সকাল ৯:৫৮, মঙ্গলবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ স্বাস্থ্য / হাঁটু ইন্জুরি
হাঁটু ইন্জুরি
এপ্রিল ৯, ২০১৭

ডা : এম নজরুল ইসলাম বকুল : আই, ডি, কে, কি?হাঁটু সন্ধি বা নী জয়েন্ট মানব শরীরে অন্যতম জটিল এবং প্রচন্ড ষ্ট্রেসফুল জয়েন্ট। এ জয়েন্ট ফিমার এবং টিবিয়ার হিন্জ-জয়েন্ট এবং প্যাটেলা ও ফিমারের মাঝে স্যাডল-জয়েন্ট এর সমন্বয়ে গঠিত “জটিল সাইনোভিয়াল জয়েন্ট।” বাইরে এবং ভিতরে মাংসপেশী লিগামেন্ট, অস্থি, সাইনোভিয়াস, ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট এবং সর্বোপরি মিনিস্কাসের বিশাল উপাদান নিয়ে এ জয়েন্ট গঠিত। যদি কোন কারণে এই সুগঠিত সন্ধির ভিতরে বাইরে লিগামেন্ট-মিনিস্কাস কিংবা অস্থি দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে ব্যথা সহকারে অস্বাভাবিক নড়াচড়া বা এ্যাবনরমাল মুভমেন্ট হয় তবে তাকে “ইন্টারন্যাল ডির‌্যাঞ্জমেন্ট অব নী” বা আই, ডি, কে বলে থাকে।
কারণ কি? হাঁটু সন্ধির সু-স্থিরতা নির্ভর করে:
(১) জয়েন্টের যান্ত্রিক অক্ষরেখার উপর। (২) অস্থি দ্বারা গঠিত মনোরোম কাঠামোর উপর। (৩) সন্ধির অন্ত:স্থ মিনিস্কাস এবং দুইটি ক্রুসিয়েট লিগামেন্টের অবিচ্ছিন্নতার উপর। (৪) সন্ধির বহিস্থ: শক্ত কাঠামো যেমন সাইনোভিয়াস ক্যাপসুল, কোলেটারাল ২টি লিগামেন্ট, মাংস দেশী ও টেনডনের উপর।
যে কারণে হাঁটুর ইঞ্জুরি হয়:
(১) খেলোয়াড়দের- ফুটবল খেলতে গিয়ে অর্ধ-ভাঁজ হাঁটুতে সরাসরি আঘাত কিংবা শট নিতে গিয়ে হাঁটু মোচড় খেলে। (২) এ্যাথলেটসদের: সরাসরি একজনের সাথে আরেকজনের আঘাত অথবা পরোক্ষভাবে হাঁটু মোচড় খেয়ে ঘুরে গেলে। (৩) সড়ক যান দুর্ঘটনায় সরাসরি ড্যাসবোর্ড ইনজুরি। (৪) উঁচু স্থান থেকে পড়ে গিয়ে হাঁটু ঘুরে গেলে।
এসব ক্ষেত্রে যেবাবেই হোক না কেন কোলেটারাল লিগামেন্ট মেডিয়াল অথবা লেটারাল, ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট এন্টেরিওর অথবা পোষ্টেরিয়র, কিংবা মিনিস্কাস মিডিয়াল অথবা লেটারাল, এমনকি প্যাটেলা, টিবিয়াল কন্ডাইল/ ফিমোরাল কন্ডাইল পর্যন্ত ভেঙ্গে যেতে পারে।

 

আজ আমরা হাঁটু ইঞ্জুরির মেকানিজম সহ কো-লেটারাল লিগামেন্ট নিয়ে আলোচনা করবো। অন্যান্য বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে আপনাদের জন্য তুলে ধরবো। নিম্নলিখিত কারণে এবং পদ্ধতিতে নী ইঞ্জুরি হয়। (১) হাঁটু ভাঁজ করা অবস্থায় শরীরের মধ্যখান থেকে দুরে গিয়ে ভিতরের দিকে ঘুরে গেলে অর্থাৎ এ্যাবডাকশন, ফ্লেকশন এবং ইন্টারন্যাল রোটেশন অব ফিমার যদি টিবিয়ার কন্ডাইলের উপরে হয়। সেক্ষেত্রে হাঁটুর ভিতরের পার্শ্বের অবকাঠামো যেমন মিডিয়াল কোলেটারাল লিগামেন্ট, মিডিয়াল ক্যাপসুল, মিডিয়াল মিনিস্কাস, আরো জোরের আঘাতে এ্যান্টেরিওর স্ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ইনজুরি হতে পারে।


(২) শরীরের মধ্যলাইনের কাছে এসে, হাঁটু ভাঁজ করা অবস্থায় বাইরের দিকে ঘুরে গেলে অর্থাৎ এ্যাডাকশন, ফ্লেকশন এবং এক্সটারনাল রোটেশন অব ফিমার যদি টিবিয়ার উপর ঘটে সেক্ষেত্রে লেটারাল হাঁটুর কাঠামো সমূহ যেমন- ফিবুলার কোলেটারাল লিগামেন্ট, লেটারাল ক্যাপসুল, আরকুয়েট কমপ্লেক্স, পপলিটিয়াস, ইলিও টিবিয়াল ব্যান্ড, বাইসেপসমাংস, কমন পেরোনিয়াল নার্ভ, এন্টেরিওর অথবা পোষ্টেরিওর অথবা উভয় ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ইঞ্জুরি হতে পারে।
(৩) হাইপার এক্সটেনশন ফোর্স অর্থাৎ হাঁটু সন্ধি যদি উপরের দিকে অধিক বাঁকানোর ফোর্স কাজ করে, সেক্ষেত্রে এন্টেরিয়র অথবা পোষ্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। (৪) সামনে পিছনে জোরে আঘাতের কারণে স্থানচ্যুত হলে সেক্ষেত্রে হাঁটুর এ্যান্টেরিয়র অথবা পোষ্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


কোলেটারাল লিগামেন্ট ইঞ্জুরি:
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আঘাতজনিত কারণে কোলেটারাল লিগামেন্ট ইঞ্জুরি হয়ে থাকে। তবে মিডিয়াল কোলেটারাল লিগামেন্ট বেশী পরিমাণে এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। কারণ ‘ভালগাস ষ্টেস’ অর্থাৎ খেলোয়াড়দের হাঁটুর বাইরের দিকে আঘাত প্রাপ্ত হয় পরস্পরের সংঘর্ষের কারণে। ভ্যারাস ফোর্স অর্থাৎ ভিতরের দিকে আঘাতের কারণে লেটারাল কোলেটারাল লিগামেন্ট ইঞ্জুরি হয়। কিন্তু আরেক পায়ের সাপোর্ট থাকায় লেটারাল কোলেটারাল লিগামেন্ট ইঞ্জুরি খুবই কম হয়।
শ্রেণীভাগ: আমেরিকান মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশনের মতে লিগামেন্ট ইঞ্জুরি তিন গ্রেডের: (স্প্রেইন) এবং (স্ট্রেইন)
(র) ডিগ্রী: ন্যূনতম ছিঁড়ে যায়, স্থানীয় ব্যথা থাকে, কোনরূপ সন্ধি অ-স্থিরতা থাকে না, সন্ধি সেপারেশন ৫ মি. মি. এর কম।
(রর) ডিগ্রী: মাঝারী রকমের ছিঁড়ে যায়, ব্যথা থাকে, সন্ধি সু-স্থির সন্ধি- সেপারেশন ৫০-১০ মি মি এর বেশী থাকে।
(ররর) ডিগ্রী: পুরাপুরি লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। সন্ধি অ-স্থিরতা উপস্থিত, জয়েন্ট সেপারেশন ১০ মি. মি. এর বেশী হয়।


লক্ষণ/ উপসর্গ:  যেহেতু মিডিয়াল কোলেটারাল লিগামেন্ট ইঞ্জুরি বেশী হয় এটা নিয়েই বলি। ভালগ্রাস এবং বাইরের দিকে ঘুরে গিয়েছে এরূপ একটা তথ্য রোগী দেয়। মারাত্মক আঘাতের ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা খেলতে গিয়ে সরাসরি হাঁটুতে আঘাতের ঘটনা বলে। অনেক সময় মিনিস্কাস কিংবা এ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ইঞ্জুরি থাকতে পারে। প্রচন্ড ব্যথা, সন্ধি: ফুলে যাওয়া এবং সন্ধিতে রক্ত জমা হওয়া দেখা যায়। চাপ দিলে টিবিয়াল কোলেটারাল লিগামেন্টের সংযোগ স্থলে জয়েন্ট লাইনে অথবা এ্যাডাক্টর টিউরাকলে ব্যথা অনুভূত হয়। ২০% ক্ষেত্রে প্যাটেলার লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া অথবা প্যাটেলা ভেঙ্গে যেতে পারে।
ক্লিনিক্যাল কিছু টেষ্ট: (ঈষরহরপধষ ঞবংঃ)
(১) এ্যাবডাকশন ষ্ট্রেস টেষ্ট +াব –মিডিয়াল কোলেটারাল ইঞ্জুরি। (২) এ্যাডাকশন ষ্ট্রেস টেষ্ট +াব -লেটারাল কোলেটারাল ইঞ্জুরি। (৩) পষ্টেরিয়ার ড্রয়ার টেষ্ট +াব –পষ্টেরিওর ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ইঞ্জুরি। (৪) এ্যান্টেরিয়ার ড্রয়ার টেষ্ট +াব –এ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ইনজুরি। (৫) ম্যাকমারি টেষ্ট +াব –মিনিস্কাস ইঞ্জুরি। (৬) ল্যাকমানস টেষ্ট +ঃাব –এ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ইঞ্জুরি।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা: এক্সরে: ষ্ট্রেস এক্সরে নী-এপি এন্ড লেটারাল ভিউ করলে অস্থি ভাঙ্গা আছে কিনা পাশাপশি লিগামেন্ট ইঞ্জুরি বোঝা যায়।
এমআরআই: পুরো সন্ধির সমস্ত কাঠামো সম্পর্কে ক্লিন কাট ধারণা পাওয়া যায়।
আর্থোসস্কোপি: এসিএল, পিসিএল, লেটারাল অথবা মিডিয়াল মিনিস্কাস ইঞ্জুরি পরিস্কার বোঝা যায়।


চিকিৎসা: জেনারেল প্রিন্সিপ্যাল: তাজা কেস অর্থাৎ ঘটনার পরপরই রোগী এলে (র) ¯েপ্রণ: ব্যথানাশক নন-ষ্টেরোয়েডাল এন্টি ইনফ্লামেটরী ওষুধ। -এন্টি আলসারেন্ট ওষুধ। -মাসল বিলাক্সান্ট ওষুধ। -এন্টি বায়োটিক ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। -পায়ের বিশ্রাম -৩ সপ্তাহ। (রর)  ¯েপ্রণ: হাঁটু ২০-৩০০ ফ্লেকশন অবস্থায় লংলেগ ব্যাক গ্ল্যাব দিয়ে অনড় রাখা হয় ৪-৬ সপ্তাহ। এর সাথে ১০ স্প্রেনের চিকিৎসা পাশাপাশি চলবে। (ররর)  ¯েপ্রণ: অপারেশন। অপারেশনের মাধ্যমে ছেঁড়া লিগামেন্ট রিপেয়ার করা হয়।
 দেরীতে যদি রোগী আসে, সেক্ষেত্রে রিকন্সট্রাকশন অপারেশন ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। লেটারাল কোলেটারাল লিগামেন্টের ইনজুরি হলে ফ্যাসা-ল্যাটা অথবা বাইসেপ মাসলের টেনডন দিয়ে রিকন্সট্রাকশন করা হয়। আর মিডিয়াল কোল্যাটারাল লিগামেন্টর ক্ষেত্রে হ্যামসষ্ট্রিং অথবা সেমিটেন ডিনোসাস টেনডন দিয়ে রিকন্সট্রাকশন করা হয়।
জটিলতা: হাঁটু একটি জটিল জয়েন্ট তাই এর ইনজুরিতে বড় ধরনের জটিলতা দেখা যায়। যেমন- জয়েন্ট ইন্ট্যাবিলিটি, জয়েন্ট ইফুসন ওষ্টিও আর্থ্রাইট্রিস ইত্যাদি।
কোলেটারাল লিগামেন্ট হোক সেটা লেটারাল কিংবা মিডিয়াল ইনজুরির সাথে সাথে চিকিৎসা করালে রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। তবে এসিএল, পিসিএল, মিনিস্কাস কিংবা ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট সহ ছিঁড়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব সার্জারী করাতে হবে নতুবা রোগীরা বড় ধরনের জটিলতায় পড়বে। তাই অপচিকিৎসা নয়, যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অর্থোপেডিক সার্জনের পরামর্শ গ্রহণের আবেদন রইল এবং আগামী দিন অন্যান্য লিগামেন্ট কিংবা মিনিস্কাস ইনজুরি সম্পর্কে লেখার আশা রাখি ইনশাআল্লাহ।



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top