ভোর ৫:১৭, শনিবার, ২০শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ Top News / গহনা তৈরির মাঝেই ওদের স্বপ্ন খোঁজা
গহনা তৈরির মাঝেই ওদের স্বপ্ন খোঁজা
মার্চ ২০, ২০১৭

আলী আজম সিদ্দিকী : গোপি চন্দ্র সরকার ও ভালো রাণী সরকার দম্পতির পেশা ইমিটেশন গহনা তৈরি করা। সকাল ৯টা হতে সন্ধা ৬টা পর্যন্ত তারা গহনা তৈরি করেন। পরিবারের একমাত্র সন্তান জয় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। জয়কে তারা ডাক্তার বানাতে চান। গয়না বিক্রি করেই তাদের সংসার চলে। গয়না তৈরির মাঝেই তাদের স্বপ্ন খোঁজা।
সভারের ভাকুর্তা গ্রামে এই গোপি পরিবারের মতো অধিকাংশ বাড়িতেই গহনা তৈরি করা হয়। তামা, পিতল, কাঁসা দিয়ে তারা গহনা তৈরি করেন। গয়না তৈরির মধ্যে তাদের জীবননির্বাহ, গয়না তৈরির মাঝে তাদের স্বপ্ন লুঁকায়িত। ঢাকার গাবতলি থেকে আমিনবাজার পার হলেই হাতের বাম দিকে একটি পুরাতন জরাজীর্ণ বেইলি ব্রিজ চোখে পড়ে। ব্রিজটি পার হয়ে মোগরকান্দা। তারপরের পুরোটাই ভাকুর্তা। গ্রামটি ভাকুর্তা, মধ্য ভাকুর্তা এবং হিন্দু ভাকুর্তার সমন্বয়ে গঠিত।

ভাকুর্তাকে বলা হয় গহনা তৈরির গ্রাম। এখানকার বিভিন্ন নকশার গহনা সারা বাংলাদেশে পরিচিত। সরেজমিনে ভার্কুতা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি অনেকগুলো দোকান। এসব দোকানগুলোর কোনটাতে হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ বাজছে আবার কোনটাতে ক্রেতারা অলংকার দেখছেন। দোকানগুলোতে কানের দুল, চুরি, মনিপুরি বালা, নেকলেস, সিতাহার, গলার চেইন, ঝুমকা, হাতের বালা, চুলের ব্যান্ড, কিপ, আংটি, সিঙ্গারা টায়রা , লহরি সহ ২৫-৩০ ধরনের গয়না পাওয়া যায়। চাইলে নিজের পছন্দমতো ডিজাইন দিয়েও গহনা তৈরি করানো যায়। সুজন সরকার নামে এক দোকানদারের সাথে কথা হয়। তিনি ৮৪ সাল থেকে গয়না তৈরির কাজ করছেন। এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, ২০০৩ সালের পর এই ইমিটেশন গয়নার চাহিদা বেড়ে যায়। এখনো বেশ চাহিদা। চাহিদা সম্পর্কে ধনী,মধ্যবিত্ত গরীব সবাই এই গয়না স্বাচ্ছন্দে ব্যবহার করে এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের আকাশচুম্বী দামকে তিনি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

একটি দোকানে মৌচাক থেকে আসা রাকিবুল ইসলাম নামে এক ক্রেতার সাথে কথা হয়। তিনি প্রায়ই এসব দোকান থেকে পাইকারি দরে গয়না কিনেন। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে গয়না কিনে মৌচাকে আমরা কালার করি। তখন বোঝার সাধ্য থাকে না এটা সোনার গয়না নাকি ইমেটিশেন গয়না।’ বাজারে এসব গহনার বেশ চাহিদা বলে তিনি জানান। দোকান পরিদর্শন শেষে এই প্রতিবেদক গ্রামের দিকে রওনা হন। সেখানে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় গহনা তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞ। ভাকুর্তা গ্রামে প্রায় হাজার তিনেক গহনার কারিগর আছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। গ্রামের ভেতরে যেয়ে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা গয়না তৈরির কাজে ব্যস্ত। এদের কেউ গয়নার কাঁচামাল জোগান দেন, কেউ ডাইস বানানোর কাজ করেন আবার কেউবা গয়নাগুলো জিংকে ধুয়ে রং বের করেন বলে তারা জানান। গহনা তৈরিতে লাভ সম্পর্কে নারায়ণ কর্মকার নামের একজন জানান, আগে কম লোকজন গয়না তৈরির কাজ করতো। এখন এই কাজে অনেক মানুষ এমনকি মুসলমানেরাও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে লাভ কমে গেছে। গয়না বিক্রির অর্থ দিয়ে অনেক কষ্টে তার পরিবারের ৯ সদস্যের জীবননির্বাহ করতে হয় বলে নারায়ণ কর্মকার জানান। কম লাভেও এই পেশা গ্রহণের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই পেশা বাপ-দাদার ঐতিহ্য। কষ্ট হলেও মরার আগে এই পেশা ছাড়ুম না।’

এদিকে, রাজধানীর নিউমার্কেট স্বর্ণের দোকান গুলোতে গিয়ে সোনার গহনার বর্তমান চাহিদা সম্পর্কে জানবার চেষ্টা করা হয়। স্বর্ণের দোকানদাররা বলেন, স্বর্ণ তো স্বর্ণই। তবে বর্তমানে স্বর্ণালঙ্কারের  অনেক বেশি দাম ও বর্ধিত কর আরোপের কারণে মানুষ ইমিটেশন গয়নার দিকে ঝুঁকছে। বাধ্য না হলে কেউ সোনার গহনা কিনেনা বলে তারা মতপ্রকাশ করেন। স্বর্ণ অলংকারের ওপর যাকাত থাকার কারণে অনেকে অলংকার কিনে রাখতে চান না বলেও তারা মনে করেন। অন্যদিকে, চাঁদনী চক মার্কেটে গিয়ে ইমিটেশন গয়নার দোাকানগুলোতে ক্রেতাদের বেশ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মনিরা বেগম নামের মপল ক্রেতা কানের দুল ও চুরি দেখছিলেন। এই অলংকার ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘স্বর্ণালঙ্কারের অনেক দাম। তাছাড়া এই গহনা সব সময় ব্যবহার করা যায় দামও কম।’ বর্তমানে অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেও ইমিটেশন গহনা বিক্রি হচ্ছে বলে দোকানদাররা জানান।

ছবির ক্যাপশন : সাভারের ভাকুর্তা গ্রামে গোপি পরিবারের সদস্যদের তামা, পিতল, কাঁসা দিয়ে তৈরি গহনা।

 

 



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top