ভোর ৫:১৭, শনিবার, ২০শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন ধর্মীয় অনুশাসন
জঙ্গিবাদ দমনে প্রয়োজন ধর্মীয় অনুশাসন
মার্চ ২০, ২০১৭

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন : বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ একটি প্রধান সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় সমস্যা। বিশ্বের দেশে দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ যেভাবে তার ডালপালা বিস্তার করছে এতে সামাজিক স্থিতি এক বিরাট হুমকির মুখে এসে পড়েছে। কোন মানুষই আর নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। সন্ত্রাসীদের কর্মকা  শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠিবিশেষকে কেন্দ্র করেই নয়, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোও সব সময় আতংকগ্রস্ত করে রাখে।


আমাদের মুসলিম বাংলাদেশ হচ্ছে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। বহুঘাত প্রতিঘাত লড়াই ও সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশ। যে দেশে দল, মত ও ধর্ম-বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকলের চিন্তা ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। এমন একটি দেশে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলে সন্ত্রাসী কর্মকা  পরিচালনা ছিল অকল্পনীয় ব্যাপার।

কারণ সত্য ও বাস্তব দিক হচ্ছে, যে দেশে চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে এবং জনগণের মাধ্যমে তাদের অধিকাংশের পছন্দ অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা ও সরকার বেছে নেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রয়েছে সে দেশে দাবি আদায়ের জন্য সশস্ত্র তৎপরতা জনগণের সমর্থন লাভ করতে পারে না। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান সহ ২৪ জনের মৃত্যু জাতিকে হতবাক করে দিয়েছে। গত ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার মত অচিন্তনীয় ঘটনাটিই সংঘটিত হলো। সেই সময় সারাদেশে ১৬১টি মামলা হয়েছিল। তার মধ্যে ১০২টির বিচার শেষ।

 ঝুলে আছে ৫৯টি মামলা। এতে ১৫ জনের মৃত্যুদন্ড আর ২৪৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে (দৈনিক ইত্তেফাক ১৭/০৮/২০১৬)। এছাড়াও ১ জুলাই-১৬, গুলশানে বিদেশী রেষ্টুরেন্টে হলি অর্টিজান হামলা, ৭ জুলাই শোলাকিয়ায় ঈদগাহে হামলা-২০১৬ সহ বিভিন্ন স্থানে অতর্কিত বোমা নিক্ষেপ জাতিকে হতবাক করে দিয়েছিল। অবশ্য এই উগ্র অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দেশের রাজনৈতিক অরাজনৈতিক, পেশাজীবী, নির্বিশেষে সকল ইসলামী মহল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এ সন্ত্রাসের বা জঙ্গিবাদের তীব্র নিন্দা করেন এবং সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, ইসলাম সন্ত্রাস সমর্থন করে না, সন্ত্রাস ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার পথ নয়। বাংলাদেশে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার দাবির নামে সাম্প্রতিককালে যে সন্ত্রাসী হামলা চলানো হয়েছে কোরআন ও হাদীসের দৃষ্টিতে তা জিহাদ পর্যায়ভূক্ত নয় বরং নিছক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড মাত্র। হযরত আবু সাঈদ খুদরী ও আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত মহানবী বলেন “আসমান ও যমীনের সমস্ত বাসিন্দাও যদি একজন মুমিনকে হত্যা করার ব্যাপারে শরীক থাকে তবে তাদের সবাইকে মহান আল্লাহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন”। (আত তিরমিজি-২৫৯)
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে ইসলামী দর্শন :


মহানবী (স:) অশান্ত পৃথিবীতে এসে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন একমাত্র ভালবাসা আর ক্ষমার মাধ্যমে। ক্ষমার মূর্ত প্রতীক ছিলেন তিনি, প্রাণের শত্র“কে তিনি ক্ষমা করতে দ্বিধাবোধ করেন নাই। মক্কা ও তায়েফ বিজয়ের সময় তিনি সে ক্ষমার আদর্শ দেখিয়েছেন। ইসলাম শান্তির ধর্ম, পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোন নজির নাই। এটা সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। ইসলাম শান্তির ধর্ম, পৃথিবীর শান্তি ও সৌহার্দ্য স্থাপনই এর লক্ষ্যে।

]উগ্রতা ও সন্ত্রাসের বিপরীত শব্দ। যে ধর্মের নামই শান্তি সে ধর্ম অশান্তি সৃষ্টিকারী বা সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গিবাদ গ্রহণ করতে পারে না বা করে না। সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা  এ ধর্মে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কারণ ইসলাম হচ্ছে সার্বজনিন ধর্ম। সেখানে উগ্রবাদের কোন স্থান নেই। তাই আল্লাহ বলেন “দ্বীন সম্পর্কে জোর জবরদস্তি নেই। সত্যপথ ভ্রান্তপথ হতে সুস্পষ্ট হয়েছে।

সুরা বাকারা-১৫৬মহানবী (স.) যে ধর্ম এনেছে তাতে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা নিষিদ্ধ। ইসলাম সকল মানবজাতিকে অখ  সমাজভূক্ত করেছেÑতাইতো মহান স্রষ্টা ঘোষণা করেছেন নিশ্চয়ই মানবজাতি এক অখ  সমাজ। (সূরা বাকারা-২১৩)


আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলা রাসূলে কারীম (সা:) কে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছিলেন শান্তির দূত হিসেবে। তিনি ছিলেন সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আপোষহীন। তিনি যুবক বয়সে সন্ত্রাস নির্মূল করে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে হিলফুল ফুজুল নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার জন্য উদ্যোক্তাদের সহযোগী হয়েছিলেন। এ সংগঠনের অন্যতম শর্ত ছিল: আল্লাহ্র কসম, মক্কা নগরীতে কারো উপর অত্যাচার করা হলে আমরা সবাই মিলে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যাচারিতকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাহায্য করবো-চাই সে উঁচু শ্রেণির হোক, না নীচু শ্রেণির, স্থানীয় হোক, বা বিদেশী। অত্যাচারিতের প্রাপ্য যতক্ষণ পর্যন্ত না আদায় করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এভাবেই থাকবো [দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ (ইফাবা, ১৯৮৭), ২য় খ  পৃ. ২২৮]। এভাবে মহানবী (স.) তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের জন্য মানব ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।

 একটি কথা না বললেই নয় তা হচ্ছে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ হচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা। ধর্মের অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার জঙ্গির অন্যতম কারণ। তাই ধর্মীয় অতুভূতি জাগ্রত করতে হবে সর্বত্র। একজন প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তি কোন অবস্থায় জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হতে পারে না। তার দ্বারা মানুষতো দূরের কথা বরং কোন প্রাণির ক্ষতি হবে না। আমি রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসাবে গত ৯ ফেব্র“য়ারি ২০১৭ পুরস্কার সনদ ও ক্রেষ্ট নেয়ার জন্য জাতীয় ইমাম সম্মেলন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রধান অতিথি হিসাবে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রতিটি মসজিদের ইমামদেরকে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোরআন হাদিসের আলোকে বক্তব্য প্রদানের আহ্বান জানান। কারণ ইমামদের কে আজও মানুষ সম্মান করে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দেশের আলেম ওলামা সহ সর্বস্তরের


মানুষ জোরালো ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে গুলশান, শোলাকিয়াসহ সব কয়টি জঙ্গী তৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালি ও জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। এজন্য দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে পুলিশ বাহিনী কে সাধুবাদ জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইজিপি এ.কে.এম. শহীদুল হক বলেন “জঙ্গীবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশের পুলিশ সফলতার বিষয়টি নিয়ে ইন্টারপোল সহ বিশ্বের অনেক দেশই সাধুবাদ জানিয়েছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমন পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্য দেশের অপরাধীরা আত্মগোপন করে থাকে এর মূল উৎপাটনের জন্য প্রয়োজন আন্ত:দেশীয় সহযোগিতা।

 (তথ্য: ১২ মার্চ ২০১৭ বাংলাদেশ প্রতিদিন) অবশ্য একারণে ইন্টারপোল ও বাংলাদেশ পুলিশের যৌথ উদ্যোগ গত ১২ মার্চ ২০১৭ থেকে ঢাকায় প্রথম বারের মত তিনদিন ব্যাপি চিফ অফ পুলিশ কনফারেন্স সফলভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে। আসলে সকল সমস্যা সমাধানের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। এ লক্ষে বাংলাদেশে অপরাধ দমনের জন্য কমিউনিটি পুলিশ এর মাধ্যমে পুলিশ ও জনতা যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বিপিএম এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তিনি ইতিপূর্বে বগুড়া জেলার প্রায় সব কয়টি থানায় সর্বস্তরের মানুষের সাথে সমাবেশ করেছেন। কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম বগুড়ার সভাপতি ও দৈনিক করতোয়া পত্রিকার সম্পাদক মোজাম্মেল হক ও সদস্য সচিব অধ্যক্ষ শাহাদৎ আলম ঝুনুর সফর সঙ্গী হিসাবে আমিও বেশ কয়েকটি সমাবেশে উপস্থিত থেকে কোরআন হাদীসের আলোকে বক্তব্য উপস্থাপন করেছি। মনে রাখতে হবে ধর্মীয় বিশ্বাসই মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পারে। ধার্মিক ব্যক্তি নিজ ধর্ম তো দূরের কথা অন্য ধর্মেরও ক্ষতি করতে পারে না।


এক বর্ণনায় এসেছে হযরত আবু বকর (রা.) বলেন রাসুল (স.) এরশাদ করেছেন “অভিশপ্ত সেই ব্যক্তি যে কোন মুমিনের ক্ষতি করে বা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে (তিরমিজি ১৯৪১) অন্য বর্ণনায় মহানবী (স.) বলেছেন সাবধান (জেনে রাখ) যে কেউ কোন জিম্মির (ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী কোন কাফের) প্রতি অবিচার করবে অথবা তার প্রাপ্য অধিকার কমিয়ে দেবে বা সামর্থ্যরে বাইরে কোন কাজ চাপিয়ে দিবে কিংবা তার আত্মিকতুষ্ট ব্যতিত তার সম্পদ ভোগ করবে। কিয়ামত দিবসে আমি তার প্রতিপক্ষ হয়ে তার অন্যায় অপরাধ প্রমাণ করব (আবু দাউদ ৩০৫২)

 
আসুন, আমরা দলমত নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে প্রতিরোধ করি এবং কুরআন ও মহানবী (সা.) এর শিক্ষার আলোকে আমরা একটি মানবতার চেতনায় সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাই। এগিয়ে যাই হককানি ওলী আওলীয়াদের উত্তম চরিত্র ও চেতনা নিয়ে। সন্ত্রাস নয়, ইসলামের মানবতাবাদী স্লোগানকে উজ্জীবিত করি। আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের সকল শুভ প্রয়াস কবুল করুন। আমীন!
লেখক ঃ ইসলামী গবেষক-কলামিষ্ট
সড়ংঃধশরস নড়মৎধ@মসধরষ.পড়স
০১৭১২-৭৭৭০৫৮



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top