রাত ৪:০৬, বৃহস্পতিবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ জাতীয় / ‘শান্তি-নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও সুসংহত হয়েছে’
‘শান্তি-নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও সুসংহত হয়েছে’
সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৭

করতোয়া ডেস্ক : শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অবদান ও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও সুসংহত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এবারের অধিবেশনে আমি রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি এ সমস্যা সমাধানে মুসলিম বিশ্বসহ সবার সহযোগিতা কামনা করি। সামগ্রিকভাবে এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহেণের মাধ্যমে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অবদান ও ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল ও সুসংহত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা) নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানসহ সফর নিয়ে ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রী।

 ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে অংশ নিয়ে আমি সাধারণ বিতর্ক পর্ব, ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের উচ্চ পর্যায়ের সভাসহ সব দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে     ধরেছি। চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় বিশ্ব নেতারা আমাদের প্রশংসা করেছেন। স্থান ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণ এসব অসহায় ও নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের খাদ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের মানুষের এই উদারতা ও মহানুভবতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।’ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন এমন একটি সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মিয়ানমারে জাতিগত নিধন অভিযানের ফলে হাজার হাজার নিরীহ রোহিঙ্গা প্রতিদিন প্রাণভয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

 গত তিন সপ্তাহে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদের বেশিরভাগই নারী, শিশু ও বয়স্ক। আগে থেকেই চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ছিল। ফলে বর্তমানে মোট আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আমাদের দেশে অবস্থান করছে। এদের খাদ্য, বাসস্থান ও জরুরি সহায়তা সংকুলান এবং এদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন নিয়ে আমরা জটিল সংকটের মুখোমুখি। এ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রোহঙ্গা সমস্যা তুলে ধরা ও এর সমাধানে বিশ্ববাসীর সহযোগিতা নিশ্চিত করা ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক পর্বে অংশ নিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে যে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেছিলেন, সেই প্রস্তাবগুলোর কথাও বলেন তিনি।

 তুরস্ক ও ইরানের রাষ্ট্রপতিসহ মুসলিম বিশ্বের বেশ কয়েকজন নেতা ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের সভায় বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব দেশ বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সভায় আমি রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলমান নির্যাতন বন্ধে এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রর্ত্যাবতন নিশ্চিত করতে ওআইসির পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাই। এসময় বিশ্বজুড়ে কেবল মুসলমানরাই কেন শরণার্থী হচ্ছে তার কারণ অনুসন্ধান করতেও আমি ওআইসি নেতাদের অনুরোধ জানাই। ওই সভায় রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সব দেশের সম্মতিতে একটি ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়।’ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকের মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে জাতিসংঘের সংস্কার বিষয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের সভা, জাতিসংঘ মহসচিবের আমন্ত্রণে যৌন হয়রানি ও নির্যাতন রোধে উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক। দ্বিতীয় বৈঠকটিতে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীবাহিনীর সদস্য কর্তৃক যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে সহায়তা প্রদানের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে গঠিত ভিকটিম সাপোর্ট ফান্ডে এক লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বলেও জানান।

 প্রধানমন্ত্রী জানান, আইএলও ও ওইসিডি’র যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হাই-লেভেল ফলোআপ মিটিং অব গ্লোবাল ডিল ফর ডিসেন্ট ওয়ার্ক অ্যান্ড ইনক্লুসিভ গ্রোথ শীর্ষক বৈঠকে পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পখাতে শ্রম অধিকার রক্ষা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়ন সংক্রান্ত গ্লোবাল ডিল ইনিশিয়েটিভ বাস্তবায়নের সরকারের উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়ে জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে সরকারের নেওয়া বহুমুখী উদ্যোগগুলোর কথা তুলে ধরেন। একই দিনে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আমন্ত্রণে পরিবেশ বিষয়ে একটি গ্লোবার প্যাক্ট গ্রহণের লক্ষ্যে আয়োজিত একটি শীর্ষ সভায় জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ উন্নয়ন বিষয়ে সরকারের গৃহীত উদ্যোগ তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী ২০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে এসডিজি বিষয়ে দুইটি উচ্চ পর্যায়ের সাইড ইভেন্ট আয়োজনের কথাও জানান তিনি। একইদিন দুপুরে বিজনেস কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের (বিসিআইইউ) উদ্যোগে আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

 এ সভায় অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের তিনি বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিত ও সম্ভাবনা বিষয়ে অবহিত করেন এবং বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। বৃহস্পতিবার বিকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে গঠিত পানি বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘সাধারণ বিতর্ক পর্বের বক্তৃতায় রোহিঙ্গা সমস্যা ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রগতির বিষয়গুলো তুলে ধরেছি। আপনারা জানেন, এ বছরের এপিলে আমাদের জাতীয় সংসদ ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্ক পর্বের বক্তৃতায় একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়েছি। বিশ্ব শান্তিতে বাংলাদেশের অবদানকে সংসহত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের পিস বিল্ডিং ফান্ডে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১ লাখ ডলার অনুদান দেওযার ঘোষণা দিয়েছি। এছাড়া, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গত ৭ জুলাই পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি গ্রহণ করে। নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে আমাদের নীতিগত অবস্থানের কারণে আমরা এই চুক্তিতে সই করেছি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষে এবারের অধিবেশনের এই চুক্তিটিতে সই করেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে সাইডলাইনে আমি বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছি। জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার আমরা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছি। বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি এ সমস্যা রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমি মহাসচিবকে অনুরোধ জানিয়েছি। রোহিঙ্গা বিষয়ে তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, এজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। মিয়ানমারের শিগগিরই ফ্যাক্ট ফাইন্ডং মিশন পাঠানোর অনুরোধ জানাই। এছাড়া ভুটানের প্রধানমন্ত্রী, নেদারল্যান্ডেসর রানি, এস্তোনিয়া প্রেসিডেন্ট, কসোভোর প্রেসিডেন্ট, নেপালের প্রধানমন্ত্রী, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আন্তির্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মহাপরিচালক, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক এবং আইবিএমের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।’



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top