রাত ৪:০৮, বৃহস্পতিবার, ২২শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং
/ আইন-আদালত / ১২ ঘন্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান আশুলিয়ায় রাতভর গোলাগুলি দুপুরে ৪ জঙ্গির আত্মসমর্পন
গার্মেন্টসকর্মী পরিচয়ে বাসা ভাড়া নেয় তারা
১২ ঘন্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান আশুলিয়ায় রাতভর গোলাগুলি দুপুরে ৪ জঙ্গির আত্মসমর্পন
জুলাই ১৬, ২০১৭

ঢাকার আশুলিয়ায় নয়ারহাট চৌরাবাড়ি এলাকার একটি জঙ্গি আস্তানায় টানা ১২ ঘন্টা অভিযান চালানোর পর আত্মসমর্পন করেছে নব্য জেএমবির সরোয়ার তামিম গ্র“পের চার সদস্য। তারা হচ্ছেন- মোজাম্মেল, ওরফানুল, আলমগীর ও রাশেদুল নবী। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই বাড়ির মালিক ও পাশ্ববর্তী এক দোকান মালিককে আটক করা হয়েছে।  রোববার দুপুরে ওই জঙ্গিরা আত্মসমর্পন করে। র‌্যাব ক্যাম্পের মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে এমন জঙ্গি আস্তানা পেয়ে হতবাক র‌্যাবও।

আজাদ নাম জানিয়ে এক লোক গার্মেন্টকর্মী পরিচয় দিয়ে গত মাসে আড়াই হাজার টাকায় টিনশেডের ওই বাসা ভাড়া নেন বলে আটক বাড়ি মালিক ইব্রাহীম র‌্যাবকে জানিয়েছেন। অভিযান চলাকালে ওই আস্তানার এক কিলোমিটারের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের পর্যন্ত ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ওই আস্তানা থেকে দুটি পিস্তল, ৩টি তাজা বোমা, জিহাদি বই ও পনড্রাইভ উদ্ধার হয়েছে বলে র‌্যাব জানিয়েছে।

আত্মসমর্পণের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ওই বাড়িতে অবস্থান নিয়ে তারা বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছিল। ডগ স্কোয়াড দিয়ে তল্লাশি চালিয়ে ওই বাড়ির ভেতরে কয়েকটি আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) পাওয়া গেছে।  তা নিষ্ক্রিয় করেছে বোম ডিসপোসাল ইউনিট। ওই চার জঙ্গির পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, আত্মসমর্পণ করা সবাই সরওয়ার তামিম-গ্র“পের সদস্য।

হলি অর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ তামিম দ্বারীকে গত এপ্রিলে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়েছিলেন ঢাকার আশে-পাশে বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে জঙ্গিরা নাশকতার পরিকল্পনা করছে। মুফতি মাহমুদ বলেন, গত মাসে পোশাক শ্রমিক বলে ওই বাসাটি ভাড়া নেয় তারা। বাড়ির মালিক তাদের প্রতি সন্দেহ করলে র‌্যাবের কাছে যায়। এরপর র‌্যাব ওই বাড়িতে নজরদারি বাড়ায়। পরে গত শনিবার দিনগত রাত ১২টার দিকে ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলে র‌্যাব। অন্যান্য জঙ্গি অপারেশনের সঙ্গে এই অপারেশনের কোনো পার্থক্য আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই জঙ্গি অপারেশনে সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে। এভাবে অভিযান করা গেলে উদ্ধার করা জঙ্গিদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায় এবং অন্য অপারেশনের প্রস্তুতি নেওয়া যায়। এর আগে শনিবার রাতে বাড়িটি ঘিরে ফেললে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়ির ভেতর থেকে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে দুই দফায় কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে। এরপর র‌্যাব সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নিয়ে বাড়ির আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।

১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান : মুফতি মাহমুদ খান জানান, এপ্রিলের শেষ দিকে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্র“পের কয়েকজনকে আটক করার পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা জানতে পারেন, এই জঙ্গি দলের কয়েকটি গ্র“প দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়। এর সূত্র ধরে বিভিন্ন এলাকায় র‌্যাবের গোয়েন্দাদের নজরদারি বাড়ানো হলে আশুলিয়ায় এই বাড়ির সন্ধান মেলে। র‌্যাব-৪ এর একটি দল শনিবার রাত ১টার দিকে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। অভিযানের নেতৃত্বে থাকা র‌্যাব-৪ অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি লুৎফুল কবীর বলেন, শনিবার দিনগত রাত ৩টার দিকে বাড়ির ভেতরে থাকা ‘জঙ্গিরা’ র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে কমপক্ষে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এরপর রোববার সকাল ৬টার দিকে আবারও গুলি করে তারা। কয়েকটি বোমাও ছোড়া হয়। জবাবে র‌্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছোড়েন।

লুৎফুল কবীর জানান, বাড়ির ভেতরে থাকা জঙ্গিদের আত্মসম্পর্ণ করার জন্য হ্যান্ডমাইকে বেশ কয়েকবার আহ্বান জানানো হলেও তখন তারা সাড়া দেয়নি, বরং র‌্যাব সদস্যদের ‘তাগুতির দল’ আখ্যায়িত করে তারা গালিগালাজ করে। আশুলিয়া থানা পুলিশের একটি দলও সকালে ঘটনাস্থলে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের বাড়িগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। র‌্যাবের স্পেশাল ফোর্স ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে চূড়ান্ত অভিযানের প্রস্তুতি শুরু হয়। সকাল ৯টার পর র‌্যাবের একটি এপিসি ওই বাড়ির কাছাকাছি যেতে দেখা যায়। আকাশে একটি হেলিকপ্টারও চক্কর দিতে দেখা যায়।

বাড়ির ভেতরে থাকা ‘জঙ্গিদের’ উদ্দেশে হ্যান্ড মাইকে বলা হয়, বেলা ১২টার মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে র‌্যাব চূড়ান্ত অভিযানে যাবে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই বাড়ির দিক থেকে একটানা বেশ কিছুক্ষণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ আসে। এরপর ১২টার দিকে একজন বেরিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করে। মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘আত্মসমর্পণের পর সে জানায়, ভেতরে আরও তিনজন রয়েছে। কোনো নারী বা শিশু তাদের মধ্যে নেই। এরপর এক ঘণ্টার মধ্যে একে একে বাকি তিনজনও বেরিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল তাদের জীবিত ধরা, এ কারণে আমরা সময় নিয়েছি।’ র‌্যাব-৪ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর আবদুল হাকিম জানান, চারজন ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা সেখানে প্রবেশ করেন। পরে বিকাল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে এ অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। র‌্যাব-৪-এর এরিয়া কমান্ডার মেজর আব্দুল হামিদ বলেন, ‘জঙ্গি আস্তানায় তিনটি বোমা পাওয়া গেছে, যা নিষ্ক্রিক্রয়ও করা হয়েছে। ডগ স্কোয়াড দিয়ে আস্তানায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। তবে আর কিছু পাওয়া যায়নি। সেজন্য অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।’

 

 

এই বিভাগের আরো খবর



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top