দুপুর ১২:০৭, শনিবার, ২৫শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / স্বাধীনতা ও ইসলাম
স্বাধীনতা ও ইসলাম
এপ্রিল ২০, ২০১৭

মাহমুদ আহমদ : ইসলাম মানে শান্তি। ইসলাম চায় সকল মানুষ যেন শান্তিপূর্ণভাবে স্বাধীনভাবে স্ব স্ব ধর্ম পালন করতে পারে।  স্বাধীনতা মহান সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য এক বিশেষ নেয়ামত। ইসলামে স্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। স্বাধীনতার ইসলামী স্বরূপ হচ্ছে-মানুষ মানুষের গোলামি করবে না।

 

মানুষ একমাত্র তার সৃষ্টিকর্তার গোলামি করবে। আমাদের মাতৃভূমি বাংলাকে স্বাধীন করার জন্য ত্যাগ করতে হয়েছে অনেক কিছু, দিতে হয়েছে লাখ প্রাণের তাজা রক্ত। আল্লাহপাকের জমিনে তিনি পরাধীনতা পছন্দ করেন না। যেখানে স্বাধীন ভূখন্ড নেই সেখানে ধর্ম নেই আর যেখানে ধর্ম নেই সেখানে কিছুই নেই। তাই ইসলামে স্বাধীনতার গুরুত্ব অতি ব্যাপক। সৃষ্টির প্রতিটি জীব স্বাধীনতা পছন্দ করে। পৃথিবীতে এমন কোন জাতি বা জীব পাওয়া যাবে না যারা পরাধীন থাকতে চায়।


তাই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সবাই কতই না চেষ্টা-প্রচেষ্টা করে থাকে। আর এই স্বাধীনতার জন্যই মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে মক্কাকে করেছিলেন স্বাধীন। ইসলামের ইতিহাস পাঠে জানা যায়, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত নবীর আগমণ হয়েছে তারা সবাই সমাজ, দেশ ও জাতির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন। আর এই স্বাধীনতা অত্যাচারী শাসকের দাসত্ব থেকে জাতিকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রেই হোক বা ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে হোক।

 

এক কথায় বলা যায়, সব ধরণের দাসত্ব ও পরাধীনতা থেকে মুক্ত করাই হচ্ছে আল্লাহতায়ালার প্রেরিত নবীদের কাজ। আমরা জানি, গোলাম মুক্ত করে এবং সর্ব ক্ষেত্রে স্বাধীনতার জন্য যিনি আজীবন লড়াই করে গেছেন এবং শতভাগ সফল হয়েছেন তিনি হলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।


 তিনি হচ্ছেন স্বাধীনতার উজ্জল সূর্য। যাঁর কিরণ দূর-দূরান্তে বিস্তার লাভ করেছে, যিনি নিজের মাঝে সব ধরনের স্বাধীনতাকে ধারণ করেছিলেন। যিনি মানুষকে শুধু বাহ্যিক দাসত্ব থেকেই স্বাধীনতা দেননি, বরং সমাজ ও দেশ থেকে সব ধরনের নৈরাজ্য দূর করে সবাইকে করেছিলেন স্বাধীন। বিশ্বের এক বিশাল জনগোষ্ঠী অবলোকন করেছে, কিভাবে বিশ্বনবী (সা.) সর্বত্র স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।


 পরাধীনতার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য তিনি যেমন লড়েছেন তেমনি তিনি সকলকে করেছিলেনও স্বাধীন। কিন্তু এটি বড়ই পরিতাপের বিষয়, অনেক জাতি স্বাধীনতার প্রকৃত পতাকাবাহীদের অস্বীকার করে এবং সর্বোত্তম শাসকের (আল্লাহর) শাসনের ওপর জাগতিক শাসকের দাসত্বকে অগ্রাধিকার প্রদান করার ফলে তারা কেবল নিজেরাই প্রকৃত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়নি বরং বহু জাতি আল্লাহর আজাবগ্রস্ত হয়ে ধ্বংসও হয়ে গেছে।

 

একান্তই সত্য যে, বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ার কারণে স্বাধীনতা কেবল তাদের হাতছাড়া হয়নি বরং সে জাতির ইহ ও পরকাল উভয়ই ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রকৃতিগতভাবে আল্লাহপাক মানুষকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেক মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এটাই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আল্লাহতায়ালা সবাইকে বিবেক ও বিশ্বাসেরও স্বাধীনতা দিয়েছেন। কাউকে পরাধীন করেননি।

 

 যেভাবে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে ‘তোমার প্রভু-প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সবাই অবশ্যই এক সাথে ঈমান নিয়ে আসত। তবে কি তুমি মোমেন হওয়ার জন্য মানুষের ওপর বল প্রয়োগ করবে?’ (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৯৯)। এই আয়াত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে যে, আল্লাহ সবার স্বাধীনতা চান। তিনি চাইলে সবাইকে একসাথে মোমেন বানাতে পারেন কিন্তু তা তিনি করেননি। তিনি চেয়েছেন মানুষ যেন স্বাধীনভাবে বুঝে শুনে ঈমান আনে। স্বাধীনতাকে ইসলাম যেমন গুরুত্ব দিয়েছে তেমনি দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধকেও অতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং একে ঈমানের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহানবী (সা.)-এর হৃদয়ে স্বদেশ প্রেম যেমন ছিল তেমনি তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের মাঝেও বিদ্যমান ছিল।


 তিনি (সা.) মক্কা থেকে মদীনার পথে হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তাঁর মুখ ফেরালেন জন্মভূমি মক্কার দিকে, যেখানে তিনি নবুয়ত লাভ করেছেন এবং তাঁর পূর্বপুরুষরা বসবাস করে আসছেন। তিনি বার বার ফিরে তাকাচ্ছেন মক্কার দিকে, চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। মক্কার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন ‘হে মক্কা! তুমি আমার কাছে সমস্ত স্থান থেকে অধিক প্রিয়, আমি মক্কাকেই ভালোবাসি। আমার মন মানছে না। কিন্তু তোমার লোকেরা আমাকে এখানে থাকতে দিল না, সব কিছুর মালিক তুমি।

 

মক্কার মানুষদের ঈমানের আলোয় উজ্জল কর। ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত কর’ (মুসনাদ আহমদ ও তিরমিযি)। একটু ভেবে দেখুন! স্বদেশের প্রতি কতই না গভীর প্রেম ছিল তাঁর। যে দেশের লোকেরা তাঁর ওপর এতো জুলুম অত্যাচার করেছে তারপরেও মাতৃভূমির প্রতি কত অগাধ ভালোবাসা। একেই না বলে স্বদেশপ্রেম।

 

 দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌম রক্ষায় হজরত রসূল করিম (সা.) যখনই আহ্বান করেছেন তখনই সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বোতভাবে এ ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তারা জানতেন, নিজেদের বিশ্বাস, আদর্শ ও দ্বীন-ধর্মমত প্রতিষ্ঠার জন্য একটি স্বাধীন ভূখন্ডের প্রয়োজন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য তারা যেমন আন্তরিক ছিলেন, তেমনি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন দেশপ্রেম ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষায়। মাতৃভূমির প্রতি রসূল (সা.)-এর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখুন, হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি খায়বর অভিযানে খাদেম হিসেবে রসূল (সা.)-এর সাথে গেলাম।


 অভিযান শেষে রাসুল (সা.) যখন ফিরে এলেন, উহুদ পাহাড় তার দৃষ্টিগোচর হলো। তখন মহানবী (সা.) বললেন, এই পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও একে ভালোবাসি’ (বোখারি)। প্রিয় নবী (সা.) মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বাধীনতার চেতনাকে জাগ্রত করে, তাদেরকে মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয়, সম্মান, আত্মমর্যাদাবোধ প্রতিষ্ঠা করে দুনিয়ার ইতিহাসে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি যেমন অসংখ্য দাসকে নিজ খরচে মুক্ত করেছেন তেমনি সমগ্র বিশ্বকে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ।


 আল্লাহপাকের কাছে এ কামনা করি, আমাদেরকে যেন পুনরায় দাসত্বের জীবনে জড়িয়ে পরতে না হয়। নিজ দেশের প্রতি, দেশের সম্পদের প্রতি আমাদের অনেক বেশি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে হবে। আমরা যদি ঈমান দারির সাথে এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে নিজেদের স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করি তাহলে এটি অসম্ভব নয় যে, অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীকে আমরা ইনশাআল্লাহ পথনির্দেশনা দিব, আল্লাহপাক আমাদের সেই তৌফিক দান করুন।
 লেখক: ইসলামী গবেষক ও কলাম লেখক
masumon83@yahoo.com



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top