ভোর ৫:৫৪, মঙ্গলবার, ১৬ই অক্টোবর, ২০১৭ ইং
/ উপ-সম্পাদকীয় / ইতিহাসের পাতায় পাতায় বঙ্গবন্ধু
ইতিহাসের পাতায় পাতায় বঙ্গবন্ধু
মার্চ ১৬, ২০১৭

শাওন রহমান : সৃষ্টিকর্তা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ইতিহাস হয়ে ওঠার জন্যই সৃষ্টি করেছিলেন। তার জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে; ইতিহাস শেখ মুজিব ডেকে নিয়ে, ইতিহাসের পাতায় পাতায় তাকে বেঁধে রেখেছে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময়ে ছাত্র জীবন থেকেই। সেবছর স্কুল পরিদর্শনে আসেন তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও উপমহাদেশের বর্ষীয়ান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবি নিয়ে শেখ মুজিব তাদের কাছে যান।

 বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির আন্দোলনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করেন। এই আন্দোলনের কারণে ১১ সেপ্টেম্বর তাকে আটক করা হয় এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ১৪ আগস্ট এক সিন্ডিকেট সভায় তার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিমলীগ গঠন করেন। শেখ মুজিব মুসলিমলীগ ছেড়ে এই নতুন দলে যোগ দেন। তাকে দলের যুগ্ম-সচিব নির্বাচিত করা হয়।

১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমন উপলক্ষে আওয়ামী মুসলিমলীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষ বিরোধী মিছিল করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে শেখ মুজিবকে আটক করা হয়। সেবার তার দু’বছর জেল হয়। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় ঘোষণা দেন ‘উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। এসময় শেখ মুজিব জেলে বসে ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন পালন করেন। অনশন চলাকালীন ২৬ ফেব্রুয়ারি তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগের কাউন্সিল অধিবেশনে মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৪ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অন্যান্য দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়।

 ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টিতে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে, যারমধ্যে ১৪৩টি আসনেই আওয়ামীলীগ জয়লাভ করে। ২৯ মে কেন্দ্রিয় সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়। ১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিব আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। ১৭ জুন পল্টন ময়দানে আয়োজিত সম্মেলনে আওয়ামীলীগ ২১ দফা দাবি পেশ করে, যারমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অন্তর্ভূক্ত ছিল।


এরপর ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলিমলীগের বিশেষ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে দলের নাম থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দেয়া হয়। শেখ মুজিব পুনরায় দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৬ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিব কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিয়ে একযোগে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। তিনি দলে সম্পূর্ণ সময় দেয়ার জন্য ১৯৫৭ সালে ৩০ মে মন্ত্রী পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। এতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের পরিপূর্ণ রূপরেখা উপস্থাপিত হয়। ১৯৬৮ সালের প্রথম দিকে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবসহ ৩৪জন বাঙালি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে।

 যা ইতিহাসে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। এই মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ শেখ মুজিবসহ অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি কেন্দ্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের এগার দফা দাবি পেশ করে। যারমধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার সবগুলো দাবিই অন্তর্ভূক্ত ছিল। এই পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশব্যাপি ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।

 এই গণআন্দোলন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। আইয়ুব খান রাজনৈতিক নেতাদের সাথে বৈঠকে এই মামলা প্রত্যাহার করে নেন। শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সকলকে মুক্তি দেয়া হয়। কেন্দ্রিয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করে। এই জনসভায় শেখ মুজিবকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে “বাংলাদেশ” নামে অভিহিত করা হবে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানে ২টি আসন ছাড়া আওয়ামীলীগ সবকটিতেই জয়ী হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে সরকার গঠনের আহ্বান জানালে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা ভুট্টো সে সরকারকে মানবেন না বলে ঘোষণা দেন। পশ্চিম পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন থেকে বঞ্চিত হন। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেন।

ইয়াহিয়া সামরিক আইন জারি করলে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও জনসাধারণের অসন্তোষ দমনে ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হলে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। নয়মাস যুদ্ধ চলার পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

 নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু’র আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন করেন। সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে দাঁড় করাতে বঙ্গবন্ধু অক্লান্ত পরিশ্রম করছিলেন। দিন-রাত দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তিনি দেশকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন। এরমধ্যে কতিপয় বিপথগামী তরুণ সেনা কর্মকর্তা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২নং বাড়ি ঘেরাও করে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারবর্গকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার দুই মেয়ে পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশেরই নেতা নন, তিনি অধিকার বঞ্চিত, শোষিত শ্রেণিহীন মানুষের নেতা। বিশ্বের বুকে যখনই মানুষ তার অধিকার হারাবে, শোষণের শিকার হবে তখনই মানুষ বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হবে। তবে স্বাধীনতা পরবর্তী একুশ বছর বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে তা লজ্জাকর। আবার এখন বঙ্গবন্ধুকে যথাযথ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে তার দলের মধ্যে যেভাবে তাকে সংকীর্ণভাবে ধরে রাখা হয়েছে, তাতেও তার উপযুক্ত মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। কারণ, বঙ্গবন্ধু কোন দলের নয় তিনি সমগ্র ইতিহাসের, গোটা জাতির।
লেখক ঃ সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক

[email protected]

০১৭১৬-২২৪৮১০



লাইক দিয়ে সঙ্গে থাকুন :




Go Back Go Top