সন্ধ্যা ৬:৪১, মঙ্গলবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
/ জাতীয় / গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে ভয়াবহ আগুন
২শ’ কোটি টাকার ক্ষতি * ‘ষড়যন্ত্র’ দাবি ব্যবসায়ীদের
গুলশানের ডিসিসি মার্কেটে ভয়াবহ আগুন
জানুয়ারি ৩, ২০১৭

রাজধানীর গুলশানে ডিসিসি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে  দেড় শতাধিক দোকান পুড়ে গেছে। দোকানদারদের দাবি এ অগ্নিকান্ডে ২শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। গত সোমবার রাতে এই আগুন লাগে। প্রায় ১৬ ঘন্টা পর  মঙ্গলবার সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে ফায়ার সার্ভিস জানায়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের উচ্ছেদ করতে একটি দু®কৃতিকারী মহল যড়যন্ত্রমূলকভাবে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া জানিয়েছেন, কীভাবে আগুন লেগেছে তা তদন্ত করবে পুলিশ। অন্যদিকে আগুনের ঘটনা তদন্তে পৃথক কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস। এছাড়া অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের এখন মাথায় হাত। তারা সরকারের কাছে বিশেষ আর্থিক সহযোগীতার দাবি করেছেন।

সোমবার দিনগত রাত ২টার দিকে লাগা এ আগুন আগুন  সোমবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভবনের ভিতরে ধিকি ধিকি জ্বলছিল। ডাম্পিংয়ের কাজ করছিল ফায়ার সার্ভিস। তবে পুড়ে ছাই হওয়া দ্বিতল এই মার্কেট ভবনের পূর্ব দিকের একটি অংশ ভোরে ধসে পড়ে। কিভাবে আগুন লেগেছে- সে বিষয়ে নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনাবশত আগুন লেগেছে, নাকি কোন মহলের ষড়যন্ত্রের আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে গেছে এসব ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন- তাও নিশ্চিত নয় সরকারি কোন সংস্থা।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, খবর পেয়ে তাদের ২২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালায়। তাদের অভিযোগ, মার্কেটটিতে অগ্নিনির্বাপণের কোন ব্যবস্থা নেই। এ ধরনের মার্কেটে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম থাকা আবশ্যক হলেও তারা সে নিয়ম মানেনি। গুলশান-১ নম্বরে সিটি করপোরেশনের প্রায় সাত বিঘা জমির ওপর নির্মিত এই বিপণি বিতানে কাঁচা ও পাকা মার্কেট মিলিয়ে দুই অংশে দোকান রয়েছে ছয়শর মত। নিচতলায় বড় একটি অংশে আসবাবপত্রের পাশাপাশি খাবার ও গ্যাস সিলিন্ডার মেরামতের দোকান রয়েছে। দোতলায় রয়েছে আমদানি করা খাদ্যপণ্য, প্রসাধনী, পোশাক, প্লাস্টিক পণ্য, গয়না ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকান। আর নিচতলায় পূর্ব অংশে রয়েছে কাঁচাবাজার।

পাকা মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এস এম তালাল রিজভী বলেন, রাত আড়াইটার দিকে আগুন লেগেছে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তখন ফায়ার সার্ভিসের মাত্র দুটি ইউনিট ছিল। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটের স্বল্পতার কারণে দুই মার্কেটই আগুনে পুড়েছে। ভোর ৪টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট বাড়ানো হয়। আগে বাড়ালে ক্ষতি এত হত না। ফায়ার সার্ভিস তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ জানাতে না পারলেও দুই মার্কেট মিলিয়ে কমপক্ষে দেড়শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে দাবি করেন তিনি।

১২৯ নম্বর দোকানের মালিক মো. বাবু বলেন, ‘মার্কেট বিক্রি হয়েছে কয়েক বার। ভাঙতে না পেরে সিস্টেমে ফেলে দিয়েছে। রাতের অন্ধকারে কেউ আগুন দিয়েছে।’ ব্যাবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের ছিল খেলনার দোকান। দুদিন আগে নতুন মাল তুলেছিলেন তিনি। তিনি জানান, ‘একটা সুতাও বের করতে পারি নাই। সব জিনিসপত্র ছাই হয়ে গেছে। যারা মার্কেট ভাঙার ষড়যন্ত্র করছিল তারাই আগুন দিয়েছে। এই মার্কেটটা ঘিরে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হত। সবার জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

ডিসিসি কাঁচাবাজার ব্যসায়ী সমিতির সহসভাপতি ১৯ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন সিদ্দিকী জানান, সাত বিঘা জমির ওপর এই মার্কেটের পাকা মার্কেট অংশটি আছে ১৯৬২-৬৩ সাল থেকে। ১৯৮২ সালে সিটি করপোরেশন কাঁচা মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেয়।

২০০৩ সালে মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সময়ে মার্কেটের জায়গায় পিপিপির আওতায় ১৮ তলা গুলশান ট্রেড সেন্টার নির্মাণের দরপত্র দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েও তা করতে অপারগতা জানালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা মেট্রো গ্র“পের আমিন অ্যাসোসিয়েটস ওভারসিজ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। ওই চুক্তিতে বলা হয়, ভবনের আটতলা পর্যন্ত থাকবে দোকান, নয় থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত হবে অফিস। দুই হাজার ২৪টি দোকানের মধ্যে ডিসিসি পাবে ২৭ শতাংশ। আর আমিন অ্যাসোসিয়েটস ৭৩ শতাংশ দোকান পাবে এবং তা বিক্রি করে লাভ তুলে নেবে। কিন্তু বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই চুক্তি স্থগিত করে ভবনে ডিসিসির মালিকানা বাড়াতে বলা হয়। এরপর ডিসিসির মালিকানা বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করে নতুন চুক্তি হয়। কিন্তু দোকান মালিক সমিতি এরপর মামলা করলে ঠিকাদার কোম্পানি সেখানে আর ভবন তুলতে পারেনি বলে জানান ডিসিসি কাঁচাবাজার ব্যাবসায়ী সমিতির সভাপতি শের মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং মেট্রো গ্র“প এই নাশকতার সঙ্গে জড়িত।’ ডিসিসি পাকা মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি জয়নাল আবেদিনও একই সন্দেহের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা পরিকল্পিতভাবে কেউ করেছে। আমরা দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’ তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলছেন, নাশকতা নয়, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই আগুন লেগেছে বলে তিনি ধারণা করছেন।

মার্কেটের আগুন কীভাবে লেগেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানাতে পারেননি ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। এ বাহিনীর পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, ‘একটা বিল্ডিং কলাপস করেছে। কোনো ক্যাজুয়ালটি হয়নি। এখানে কমবাস্টেবল ও ফ্লেইম্লে লিকুইড ছড়িয়ে আছে। ডেঞ্জারাস জিনিসপত্র আছে।’
দুপুরে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ অগ্নিকান্ড দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা- তা খতিয়ে দেখতে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি পুলিশ, দোকান মালিক ও স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা একটি তদন্ত কমিটি করা উচিৎ।

ক্ষুব্ধ ফায়ার, ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি : গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিকান্ডের ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক বি. জে. আলী আহমদ খান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছি। বুধবার থেকে তারা কাজ শুরু করবেন’। ১৫/১৬ ঘণ্টা পরও আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি মার্কেট ধসে পড়েছে, সেখানে ঠিকভাবে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। অপর মার্কেটে প্রচুর প্লাস্টিক, ফেব্রিকস ও কসমেটিকস পণ্য রয়েছে। তাই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।’
এদিকে গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ। ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যেকোনো ভবনে আগুন লাগতে পারে। কিন্তু আগুন নেভানোর সক্ষমতা, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা ও আগুন নেভানোর যন্ত্র থাকতে হবে। এই মার্কেটে আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ তুলে মেজর শাকিল বলেন, ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলোতে নির্দিষ্ট পরিমাণে পানি থাকে। এই পানি শেষ হয়ে গেলে বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হয়েছে। সেই পানি নিয়ে আসতেও সময় লেগেছে। মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, অগ্নিকান্ডের কারণ জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top