুম অত্যাচারে বেশি প্রতিবাদ করতে পারেন। বার্মার পণ্য বর্জনের যে টাকা এসেছে তাতে ইয়াবাই সবচেয়ে বেশি বিক্রিত পণ্য, যা আপনারা প্রতিদিন সেবন করে কোটি কোটি টাকা গুনে বার্মাকে দিচ্ছেন।

 বাংলাদেশের সকল ইয়াবা সেবনকারীরা ইয়াবা বর্জন করলে বার্মা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত হবে। মিয়ানমারের বছরে কেবল বাংলাদেশে বিক্রিত ইয়াবার দাম আসে ২১ হাজার ৬ শ কোটি টাকা টাকা। এক দিনেই মিয়ানমার বিক্রি করছে ৬০ কোটি টাকার ইয়াবা। ওরা এভাবে মুসলমানদের হত্যা করবে, আর আপনি তাদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করবেন এটা কি হয়? মুসলমানদের এ হত্যাকান্ডে কিন্তু আপনিও সামিল হচ্ছেন। আপনি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী হলে তা কিন্তু আপনি করতে পারেন না।

প্লিজ, প্লিজ যারা ইয়াবা সেবন করেন তারা একবার ভেবে দেখুন। আপনারও কিন্তু মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান আছে। একবার ভাবুন তাদের এভাবে কুপিয়ে, পুড়ে, পিটিয়ে হত্যা করলে আপনার কেমন লাগার কথা। আপনার ঘরটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে আপনাকে যদি দেশ থেকে বের করে দেয়া হতো আপনার কেমন লাগার কথা। তাই প্লিজ, প্লিজ আপনার ইয়াবা বর্জন করে বার্মাকে না বলুন। আপনি নেশাগ্রস্ত হলেও আপনার নায়ের মূল্য কিন্তু অনেক। কারণ আপনার অর্থেই মিয়ানমারে শক্তি যোগাচ্ছে। আপনার প্রিয় দেশকে তারা অশান্ত করছে, অসহায় করছে তাদের কেন আপনি সাহায্য করবেন?

জানেন কি, ২০১২ সালে চীন-থাইল্যান্ডের ‘মেকং সেফ’ চুক্তির পর থাইল্যান্ডে ইয়াবা পাচার কঠিন হয়ে গেলে এই অপরাধীরা বাংলাদেশকে টার্গেট করে এবং এখনো তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে এ কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণ ইয়াবায় আসক্ত হয়ে নিজেদের নিঃশেষ করে দিচ্ছে। কম্বোডিয়ার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক নাথান এ থম্পসন মিয়ানমার ও বাংলাদেশে সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করেন। জাপানের নিকেই এশিয়ান রিভিউ সাময়িকীতে ‘বাংলাদেশে ইয়াবা সমস্যা’ শীর্ষক ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কোথা থেকে ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকছে, কারা এর মরণ ছোবলের সবচেয়ে বড় শিকার ইত্যাদি বিষয় সবিস্তারে তুলে ধরা হয়।  

বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ এই মরণ নেশা করছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সেও এক প্রতিবেদনের বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ২০ লাখ ইয়াবা সেবন করা হয়ে থাকে। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের সমন্বয়ে তৈরি ইয়াবা ট্যাবলেটটির সেবন বাংলাদেশে শুরু হয় ২০০৬ সালের দিকে। এর আগে একশ্রেণির তরুণ গাঁজা বা হেরোইনের নেশায় বুঁদ থাকত। তাদের কাছে এখন ইয়াবাই বেশি প্রিয়। হেরোইন আর গাঁজা সেবন কমে বেড়েছে ইয়াবা সেবন।

ইয়াবা এসব নেশার চেয়েও ভয়ংকর নেশা। দেখা গেছে প্রথমদিকে অভিজাত শ্রেণির কিশোর ও তরুণ ছেলেমেয়েদের মধ্যেই ইয়াবার নেশা চালু ছিল। বিশেষ করে ঢাকা শহরের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল-কলেজে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে। কিন্তু দ্রুত ইয়াবা স্মার্টনেস, ফ্যাশন ও আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। তরুণী মডেল, চলচ্চিত্রের নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, ড্যান্সার এবং তারকা জগতের অনেকেই ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে। ২০১২ সাল নাগাদ বাংলাদেশে মিয়ানমারে প্রস্তুত ইয়াবার বন্যা বওয়া শুরু হয়। ২০১২ সালে চীন ও থাইল্যান্ডের মধ্যে ‘মেকং সেইফ’ চুক্তির পর মিয়ানমারের মাদক উৎপাদনকারীদের জন্য পাচার কঠিন হয়ে যায়। তখন তারা বাংলাদেশকেই মাদক পাচারের প্রধান রুট করে; এখনো তা বিদ্যমান।

 বাংলাদেশকে মিয়ানমারের চোরাচালানিরা সফট তথা সহজ টার্গেট বানিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের রয়েছে ২৫০ কিলোমিটার সীমান্ত। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়ের তথ্য মতে, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে ইয়াবা সরবরাহকারী দেশ এই মিয়ানমার। বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংস করা এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার একটি ষড়যন্ত্রের অস্ত্র হচ্ছে ইয়াবা। এক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০১৬ সালে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন রেকর্ড ৭.০৫ শতাংশ বাড়ে।

চলতি বছর আরও বাড়বে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। সমস্যাটা এখানেই। মিয়ানমারের ইয়াবা বাংলাদেশে আসাটা সহজ নয় বরং তা আন্তর্জাতিক কৌশল হতে পারে। বাংলাদেশে ইয়াবা সমস্যার পেছনে ষড়যন্ত্র আছে অবশ্যই। তারা আমাদের দেশের ক্ষতি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমাদের জনসংখ্যার পাঁচ কোটি তরুণ-তরুণী। এদের স্বাস্থ্য ও কর্মশক্তিকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওরা। আর আমাদের যুব সমাজ ধ্বংসে তাদের ষড়যন্ত্রে সাহায্য করছি আমরা। মাদকের সাথে প্রশাসনের সম্পৃক্ততার কথাতো শুনি হরহামেশাই। কখনো কখনো মন্ত্রী আমলাদের সম্পৃক্ত হবার খবরও আমাদের আছে।

পাশের দেশ মিয়ানমারের গুটির চালে গোটা বাংলাদেশ তছনছ হয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা নামক এই মরণনেশার দংশনে নীল সারা দেশের লাখ লাখ তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিদিনই এ নেশার জগতে পা বাড়াচ্ছে নতুন নতুন মুখ। বাংলাদেশ লাগোয়া মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় ইয়াবা তৈরি হচ্ছে অন্তত ৪৬টি কারখানায়। মিয়ানমারের শান ও ওয়া রাজ্য থেকে মরণ নেশা ইয়াবার কাঁচামাল ইয়াংগুন হয়ে রাখাইন রাজ্যের সিটওয়ে ও মংডুতে পৌঁছে। এসব কারখানার মধ্যে ১০টি গড়ে উঠেছে মংডু এলাকায়ই। এখন নাফ নদী পার হয়ে নৌযানে ইয়াবার চালান চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদক ও অপরাধ নির্মূলবিষয়ক জাতিসংঘ কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মিয়ানমারের ইয়াবা কারখানাগুলোকে।

মাদকের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কমিটিকে (সিসিডিএসি) ইয়াবা কারখানার তালিকা দিয়ে প্রতিকার চাইছে বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। তবে কারখানা বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেয়নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে একটি তালিকায় মিয়ানমারকে ৪৫টি ইয়াবা কারখানার ব্যাপারে তথ্য দেয় বাংলাদেশ। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, এসব কারখানার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবান্তর কথাই মিয়ানমার বারবার বাংলাদেশকে জানাচ্ছে। অথচ মিয়ানমারে সোর্স দিয়ে তল্লাশি চালায় এদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এতে ৪৫টি কারখানার তথ্য প্রমাণ মেলে।

প্রতিটি কারখানা থেকে বাংলাদেশে নিজস্ব সিন্ডিকেটে ইয়াবা আসে। এসব ইয়ার অনুুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে অনেক বেশি সচেষ্ট হতে হবে। আর যারা মাদক সেবন করেন তাদেও মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে মিয়ানমার কখনই বাংলাদেশ মঙ্গল চায় না। যারা মুসলমানদের এভাবে নির্বিচারে হত্যা করে হাত রক্তাক্ত করে তাদের কেন আমরা ইয়াবা আর কমদামী পণ্য কিনে অর্থ দিয়ে সাহায্য করছি? যারা ইয়াবায় আসক্ত তাদের বলছি, আপনাদের ভাবনায় আনতে হবে, কোন খুনের সাথে আপনারা যুক্ত হতে পারে না। তাই আজই ইয়াবা সেবন ছাড়–ন। মিয়ানমারকে না বলুন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩৩৩৪৬৪৮

এই বিভাগের আরো খবর

আশুরার দর্শন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন :শুরার কথা মনে হলেই হৃদয়ে জাগ্রত হয় ঐতিহাসিক কারবালার প্রেক্ষাপট। আশুরা সম্পর্কে অনেক ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। পৃথিবী সৃষ্টি থেকে শুরু করে অসংখ্য নবী রাসুলদের ঘটনাপ্রবাহ বিদ্যমান এই আশুরার দিনে। যা অল্প পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব না। তথাপি আশুরার দর্শন এবং কারবালার সংক্ষিপ্ত চিত্র জ্ঞানী পাঠক সমাজের নিকট উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ। শুরুতেই মনে পড়ে জাতীয় কবির সেই বিখ্যাত ‘মহররম’ কবিতাটিÑ ‘নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া/আম্মা! লাল তেরী খুন কিয়া খুনিয়া/কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে/সে কাঁদনে আসু আনে সিমারের ছোরাতে’……..।

কাজী নজরুল ইসলামের মহররম কবিতাটি পাঠ করলেই কারবালার ঘটনা উপলব্ধি করা যায়। কবি পুরা কবিতার মধ্যে সুন্দরভাবে ফুটে তুলেছেন আশুরার দিনের কারবালার ঘটনা। মহররম হিজরী বছরের প্রথম মাস। এই মহররম মাসের ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র আশুরা। ইসলাম সু-প্রতিষ্ঠা ও পুনরুজ্জীবিত করার জন্য আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্যের কথা প্রমাণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা.) কে আশুরার দিন এবং রমজান মাস ব্যতীত অন্য কোন দিন রোজা রাখাকে এত অধিক সাওয়াবের বলিয়া ধারণ করতে এবং অপরাপর দিন সমূহের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিতে দেখি নাই।

(মুসলিম) উপরোক্ত হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আশুরার দিন রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলত ও সওয়াবের কাজ। এর মাধ্যমে অতীতের বৈচিত্র্যময় ঘটনা মুসলিম হৃদয়ে জাগ্রত হয়। এই আশুরার গুরুত্ব সম্পর্কে অন্যত্র হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে দেখা যায়, হুজুর (সা.) বলেন, আশুরার রোজাই এক বছরের সগিরা গুনাহর কাফফারা হয় অর্থাৎ আশুরার রোজার মাধ্যমে মুসলিম বণি আদম গত এক বছরের যাবতীয় ছগিরা গুণাহ থেকে পরিত্রাণ পায়।

 এই রোজা সম্পর্কে কিছুটা মত বিরোধ রয়েছে। যার সমাধান হচ্ছে এক সাথে দুটি রোজা রাখতে হবে। কারণ এই দিন ইয়াহুদি, নাসারা এবং কোরাইশগণও রোজা রাখত। এ জন্য মহররমের ৯ ও ১০ তারিখে দুটি রোজা রাখার নির্দেশ পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, দশম তারিখ এবং তার আগের দিন অথবা পরের দিন অর্থাৎ দুই দিন এক সঙ্গে রোজা রাখা মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে আসামা ইবনে হুমাস (রা.) বলেন, দশম তারিখ এবং তার আগের দিন অথবা পরের দিন অর্থাৎ দুই দিন এক সঙ্গে রোজা রাখা মুস্তাহাব; শুধু একদিন রোজা রাখা মাকরূহ। কারণ তা ইহুদিদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উল্লেখ্য যে, ইমাম মুহাম্মদের প্রসিদ্ধ মুয়াত্তা গ্রন্থে আছে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল।

 অতপর রমজানের রোজা তাকে রহিত করে দিয়েছে। বর্তমানে এই রোজা নফল বা মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য। উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক তাই এই মাসে ৯/১০ অথবা ১০/১১ তারিখে রোজা রাখা অত্যন্ত জরুরি। সুতরাং মুক্তি, নিস্কৃতি, সফলতা ও স্বার্থকতার যে অঙ্কুর মহররমের মাঝে লুকায়িত আছে তাকে কল্যাণমুখী গবেষণা, চিন্তা-চেতনা, জাগ্রত উদ্দীপনার মাধ্যমে উজ্জীবিত ও প্রতিষ্ঠা করার দীপ্ত অঙ্গিকার গ্রহণ করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

 সকল অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম ও নির্যাতনের প্রাচীর ভেঙ্গে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ পর্যায়ে কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনা আলোকপাত করতে চাই। ৬১ হিজরীতে মহররম মাসের ১০ তারিখে ফোরাত নদীর তীরে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল তা ছিল আশুরার দিন। ঈমান হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের বায়াত গ্রহণ না করে কুফার অভিমূখে রওনা হয়, পথিমধ্যে কারবালা নামক স্থানে ইয়াজিদ বাহিনী হোসাইনের (রা.) পরিবার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবরোধ, অসহযোগ শুরু করে। তখন হোসাইন (রা.) মাত্র ৭২ জন মুজাহিদ নিয়ে ইয়াজিদের ৩০ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।

সে সময় ইয়াজিদ বাহিনী পানি পর্যন্ত দেয়নি। তারা নিষ্পাপ শিশুদের বুক ধনুকের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে শহীদ করেছে। সর্বশেষে হুসাইন (রা.) একাই ইসলামকে টিকে রাখার জন্য হাজারও সৈন্যের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। তার সামনে সে এসেছে সেই পরাজিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইবনে সাদ বলেন, “তোমরা জান এ কার সন্তান? এ তারই সন্তান যে সমস্ত আরব নিশ্চি?হ্ন করতে পারত। এ শেরে খোদা হযরত আলী (রা.) এর সন্তান। অবশ্য হুসাইন (রা.) সর্বশেষে পাষন্ড সিমারের হাতে শাহাদৎ বরণ করেন। ইমাম হোসাইন কোন পরাশক্তির সঙ্গে আপোষ না করে সংগ্রামে উপনীত হয়েছিলেন। কেননা আল্লাহ বলেন, “মুমিনদের দুই দল দ্বন্দে¦ লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মিমাংসা করবে, অতপর তাদের একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। (হুজরাত-৯)।


আশুরার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, হোসাইন (রা.) ছিলেন একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত পবিত্র ও বিশ্বাস মুখর চরিত্র। ইতিহাসে এর কোন জুড়ি নেই। এ কারণেই কারবালার ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে চির ভাস্বর হয়ে আছে। কারণ আশুরার লক্ষ্য ছিলো ব্যক্তি, গোত্র, জাতি, দেশ-মহাদেশের অনেক উর্দ্ধে। মূলত: সাইয়্যেদেনা হোসাইন ইবনে আলী ইবনে আবু তালিব, ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম করেছিলেন তা ছিল অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের। তা ছিল ন্যায় প্রতিষ্ঠায় পাপাচারের বিরুদ্ধে পূণ্যের, ফেতনা ফাসাদের বিরুদ্ধে কল্যাণের, অহংকার ও ওই দুত্যের বিরুদ্ধে বিনয় ও নম্রতার, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে স্থিতিশিল মানবতার ও আদর্শ সমাজ তথা ইসলামকে বিশ্বের বুকে পুনরুজ্জীবিত করার মহা আন্দোলন।

যার কারণে আশুরার এই দিন ইমাম হোসাইন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে শাহাদৎ বরণ করে ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তিনি অমর। আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের মৃত বলো না বরং তাঁরা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা অনুধাবন করতে পারনা (সূরা বাকারা)। ইমাম হোসাইন (রা.) ইসলাম এবং তার নানাজান মহানবী (সা.) আদর্শ ও সুন্নাতকে জিন্দা করতে গিয়ে আত্মত্যাগের ঝুঁকি গ্রহণ করে যুগ যুগ ধরে অমর হয়ে রয়েছে মুসলিম হৃদয়ে।

আমরা এ তথ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি যে, কোন অবস্থায় বাতিলের সাথে আপোষ নেই। মুমিন ব্যক্তি রক্ত দিতে রাজি, জীবন দিতে রাজি কিন্তু মান সম্মান ও বাতিলের কাছে মাথা নত করতে রাজি নয়। তাই আল্লাহ প্রদত্ত ঈমানী শক্তি নিয়ে বিশ্বের সকল মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সকল পরাশক্তির বিরুদ্ধে বিপ্লব গড়ে তোলা একান্ত কর্তব্য। কারবালা ইসলামের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবির অংশবিশেষ, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সহানুভূতি, বিশ্বস্ততা, ঈমানী সাহস ও বীরত্বের অতুলনীয় বাস্তব নাট্যমঞ্চ।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট ভাষায় বলা যায়, হোসাইন (রা.) এর আশুরার আন্দোলন মুসলিম বিশ্বের আমূল পরিবর্তন ও সুদূর প্রসারী সাড়া জাগিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আশুরার ঘটনা মুসলিম বিশ্বকে মুক্তির সোপান হিসাবে পথ দেখিয়েছে। সুষ্পষ্টভাবে ইসলামী ঐশি দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করার মহাবিপ্লবই হচ্ছে আশুরা। পরিশেষে বলা যায়, ঈমাম হোসাইন (রা.) আশুরার দিনে স্বীয় প্রাণকে কোরবানি করে ইসলামের প্রাণকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং বুকের রক্ত দিয়ে ইসলামের চারাগাছকে পুষ্ট ও সজীব করে তুলেছেন ইহাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই কবির ভাষায় বলতে হয় ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হায় কারবালাকে বাদ।’
লেখক : প্রভাষক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১২-৭৭৭০৫৮

এই বিভাগের আরো খবর

দুর্গাপূজার তাৎপর্য ও বাঙালির সার্বজনীন উৎসব

রণজিৎ সরকার  :দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে সর্ববৃহৎ পূজা। এটি সার্বজনীন দুর্গোৎসবও। দেবীপক্ষের অমাবস্যায় মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হয় দুর্গোৎসব। দুর্গাপূজার প্রধান আবেদন হলো ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ অর্থাৎ সকল অশুভ শক্তির নির্মূল করার জন্যই পৃথিবীতে প্রতিবছর দুই বার দেবী দুর্গার আগমন ঘটে। একবার বসন্তকালে, আরেকবার শরৎকালে। বসন্তকালের দুর্গাপূজাকে সংক্ষেপে বাসন্তী পূজা বলা হয়। আর শরৎকালের দুর্গাপূজাকে বলা হয় শারদীয় দুর্গাপূজা। সত্যযুগে সুরথ রাজা জীব ও রাজ্য উদ্ধারের জন্য বসন্তকালে বাসন্তী পূজা করেন। আর ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র রাবণকে বধ করার জন্য শরৎকালে দুর্গাপূজার অকাল বোধন করে শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন। শরৎ-আশ্বিনের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে শারদীয়া দুর্গাপূজা বোধন ও অধিবাস হয়।

 হিন্দু পুরাণ থেকে জানা জানা যায়- ত্রেতায় রামায়ণ যুগ হতে শরৎকালীন শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন হয়। দৈত্যরাজ রাবন যখন রামের স্ত্রী সীতাকে হরণ করে লংকায় নিয়ে যান, তখন রাজা রাম স্ত্রী সীতাকে দৈত্যরাজ রাবণের বন্দীশালা থেকে উদ্ধার করার মানসে ১০৮টি নীল পদ্ম ও ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে পূজা করছিলেন। রামায়ণে বর্ণিত আছে- রাজা রাম দেবী দুর্গার পূজার ১০৮টি নীল পদ্মের মধ্যে ১০৭টি যোগাড় করেছিল। নীল নয়নধারী রাম উপায়ন্তর না দেখে নিজের একখানি চোখ দান করতে উদ্যত হয়েছিলেন। শ্রীরামের ভক্তিতে দেবী দুর্গা তুষ্ঠ হয়ে স্বয়ং শ্রীরামকে চোখ দান করা থেকে নিবৃত্ত করেন। শ্রীরাম বসন্ত কালের পরিবর্তে শরৎকালে দুর্গাপূজা করেছিলেন বলেই এ পূজাকে অকাল বোধন বলা হয়।
 
বাংলায় শারদীয় দুর্গোৎসব শুরুর কথা ইতিহাসবিদের মাধ্যমে জানা যায়, ১৫০০ শতকের শেষের দিকে মহাধুমধামের সঙ্গে শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হয়েছিল। দিনাজপুর এবং মালদার জমিদার বাংলায় সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। তথ্যসূত্রে আরও জানা যায়, ১৬০৬ সালে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ অথবা নদীয়া জেলার ভবানন্দ মজুমদার মহাশয় শরৎকালে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। অতীতে রাজা-জমিদাররাই এ পূজা করে থাকতেন। দুর্গাপূজা পরবর্তী পর্যায়ে সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সার্বজনীন পূজা হিসেবে প্রচলিত হয়। আধুনিককালে বাঙালি হিন্দুদের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা। এই পূজা এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সকলের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত এবং জনপ্রিয়।

 দুর্গাপূজার তাৎপর্য আমরা ধর্মগ্রন্থ পুরাণে দেখি, শক্তির দ্বারা অসুরকে অন্যায়কে অত্যাচারকে অশুভকে পরাভূত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যুগে যুগে। শক্তির দেবীর হাতে ভয়ঙ্কর অসুরদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শান্তি ও কল্যাণ- পুরাণে বিভিন্ন উপাখ্যানে আমরা একথার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই। সমাজে অন্যায়, অবিচার, অশুভ ও অসুর শক্তি দমনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ পূজা হয়ে থাকে। দুর্গাপূজা কিংবা অন্যান্য পার্বণ বাংলার শাশ্বত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর থেকে উৎসারিত। তাই ধর্মের গন্ডিতে কখনও আবদ্ধ থাকেনি উৎসব। ধর্ম সম্প্রদায়ের, কিন্তু উৎসব সার্বজনীন হাজার বছর ধরে। সব ধর্মের মূলবাণী মানবকল্যাণ। দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় কৃত্য নয়, তা সার্বজনীন উৎসব।

ছোটবেলার দুর্গোৎসরের কথা খুব মনে পড়ে আমার। পূজা শুরু হওয়ার এক মাস আগ থেকেই চলত আমাদের দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। মুগ্ধ হয়ে প্রতিমা তৈরি করা দেখা। দর্জিবাড়ি গিয়ে শার্ট-প্যান্ট বানাতে দেওয়া। বিল থেকে শাপলা তোলা ও তার ঢ্যাপ নিয়ে আসা। ঢ্যাপের খই দিয়ে তৈরি মোয়া তৈরি করা। গাছ থেকে নারিকেল পারা। দুর্গাদেবীকে যে দিন আসনে বসানো হতো সেদিন বাড়ির প্রায় সবাই মিলে নারিকেলের নাড়–, মুড়ির মোয়া, তিলের নাড়–, চিড়ার মোয়া, দুধের নাড়–সহ কত কিছু তৈরি করতে বসে যেতাম।

এসব তৈরিতে আমাদের মাঝে এক ধরনের প্রতিযোগিতা হত। এ প্রতিযোগিতা হতো আনন্দের। দুর্গাপূজা শুরুর দিন ভোরে মা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে চোখে কাজল পরিয়ে দিতেন। নতুন কাপড় পরে ঠাকুরমা, মা, কাকীমা ও পিসিদের সঙ্গে দলবেঁধে গ্রামে গ্রামে ঘোরাঘুরি করে পূজা দেখতাম। সন্ধ্যায় মন্দিরের সামনে আরতির মজা করা। রাতে দেখা হতো যাত্রা। শৈশবের পূজার মজাই আসলে অন্যরকম, আজ সত্যি শৈশবের পূজার দিনগুলোর কথা মনে হলে আমার ফিরে পেতে ইচ্ছা করে সে সব পূজার দিনগুলি।

২৬ সেপ্টেম্বর মহা ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব শুরু হয়েছে, মহাসমাপ্তি ঘটবে ৩০ সেপ্টেম্বর শুভ বিজয়া দশমীতে। প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, এবার ৩০ হাজারেরও বেশি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত  হবে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক আনন্দ সংবাদ। তাই প্রকৃতিও বর্ণিল সাজে সেজেছে। দিকে দিকে পূজার সুর বাজছে। পূজার আয়োজনে যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অগ্রণী, কিন্তু উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে বাংলাদেশের সকল ধমের্র মানুষ।

শারদীয় দুর্গোৎসবে এখন দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে চলেছে। সকল ধর্ম, সকল শ্রেণির মানুষের মিলিত আনন্দে সার্থকতা পেয়েছে। দুর্গাপূজার ধর্মীয় দিক অবশ্য একটা আছে। মহালয়ার পূণ্যপ্রভাতে শুরু হয়। তারপর ষষ্ঠী থেকে সপ্তমী অষ্টমী নবমী হয়ে দশমী অর্থাৎ বিসর্জন পর্যন্ত ধর্মীয় পুরোহিতের নেতৃত্বে চলে নানাবিধ ক্রিয়া। মন্ত্রপাঠ, স্তোত্রপাঠ, নৈবেদ্য, ভোগ, যজ্ঞ, প্রসাদ বিতরণ, সন্ধ্যারতি, উপোস পালন, বস্ত্রদান, বোধন ইত্যাদি অসংখ্য বিষয় থাকে ধর্মীয় ক্রিয়ায়। ঢাকের বোলে দেহমন নেচে উঠে। ঢাক-ঢোল, কাঁসার ঘণ্টা, শাঁখের ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে সারাদেশের পূজামন্ডপগুলো। প্রতিমা দর্শনার্থীদের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ায় একটা মজা আছে না! কিন্তু এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের মজার আনন্দকে বহুলাংশে ম্লান করে দিয়েছে।

প্রথমত, কারণ মিয়ানমার তাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আরাকান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার যে খেলায় মেতে উঠেছে। আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে এক বিশাল বোঝা। রোহিঙ্গাদের বহন করার দায় আমাদের না হলেও মানবিক দিক বিবেচনা করে আশ্রয় দিতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। দ্বিতীয়ত, শারদীয় দুর্গোৎসবে নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাত আটটার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করতে হবে এবং মন্ডপ প্রাঙ্গণে মেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিরাপত্তা এখন একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। রাত আটটার মধ্যে বিসর্জন সম্পন্ন করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা হয়তো বাস্তবায়নযোগ্য। কিন্তু মেলা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কতটা যৌক্তিক। সার্বজনীন উৎসব থেকে মেলা বাদ গেলে পূজা তার জৌলুশ ও ঐতিহ্য হারাবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পারস্পরিক ধর্মীয় সহাবস্থান ও সম্প্রীতির ওপর সর্বদাই সবিশেষ জোর ও গুরুত্বারোপ করেছে।

 প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং একাধিকবার বলেছেন, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। দুর্গাপূজাও দিনে দিনে উৎসবমুখর ও সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। ধর্ম-বর্ণ-মত ছোট-বড়-ধনী-গরিব নির্বিশেষে দেশ ও সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে সার্বজনীন দুর্গোৎসবে। বিশ্বের কোনো দেশেই এখন কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উৎসব নিরাপত্তা ঝুঁকির বাইরে নয়। তাই শারদীয় উৎসব স্থলে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। নতুন নতুন কৌশল নেওয়া এবং গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। যাতে কোন রকমের বিশৃংখলা না ঘটে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

আশা করি আইন শৃংখলা বাহিনীর তৎপরতায় পূজাতে কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না। দুর্গোৎসব হচ্ছে সব মানুষকে সত্যের অনুসারী হওয়ার পথে অনুপ্রাণিত করা এবং পৃথিবী থেকে দুর্বৃত্তায়নকে দূর করে সত্য ও ন্যায়ের পথকে প্রতিষ্ঠা করা। পশুত্ব মনোবৃত্তিকে নির্মূল করতেই এই ধরণীতে মায়ের আবির্ভাব। বাঙালির অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘেœ হোক। শান্তি ও কল্যাণের পাশাপাশি এবার মানবিকতায় জ্বলে উঠুক শারদীয়া। দুর্গাদেবী কেবল সৌন্দর্য-মমতা-সৃজনের আধার হিসেবে বিবেচিত নন, অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয় হিসেবেও পূজনীয়। দুর্গাদেবী আমাদের জন্য বহন করে আনেন মঙ্গলবার্তা। সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।
লেখক ঃ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
[email protected]
০১৭৩৫-৫১৯৫১২

 

এই বিভাগের আরো খবর

বাংলাদেশের অহংকার দেশরতœ শেখ হাসিনা

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি:ভিনদেশী রোহিঙ্গা নারী যখন তার নাড়িছেড়া ধন, আদরের নবজাতকের নাম রাখেন শেখ হাসিনা; সর্বস্ব হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এমন মানুষেরা শেখ হাসিনার মানবিকতায় কতটা বিমুগ্ধ আর অভিভূত এ উপলব্ধির জন্য চোখ বন্ধ করতে হয়না। শুধু বাঙালি নয়; বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের মনের গহীন কোণে আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আসন গেড়েছেন, তার আকাশসম বিশাল মানবিকতা, হƒদয় উজাড় করা ভালবাসা আর মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মাধ্যমে। মানবতার জননী এ মহানুভব নেত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জš§দিন আজ; ২৮ সেপ্টেম্বর।

পিতা শেখ মুজিব যখন কলকাতায় ভারত ভাগের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং লেখাপড়া নিয়ে মহাব্যস্ত, ১৯৪৭ সালের এদিন টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তাঁর জš§ হয়। গ্রামের নদী-নালা-খাল-বিলের স্রোতের শব্দ এবং সবুজ প্রকৃতির গন্ধ মেখে তার শৈশব কাটে। সেখানেই শিক্ষা জীবন শুরু হয়। মা ফজিলাতুন্নেছা রেণুর ছায়াসঙ্গী হয়ে পিতার রাজনৈতিক জীবনকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখেন এবং নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে একজন আদর্শময়ী হিসেবে গড়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই আদরের নয়নমণি ছোট্ট ‘হাচুমণি’ মানবিকতা আর ন্যায়বোধ দিয়ে বাংলাদেশের প্রিয় নেত্রী হয়ে বিশ্বনেত্রীর মর্যাদায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ইডেন কলেজের ভিপি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ঘোষণার পর; এর স্বপক্ষে এটি ছিল প্রথম ম্যান্ডেট। সেদিন শেখ হাসিনা পরাজিত হলে ইতিহাস অন্যভাবেও লিপিবদ্ধ হতে পারত। বাবার আন্দোলন- সংগ্রামে মা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এর সঙ্গে আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাও ছিলেন ছায়াসঙ্গীর মতো। একাত্তরে বন্দীদশায় জš§ নেয়া সন্তান কম্পিউটার বিজ্ঞানী সজীব ওয়াজেদ জয় আজ আধুনিক বাংলাদেশ গড়ায় কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিশ্বময় আলোকিত। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অটিজম বিশেষজ্ঞ।

‘৭৫ থেকে ‘৮১ স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে পুরো পরিবারকে হারিয়ে প্রবাসে কষ্টের জীবন কাটাতে হয় ছয় বছর। অভিবাসী হন পরিবারের বেঁচে থাকা দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। স্বাধীনতার স্থপতিকে হারানো ভাগ্যহারা বাঙালির স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়, ১৭ মে ১৯৮১ সাল। সুদীর্ঘ ছয় বছর প্রবাস আশ্রিত জীবন শেষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বাংলার মাটিতে পা রাখেন জাতির জনক কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা। ক্যু-হত্যা-গুম-খুনের বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রধানমন্ত্রীর মানবিকতার সংগ্রাম। ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে জনগণের মানবাধিকার নিশ্চিত করেন তিনি।

 নিকট অতীতে তার হাত দিয়ে সম্পন্ন হয় বেশিরভাগ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিচার, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্পাদন, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি, বিনামূল্যে কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বই বিতরণ, উপবৃত্তির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভাবনীয় সফলতা। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের কান্ডারী দেশরতœ শেখ হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের মানবিক রূপ। এ সময়ে বার বার দেশরতœ শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াতের প্রত্যক্ষ মদদে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করা হয়। এত কিছুর পরও দেশরতœ শেখ হাসিনাকে মানবতার সংগ্রাম থেকে ফেরানো যায়নি।

দেশরতœ শেখ হাসিনা শুধু জাতীয় নেতাই নন, তিনি আজ তৃতীয় বিশ্বের একজন বিচক্ষণ বিশ্বনেতা হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, উদার, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও বিজ্ঞানমনস্ক জীবনদৃষ্টি তাকে করে তুলেছে এক আধুনিক, অগ্রসর রাষ্ট্রনায়ক। একবিংশ শতাব্দীর অভিযাত্রায় দিন বদল ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার কান্ডারী তিনি। সারা বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের ভরসাস্থল। বিশ্ব মানবতা যখন মুখ থুবড়ে পড়ছে, মানবতার ঝান্ডা হাতে দেশরতœ শেখ হাসিনা তখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। দেশরতœ শেখ হাসিনার ঘোর শত্রুরাও আজ তার মানবিকতার প্রশংসা করছেন।


সর্বশেষ, বিশ্বে সব গণমাধ্যম দেশরতœ শেখ হাসিনাকে বলেছে, ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’। ২০১৬ সালে শান্তিতে নোবেল জয়ী কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্ব মানবতার বিবেক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আরেক নোবেল জয়ী কৈলাস সত্যার্থী দেশরতœ শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্ব মানবতার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে তুলনা করেছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, দেশরতœ শেখ হাসিনাকে একজন ‘বিরল মানবতাবাদী নেতা’

হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এক বক্তৃতায় দেশরতœ শেখ হাসিনার প্রশংসা করে বলেছেন, ‘বাবার মতোই বিশাল হƒদয় তাঁর। সেখানে ভালোবাসার অভাব নেই।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিলেন বাঙালির হƒদয় কত বড়। তিনি বাঙালির গর্ব।’ গার্ডিয়ান পত্রিকায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে বিশাল মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন, তা বিরল। তিনি যে একজন হƒদয়বান রাষ্ট্রনায়ক- তা তিনি আগেও প্রমাণ করেছেন, এবারও প্রমাণ করলেন।’ ইন্ডিয়া টুডে তাদের দীর্ঘ এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘শেখ হাসিনার হƒদয় বঙ্গোপসাগরের চাইতেও বিশাল। যেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে কার্পণ্য নেই।’

আসলে দেশরতœ শেখ হাসিনার হƒদয়ের গভীরতার সঙ্গে বঙ্গোপসাগর বা আটলান্টিকের গভীরতার তুলনা প্রতীকী। হƒদয়ের গভীরতা উপলব্ধি করতে হয় হƒদয় দিয়ে; এর পরিমাপ হয়না। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভূ-রাজনীতি, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে যিনি আশ্রয় দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, খাবার দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছেন, সেই দেশরতœ শেখ হাসিনার হƒদয়ের গভীরতা উপলব্ধি করে বিদগ্ধজন প্রতীকী তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। আসলে দেশরতœ শেখ হাসিনার তুলনা তিনি নিজেই। একসঙ্গে ১০ লাখ শরণার্থীকে এমন একটি ছোট দেশে আশ্রয় দেয়ার সাহস! সারা বিশ্ব দেখল মানবিকতা এমনও হতে পারে!

শুধু রোহিঙ্গাই নয়; মাতৃ¯েœহের এমন অনেক বিরল দৃষ্টান্ত এর আগেও স্থাপন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা। নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে নিঃস্ব-রিক্ত পিতৃমাতৃহীন রুনা আর রতœাকে নিজ কন্যার মর্যাদা দিয়ে ওদের গণভবনে এনে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিয়ে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু-তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা। পরে আরও এক নিঃস্ব মেয়ে আসমাকেও কন্যা¯েœহে একই অনুষ্ঠানে বিয়ে দিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সব স্বপ্ন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া এই তিন মেয়ের বিয়ের জন্য শাড়ি, গহনা এবং জামাইদের পোশাক-আশাক আর সংসার সাজানোর আসবাবসহ সবকিছুরই ব্যবস্থা করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত আগ্রহে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাতৃ¯েœহের দীপ্তির মাঝে ওরা ফিরে পায় নিজের পিতা-মাতাকে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব শেখ হাসিনাসহ বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারটিই একটি মানবিক পরিবার। যারা সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন এ জাতিকে। মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, অসহায়ের প্রতি সংবেদনশীলতা শেখ পরিবারের ঐতিহ্য। তরুণ শেখ মুজিব নিজেদের ধানের গোলা থেকে প্রতিবেশী দরিদ্র অসহায়ের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকাবস্থায় সংগঠন চালানোর জন্য দলের কর্মীদের খরচ যোগাতে নিজের গহনা বিক্রি করে দিয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। সেই বাবা-মায়েরই কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা।

১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট যখন ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড ঘটানো হয় ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বাসভবনে, তখন দেশরতœ শেখ হাসিনা তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে স্বামী প্রখ্যাত অণুবিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ আলী মিয়ার কাছে জার্মানিতে যান। ড. ওয়াজেদ তখন জার্মানিতে গবেষণারত ছিলেন। দুই বোন এ জন্যে প্রাণে বেঁচে যান। মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে তারা দুই বোন পরিবারের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক এ বাড়িটি জনসাধারণের জন্য দান করে দেন। এই বাড়ি এখন বঙ্গবন্ধু মিউজিয়াম। একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে। এই ট্রাস্ট প্রায় দুই দশক ধরে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত গরিব-মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ক্ষমতায় এসেও তার মানবিকতার হাত আরো প্রশস্ত হয়। মাতৃত্বের মমতায় দেশরতœ শেখ হাসিনা এতিম শিশুর মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন, পরম শ্রদ্ধায় অশীতিপর বৃদ্ধাকে বুকে জড়িয়ে নিচ্ছেন- তাদের দুঃখ-দুর্দশা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন। অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় তুলে আনার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছেন, জাতীয় বাজেটে তাদের জন্যে আলাদা বরাদ্দ রাখছেন, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ঈদ-পার্বণে তাদের জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন-আশ্রয়হীনের জন্য ঘর বানিয়ে দিচ্ছেন, কাজ দিচ্ছেন।

 কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিকে দেশের দরিদ্র মানুষ হাতের নাগালে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে, বিনামূল্যে ওষুধও পাচ্ছে। প্রথমবার ক্ষমতায় এসে মূল বাজেটের বাইরে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়েছিলেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সফল কর্মকান্ডের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্থা, আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি সম্মানিত এবং প্রশংসিত হয়েছেন, যা তিনি বাংলাদেশের জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছেন। আজ এমন একজন গর্বিত মা, গণতন্ত্র ও মানবতার জননী, সফল রাষ্ট্রনায়ক, বিশ্ব মানবতার বিবেক, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার দেশরতœ শেখ হাসিনার জš§দিন। যুগে যুগে জš§ নিক তোমার জš§দিন। জয়তু শেখ হাসিনা।
লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক,
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

এই বিভাগের আরো খবর

তার রাজনীতি মাটি ও মানুষের

মাহমুদ হাসান:আমাদের জীবনে আশা আছে, হতাশাও আছে। আনন্দ-বেদনাও আছে। স্বপ্ন আছে, স্বপ্নভঙ্গও আছে। দুঃখ আছে, দুঃখের দায়ও আছে। সব মিলিয়ে বদলে যাওয়া অগ্রসরমান দেশের নাগরিক হওয়ার গর্বও আছে। এ গর্ব ও গৌরবের উৎস তিনি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দেশের চেহারাটা ও দেশের মানুষের ভাগ্যটা, স্বপ্নটা পাল্টে দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ, এ দেশের মানুষ যে তার হƒৎকমল, তার রাজনীতির প্রাণভোমরা।

দেশের মানুষের জন্যে প্রাণ দিয়ে গেছেন তার অকুতোভয় পিতা, এ দেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পিতার স্বপ্ন, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর স্বপ্ন পূরণের নিরন্তর সংগ্রামে আজ সফল এক রাজনীতিক, সফল এক রাষ্ট্রনায়ক। একজন গৃহিণী থেকে হয়েছেন জননেত্রী, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্রষ্টা, উন্নয়ন ও কল্যাণের রূপকার। তাকে কেন্দ্র করে, তার নেতৃত্বে আবর্তিত হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন। শেখ হাসিনার কল্যাণে বাংলাদেশ এখন এক সাফল্যের গল্প।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার পর দেশে দুঃসময় চলছে। গণতন্ত্র তখন দুর্দশাগ্রস্ত। চারদিকে অনাসৃষ্টি। প্রাণহীন রাজনীতি। সেই নিস্তেজ নিষ্প্রাণ রাজনীতিতে প্রাণের সঞ্চার করতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের আশার আলো হয়ে এলেন শেখ হাসিনা। ৬ বছর  নির্বাসন শেষে ১৯৮১-র ১৭ মে দেশে ফিরে তুমুল বর্ষণের ভেতর শোনালেন উদ্যম বসন্তের গান। তার আগমনে সেদিন আওয়ামী লীগের কর্মিরা পেল নতুন সকালের ইঙ্গিত।

স্বজন হারানোর শোক ও পিতার স্বপ্ন পূরণের সংকল্পশক্তির মিশেলে শুরু হয় তার নতুন পথ চলা। রাজনীতির দুর্গম-বন্ধুর এইপথ পরিক্রমায় তিনি নিজের ভেতর আবিষ্কার করেন এক দুর্লঙ্ঘনীয় নেতৃত্ব। রাজনীতির এই নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব আর প্রত্যয়ী রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতায় আজ শেখ হাসিনা স্বয়ং তার সময়ের উপমা। আর সর্বশেষ প্রতিবেশী মিয়ানমারের লাখ লাখ নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয়দানের মধ্যদিয়ে তিনি সারা বিশ্বের সামনে নতুন পরিচয়ে পরিচিত হয়েছেন, মাদার অব হিউম্যানিটি।

১৯৮১ থেকে ২০১৭, সেই সময় থেকে এই সময়, কত বাঁক, কত দীর্ঘশ্বাস। কত স্বপ্ন দেখা, স্বপ্ন ভাঙা। আবার ভাঙা স্বপ্নগুলো জোড়া লাগিয়ে পথ হাঁটা। একটা জাতির পথ যে অনেক দীর্ঘ, সে পথ কখনো শেষ হয়না। হাঁটা শেষ হয়না, সময়ের বাঁকে বাঁকে পথ বদলায়। নতুন পথের সন্ধান দেয়। সেই পথের সন্ধানী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে, তিন বার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে, তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৩৬ বছর ধরে নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আপসহীন নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল স্রোতধারার প্রধান নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।

তিন যুগ পেরিয়ে গেছে, তিনি তেমনই আছেন, দেশের মানুষের মনের গহীনে আছেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি তার হƒদয়জাত স্বপ্নের ভেতর মগ্ন করে রেখেছেন আমাদের। সে স্বপ্ন বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারভুক্ত করা, দেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। জনগণের কল্যাণ তার আরাধনা, তার সাধনা। দেশ ও দশের স্বার্থরক্ষা, মঙ্গল আকাঙ্খা তাকে সৃজনশীল রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাকে একজন যথার্থ রাষ্ট্রনায়ক করে তুলেছে। যদিও নিজের সাফল্য নিয়ে তার আত্মতুষ্টি নেই। তিনি পিতার মতো দেশের মানুষের মনে আশা জাগিয়েছেন, মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।

ন্যায়ের প্রশ্নে কখনো আপসকামী ও পলায়নপর হননি। দ্বন্দ্বমুখর রাজনীতির ঘাত-প্রতিঘাতে কখনো হননি হতাশ-হতবিহ্বল। কখনো কখনো প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি তার মনে ক্ষণিক বিষন্নতার ছায়া ফেললেও হতোদ্যম হননি তিনি । কারণ তার মনের গভীর গহীনে রয়েছে প্রবল আত্মবিশ্বাস। আর এই আত্মবিশ্বাসের জোরেই তিনি স্রোতের বাইরে হাঁটার সাহস দেখাতে পারেন। এ সাহস ক্রমেই সক্ষম ও শক্তিশালী করে তুলেছে তাকে।

রাজনীতির একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। সেই সৌন্দর্য রচনার রসদ যে রাজনীতিকের মনের গহীন ভেতরে থাকতে হয়। আর তা হচ্ছে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই ভালোবাসার সুবাদেই শেখ হাসিনা মানুষের আকাঙ্খাগুলো নিজের মধ্যে নিয়ে প্রকাশ করতে পারেন। তিনি নিজের কণ্ঠে সকলের কথা বলতে পারেন। পিতার মতো এই অসামান্য ভিন্নতা তাকে সমকালীন আর সবার থেকে আলাদা করেছে । বাংলা সাহিত্যের এই মেধাবী ছাত্রীর সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে তার বড়মাপের মানবিক গুণাবলী। শুধু বাংলাদেশ কেন, দেশের বাইরে, এ অঞ্চলে, অঞ্চল ছাড়িয়ে সমকালীন বিশ্ব পরিমন্ডলে কী দারিদ্র বিমোচন, কী গভীর গভীরতম মানবিকতায় এই মানবিক প্রাণ আজ বাঙালির গর্ব।  

শেখ হাসিনা কখনোই শাসক হতে চাননি। চেয়েছেন ভাল জনসেবক হতে এবং তিনি তা হয়েছেনও। এ পারঙ্গমতা সব নেতা-নেত্রীর হয় না। আজ তার রাজনৈতিক জীবনের যে সাফল্য এর পেছনে রয়েছে নিজের আত্মবিশ্বাস এবং অঙ্গিকার। আর লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য পথ চলার ধৈর্য। পরিশ্রম করার মতো মনোবল। তিনি রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক দুর্নীতির গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দেননি। ক্ষমতার পেছনে অন্ধের মতো ছোটেননি। বরং ক্ষমতার অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে দেখিয়েছেন বিশাল উদারতা। এক উদার রাজনীতিকের চিন্তা-চেতনা নানা ভাবে ধরা দিয়েছে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজকর্মে, পদক্ষেপ গ্রহণে। তার রাজনীতিতে ক্ষমতা নয়, সবার উপরে মানুষ। তাই তো তার রাজনীতি চেয়ে থাকে মানুষের দিকে, চেয়ে থাকে  মাটির দিকে।

আশির দশক থেকে একুশের প্রথম দশক, আমি যখন রিপোর্টার ছিলাম, খুব কাছে থেকে শেখ হাসিনাকে দেখেছি, তাকে পেয়েছি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কণ্ঠস্বরে। সে কণ্ঠস্বরে ছিল আশা ও উচ্ছ্বাস, ছিল সমকালীন অনেকের থেকে আলাদা একটা ভাবনা। এই কণ্ঠস্বরের শক্তি হচ্ছে তার সততা, তার নিষ্ঠা ও তার রাজনৈতিক দৃঢ়তা। আর পিতার কাছ থেকে পাওয়া সত্য ও ন্যায়ের জন্য আপসহীন পথ চলার শিক্ষাটা। স্বজন হারানোর বুকভরা কষ্ট পাথরচাপা দিয়ে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দুর্গম পথ।

পার হতে হয়েছে বহু চড়াই-উতরাই । পদে পদে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। একদিকে মৃত্যুঝুঁকি, অন্যদিকে ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে জনগণকে সাথে নিয়ে বন্ধুর পথ চলতে হয়েছে। তিন যুগের অধ্যবসায় ও পরিশ্রম, ত্যাগ ও ধৈর্য আজ তাকে আসীন করেছে এক অনন্য উচ্চতায়। ন্যায়ের জন্য, জনগণের কল্যাণের জন্য, মানবতার জন্য তার ডাক, তার উদ্যোগ, তার পদক্ষেপ তাকে দিয়েছে এক ভিন্ন মর্যাদা। বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা আজ সারাবিশ্বের কাছে অভিষিক্ত হয়েছেন নিপীড়িত মানুষের আপনজন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক  
০১৭১১৬৪১১৬৪

এই বিভাগের আরো খবর

শেখ হাসিনা প্রশংসিত-সুচি সমালোচিত

মাশরাফী হিরো :কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন জীবন সহজও নয়, জটিলও নয়। জীবন জীবনের মতো। আমরাই একে সহজ এবং জটিল করে ফেলি। রাজনীতির ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আমরাই একে সহজ এবং জটিল করে ফেলি। অনেক দিন আগে ফেসবুকে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন দুয়ে দুয়ে চার হলেও রাজনীতির ক্ষেত্রে তা পাঁচ হয়। মন্তব্যটি করেছিলেন রাজনীতির সমীকরণ না মেলার কারণে। কিন্তু উনি ভুলে গেছেন দুয়ে দুয়ে পাঁচ আমরাই করেছি।

সত্যিকার অর্থেই তা চার হওয়ার কথা ছিল। এজন্য দায়ি আমরাই, রাজনীতি নয়। যেমন রোহিঙ্গা ইস্যু কারো কাছে সহজ আবার কারো কাছে জটিল। মায়ানমার সরকার জাতি উচ্ছেদ করতে গণহত্যায় মেতে উঠেছে। এর কারণ দীর্ঘদিন যাবৎ হলেও সাম্প্রতিককালে তা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। মানুষ কিভাবে সত্যকে নির্দ্বিধায় উপেক্ষা করতে পারে তার নির্লজ্জ উদাহরণ অং সান সূচি। যিনি একসময় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

 তাকে অনেকে রাজনীতিতে একসময় আইডল মনে করতেন। সেই আইডল আজ ঘৃণায় পরিণত হয়েছে। নোবেল পুরস্কার নিয়ে অতীতে যে বিতর্ক উঠেছিল তা সম্ভবত আরো একধাপ এগিয়ে গেল। অনেকে বলেন তার কোন কিছু করার নাই। তিনি পুতুল মাত্র। যাদের বিরুদ্ধে তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন এখন তিনি তাদেরই মুখপাত্র। মালয়েশিয়ার গণ আদালত ইতিমধ্যেই অং সান সূচি ও মায়ানমার সেনা প্রধানকে গণহত্যায় অভিযুক্ত করেছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অনেক দিন ধরেই সূচি সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ করে আসছে। জার্মান ভিত্তিক এই সংস্থাটি রোহিঙ্গা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘও পিছিয়ে নেই। জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেজ বার বার রোহিঙ্গা হত্যা বন্ধ করতে বলেছেন। কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে বার বার চাপ দিয়েছে মিয়ানমার সরকারকে। কিন্তু কোন কিছুতেই কর্ণপাত করছে না মিয়ানমার সরকার। সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এ সরকার বিশ্ব সম্প্রদায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে। অথচ বিশ্ব বিবেক আজ নির্লিপ্ত। কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না তারা।

 বিবৃতি দিয়েই খালাস। বিপদে আছে বাংলাদেশ। না পারছে সহ্য করতে না পারছে ব্যবস্থা নিতে। শুরুতে বাংলাদেশ তাদেরকে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মানবিকতার কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে দিয়েছে। শরণার্থী শিবির তৈরি করে দিয়েছে। জাতিসংঘ আর্থিক সহযোগিতা করছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে। সরকারি এবং বেসরকারি হিসাবের মধ্যে খুব বেশি ফারাক নাই। তাদের মতে ৪ লাখ ২৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। যা ১৬ কোটির দেশ বাংলাদেশে রীতিমত ভয়াবহ।

এত স্বল্প জায়গায় এত মানুষের বসবাস পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। যা নিয়ে সবাই চিন্তিত। তারপরও শেখ হাসিনার সরকার তাদের পাশে রয়েছে। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি কথা। আমরাও ১৯৭১ সালে শরণার্থী ছিলাম। সুতরাং শরণার্থী হওয়ার জ্বালা আমরা বুঝি। শুধু এখানেই থামেননি তিনি। ছুটে গেছেন শরণার্থী শিবিরে। শুধুমাত্র মানবিকতার কারণে। যেখানে কোন রাজনীতি নেই। রাজনীতি সহজ না জটিল সে আলোচনা নেই।

 বাংলাদেশের মত ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্র যেখানে রাজনীতির চিন্তা করে না। সেখানে উন্নত বিশ্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণের বাইরে আসতে পারছে না। জাতিসংঘে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সবাইকে সাহস জুগিয়েছে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য। গত কয়েকদিন আগে টেলিভিশনে একটি সাক্ষাৎকার দেখছিলাম, সেখানে এক রোহিঙ্গা বলছে আমরা এখন কিছুটা খুশি। কারণ আমাদেরকে তো আর হত্যা করতে পারছে না মিয়ানমার সরকার। তারা শরণার্থী শিবিরের কষ্টও মেনে নিতে রাজি। হাজারও মানুষের কান্না, শিশুদের মর্মন্তুদ চিৎকার, বৃদ্ধদের আহাজারি আর কাউকে স্পর্শ না করলেও ভরাক্রান্ত করেছে শেখ হাসিনাকে।

তিনি শুধু রোহিঙ্গাদের পাশেই দাঁড়াননি, প্রতিবাদ করেছেন সর্বত্র। ফিলিস্তিনে নির্যাতন বন্ধেও কথা বলেছেন জাতিসংঘে। মানবতার প্রশ্নে আপোষ করেননি শেখ হাসিনা। যেখানে অং সান সূচি সমালোচিত, শেখ হাসিনা সেখানে প্রশংসিত। রাজনীতির মূল উপাদানই হলো মানুষ। আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নামই হলো রাজনীতি। এক্ষেত্রে কেউ রাজনীতিকে সহজ করেছেন আবার কেউ জটিল করে ফেলেছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কি ঘটবে তা জানি না। তবে শেখ হাসিনা প্রশংসিত হবেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আজ শেখ হাসিনার ৭১তম জন্মদিনে রইল রোহিঙ্গাদের অশ্রুসিক্ত নিখাদ ভালোবাসা। যা সত্যিই তাঁর প্রাপ্য।

লেখক ঃ উপ-দপ্তর সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ
০১৭১১-৯৪৪৮০৫

এই বিভাগের আরো খবর

আকাশ ছুঁতে না পারা শহীদ মেজর নাজমুল হক এবং বগুড়া

আকবর আহমদ :আজ ২৭শে সেপ্টেম্বর। ১৯৭১ সালে এ দিনে শহীদ হন মেজর নাজমুল হক। কে এই মেজর নাজমুল হক? কেন তাঁকে আমরা স্মরণ করবো ?বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবগাঁথা যেমন “মুক্তিযুদ্ধ”, তেমনি সবচেয়ে বেদনা বিধুর ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত এই “মুক্তিযুদ্ধ”। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটি স্বাধীন ভূখ  প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও নিজেদের একটি পতাকা অর্জনে এ জাতিকে উৎসর্গ করতে হয়েছে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত ও ২ লক্ষ নারীর সম্ভ্রম। প্রতিটা শহীদ এর শহীদ হওয়ার ইতিহাস ও সম্ভ্রমহারা এক এক জন নারীর সম্ভ্রম হারানোর ইতিহাস প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র।

সে ইতিহাসের সমুদ্রে একটি বিশাল ঢেউ হলেন শহীদ মেজর নাজমুল হক।তিনি ছিলেন ৭নং সেক্টরের প্রথম কমান্ডার। ৭নং সেক্টরের আওতায় ছিল পুরো বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা জেলা এবং দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল। বগুড়া যদিও ৭নং সেক্টরের আওতায় ছিল, তদুপরি, মেজর নাজমুল হক বেঁচে থাকাকালীন সময়ে হয়তো বেশি দিন বগুড়ায় আসতে পারেননি বলে, অনেকেই তাঁকে চেনেন না। তবে ৭ নং সেক্টরের প্রথম কমান্ডার হিসাবে অবশ্যই ওনাকে আমাদের জানা উচিৎ।

১৯৩৮ সালের ১লা আগস্টে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া (তৎকালীন সাতকানিয়া) আমিরাবাদ ইউনিয়নের নাজির বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক। অ্যাডভোকেট হাফেজ আহমদ ও জয়নাব বেগমের আদরের পুত্র নাজমুল হক (টুলু)। তিনভাই ও দু’বোনের মধ্যে দ্বিতীয় টুলু। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন গ্রামের এক স্কুলে। পরে কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা থেকে মেট্রিক ও ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।

এরপর ঢাকার আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ২য় বর্ষে পড়ার মাঝেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। নিজ যোগ্যতায় ১৯৬২ সালের ১৪ই অক্টোবর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে আর্টিলারি কোরে কাকুল থেকে কমিশন প্রাপ্ত হন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৮ সালে ৭ই জুলাই নওসাবা মিলি’র সাথে চট্টগ্রাম রাইফেলস ক্লাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৭১ এর জানুয়ারি মাসে তাঁকে “উইং কমান্ডার” হিসাবে নওগাঁয় পোস্টিং দেওয়া হয়। নওগাঁ কর্মক্ষেত্রে যোগদানের জন্য তিনি নিজের মরিস মাইনর গাড়ি চালিয়ে সস্ত্রীক কন্যাদ্বয় (ইশরাতজাহান এবং নওরীনসাবা) সহ রওনা হন। ঠিক সন্ধায় বগুড়ায় তাঁর গাড়ি বিকল হয়ে যায়। স্ত্রীর নানির ছোট বোনের বাসা হল বগুড়ার ঐতিহাসিক “সাত আনি” বাড়ি। অনেক কষ্টে ছোট নানির বাসায় উঠলেন ওনারা। নানি তো মহা খুশি। মহা-সমারোহে চলতে থাকে নাত-জামাই আপ্যায়ন।

রান্না শেষে রাজকীয় রূপার রেকাবিতে মুরগির মুসাল্লাম পরিবেশন করা হলো। পরে নাতনী (নওসাবামিলি)ও নাতনী জামাই মেজর নাজমুল হককে পরানো হলো সোনার আংটি। রাতেই গাড়ি ঠিক করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরদিন সকালে ওনারা আবার রওনা হলেন নওগাঁ’র দিকে। নওগাঁ পৌঁছানোর পর, সেখানে অবাঙালি উইং কমান্ডার মেজর আকরামতো কোনভাবেই তাঁর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর রোজিনা, পরে গোলযোগপূর্র্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে মেজর আকরাম দায়িত্ব বুঝে দিতে বাধ্য হয়।

২৫শেমার্চ পাকিস্তানীদের বর্বরোচিত হামলার সময় তিনি নওগাঁস্থ ই.পি.আর. এর অধিনায়ক। ২৬শে মার্চ নওগাঁয় এই হামলার খবর পোঁছায়, তখন মেজর নাজমুল হক স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে নওগাঁ মহকুমাকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলার অংশ ঘোষণা করেন তিনি। স্থানীয় যুবকদের হাতে তিনি তুলে দেন অস্ত্র। স্বেচ্ছাসেবক যুবকদের নিয়ে গঠন করেন ই.পি.আর মুজাহিদ বাহিনী। ২৬শে মার্চ রংপুর থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বগুড়া এসে আক্রমণ করে এবং পুলিশ, সাধারণ জনগণ ও ছাত্রদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে বগুড়া দখল করতে ব্যর্থ হয়। ওরা ফিরে যায় ২৯শে মার্চ রাতে।

৩০শে মার্চ’৭১-এ মেজর নাজমুল হক নওগাঁ ইপিআর ক্যাম্প থেকে সান্তাহার হয়ে বগুড়ায় আসেন। প্রথমে তিনি হাইকমান্ডের সাথে মিটিং করেন। “মাঝারি গড়নের শ্যামলা একহারা চেহারা, সর্বাঙ্গে  দৃঢ প্রত্যয়ের ছাপ” – মেজর নাজমুল হকের চেহারার এ রকম বর্ণনাই দিয়েছেন গাজীউল হক। প্রথম দেখাতেই নিরহঙ্কার এই মানুষটিকে ভালো লেগে যায় গাজীউল সাহেবের। তারপর ক্যাম্প ইনচার্জদের সাথেও আলাপ করেন মেজর নাজমুল হক।

ওনার মূল কথাছিল – যুদ্ধের সময় চতুর্দিকের খবর না পাওয়া গেলে, একা প্রস্তুত থেকে লাভ নেই। তাই, তিনি বগুড়ায় একটা কন্ট্রোল রুম খুলতে বলেন এবং সেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও যোগ্য লোককে দায়িত্ব দিতে বলেন। আর বলেন, দায়িত্ব যাকে দেওয়া হবে, তাকে অবশ্যই বিশ্বাসী হতে হবে। কারণ, বাহির থেকে আসা খবরগুলি শুধু হাই কমান্ডকেই দিতে হবে, অন্য কাউকে নয়। তৎক্ষণাৎ টিএন্ডটিকে বলে সার্কিট হাউজে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয় এবং মেজর নাজমুল হক নিজেই সেনাবাহিনীর হাবিলদার মোসলেম উদ্দিন তোতাকে এই কন্ট্রোল রুমের দায়িত্ব দেন।

এরপর বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধারা হাই কমান্ড এর সাথে আলাপ করে এবং আড়িয়া বাজার অ্যামুনিশন পয়েন্ট আক্রমন ও দখল করতে চায়। বগুড়া থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে আড়িয়া বাজার এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৩ ব্রিগেডের ৯১ আই.এ.পি. (ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যামুনিশন পয়েন্ট) অবস্থিত। এখান থেকে বগুড়ার আশেপাশে বিভিন্ন জায়গায় অ্যামুনিশন সরবরাহ করা হতো। এই অ্যামুনিশন ডিপোটি তখন ক্যাপ্টেন নূর মোহাম্মাদ নামে এক পাঞ্জাবীর অধীনে ছিল। ২৩ ফিল্ড রেজিমেন্ট এর কিছু সৈন্য অ্যামুনিশন পয়েন্ট পাহাড়া দিতো। এই ডিপোতে বেশ কিছু পশ্চিমা মিলিটারি ও বাঙালি মিলিটারি যৌথভাবে অবস্থান করতো।

হাই কমান্ড মেজর নাজমুল হক এর সাথে যোগাযোগ করলে, মেজর নাজমুল হক এই সমস্ত গোলাবারুদ যেন কোনভাবেই শত্রুর নিয়ন্ত্রণে না যায়, তা নিশ্চিত করতে বলেন। ১লা এপ্রিল আড়িয়া বাজার অ্যামুনিশন পয়েন্ট আক্রমণ করা হয়। স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় প্রায় আড়াই ঘন্টা যুদ্ধের পর ক্যাপ্টেন নূর ৬৮জন সৈন্যসহ আত্মসমর্পণ করে এবং বগুড়ার বিশিষ্ট চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ টি. আহমেদ এর ছেলে মাসুদ আহমেদ শহীদ হন। বগুড়ার জনগণ মাসুদের মৃত্যু সহজভাবে নিতে পারেনি, তাই তারা জেল থেকে বের করে ক্যাপ্টেন নূরসহ বন্দি সৈন্যদের হত্যা করে।

মেজর নাজমুল হক অংশ নেন একের পর এক সম্মুখ যুদ্ধে। গড়ে তোলেন ইপিআর মুজাহিদ বাহিনী, পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করেন একের পর এক দুর্দান্ত অভিযান, যার বর্ণনা আমরা নিউজ উইক-এর দুঃসাহসিক সাংবাদিক মিলান জেকিউবিকের নেওয়া সাক্ষাৎকার, যা ১৯৭১ সালের ১০মে আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র নিউজ উইকের ১৭তম পাতায় প্রকাশিত, সেখানে দেখতে পাই। এই বীর সৈনিক মুক্তিযুদ্ধকে আরও সংগঠিত করার লক্ষ্যে সমগ্র বাংলাকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হলে ৭নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন।

দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এই মহান সৈনিক মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ২৭ সেপ্টেম্বর শিলিগুড়ি ৩৩ কোর সদর দপ্তরে কোর কমান্ডার লে. জেনারেল মোহন লাল থাপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা সংক্রান্ত একটি সভায় অংশগ্রহণ শেষে ফেরার পথে ২৭ সেপ্টেম্বর মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। সেই সাথে আমরা হারাই এক দেশপ্রেমী চৌকস সেনা অফিসার, যার সুদক্ষ পরিচালনায় ৭নং সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছিল এই বাংলাকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা ছোট সোনা মসজিদএর প্রাঙ্গণে মেজর নাজমুল হকের সমাধি রয়েছে।

বগুড়ার তিন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ডঃ আহসান হাবিব (ওয়ালেস), ডঃ আরশাদ সায়ীদ ও মাসুদ হোসেন আলমগীর (নোবেল) সরাসরি মেজর নাজমুল হক-এর তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গেরিলা প্রশিক্ষণ লাভ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে যখন এনাদেরকে দেশে পাঠানো হয়, তখন তাঁদেরকে প্রায়-অসম্ভব রকমের বড় বড় টার্গেট দেন মেজর নাজমুল হক। সেই টার্গেট সফল করা অসম্ভব জেনে, গ্রুপ লিডার ওয়ালেসও মজা করে অস্ত্র ও গোলা-বারুদের এমন ফিরিস্তি দিলেন যে, ওগুলো যখন নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হলো, ছোট-খাটো টিলার আকার ধারণ করলো।

এত অস্ত্র ও গোলা-বারুদগুলো ৩ জনে নেওয়া অসম্ভব বলে, ওনারা আবার মেজর নাজমুল হকএর ঘরে ঢোকেন। হঠাৎ  মেজর নাজমুল হক তাঁর স্বভাব সূলভ অট্টহাসি দিয়ে ওয়ালেসএর পিঠে জোরে থাবা সিয়ে বল্লেন “আমি বিরাট বিরাট টার্গেট দিয়েছি বলে তোমরা আমাকেও বিরাট ফিরিস্তি ধরিয়ে দিয়েছো? আরে পাগল, বিরাট টারগেট দিয়েছি একটা ফল পাবো বলে।” উনি আরো বলতে লাগলেন– “ধরো তুমি যদি গাছের উপর ঢিল ছুড়তে চাও প্রথম দিকে ঐঢিল গাছের উপর না পৌঁছালেও, প্রতিদিন চেষ্টা করলে ওই ঢিল উপরেই উঠতে থাকবে। একদিন না একদিন ঢিলটা গাছের উপর পৌছোবেই আর তুমি সেদিন কি হবে জানো? আনন্দে লাফাবে না, বরং হতাশ হবে। কারণ, তোমার আর কিছু পাবার থাকলো না বলে।

 অথচ তোমার লক্ষ্য যদি অসীম আকাশ হতো, তাহলে কোনদিনই ঐ অসীম আকাশকে তোমার ঢিল ছুতে পারতো না, হাজার বছরের চেষ্টার পরেও না। তবে আকাশ ছোয়ার  চ্যালেঞ্জটা সবসময় তোমার ভিতর কাজ করতো, হতাশ হতেনা। আর ওই চ্যালেঞ্জের ফলে একটা বড় ফল বেরিয়ে আসতো। আমিও তোমাদেরকে মনি অসীম টার্গেট দিয়েছি, যাতে বড় কিছু করে আসতে পারো।জাতিগতভাবে আমরা তাঁকে যথাযথ সম্মান দিতে পারি নাই। একমাত্র “শহীদ” সেক্টর কমান্ডার হিসাবে তাঁকে আমরা “বীর বিক্রম” বা “বীর উত্তম” উপাধি দিয়ে সম্মানিত করতে পারি। যেখানে অন্য সব সেক্টর কমান্ডারই কোন না কোন উপাধি পেয়েছেন। আকাশ ছুঁতে না পারা এ ক্ষণজন্মা বীরকে তাঁর ৪৬তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে অন্তরের অন্তঃ স্থল থেকে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ছাড়া আর কিছুই দেবার নেই।
তথ্য সুত্র ঃ    
১. বিস্মৃত কমান্ডারের উপাখ্যান – অভীক ওসমান
২. আমার অনেক ঋণ আছে – ডঃ আরশাদ সায়ীদ
৩. নওরিন সাবা (শহীদ মেজর নাজমুল হক’র কন্যা)
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭৭২-৭৮১৩০১

এই বিভাগের আরো খবর

দুর্গাপূজা শুভচেতনা জাগরণের প্রতীক

জয়ন্ত কুমার:আজ   রণ-রঙ্গিনী জগৎমাতার দেখ্ মহারণ,
দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে দশ প্রহরণ!
পদতলে লুটে মহিষাসুর,
মহামাতা ঐ সিংহ-বাহিনী জানায় আজিকে বিশ্ববাসীকেÑ
শাশ্বত নহে দানব-শক্তি, পায়ে পিষে যায় শির পশুর!
– (আগমনী) অগ্নি-বীণা ।
পূজা’- ‘পূ’- অর্থ ‘পূর্ণঃ ‘জা’ অর্থ  ‘জাগরণ’। পূজা অর্থ পূর্ণরূপে জাগরণ। এ জাগরণ সত্যিকার চেতনার জাগরণ। আমরা কামনা, বাসনা তথা আসুরিক প্রবৃত্তি সমূহের মধ্যে তন্দ্রাচ্ছন্ন আছি। বিশ্বমাতা-দুর্গা এসে আমাদেরকে জাগিয়ে দেয়। সমস্ত আসুরিক শক্তিকে বিনাশ করে শুভ চেতনা শক্তিকে জাগিয়ে তোলাই এ পূজার সার্থকতা। এছাড়া ‘দুর্গা’ শব্দের অর্থ দুর্গতিনাশিনী দেবী। যিনি বিশ্বকে সকল দুর্গতি থেকে রক্ষা করেন। মা যেমন তাঁর পুত্র বা কন্যার দুঃখ, কষ্ট, শোক, তাপ ইত্যাদি হরণ করে নেন, তেমনি দুর্গা-মাতাও এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল মনস্তাপ হরণ করে নেন। তাইতো তিনি, জগৎ-জননী।

দুর্গা-অর্থাৎ আত্মা। আত্মজ্ঞান তথা-পরমাত্ম জ্ঞান লাভ করতে হলে অনেক দুঃখ কষ্টের মাধ্যমে তা লাভ করতে হয়। দুঃখের মধ্য দিয়েই দুর্গাকে বা আত্মাকে পাইতে হয়। মা দুর্গা-দশভুজা। মানব যখন সাধনায় আত্মজ্ঞান লাভ করেন তখন তিনি দশদিকেই জয়ী হন। ‘সাপ’ দেহস্থ কুন্ডলিনী শক্তির প্রতীক।সিংহ রজোগুণের এক প্রচ- শক্তির উচ্ছ্বাসের এবং পশুত্ববিজয়ের প্রতীক । ‘সিংহ’ মানে শ্রেষ্ঠ শক্তি, ইহা আত্মার শক্তি। ইন্দ্রিয় বৃত্তিগুলির সাথে আত্মিক সংগ্রামে রত। বিবেক যেমন মানবের কু-প্রবৃত্তিসমূহের সঙ্গে দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত। সিংহ শক্তি, আত্মার শক্তি বলেই সিংহ আত্মা বা দুর্গার বাহন। আবার অন্যভাবে বলা যায়, সিংহ বশ্যতার প্রতীক। বিক্রমশালী বন্যপশুকে বশে এনে দুর্গা তাকে দিয়ে অসুর বা অশুভকে ধ্বংস করছেন। আমাদের দেশের আনাচে কানাচে অনেক প্রতিভা লুকায়িত। তাদেরকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আমরাও সাফল্যের শীর্ষে আরোহণ করতে পারব।

মহিষাসুর অর্থ- ইন্দ্রিয় বৃত্তিসমূহ। আমাদের শরীরের আসুরিক বৃত্তিসমূহ (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য ইত্যাদি) প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে যুদ্ধ করে চলেছে,  আমাদেরকে কুপথে-  পরিচালিত করার জন্য। মাদুর্গার পদতলে দলিত মহিষাসুর হচ্ছে চিরন্তন শুভ ও অশুভের দ্বন্দ্বে অশুভের পরাজয়ের প্রতীক এবং জগৎমাতা সন্তানের দুঃখ-বেদনা-রোগ-শোক-জ্বালা-যন্ত্রণা , অবিদ্যা রূপ অসুরকে বিনাশ করে কল্যাণ আনয়ন করেন।

প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের মত আমাদের সমাজ তথা-প্রত্যেক সমাজে চার শ্রেণির মানুষ দেখা যায়। শুদ্ধশক্তি বা বুদ্ধিজীবী হচ্ছে ব্রাহ্মণ(মস্তক), ক্ষাত্রশক্তি বা বীর্যজীবী হচ্ছে ক্ষত্রিয়(হস্ত), বৃত্তিজীবী বা ধনশক্তি হচ্ছে বৈশ্য(উদর) এবং শ্রমজীবী বা জনশক্তি হচ্ছে শুদ্র(চরণ)। এখানে মনে রাখা দরকার- চরণ স্পর্শ করেই আমরা আশীর্বাদ লাভ করে থাকি  এবং চরণই সমস্ত দেহের ভার বহন করে থাকে । এখানে জ্ঞান শক্তি হচ্ছেন বিদ্যার দেব- সরস্বতী, ক্ষাত্রশক্তি হচ্ছেন দেব সেনাপতি কার্তিক। ধনসম্পদের দেবী শ্রীলক্ষ্মী। দেবী লক্ষ্মী হলেন ধনশক্তির প্রতীক এবং শ্রীগণেশ হলেন গণশক্তি প্রতীক। জ্ঞান, বীর্য, ধন ও জন এর মাধ্যমেই জাতি পরিপূর্ণ হয়। সুখ ও সমৃদ্ধির পথে নিয়তই এগিয়ে চলে। বস্তুত মা দুর্গা-প্রতিবারই আমাদের জাতীয় প্রতিমা। এই প্রকৃত সত্যটি উপলব্ধি করেই দুর্গাপূজায় আত্মনিয়োগ করা আমাদের একান্ত উচিত।

সরস্বতী ব্রহ্মবিদ্যা। যে সাধক দিবারাত্র অজপা মন্ত্রে সিদ্ধ তিনিই হংসধর্মী। মানুষ সুস্থ শরীরে দিবারাত্র মধ্যে একুশ হাজার ছয়শত ‘হংস’ এই অজপা মন্ত্র জপরূপে শ্বাস-প্রশ্বাস করে থাকে। মানুষ যতদিন এই স্বাভাবিক জপ উপলব্ধি করতে না পারে, ততদিন ‘হংসধর্মী হতে পারে না। সুতরাং ব্রহ্মবিদ্যারও সন্ধান পায় না।হংস সরস্বতীর বাহন। হাঁসের এক অপূর্ব শক্তি আছে যা দ্বারা সে জল মিশ্রিত দুধ থেকে দুধকে গ্রহণ আর জলকে ত্যাগ করতে পারে। জ্ঞান তাপসকে তদ্রুপ সত্য, নিত্য বিদ্যাকে গ্রহণ ও অবিদ্যা, অনিত্য, অসত্যকে ত্যাগ করতে হবে।

একজন সুস্থ মানুষ চব্বিশ ঘন্টায় ২১৬২০ বার শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। জীবের প্রত্যেকটি শ্বাস-প্রশ্বাসে হং ও সং এই অক্ষর ধ্বনিত হয়। হংস অর্থ অহম্ আমিই-সেই। অর্থাৎ সোহহং বা আনাল হক। জীব আর ব্রহ্ম অভিন্ন। জীব উর্দ্ধ গমনের এক বিশেষ স্তরে (মারফত)সৃষ্টিকর্তা বা ব্রহ্মের সাথে অভিন্ন হয়। নদী যখন সাগরে মেশে, তখন সে হয় সাগর। তেমনি হংস তত্ত্বের জ্ঞান লাভ করলে সাধক পরমহংস  হয়। হাঁস জলে বাস করলেও জল তার গায়ে লাগে না। আবার হাজারো পাক বা স্রোতের মধ্যে সে নিজেকে ঠিক রাখতে পারে। তাই সকল বুদ্ধিজীবী তথা বিদ্যার্থীর উচিত সমস্ত বাধা বিপত্তির মধ্যেও সংসারাসক্তি স্পর্শ না করে, সারবস্তু গ্রহণ করে মহাজাগতিক পথিকের মত এগিয়ে চলা।সরস্বতীর বায়ে থাকে কার্তিক। কার্তিক দেবতাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক – যুবশক্তির প্রতীক কার্র্তিক বীরপুত্র দাতা। বীর সন্তান লাভের আশায় তাই অনেকে কার্তিক ব্রত পালন করে।

কার্র্তিকের আরেক নাম ষড়ানন। সে ষড়রিপু বিজয়ী। মানুষ তখনই শুদ্ধজ্ঞান লাভ করে যখন সে ষড়রিপুকে ষড়মিত্রে পরিণত করে। কার্তিকের বাহন ময়ূর। মানব সমাজের ত্রাস সর্পকে সে ধ্বংস করে। সর্প ক্রুরতা ও হিংস্রতার প্রতীক। ময়ূর তাই সর্প নিধন করে সমাজকে ক্রুরতা ও হিংস্রতা থেকে মুক্ত রাখে।ময়ূর সর্বাগ্রে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় এবং অপরকে জাগ্রত করে। কার্তিক চিরকুমার। তাই সে বীর্যজীবীর প্রতীক। তাঁর বাহন ময়ূরের কোনো দৈহিক প্রতিক্রিয়া নেই। মেঘের গর্জন শুনলে ময়ূর নৃত্য করে। তাতে পুরুষ ময়ূরের বীর্য স্খলন হয়। তখন স্ত্রী ময়ূর ইহা সেবন করলে গর্ভবতী হয়। মানব জীবনের চরম দুর্জয় শত্রু হচ্ছে কাম। একে জয় করতে পারলে অন্য পাঁচটিকে জয় করা সহজ হয়। এই প্রতীকের মাধ্যমে আমাদের সর্বাগ্রে কামকে দমন করতে বলা হয়েছে।

দেবী লক্ষ্মী শ্রী, সমৃদ্ধি, বিকাশ ও অভ্যুদয়ের প্রতীক। শুধু ধনৈশ্বর্যই নয়, লক্ষ্মী চরিত্রধনেরও প্রতীক। দেবী লক্ষ্মী ধন ও সম্পদ এবং সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি সমুদ্র থেকে উত্থিত। সমুদ্রের আরেক নাম রতœাকর। অতএব সমুদ্র থেকে রতœ তো উঠবেই। ধন, জ্ঞান ও শীল Ñতিনেরই সর্বাত্মক মহনীয় বিকাশ দেবী কমলার চরিত্রমাহাত্ম্যে।শ্রীলক্ষ্মী শ্রী বা সৌন্দর্যের প্রতীক। মানুষ যখন আত্মজ্ঞান লাভ করেন, তখন তিনি হন শ্রীমান-দিপ্তীমান, সৌন্দর্যের আঁধার।শ্রীলক্ষ্মীর বাহন পেঁচক। পেঁচকের আরেক নাম উলুপ। বল শব্দ উপ,  প্রত্যয় করে উলুপ। তখন সাধকের শ্রী বা সৌন্দর্য বলের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ বলবান বলিয়াই শ্রীমান হন। পরমার্থধনাভিলাষী সাধক পেঁচকের মতো রাত্রি জাগিয়া সাধনা করে। পেঁচক মুক্তিকামী সাধককে বলে, সকলে যখন ঘুমায় তুমি আমার মতো জাগিয়া থাকো। আর সকলে যখন জাগ্রত তখন তুমি আমার মতো ঘুমাইতে শিখ, তবেই সাধনে সিদ্ধ।

পেঁচা দিনের বেলায় অন্ধ। বেশী ধনশালী হলে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। অর্থ প্রাপ্তির পূর্বে মানুষ অনেক জনহিতকর কার্যাদি করতে চায়, কিন্তু অর্থ প্রাপ্তির পর সে পেঁচা হয়ে যায়। পেঁচা রাত্রে জাগে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে। ধনসম্পদ তথা বড় কিছু করতে গেলে সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে গিয়েই করতে হয়। তাই শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন- “ধ্যান করবে কোণে, বনে আর মনে।শ্রীলক্ষ্মীর ডানে থাকে গণেশ। গণেশ জনগণের প্রতীক তাই গণেশের অপর নাম গণপতি। গণশক্তি পক্ষে থাকলে কার্যসিদ্ধ হয়। তাই গণদেবতা গণেশের পূজা সর্বাগ্রে ।নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে কল্পিত হয়। এই নয় দেবী হলেন রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচ¦াধিষ্ঠাত্রী কালিকা, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, জয়ন্ত্যাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী রক্তদন্তিকা, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামুন্ডা ও ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী। এই নয় দেবী একত্রে ‘‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা” নামে পূজিতা হন।

গণেশের গায়ের লাল রং রজোগুণের প্রতীক। ভোগ, সিদ্ধিদাতা অর্থে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ। সংখ্যায় সাধারণ মানুষ বেশি। এই সাধারণ মানুষের প্রতীক ইঁদুর। পশুদের মধ্যে সংখ্যায় বেশি ইঁদুর। ইঁদুরের গুণ কী? তার তীক্ষè দাঁত দিয়ে সব কেটে কুটে ছারখার করতে পারে। এই শক্তি সাধারণ জনগণের আছে। পশুরাজ সিংহ যদি জালে আটকে পড়ে তাহলে, জাল ছিড়ে বের হবার ক্ষমতা তার নেই। কিন্তু ছোট ইঁদুর জাল কেটে দিলেই পশুরাজ বের হতে পারেন। জনগণের অসীম শক্তির প্রতীক ইঁদুর। গণেশের মুন্ডু হাতির। সংখ্যায় কম, সমাজের বিত্তবান লোকের প্রতীক। এই বিত্তবানগণ জনগণের উপর বসেই বিত্তের প্রভাব খাটায়, সাধারণ মানুষের সম্পদ কুক্ষিগত করে। প্রয়োজন শুধু সাধারণ মানুষের একত্রিত হওয়া। তা হলেই বিত্তবানগণ পরাজিত হতে বাধ্য। গণপতি গণেশ শ্রমিকের শ্রমের ফলদাতা। এদের ক্ষুধা আছে কিন্তু মস্তিষ্ক নেই। তাই গণেশের মাথাটা পশুর।

 যার মাথা হাতীর তাঁর বাহন ইঁদুর। কার্যসিদ্ধ করতে গেলে ইঁদুরের মত সর্বদা শ্রম দিতে হবে। জাতি গঠন করতে হলে ছোট ও বড়র মিলন ঘটাতে হবে। যত ছোটই হোক ইঁদুর হাতির স্বজাতি। কেননা- উভয়ই পশু। স্বজাতি ক্ষুদ্র হলেও তাকে অবহেলা করা উচিৎ নয়। গণেশ, হাতী ও ইঁদুরের মিলন ঘটিয়ে এই মহান শিক্ষাই দিয়ে থাকে। হয়তো অবাক লাগবে বিশাল হস্তী মুন্ডধারী গণেশকে ক্ষুদ্র ইঁদুর কি করে বহন করে? হ্যাঁ, ক্ষুদ্ররাই তো বড়কে বহন করে। কৃষক ও শ্রমিকই সমগ্র জাতিকে বহন করে, জাতির কর্ম সমাধান করে, অন্নের সংস্থান করে। ক্ষুদ্রদের সমর্থনে বা ভোটেই জননেতার জন্ম হয়। গণেশ একক মুক্তিতে বিশ্বাসী নয়। তিনি চান জনগণের মুক্তি-সকলের কল্যাণ। গণেশের এই জনকল্যাণ চিন্তায় অগ্রসর হলে কর্মে সিদ্ধি আসবে।এই বিশ্বে দুর্বলতার কোনো স্থান নেই। অতএব শক্তি চাই, চেতনার শক্তি। সেই চেতনা শক্তির প্রতীক মা দুর্গা। এই কারণেই দুর্গাপূজা।

 দুর্গাপূজা অনন্ত সম্মিলিত শক্তির প্রতীকি পূজা। দুর্গাপূজা আসলে বিশ্বমাতার পূজা। মায়ের মাধ্যমে অনন্ত শক্তির উপাসনা। আমাদের হৃৎ-কন্দরে(কাল্বে) সকল ধরনের অসীম শক্তি রয়েছে। তা কাজে লাগানোর চেতনায় কেন আমরা পূর্ণরূপে জাগরিত হচ্ছি না?তুমি আমাদের চেতনায় জাগ্রত হও মা, ললিত বাণী প্রচার করে অশুভ অসুর বা দানব শক্তিকে (বিশ্বব্রহ্মান্ডে ও দেহভান্ডে যা অবস্থিত) বশ করা যায় না। এজন্য দরকার তোমার সংগ্রামী, প্রতিরোধী, বিরাট শক্তির সম্মিলনী চেতনা। শরীর, আবেগ ও মন দ্বারা সত্যিকার অর্থে সে কাজ করা যায় না। এজন্য প্রয়োজন মনাতীত চেতনা।  ও মা, আমরা সবাই সেই সম্মিলিত চেতনাশক্তিরূপে আবির্ভূত হওয়ার প্রতীক্ষায় রইলাম। কবির ভাষায়-
জাগো, তুমি জাগো, জাগো দুর্গা,
জাগো দশপ্রহরণধারিণী,
অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো।
প্রণমি বরদা অজরা অতুলা
বহুবলধারিণী রিপুদলবারিণী জাগো মা।
শরণময়ী চন্ডিকা শংকরী জাগো, জাগো মা,
জাগো অসুরবিনাশিনী তুমি জাগো।।- বাণী কুমার
লেখক: গবেষক-প্রভাষক।
 ০১৭১৭১৪৩৩৮৯
[email protected]|

এই বিভাগের আরো খবর

অসহায় রোহিঙ্গা মানবিক বাংলাদেশ

মোহাম্মদ নজাবত আলী:বর্তমান পৃথিবী ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিগত বিদ্বেষ সহিংসতায় কোনো কোনো রাষ্ট্রে চলছে। যখন কোনো রাষ্ট্রে জাতিগত বিদ্বেষ হানাহানি সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন শোষিত মানুষের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে তারা প্রাণ বাঁচাতে পাশ্ববর্তী কোনো রাষ্ট্রে আশ্রয় লাভের আশায় ঘর বাড়ি ছেড়ে পরিবার পরিজন সহ অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে। অতি সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত বিদ্বেষ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করলে সরকার তাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দেন।

 
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে সহিংসতা চলছে তা সভ্যতার ইতিহাসে বিরল ঘটনা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের হত্যা করে। রক্তের হোলি খেলায় এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজারের অধিক রোহিঙ্গা প্রাণ হারান। অবুঝ শিশু, নারীরাও এ সহিংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। কি এক মানবতা বিরোধী নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তাদের অত্যাচার নির্যাতন হত্যা থেকে প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনু প্রবেশ করে।


ক্লিয়ারেন্স অপারেশন নামে অভিযানে এ পর্যন্ত তিন হাজারের ও অধিক মুসলিম রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুড়ে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে দেশটির সেনাবাহিনী। যুগের পর যুগ ধরে মুসলিম রোহিঙ্গারা দেশটিতে নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয় যেন নিজ ভুমে পরবাসী। জন্ম যেন তাদের আজন্ম পাপ।

 দেশটিতে মুসলিম রোহিঙ্গাদের সংখ্যা খুব একটা বেশি নয় ১০-১২ লক্ষের মতো হতে পারে। জাতিগত বিদ্বেষ হানাহানিতে বিগত কয়েক দশকে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা ইতোপূর্বে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে বসবাস করে আসছে। যদিও তারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পরার অভিযোগও রয়েছে। ১৯৭৭ সালেই প্রায় তিন লক্ষ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে প্রবেশ তারপর থেকে বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গারা অত্যাচার নির্যাতন সইতে না পেরে বাংলাদেশ সহ আরবে পাড়ি জমায়। তবে এবারে ভয়াবহ জাতিগত সহিংসতায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মানবিক বিপর্যয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া জন্য আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানায়।

 তবুও বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিয়ে সংকটে পড়েছে। পরপর দু’দফা বন্যা, ৪ লাখ রোহিঙ্গাদের দেখভাল সরকার হিমশিম খাচ্ছে। এমনিতে চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে এক ধরণের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা ও রোহিঙ্গাদের সামাল দিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রচন্ড চাপ পড়ছে। বাংলাদেশের একার পক্ষে এ সংকট সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্র বাংলাদেশ তথা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সরবরাহে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। নারী, শিশু, যুবক-যবুতী সবাই আজ চরম বির্যয়ের মুখে পতিত। মিয়ানমার সরকারের সেনাবাহিনী তাদের মানুষ হিসাবে ভাবছে না। দেশটির সেনাবাহিনী তাদের নির্বিচারে হত্যা করছে। বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। হত্যা, ধর্ষণ সহ নানা ধরনের অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে। আজ রোহিঙ্গা মুসলমানরা বড় অসহায়। তাদের জীবন বিপন্ন। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে তান্ডব চলছে তা সভ্য দুনিয়ার ইতিহাসে নিষ্ঠুর ও জঘন্যতম ঘটনা।


গত ২৫শে আগষ্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক অভিযান শুরু হলে প্রাণ বাঁচতে মুসলিম রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালালে বর্ডার গার্ড তাদের বাধা প্রদান করলে ও বর্তমান সে অবস্থা আর নেই। বলা যায় বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের বিভিন্ন পয়েন্ট ও নাফ-নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ইতিমধ্যে নৌকাডুবিতে প্রায় শতাধিক নারী, পুরুষ, শিশু রোহিঙ্গা প্রাণ হারান।

অন্য দিকে মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ১০ হাজারেরও বেশি শিশু স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেকেই আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছে। ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে দেড়’শ এর অধিক শিশু, প্রসূতি মা মারা গেছেন কম পক্ষে ১০ জন তবে মৃতের আরো বেড়ে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতাল ও সিমান্তে রোহিঙ্গা মেডিকাল টিম।


 বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে এটা যেমন সত্য তেমনি এ বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের ভার বহনের ক্ষমতা বাংলাদেশে কতটুকু রয়েছে এটাও বিবেচ্য বিষয়।  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে আশ্রয় ও মানবিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র  বাংলাদেশে প্রশংসা করলেও আমরা মনে করি এ সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের ভূমিকা নিতে হবে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সেনা অভিযান বন্ধ করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের শেষ একটা সুযোগ মিয়ানমারের নেত্রী অংসান সুচির সামনে রয়েছে। সুচি সাড়া দিতে ব্যর্থ হলে ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনবে। অং সান সুচি জাতির এক ভাষণে যাচাই বাছাই শেষে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কথা বলেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন অং সান সূচির এ প্রতিশ্র“তি ভাওতাবাজি মাত্র। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জোর দাবি জানিয়েছেন।


দেশটির সেনাবাহিনী ও উগ্রবৌদ্ধরা যেসব কর্ম করছে, পুলিশ রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে এ অবস্থায় অংসান সুচির নিষ্ঠুরতা সারা বিশ্ব জুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠেছে। উপরন্ত অংসান সুচির শান্তিতে নোবেল ও পেয়েছেন। বিগত কয়েক বছর আগের মিয়ানমারের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য অংসান সুচিকে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। এখন শান্তিতে নোবেল পাওয়া একজন নেত্রির ভূমিকা নিয়ে সারা বিশ্বে প্রশ্ন উঠেছে। রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বেড় করে দেওয়া, হত্যা নির্যাতন চালানো, বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া, নারীদের ধর্ষণ, শিশু হত্যা এটা অংসান সুচির অহিংসা ও শান্তির নুমনা? ইতিমধ্যে বিশ্বের বেশ কয়েকজন নোবেল জয়ী মিয়ানমারের সংঘটিত ঘটনাকে মানবতা বিরোধী অপরাধ বলে অভিহিত করেছেন।

তার নোবেল পদক বাতিলের দাবি ওঠেছে যেমন ওঠেছিল গত অক্টোবরেও। আসলে মিয়ানমারের পুলিশ যেভাবে মুসলিম রোহিঙ্গাদের নিধনে নিষ্ঠুর খেলা, সহিংসতা চালাচ্ছে, দেশটির সেনাবাহিনী তাতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে অংসান সুচি যেন দেশটিতে সেনাদের খেলার পুতুল। বিশ্বব্যাপী তার গৌরব মর্যদা আজ সেনাবাহিনী কাছে সমর্পিত। অতিত থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখের অধিক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সেনাবাহিনী যেভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে তাতে মুসলিম রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যাবে।

১৯৮৫ সালে আরাকান (রাখাইনের পূর্ব নাম) দখলকারীরাই বহিরাগত। ১৯৬২ সালে দেশটিতে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের উপর অত্যাচার শুরু হয় এবং নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। ক্লিয়ারেন্স অপারেশন নামে একটি জনগোষ্ঠীকে দেশ থেকে, উচ্ছেদ ও গণহত্যা মানবতা বিরোধী অপরাধ। ইতিমধ্যে মিয়ানমারে জাতিগত বৈষম্য বিদ্বেষ সহিংসতাকে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার কমিশন মানবতা বিরোধী অপরাধ বলে অভিহিত করেছেন। আর অংসান সুচির কাছে এ সহিংসতাই কি শান্তির নমুনা? শান্তির জন্য নোবেল পদক পাওয়ার পুরস্কার?

বাংলাদেশের মিয়ানমারের সীমান্তে কাঁটা তারের বেড়া দিয়েছে মিয়ানমার সরকার অনেক আগেই। তবে বর্তমান চলমান সংহিংসতাই সীমান্তে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে মাইন স্থাপন করেছে। মাইন বিস্ফোরণে ইতিমধ্যে কয়েকজন মুসলিম রোহিঙ্গার মৃত্যু ঘটে। সীমান্তে মাইন স্থাপন ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর টহল দেওয়াই স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এক ধরণের উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর হামলায় তারা এখনও পালিয়ে আসছে বাংলাদেশে। এ পর্যন্ত প্রায় চার লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রায় পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে। উপরšুÍ প্রায় চার লক্ষ রোহিঙ্গাকে নিয়ে সরকার বিপাকে পরেছে। যদিও মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার সাময়িকভাবে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কক্সবাজারের বালুখালীতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপনও তাদের নিবন্ধনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন। আর্ন্তজাতিক মহল থেকে নিয়ানমারের উপর চাপ দিতে ইতিমধ্যে সংসদে কণ্ঠ ভোটে প্রস্তাব ও পাস হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন….. ‘আমরা মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছি। ……….সব রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে হবে।’

মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর সভ্যতা বিবর্জিত অনামবিক ও অত্যাচার চলছে। সম্প্রদায়িক, বিদ্বেষ, হানাহানি, দমন পীড়ন আর নয়। প্রতিষ্ঠা করতে হবে শান্তি। অশান্তির বিপরীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়া রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। মানুষ মানুষের জন্য, মানবতার এ অমর বাণী যদি নিঃশেষ হয়ে যায় তাহলে শুধু মিয়ানমার নয়, সারা পৃথিবী অশান্তির আগুনে পুড়বে। ধর্মীয় বিদ্বেষ, হিংসা, সহিংসতা, বন্ধ করে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবতার পরিচয়।  
লেখক: শিক্ষক-কলামিস্ট
০১৭১৯-৫৩৬২৩১

 

এই বিভাগের আরো খবর

রেমিটেন্সে মন্দাভাব

আব্দুল হাই রঞ্জু:দেশে প্রতিনিয়তই কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে হারে কর্মসংস্থান সম্প্রসারিত হচ্ছে না। দেশি বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতিও খুব একটা ভাল না। ফলে শিক্ষিত আধা শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। শুধু কর্মসংস্থানের জন্য বাধ্য হয়েই অনেকেই প্রবাসে ছুঁটছেন। সে ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা। রিক্রুটিং এজেন্সীগুলোর অতি মুনাফার মানসিকতা এবং দালালদের হাতে অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন।

যদিও সরকার নির্ঝঞ্জাট বিদেশ গমনে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ায় দালার চক্রের দৌরাত্ব অনেকাংশেই কমে গেছে। তবুও আইনের ফাঁক ফোঁকর গলে অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের দৌরাত্মের কথা শোনা যাচ্ছে। জানা যায়, অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতনের লোভ দেখিয়ে বিদেশ গমেনকচ্ছুদের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে ৬/৭ লক্ষ টাকা। প্রশিক্ষণহীন প্রবাসীদের পরিণতি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে।

 বিশেষ করে প্রশিক্ষণ না নিয়ে বিদেশ গমনে সক্ষম হলেও শুধুমাত্র দক্ষতার অভাবে হাড়ভাঙ্গা খাঁটুনি খাটলেও সে হারে পারিশ্রমিক মেলে না। ফলে অদক্ষ এ সব প্রবাসী শ্রমিকদের কম মজুরির কারণে তেমন কোন অর্থ দেশে পাঠাতেও পারেন না। সংগত কারণে পরিবার এবং রাষ্ট্র উভয়ই সমানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে প্রবাসে যাওয়া কর্মিদের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে রেমিট্যান্স দেশে আসছে না। ফলে রেমিট্যন্সে এক ধরনের মন্দাভাব বিরাজ করছে।

অথচ সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য রেজিট্যান্সের অবদান অপরিসীম। মূলত দেশীয় অর্থনীতির চাকা সমৃদ্ধ হচ্ছে পোশাক খাতের রফতানি আয় এবং রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে। যদি রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার এ ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামীণ অর্থনীতি। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারা কিছুটা হলেও পরিবর্তন হয়েছে। যদিও এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন এনজিওর দেয়া ঋণের ওপর ভর করে গরিব পরিবারগুলোর বসবাস উপযোগী ঘরবাড়ির চেহারা এখন আর অতীতের মতো নেই। শুধু এনজিও ঋণই নয়, এই পরিবর্তনের মূলে মূখ্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছে প্রবাসী আয়।


পাঠক মাত্রই স্মরণে থাকতে পারে স্বাধীনতা পূর্ব এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ অর্থাৎ মধ্যবিত্ত ব্যতিত সকলেই ছোন খড়ে নির্মিত খড়েই বসবাস করতেন। তুলনামুলক একটু আর্থিকভাবে অবস্থাপন্ন মানুষজনের বাড়িতেই টিনের খড় দেখা যেত। স্বাধীনতা অর্জনের পর সে প্রেক্ষাপট পরিবর্তনে খুব বেশি দিন সময় লাগেনি। আধুনিক প্রযুক্তির চাষাবাদ, প্রবাসী আয়, গ্রামের খেটে খাওয়া বেকার তরুণ তরুণী, যুবক যুবতীদের পোশাক কারখানায় কাজের সুযোগ, সব মিলে একজন দীন মজুরের বাড়ী পর্যন্ত ছোনের ঘর উধাও হয়ে গেছে। এটাও গ্রামীণ অর্থনীতি পরিবর্তনের একটা জলন্ত নজির। যদিও বিভিন্ন এনজিওর বাড়তি সুদ আসল পরিশোধে ঋণ গৃহীতাদের অনেক বেশি কষ্ট করতে হচ্ছে। সে ধারা এখনও প্রবলভাবে বিদ্যমান।

 সময় এসেছে এনজিওগুলোর নগদ অর্থ প্রদানের বদলে কর্মসৃজন নানা প্রকল্পে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া। আমি যতদুর জানি, প্রতিটি এনজিও কাগজ কলমে নানামুখী কর্মসৃজন প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ প্রদান করলেও প্রকৃত অর্থে সে ধরনের কোন প্রকল্প বাস্তবে নেই। ফলে ঋণ গ্রহণকারীদের কায়িক শ্রম বিক্রি করে সে অর্থ দিয়ে সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। এটাও শ্রম শোষণের মোক্ষম হাতিয়ার। অথচ শ্রম শোষণহীন একটি সুখি  সমৃদ্ধশালী সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন নিয়েই বাঙালি জাতি পশ্চিমা শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করে দেশটি স্বাধীন করেছে। কিন্তু বাঙালি জাতির সে স্বপ্ন আজও অধরাই থেকে গেছে। গ্রামের  মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চাষের জমি হারিয়ে নি¤œবিত্তে পরিণত হয়েছে স্বাধীনতা উত্তর ৪৬ বছরে।


 আর নি¤œবিত্ত বর্গাচাষিরা জমি জিরাত হারিয়ে অনেক আগেই নগর মহানগরে বস্তিবাসী হয়েছে। আর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ধ্বংস হয়ে এখন অভাব অনটনকে সম্বল করে মানবেতর পরিবেশে দিন যাপন করছেন। ভাগ্যগুণে মধ্যবিত্তদের মধ্য থেকে কেউ প্রবাসে কিম্বা গামের্ন্টসে অথবা সরকারি-বেসকারি কোথাও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে পারিবারিক স্বচ্ছলতা অর্জন করতে সক্ষম হলেও যাদের সংখ্যা অতি নগন্যই। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কর্মসংস্থানের এখন বড়ই অভাব। শুধু একটু কাজের আশায় শিক্ষিত বেকার গোষ্ঠীর আহাজারি শাসকগোষ্ঠীর কর্ণপাত হলেও আশ্বাস ব্যতিত দৃশ্যমান অগ্রগতি তেমন একটা নেই। অথচ ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে কর্মসংস্থান পাহাড় সমান একটি সমস্যা।

যে সমস্যা সমাধানে সরকারকেই কর্মসংস্থানের দ্বারকেই উম্মোচিত করতে হবে। এজন্য বিরাষ্ট্রীয়করণের বদলে জাতীয়করণের দিকেই সরকারকে ঝুঁকতে হবে। দেশে গড়ে ওঠা চিনি শিল্প, পাট শিল্প, কৃষি শিল্পের উন্নয়নে বেশি করে নজর দিতে হবে। নতুন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। তানা হলে শুধুমাত্র সেরকারি বিনিয়োগের ওপর খবু বেশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যাবে না। দেশিয় শিল্প চিনি কলগুলোকে পুনর্জীবিত করতে হলে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে।

সোনালী আঁশ খ্যাত পাট শিল্পকে রক্ষায় সরকার যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে তার সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ বিরাষ্ট্রীয়করণের পথ থেকে সরে আসতে হবে। দেশীয় কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলোর বিকাশ ঘটাতে হবে। বিশেষ করে গোটা দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠা চাল কল শিল্পকে বাঁচাতে হবে। যে শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে কোটি মানুষের রুটি-রুজি নির্ভরশীল। গলা টিপে সে শিল্পকে ধ্বংস করার মতো কার্যকলাপ থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে।  


বিশেষ করে বিনিয়োগ উপযোগী অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধাকে সম্প্রসারিত করতে হবে। যেন দেশী বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। তাহলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বেকারত্বের অভিশাপ থেকে জাতিকে রক্ষা করাও সম্ভব হবে। স্মরণে রাখতে হবে, কোটি কোটি কর্মক্ষম হাতকে অলস রেখে আর যাই হোক, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে না। এজন্য গোটা দেশেই কর্মক্ষম হাতগুলোকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হাতে কলমে কারিগরি শিক্ষার দ্বারকে আরও প্রসারিত করতে হবে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সুত্র মতে, বিশেষ করে বিদেশগামীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য দেশে ৭১টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৪৮টি খাতের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যেখানে প্রশিক্ষণ শেষে সনদপত্র প্রদান করা হয়। সুত্র মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশগামীরা প্রশিক্ষণ না নিয়েই ৩/৪ হাজার টাকার বিনিময়ে খুব সহজেই সনদপত্র সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমায়। প্রথমেই সর্বনাশা এ পথকে বন্ধ করতে হবে। যেন কোন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রশিক্ষণ ছাড়া সনদপত্র প্রদান করতে না পারে।

এমনকি মাধ্যমিক স্তর থেকে সকল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে কারিগরি বিষয়কে (অন্তত ২/৩টি বিষয়ে) বাধ্যতামূলক করে ব্যবহারিক নম্বর যোগ করার নিয়ম চালু করা যেতে পারে। তাহলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর পক্ষে বিশেষ কোন কোন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করলে যা ভবিষ্যত কর্মজীবনে সহায়ক ভুমিকা রাখতে সক্ষম হবে। যেহেতু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় উপজেলা পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষার কারিকুলাম চালু আছে, সেখানেই বিদেশ গমেনুচ্ছুদের প্রশিক্ষণের সুযোগ করা গেলে যা আরো সহজ হবে।

কারণ ভুয়া সনদ নিয়ে বিদেশ গমন করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করলে পারিশ্রমিক কম পাবে- এটাই স্বাভাবিক। আর পারিশ্রমিক কম পাওয়ার অর্থই হলো পরিবার এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি হওয়া। আমরা মনে করি, বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিৎ। যেন প্রশিক্ষণ ব্যতিরেকে অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে সনদপত্র সংগ্রহ করে বিদেশে কেউ পাড়ি দিতে না পারে।

তাহলে একদিকে বিদেশগামীদের পরিবারগুলো যেমন উপকৃত হবে, তেমনি প্রবাসী আয় হতে রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর ক্ষতিকর এ অবস্থা থেকে প্রবাসগামীদের নিবৃত করতে পারলে রেমিটেন্স নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না এবং প্রবাসী আয় হতে রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর ক্ষতিগ্রস্ত এ অবস্থা থেকে প্রবাসগামীদের নির্বৃত্ত করতে না পারলে রেমিটেন্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হওয়ার বদলে দূর্বল হবে। যা কারো কাছেই কাম্য নয়।
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮ 

এই বিভাগের আরো খবর

হিজরী নববর্ষ ও আশুরা

অধ্যক্ষ মোহাম্মাদ আব্দুল আজিজ:আজ ইসলামি পঞ্জিকার ১৪৩৯ হিজরীর প্রথম মাস মহররম। ইসলামি পঞ্জিকার আগে রোমান, পারসিয়ান ও অন্যান্য জাতির মধ্যে তাদের নিজস্ব পঞ্জিকা প্রচলিত থাকলেও আরববিশ্বে  কোনো নির্ধারিত বর্ষগণনা পদ্ধতি ছিল না। বিভিন্ন ঘটনার উপর নির্ভর করে বলা হতো যে, ওমুক ঘটনার এত বছর আগে বা এত বছর পরে। হুজুর (সা.) এর জীবনে এবং ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর আমলেও ইসলামি পঞ্জিকার উদ্ভব ঘটেনি। খলীফা উমর (রা.) এর খিলাফতের তৃতীয় বা চতুর্থ বছরে বছরার গভর্নর আবু মুসা আশয়ারী (রা.) খলীফাকে পত্র লিখে জানান যে, সরকারি চিঠিপত্রে সন তারিখ না থাকায় প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়; এজন্য একটি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার প্রয়োজন।

খলীফা এ ব্যাপারে সাহাবাদের সংগে পরার্শ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পরামর্শ সভায় ৫টি মতামত ব্যক্ত করা হয়। (১) কেউ কেউ রোম বা পারস্যের যে কোন ১টি পঞ্জিকা ব্যবহার করতে পরামর্শ দেন। (২) অনেকেই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জন্ম সাল হতে গণনা শুরু করার পরামর্শ দেন। (৩) কোন কোন সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নবুওয়াত থেকে সাল গণনার কথা উল্লেখ করেন। (৪) কেহ কেহ রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মৃত সাল থেকে গণনা করার পক্ষে মত দেন। (৫) হযরত আলী (রা.) হিজরত থেকে সাল গণনার পক্ষে জোরালো বক্তব্য পেশ করেন।

 অনেকেই এমতকে পছন্দনীয় মনে করেন। হযরত উমর (রা) এ মত সমর্থন করে বলেন যে হিজরতই হক ও বাতিলের পার্থক্য সূচনা করে; এজন্য আমার মতে হিজরত থেকেই সাল গণনা করা উচিত। অবশেষে সাহাবীগণ হিজরত থেকেই সাল গণনার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। কোন মাস থেকে বর্ষ গণনা শুরু করা হবে মর্মে পরামর্শ চাওয়ায় সেখানেও ৩টি মতামত উল্লেখ করা হয়। (১) যেহেতু হিজরত রবিউল আউয়াল মাসেই অনুষ্ঠিত হয়। ১২ রবিউল আউয়াল তিনি মদীনায় পৌছেন। তাই অনেকেই উক্ত মাস হতে গণনা শুরু করার পক্ষে মত দেন। (২) অনেকেই কোরআন নাজিলের মাস রমজান মাস হতে গণনা শুরু করার কথা বলেন। (৩) অধিকাংশ সাহাবীগণ হারাম মাসের অন্যতম মাস মহররম মাস হতে গর্ণনা শুরু করার কথা উল্লেখ করেন। কারণ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ  হজ্ব পালন হয় জিলহজ্ব মাসে।

 সারাবিশ্বের হাজীগণ জিলহজ্বের শেষের দিকে বাড়িতে ফিরে যান। বৎসরের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হজ পালন সর্বশেষ মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে হাজীরা বাড়িতে ফিরে নতুন বছর হিসাবে মহররম মাসকে গ্রহণ করবেন এই চিন্তা চেতনাকে সামনে রেখে সর্ব সম্মতিক্রমে মহররম মাসকে নতুন বছরের প্রথম মাস হিসাবে গণ্য করা হয়। এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ইন্তেকালের ৬ বছর পরে ১৬ বা ১৭ হিজরী সাল থেকে হিজরী সাল গণনা শুরু করা হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অধিকাংশ মুসলমান আমাদের ধর্মীয় এ পঞ্জিকার বিষয়ে কোন খোঁজ খবর রাখিনা শুধু বছরের ২ ঈদ, শবে বরাত, শবে মিরাজ, এ রকম কয়েকটি দিন রাতের খোঁজ খবর রেখেই সারা বছর শেষ হয়। হিজরীর কত সাল, কোন মাস কোন খবর নেই। অথচ ইংরেজি তারিখ ভুল হয় না। ১৫৮২ খৃষ্টাব্দে পোপ অষ্টম গ্রেগরী রোমান জুলিয়ান ক্যালেন্ডার সংশোধন করে যীশুর জন্মকে সাল গণনার শুরু ধরে এ পঞ্জিকা প্রচলন করে নাম দেয়া হয় গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার বা খৃষ্টীয়ান ক্যালেন্ডার।

 যীশুকে প্রভু ও উপাস্য হিসাবে বিশ্বাসের ভিত্তিতে বৎসরকে বলা হয় আন্নোডোমিনি সংক্ষেপে এডি বলা হয়। এর অর্থ আমাদের প্রভুর বৎসরে শুধু জাগতিক প্রয়োজনেই নয়, জীবনের সকল কিছুই আমরা এ খৃষ্টধর্মীয় পঞ্জিকা অনুসারে পালন করি। অথচ আমাদের পঞ্জিকার খবর আমরা কেউ রাখিনা। আফসোস! মহান আল্লাহ আমাদেক ক্ষমা করুন এবং রক্ষা করুন। সুপ্রিয় পাঠকবৃন্দ! ইসলামি পঞ্জিকার নতুন বছর শুরু করেছি। নতুনের মধ্যে আমরা পরিবর্তনের আশা ও কামনা অনুভব করে আনন্দিত হই। আমাদের জানা উচিত যে, মানুষের প্রতিটি দিনই নতুন জীবন। যেমন পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে মহান আল্লাহ বলেন- “তিনিই রাতে তোমাদের মৃত্যু ঘটান এবং দিনে যা কর তা তিনি জানেন। অত:পর তিনি তোমাদেক দিনে পুনরায় জেগে তোলেন যাতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হয়।” (সুরা আনয়াম আয়াত নং ৬০)। এজন্য হাদীসে প্রতিদিন ভোরে মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া সহ পরিবর্তনের ও বরকতের প্রার্থনা করে নতুন জীবন শুরু করতে হবে মর্মে বর্ণিত আছে।

 প্রতিরাত শয়নের সময় ক্ষমা ও রহমতের প্রার্থনা সহ নিজকে সমর্পণের দু’আ পাঠ করে ঘুমাতে হবে। আমরা অনেকেই নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাই। শুভেচ্ছা অর্থ মনের ভাল ইচ্ছা। বস্তুত শুভেচ্ছা বা শুধু কামনা যথেষ্ট নয়, ইসলামি রীতি হলো দু’আ করা। মানুষের ইচ্ছাই যথেষ্ট নয় বরং আল্লাহর ইচ্ছাই হলো মূল। এজন্য তার দরবারে দু’আ করে নতুন বছরের সফলতা কামনা করতে হবে। অন্তসারশূন্য ইচ্ছা বা কামনা কোন পরিবর্তন আনে না। বরং পরিবর্তনের জন্য নতুন বছরকে নতুনভাবে গড়ার সুদৃঢ় ইচ্ছা ও কর্ম থাকা চাই। কোরআন হাদীসের দৃষ্টিতে সৃষ্টির সেবা ও মানব কল্যাণ মূলক কাজই রহমত ও বরকত লাভের অন্যতম উপায়। পক্ষান্তরে মানুষের ক্ষতি করা, ব্যক্তি বা সমাজের অধিকার নষ্ট করা আল্লাহর গজব ও শাস্তি লাভের অন্যতম কারণ। আসুন আমরা সকলে মহান আল্লাহর নির্দেশমত তার ইবাদাত ও আনুগত্যের মাধ্যমে মানুষের অধিকার আদায় ও ক্ষতি থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে নতুন বছরের সুচনা করি। বিগত বছরের অপরাধের জন্য লজ্জিত হই, অনুতপ্ত বোধ করি। তাওবা করি যেন মহান আল্লাহ আমাদেক ক্ষমা করেন এবং চলতি বছরে সর্বদা বেশী বেশী ভাল কাজ করতে পারি এ প্রার্থনা জানাই মহান প্রভুর দরবারে, তাহলেই হিজরী নববর্ষ পালন সার্থক হবে।

 মহান আল্লাহ আমাদেক তাওফিক দিন। হিজরী নব বর্ষের প্রথম মাসের ১০ তারিখ গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিনকে আশুরা বলা হয়। আশুরায় শাব্দিক অর্থ দশম। মহররমের দশম তারিখকে আশুরা বলা হয়। সহীহ হাদীস থেকে জানা যায় যে, এই দিনে (১) মুসা (আ.) বনী ইসরাইলদেক নিয়ে আল্লাহর রহমতে নীল নদ পার হন। অপর দিকে ফিরাউন তার বাহিনী সহ ঐ নীল নদে ডুবে মারা যায়। (২) এই দিনে আদম (আ.) এর তাওবা কবুল হয়। (৩) এই দিনে নুহ (আ.) এর কিশতী জুদী পর্বতে অবতরণ করে। (৪) এই দিনে ঈসা (আ.) জন্ম গ্রহণ করেন। এই দিনে আরও অনেক ঘটনার কথা বিভিন্ন বই পুস্তকে পাওয়া যায়। তবে বিশুদ্ধ হাদীসে সেগুলি বর্ণিত নয় বলে মুহাদ্দিস আব্দুল হক দেহলবী (রহ.) তার “মা ছারাতা বিসসুন্নাহ” কিতাবে উল্লেখ করেছেন। সম্ভবত ঐগুলি দুর্বল বর্ণনায় বর্ণিত অথবা ঐতিহাসিকদের কিংবা ওলামাদের মন্তব্য।

 ঐ দিনের সিয়াম পালনের কথা ছহীহ মুসলিম শরীফের হাদীসে বর্ণিত আছে। হাদীসটির অর্থ হলো “আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি যে, ঐ দিনে সিয়াম পালনে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।” অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, আশুরার দিনে ভাল খাবার পরিবারে ঐ বছর রিজিক প্রশস্ত করে দেয়া হয়। হাদীসটি আমল যোগ্য তবে হাসান লিগায়রিহি। সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “রমজানের পরে সবচেয়ে বেশী ফজীলতের সিয়াম হলো আল্লাহর মাস মহররমের সিয়াম।” (সহীহ মুসলিম)। রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার আগে আশুরার সিয়াম ফরজ ছিল। রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পর আশুরার সিয়াম মুস্তাহাব পর্যায়ের ঐচ্ছিক ইবাদাত বলে গণ্য করা হয়। দুর্বল সনদে একজন সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যে, আশুরার দিনে দান খয়রাতের বিনিময়ে অধিক ছওয়াব পাওয়া যেতে পারে। সহীহ হাদীস থেকে জানা যায় যে, ইহুদীরা আশুরার দিনে আনন্দ করে তোমরা তাদের বিরোধীতা করবে। ঐ দিনে সিয়াম পালন করবে উৎসব বা আনন্দ করবে না।

 দুর্বল সনদে বর্ণিত আছে যে, আশুরার দিনে চোখে সুরমা ব্যবহার করলে কখনই তার চোখ উঠবে না। একাধিক সনদে বর্ণিত হলেও সবগুলো দুর্বল। ইমাম হুসাইনের হত্যাকারীরা আশুরার দিনে সুরমা মাখার রেওয়াজ চালু করেছিল। হাদীসটি তাদের বানানো। কোনো দুর্বল রাবী অসতর্ক অবস্থায় বর্ণনা করেছেন। আশুরার দিনটিকে ইহুদীরা সম্মান করতো। এ কারণেই ইহুদীদের মধ্যে আশুরা সম্পর্কে অনেক ভিত্তিহীন কল্প-কাহিনী প্রচলিত ছিল। পরবর্তী যুগে ইসরাইলি রেওয়ায়েত হিসাবে সেগুলি মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে। প্রথম যুগে এগুলো সত্য বা মিথ্যা বলে বিশ্বাস না করে ইসরাইলি কাহিনী বলা হতো। পরবর্তী যুগে এগুলি ‘হাদীসে’ পরিণত হয়েছে। যেমন হাদীস বলে প্রচার করা হয় যে, আশুরার এক রোজা অন্য মাসের ৩০ রোজার সমান, মহররমের ১০ দিনের রোজা ১০ হাজার দিনের রোজা, মহররমকে সম্মান দেখালে আল্লাহ তাকে জান্নাতে সম্মান দেখাবেন, ঐ দিনে ২০০০ নবীর জন্ম হয়েছে এবং তাদের দু’আ কবুল হয়েছে ইত্যাদি এগুলো বিভিন্ন বই পুস্তকে লেখা থাকলেও একটিও রাসুল (রা.) হতে সহীহ বা জয়িফ কোন ভাবেই বর্ণিত নয়। সবগুলো মানুষের বানানো কথা হাদীস বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 সকল মুহাদ্দিস একমত যে, এগুলি সবই বানোয়াট বা মিথ্যা হাদীস। আশুরার ভবিষ্যৎ ও অতীত ঘটনাবলি যা আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে যেমন আশুরার দিনে আসমান জমিন সৃষ্টি হয়েছে ঐ দিনে কলম, লওহে মাহফুজ, আরশ কুরসি, জান্নাত, জিবরাইল সৃষ্টি হয়েছে। ইদরিস (আ.) কে আসমানে উঠান, দাউদ (আ.) তাওবা কবুল, সুলাইমান (আ.) এর রাজত্ব ফিরে দেওয়া, তাওরাত নাজিল হওয়া, ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়া, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে বের হওয়া, ইউসুফ (আ.) জেলখানা হতে বের হওয়া ঐ দিনে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া এইরূপ অগণিত ঘটনা কাহিনী আমাদের দেশের আশুরার মিলাদে, আলোচনায় ও ওয়াজে বয়ান করে শুনানো হয় জনগণ এতে খুব খুশী হয়ে ধুমধামের সহিত আশুরা উদযাপন করে থাকে কিন্তু মূলত এগুলি সব ভিত্তিহীন কথা।

মুহাদ্দিস আব্দুল হাই লাখনবী, ইমাম সাহাবী, ইমাম সুয়ুতী, মোল্লা আলী কারী হালফী সকলেই এগুলিকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। সহীহ হাদীস থেকে আমরা জেনেছি, এ মাস আল্লাহর মাস, সম্মানিত মাস, এ মাসের নফল সিয়াম সর্বোত্তম নফল সিয়াম, আশুরার সিয়াম বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। এছাড়াও অন্যান্য মাসের মত আমরা এ মাসেও নফল সালাত কুরআন তেলাওয়াত, বেশী বেশী জিকির, দু’আ দরুদ পাঠ করবো। মহররম মাসের কোন দিনে বা রাতে বিশেষ কোন সালাত পাঠের নির্দেশনা বা উৎসাহ হাদীসে বর্ণিত হয় নি। যা আছে সব মানুষের তৈরী কথা।

আমাদের সমাজে আশুরাকে কারবালার সংগে যুক্ত করা হয়। অনেকেই আশুরাকে কারবালার ঘটনা বুঝেন। কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আশুরার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে থাকেন। আশুরার ফজিলত কারবালার জন্য নয়। আশুরার ফজিলত কারবালার ঘটনায় ৫০ বছরেরও বেশী আগের হাদীস থেকে বর্ণিত। তবে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে কারবালার ঘটনা পর্যালোচনা করা আমাদের জন্য অতীব প্রয়োজন। সেখানে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তার পরিবারের ১৯ সদস্য সহ প্রায় ৫০ জন সংগী নিয়ে উবাইদুল্লাহ বাহিনীর আক্রমনের শিকার হয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন। শহীদ হন তার পরিবারের দুগ্ধ পোষ্য শিশু, কিশোর ও মহিলা সহ অনকেই। ইমাম হুসাইন (রা.) কারবালায় যুদ্ধ করতে যান নি।

 তিনি কুফার লোকদের আহ্বানে সাড়া দিতে, মুসলিম বিশ্বের খিলাফতের দায়িত্ব (ইয়াজিদ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি) নিতে। যদিও মক্কা মদীনার অনেক বিচক্ষণ সাহাবী ইমাম হুসাইনকে কুফায় যেতে নিষেধ করে বলেছিলেন যে, কুফার লোকজন বিশ্বাস ঘাতক তারা আপনার বিপদে সরে দাঁড়াবে। কিন্তু তিনি ইসলামি আইনের মূল উৎস বিষয়ক সুত্র ‘আযীমাত প্রতিষ্ঠা’ তথা একটা উত্তম কাজ করার জন্য কুফায় গিয়েছিলেন। তার শহিদ হওয়ার জন্য কোন সাহাবীকে দায়ী করা যাবে না।

এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মত। আহলে বাইত কে মহব্বত করা ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের কষ্টে আমরা ব্যথিত। তাদের যারা কষ্ট দিয়েছে আমরা তাদেক ঘৃণা করি। তবে আশুরার দিনে শোক, মাতম, তাজিয়া ইত্যাদি ইসলাম বিরোধী কর্ম। ইমাম হুসাইনের শত্রুরা মাত্র ৪ বছরের মধ্যে নির্মূল হয়ে যায়। এরপর কোন দিন তাদের বংশে কেউ শাসক হয়নি। মহান আল্লাহ আমাদেক তার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
লেখক : খতীব, উপশহর জামে মসজিদ, বগুড়া।
ও ইমাম, মদীনা মসজিদ কালিতলা হাট,
বগুড়া।
০১৭১২-৫১৪৪৭৮

এই বিভাগের আরো খবর

শিক্ষা ক্যাডারে অস্বস্তি : সমস্যা ও সমাধান

মোঃ শওকত হোসেন :বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ২৮টি ক্যাডারের  মধ্যে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অন্যতম । সদস্য সংখ্যায় সবচেয়ে বৃহৎ ক্যাডার হলেও নানা কারণে জন্মলগ্ন হতেই এই ক্যাডারটি অবহেলা আর অমর্যাদায় বেড়ে উঠেছে। নানা প্রতিকূলতা অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিস হতে সুযোগ সুবিধা মর্যাদার ক্ষেত্রে তুলনামূলক পিছিয়ে দিয়েছে। বৃহৎ ক্যাডার হওয়া সত্ত্বেও কাঙ্খিত জব সেটিসফেকশন না থাকায় এই ক্যাডারের কর্মকর্তারা জনসেবায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারছেন না। অফিস, ক্লাসরুম  ছেড়ে অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় মাঠে, রাস্তায় আর আদালতে দাঁড়াতে হচ্ছে  প্রতিনিয়ত। ফলে কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ ও জাতি। ক্যাডার সার্ভিসের সদস্য হিসেবে এটি অসম্মানেরও বটে। দেশের স্বার্থে, জনসেবার স্বার্থে এই বৃহৎ ক্যাডারটিকে তার যথাযথ  অধিকার ও মর্যাদা দিয়ে কাজে লাগাতে পারলে সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নে সর্বাধিক সক্রিয় ভুমিকা রাখবে বলে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।


শিক্ষা ক্যাডারে আছি বলেই এ ক্যাডারের সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার ও ভাবার সুযোগ পেয়েছি। আমার দৃষ্টিতে শিক্ষা ক্যাডারে অস্বস্তির  সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক কিছু কারণ বিদ্যমান। ক্যাডার সার্ভিস হওয়া সত্বেও শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য ওয়ারেন্ট অব পিসিডেন্সে কোন অবস্থান নির্দিষ্ট করা নেই,  বদলি/ পদায়নের কোন সুনির্দিষ্ট বিধান কার্যকর নেই, পদোন্নতিতে চলছে চরম হযবরল অবস্থা। আর শিক্ষা ক্যাডারের জন্য “অবকাশ বিভাগ” শব্দটি এ সময়ের সবচেয়ে বড় কৌতুক। অবকাশ যাপনের সুযোগ নেই কিন্তু  নামে অবকাশ বিভাগ। সরকারের অন্য বিভাগগুলি সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করেন দুই দিন। অথচ শিক্ষা ক্যাডারের কলেজ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সেটি একদিন।  আরেকটি অবকাশ বিভাগ হিসেবে বিচার বিভাগের সাথে তুলনা করলে আরো করুণ চিত্র ফুটে উঠবে। গ্রীষ্মকালীন অবকাশ, শীতকালীন অবকাশ, রমজান মাসের অবকাশ যাপনের বিধান কিতাবে থাকলেও বাস্তবে সুযোগ নেই। বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এসব অবকাশের মধ্যে শিক্ষাবোর্ড, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সমুহের কারণে এসব ছুটি ভোগের কোন সুযোগ পান না তাঁরা । ফলে অধিকার বঞ্চিত হয়ে ক্যাডার কর্মকর্তাদের মাঝে চরম হতাশা ও অস্বস্তি জমে আছে । অথচ ক্যাডারটিকে অবকাশ বিভাগ থেকে মুক্তি দিলেই সমস্যা চুকে যায়। অন্য ক্যাডারের মতো বদলি প্রক্রিয়া কার্যকর করা কর্তৃপক্ষের জন্য নস্যি। ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বিধি মোতাবেক যোগ্যদের পদোন্নতি দিলেই এ অস্বস্তি কেটে যায় নিমেষেই। সরকারের একটি সিদ্ধান্তেই ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে কাঙ্খিত অবস্থান পেয়ে সম্মানজনক অবস্থানে থাকতে পারে ক্যাডারটি।   


এবার আসি অস্বস্তির মূল কারণে। ক্যাডারটির জন্য “মরার উপর খাড়ার ঘা” হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্তীকরণ সমস্যা। ক্যাডার সার্ভিসে আত্তীকরণ এক চরম অন্যায় ও অবিচার। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত যুদ্ধবিধবস্ত দেশে এমন একটি সুস্থ ও সুন্দর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সিভিল সার্ভিসকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন  যারা বিশ্বমানের সক্ষমতা সৃষ্টি, দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত সরকারি নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে স্বাধীন ও সার্বভৌমভাবে নব প্রতিষ্ঠিত দেশের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণে সক্ষম হবে। এ জন্য ঞযব ঝবৎারপবং (জবড়ৎমধহরুধঃরড়হ ধহফ ঈড়হফরঃরড়হং) ঙৎফরহধহপব, ১৯৭৫ নামে ১৯৭৫ সালে ঢঢওও নং অধ্যাদেশ জারি করেন। পরবর্তীতে এটি পার্লামেন্টে উত্থাপন করেন এবং ঞযব ঝবৎারপবং (জবড়ৎমধহরুধঃরড়হ ধহফ ঈড়হফরঃরড়হং) অপঃ ১৯৭৫ নামে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে পাস হয়। এ আইনের ৪নং অনুচ্ছেদ বলে ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে ১৯৮০ সালে তৎকালীন সরকার ১৪টি ক্যাডার সৃষ্টি করে ঞযব ইধহমষধফবংয ঈরারষ ঝবৎারপবং (জবড়ৎমধহরুধঃরড়হ) ঙৎফবৎ, ১৯৮০ জারি করেন।  সংশোধনীর মাধ্যমে ক্যাডার সংখ্যা ৩০ এ উন্নীত করা হয়। একটি ক্যাডারের ধরণ, পদের ধরন ও পদ সংখ্যা নির্দিষ্ট করার জন্য প্রত্যেকটি ক্যাডারের জন্য একটি করে ক্যাডার কম্পোজিশন রুল প্রণয়ন করে ০১/০৯/১৯৮০ তারিখেই তা জারি করা হয়। এর মধ্যে বিসিএস সাধারণ শিক্ষার জন্য প্রযোজ্য  রুলটি হলো ঞযব ইধহমষধফবংয ঈরারষ ঝবৎারপব (ঊফঁপধঃরড়হ : এবহবৎধষ ঊফঁপধঃরড়হ) ঈড়সঢ়ড়ংরঃরড়হ ধহফ ঈধফৎব জঁষবং, ১৯৮০। সর্বমোট-১০১৮টি পদ নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও  এই ক্যাডার রুলে সিএসপি ও ইপিএস ক্যাডারে স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সরাসরি অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি নতুন জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়।


ক্যাডারে বা ক্যাডার পদে জনবল ঢোকার স্বীকৃত নিয়মিত উপায় ২টি হলোঃ ১. সরাসরি নিয়োগ ও ২. পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ।  ১৯৮১ সালে বিসিএস ক্যাডার পদে নিয়মিত নিয়োগের জন্য সরকার ঞযব ইধহমষধফবংয ঈরারষ ঝবৎারপব জবপৎঁরঃসবহঃ ৎঁষবং, ১৯৮১ এটি সব ক্যাডারের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। এই রুলসেও নিয়োগের ধরণ ৃবলা হয়েছে ২টি  ১। ধারা ৪ এ সরাসরি নিয়োগ   ২। ধারা ৫ এ পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ। জনবল নিয়োগের কাজটি করে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ঞযব ইধহমষধফবংয চঁনষরপ ঝবৎারপব ঈড়সসরংংরড়হ (পিএসসি)। বিসিএস ক্যাডারে সরাসরি নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের একমাত্র বৈধ উপায় হলো বিসিএস পরীক্ষা এবং যেটি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য ১১/০৫/১৯৮২ তারিখে ইঈঝ (অমব, য়ঁধষরভরপধঃরড়হ ্ ঊীধসরহধঃরড়হ ভড়ৎ ফরৎবপঃ ৎবপৎঁরঃসবহঃ) জঁষবং, ১৯৮২ নামে সরকার কর্তৃক একটি পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা বিধিমালা প্রণীত হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য বিধি মোতাবেক প্রিলিমিনারী, লিখিত, মনস্তাত্ত্বিক, মৌখিক ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা যোগ্য বিবেচিত হলে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে।
লক্ষ্য করুন,   

প্রথমত ঃ ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস ১৯৮০ ধারা ৬  এ নিয়োগের ধরন বলা হয়েছে ২টি   ১। সরাসরি নিয়োগ  ২। পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ। আবার ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট রুলস ১৯৮১ তে নিয়োগের ধরন বলা হয়েছে ২টি  ১। ধারা ৪ এ সরাসরি নিয়োগ  ২। ধারা ৫ এ পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ।
দ্বিতীয়ত ঃ সরকার কলেজ জাতীয়করণ করলে ১৯৮১ জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের জন্য একটি বিধি তৈরি করে যেটা ঞবধপযবৎং ধহফ ঘড়হ ঞবধপযরহম ঝঃঁভভ ড়ভ ঘধঃরড়হধষরংবফ ঈড়ষষবমবং অনংড়ৎঢ়ঃরড়হ জঁষবং, ১৯৮১ নামে পরিচিত। এই বিধিতেও জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডার ভূক্ত করার কোন সুযোগ নেই। তাদেরকে কলেজ জাতীয়করনের তারিখ হতে চাকুরী গণনায় সিনিয়রিটির বিষয় উল্লেখ আছে সেটাও তাদের মধ্যে।

তৃতীয়তঃ ১৯৯৮ সালে জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের জন্য ঞবধপযবৎং ধহফ ঘড়হ-ঞবধপযরহম ঝঃঁভভ ড়ভ ঘধঃরড়হধষরংবফ ঈড়ষষবমবং অনংড়ৎঢ়ঃরড়হ জঁষবং, ১৯৮১ বাতিল করে স্বপদে আত্তীকরণ বিধিমালা ১৯৯৮ প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিতেও জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের তারা অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ/যে যে পদেই থাকবেন সে পদে আত্তীকরণ করা হয় কিন্তু ক্যাডারভূক্ত করার কোন সুযোগ নেই। চতুর্থত ঃ ২০০০ সালে জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের জন্য জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষক অশিক্ষক কর্মচারি আত্তীকরণ বিধিমালা ২০০০ নামে একটি বিধি প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিতে একটি তেলেসমাতি ধারা ৯ (২) সংযোজন করা হয় যেখানে আত্তীকরণ বিধি ১৯৯৮ প্রণয়নের সময় বাতিলকৃত বিধি ঞবধপযবৎং ধহফ ঘড়হ ঞবধপযরহম ঝঃঁভভ ড়ভ ঘধঃরড়হধষরংবফ ঈড়ষষবমবং অনংড়ৎঢ়ঃরড়হ জঁষবং, ১৯৮১ এর জ্যেষ্ঠতা ও আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয় এবং  ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস ১৯৮০ ও ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট রুলস ১৯৮১ এর পরিপন্থীভাবে তাদেরকে ক্যাডারভূক্ত করা হয়। ফলে ওই সময়ে ২০০০ বিধিতে নিয়োগ প্রাপ্ত হলেও ১৯৮১ বিধিতে সুবিধা দিয়ে পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ প্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তাদের উপরে সিনিয়রিটি দেয়া হয়েছে ফলে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তাদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে।

পঞ্চমত ঃ বর্তমান সরকারের বড় সাফল্যগুলোর অন্যতম একটি হলো জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এ বলা হয়েছে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীকরণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। এই নীতিমালায় জাতীকরণকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক/কর্মচারীদের চাকরি সংক্রান্ত বিধিমালা থাকবে যাতে কর্মকমিশন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়’ (জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০: অধ্যায় ২৭: শিক্ষা প্রশাসন: অনুচ্ছেদ-৮)। এটি জাতীয়করণকৃত  প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ক্যাডার বহির্ভুত রাখার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। কারণ কর্মকমিশন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অর্থাৎ বিসিএস থেকে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত রাখতে হলে জাতীয়করণকৃত  প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ক্যাডার বহির্ভুতই রাখতে হবে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও সরকারের এই মহৎ কর্মটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকরা বিসিএস পরীক্ষা না দিয়েই ক্যাডারভূক্ত অযৌক্তিক দাবি তুলছেন, যা কোন ক্রমেই কাম্য হতে পারে না।
 
মনে রাখা দরকার সরকারি চাকুরীতে আত্তীকরণ আর ক্যাডার সার্ভিসে আত্তীকরণ এক বিষয় নয়। আমরা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত কে স্বাগত জানাই। প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পর জনবল সরকারি চাকুরীতে আত্তীকরণ হতে পারে। মানবিক কারণে তাদের অর্থিক সুযোগ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। তবে ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট রুলস ১৯৮১ মোতাবেক পিএসসির মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন ব্যতিত ক্যাডার ভূক্তির কোন সুযোগ নেই। সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগ প্রাপ্তির সুনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি বিদ্যমান। ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগের জন্য সরকারি কর্মকমিশনের অধীনে লক্ষ লক্ষ প্রার্থীর মধ্য হতে প্রিলিমিনারী, লিখিত, মনস্তাত্ত্বিক, মৌখিক, স্বাস্থ্যগত ও নিরাপত্তাগত যাচাই বাছাইয়ের পর প্রকৃত মেধাবীদের কে ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।

 কিন্তু বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এসব অনুসরণ করেনা। তারাও আমাদের মতো বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য সাংবিধানিকভাবে অধিকারী ছিলেন। বেশির ভাগই বিসিএস পরীক্ষা দেবার যোগ্যতা হয়নি। যারা বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছেন তারা অংশগ্রহণ করে অনুত্তীর্ণ হয়েছেন অথবা প্রিলিমিনারীতেই বাদ পড়েছেন অথবা চূড়ান্তভাবে ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। শেষতক যেনতেন  প্রক্রিয়ায় একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষক তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। সরকরের জাতীয়করণের সিদ্ধান্তের সুযোগে তারা রাতারাতি ক্যাডার কর্মকর্তা হতে চাচ্ছেন। মেধার যথাযথ মূল্যায়ণ না করে ভিন্নপথে ক্যাডার ভুক্তির এই পথ এখনই বন্ধ করা না গেলে প্রকৃত মেধাবীদেরকে শিক্ষা ক্যাডার হতে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে। ফলে দেশের মান সম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করণের প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।  

সিভিল সার্ভিস হিসেবে সব ক্যাডারই সমান সুবিধা, সম্মান মর্যাদা পাবার অধিকারী। কিন্তু, তা না হওয়াতেই শিক্ষা ক্যাডার  কর্মকর্তারা দিন দিন তাদের প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, ফুঁসে উঠছে, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলন মুখী হচ্ছে। যেহেতু ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট রুলস, ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস অনুযায়ী ক্যাডারে আত্তীকরণের কোন সুযোগ নেই। ক্যাডার সার্ভিসের অন্য কোন ক্যাডারে এভাবে ক্যাডারভুক্ত করণের কোন নজির নেই। যেনতেন ভাবে এ ধরনের ক্যাডার ভূক্তি শুধু শিক্ষা ক্যাডার নয় গোটা ক্যাডার সার্ভিসের অমর্যাদা। আর এই প্রক্রিয়ায় ক্যাডারভুক্তকরণই শিক্ষা ক্যাডারে অস্বস্তির মূল কারণ।  সুতরাং ক্যাডার বৈষম্য দূরীকরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নির্দেশনা, অনুশাসন ও শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে কলেজ জাতীয়করণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কলেজ শিক্ষকদের কে ক্যাডার বহির্ভূত রেখে তাদের নিয়োগ, পদায়ন পদোন্নতির জন্য আলাদা সার্ভিস করাই এ সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ।
লেখক ঃ সহকারি অধ্যাপক (২৪তম বিসিএস)
সদস্য সচিব
ক্যাডার মর্যাদা রক্ষা কমিটি।
০১৭২৫-৪৪৯৯৮৭
 

এই বিভাগের আরো খবর