রাত ২:৪৫, শনিবার, ২৪শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং
/ রংপুর / শ্রদ্ধা জানাতে শোকার্ত মানুষের ভিড় এমপি লিটন হত্যা : চারদিনেও ক্লু পায়নি পুলিশ
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায় : কাদের সিদ্দিকী
শ্রদ্ধা জানাতে শোকার্ত মানুষের ভিড় এমপি লিটন হত্যা : চারদিনেও ক্লু পায়নি পুলিশ
জানুয়ারি ৩, ২০১৭

গাইবান্ধা জেলা ও সুন্দরগঞ্জ প্রতিনিধি : গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মো: মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডের চারদিনেও কোনো ক্লু খুঁজে পায়নি পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যায় হত্যার পর থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ২৭ জনকে আটক করে। তাদের সুন্দরগঞ্জ থানা হাজতে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে পাঠানো হয়।

এদিকে চারদিনেও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া পাঁচ যুবককে শনাক্ত ও তাদের গ্রেফতারসহ কোনো ক্লু উদঘাটন করতে না পারায় আওয়ামী লীগের দলীয় নেতা-কর্মীসহ সুন্দরগঞ্জ উপজেলাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে কি ধরনের অস্ত্র (পিস্তল) ও গুলি ব্যবহার করা হয়েছে তাও এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। এমনকি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা দুটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তাফা বলেন, সুন্দরগঞ্জ জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এলাকা। এখানে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। এর আগে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বামনডাঙ্গা ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যসহ ছয়জনকে হত্যা করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এছাড়া লিটন ছাত্রলীগ করার সময় গোলাম আযমকে সুন্দরগঞ্জে ঢুকতে দেননি। এ নিয়ে জামায়াত-শিবিরের সাথে তার একটা বড় জের ছিল। জামায়াত-শিবির পূর্বপরিকল্পিতভাবে লিটনকে হত্যা করেছে।
তিনি আরও বলেন, লিটন হত্যার চারদিনেও হত্যার ক্লু ও হত্যাকারীদের গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও তাদের ফাঁসির দাবি জানান তিনি। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে।

গাইবান্ধা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মো: রবিউল ইসলাম বলেন, হত্যার পর থেকে পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম হত্যাকারীদের শনাক্ত ও তাদের গ্রেফতার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে আটকদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে। পাশাপাশি হত্যায় অংশ নেয়া পাঁচজনকে শনাক্ত ও মোটরসাইকেল দুটি উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হত্যার সময় যে অস্ত্র ও গুলি ব্যবহার করা হয়েছে তার আলামত হিসেবে গুলির খোসা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে কি ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছে হত্যাকারীরা। হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদঘাটনে বেশ কয়েকভাবে তদন্ত চালানো হচ্ছে। তবে আশা করি, শিগগিরই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও সঠিক রহস্য উন্মোচন হবে।

সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের শাহবাজ মাস্টারপাড়া গ্রামের নিহত এমপি লিটনের যে বাড়িটি কর্মী সমর্থকদের আনা গোনায় এক সময় মুখর হয়ে থাকতো। সেই বাড়িটির  সুনসান নিরবতার মাঝেও এমপি লিটনের কবর জিয়ারত করতে এবং তাকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা শোকার্ত মানুষের ভীড় বাড়ছে। গোটা বাড়িতেই পুলিশ ও র‌্যাবের নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে বাড়ছে ছুটে আসা ভক্ত অনুরক্তের আহাজারি। গতকাল মঙ্গলবার এক শোকাবহ পরিবেশেই শোকে মুহ্যমান অসুস্থ স্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগ নেত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি সাংবাদিকদের সামনে বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তার বিবরণ তুলে ধরেন।

স্মৃতি জানান, বিগত ১৯৯৮ সালের ২৬ জুন সুন্দরগঞ্জ ডি ডাবি¬উ ডিগ্রি কলেজ মাঠে জামায়াত-শিবির আয়োজিত জনসভায় গোলাম আজমের বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। সেসময় স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের এই সভা পন্ড করে দিতে  মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ লিটন তার বন্দুক হাতে কর্মী সমর্থকদের নিয়ে ওই জনসভায় প্রবেশ করে গোলাম আজমকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়েন। এতে জনসভাটি পন্ড হয়ে যায়। ফলে সেই থেকে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বাহিনী লিটনকে যেকোন মূল্যে হত্যার টার্গেট করে রেখেছিল। সেসময় তার গুলিতে আহত জামায়াতের ফতেখাঁ গ্রামের ক্যাডার হেফজসহ আরও দুর্ধর্ষ জামায়াত ক্যাডাররা লিটনকে মোবাইল ফোনে ম্যাসেজ পাঠিয়ে এবং মোবাইলে করে দীর্ঘদিন থেকেই হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। লিটনকে ৩১ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় গুলি করে এই নির্মম হত্যা তারই জের বলে উল্লে¬খ করে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ওই গোলাম আজমের জামায়াত-শিবিরের খুনিরাই তার স্বামীকে হত্যা করেছে। তিনি মর্মান্তিক এই হত্যার বিচার চান এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

লিটনকে নিরস্ত্র করায় : ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর ভোরে শিশু শাহাদত হোসেন সৌরভকে গুলি ছোঁড়ার একটি পরিকল্পিত মিথ্যা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপি লিটনের লাইসেন্সকৃত রিভলবার ও শর্টগান জব্দ করে নেয়া হয়। খুনি জামায়াত-শিবির চক্র জানতো তার বাড়িতে তাদের প্রতিরোধ করার মত কোন অস্ত্র নেই। সেই সুযোগে তারা বাড়িতে এসে পরিকল্পিতভাবে খুনিরা তাকে হত্যা করতে সাহসী হয় বলে লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি জানান।

এমপি শ্যালক বেদারুলের বর্ণনা : ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এমপির শ্যালক সৈয়দ বেদারুল ইসলাম বেতার গতকাল সাংবাদিকদের কাছে তার মর্মস্পশী বর্ণনা দিয়ে কেঁদে ফেলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, যে দু’জন খুনি লিটনের সাথে কথা বলার অনুরোধ জানিয়ে তার সাথে ঘরে ঢোকেন তারা গিয়ে সামনের সোফায় বসে পড়েন। খুনি দু’জনার মুখ খোলা থাকলেও মাথা ও কান মাফলারে ঢাকা ছিল এবং তাদের পরণে ছিল কালো জ্যাকেট ও কালো প্যান্ট। তারা বহিরাগত ছিল না, কারণ তারা গাইবান্ধা এলাকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিল।

লিটন হত্যায় আটক আরও ৩ : লিটন হত্যা মামলায় গতকাল মঙ্গলবার আরও ৩ জনকে আটক করেছে সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশ। এ নিয়ে চারদিনে এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ মোট ২৭ জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। এদিকে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের খুঁজের বের করতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও মোবাইল ট্যাকিং করে নানা তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে।

কবর জিয়ারতে কাদের সিদ্দিকীর ক্ষোভ : কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গতকাল মঙ্গলবার তার দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে এসে এমপি লিটনের কবর জিয়ারত করেন। পরে লিটনের স্ত্রী এবং ঘনিষ্ঠ আর্ত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করে গভীর শোক জ্ঞাপন করেন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে ক্ষোভমিশ্রিত কন্ঠে বলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের মত সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্য যদি তার নিজ বাড়িতে নির্মমভাবে খুন হন, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? অথচ সরকার বলছেন, দেশে কোন সমস্যা নেই, অশান্তি নেই, আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নাকি অনেক উন্নত। তিনি এই নির্মম হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত খুনিদের খুঁজে বের করে ন্যায্য বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

গাইবান্ধায় বিক্ষোভ সমাবেশ : এমপি লিটন হত্যার প্রতিবাদের গাইবান্ধা শহর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে মঙ্গলবার স্থানীয় শহীদ মিনার চত্বরে এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবির মিলনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের হুইপ মাহাবুব আরা বেগম গিনি, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ-শামস-উল-আলম হিরু, সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক প্রমুখ। এদিকে সুন্দরগঞ্জ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। পরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা শহরের বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল চত্বরে এক প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া সুন্দরগঞ্জ ডি ডাব্লি¬উ ডিগ্রি কলেজের উদ্যোগে এক শোক সভা মঙ্গলবার দুপুরে কলেজ হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়। শোক সভায় অধ্যক্ষ এ.কে.এ.এম. হাবিব সরকার সভাপতিত্ব করেন।

উল্লেখ্য, গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন শনিবার সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জের নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে আশংকাজনক অবস্থায় দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। রাত সাড়ে ৭টায় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top