সকাল ৬:০৯, বৃহস্পতিবার, ২৩শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / হাওরে কৃষকের সর্বনাশ : টেকসই পরিকল্পনা জরুরি
হাওরে কৃষকের সর্বনাশ : টেকসই পরিকল্পনা জরুরি
এপ্রিল ১৫, ২০১৭

আব্দুল হাই রঞ্জু : জয়বায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা, টর্নেডো, জলোচ্ছ্বাস এখন বাংলাদেশের নিত্যসঙ্গী।  আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, চৈত্র মাস এলেই তীব্র রোদের তাপদাহে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। অনেককেই বলতে শোনা যায়, চৈত্রের রোদে তাল পাকে। এবার সেই চৈত্রে মেঘের ঘনঘটা, অঝরে ঝরছে আকাশ, রোদের দেখা মেলাও এখন ভার। আবার কোন কোন দিন উত্তরাঞ্চলেও শীত পড়তে দেখা যায়। মনে হয়, শীতের সময় এখনও শেষ হতে অনেক বাকি।

 

এর মূলেই রয়েছে মনুষ্য সৃষ্ট প্রকৃতি বিধ্বংসী কর্মকান্ড। যার প্রভাবে তাবৎ দুনিয়া উষ্ণ হয়ে ওঠছে। ফলে প্রকৃতির ভয়াবহরূপ মানুষের স্বাভাবিক জীবন জীবিকা কিম্বা বসবাসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। জন্মসূত্রে আমার বসবাস কুড়িগ্রাম জেলায়। এ বছরের ফাল্গুনের শেষে গোটা কুড়িগ্রাম জুড়েই এমন ভারি শীলা বৃষ্টি হয়েছে, যা স্মরণকালের মধ্যে দেখা যায়নি। শীলের আকার ছিল অনেক বড় বড়। যে দৃশ্য যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বদৌলতে হয়ত অনেকের দেখারও সুযোগ হয়েছে। এত ভারি শিলা বৃষ্টি হয়েছে যার কারণে অনেকের ঘরের টিন জালের মতো ছিদ্র হয়েছে। এখনও কুড়িগ্রামের আকাশে মেঘের ঘনঘটা। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। রাত এলেই ঠান্ডা নেমে আসে। মনে হয়, এ য়েন নতুন রূপের কোন শীত মৌসুম।


 এ সময়টা গম কাটারও ভরা মৌসুম। মূলত চৈত্র মাসের রোদে গম শুঁকিয়ে মাড়াই করতে কৃষকের অনেক বেশি সুবিধা হয়। কিন্তু এবার রোদের অভাবে এবং অতি বৃষ্টির কবলে পড়ে গমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এরই মধ্যে আবার মানুষ সৃষ্ট অপকর্ম, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং যথাসময়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ এক বিপর্যয় ঘটে গেল হাওর অঞ্চল খ্যাত ৪টি জেলায়। যেখানে ধানের তিন মৌসুম আউশ, আমন ও বোরো এর মধ্যে শুধু সেচ ভিত্তিক বোরো ধানেরই আবাদ হয়। এ দিয়ে হাওর অঞ্চলের মানুষের সারা বছরের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়। অথচ সত্যিই বিনা মেঘে বজ্রপাতের ন্যায় উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল ও অবিরাম বর্ষণে বাঁধ ভেঙ্গে পানি হাওরে প্রবেশ করে নিমিষেই কৃষকের স্বপ্নের বোরো ধানের মাঠ তলিয়ে দেয়। হয়তো মহা এই বিপর্যয় না ঘটলে মাত্র ২/১ সপ্তাহের মধ্যেই পাকা ধান কাটার ধুম পড়ে যেত। বিশেষ করে গোটা দেশের মধ্যে হাওরের ধান অন্তত ১৫/২০ দিন আগেই কাটা পড়ে। ফলে এই অঞ্চলের ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে যখন ধান সংকটের কারণে চাল কলগুলো বন্ধ থাকে, তখন এই হাওরের ধান দিয়েই সংকট মোকাবেলা করা হয়। কিন্তু এ বছর প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও মনুষ্যসৃষ্ট দায়িত্বহীনতার কারণে শুধু হাওর অঞ্চলেই নয়, এর বিরূপ প্রভাবে গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু কেন এই অবস্থা? পাহাড়ি ঢল তো নতুন কিছু নয়, এটা চিরচেনা একটি বড় মাপের সমস্যা।


 যে সমস্যা সমাধানে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয় কিম্বা পানি উন্নয়ন বোর্ডের আগাম ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব থাকলেও তা যথাযথভাবে পালন না হওয়ায় ভংগুর দশা পানি রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে পানি ভিতরে সহজেই ঢুকে গেছে। জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সরকার কর্র্তৃক বরাদ্দকৃত অর্থে পানি উন্নয়ন রোর্ডের বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করার কথা। কিন্তুু এ বছর, ফেব্রুয়ারি মাসে বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু করা হয়েছে। সত্যিই এটা হাওর অঞ্চলের মানুষের দুর্ভাগ্য! অথচ এই হাওর অঞ্চলে বেড়ে উঠা অনেক রাজনীতিক আছেন, যাঁরা আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত। বিশেষ করে দেশের অর্থ ভান্ডার যাঁর হাতে নিয়ন্ত্রিত, তিনিও হাওর অঞ্চল খ্যাত পার্শ^বর্তী জেলার জন্মসূত্রে বাসিন্দা।

 

এরপরও কেন এবং কোন অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে বাঁধ সংস্কারে নিয়োজিত ঠিকাদারির প্রতিষ্ঠান কাজের অবহেলা করলো, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদঘাটন করে কর্তব্যের অবহেলার জন্য দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, তানা হলে ভবিষ্যতেও দায়িত্বহীনতার দরুন হাওর অঞ্চলের লাখ লাখ হেক্টর এক ফসলি জমির সেচভিত্তিক বোরো চাষাবাদকে নির্বিঘœ করা কঠিন হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের সুত্র মতে, এবার সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭১৪ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়।


 যা থেকে প্রায় ৩৫ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল। বোরো চাষাবাদের এসব জমির মধ্যে সিলেটে ৭৬ হাজার ৮৩৩ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ৫০ হাজার ৪৬৪ হেক্টর, হবিগঞ্জে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০০ হেক্টর ও সুনামগঞ্জে ২ লাখ ১৫ হাজার ৮১৭ হেক্টর জমিতে বোরো লাগানো হয়েছে। উল্লেখিত ৪ জেলায় ১১ লাখ ৮১ হাজার ১১৩ জন কৃষকের ভাগ্য নির্ধারণ ছিল। ছিল কৃষকের বুকভরা স্বপ্ন। ধার দেনা, ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণের বিনিময়ে চাষীরা ব্যয়বহুল সেচভিত্তিক চাষাবাদ করে থাকে।

 

আকস্মিক এ বিপর্যয়ের ধকল সামাল দেয়া কৃষকদের পক্ষে বড়ই কঠিন হবে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় বোরো চাষাবাদের পরিমাণ অনেক বেশি। মূলত এবার হাওর অঞ্চলগুলোর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার হাওরের বোরোর প্রায় সবটুকুই অথই পানিতে তলিয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলায় ৮০ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ পরিমাণকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন, হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’- এর আহবায়ক এ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু।


 তিনি বলেন, জেলার চার ভাগের মধ্যে ৩ ভাগ ফসল পানিতে ডুবেছে। বাস্তবে, যতদ্রুত সম্ভব সরকারের তরফে হাওর অঞ্চলের চার জেলার প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কারণ কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে কৃষকই অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। যারা খেয়ে না খেয়ে হাঁড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে চাষাবাদ করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। তাদের সর্বনাশ সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে ক্ষতিগ্রস্ত চাষীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

 

এজন্য ক্ষতিগ্রস্থ চার জেলায় কৃষি ঋণ, এনজিও ঋণ মওকুফ করে পুনরায় চাষাবাদের জন্য ঋণ মঞ্জুরীর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন পানি শুঁকিয়ে গেলে চাষীরা অন্যান্য চাষাবাদ করে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। ভাবনার বিষয়টি হচ্ছে, যেখানে হাওর অঞ্চলের বোরো চাষাবাদের উপর নির্ভর করে এসব এলাকার বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সারা বছরের অন্নের সংস্থান হয়, সেখানে প্রতি বছরই কম বেশি উজানের পানির ঢলে পানি রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে কৃষকের সর্বনাশ করে।

 

এ ঘটনা আকস্মিক নয়, কমবেশি বরাবরই ঘটে থাকে। তা সামাল দিতে সরকার কেন পরিকল্পিতভাবে টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করে এসব এলাকার চাষীদের সর্বনাশী উজানের ঢলকে প্রতিহত করার ব্যবস্থা নেয়া হয় না, যা আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা চাই, নদীর ভাঙন রোধে যেভাবে বড় প্রকল্প গ্রহণ করে ভাঙন প্রতিরোধ করা হয়, সেভাবেই হাওরে যেন কোন ভাবেই উজানের পানি ঢোকা কিংবা বৃষ্টির পানি ঢুকলেও তা সহজেই নিষ্কাশন করা যায়, সে ভাবেই মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। এর পাশাপাশি পানি সহনীয় বোরোর জাত উদ্ভাবন এবং স্বল্প সময়ে ধান পাকার মতো বীজও উদ্ভাবন করা জরুরি।


 তানা হলে হাওর অঞ্চলের একমাত্র বোরা ধান চাষাবাদকে নির্বিঘœ করা সম্ভব হবে না। অবশ্য এ ব্যাপারে সরকার গবেষণা খাতে এখন ব্যয় বরাদ্দও বৃদ্ধি করেছে। এমনকি ইতিমধ্যেই পানি সহনীয় কিছু কিছু ধানের জাতও উদ্ভাবন করেছে। কৃষি বিভাগকে এখন এসব নতুন জাতের ধানের চাষাবাদ নিশ্চিত করতে জন সচেতনতা বৃদ্ধি করে হাওর অঞ্চলের বোরো চাষাবাদকে নির্বিঘœ করতে হবে। যেন ভবিষ্যতে আর উজানের আকস্মিক পানির ঢলে হাওরের চাষীদের ভাগ্য না পোঁড়ে। সিলেটের উজানে ভারতের নদী। যদি ভারতে আগাম বন্যা কিম্বা বৃষ্টি হয়, তাহলে উজানের পানি নেমে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। এজন্য কুশিয়ারা সহ অন্যান্য নদীর উজানে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যারেজ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। যেন সহসাই উজানের পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তা না হলে এভাবে ভবিষ্যতেও কৃষকের কপাল পুঁড়বে উজানের পানির ঢলে। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বার প্রান্তে। যা সম্ভব হয়েছে, হাওর, বাওর অঞ্চলগুলোকে চাষাবাদের আওতায় আনার বদৌলতে।


 ফলে হাওর, বাওরের চাষাবাদকে নির্বিঘœ করা সম্ভব না হলে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেকাংশেই কঠিন হবে। পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, এ বছর হাওর অঞ্চলে যে ভয়াবহ পানি বিপর্যয় ঘটে গেল, তা মোকাবেলায় সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসমূহকে দুর্যোগ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় সহায়তাকে জোরদার করতে হবে। যেন ফসল হারানোর সমবেদনা ছুড়ে ফেলে চাষীরা আবার কোমর শক্ত করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে- এটাই দেশের সকল মানুষের প্রত্যাশা।   
  লেখক : প্রাবন্ধিক
০১৯২২-৬৯৮৮২৮



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top