সকাল ৯:৫৫, মঙ্গলবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ সাহিত্য / শহীদের দেয়া সেই শার্ট
শহীদের দেয়া সেই শার্ট
মার্চ ২৬, ২০১৭

ফজলে রাব্বী দ্বীন: মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল রাফির। দরজার বাইরে পায়ের টুংটাং শব্দ। এত রাতে আবার ওখানে কে এল? চোর কি হবে? টর্চ হাতে নিয়ে সন্দিহান রাফি এগিয়ে চলল দরজার বাইরে। আস্তে করে দরজাটা খুলতেই অন্ধকারে জ্বোনাক পোকার মত কিছু একটা তার নজর কাড়ল।

 

পোকাটা দেখতে এতটাই সুন্দর যে রাফি আর সহ্য করতে পারল না। দ্রুত সেটাকে ধরার জন্য পোকার পিছন পিছন ছুটতে লাগল। বাঁশবাগানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে প্রায়। এমন সময় কোথা থেকে যেন দাদু এসে হাজির। পিছন থেকেই তার কাধে হাত রাখল যেই, অমনি বুকটা ধুক করে উঠল রাফির।
‘এতরাতে এখানে কি করছ দাদুভাই? জান না জায়গাটা ভালো না?’


‘কেন দাদু, ঘর থেকে উঠোনে আসা বারণ নাকি? আর আমিতো উঠোনের মধ্যেই ঐ জ্বোনাক পোকাটাকে ধরার জন্য দৌড়াদৌড়ি করছি।’
‘উঠোনের মধ্যে মানে? তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে দাদুভাই? দেখছ না এটা বাঁশবাগানের তলা। উঠোন ছেড়ে প্রায় পঞ্চাশ হাত দূরে চলে এসেছ। আর কখনই এই মাঝরাতে একা বাইরে বের হবে না। এটা হচ্ছে গ্রাম। তোমাদের মত শহর না। আর কোন কিছুর জন্য দরকার পড়লে আমায় ডাক দিবে। আমি সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিব।

দাদুর কথা শুনে রাফি রীতিমত চমকে উঠে। অনেক দিন পর তার বাবা-মা তাকে গ্রামে আসতে দিয়েছে। পরিক্ষা শেষে মাত্র কয়েকটা দিন ভালোভাবে যেন কাটে সেই প্রত্যাশায়। গ্রামের সবুজ শ্যামল সুন্দর পরিবেশ রাফির হৃদয়টাকে একেবারে সজীব করে তোলে। কিন্তু এইবার গ্রামে এসে কেমন যেন সবকিছুই উলট পালট লাগছে। মাঝরাত্রে কেন যে সে ঘরের বাইরে চলে এসেছিল তা কে জানে!


পরের দিন ঠিক একই সময়। রাত যখন গভীরে গিয়ে পৌঁছে রাফির তখন ঘুম ভেঙ্গে যায়। দরজার বাইরে কারও পায়ের খটখট শব্দ ভেসে আসে কানে। পায়ের শব্দ শুনে রাফি একদমই ঠিক থাকতে পারছে না। তাকে যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত সেই শব্দ কাছে টানতে চায়।

 

ইচ্ছে করছে দাদুকে ডাক দিতে। কিন্তু পারছে না কিছুতেই। সটাৎ করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় রাফি। তারপর টর্চ ছাড়াই দরজার বাইরের দিকে হাঁটতে থাকে। আবারও সেই সুন্দর জ্বোনাক পোকাটাকে ধরার নেশায় দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। ধীরে ধীরে পৌঁয়ে যায় সেই বাঁশবাগানের তলায়।

 রাফির হঠাৎ সেন্স ফিরে আসে। চারদিকে লক্ষ করে সে বুঝতে পারে কোথাও হয়ত একটা ভুলের শিকার হতে যাচ্ছে। না হলে কেন সে এই অন্ধকারে একা একাই এখানে আসবে? ভয়ে ঠকঠক করে সারা শরীর কাঁপছে। এমন সময় সেই জ্বোনাক পোকাটার দিকে চোখ গেল রাফির।

 

জ্বোনাক পোকাটা আস্তে আস্তে মানুষে রূপান্তরিত হচ্ছে। ঠান্ডা শীতল রাত্রিতে শরীর বেয়ে ঘাম নামা কি আর নির্ভয়ে কচুশাখ তোলা মানে? রাফির দু’পাটি দাঁত যেন চিরতরে লৌহের দন্ডের মত লেগে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় রূপান্তর হওয়া পূর্ণাঙ্গ একটা মানুষের মুখ থেকে কথা বের হল, ‘ভয় পেও না বন্ধু। আমি তোমার কোনই ক্ষতি করব না। আমার একটা উপকার করার জন্য তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি।


মানুষটার কথা শুনে রাফির চিন্তা কিছুটা দূর হলেও ভয় কমছিল না। কাপা গলায় দু’একটা কথা সেও বলল, ‘কিন্তু আপনি কে? ভূ..ভূ..ভূ…’
‘না, আমি ভূত নই। তবে তোমার মত জ্যান্তও নই। আমি শহীদ হয়েছিলাম সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। নিজের দেশকে বাঁচানোর জন্য স্বাধীনতার লাল পতাকা নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিলাম এইদিক দিয়ে। আর এই এখানেই, এই বাঁশবাগানের তলাতেই আমাকে ঐ ঘাতক নরপিশাচ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা গুলি করে মেরেছিল।

 

আমি শহীদ হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু আমি আমার ছোট্র ছয় বছরের সোনামানিক ছেলেটাকে আর দেখতে পাইনি। দেখার বড্ড শখ ছিল। আমার স্ত্রী জমেলা আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে দিত না। কিন্তু আমি ভাবতাম, আমরা যদি বসে থাকি তাহলে এই দেশটাকে স্বাধীন করবে কে? কিভাবে অর্জিত হবে স্বাধীনতা?


‘এখন আপনার ছেলেটা কোথায়?’ কথার মাঝে টুপ করে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে রাফি। চাঁদের আলোয় সবকিছু দিনের মত পরিষ্কার লাগছে।‘ঐ যে দূরে মাটির যে একটা ঘর দেখতে পাচ্ছ সেখানেই আমার ছোট্ট মানিক অতিকষ্টে বেঁচে আছে। তার দুটা পা নেই। মা-বাবার আদর পায়নি বাকি জীবন। আমার মৃত্যুর খবর শুনে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল আমার স্ত্রী। তারপর আর কোনদিন চোখ খুলে নি। তুমি আমার একটা উপকার করবে বন্ধু?’
‘হ্যাঁ করব, অবশ্যই করব। তার আগে বল আমাকে কি করতে হবে?’


‘তেমন কিছু না। শুধু এই ছোট্ট শার্টটা আমার ছেলেকে দিয়ে আসবে। তার জন্য একাত্তরের সময় বাজার থেকে কিনেছিলাম কিন্তু ঐ নরপিশাচদের জন্য আমার ছেলের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তুমি আমার এই উপকার করলে আমার আত্মাটা বড়ই শান্তি পাবে।রাফির ভয়ে কাপা শরীর এবার কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন দেওয়া একটা মানুষের মুখ থেকে এতগুলো কষ্টের ইতিহাস শুনে কিভাবে ঠিক থাকা যায়? প্রকৃত দেশপ্রেমের চিত্র তো ফুটে উঠে এখানেই। রাফি আর দেরী না করে শহীদ হওয়া মানুষটার কাছ থেকে ছোট্ট সেই শার্টটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়।


 এবার দূরের সেই মাটির ঘরটার দিকে ছুটতে থাকে। পিছন পিছন সেই মানুষটাও হেঁটে চলেছে। ভাঙ্গা দরজাটায় নক করার কোন প্রয়োজন পড়েনা। রাফি সোজাসোজি মাটির সেই ঘরটাতে ঢুকে পড়ে। ঘরের ভিতর ঢুকেই দেখে খুব কষ্টকাতর অবস্থায় একটা গরীব নিঃস্ব লোক বসে আছে। লোকটার চোখে নির্ঘুমের ছাপ। না জানি কত দিন ধরে অনাহারে কাটাচ্ছে বেচারা।

 রাফি চোখের জল আর ধরে রাখতে পারল না যখন পা হারা সেই লোকটার সামনে তারই বাবার দেওয়া ছোট্ট শার্টটা মেলে ধরল। শার্টটা দেখামাত্রই রাফির হাত থেকে খামচি মেরে সেটা বুকের ভিতর জড়িয়ে নিল লোকটা। তারপর হাউমাউ করে ‘বাবা..বাবা..’ বলে অঝরে কাঁদতে লাগল।

রাফির গ্রামে কাটানো দিনগুলো শেষমেষ সুমধুর হয়ে উঠেনি। একজন বীর শহীদের ছেলের জন্য মনটা তার সবসময় কেঁদেছে। সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতেও পেরেছে। পা হারা সেই লোকটাকে নিয়ে নতুন চিন্তার অধ্যায় শুরু করেছে। তাকে আগে শহরে ফিরে যেতে হবে।


 তারপর সংবাদ কর্মীদের মাধ্যমে সারাদেশে এই খবরটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর শহীদের ছেলে হয়েও আজ কেন তাকে পঁচে মরতে হচ্ছে সেই মাটির পরিত্যক্ত ঘরটায়? জবাব চাই, দিতে হবে জবাব। রাফির মনের মধ্যে অনেক অনেক প্রশ্ন। পরদিন গ্রাম ছেড়ে শহরে যাবার সময় একবার সেই মাটির ঘরটার দিকে হাঁটা দিয়েছিল রাফি। গিয়ে দেখে পা হারা সেই লোকটা তার বাবার মতন জ্বোনাক পোকা হয়ে সারা ঘরটাতে আলো ছড়াচ্ছে!



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top